বৃহস্পতিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

উন্মূল


নাহার মনিকা

ইংলিশ টিচার যেদিন প্রথম আমাদের স্কুলে জয়েন করে, সেদিন আমাদের বাড়ি বিক্রি হচ্ছিল। বড় চাচী এমন ডাক ছেড়ে কান্না শুরু করলো যে তাকে ছেড়ে স্কুলে যাওয়া ভালো দেখালো না। পরের দিন শুক্রবার, সারা দুপুর সরলার কাছে ইংলিশ স্যারের গল্প শুনলাম। বাড়ি বিক্রির মত তুচ্ছ কাজে নতুন স্যারকে দেখতে না পারার দুঃখে দুটো বিকেল অর্থহীন কাটলো।
বাড়ি ছাড়ার ব্যাপারটা আমার এই প্রথম না। ক্লাস টেনে ওঠার আগে আরো দুবারের অভিজ্ঞতা আছে। আব্বু যখন মারা গেল, আমরা চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্কর ঝক্কর লাল বি আর টি সির বাসে চড়ে এসে পাবনায় নানার বাসায় উঠলাম, চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কোয়ার্টারে। আমি দুই চার বছর এদিক ওদিক বয়সী তিন খালার সাথে এক খাটে জড়াজড়ি রে শুই, স্কুলে যাই। চুয়াডাঙ্গায় সরকারি কোয়ার্টারের সামনের জাম্বুরা গাছটার কথা মনে পড়ে। জাম্বুরা দিয়ে এত ফুটবল খেলতাম যে আমার তিন চাকার সাইকেলটা একদম নতুন রয়ে গিয়েছিল। আসার আগে ক্লাস থ্রির আঞ্জুম আমার সাইকেলটা কিনে নিতে এলে আম্মু অর্ধেক দামে দিয়ে দিয়েছিলো, অত দূর থেকে নিয়ে আসা ঝামেলা। সঙ্গে পুরুষ লোক নাই। আমি সাইকেলটা জড়িয়ে একটু কাঁদলাম, আম্মু বললো-‘ কত যে চালাইতা! গিয়ে আরেকটা কিনে দেবো
তারপরতো আম্মুই নাই, আসলে থেকেও নাই। ভাত খেতে বসলে নানু খালি আমাকে দেখে আহা রে আহা রে করে। আমি মন খারাপ করতে চাইলে করি, না করতে চাইলে করি না। আম্মু আমাকে রেখে গিয়ে এই ক্ষমতাটা দিয়ে গেছে। জন্ম দেয়ার বাইরে এই আরেকটা জিনিশ আম্মু দিয়েছিল।
একদিন ক্লাস সিক্সের বই কিনতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি বড় চাচা আর চাচী এসে বসে আছে। পাগলাগারদে ওদের ছেলেকে দেখতে এসেছিল। চা নাস্তা খেয়ে চাচা আমার প্যান্ট শার্ট কিনতে নিয়ে গেল, নীল প্যান্ট আর শাদা শার্ট, ওখানের স্কুলে ভর্তি হলে লাগবে।
একটা সময় থাকে যখন কোথায় থাকছি সেই অনুভূতি বোঁটায় সেঁটে থাকা কাঁচা ফলের মতো, খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে, এই দোলে আর কি। তারপর সময় গেলে তেমন যন্ত্রণাদায়ক কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে না গিয়েই এক সময় ফলটা টুপ করে ঝরে পড়ে। অন্য কোন বোধিকল্পদ্রুম? দুর! আমি শুধু ঘটনার সঙ্গে যাই। আগে যেমন শুক্রবার এলেই ভয় লাগা শুরু হতো, আবার একটা সপ্তা সামনে, আবারো পূর্ণ কর্মদিবসের শরীরী সময় পার হতে হবে। এখন অন্যরকম। আর ভয় করে না। প্রবল বৃষ্টি হোক, আর রেডিওতে সাবধান বাণী দেয়া তিন নং বিপদ সংকেতময় ঝোড়ো হাওয়ার দিনই হোক। এই বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে গেলেও দিন নিজের মতো করেই বয়ে যাবে।
শূন্য বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয়”-অখিল বন্ধু ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়ায় আর বড় চাচী তার ছেলের জিনিশপাতি তুলে তুলে বাক্সে রাখে। নাহিদ ক্যাসেটের কভারে লেখা ইংরেজি অক্ষরে নাকি পড়তো-‘আখিল বন্ধু
-“
আখিল মানে কি?” আখিল না রে বুদ্ধু অখিল। অখিল, নিখিল শব্দের মিল মনে আসে। অখিল মানে আসলে কী? অখল মানে হলো- যে ছলনা জানে না। এই মানেটা মনে রাখা সহজ। মানুষ মনে প্রাণে বোধ হয় এক ছলনা শূন্য জগতের প্রত্যাশা করে, কিন্তু নিজে ছলনার গণ্ডিতে ঘোরাঘুরি করে?
দেয়ালের কোনায় এইচবি পেন্সিলে কচি হাতের লেখা মিটির মিটির জ্বলে। আমি এসে অব্দি দেখছি হাতের লেখাঅলা দেয়াল। এগুলো কিভাবে বাক্সবন্দী করি? দেয়ালের রং বদলে দেয়া নিয়ে বড় চাচা, চাচীর কত দাম্পত্য কথা-কলহের শরীর ভেদ করে আমি স্কুলে গেছি, কিন্তু দেয়াল যেই কে সেই। অখিল বন্ধু কেন যে বার বার গায়- শূন্য বুকে বাড়ির ক্রেতা পাওয়া গেছে। পাখির আর ফেরার উপায় কী?
বয়ঃসন্ধিক্ষণের আবাসস্থলের জন্য একটা গোপন অহংকার আর মায়া স্থির কাঁপে বুকের ভেতর। পেছনে কুয়োতলার পাশে নুয়ে থাকা একটা কাঁঠাল গাছ, কত কিছুর সাক্ষী হতে গিয়ে পাতা কুকড়ে শিরায় ভাঁজ পড়ে গেছে। গাছের নিচ দিয়ে পাতা ছাওয়া পথ যেটা পেছনের বেড়ার গায়ে বাঁশের ঝাঁপে দড়ির হুড়কো দিয়ে আটকা। ঠেলে খুলে দিলে,যতটুকু দূরত্ব লে বস্তুর আকার আর দৃশ্যপট টাল খায় না, তেমন দূরে নদী। নাদিম মাস্তান আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা দুই দুটা বাচ্চা ছেলেকে নাকি এই ঘাটে শুইয়েই ঘচাৎ করে ছুরি দিয়ে বড় চাচী নাহিদের কোন বায়না থামাতে ওকে কোলে নিয়ে পেছনের দরজা খুলে দুলে দুলে হাঁটছিলো। আতকা এই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে আতংকে ছেলের চোখ ঢেকে দিতেও ভুলে গিয়েছিল, আর নাহিদ, বাচ্চামানুষ, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। বড়চাচীকে সারাজীবন সবাই বিস্তর দোষ দিয়েছে, কেন তার পাঁচ বছরের শিশুকে এসবের সাক্ষী করতে গেল, সে জন্যেই আজকে নাহিদের এই হাল। কিন্তু চাচীর শরীর তখন পাথরের মূর্তি, সরে আসার মতো সাড় ছিল না।
শোনা ঘটনাটা আমার মাথায় খেঁজুর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে, বড় সড়, মাংসল সূঁচালো স্মৃতি হয়ে। আর বাড়ির পেছনের ঝাঁপ খুললেই ছেলেগুলোর কালো কাপড় বাঁধা চোখ তার সামনে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। সূর্য পেছনে অসহায় পিতার মতো ফ্যাকাশে রং ছড়িয়ে অস্ত যায়। ছেলেদুটোর শেষজন নিজের বুকের ভেতরে জমতে থাকা আতংকের শব্দে কানে তালা লাগিয়ে নিজেকে ঠাণ্ডা লোহার পাতের ওপরে বিছিয়ে দেয়।
কারা, কেন এই ছেলেগুলোকে মারলো, কেউ কেউ তো নিশ্চয়ই জানে, শুধু আমিই জানি না। বড় চাচা বলে যে ছোট শহরে বড় কিছু লুকিয়ে রাখা যায় না।
যুদ্ধের সময় বড় চাচা আর উকিল চাচা মিলে সুগার মিলের জিপ নিয়ে কিছু শরণার্থীদেরকে শিলিগুড়ি পৌঁছে দিল, দুই ট্রিপের পর বৃটিশ আমলের জিপ খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তারপরও ম্যানেজারের পারমিশন ছাড়া জিপ নেয়ার কথা সবাই বলাবলি করে। শহরে যুদ্ধের ডামাডোল মানে শান্তি কমিটির একটা সাইন বোর্ড আর দু চারটা বাড়িঘর লুটপাট, এর বাইরে গোলাগুলির শব্দ কালেভদ্রে। শহরবাসীকে গুলির শব্দবিহীন শান্তির দিনযাপন করতে দেয়ার বদলে নেওয়াজ আলী খান, রাওয়ালপিন্ডির লোক, ভালো বাংলা শিখেছিল, সে রিভারভিউ স্কুলের পাশে কসাইখানা খুলেছিল, গরু ছাগলের বদলে সেখানে সকাল সন্ধ্যা মানুষ জবাই।
নেওয়াজ কপালে লাল ফেট্টি বেঁধে রক্ত লাল চোখে রাস্তায় টহল দিতো, কারো বাড়িতে ঢুকতো না।
-‘
তারপর থেকেই কি মানুষ জবাই অভ্যাসে পরিণত হলো?’- প্রশ্ন শুনে বড় চাচা বিব্রত হয়ে না না করে হাসে। রক্তের নেশা মানুষের আদিমতম নেশার একটা।
পেছনের দরজা খুলে মানুষের আদিম নেশার চিহ্ন খুঁজতে, ওই শোনা ঘটনাটার কথা মনে পড়লে বাড়ির ভেতরেও গা ছম ছম করে। কিন্তু তারপরও মাটি কুপিয়ে লাগানো পুদিনার ঝোপের কাছে ঘুরে শ্বাস নিতে ভালো লাগে।
***
বড় চাচী তার আটো সাঁটো শরীর কাঁপিয়ে কাঁদে, শ্যামলা নাক ঘষে ঘষে ফুঁপিয়ে লালচে বানিয়ে ফেললে বাসেদ মোল্লা লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে বারান্দায় পাতা পাটিতে বসে গোনে। ধোয়া মোছা চক চকে বারান্দা তাও কেন যেন কয়েকটা মাছি ভন ভন করে। বাসেদকে বিরক্ত দেখায়, মাছি নাকি বড় চাচীর কান্না, কে জানে। বিয়ের গয়না বেচে কেনা বাড়ি বেচতে যে এমন কান্না পায়, তা বাসেদ বুঝবে কী করে। বিয়ের গয়না কি এমনি এমনি দেয় মেয়েরা? আমার বোঝার কথা না, পুলি পিঠে বানানোর নারকেল খাবার লোভে একদিন বড় চাচীর কাছে অনেকক্ষণ বসেছিলাম, জেগে থাকা গভীর রাত, গাছের পাতায় শিশিরের মিহি ঢপ, ঢপ শব্দ। বাসি দুধে জমে থাকা মোটা সরের মত চাচীর কথাগুলো ভারী আর নরম হয়ে তার হাতের পিঠের কাঁইয়ের মধ্যে কুঞ্চিত ডিজাইনএ নিবিষ্ট হয়- ‘কোথাও শেকড়ের বিস্তার না হলে গয়নার কাছে আশ্রয় চাওয়া জন্মান্তরের অভ্যাস, মেয়েরা গয়না ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক
এই বাড়িটা দেখে শুনে পছন্দ হয়ে গেলে বড় চাচা মুখ গোমড়া রে বসেছিল,…‘নাহ, কেনার পয়সা কোথায় এনিমি প্রপার্টি হলেও হাত ঘুরে ঘুরে বাড়ির দাম বেড়ে গেছে। ইঁদারা আছে। লাল সিমেন্টের মেঝেঅলা বিশাল বিশাল তিনটা ঘর। বড় চাচী তখন ঘরগুলোর প্রেমে পড়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে জানালার গরাদে লেগে থাকা ধূলো মুছতে শুরু করেছে সই সাবুদ হওয়ার আগেই।
এনিমি প্রপার্টি কী তা বুঝতে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হওয়া আমাকে একটু ঘ্যান ঘ্যান করতে হয়েছে। চাচী তারপর ঠেলে দিলেন পাশের বাসার উকিল সাহেবের কাছে। যা বুঝে আয়। উকিল চাচার কাছে বসে বসে গল্প শুনলাম। মনে হলো একটা খল-বলানো হাঙ্গরকে পানি থেকে মাটিতে তুলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, আর হাঙ্গরটা চারপাশের ঘাস, শুকনো লতা গুল্ম ছিঁড়ে ছেঁচড়ে দিক নিশানা না বুঝে চলছে তো চলছেই। শুধু এনিমি প্রপার্টি কাকে বলে এটার জন্য এত কথা? উকিল চাচাদের ঘা অলা কুকুরটা একটা মাড়ের মালশা নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি চাটা দিচ্ছে, বারান্দায় বসা উকিল চাচার লম্বা কথা থেকে মনযোগ সরিয়ে তা দেখি।
***
বড়চাচী চোখের পানির পর্দা পার হয়ে বাসেদ মোল্লার দলিলে সই করে। নগদ টাকার সঙ্গে বাসেদের আরেকটা বাড়ির বিনিময়। দূরে না। মিনিট দশেক। বাজারের কাছে, ঘন বসতির পাড়ার ভেতরে। আগের বাড়িটা এত বড় ছিল যে বিকেলে আমার ছায়া দীর্ঘ হয়ে শুয়ে থাকার পরেও অনেকটা জায়গা জুড়ে খালি থাকা উঠোন ছিল। চাচী গয়নার মতোই যত্নে রেখেছিলো।
আগের বাড়িটা যদি সোনার মোহর হয়, নতুন বাড়িটা সে তুলনায় দস্তার টাকাও না। বাড়িতেও ঘর আছে, কোন কোন ঘরে ভাড়াটে আছে। তবে লাল সিমেন্টের ঠাণ্ডা প্রাণ জুড়ানো মেঝে নেই। উঁচু সিলিং কাঠের নকশী করা নেই।
বাড়ি না বেচে উপায় ছিল? মার্শাল সময় বড়চাচার চাকরি চলে গেল। সরকারি চাকরী এত হুট করে যায় না, কিন্তু গেল। কোন প্রস্তুতিই, প্রস্তুতি মানে সারা বছরের ভাত কাপড়ের সেবার যোগাড় রাখা হয়নি। দেশ থেকে কফিলুদ্দিন বৌ ছেলেমেয়ে নিয়েই হাজির। ভিটাবাড়িও নাকি রাতারাতি নদীগর্ভে। খায় কী? ঘুমায় কোথায়? আধির ধান, সেও তো প্রতারক নদীর পেটে।দুনিয়া খায়া সাধ মিটপে না নেকফিলুদ্দিন হাউমাউ করে কাঁদে।
বড় চাচা দু এক মাস হতাশ হয়ে, আর্মির বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে মামলার আস্ফালন রে তারপর চুপ মেরে গেলো। আগের বাড়িতে সব্জি ক্ষেতের বেড়া ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে দাঁত ব্রাশ করতো। নতুন বাড়িতে ভীড় বেশী। এর ঘরের কোন, তার ঘরের কোনার খুঁটি। হাঁটার সময় ব্যালান্স থাকে না। দুই চারদিন চিন্তা আর দাঁত মাজা এক সাথে করতে গিয়ে শাদা গেঞ্জিতে পেষ্ট ভরিয়ে ফেললে সবাই এক কথাই বলে- ‘…সাত্তার তো দাঁতই ঠিক ঠাক মাজবার পারে না, অক দিয়া কি ব্যবসা বাণিজ্য বো?’…তারপরও বড় চাচা ব্যবসা শুরু করে।
সাত্তার ব্যবসা যাও বা বুঝতো, টেন্ডার একেবারেই বোঝে না। ফলে সুগার মিলের চিটা গুড়ের টেন্ডার চলে যায় বদ্রীপ্রসাদ আগরওয়ালার কাছে। মাড়োয়ারীর চিবুকের নিচে চর্বির তাক থেকে ঘাম ঝরে পড়ে। তার সবচেয়ে বড় ব্যবসা হলো কাপড়ের। কাপড়ের দোকানের গদিতে বসে কর্মচারীদের হাঁক ডাক দেয়। আমি সেই গদিঘরের পাশ দিয়ে ভেতরের দিকের বাড়িতে তার মেয়ে সরলার সঙ্গে ওদের বারান্দায় টেবিলে বসে ইংলিশ টিচারের কাছে টেস্ট পেপার থেকে কোয়েশ্চেন সল্ভ করি, স্কুল ফাইনালের আগাম প্রস্তুতি।
ইংলিশ টিচার সরলাকে বিয়ে করবে। অন্তত সরলা সে কথা আমার কাছে, করিম বক্সের লিচু বাগানের মধ্যে দিয়ে স্কুল থেকে ফেরার সময় স্বীকার গেছে। রাজশাহী ইউনিভার্সিটির অনার্স-মাস্টার্স। এম এড করা। শার্ট প্যান্টের ভাঁজ ভাঙে না। কি এক সুগন্ধ ছড়ায় তার গা থেকে। আর তার ইংলিশ উচ্চারণ! স্যার আসার আগে- ‘ডিভেলপমেন্ট’, আর এর মাঝামাঝি উচ্চারণ জিভের আগায় এনেকনটেম্পরারিজোরে জোরে বলে সক্রেটিসের আর্লি লাইফ মুখস্থ করে সরলা। আগের বৌ আছে তাতে কি? তিন তালাক বললেই হবে। মোস্তফার কালো বৌটা সেদিন রিক্সায় শাড়ির ঘেরাটোপ বানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো না? কেউ কিছু মনে করেছে? নাকি বলেছে?
ইংলিশ স্যারের বৌ কিন্তু একদিন বছর দুয়েকের বাচ্চা মেয়েটা সহ হাজির। একদম স্কুলে। হেড মাস্টারের অফিসে। সরাসরি নীলফামারী থেকে। বাসে, ট্রেনে, ঘেমে নেয়ে, ক্লান্ত হয়ে এক শেষ। আমি সেদিন ভাগ্যিস স্কুলে। ক্লাস টেনের মেয়েরা, যাদের শুধু স্কুলের মিস্ট্রেসদের বাথরুম ব্যবহারের পারমিশান ছিল, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলো। আর আমরা ছেলেরা শিয়ালকোটের চামড়ার ফুটবলে বেখেয়ালে লাথি মারতে মারতে হেডস্যারের অফিসে উঁকি মারার চেষ্টা করি। ইংলিশ স্যারের বৌ। লাল ম্যাড় ম্যাড়ে সুতির শাড়ি। রং ফর্সাই, রওনা হওয়ার আগে লাগানো লাল লিপস্টিক, শুকিয়ে গেছে। স্যার বৌকে চিঠি লেখে না। বাড়ি যায় না। টাকাও পাঠায় না। হেড স্যার তার ডুকরে ওঠা কান্না সামলাতে মহিলা শিক্ষকদেরকে ডাকেন। পিয়ন পাঠিয়ে চানাচুর আর পেপসি আনান। মহিলা হাত মুখ ধুয়ে ভেজা হাতে চানাচুর খায়। ছোট বাচ্চাটাকে বিস্কুট ভেঙে ভেঙে খাওয়ায়। কপালে কালো টিপ ল্যাপ্টানো বাচ্চাটা মায়ের হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে দ্যাদ্যাদ্যা রে ডাকে।
ইংলিশ স্যার তখন সরলার জন্য টেস্ট পেপার কিনতে টাউনে বইয়ের দোকানে গেছেন।
***
আমাদের বাড়িতে এলে সরলা নাক চেপে রাখে। আঁশটে গন্ধ। নিরামিষভোজী। মা নেই, পিসিও মরে গেছে। নিজের বাড়ির গণ্ডাখানেক চাকর বাকরের মধ্যেও নিজেই হেড বাবুর্চী। খাড়া নাক, ফর্শা রং, কোমর সমান কোকড়ানো চুল, মাড়োয়ারীর মেয়ে বলেই সরলা তখনো হাঁটু অবধি ফ্রক পরে, ওর গোছা পায়ে ভাসা ভাসা লোম। ভেতরে টাইট গেঞ্জিটাইপ ছোট জামায় বুক চ্যাপ্টা দেখায়। আমার ছোটখাটো শরীরের কারণে তখনো খেলাধুলা আর ঘরের পোশাক উরু-উন্মুক্ত হাফপ্যান্ট।
ক্লাশ টেনে পড়া মেয়ে রান্না করে, চাচীর খুব কৌতুহল- ‘ সরলা কি রানছোস?’
-‘
গোটা আলু, গোটা পটল আর গোটা’…
বড়চাচী এমন করে তাঁকায় যেন চোখের সামনে গোল গাপ্পুস সব্জিদের নিখুঁত গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরলার সুখী জীবন গড়িয়ে যাওয়া দেখে আর হাসে। আমারও কেন জানি খিক খিক করে হাসি পায়।
সরলাদের বাড়িতে টেস্ট পেপারের কোচিং কয়েকদিন বন্ধ দিতে হয়। ইংলিশ স্যারের মৃদু হাসি আর কথা বুঝিয়ে বলা মিস করি, কিন্তু বাড়ি বদল তো সারা বছর হবে না, বড় জিনিশ না, আমাকে টানতে হয় বইপত্র, পুরানো ফটোর গাদাখানেক ফ্রেম- যেখানে বড় চাচা উত্তম কুমারের মতো ঘাড় বাঁকিয়ে, ক্লিন শেভড, শাদা কালো।
সপ্তাহ খানেক পরে গিয়ে তো আমি ভ্যাবাচ্যাকা। সরলার বারান্দায় টেবিল চেয়ার যেমন থাকার আছে। বীজগণিতের বইটা পর্যন্ত। মাড়োয়ারী মেয়েকে বিয়ে দিতে নিয়ে গেছে। পাটনা। সেখানে ভাই বেরাদর আছে। নিজের লোকজন। ইংলিশ উচ্চারণের উন্নতি করা সরলা নাকে বিশাল নথ পরে ঘাঘরা আর ঘোমটায় গোটা গোটা সবজি ঘুটছে, এই দৃশ্য মাথায় নিয়ে আমি সরলার ঘরের বন্ধ দরজা দেখি, জানলার পাল্লা ঠেলে উঁকি দেওয়া যায় কিনা খোঁজ করি
***
নতুন বাড়ির চারদিকে ভীড়। সবাই বাড়িওয়ালা। বাড়িওয়ালাদের ভাড়াটেরা সুগার মিলের সিজনাল এমপ্লয়ি। শীতকালের দুতিন মাস কাজ। এরা কোয়ার্টারস পায় না। ব্যাচেলরেরা- বৌ-অলাদের সাথে থাকে, খোরাকির পয়সা দেয়।
বড় চাচীর রান্নার পাশেও মালেক বসে বসে হারানো দিনের গান গায়। সুগারমিলের নাইট সিফটের বয়লার-ম্যানের গানের গলা এত সুরেলা কী করে হয়? বড় চাচী অবাক হলে তার চোখের মনির চারপাশে শাদা অংশ বিস্তৃত দেখায়। ফলত মালেককে নিয়ম করে গাইতে হয়। এক গান অনেকবার গাইতে হয়।আমার প্রিয় নজরুল গীতি বই দেখেভূলি কেমনে…” কথা মুখস্থ করতে হয়। বড় চাচীর দুপুর গড়ানো গোসল-ভেজা চুল গামছায় ঝেড়ে কাপড় মেলতে মেলতে নিজেও গুনগুন করে –“আগে মন করলে চুরি, মর্মে শেষে হানলে ছুরি” –বিয়ের গয়না বেচে কেনা বাড়ি বিক্রির দুঃখ ভুলতে বড় চাচীর বিনোদন দরকার। বিশেষত, নাহিদ সুস্থ থাকলে আঁটো সাঁটো শরীরের বড়চাচীরও এতদিনে মালেকের বয়সী ছেলে থাকতো আশে পাশে- এতে কোনো দ্বিমত নেই।
***
স্কুল ফাইনাল শেষ। বড়খালার বাড়ি বেড়ানোর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দুমাস পরে বাড়ি ফিরি। মন এখনো ফিরতে চায় আগের বাড়িটায়ই। কিন্তু রিক্সা মোড় নিতে নিতে বাসেদের কাণ্ডকারখানা চোখে পড়ে। বাড়ির উঠোন ইটের ভাটা এনে ডাই করা। বালি, সিমেণ্ট, হৈ চৈ। রাইস মিল তৈরী হবে। ধান সেদ্ধ, শুকানো আর মাড়াই সব শেষে চিড়ে কুটেও বের হয় এমন মেশিন আসবে। বাপরে, কোন বিদেশ থেকে অর্ডার করা মেশিন কে জানে? পানির জন্য নদীর সাথে বড় পাইপ দিয়ে ডাইরেক্ট কানেকশন। সে জন্যেই মনে হয় বাসেদ এই কোনার বাড়িটা টার্গেট করেছিল! কি জানি, এই বাড়িটা হয়তো বাসেদের বেশী দরকার ছিল!
বেশী ঘর আর বেশী মানুষের নতুন বাড়িতে ফিরে আসি।
স্কুলের নতুন খবর পাওয়া যায়। ক্লাসের রীতা এখন ইংলিশ টিচারের দ্বিতীয় বউ, সাংঘাতিক খবর একটা। সরলার কথা আমি কাউকে বলিনি। এতদিন পর, জানি সরলা আসবে না, আসলেও ইংলিশ টিচার ওকে বিয়ে করবে না।
দুপুর পার করার তর সয় না পলাশের সঙ্গে ফুটবল হাতে বিকেলেই ইংলিশ টিচারের বারান্দাওয়ালা বাড়িতে যাই। রীতা ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেয়। এই বারান্দায় বসে রীতাও স্যারের কাছে টেস্ট পেপার সল্ভ করতো। এখন দেখো, কেমন ম্যাজিশিয়ানের মত বন্ধ দরজা খুলে দেয়, ওর গায়ে জড়ানো আলস্য লুকাতে শাড়ির আলুথালু আঁচল ঠিক করে, দুহাত উঁচিয়ে খোঁপা বাঁধে।
এই প্রথম ইংলিশ স্যার আমাদেরকে ভেতরে ডাকেন। খাটের স্ট্যান্ডে পাঞ্জাবি ঝুলছে, স্যার স্যান্ডো গেঞ্জিতে আধশোয়া। ঘরের মেঝেতে সিল্কের থান কাপড় গড়াগড়ি যায়। স্যার রীতাকে চা বানাতে বললেরীতা চোখে ঝিলিক দিয়ে ঘাড় মুচড়ে-‘কেন তুমি বানাওবললে আমি আর পলাশ হতবাক হয়ে যাই। স্যার অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে খাটে বসে হাসেন।
-‘
ওর এই ভাড়া বাসায় থাকতে ভালো লাগে না, তাই নিয়ে সারা দুপুর কান্নাকাটি। নাহ, বাড়ি কিনতে হবে একটাতোমরা কেউ কোন বাড়ি বিক্রির সংবাদ পেলে দিও তো…’
রীতা ট্রেতে চা আর বিস্কিট আনলে আমরা খাই আর খেলা, পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে কথাবার্তা বলি।
সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরলে মনে হয় সব ঠিকঠাকই আছে। ঠিক নাই শুধু বড়চাচা। নতুন বাড়িতে আসার পরে সাত্তারের রাগ একটুতেই বাজি পটকার মতো ধুন্ধুমার আকাশের দিকে ছুটতে থাকে। বড় চাচা চিৎকার করে আর জিনিশপত্র ভাঙে। কাঁচের জগ একটাও আর আস্ত নাই, আলমারির কাঁচ ভাঙা।
শুধু বড় চাচী তেমনি, আরো বেশী ভাবলেশহীন। রান্না করে, আঁচল দিয়ে চেয়ার টেবিল মোছে। সব কাজ কর্মের মধ্যে মাথা ঘুরলে একটু শুয়ে থাকে, বমি পেলে দৌড়ে কল পাড়ে গিয়ে ওয়াক তোলে। তারপর ঘাড়ে মাথায় পানি দিয়ে আবারো গুনগুন করে গান ধরে।দুই মাসের পোয়াতির, সতেরো বছর পরে আবার বাচ্চা পেটে এলে হয়তো এমন হয়’- ভাড়াটেরা এমন কিছু বলে টলে।
আরেকটা বদল, গান শোনা যায় না। সুগারমিল বন্ধ, কাজেই মালেককে তার ভরাট কণ্ঠ নিয়ে দেশের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরতে হয়েছে। বড়চাচী শুধু গুণগুণ করে তার গাওয়া গানগুলো ঘুরে ফিরে গায়। সেই গুণগুণ শুনে বড় চাচা জিনিশপত্র ভাঙা শেষে কাজের মানুষের দিকে হাত বাড়ায়। মার খেয়ে সোনাভান পালায়। কফিলুদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির জমি বর্গা নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যায়।
একদিন ঘর মুছতে গিয়ে বড়চাচী পা পিছলে পড়ে। নিজের রক্ত দেখলেও তার মাথা ঘোরে। সেজন্যে আমাকেই ছেড়া শাড়ি, কাঁথা, বিছানার তোষক ভিজে মেঝেতে রক্তের ধারা সাফ করতে হয়। বড় চাচা সাহায্য করতে এসে পানি এমনভাবে ঢালে যেন কোন নর্দমা ঝেটিয়ে সাফ করে দিচ্ছে। তারপর ডেটল ঢাললে বাড়িটা কেমন হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ দিয়ে ভরে ওঠে।
দুচারদিনে বড় চাচীর শ্যামলা ত্বক ফ্যাকাশে ফিকে হয়ে গেলে সুগার মিলের ট্রাকের রিকুইজিশান দিই আমরা সন্ধ্যেবেলা বাড়ির সামনের রাস্তায় রং জ্বলা ধূসর ট্রাকের হেডলাইট চড়া হয়ে জ্বলে জ্বলে গর্জন করে। পাজাকোলা করে লেপ কম্বল নিয়ে ড্রাইভারের পেছনে অপ্রশস্ত কেবিনে বিছানা পাতি। চাচীকে দ্রুত রংপুর মেডিকেলে নিতে হবে। ট্রাকের দুলুনিতে চাচী ঘুমায়। আমি পাশে হাটুমুড়ে বসে এক হাতে তাল সামলাই অন্য হাতে চাচীর গড়িয়ে গড়িয়ে যাওয়া মাথা সোজা রে দিই।
ধুলোর রাস্তায় বড় বড় ট্রাকের তেজী ঝাপ্টায় পি-কাপ ভয়ার্ত খরগোশের মতো দৌঁড়ায়। আমাদের চোখে ঘুমের সঙ্গে ধূলো বালির আস্তর জমা হয়। বড় চাচা ড্রাইভারের পাশে, শুকনো মুখ। চাচীর শুকনো ঠোঁট ফেটে আছে, বন্ধ চোখের সামান্য ফাঁক দিয়ে চোখের শাদা দেখা যায়।
মেডিকেল কলেজের গেটে রাত দুটোর আলো চোখ ধাঁধিয়ে জ্বলে। নীল শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা বড়চাচী আর ওঠে না। বড় চাচা এবার আর ক্রুদ্ধ না, মৃদু স্বরে ডেকে ডেকে ধাক্কা দেয়।
***
ইংলিশ টিচারকে চা দেই, সাথে নিমকপাড়া। বড়চাচী বানিয়ে বৈয়ামে ভরে রেখেছিলো। বড়চাচা বেশ অনেকক্ষণ চুপ থেকে কথা বলে।
-‘
বাড়ি কিনতে চান…?’
রীতা নাকি আজকাল নিজের বাড়ির জন্য খুব জেদ করে। ‘…ভরসা কি?’…বলেও নাকি বেড়ায়,… ‘দুই বিয়ে করনেওয়ালা মানুষের বিশ্বাস আছে?’…
বড় চাচা কেনা দামেই দলিল সই করে দিয়ে দেয়।
পরের দিন তারপর আমাকে ডাকে- ‘আয়
আমরা রিক্সা থেকে নেমে মহসিন জুয়েলার্সের কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকি। একদম সেরকম পাওয়া যায় না। কিন্তু কাছাকাছি ডিজাইন আছে। একটা সীতা হার, এক জোড়া মকর বালা, কান পাশা আর টিকলি নিয়ে ফিরে আসি।
বাড়ির উঠোনে তখন ভাড়াটেরা হৈ হল্লা করছে। তারা নাহিদকে নিয়ে জোরে শোরে গল্প করে। পাবনা থেকে স্পেশাল পারমিশান নিয়ে বড়চাচা তাকে নিয়ে এসেছিল চাচীর চল্লিশার দিন, দুই দিন ছিল। কণ্ঠার হাড় বেরুনো গলায় একটা লকেট, এন লেখা। কথা বলে না, মাথা নিচু করে খায়। বড় চাচা পাবনাতেই ফিরে যাওয়া স্থির করেছেন।
ছোট হাত খুরপিটা চাচা গয়নাগুলোর সঙ্গে ব্যাগে ভরে নেয়। হাত খুরপীতেই হবে। মাটি এখনো শুকায়নি, বৃষ্টি হওয়ায় নরম আছে। আর বেশীতো চাচা খুড়বে না, এটুক পোটলার জন্য যা দরকার।
আমি আমার ঘরে ঢুকে স্যুটকেস খুলে জামা কাপড় গোছাই। আজকে না হলেও কাল পরশু তো সব গোছাতেই হবে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন