বৃহস্পতিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

একটি প্রাকৃতিক সাইজ ফিকশন : শিন্টু ধর্মাবলম্বী রাজা, সবুজ ভদ্রমহিলা এবং একজন অভদ্র সামুকামী



আবু মুস্তাফিজ


বাবা আমাকে শিখিয়েছিল অর্থাৎ বলেছিল অথবা শেখাতে চেয়েছিল। আমি শিখিনি, বরং ভুলে যাবার চেষ্টা করেছি সত্বর। ' পৃথিবীর কোনো কিছুই ফেলনা নয়...প্রত্যেকটা জিনিসেরই মূল্য আছে, ঈশ্বর সকল কিছুকেই আরো বেশি প্রয়োজনীয় করে তৈরি করেছেন।' ভুল বলেছিল, আমার কাছে মনে হয়-সব কিছুই বাগদত্তা, প্রেমহীন বউয়ের মতোই অপ্রয়োজনীয়

আকাশ মাথায় নিয়ে শুয়ে আছি, মাটিতে। দীর্ঘকাল পর। দুশ্চিন্তামুক্ত মাথা। কখনো চিৎ হয়ে, কখনো এপাশ-ওপাশ। মাঝে মাঝে কষ্ট পাচ্ছে আমার ডান হাত, মাঝে মাঝে কষ্ট পাচ্ছে বাম হাত। আবার কখনো বা পুরোটা পিঠ। বন্ধুর মতো একটা মেয়ে, বসে আছে পাশে, একটু পেছনে। আরেক পাশে প্রেমিকা মতো একটা মেয়ে, অথচ সে প্রেমিকা নয়। সামনে লাল লাল শাপলাফুলফোটা হ্রদ। জলের রং জলের মতোই আদুরে কালো। সেইবার...এক হলুদ ট্যাক্সিক্যাব ড্রাইভার, চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে তার বন্ধুকে কিংবা প্রেমিকাকে নয়তো বউ নতুবা শ্যালকস্বরূপ কোনো প্রিয় আত্মীয়ের নিকট গল্প মারছিল, তার দূরালাপনীতে যন্ত্রতে .. ..আমি জাহাঙ্গীরনগরে....সাভারের কাছেই..এইহানে একডা নদী আছে..লাল লাল শাপলাফুল ফুইট্ট্যা আছে...
আমার পাশেই ছিল অনজন। ফাট করে বলে বসলো,' শালারে গ্রীবা ধরে বের করে দেওয়া উচিত।' কেন..কেন.. কেন। কেন তুমি তাকে গ্রীবা ধরে বের করে দিতে চাও? কারণ কি তার অজ্ঞতা? .. একটা মানুষ তো বহু কিছুই না জানতে পারে। তুমিও তো কত কিছু জানো না। তাই বলে আমি তো তোমাকে বের করে দিতে চাইছি না। হলুদ ট্যাক্সিক্যাবওয়ালা হয়তো একটু বেশিই নাদান। সে হয়তো জানে না নদীতে শাপলা ফুল ফুটতে পারে না জলের ব্যস্ততায়। কিন্তু সে কথা জগতের কটা লোকই বা জানে? অথচ দেখো, কী দারুণ উচ্ছ্বাসভরে সে গল্প মারছিল তার কোনো প্রিয় শ্যালকের নিকট। লাল লাল সব শাপলা ফুলের। এই প্রেম আন্তরিকতাকে তুমি অগ্রাহ্য করতে পারো না। আমি পারি না অন্তত। অনজন চুপসে যায় ফশ করে।

আজ সেই লাল লাল শাপলা ফুল ফোটা নদীর পাশেই শুয়ে আছি.. ঘেসো মাটিতে। পাশেই বসে আছে বন্ধুর মতো একটা মেয়ে অথবা সে বন্ধু নয়। নাওতো হতে পারে। যেমন আমার পাশেই বসে আছে প্রেমিকার মতো একটা মেয়ে, অথচ সে প্রেমিকা নয়। আমি তাকে বলি, 'আচ্ছা বড় হলে কী হবে তুমি?' সে ভীষণ করে হাসে। বড় হলে কী হবো মানে? আমরা তো বড়ই! আমি বলি..হ্যা.. ধরো চাই.সে তো ঠিকই..কিন্তু অনজনের পুরনো রুমমেট তাকে জিজ্ঞেস করেছিল..বড় হলে কী হবে সে? অনজন আঁকাবাঁকা হেসেছিল এবং বলেছিল..একটা শান্তশিষ্ট গরু। সে হাসে ..প্রেমিকার মতো মেয়েটা হাসে। আমি তাকে বলি..হেসো না..হেসো না মেয়ে..হেসো না কালো মেঘ... তোমার পেটের ভেতর যে ভুল অথবা ফুলের জন্ম হচ্ছে ..তাকে রুখবে কে?..একটা লাল কৃষ্ণচূঁড়া বৃক্ষ হত্যার দায়ে তুমিও অভিযুক্ত হতে পারো.. মানে? বলে চোখ সরু করে প্রেমিকার মতো মেয়ে। শোনো.. বলে আমি তাকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বোঝাই..আসলে বড় হলে মানুষ দুটো জিনিসই হতে পারে..হয় গরু...শান্তশিষ্ট অথবা অশান্ত। আর নয়তো ছাগল। ম্যা..ম্যা..করতে করতে আমি তার চোখের কালো অংশের গভীরতা মাপি। সেখানে ইট্টুখানি ভালবাসা পাওয়া যায় কি-না দেখি। কিন্তু সেখানেই স্পষ্টই লেখা আছে....য়া, ..রু..ণা। আমি আরো আদুরে বাদুরে হয়ে, প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে - কে , য়-কে , - কে আর একখানা ছোট্ট কুঁড়েঘর দেখবার প্রত্যাশায় মাতি। কিন্তু প্রেমিকার মতোই অথচ যে প্রেমিকা নয়, খেক শিয়ালের মতোই খ্যাঁক খ্যাঁক করে বলে, হ্যা..আপনারে কইছে?..ধপ করে নিবে যাওয়ার মতোই প্রতিটা শব্দ। কিন্তু তার মুখের গর্ত থেকে..'কইছের পেছন পেছন লাফিয়ে বেরয় একটা মায়াবী বাতাস। আর তাতেই বর্তে যাওয়া বর্তুলাকার আমি আবারও টানটান ভঙ্গিতে শুরু করি, প্রবল আশা নিয়ে। চোখের কালোতে আলো করা এক ভাঙাচোরা কুঁড়ে ঘর দেখবার প্রগাঢ় বাসনায়।.. কিন্তু ধরো চাই ..আমার মাঝে মাঝে মানুষ হতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু মানুষ হওয়াতো খুব শক্ত কাজ! যেমন একটা পাকা বালকে টেনে সোজা করার মতোই অসম্ভব ব্যাপার। পেটের ভেতর গুঁড়ি মেরে শব্দগুলো লুকিয়ে থাকে। বেরিয়ে আসে আদর করে কুত্তার লেজ সোজা করার মতোই অবাস্তব।

প্রেমিকার মতো মেয়েটা হাসে। চোখের কালো চিকমিক করে উঠে। একটা দুটো খড়কুটো দেখতে পাই আনন্দে বুকের ভেতর খরগোশের বাচ্চা নেচে নেচে ঘাস খায়। পেছন থেকে বন্ধুর মতো মেয়েটা উঠে যায়। উঠে গিয়ে দূরে বসে। হয়তো আরো গভীর মনোযোগে লাল লাল শাপলাফুল দেখে। এই ফাঁকে আমি আমার বুকের ভেতর নেচে নেচে খাসখাউয়ারত আনন্দিত খরগোশগুলোকে গ্রীবা ধরে খোয়াড়ে ঢোকাই, আনন্দের চাপড় মেরে। তারপর আরো বেশি মুখের কাছে মুখ, চোখের কাছে চোখ নিয়ে প্রেমিকার মতো মেয়েটাকে বলি.. তোমার বুঝি মানুষ হতে ইচ্ছা করে না? মেঘ জমে মুখে। নিষ্পৃহ কণ্ঠে বলে..আমি তো মানুষই। ..হ্যা ..হ্যা..সে তো ঠিকই..সে তো ঠিকই। কিন্তু এরম প্রাণীর মতো মানুষ নয়।.. যে তখন বললাম..মানুষ হওয়াতো বাঁকা বাল সোজা করার মতোই সাংঘাতিক কঠিন। লুকিয়ে থাকা শয়তান শব্দগুলো গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরলো না মুখগহ্বর দিয়ে বেরলো..ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। কিন্তু নিজের কানেই যখন শুনলাম, তখন মনে হলো রাস্তার কোনো বাজে পথিক হাওয়ায় শব্দগুলো উড়িয়ে দিয়ে গেছে। ইচ্ছা করলো বাজে পথিকের গলা চেপে ধরি, দ্রুত শয়তান শব্দ থামাই। কিন্তু ডান হাত সে ইচ্ছায় সাড়া দেয় না। ঝিঁঝি ধরা ডান হাত। বাম হাত আগেই ঝিঁঝি ধরে পড়ে আছে মরে। শরীরে ঘুম পাখির মতোই বাসা বুনে যায়। ডানচোখ আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যায়, অবলীলায় খুলে রাখি বাম চোখ। চোখভর্তি লাল লাল শাপলাফুল। চুউউং করে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। মুখোমুখি হয় এক হলুদ ট্যাক্সিক্যাব ড্রাইভার। শাপলাফুল তার আদরের বাড়িঘর। লাল পাপড়িতে বসে জল খলবল করে পা নাচায়। পা নাচায় জল নাচে। জল নাচে..পা নাচে..
জন হেনরি... জন হেনরি.. নাম তার ছিল জন হেনরি ছিল যেন জীবন্ত ইঞ্জিন...
খোয়াড়বন্দি মনখারাপ করা খরগোশগুলো একজোটে লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলে খোয়াড়ের তালা। মুক্তির আনন্দে লাফায়..নাচে..হাততালি দেয়...আনন্দের আতিশয্যে কেউ কেউ কানধরে উঠবস করে। ..ইস্..আর পারি না..সব ভুলে গেছি। ঝট করে পেছনে তাকাই। ধীরে ধীরে উধাও হয় শাপলাফুল। ফিরে আসে প্রেমিকার মতো মেয়েটার কালোমুখ..না পারার বেদনা চোখেমুখে..বলতে থাকে আনমনে..একা একা ...নিজে নিজে..আমার যে কী হবে? বাবার যদি অনেক টাকা থাকতো? ..নে.. টাকা?
চুপচাপ শুনি আর মনে ভেতর গজিয়ে উঠতে থাকে বহুমূল্যবান টাকার গাছ। একটা নয়, দুটো নয়, হাজার হাজার গাছ... হাজার হাজার টঙ্কা বৃ লতায় পাতায় জড়ানো মুড়ানো..জঙ্গল ...মধুপুর..জঙ্গলভর্তি টাকা...টাকার মালিক বাঘ।

না..সত্যি...সে বলতেই থাকে..আমার তো চাকরি হবে না..কে আমাকে চাকরি দেবে?... নিশ্চয়ই হবে না..বেশ থমথমে গলায় বলি। শুষ্ক হাসি হাসে প্রেমিকার মতো মেয়ে..ভয় দেখাচ্ছেন? তাকে স্পষ্ট করি। না..বাস্তবতা বোঝাচ্ছি। আরো স্পষ্ট করার জন্য বলি..তা এই ধরো..একখানা চাকরি পেতে হলে তোমাকে কিনতে হবে নিদেনপক্ষে তিন জোড়া স্যান্ডেল। হেঁটে হেঁটে য় করে তবেই না পেতে পারো টিনের হরিণসম বেসরকারি অনিশ্চয়তাপূর্ণ, বিবিধঝামেলাযুক্ত একখানা সস্তা দামের চাকরি। সোনার হরিণসম সরকারি চাকরির প্রত্যাশা..বামনের চাঁদ ভালবাসার মতোই জটিল প্রক্রিয়া..পর্যন্ত বলে বেশ একটা অসহায় ভঙ্গি আঁকি শরীরে, তাতে জটিল প্রক্রিয়ার জটিলতা আরো বৃদ্ধি পায়।

বেশ ছোটাচ্ছেন, টিভি সিনেমা দেখে দেখে নাহ্? প্রেমিকার মতো মেয়েটা এবার যুৎসই ভ্রুভঙ্গি হানে। তা দেখে মরমে মরে যাই। তারপরও সাহসে বুকে ভর দিয়ে খাঁড়াই। মিছে অবাক হই..ছোটালাম কোথায়! এখনো তো ঘোড়ার লাগাম খোলা বাকি..আসল দৌড় তো শুরুই করিনি.. তাই নাকি? বলে আসল ঘোড়দৌড় দেখার আগ্রহ দেখায় মেয়েটা। আমিও শুরু করি প্রথমে দুলকি চালে..তা ধরো নিত্যি গুঁতোগুতি করে পাবলিক বাসে ওঠা, মশার কামড়ের মতো পুচ্ছে একঝাক রাম কিংবা কাম চিমটির জ্বালা, দাঁড়িয়ে থাকলে। আর নেহায়েৎ বসবার জায়গা পেলে পাশের ভদ্রলোক, অভদ্রলোক, বদলোকেরা নিজের ঊরু ভেবে তোমার ঊরুটি ব্যবহার করতে পারে নিশ্চিন্তে... চাকরির বাজারে অনেকেই হয়তো হেসে হেসে কথা কইবে, কেউ কেউ ফাঁসিয়ে দেওয়ার ধান্দা করবে, অনেকেই বন্ধু সাজবে, সাজতে চাইবে প্রেমিক অথবা পুত্রের জনক। অনেকেই সহগামী, সহযোদ্ধা, সহমর্মী হয়ে হাতে চাররঙা কাষ্ঠ ধরিয়ে দিয়ে বলবে..অফিসে আসবেন..কাজের কথা হবে..কামের কথা..
এক নাগাড়ে বলতে থাকি। বলতে বলতে আমোদিত হই। ঘোড়া বল্গা হরিণীর মতোই রূপকথার সমস্ত দেশ পেরিয়ে শেষমেশ উড়তে থাকে আকাশের দিকে। মোমের মতো জ্বলতে জ্বলতে গলতে গলতে মেয়েটাও হাসে। হাসতে হাসতে বিষম খায়। চারদিকে ফুটতে থাকে লাল শাপলাফুল। অজস্র..অগুনতি। জল খলবল করে পা নাচায় হলুদ ট্যাক্সি ড্রাইভার। জল নাচে, পা নাচে, পা নাচায় জল নাচে।
' কাপুরুষ সিংহ সে তো মারতেই জানে... আমরা যে মরতেও জানি.. মেয়েদের চোখ আজ চকচকে ধারালো...'

জিপারের নীচে লিঙ্গ ছোট হয়ে আসে ভয়ে। কালো মেয়েটা মুখ আলো করে জিজ্ঞেস করে..বড় হলে আপনি কী হবেন? বিপদে পড়ে যাই আমি, কঠিন। কী হতে পারি আমি? একটা শান্তশিষ্ট গরু অথবা অশান্ত ছাগল, ভীরু ভেড়া থেকে আরম্ভ করে বনের বাঘ হওয়া পর্যন্ত ভেবে ফেলি একটানে; শেষমেশ কোনোকিছু না হতে পেরে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় রা..জা..

বন্ধুর মতো মেয়েটা উঠে আসে কাছে, বসে পড়ে পাশে, হাতে রাখে হাত, বলে..নে ধর ..উপহার। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, ঘাস, আর হরেক রকমের পাতা ক্ষীণ তৃণে বেঁধে ভালবাসা দেয়। ভালবাসা নিই। ট্যাক্সি ড্রাইভার জল খলবল ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় লাল পাপড়িতে। তারপর হন্তদন্ত হয়ে ছোটে নরোম পাপড়ির মসৃণ ভাজ একের পর এক দ্রুত সরায়ে। ফুলের গোপন ঘর থেকে বের করে আনে তার প্রিয় ট্যাক্সিক্যাব। হর্ন বাজায় ....পপ....প। হেলেদুলে চলতে থাকে লাল পাপড়ির রাস্তায়... ' শোনো ..তাজেল গো..মন না জেনে প্রেমে মইজো না...

প্রেমের জন্য চাই উড়িয়াবাজ ঘোড়া, জরির জামা, জরির জুতা- ওসব কোনো কিছুই তো নেই আমার। ঠা ঠা করে হাসি। অথচ আরো কাছিয়ে আসে বন্ধুর মতো মেয়ে, হাসে খিল খিলিয়ে। প্রেমিকার মতো মেয়ে, গ্রীবা গুঁজে তখনো বসে থাকে দূরে। আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে আমার হাল্কা ঝিঁঝি ধরা হাত দুটোকে উড়িয়াবাজ ঘোড়া বানাই। তারপর হাতদুটোকে বাতাসে খেলাই। উড়িয়ে দেই আকাশে। উড়তে উড়তেই বলতে থাকি...

.......দা.. এক... শিন্টু ধর্মাবলম্বী রা..জা.. হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগে...আচ্ছা ..গাছের পাতা কেন নড়ে? অবাক হয় রাজা..সত্যিই তো কেন নড়ে গাছের পাতা! তিনি রাজা..অথচ তিনিই জানেন না কেন নড়ে গাছের পাতা? এও কি সম্ভব? খুবই সম্ভব। কারণ শিন্টু ধর্মাবলম্বীদের রাজ্য যে আর দশটা উত্তরাধুনিক রাজ্যের মতোই সাংঘাতিক আজগুবি, গুজগুবি এখানকার সব কান্ডকারখানা। অন্যসব উত্তরাধুনিক রাজ্যে যেমন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাঁচের বাক্সে বাচ্চা ফোটানো হয়, শিন্টু রাজ্যে ব্যাপারটা ঠিক রকম না হলেও মোটামুটি অন্যরকম। শিন্টুরা কাঁচের বাক্সে বাচ্চা না ফুটিয়ে ঊরুঝিলি্ল পর্বতের মাথায়, অত্যন্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পদ্ধতিতে ৩৩ বছর বয়স্ক পূত পবিত্র মানুষ ফোটায়। সঙ্গতকারণেই শিন্টুদের রাজ্যে কোনো শিশু নেই, নেই কোনো অশীতিপর বুড়োও। শুধু তাই নয়, শিন্টুদের রাজ্যে আলোময় দিন আছে, কিন্তু কেউ কখনো অন্ধকার রাত ভুলে কিংবা স্বপ্নেও দেখেনি। যে কারণে কেউই হিসাব রাখে না সময়ের। সময়ের কোনো মূল্যই নেই কারো কাছে। বরং সময় একটা ফালতু বস্তুর মতোই যত্রতত্র হামাগুঁড়ি দিয়ে পড়ে থাকে। উহা কেউ খায়ও না, রঙিন জামা হিসাবে কারো গায়ে দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। শিন্টুরা অবশ্য মান্টুদের মতো সকলেই চিরজীবী, চিরযৌবনপ্রাপ্ত। আর মান্টুরা? ওরা তো পাশের উত্তরাধুনিক রাজ্যেরই বাসিন্দা, মাথায় যন্ত্র ফিট করে এবং মন্ত্র উচ্চারণ না করেই যারা কামকলায় লিপ্ত হতে ভালবাসে। আর উহারাও শিন্টুদের মতোই চিরজীবি, চির যৌবনপ্রাপ্ত। তবে শিন্টুরা চিরজীবী, চিরযৌবনপ্রাপ্ত হলেও আদর্শগতভাবে তারা কিন্তু সকলেই বায়ুকামী। কিন্তু তারা মান্টু, পান্টু কিংবা বান্টুদের মতো যান্ত্রিক বায়ুকামে বিশ্বাস করে না। শিন্টুদের কেউই মাথায় যন্ত্র ফিট করে কাম কলায় লিপ্ত হতে রাজী নয়। কারণ রাজাই ওসব ভালো করে ভালবাসে না। বরং তারা প্রত্যেকেই মাথায় মন্ত্র ফিট করে বাতাসে অঙ্গ দুলিয়ে এবং লিঙ্গ চালিয়ে অত্যন্ত আরাম পায়। কারণ রাজা ওভাবেই বায়ু থেকে নিজের জন্য প্রগাঢ়তম আরাম এবং আনন্দ কাড়েন। যাই হোক, রাজা এবং প্রজাদের সম্মিলিত অভিনব মতির কারণে শিন্টু রাজ্যের প্রতিটা গ্রামে গঞ্জে, শহরে নগরে বন্দরে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অসংখ্য বায়ুকামঘর। কামঘরের প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র সাঙ্গপাঙ্গরা বায়ুকামীদের মাথায় সুনির্দিষ্ট মন্ত্র ফিট করার মধ্য দিয়ে শুরু করে বায়ুকাম প্রক্রিয়া। অতি ধীরে পোশাক আশাক খুলে বায়ুকামীরা একে অন্যের দশ হাত দূরে দূরে দাঁড়ায়। তারপর শুরু করে প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ মতো বায়ুতে অঙ্গ দোলানো এবং লিঙ্গ চালানো। এভাবে দীর্ঘণ বাতাসে অঙ্গ দুলিয়ে এবং লিঙ্গ চালিয়ে বায়ুকামীরা গভীরতর এক মানসিক তৃপ্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর এই তৃপ্তিময় আচ্ছন্নতা বায়ুকামীদের শরীর থেকে এক ধরনের পবিত্র জল নিঃসরণে সহায়তা করে। নিঃসৃত পবিত্র জল জমা হয় পবিত্র পুষ্পভাণ্ডে। এরপর প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র সাঙ্গপাঙ্গরা পবিত্র জল জমাকৃত পবিত্র পুষ্পভাণ্ড নিয়ে যায় মহাপবিত্র ঊরুঝিল্লি পর্বতের মাথায়, নীল কুয়াশাঘন মহা মহা পবিত্র মেঘঘরে। এরপর রাজার ইচ্ছানুসারে মেঘ ঘরে ফুলের মতো ফুটতে থাকে একেকজন ৩৩ বছর বয়স্ক শিন্টুধর্মাবলম্বী পূত পবিত্র বায়ুকামী..যারা নেমে আসে মহা পবিত্র ঊরুঝিল্লি পর্বতের পা বেয়ে।

প্রেমিকার মতো মেয়েটা হাসে। হেসে হেসে বলে..বেশ আজগুবি তো। আমি আমার উড়িয়াবাজ ঘোড়ার ডানা দুটোকে আবারো বাতাসে খেলাই এবং পাখি বানিয়ে পাখি উড়াই। তারপর বলি..রসো...আজগুবির কী আর দেখলে..ইহা তো কেবল শুরু। তারপর আবার বলতে থাকি ...যদিও শিন্টু ধর্মাবলম্বীদের রাজ্যের সকলেই আদর্শগতভাবে বায়ুকামী, কিন্তু হলে কী হবে? তাদের অনেকেই যে আবার পায়ুকামে লিপ্ত হতেও ভালবাসে! রাজা আবার এসব জানে না। জানলে কঠিন শাস্তি। কণ্টক লিঙ্গে চড়িয়ে ফাঁসি। অন্যদিকে প্রজারাও জানে না যে রাজাই কুকর্মের মূল পাঁজি। এভাবে সকলেই একে অন্যের কুকর্মের কথা না জেনে, একে একে সব শিন্টুই পায়ুকর্মে লিপ্ত হতে ভালবাসে। তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রকাশ্যে কেউ কারো কুকর্মের কথা না জানলেও, মনে মনে সকলেই সকলের সকলই জানে। কিন্তু তারা সকলেই যেহেতু আদর্শিকভাবে গাঢ় বায়ুকামী এবং বিশ্বাস করে ঘন সবুজ বিপ্লবে, তাই তাদের প্রত্যেকের হাঁটা চলায় ফুটে উঠে এক অতিপ্রাকৃত গাম্ভীর্য।
প্রেমিকার মতো মেয়েটা কিছু না বলে শুধু ছিঁড়ে যায় তৃণের মাথা। বন্ধুর মতো মেয়েটা ফেটে পড়ে উৎসাহে, তারপর কী হলো ..তারপর কী হলো বলে তাগাদা লাগায়.. আমি তবু চেয়ে থাকি প্রেমিকার মতো মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষণে, নিজেকে বানাই উড়িয়াবাজ ঘোড়ার সাদৃশ্যকরণে। তবুও দৃষ্টিহীনের মতোই সে ছিঁড়ে যায় অসংখ্য তৃণের মাথা। আমি আমার ঘাসখাওয়া নিরানন্দিত খরগোসগুলোকে লাগামহীন ঘোড়ার গ্রীবায় চড়িয়ে ছুটতে থাকি দিগ্বিদিক...তো ওই দেশেই বাস করতো এক ভীষণ বাজে লোক। যে বায়ুকামে বিশ্বাস করতো না। পায়ুকামেও ছিল না তার মতি। এহেন বাজে লোকের ভক্তি ছিল বিজাতীয় সামুকামে। মাথায় যন্ত্র অথবা মন্ত্র ফিট ছাড়াই সে বিপুলভাবে উত্তেজিত থাকতো সম্মুখ কর্মে লিপ্ত হওয়ার প্রগাঢ় ইচ্ছায়। কিন্তু তার সে প্রগাঢ় ইচ্ছা পূরণের কোনো উপায়ই ছিল না শিন্টু ধর্মাবলম্বীদের রাজ্যে। কারণ রাজ্যব্যাপী সকলেই ছিল একেকজন আদর্শ বায়ুকামী। যদিও তারা লুকিয়ে চুরিয়ে পায়ুকর্মের মধু খেত, কিন্তু তাদের কেউই সামুকামের মিঠা সম্পর্কে বিশেষ অবগত ছিল না। ফলে হেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সামুকামী সম্মুখকর্মে লিপ্ত হতে না পেরে যাচ্ছেতাই মনখারাপে আক্রান্ত হলো।

আর এই যাচ্ছেতাই মন খারাপ তাকে এতটাই দুর্বিনীত আর কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তুলল যে হঠাৎ সে দশ হাত দূরের বায়ুকামরত এক সবুজ ভদ্রমহিলাকে জাপ্টে ধরে উপর্যুপরি লিঙ্গ চালিয়ে দিল। ঘটনার আকষ্মিকতায় বায়ুকামীরা বাতাসে লিঙ্গ চালানো বাদ দিয়ে থ্ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অনেকেই সামুকামীর বুরবুকামি দেখে হাসতে হাসতে পাগল হয়ে গেল। কেউ কেউ আবার কড়া হাততালিতে ফেটে পড়ল। কিন্তু কর্তব্য ভুলে গেল না প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র সাঙ্গপাঙ্গরা। রা..রা..করে তেড়ে আসলো তারা। ঘুসি দিয়ে সামুকার নাক ফাটালো, হনুতে ট্যাপ ফুলালো, কেটে ফেলল জোড়াভ্রু। থুঁতনি আর চোয়ালেরও কিছু বাকি রাখলো না তারা। কে যেন আবার টন্নশ করে মাথায় হাতুড়ির একখানা বাড়িও বসিয়ে দিল। তারপর পুচ্ছে একগাদা শক্তিশালী লাথি দিয়ে তাকে বিদায় করে দিল রাস্তায়।

রাস্তা থেকে টেনে হিঁচড়ে, মাথা ঘুলিয়ে যাওয়া সামুকা নিজেকে নিয়ে পালালো বনে। বনে গিয়ে ণে ণে মনে পড়ল সবুজ ভদ্রমহিলার কথা। দেখতে থাকলো বিভিন্ন এঙ্গেলে সবুজ ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরার মনোরম দৃশ্যাবলি। মন ভালো হয়ে গেল সামুকামীর। কিন্তু একই সঙ্গে ফিরে এল প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র গুণ্ডা কর্তৃক প্যাঁদানোর দৃশ্যাবলিও। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল সামুকামী। কান্না ফুরিয়ে গেলে এবার পড়ল গাঢ় লজ্জার ভেতর। লজ্জা তাড়াতে সামুকা দৌড়াতে লাগলো বনময়। লজ্জা কেটে আবার ফিরে এল সবুজ ভদ্রমহিলা, ফিরে এল বিভিন্ন এঙ্গেলে জড়িয়ে ধরার রঙিন সব ছবি। সামুকামী আনন্দের আতিশয্যে তৎণাৎ হাজির হতে চাইলো সবুজ ভদ্রমহিলার কাছে। কিন্তু পরণেই তার মনে পড়ল প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র গুণ্ডা কর্তৃক পিটা খাওয়ার কাহিনী। আবার ফিরে এল গভীর বেদনা।

এভাবে সামুকা ক্ষণে হাসে, ক্ষণে কাঁদে এবং হাঁটতে থাকে বনময়। গাছকে মানুষ ভেবে কথা কয়। ফুলকে নিরানন্দে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কতণ? এসব হাল্কা পাগলামি কী আর ভালো লাগে সামুকামীর? তাই খুব সহসাই বিরক্ত হয়ে দুচ্ছাই বলে হাঁটা ধরে গাঁয়ের পথে। অজানা কারণে হাতে তুলে নিল একগাদা হাস্নুহেনা।

খিলখিল করে হেসে উঠে বন্ধুর মতো মেয়ে অথবা যে বন্ধু নয়। চোখে তার ফুটে ওঠে লাল লাল শাপলাফুলফোটা নদী। চোখের রং জলের মতোই আদুরে কালো। বাড়ি ফিরে যায় হলুদ ট্যাক্সিড্রাইবার...ভাত খেতে। সামনেই বসে থাকে বন্ধুর মতো মেয়ে, ভাত বেড়ে। ছোট ছোট অনেকগুলো কুঁড়েঘর...পাশেই শুয়ে আছে নাতিদীর্ঘ নদী...অদূরে খরগোশদের বন...বয়ে যাচ্ছে সময়...আনন্দময়।

এদিকে, রাজা গাছের পাতা নড়ার রহস্য আবিষ্কারে ব্যাপক ভাবতে লাগলো। ভাবতে ভাবতে ভাবতে ভাবতে রাজা কিছুই ভেবে পেল না। খুঁজে পেল না ভাবনার কোনো কূল কিনারাও। যা পেল তা শুধু জল আর জল। বিভ্রান্তিকর হাবুডুবুতে ওইসব নোংরা জল খেয়ে রাজার ত্রাহি অবস্থা প্রকাশ পেল অচিরেই। রাজা দেখতে পেল সম্পর্কে তার সীমাহীন অজ্ঞানতা বিরাজিত। তাই শেষমেশ কুলাতে না পেরে রাজা তার বশংবদ মন্ত্রীকে ডেকে বলল..প্রিয় মন্ত্রী ..দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমি একটা ক্ষুদ্র ভাবনায় মাথা গলিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমার ধারণা..এক্ষেত্রে আমার ভাবনা ঠিক সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে না।
মন্ত্রী বেশ পাকালোক। -তে কলিকাতার রেসের মাঠ বোঝে...টাকার উড়াউড়িও দেখে। ফাট করে বুঝে ফেলল পরিস্থিতি এবং দেরী না করে বলল...হুজুর কিছু মনে করবেন না..ইকটু ঝেড়ে কফ ফেলবেন কি? দেখি..অধম আপনার মহৎ ভাবনায় লিপ্ত হতে পারে কি-না..
রাজা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে শুরু করে...না.... বিষয়টা বিশেষ মারাত্মক কিছু নয়। তবুও বলছি...আচ্ছা ..তুমি কি বলতে পারো গাছের পাতা কেন নড়ে?

মন্ত্রী রাজাকে না দেখিয়ে মুচকি হেসে...বিষয়টা বেশ ইন্টরেস্টিং হুজুর। বেশ সহজ মনে হয়, আবার কোনো মতেই একে জটিলতামুক্ত বলা যাবে না। আসলে আমাদের বিজ্ঞানীরা প্রসঙ্গে কী বলেছে... সেটা জানা দরকার সর্বাগ্রে। তাদের ব্যাখ্যানুযায়ী, যদি আমি ভুল না করি, তবে কেউ যদি ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে তাকায় ..তাহলে দেখবে... গাছের পাতা নড়ছে... আবার কেউ যদি ৯০ ডিগ্রি এঙ্গেলে তাকায়...তাহলে সেও দেখবে গাছের পাতা নড়ছে! সত্যি কথা বলতে কী হুজুর! গাছের পাতা নড়ার বিষয়টা আপেকিতায় মোড়ানো...দৃষ্টিবিভ্রম মাত্র।
ভাবতে ভাবতে এমনিতেই রাজার মাথা ছিল ঘুলানো, তারপর যখন দেখলো মন্ত্রী তাকে সঠিক পথের ঠিকানা না দিয়ে ভুল রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে অবলীলায়, তখন রাজা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না..চুপরাও হারামজাদা..আমাকে ধুনফুন বোঝানো হচ্ছে? ধুনফুন..অ্যাহ?
মন্ত্রী ধরা খেয়ে মরা লোক সেজে গেল নিমেষেই..গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুর! সত্যি কথা বলতে কী... একটু হুসেনখুম খেয়েছিলাম কি-না...তাই মাথাটা একটু বাজে বকাচ্ছে।

সামনে বসা নারীদ্বয়কে বলি ..হুসেনখুম হলো এক জাতীয় নেশাদ্রব্যাদি, যা খেলে মানুষের মাথা বাজে কথা বলে।
রাজা এই কথা শুনে আহা..হাহ হাহ করে উঠল..না জেনে আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি? আমি তোমার বায়ু কামঘর ভেঙেছি! অনুতাপে দগ্ধ হয় রাজা। পুড়তে পুড়তে বলে..কী করবো বলো? গাছের পাতা কেন নড়ে ..এটা জানা যে খুব বেশি জরুরি! কারণ এটা অত্যন্ত প্রজাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এইবার মন্ত্রী ঝোপে কোপ মেরে ঝোপের ভেতর শুয়ে থাকা নিরীহ সাপটাকে মেরে ফেলে বলে..হু..জু....! তবে কেন শুধু শুধু আমরাই বা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে যাবো?

রাজা তো অবাক! তাহলে কে ভাববে?
মন্ত্রী জাল গুটানোর আনন্দে খিচখিচ করে হাসে আর বলে...হুজুর ..বিষয়টা যেহেতু অত্যন্ত প্রজাগুরুত্বপূর্ণ..অতএব প্রজাদেরই ভেবে ঠিক করা উচিত ..আসলে গাছের পাতা কেন নড়ে?

হারানো ধন খুঁজে পাওয়ার আনন্দে রাজা কিছুণ ঘুরে ঘুরে নাচে। তারপর বলে..প্রিয়তম মন্ত্রী! তুমি আমার ডান হাতে একটা বড় করে চুম্বন আঁকো এবং রাজ্যে ঢেড়া পিটিয়ে বলে দাও ...যে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর ভাবতে পারবে...তাকে দেওয়া হবে অজস্র পুরস্কার। আর যে না পারবে তাকে মৃদু শাস্তিসহযোগে তিরস্কার।
নারীদ্বয় একে অন্যের চোখে চোখ রেখে হেসে উঠলো আরেকবার। আরো জোরে ..আরো জোরে..ট্যাঙ্ িচালায় হলুদ ট্যাক্সিড্রাইভার।

মন্ত্রী আসলের সঙ্গে এবার সুদ যোগ করে...হুজুর! ..আমার লাল ঘোড়ার পা টা একটু মচকে গিয়েছিল কি-না..আর ঢেড়াওয়ালাদেরও নতুন জামাজুতো দরকার ছিল কি-না?

রাজা মন্ত্রীর অভিপ্রায় বুঝে ঝোপ পরিষ্কার করে মরা সাপ তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলে..কোনো অসুবিধা নাই। আমার আস্তাবলে দু'খানা সতেজ লাল ঘোড়া দণ্ডায়মান। যে কোনো একটা তুমি নিয়ে নাও আর যেখানে খুশি সেখানেই ঘুরে বেড়াও.. আর..আর.. অনেকবেশি হুসেনখুম খাও। আর ঢেড়াপিট্টিওয়ালাদের জন্য রাজকোষ অবারিত করো..হলো তো? এবার...

এইবার মন্ত্রী কোনো কথা না বলে, কোনো দিকে না তাকিয়ে হামলে পড়ে রাজার ডান হাতে এবং বাম পায়ে। হুমহাম শব্দে দীর্ঘ সব চুম্বন কাটতে থাকে পাদুকা যুগলে। রাজা উহু উহু আহা আহাময় শব্দে আনন্দে মরে যাওয়ার ভান করে।

এদিকে, সামুকামী দুরু দুরু মনে গ্রামে ফিরে এল। কী এক অজানা কারণে তার হাতভর্তি হাস্নুহেনা। কিন্তু একী! গ্রামে যে কেউই নেই! সামুকাকে ধরবার, মারবার, হাসবার কিংবা ভালবাসবার তরে। কী ব্যাপার তবে?

সামুকার হাতের হাস্নুহেনা শুকিয়ে যেতে থাকে, সবুজ ভদ্রমহিলাকে দেখতে না পেয়ে। কান বন্ধ হয়ে যায়..বায়ুকামীদের অট্টহাসি শুনতে না পেয়ে। চোখ প্রায় অন্ধ হওয়ার দশা..প্রধান পুরোহিত এবং তার পবিত্র গুণ্ডা কর্তৃক প্রদেয় শক্তিশালী ঘুসি এবং লাথির অনুপস্থিতিতে। রকম আদিভৌতিক পরিস্থিতিতে পড়ে সামুকামী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর দেখে না। অবশ্য বিমূঢ়তাও অমর হয় না। ফলে সারা গ্রাম ঢুরে কাউকে না পেয়ে গ্রামে উপস্থিত একমাত্র নিরাপত্তারী অর্ধশিতি বাঘটাকেই সামুকামী জিজ্ঞেস করে...সকলে সদলবলে কোথায় গিয়েছে? অর্ধশিতি বাঘ হালুম ভাষায় উত্তর দেয়..সুদূর দক্ষিণে। অর্থাৎ রাজার বাড়ি হতাকা বুণ্ডাকাঠে। আর দেরী না করে সামুকাও পা চালালো সুদূর দেিণই।
এদিকে, রাজা তো মহাসমারোহে রাজদরবার সাজিয়ে বসে আছে। মন্ত্রীরও উৎসাহের একফোটা কমতি নাই। সারা রাজ্যে ঢেড়া পিটিয়েছে রাজকীয় কর্মী দিয়ে, ওই আগের ছেঁড়া ঝুল্লা পুরনো পোশাক পরিয়েই। ফলে দলে দলে বায়ুকামীরা রাজধানী হতাকা বুণ্ডাকাঠের দিকে ছুটে আসছে তুমুল বেগে। শক্ত হাতে ভিড় সামলিয়ে মন্ত্রী একে একে বায়ুকামীদের হাজির করছে রাজার সামনে। রাজাও মহানন্দে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে চলছে ঘুরে ফিরে..বল..বায়ুকামী হরি খাটকা...কেন নড়ে গাছের পাতা?
হরিখাটকার সহজ, সরল নিরীহ মাথা, সে কীভাবে জানবে..কেন নড়ে গাছের পাতা? তবু বহু কষ্টমষ্ট করে বলে..হু..জু....! আমি যখন ঘুমিয়েছিলাম? তখন দেখি গাছের পাতা নড়ছে..নড়ছে তো নড়ছেই, থামাথামি নেই।

রাজা একটু নিমরাজি হওয়ার মতো করে বলে..চেষ্টা অতিশয় দুর্বল এবং তা মিথ্যাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা। এবং সবচে' মজার ব্যাপার হলো সত্য হতে উহার অবস্থান বহুদূরে। অতএব বায়ুকামী হরিখাটকা..তিরস্কার বিনে অন্য কিছু প্রাপ্য নাই তোমার। আর যা আছে...তা হলো মৃদু দলাই মলাই..এই কে আছিস..একে নিয়ে যা...

এরপর মন্ত্রী ডেকে আনলো বায়ুকামী লিরিবিরি আফান্দিকে। রাজা বায়ুকা আফান্দিকেও জিজ্ঞেস করলো একই কথা। কেন নড়ে গাছের পাতা? বায়ুকা লিরিবিরি আফান্দি আবার নিজ গাঁয়ের জ্ঞানী। তাই অনেক বেশি ভাব এবং তারও বেশি ভঙ্গি নিয়ে শুরু করলো..হুজুর! বহু বহু কাল আগে...যখন পৃথিবীর মানুষ সময়ের হিসাব রাখতো...যখন পৃথিবীতে শুধু আলোময় দিনই ছিল না, দেখা যেত রাত্রির অন্ধকারও...ঠিক সেই সময় ...টগডিল পাহাড়ের গুহায় বাস করতো এক ঘড়ি ব্যাঙ। সেই ঘড়ি ব্যাঙটা যখন টকটক করে ডেকে উঠতো, তখনই গাছের পাতা নড়তো।
রাজা বেশ আগ্রহভরে শুনছিল। আফান্দি থামলে রাজা মুচকি হাসে আর বলে..আদিভৌতিক কল্পনাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা গল্প বেশ আবেদনময়ী...কিন্তু তা মোটেও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে না। উপরন্তু তা সত্যকে নিমজ্জিত করেছে আরো ঘনান্ধকারে। অতএব বায়ুকা আফান্দি...তোমার জন্য অপো করছে উপযুক্ত তিরস্কারের ব্যবস্থা। এই কে আছিস...এটাকেও নিয়ে যা..এবং রাজধানী হতাকা বুণ্ডাকাঠের সবচে' উঁচু বৃরে মগডালে সংযত করে বেঁধে রাখ্। যখন ব্যথায় কঁকিয়ে কঁকিয়ে টক টক করে কাঁদবে, তখনই সে দেখতে পাবে কীভাবে নড়ে গাছের পাতা।

আফান্দির শাস্তি নির্ধারণের পর মন্ত্রী অতি উৎসাহে ধরে নিয়ে এল এক হলুদ ভদ্রমহিলাকে। হলুদ ভদ্রমহিলা নাচতে নাচতে রাজার সামনে এল এবং নাচতেই থাকলো। রাজা একটু বিব্রত হওয়ার ভান করে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল...ভদ্রমহোদয়া...আপনি কি বলতে পারেন..কেন নড়ে বৃরে পাতা?
হলুদ ভদ্রমহিলা নাচ না থামিয়েই চোখ নড়োবড়ো করে বলল..আমি যখন নাচি..এবং নাচতেই থাকি..তখনই দেখি গাছের পাতা নড়ছে এবং তা নড়তেই থাকে।

রাজা বেশ আমোদিত ভঙ্গিতে বলেন..অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা...সত্যের খুউব কাছাকাছি...এই কে আছিস..ওনাকে আমার খাস কামরায় নিয়ে যা। উনি যখন নাচবেন..আমি তখন বৃক্ষপত্রের নড়াচড়া দেখবোণ। তখন যেন আমাকে বিরক্ত করা না হয়। জিভে আনন্দের রস নিয়ে হুম বলে মন্ত্রীর দিকে তাকায়।

মন্ত্রীও বেশ বিগলিত..জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর... খুব সুন্দর হয় তাহলে... খিচখিচ করে হাসে।
এভাবে মন্ত্রী বহু বায়ুকামীকে ডেকে নিয়ে এল। আর রাজাও প্রত্যেকের জন্য উত্তম তিরস্কারের সঙ্গে বিস্তর দলাই মলাইয়ের ব্যবস্থা করে বেশ আনন্দেই কাটাতে লাগলো। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। কেউই রাজার প্রশ্নের সঠিক ভাবনা ভাবতে পারলো না।

পরিস্থিতি যখন এমন, বায়ুকামীদের সকলের সিরিয়াল প্রায় শেষ, ঠিক তখনই মন্ত্রী রাজার সামনে ধরে নিয়ে গেল কান্ত, তিতি বিরক্ত হতাশ সামুকাকে। যে সামুকা হতাকা বুণ্ডাকাঠে এসেছিল জাপ্টে ধরা সবুজ ভদ্রমহিলাকে খুঁজতে। অথচ সামুকাকে একটু জিরোবার সময় না দিয়েই রাজা জিজ্ঞেস করে বসে...তুই বল কেন নড়ে গাছের পাতা?

'গাছের প্রাণ আছে।' সহজ প্রশ্নের সহজ উত্তর দিয়ে সামুকা জিরোবার ফুরসৎ খোঁজে, কিন্তু রাজার পেছনে প্রধান পুরোহিতকে দণ্ডায়মান দেখে চমকে ওঠে অজানা আশঙ্কায়।

এদিকে রাজাকে বেশ কিছুণ চুপ করে থাকতে দেখে দ্বিধান্বিত মন্ত্রী জিজ্ঞেস করে, হুজুর পুরস্কার নিয়ে আসবো? না..উপযুক্ত ভর্ৎসনার ববোস্থা করব?
রাজা সম্বিত ফিরে পেয়ে চিৎকার করে বলে...এই কে আছিস?...একে হত্যা করা হোক।
আমার অপরাধ? সামুকামী রুখে দাঁড়ায়।
রাজা: বহুবিধ.. জিভে ব্যঙ্গ আর শ্লেষের ধার।
সামুকা: যেমন?
রাজা: (অনিচ্ছাসহকারে)..এই যেমন ধরো ..রাজার আদেশের কারণ জানতে চাওয়া।
সামুকা: তারপর?
রাজা: ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাস
সামুকা: আর?
রাজা: সবুজ ভদ্রমহিলাকে অপমান
সামুকা: আরো শুনতে চাই আমি..

ক্ষোভে ফেটে পড়ে সামুকামী। রাজাও হিসহিসিয়ে শোনাতে থাকে..সবচেয়ে বড় অপরাধ..সত্য জানো তুমি। ভয় না পাওয়াটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়..আরো যদি শুনতে চাও..তবে বলতে পারি.. তোমার জন্যই বসে আছি আমি...বিচার সভা সাজিয়েছি..প্রচুর পয়সা খরচা করে লোক দিয়ে রাজ্যব্যাপী ঢেড়া পিটিয়েছি..মন্ত্রী মশায়কে একখানা লাল ঘোড়া বিনি মাগনা দিয়ে দিয়েছি..সে এখন শুধু হুসেনখুম খাবে..আর পুরো পৃথিবী চড়ে বেড়াবে..আর তোমাদের গাঁয়ের প্রধান পুরোহিত, যে তোমাকে তার পবিত্র গুণ্ডা দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটিয়েছে, আর রা করেছে আমার স্বপ্নে গড়া সাধের শিন্টু রাজ্যটিকে। তিনিই হবেন আমার নতুন মুখ্যমন্ত্রী, তার প্রতু্যৎপন্নমতিতার জোরে। আর তুমি যাকে জাপ্টে ধরে এলোপাথারি লিঙ্গ চালিয়েছিলে- সেই সবুজ ভদ্রমহিলাকে আমি আমার নিজের কাছেই রেখে দোবো.. যে কোনো ধরনের অনিষ্ট হওয়ার ভয়ে। হিক হিক করে হাসতে থাকে রাজা আর হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে হুসেনখুম চাটা মন্ত্রী মহোদয়রা, একজন অপার আনন্দে অন্যজন অপার বেদনায়।
সামুকামীর রিক্ত নিঃস্ব ব্যথিত হৃদয় শেষবারের মতো বিদ্রোহ করে। কিন্তু তার আগেই কতিপয় রাজকীয় গুণ্ডা ঝাপিয়ে পড়ে বেঁধে ফেলে সামুকামীকে। পেটাতে পেটাতে নিয়ে চলে হত্যার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার একটু আগেই একদল থুঁথু ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজার চোখেমুখে।

বন্ধুর মতো মেয়েটা উঠে চলে গেল দূরে। ঘর বাঁধলো বাচ্চাদের স্কুলে। প্রেমিকার মতো মেয়েটা বসে রইলো চুপচাপ, নিজের মতো করে। হাতে নিহত হয় ঘাসের শরীর, দাঁতে নিহত ঘাসের শরীর। অনজনের আঁকা বাঁকা হাসি আরো বেঁকে গেল। কিন্তু হলুদ ট্যাক্সিড্রাইভার আর কখনই আসলো না। অথচ লাল লাল শাপলাফুল এখনো ফোটে, জাহাঙ্গীর নগরের ছোট্ট ঝিলে। বাবা আমাকে শেখাতে চেয়েছিল বহুকথা। আমি শিখিনি। কারণ বাবা ছিল বড্ড গরিব, তাই বোকা। আর মাত্র একটা কথা। সবুজ ভদ্রমহিলা শেষপর্যন্ত বনে চলে গিয়েছিল, রাজাকে ফাঁকি দিয়ে...কারণ তার পেটের ভেতর ফুল হয়ে ফুটেছিল একগাদা লাল কৃষ্ণচূড়া।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন