শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

চলে যাওয়া ও থেকে যাওয়া


ফাহমুদুল হক

--আঁই কীত্তাম?
এমনই আত্মমগ্ন এমনই অসহায় আর এতটাই অনির্দিষ্ট এই প্রশ্ন যে, যার কানে এই প্রশ্ন পৌঁছে, তার অস্তিত্বেই অসহায়ত্ব ভর করবে। শ্রোতৃপক্ষের অসাহায়ত্ব আরও বেড়ে যাবে যখন বোঝা যাবে যে প্রশ্নকর্তা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর কারো কাছে আশাও করছে না।

একসময়ের মহাব্যস্ত ডাকসাইটে সৎ সরকারি কর্মকর্তার আজ এ কী হাল! যার অফিসে লাইন দিয়ে লোকেরা দাঁড়াতো, যার ব্যস্ততার তোড়ে পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত আদর-পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত থেকে গেছে, আজ তার কত অখণ্ড অবসর! লম্বা বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে তিনি হাঁটেন আর দুর্বল হাত দুটো খানিক উল্টে আপনমনে বিড়বিড় করে প্রশ্ন তোলেন, আঁই কীত্তাম? প্রশ্নটা সম্ভবত নিজেকেই করেন তিনি। উত্তরের অপেক্ষা না থাকলেও প্রশ্নটার নিশ্চয় একটা গ্রহণযোগ্য প্রেক্ষাপটও আছে, যে একসময়ের ব্যস্ত মানুষটির আজ আর কোনো কাজ নেই। অবসরজীবনের জন্য কাজের কিছু রূপরেখা ছিল, মানে নিজেকে ব্যস্ত রাখার নানান অনুষঙ্গ জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন তিনি। ধর্মকর্ম, বাগানপরিচর্যা, সাহিত্যপাঠ কিংবা নাতি-নাতনীর সঙ্গে ক্রীড়াময় সময় কাটানো -- ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে ভালোই কেটেছে প্রায় দুই যুগের অবসরজীবন। কিন্তু আজ যেন তার অবসরজীবনও শেষ হয়ে এসেছে। আজ যেন নিজ অস্তিত্ব ও ইতিহাসবিস্মৃত তিনি -- স্মৃতি-বিস্মৃতির সীমানায় দাঁড়িয়ে তাৎপর্যহীন বেঁচে থাকার বিভ্রমে বিহ্বল থাকেন সবসময়।

সায়মা নানার কথা ভাবে। নানা আজ তাকে চিনতে পারেন না।

--তুই কে রে?

--নানা আমি সায়মা।

--কোন সায়মা?

--আপনার নাতনি সায়মা। --

--, নাতনি সায়মা। তুই এত মোটা ক্যান?

--আমার পেটে বাচ্চা নানা। ওকে খাওয়াতে গিয়ে নিজে মোটা হচ্ছি।

--অ। বাচ্চার বাপ কই? বাপ ছাড়া বাচ্চা অয় নি?

--আছে একটা বাপ আছে। ঢাকায় চাকরি করে।

--হ্যাতে কি তরে বিয়া করছে নি? না বিয়া ছাড়াই ... নানার মুখে দুষ্টু হাসি।

--হ্যাতে আমারে বিয়া করছে, আমিও হ্যাতেরে বিয়া করছি। বুচ্চেন নি? হেই বিয়া আপনি খাইছেনও, দোয়াও করছেন। বুড়া মিয়া, এত ভুলে গেলে চলবে?

--, ভুইলা যাই। বুড়া হইছি, কিছু মনে থাকেনা। মন্টু কার বাপ? তোর বাপ নি?

--হ্যাঁ নানা।

--মন্টু অনেকদিন শ্বশুরবাড়ি যায়না। এহানেও দেহি না। হ্যাতে গেছে কই?

--বাবা তো তিন বছর আগে মারা গেছে, হার্ট অ্যাটাকে।

--অ। আঁর পোলার বয়েসী মন্টু মিয়া মারা গেল, আর আঁই বাঁইচা রইছি। কী শরমের কথা! আঁর অহনই মরণ উচিত।

--খারাপ কথা কেন বলেন নানা?

--আঁই তর বাচ্চারে দেখুম তারপর মরুম। আচ্ছা আঁর গামছা কোনায় কইতে পারস?

--আপনার গামছা আপনার কাঁধে।


নানার নতুন উপসর্গ, লুঙ্গি ও গামছা নিয়ে খুব স্পর্শকাতর তিনি। তার সন্দেহ এই বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের তার লুঙি ও গামছার প্রতি বদনজর আছে। যেকোনো মুহূর্তে যেকেউ তার গামছা বা লুঙি সরিয়ে ফেলবে। তাই তিনি ঘুমানোর আগে বালিশের নিচে প্রিয় দুই পরিধেয় লুকিয়ে রাখেন, সকালে উঠে প্রথমেই পরখ করেন তা ঠিকঠাক আছে কিনা। আর দিনের ভাগে তার আলাপচারিতা বা প্রশ্নমালার বিরাট অংশ জুড়ে থাকে এই লুঙি বা গামছার প্রসঙ্গ। এই, তোরা কোনায়? আঁই আঁর লুঙিডা দেখতাছি না -- হঠাৎ হঠাৎ শোরগোল করে ওঠেন নানা। দেখা যাবে বালিশের নিচে আসলেই লুঙি নাই। বিছানা-আলনা তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর লুঙিটা হয়তো পাওয়া যাবে তোষকের নিচে। তার নেয়া অধিক নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ, কিন্তু সেটার কথা তার মনে থাকলে তো!

আর নানা সায়মাকে তুই সম্বোধন করতেন না, এটা সাম্প্রতিক পরিবর্তন। প্রমিত-মার্জিত ভাষায় গুছিয়ে কথা বলতেন সবসময়, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারও সাম্প্রতিক সংযোজন। যা কিছু স্বাভাবিক তার জন্য ছিল, তার কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। একে একে নিবিছে দেউটি!


সায়মা নানাকে যে খুব বেশি কাছে পেয়েছে এমন নয়। কারণ নানা-নানি-মামারা থাকেন এক শহরে আর সায়মারা আরেক শহরে, যদিও পাশাপাশি দুই জেলাশহর। তবে নানার সঙ্গে কিছু মধুর স্মৃতি রয়েছে। বিশেষ করে সায়মা নাতি-নাতনীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ায় নানা-নানি উভয়ের কাছ থেকেই অনেক আদর পেয়েছে। কলেজ পর্যায় পর্যন্ত সে নানাবাড়ি যেত বাবা-মার সঙ্গে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক সময় একাই যেত। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ছুটি হলে ঢাকা থেকে অনেক সময় নিজ বাড়িতে না ফিরে নানাবাড়ি চলে যেত। সেখানে নানা-নানিসহ মামাদের দুই পরিবার, এক খালাও একই শহরে থাকেন। লাগামছাড়া আদর-যত্নে সে আপ্লুত হয়ে থাকতো। অত্যধিক প্রশ্রয়ে সে বেয়াড়া হয়ে পুকুরপাড়ে ঘুরে বেড়াতো, বাসার ছাদে গলা ছেড়ে গান গাইতো, গাছে উঠে পেয়ারা খেতে খেতে সকাল-দুপুর কাটিয়ে দিত। নানির কাছ থেকে সে শখ করে জর্দা দিয়ে পান খেতো, মাথা ঘুরালে যেকোনো এক মামার বাসার বিশাল বিছানায় পাঁচটা বালিশ নিয়ে ঘুম দিত। নানার একটা ব্যাপার ছিল, তিনি আনারটা, কমলাটা নিজ হাতে কেটে প্লেটে করে সায়মার পেছন পেছন ঘুরতেন। সায়মার মর্জি হলে একবার-দুবার ফল মুখে পুরতো। নানাবাড়ি নিয়ে সায়মার স্মৃতি এরকম মধুর সব অভিজ্ঞতায় ভরা। বিয়ের পর অবশ্য আগের মতো আর নানাবাড়ি যাওয়া হয়না। আর গিয়েও আগের মতো ভালো লাগেনা। পুকুরের ওপারে জঙ্গলমতো ছিল, তারও পরে শহরের প্রধান খাল। সেই খালপাড়ে বসে ডানকিনা মাছের যাওয়া-আসা দেখতো সায়মা। প্রিয় পুকুরটা আর নেই, ভরাট করে মামারা ফ্ল্যাট করে ভাড়া দিয়েছে, জঙ্গল কেটে সাফ। আর খালটার ওপর বরাবর রাস্তা হয়েছে, রিকশায়-ভ্যানে দস্তুরমতো ব্যস্ত রাস্তা সেটা। একসময় যে বাড়িতে তার আদরের একক অধিকার ছিল, এক দঙ্গল মামাতো ভাইবোনের দাপটে সেই শূন্যস্থান ভরাট এখন।

নানা এখন খুব কাছে, কিন্তু নানার ব্যাপারে সায়মার মনে তিক্ততা দিনদিনই বাড়ছে। নানাকে এবাড়িতে এনেছেন মা। আর এনেছেন সায়মা কনসিভ করে এবাড়িতে আসার পর। মার খুব শখ হয়েছে বাপের জীবনের বাকি কটা দিন যেন এখানেই কাটে, বাবা-মা সবসময়ই ছোট দুই ভাই ও ভাবীর কাছে থেকেছে। দুজনের মধ্যে নানার অবস্থা নাজুক, শরীরটা ভেঙ্গে পড়েছে, মনও স্থির নয়। তাই নানাকেই কেবল আনা হয়েছে। শেষ বয়সে নানা নানী আলাদা থাকছেন, বিষয়টা অমানবিক ঠেকে সায়মার। অবশ্য নানীর তার স্বামীর দিকে তেমন নজর নেই। তিনি আছেন নিজের কর্মসূচি নিয়ে -- শহরের নানান বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত। শহরের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো তার দানের টাকায় অনেকখানি চলে। নিজের নামে তার খুব বেশি সম্পত্তি নেই, তবে টাকার প্রয়োজন হলেই বড়লোক ভাইদের কাছে গিয়ে কদিন থাকেন। কিছু টাকাপয়সা নিয়ে আবার চলে আসেন। ভাইরা গাঁইগুঁই করলে সঙ্গে থাকা নিউজপেপার কাটিং বের করে দেখান -- ভাইদের বিরুদ্ধে মামলা করে বোনের সম্পত্তি উদ্ধার। ভাইরা সুড়সুড় করে টাকা বের করে দেন।

মা নানাকে এবাড়িতে এনেছেন ঠিকই, কিন্তু দিনের একটা বড় সময়ই তিনি বাড়ি থাকেন না। সকাল আটটার দিকে স্কুলে যান, ফেরেন সেই বিকাল সাড়ে চারটায়। এই আট-নয় ঘণ্টা নানার যত্ন নিতে হয় সায়মাকেই। কিন্তু সায়মার যত্ন নেয় কে? সে নিজেই যথেষ্ট নাজুক, তার পেটে অনাগত সন্তান। কনসিভ করার পরপরই, প্রথম সন্তান বলে, মায়ের পরিচর্যায় থাকার জন্য ঢাকা ছেড়ে বাড়ি চলে এসেছে সে। কিন্তু মা তার পরিচর্যা তো সবটা সময় করছেনই না, উল্টো এই বুড়ো শিশুর দায়িত্ব তার ঘাড়ে। তাকে দুপুরের খাবার খাওয়ানো, তার আগে গোসলের ব্যবস্থা করা, পাহারা দেয়া -- কখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়, ঠিক নেই। একদিন গেট খুলে প্রায় মেইন রোডে চলে গিয়েছিলেন নানা। অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বিশাল শরীর টেনে টেনে সায়মা নানাকে খুঁজতে বেরিয়েছিল। রাস্তার কাছাকাছি তাকে পাওয়া গেল নর্দমায় উঁকিঝুঁকি দিয়ে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছেন। জানা গেল তার লুঙি নাকি কেউ একজন এখানে ফেলে রেখেছে, সেটাই খুঁজছিলেন তিনি।

ফলে অসহায় নানার ওপর থেকে রাগ সরে গিয়ে মাঝে মাঝে পড়ে মার ওপরে। মা স্কুল থেকে ফিরলে সেদিন অনেক হৈ চৈ করেছিল সায়মা। বেলা বারোটার দিকে জুলেখা আপা আসে দাদাকে গোসল করাতে। জুলেখা আপা বয়ষ্ক মানুষ, সায়মারা দুই ভাই-বোনকে জুলেখা আপাই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে, মার স্কুলের চাকরির কারণে পুরো মনোযোগ দিতে পারেন নি সন্তানদের প্রতি। জুলেখা আপার এই বাড়িতে যাতায়াত বহুদিনের। এখন দুই ঘণ্টার জন্য আসেন, ঘরদোর একটু পরিস্কার করে দেন, আর নানাকে গোসল করিয়ে দেন। সায়মাকে ঠিকঠাকমতো চিনতে না পারলেও জুলেখা আপাকে চিনতে নানার কখনো ভুল হয়না। জুলেখা আপা আসলেই নানা উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, আইছে হারামজাদি। গোসলের সময়টায় শুরু হয় ধুন্দুমার কাণ্ড। দুজনের হৈ চৈয়ে তখন বাড়িতে টিকে থাকা দায় হয়ে যায়। তাদের সব কথাবার্তা এঘর থেকে শোনা যায়।

--জুলেখা হারামজাদি, তুই আইছস আঁরে গোসল করাইতে? তর এইজন্মে বিয়া হয় নাই, তুই আইছস আঁর শরীর দেখতে?

--আন্নারে আর জন্মে তো আঁই বিয়া করুম।

--তরে আঁই আঁর বান্দিও রাখুম না। এই জুলেখা, এই, আমার আরেকটা বীচি কই? তুই আঁর আরেকখান বীচি কী করছস?

--আঁর বাসায়, একডা বোয়ামে হাজাই রাখছি।


এইসব আলাপ শুনে সায়মার কান গরম হয়ে ওঠে, ব্রিবত লাগে। তানভীর ফোন করলে এসব কাহিনী সে রাগতস্বরে বলে, তানভীর ওপাশ থেকে হো হো করে হাসে। তানভীরের ভরাট কণ্ঠের হাসি সায়মার মনকে কিছুটা হালকা করে, একসময়ে সেও হেসে ফেলে। তানভীর ব্যস্ত ব্যাংকার, কনসিভ করার পর এবাড়িতে আসার ব্যাপারে তার সম্পূর্ণ সায় আছে। বলতে গেলে এখানে আসাটা মা ও তানভীরের যৌথ ষড়যন্ত্রের ফল। অথচ গর্ভে সন্তান বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় তার মাকে যেমন দরকার হয়েছে, তানভীরকে কাছে পাবার প্রয়োজন তার চাইতে কম নয়। শরীর দিন দিন ভারী হচ্ছে, পাশ ফিরতেই তার মনে হয় যেন একেকবার পাহাড় ঠেলছে সে। অবসাদ-ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। এসময় তানভীরকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে। যদি সে একটু পাশে বসতো, স্পর্শ করতো, তবে অনেক শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক অবসাদ কমে আসতো। প্রতিদিন দুবেলা ফোন করে, কিন্তু সপ্তাহান্তে আসতে পারেনা। তানভীরের ভাষ্য অনুযায়ী অফিসে অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ। সায়মার ঘোর সন্দেহ কয়েক মাস সায়মাকে ছাড়া থাকতে পেরে সে খুশিই। তানভীর অফিস ঠিকঠাকমতোই করছে, কিন্তু সায়মা নিশ্চিত জানে অফিসের পরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও দিচ্ছে নিয়মিত। সায়মা ঢাকায় থাকলে এই আড্ডাটা সে দিতে পারেনা। তার বন্ধুমহলও বিশাল, যেনতেন উপলক্ষে গেট-টুগেদার আয়োজন করে ওরা। তার মধ্যে কিছু কিছুতে সায়মারও নিমন্ত্রণ থাকে। সবক্ষেত্রে যাওয়া হয়না, তানভীরকেও যেতে দিতে ইচ্ছে করে না। তাতে তানভীরের মুখ গোমড়া হয়, একসময় সায়মা পারেনা, যেতে দেয়। কার্য এবং অন্যান্য সূত্রে তানভীরের বন্ধুপরিধি দিন দিন বাড়ছে, সায়মার কমছে। তানভীরের ওপর সায়মার নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে, ওকে ছাড়া এরকম দিনের পর দিন থাকা আসলেই কঠিন সায়মার জন্য। ফলে তানভীরের ওপর তার রাগ জমছে দিনদিন। রাগ জমেছে মার ওপর, নানার ওপর। আজ বাবা থাকলে অনেক সহায় হতেন তিনি। বাবা ছিলেন সায়মার ফ্রেন্ড ফিলসফার অ্যান্ড গাইড। কিন্তু হৃদরোগ বাবাকে তিনবছর আগে পৃথিবী থেকে নিয়ে গেছে। অথচ বাবার পিতৃবয়সী নানা এখনও টিকে আছে।

হরমোনাল ক্ষরণের কারণে কিনা কে জানে, সায়মার মেজাজ খুব চড়ে থাকে আজকাল। নানার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হয়ে সে মাঝে মাঝে মাকে বলে, আপনার বাপটা মরে না কেন? মানুষের আশি-নব্বই বছর বাঁচার দরকার কী? মা শুনে হতভম্ব হয়, মেয়ে এসব কী বলে? সায়মা বলে, হা করে কী ভাবেন? আমাকে আনছেন তো আপনার বাপের সেবা করার জন্য। মা নির্বাক থাকে। চোখে সামান্য জলও কি দেখা যায়?

ক্লান্তিকর সকাল আর দীর্ঘ পড়ন্ত দুপুর মিলে সায়মা নানাকেই দেখে। নানা কখনো গামছা-লুঙি খোঁজে, কখনো পড়ে পড়ে ঘুমায়, কখনো লম্বা বারান্দায় পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে। তাকে সবচেয়ে অসহায় লাগে পড়ন্ত বেলায় ইজি চেয়ারে বারান্দায় বসে থাকা দেখলে, বারান্দার গ্রিলের ভেতর দিয়ে নিস্পলক দূরে তাকিয়ে থাকে। আকাশে হয়তো একটা-দুটো চিল উড়ছে, সেদিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকেন নানা। বারান্দার ছাদের ছায়া সরে কখন পড়ন্ত রোদ গায়ে এসে পড়েছে, নানার কোনো ভাবান্তর নেই। সায়মা বোঝার চেষ্টা করে, নানার মনে এখন কী ভাবনা খেলা করে? অতীত জীবন, কর্মক্ষেত্র, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা? নাকি বর্তমানের অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে? অশক্ত শরীর, দুর্বল চিত্ত, প্রায় অকার্যকর মস্তিষ্কের স্মৃতিপ্রকোষ্ঠ -- সব মিলিয়ে অস্তিত্বের কোন তলায় বাস করছেন নানা? শীর্ণ হাত-পা, শূন্য দৃষ্টি, ইজি চেয়ারে নিঃসাড় পড়ে থাকা -- তাৎপর্যহীন এই জীবনের কোনো মূল্য কি আছে? এবার রাগ নয়, অনেক মায়ামাখা ভালবাসায় বুকটা হাহাকার করে ওঠে সায়মার, নানার আসলেই আর বেঁচে থাকার দরকার নেই। ব্যক্তি ও কর্মজীবনের একজন সফল মানুষের এরকম খড়-কুটোর মতো বেঁচে থাকার মানে হলো তার সারাজীবনের অর্জনকে অপমান করা।

...

হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তানভীরের হাস্যোজ্জ্বল মুখটাই প্রথমে দেখতে পেল সায়মা এবং ওর কথা শুনে বুকটা আনন্দে ভরে গেল:
--কনগ্রাচুলেশনস, ডার্লিং, নাউ ইউ আর এ প্রাউড মাদার অব এ প্রিটিয়েস্ট প্রিন্সেস। অ্যানেস্থেশিয়ার ঘোরলাগা সায়মার চোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তানভীর বাচ্চাকে সায়মার হাতের ভাঁজে শুইয়ে দেয়। সায়মা মন দিয়ে নিজের শরীরের অংশটিকে দেখে।

-- মা কোথায়? মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে সায়মা।

--ছিলেন, বেবিকে দেখে গেছেন। এই একটু আগে গেলেন ... যেতে হলো। ... নানা মারা গেছেন।


১৯ জুলাই, ২০১২

প্রথম প্রকাশ: ঈদসংখ্যা, ইত্তেফাক, ২০১২।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন