শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

এমদাদ রহমানের গল্প : বাইফোকাল

কলিংবেল চাপতে যাব, তখন মনে হল আজ কেউ নেই!

বকুল নেই। বকুলের গন্ধও নেই। বকুলের গন্ধ আজ আর এই কথা বলবে না— ‘আকাশে অনেক তারা বাবা। গুণে শেষ করতে পারি না।’ আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। এ-কোন জীবন আমার সঙ্গে কথা বলে, বকুল! এই মেয়েটা কি আমাদের রক্তে লুকিয়ে ছিল? ‘তুমি বলতে পারবে বাবা। বলতো, আকাশে কত তারা?’ বকুলরা আজ নেই। বান্ধবীর বিয়েতে গেছে। আহা, বকুল ঘরে নেই!

আমাদের মাঝখানটায় যে-মেয়েটা ঘুমায়, তাকে আমি বকুলের গন্ধ বলি। আজ সেও নেই। ভাল লাগছে না। তার মানে হল আজ রাতে কথা বলবার মত একটি মানুষ আমি খুঁজে পাবো না। বুকটা খা খা করে। চোখ ফেটে জল আসে। একটা কণ্ঠ, একটা মানুষ; যাকে নিজের সমস্ত বিশ্বাসের ওপর বসিয়ে দেয়া যায়;; তার সঙ্গে আজ রাতে একটাও কথা হবে না! আমার বন্ধুরা কোথায়? আমি কাঁদছি। বন্ধুহীন একটা মানুষ কাঁদবে, এটাই তো জীবনের পক্ষে সবচে সহজতম উপলব্ধি। তবে আজ খুব মিষ্টি একটা মেয়ের গল্প আছে আমার কাছে। ওর নাম বৃষ্টি... আচমকা কেউ চিৎকার করে উঠে—এই যে কেউ এখন জেগে আছেন? এই যে... শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? আমরা মরছি। আমাদের বাচ্চাদের মেরে ফেলছে ওরা। এই যে আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন, বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরেন। ওরা গুলি করছে। রকেট ছুঁড়ছে... হ্যাঁ, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। এই যে কেউ শুনতে পাচ্ছেন? টিভিতে দেখাচ্ছে... এই যে দেখেন... এই যে রঙিন করে দেখাচ্ছে... এই যে হাসপাতালে শিশুদের লাশ... মাথার খুলি উড়ে গেছে... এই যে... হায়রে! আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন? কেউ কি জেগে নেই... কে বলছে কথাগুলো? আমি? আপনি? আপনারা? না, কেউ কোথাও নেই... বৃষ্টির কথা বলছিলাম। মেয়েটা হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ এক আয়নার দোকানের সামনে থমকে দাঁড়ায়। নিজেকে সে দেখে। সরল বিস্ময়মাখা মুখটা দেখে সে আনন্দিত হয়। তার মুখে হাসি। অথচ, এই আমি মানুষটা বহুদিন হয় আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি না। কোনও এক মানুষের সঙ্গে আমার খুব প্রাণ খুলে কথা বলতে ইচ্ছা করে। আমি কাউকেই খুঁজে পাই না। ঘরের ভিতর মেয়েটার খেলনা গাড়িগুলো এখানে ওখানে ছড়ানো। বুকটা কেমন ধক করে উঠে। লোকটা চিৎকার করে কী যেন বলছিল? শিশুদের মেরে ফেলা হচ্ছে? কোথায়? এত মারণাস্ত্র কোথায় পেল মানুষ? জানালা খুলে আমিও কি চিৎকার করব? জানতে চাইব পৃথিবীতে এখন কী ঘটছে? বিবিসি দেখব? নাকি আল-জাজিরা? বকুলের বুকের ভিতর ছোট্ট পুঁটুলির মত আমার মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে তো? আমার বন্ধুরা সব কোথায় গেল? অন্ধকারে!

আমার স্ত্রী দু’টো জিনিশ দিয়েছে আমাকে। দু’টোই অনুভবের। কেওকারপিনের গন্ধ আর একটা মেয়ে। ও পৃথিবীতে আসার পর থেকে আমার ভিতরটায় অনেক বদল, অনেক আলোড়ন টের পাই। নিঃসঙ্গ মানুষের বেদনার অনুভবে আমার ভিতর থেকে একটা গান আপনাআপনি বেজে ওঠে—


On a cold dark night in a lonely brake van,
A guard sits there, a solitary man.
Far away from the kids and his wife.
He’s been away from home nearly half of his life.
For six long days they’ve been waiting for him,
It’s a job to be done but they think it’s a sin.
He works all night, hoping that they might,
Be together in the morning light.

Railway man...Railway man...


দাপুটে শীতরাত্রির ভিতর নিঃসঙ্গ রেলওয়েম্যানের অবয়ব আমার চোখে। মানুষটার বুক ভরে আছে টুকরো টুকরো স্মৃতি। স্ত্রী আর সন্তানরা দূরের এক ঘরে... আবার সেই কণ্ঠের দাপুটে চিৎকার— মরছি, আমরা মরছি। শালারা ঘুমাচ্ছেন সকলে তাই না? বাল ছিঁড়ছি আমরা। শান্তিতে ঘুমাচ্ছি। শালা শান্তিতে চুদাচ্ছি। এই যে দেখেন, হায়রে কেউ বুঝি জেগে নেই? এই যে দেখেন, আমি শালা কিছুই করতে পারছি না। খালি নিজের বাল নিজে ছিঁড়ছি। এই যে দেখেন, এই যে আমার মুঠো ভর্তি বাল... কে? জানালা খুলে বাইরে তাকালে দেখা যায় মরা-আলোয় ঘুমিয়ে থাকা এক শহর। আজগুবিরঙের আলোয় কেমন জানি দেখাচ্ছে। কিন্তু কোন মানুষ তো চোখে পড়ে না। কে তবে এমন বাজখাই চিৎকার করে? এই এলাকায় নতুন করে কেউ উন্মাদ হল? উন্মাদরা কি পৃথিবীর সব খবর রাখে?... একটা গানের কথা বলছিলাম। গানে এক নিঃসঙ্গ রেলওয়েম্যানের কথা বলা হয়েছে। স্ত্রী আর সন্তানরা দূরের এক ঘরে। এই দূরত্ব মৃত্যুর আগে ঘুচবে না। অর্ধেক জীবন তার কেটে গেছে ঘর থেকে দূরে। ঘরে ফিরে যায় সবাই। বৃদ্ধ রেলওয়েম্যান শুধু শীতল অন্ধকার রাতে তার মতই এক নিঃসঙ্গ ভ্যানে বসে আছে, একা!

দীর্ঘদিন পর বকুলহীন একটা রাত পেয়েছি, নিজেকে একটু দেখার। এই সুযোগটুকু আমি কতদিন ধরে পাই নি। একটু অবসর। নিজের জন্য একটা একা একা রাত। বকুল আমার অনেককিছুই কেড়ে নিয়েছে। নির্ঘুম রাত বড় প্রিয় ছিল আমার। সেই উন্মাদের আবার চিৎকার— ঘুমা। ঘুমা। শুওরের বাচ্চারা ঘুমা... তার এই চিৎকারে কয়েকটি সিনেমার দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। মগজের ভিতর কিছু সংলাপ নড়ে উঠে-

: আমরা আমাদের জীবনের ফাউন্ডেশনকে হারিয়ে ফেলেছি!

: নিশ্চিদ্র নীরবতাও একদিন খানখান হয়ে ভেঙে যেতে পারে!

: না, আর গুলি করো না। না। তোমরাই তো আমাদেরকে জন্ম দিয়েছ!

: মা!

বকুল আর তার গন্ধের যুগল অনুপস্থিতি আমার ভিতর হঠাৎ যেন পৃথিবীর একমাত্র বঞ্চিত মানুষের বোধ জাগিয়ে দিচ্ছে। অভিনয়ের কুশিলব হওয়ার ইচ্ছা আমার কোনদিনও ছিল না। লাইট অ্যান্ড শ্যাডো আমার ভাললাগার বিষয় ছিল। লিখতেও পারতাম। প্রতিদিনের কথা লিখে ডাইরির পাতা ভরাতে পারতাম। এখন সব ভুলে গেছি। এখন শুধু বকুলের মুখের দিকে তাকাতে পারি। মেয়ের মুখের দিকেও। অন্যকিছু দেখার চোখ যেন আমার অন্ধ হয়ে গেছে! বকুল চুলে কেওকারপিন ব্যবহার করে। তিন বছর আগে এই অদ্ভুত গন্ধের সঙ্গে আমার পরিচয়। শরীরময় কেওকারপিনের গন্ধ নিয়ে প্রতিরাতে বকুল আমাকে জড়ায়। লতাপাতা যেমন বৃক্ষের শরীর বেয়ে বেয়ে আকাশ ছুঁতে চায় ঠিক তেমনি করে। মেয়েটার শরীরেও এই গন্ধ। আজ বকুল নেই। কিন্তু কেওকারপিন? বকুলের সঙ্গে গন্ধও কি চলে গেছে? ভাবতে পারছি না। নিজেকে কেন জানি আজ বড় বেশি সলিটারি ম্যান লাগছে। আজ বহুদিন পর ইচ্ছা করছে পুরনো ডাইরিগুলি খুলে দেখি। ডাইরির পাতায় আমার সংকলিত দিনগুলি কি এখন ঘুমিয়ে পড়েছে? কেন লিখতাম, আজ এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। ভার্সিটির বন্ধু সফিল আমাকে লিখতে শিখিয়েছিল। সফিল গল্প উপন্যাস পড়ত না। তার পড়ার বই ছিল আত্মজীবনী।

আমাদের ঘরে এক শাদা বিড়াল সংসার পেতেছে। আজ সেই সংসারে মিহিগলার ডাক! বাচ্চাগুলি কি তাদের মায়ের কাছে কিছুর আব্দার করছে? কয়টা বাচ্চা? তাদের কি চোখ ফুটেছে? বকুলের পোষা বিড়াল। ইশকুলে ক্লাশ টু’তে আজ একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে। ওর নামটা ভারি মিষ্টি। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। বৃষ্টি। আজ ক্লাশ নিতে গেলে সে বলল, স্যার আমার নামের ইংরেজি করেন। আমি বললাম, তোমার নামটা বাংলায় কত সুন্দর! সে তবু মানবে না। আমাকে দিয়ে তার নামের ইংরেজি করাবেই। আমি বললাম, বৃষ্টি তো রেইন... রেইন শব্দটা সত্যিই অপূর্ব। আমার এক বন্ধুর লেখায় এই শব্দটা এমন এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা তইরি করেছিল যে ভাষা দিয়ে যেন এমন অনুভূতিকে প্রকাশ করার কৌশল মানুষ আবিস্কার করতে পারে নি। গল্পে এক বোন ছিল। লিসা। সে তার মাকে ভালবাসতে পারছিল না। তবু সে তার মাকে বৃষ্টির ভিতর দিয়ে অনুভব করতে চাইছিল। লিসা তার ভাই ইফিকে নিয়ে একদিন বৃষ্টির অপেক্ষা করছিল। অপেক্ষা করছিল বৃষ্টি নামলে তারা গলা খুলে গাইবে—


রেইন রেইন রেইন
রেইন ইজ দ্য স্মেল অব মাই মাদার
মাদার ইজ দ্য স্মেল অব মাই হার্ট
ওঃ মাই মাদার, মাই হেজি ফগি মাদার
ফল ইন ডাউন

ফল ইন লাইক অ্যা ফাউন্টেইন
ফল ইন ফল ইন

ওঃ মাই মাদার, মাই হেজি ফগি মাদার
ফল ইন ফল ইন
ফল ইন লাইক অ্যা বার্ড
ফল ইন ফল ইন

বার্ড বার্ড বার্ড
বার্ড ইজ দ্য হুইসপার অব মাই ব্লাড
ফল ইন ফল ইন

ব্লাড ব্লাড ব্লাড
ফল ইন লাইক অ্যা ফ্লাড
ফল ইন ফল ইন
ওঃ মাই মাদার, মাই হেজি ফগি মাদার

ফল ইন ফল ইন... আচ্ছা, বাইরে কি ঝড় হচ্ছে? এত নিঃসঙ্গ লাগছে কেন আজ? মানুষ কি একা জীবন কাটাতে পারে না? জীবনে কি বৃষ্টিবাদল নামতেই হয়? ঝড়ের রাতগুলি কেন যেন আমার জন্য খুব দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এইরকম রাতে মনের গোপন সব দরজা খুলে গিয়ে জীবন বড়বেশি ন্যাংটো হয়ে পড়ে। অবশ্য এই সংক্রামের হাত থেকে মুক্তির কিছু পদ্ধতিও মানুষের জানা আছে। ভিতরের গোপনতা যখন দরজা জানালার মত খুলে খুলে যেতে থাকে, তখন কিছু গান দুঃখগুলির সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে রাজি হয়। সবারি একটা না একটা দুঃখের গান থাকে। বকুলেরও আছে। মাঝরাতে প্রায়ই তার ঘুম ভেঙে যায়। সে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে সে কী দেখে, আমাকে বলে না। আমার দিকে কেমন করে জানি তাকিয়ে থাকে। আমি কি তার ভয়? তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম! কী দেখে? মৃত্যু? জন্ম? প্রথম প্রথম চিৎকার করত। এখন মনে হয় নীরবে কাঁদে। এই কান্নাই কি তার দুঃখের গান! আজ সে ঘরে নেই। বান্ধবীর বিয়েতে গেছে। মেয়েটাও কাছে নাই। আজ আর আমার আকাশের তারাদের সঙ্গে মেয়েটির কথা বিনিময় শোনা হবে না।

প্রতিরাতে, বিশেষ করে রাতের মধ্যমায়, এখানকার নাইটগার্ড হরমুজ মিয়া বাঁশি বাজায়। আমাদের ভিতর প্রকৃতিসংস্থানের নদীর মত এক দীর্ঘ নদী থাকে। এই নদী সাগরে গড়ায় না কিন্তু শাখাপ্রশাখায় নিজেরে সে বিস্তৃত করে। ঠিক যে-মুহূর্তে হরমুজ মিয়া বাঁশি বাজায়, ঠিক তখনি এই নদী জেগে উঠে। সারাদিন নদীটাকে ভুলে থাকি। নদীটাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই হরমুজ মিয়াকে বাঁশি বাজাতে হয়। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য হরমুজ মিয়া ছাড়া আর আপনজন নেই। তখন মাথার ভিতর সেই নিঃসঙ্গ রেলওয়েম্যানের গান বাজতে থাকে। কতদিন, মাঝরাতে এই মানুষটির কাছে ছুটে গেছি। সে যেন এক বিশাল আশ্রয়। লোকটার চোখগুলি বড় বেশি কথা বলে। পৃথিবী যখন ঘুমন্ত জনপদ নিয়ে ধুঁকছে, ঠিক তখনই যেন হরমুজ মিয়ার বাঁশি জীবনমৃত্যুর হিসাব কষতে শুরু করে। বয়স্ক পৃথিবীর মত তার বাঁশির সুর যেন আমাদের আত্মার সঙ্গে সংলাপে মাতে। যারা আমার মত নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে কিংবা একা একা জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে আত্মজার কথা ভাবছে, আর কুয়াশাময় রাতের আচ্ছন্ন জারুল গাছগুলোর মত ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে ভিতরের নদীটির পাতালভূমিতে, তখন হরমুজ মিয়ার মুখের তামাকের ঝাঁঝাল গন্ধ আমার নাকে এসে লাগে— পাখিরে, একবার পিঞ্জিরাত আও দেখি... মনে হয় হারিয়ে যাওয়া মানুষরা আবার ফিরে আসছে। মনে হয় আমার মৃত বাবা কাঁদছেন। কানার ঢেউগুলো কানের কাছে আছড়ে পড়ছে, যেমন করে ঝড়ের সময় গাছের ডালপালা ডানা ঝাঁপটায়। ডালপালার ফাঁকফোকরে থাকা পাখির বাসাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অসহায় পাখির বাচ্চাগুলো চায় মায়ের বুকের আরও বেশি ওমে চলে যেতে, কিন্তু পারে না। ঝড়ের তোড় মায়ের ওম কেড়ে নিয়ে কোথায় তাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়!

বকুলের বিড়ালটা মেঝেয় দাঁড়িয়ে জ্বলজ্বলে চোখে আমাকে দেখে। আমি তার দিকে স্থির তাকিয়ে রই।

কারা যেন তাস খেলছে। আমি তাদের দেখতে পাই না। তারা কি পাশের ঘরে খেলছে, নাকি মাঝরাস্তায় চটের ওপর আসর জমিয়েছে? হরতন। রুইতন। ইসকাপন। উল্লাস। খিস্তি... আমি পারি না। আমি কোন খেলাই খেলতে পারি না। আমার হাতে খেলা নেই। আমি একটা... আমি কি অনুভূতিহীন? কেন এমন হল? আমি কি তবে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছি? হ্যাঁ, সত্যিই, আজ রাতে আমার কিছু গান প্রয়োজন। হরমুজ মিয়ার বাঁশি যেভাবে আমার ভিতরের নদীটিকে জাগায়, ঠিক সেইভাবে, আমি আজ নিজেই আমার নদীটিকে জাগাতে চাই। হে জীবন, আমাকে কিছু গান দাও। এখন আলোও আমার ভাল লাগে না, আবার অন্ধকারে নিজেকে এত স্পষ্ট দেখা যায় যে বেশিক্ষণ আলোহীন থাকলে আমার দম শেষ হয়ে যায়। মেয়েটা বলে—‘বাবা, রাতের আকাশে না অনেক তারা। গুণে শেষ করতে পারি না।’ আরেকদিন বলে—‘বাবা, পাখি খুব সুন্দর। ওদের ছেঁড়ে দাও।’ আরেকদিন বলে—‘তোমাকে না ভূতের মত লাগে। তুমি খুব পচা। আমার দিকে তাকিয়ো না।’ আরেকদিন বলে—‘ফুল এত রঙিন হয় কী করে বাবা?’ আরেকদিন বলে—‘আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না বাবা। তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। মাকে দেখতে পাচ্ছি না। পাখিটিকেও না। কিছুই না। চারপাশ এত কালো... সুতরাং, বকুল, ও বকুল, লেট দেয়ার বি লাইট... আচমকা কেউ চিৎকার করে উঠে— এই যে কেউ এখন জেগে আছেন? এই যে... শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? আমরা মরছি। আমাদের বাচ্চাদের মেরে ফেলছে ওরা। এই যে আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন, বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরেন। ওরা গুলি করছে। রকেট ছুঁড়ছে... হ্যাঁ, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। এই যে কেউ শুনতে পাচ্ছেন? টিভিতে দেখাচ্ছে... এই যে দেখেন... এই যে রঙিন করে দেখাচ্ছে... এই যে হাসপাতালে শিশুদের লাশ... মাথার খুলি উড়ে গেছে... কে বলছে কথাগুলো? আমি? আপনি? আপনারা?



লেখক পরিচিতি
এমদাদ রহমান

জন্ম ১ জানুয়ারী ১৯৭৯।
মৌলভীবাজার জেলার কমলাপুর থানার বাদে সোনাপুর গ্রামে।
পড়াশুনা : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববদ্যালয়, ইংল্যান্ড।

গল্পকার। অনুবাদক।
গল্পগ্রন্থ : পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প।

২টি মন্তব্য: