শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

প্রিয়ংবদা



শামীম আজাদ

মানুষ চশমা হারায়। পাসপোর্ট হারায়। কবিতার পংক্তি হারায়। মানুষ, মানুষ হারায়
না। যাকে হারাতে যাচ্ছে ভাবে, তাকে হারাবার ভয়ে ভালোবাসায় পাথর করে রেখে
দিতে চায়। তার কন্ঠমূলে শ্বাসের স্থান রাখে না। কিন্তু স্যামুয়েল তার কতটুকু
বুঝেছিলো এবারের এই শীতে আর মনে করতে পারে না শাহানা। হেমন্তে কিন্তু
অদ্ভুত এক সম্ভাবনার বিড়াল লাফিয়েছিলো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে স্যামুয়েল ওরফে
সামসুদ্দিন যে ভাবে তাকে বুঝেছিলো বলে জানাতে চেয়েছিলো তা জানাবার সময়
যে সব রেসিপি ব্যবহারের দরকার ছিলো তা তার ছিলো না।
শাহানা সালাদ আর নিরেট সবজির স্যুপ ভালোবাসে। অথচ একদিন
প্রতিদিনের বেহাগ বাজাতে বাজাতেই আবার সে স্যুপে স্যামুয়েলের হাড়ের ঘ্রাণ
পায়। হাড়ের ভেতরে যে কলজে কালো মজ্জা থাকে তার কুচো পর্যন্ত ভেসে ওঠে।
আর তাতেই শেফার্ডস বুশের চিমনীর মাথায় উড়তে শুরু করেছিল তার বহু খণ্ডিত
তাঁতের শাড়ি। রাত আরো গভীর হলে বহুজাতিক সভ্যতার বোতাম খুলে গেলে
বিস্ময়ে এতই বিপনড়ব হয় যে এক সময় সে শয্যা ত্যাগ করে। ঘর থেকে বেরুবার
সময় তার ঝুলন্ত মন একবার ফিরে চায়, দেখে বিছানায় লেগে আছে সামসুদ্দিনের
ভগড়বাংশ। বুকের কাছ থেকে কাপড় কাচা ময়লা সাবানের ফেনা উঠছে।
পাবের পাশের ফ্ল্যাটের লিজকে ঘুম থেকে তুলে বাড়তি চাবিটি দিয়ে রাস্তায়
নামতেই চেনা শহরকে লাগে যেনো বরফের পানেসারি। চাবি সে বেগুনী অর্কিডের
নিচে রাখতে পারতো। কিন্তু শাহানা চায় সকাল বেলা বাড়তি চাবির সঙ্গে একজন
বাড়তি মানুষও যেন স্যামুয়েলের সঙ্গে থাকে। তাতে সে ভদ্র থাকবে, বনের বাঘ হবে
না। না, কোন মায়াবতী সে না। এ শুধু ভব্যতা। কিন্তু তবুও কি ডকল্যান্ড থেকে
ডাহুক কেঁদে উঠেছিলো!
রাস্তায় রাস্তায় বস্তাভরা শীতÑ বরফের বালিশ লাইট পোস্টের খোঁচায় ফুটো
হয়ে গেছে। কিন্তু তার কোন ঠান্ডা লাগে না। ঘুমন্ত রিয়ার চোখে শুকনো অশ্রচিক্
চিক্ করছে। ঘাড়ে চলেছে যেন স্মৃতির ব্যাগেজ। নাইন ইলেভেনের পর দ্বিখন্ডিত
এই পৃথিবীর আকাশেই উড়াল পথে স্যামুয়েলের সঙ্গে তার প্রম দেখা। দেখা হয়েছিলো আফগানিস্তানের পানেসারিতেই; স্বেচ্ছা সেবাদান শেষে বিলেতে ফিরতি
বেলায়। তারপর একসাথে হিথ্রো থেকেই। মানুষ মৃত্যুর মুহূর্তে নাকি তার শৈশব
দেখে। নাইট বাসে বসে তার তেমনি হচ্ছে। আজ একটি সম্পর্কের মৃত্যু দিবস।
তাই সব মনে এসে দাঁড়াচ্ছে একে এক।
তারপর শাহানা স্যালি হয়ে গিয়েছিলো। সেদিন স্যামুয়েলের সঙ্গে লন্ডিনিয়ামের
মাটিতে পা স্পর্শ করতে না করতেই একটি ম্যাগপাই উড়ে গেলে অন্যটির প্রার্থনায়
চার্চের চূড়ায় বসা মেঘকে কুয়াশা গন্ধে বন্দী করে ফেলেছিলো তারা। মডার্ণ টেইটের
ঢালে টংকারে টংকারে অনীশ কাপুরের টারবাইনে এক সঙ্গে ফুঁ দিয়ে আরশে মোয়াল-া
কাঁপিয়ে তুলেছিলো। সে সময় দিন রাতের কাব্যে আর কুসুমে লাল লাল দোতলা
বাসে বসা জাপানি ট্যুরিস্ট নর নারীরা সারেঙ্গির মত লাগাতার শব্দ করেছিলো।
তাদের কন্ঠার গলে যাওয়া মাখন তাদের সামনে তুলে ধরেছিলো। এর সবই ঘটে
গেল সর্বজনবোধ্য পৃথিবীর ভাষায়। ভাষান্তরের প্রয়োজন হয় নি। কোন অনুবাদক
লাগে নি। কোন নোয়াম চমস্কি এসে একটি একটি করে পাথর সাজায় নি। শাহানার
পাথরে কর্ণফুলির কল্পনা আর স্যামের পাথরে রাই নদীর লাইট হাউসের হলুদ আলো
জলের ঝালরে দুলেছে। তখন শাহানার শরীরে প্রবেশ করেছে পূর্ণিমা প্রভাত। প্রতি
রাতে ওরা দুজন সাঁতরে পেরিয়েছে পূর্ণিমা পুকুর। এত সাধনার সর্ম্পকর আজ মৃত্যু
দিবস। সে রাতেই তারই কুলখানি হলো বন্ধুর ফ্ল্যাটে কফি আর কষ্টের স্লাইস অব
বিটারে।
শাহানার আজকের এ ঘুরে দাঁড়ানোর আগে ছিলো মোজাইক মার্বেল ফাটিয়ে
সরে দাঁড়ানোর ঘটনা। বিবাহের ছমাসেই সেই সব হল। কালো তুষার দেখে দেখে
ঘোলা চোখে রাতের পর রাত সে বসে থেকেছে। উইম্বলডনের ম্যাচ-এ ফেডারারের
জয় দেখার জন্য শাহানার সাথে হ্যানম্যান টিলায় দাঁড়াবার জন্য স্যামের যতটা চেষ্টা
ছিল তার পাশে তার সঙ্গে ব্রিকলেনের বৈশাখী মেলায় রোদে ভিজে হাবীবের গানের
সঙ্গে ফুচ্কা খাওয়া হয় নি ততটা। একবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে রোকেয়া
সাখাওয়াতের সুলতানার স্বপ্ন নিয়ে ভাষার ঙিচμযানে তাকে নিয়ে উঠেছিলো কিন্তু
সেটাও উড়তে পারলো না জিলিংহ্যামের সঙ্গে ম্যান ইউনাইটেড-এর গলবন্ধনী
পেরিয়ে। প্রায় ভিড়মি খায় বিবিসির নিউজ ক্লিপ দেখে। ফ্রান্সের বর্ডারে আটকা পড়া
হূলিগানদের একজন তারই মজ্জা! একি, এ কে? কীভাবে সম্ভব?
শুধু তা নয় তারপর পুলিশের খাতায় মুচলেকাও। ফ্রান্সে যাবার ভিসা বাতিল
হলে পরে স্যামুয়েল সেন্ট জর্জ হাসপাতালে মরফিন হয়ে লটকে থেকেছে সাত দিন।
গায়ের নীল ট্যাটুর রেখা আঘাতের দাগে বিভৎস দেখাচ্ছিল। এসব কথা ডাবলিনে
থাকা স্যামুয়েলের মা বাবা না জানলেও সব বাংলা পত্রিকার জানা ছিলো। সুরমা,
জনমত, বাংলা পোস্ট আরো কি কি যেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ হালাল গোস্তের
বিজ্ঞাপনের পাশেই ছাপা হয়েছিলো তাদের বিবাহের ছবি। তখনই তার ছোট মামা
নিউক্যাসেল থেকে এই পেপার কাটিং দেশে পাঠিয়ে দেন। আর প্রতিরাতে চাঁদ
ভেঙ্গে তার কন্দরে কুঠারাঘাতে শাহানার প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে। শাহানার গায়ে
পিছলে পড়েছিলো এক পূর্ণ বয়ষ্ক বিছুটি। দুজনেরই সড়বায়ুমূলের চরণে জমা হয়েছিলো
বর্জ্য আর পুঁজ।
তারপর এই লন্ডিনিয়ামের লেগুনে অকস্মাৎ একা উগড়ে পড়েছিলো শাহানা।
তাতেই সন্তান ও শহরের শিরা উপশিরা ভালো করে দেখবার প্রয়োজন বোধ
করেছিলো সে। পায়ের নিচে অনুভব করেছিলো শুকিয়ে যাওয়া শক্ত গহনা মাটি; যার
কোন চিহ্নই সে কোথাও রাখে নি। কিন্তু স্কুলের শিক্ষা সফরে শহর মানচিত্রে অতসী
কাঁচ মেলে ধরা হাত গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল তার রিডিং গ্লাসেস। যাদুঘরের বাঁকে,
মিলেনিয়ামের মগজ ধরা বিশাল দালানের নিচে প্রক্ষালন কক্ষে। চশ্মার খোলে
ছিলো তার পুরোনো ঠিকানা বুচারস্ বিন, ইজলিংটন
কিন্তু ডাকে শাহানার চশমা পাবে এসে পৌঁছলে স্যামুয়েল আবার পরশ পাথরের
খ্যাপা হয়ে ওঠে। দিনরাত এর সবুজ খোল দেখে, হাত বুলায় আর মিউজিয়ামে ধর্না
দিয়ে তাদের দিন তারিখ ঘুটে সব বের করতে থাকে। সিসি টিভি ক্যামেরায় স্কুল
ট্রিপ ধরা পড়লেই তার পাব টিলের পাশে নতুন ছত্রাক ছড়ায়। তারপর এক বিকেলে
রবাহুত মেঘের সাথে এনভেলাপ হাতে পিচ্ছিল পাহাড় কাটতে উঠে দাঁড়ালো
স্যামুয়েল। একটা উপলক্ষ্য আসলে লাগে। মানুষ নিজেকে ছোট ভাবতে চায় না।
অশ্বারোহনে পেশী আর অমাবস্যায় দূরবীণ। না হলে কে এই ঘন দুর্বা কষে করে
মিঠা বিষ অনুসন্ধান? কার জন্যে এসবÑ তার ছাবাল সন্তান না মিঠা বিষ প্রিয়ংবদা!
পৃথিবীর সে বিষের একটি স্ফুলিংগ নিশ্চয়ই ফস্কে পড়েছিলো ঠিক সুবেহ
সাদেকের সময়। না হলে কীভাবে লাল সূর্যরশ্মির চিরল রেখা ধরে স্কুলগামী বালক
ও বালিকাদিগের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে তার স্থান চিহ্নিত করেছিলো! কিন্তু
এদিকে ততদিনে সুপক্ক হর্স চেস্টনাটে সিকামোর পাখা গজিয়েছেÑ কচি কাঠ
বিড়ালীরা তাদের মার আতর অঙ্গে মেখে নিয়ে অচেনা হয়ে যাচ্ছে। শিশু ও পশু ধান
আর দোক্তার বৈষম্য জানে না। তাই গত কবছরে স্যামুয়েল ওরফে সামসুদ্দিন তার
সমস্ত ক্লেদ আর কয়লা ধুয়ে ফেলেছিলো তার শিশুর পুরোনো কাঁথায়। পিতৃপুরুষের
পাহাড়িয়া কটা চোখের আলোতে দুই অসম বয়সী পাঁচ মিনিটে বিগত পাঁচ বছরের
সাধ ও সম্ভাবনা রুয়ে দিয়েছিলো। সেটাইতো নিয়ম। বাবাতো এলো তাকে দেখতে!
কিন্তু শাহানার কাছে সে এক অচেনা আগন্তুক। তাদের পাঠশালা বাতিঘরের
গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আছে তো আছেই। এ সংবাদ নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যস্ত করে তোলে তখনই। স্ফীত বিয়ার বেলিসহ ধরা পড়ে যায় সে। তখন অপমান থেকে
শাহানা তার সম্মান বাঁচায়। অচেনা মুসাফিরকে চেনার পৈতায় টেনে আনে কিন্তু
প্রত্যাখানে প্রবল দাঁড়িয়ে থাকে।
তখনই হিলে- হয় বিরল উপস্থিতির স্টাফ রুমে।
একদিন তুমি রিয়াকে নিয়ে রাখতে পারো।
আর তোমাকে?
সে আমার আইনজীবি যা বলবেÑ আমি বুঝবো।
আইনজীবির কথা বোঝোÑ আমার কথা বোঝো না!
তুমি কি আমাদের ধ্বসের শব্দ বুঝেছিলে? তুমি চিনেছিলে পর্দার পাগলা ঘোড়া,
বিয়ারের ব্যারল আর সেন্ট জর্জের পতাকায় মাথা মোড়ানো...
আমি আমার শিশুর শব্দ বুঝি, ওর প্রিয় ফলের রস চিনি কিন্তু তুমিতো তাই
নর্দমায় ফেলে দিলে। এত অবহেলা কী করে করলে!
ভালোবাসা কম ছিলো না বলে!
কী!
আর তখনইÑ ঠিক তখনই শাহানার ইশারায় স্কুলের দুই নিরাপত্তাকর্মী তার
ঘাড়ের  দুপাশের হাওয়া কেটে সরে যায়। শাহানা চশমার জন্য হাত বাড়ালে
স্যামুয়েল হেসে তাকে হঠাৎ একটা ট্যাংগো টান মারেÑ নাচের ঘূর্ণনে শাহানা এসে
যায় তার দেহের একদম সীমানায়; প্রায় উষ্টা খেয়ে পড়ে আরকি! স্যামুয়েল তখন
শাহানাকে লঘু চালে দাঁড় করিয়ে চশ্মার সঙ্গে নিজের চোখের সমস্ত তীরগুলো খুলে
তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেট থেকে বেরিয়ে যায়।
ফ্ল্যাটে ফিরে এসে তা সে এক টুকরো মেঘের মত নিজের উর্বরা শক্তি বাড়াবার
তাগিদে শোবার ঘরের জানালায় রেখে দেয়। যে ভাবে একটা সময় পর অধিকাংশ
নারীই তাদের দেহগত জরায়ু যে কোনো উপায়ে আত্মসাৎ করে চিরজীবি হতে চায়।
সে রোজ সেই মেঘ দেখে আর তার বীজ হয়ে আবার তারই অন্তরে ঢুকে যেতে যায়।
অথচ তার এসব জৈব আহারের কোনো ইচ্ছাই আর অবশিষ্ট ছিলো না। তারপর ঠিক
নিউ ইয়ার্স ইভে ঘটলো পৃথিবীর সেই অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি। বর্ণতত্ত্ব ভেদ করে তাদের
নাকে আবার লাগলো ল্যাভেন্ডার ঘ্রাণ। তাদের খোলা বুকের ওপর শুয়ে পরলো
পুরোনো কাব্য-সেতু। ঘটনাটি এভাবে ঘটে।
ফিরে আসার পর থেকে স্যামুয়েলের গায়ের সাদা শার্ট থেকে যেন জ্বর উঠে
গেলো। পাব ভরে গেলো ক্রিসমাস সজ্জায়। কাজের ফাঁকে পানরত সুখী মানুষদের
সঙ্গে কথা বলতে বলতে আচম্কা দরোজায় তাকায়। রাতে ফ্ল্যাটের দরোজা খুলে
রাখে। দরোজার ওপরে মিসেল্টোর পাতা শুকিয়ে যায়। এখনো কি গেরো খোলার
সময় হলো না! μমে μমে বছরের শেষ দিন এসে গেলো। শাহানা ট্যাক্সি থেকে
নেমে পাবে ঢুকতে গেলে লাইট পোস্টের ধাতব দেহে হাতের আংটি লেগে মন্দিরের
ঘন্টা বেজে ওঠে। নানীবাড়ি কনকপুরের তেতুলগন্ধা সেই মন্দিরের বিষনড়ব ঘন্টা যেনো
শেষবারের মত আর্তনাদ করে উঠলো। আয়গো তোরা ধীরে ধীরে তুলে দিমু দধি
চিঁড়া...।কার্তিক সন্ধ্যায় ঘন্টা বাজাতে বাজাতে ক্ষেতের আইল ধরে বেল পাতার
ঘট বয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষের পেছনে পেছনে আবার সে হাঁটতে থাকে। ঘন্টাধ্বনিতে
সে শুনতে পায় গীর্জা ও মসজিদের গম্বুজ ভাঙা শব্দ। এত কোলাহল। এতগুলো বছর
এ আংটি তার অনামিকায় নিরবে এত শব্দ করেছে!
ঘড়ির বারোটার কাঁটা এক মিনিট পেরুতেই স্যাম্পেইন হাতে নিয়েছে সবাই।
রেডিওতে উচ্চস্বরে শুরু হয়েছে কাউন্ট ডাউন। চার... তিন... দুই... এক...! সবাই
যার যার সঙ্গীকে টেনে এনে দাঁড়িয়েছে। তার সামনের এ বিরাট ফাঁকা সে কী দিয়ে
ভরবে? সে বিগ বেনের ঘন্টার সময় চোখ আর খোলা রাখতে পারে না। বারোটা
আঘাত তার চোখে বর্ষা নামায়। চোখের ভেজা পাঁপড়ির ফাঁকে কিছু দেখা না গেলেও
চারিদিক থেকে শুনতে পায় স্যালি স্যালি স্যালি...। একি তার মগজের শব্দ? চোখ
খুলে দেখে সবাই শাহানাকে কোলে তুলে স্যাম্পেইনের ফেনায় ভিজিয়ে দিচ্ছে।
এতক্ষণ বাইরে, পাবের চরণের খুর হয়ে পড়ে থাকা তাদের সেই মাতালযুগলও
এখন ভেতরে। বাইরে নড়ে চড়ে উঠেছে মাতালদের সমিল চেহারার একজোড়া
বুলডগ। নাচ আর গানের উন্মত্ততায়    লাস্ট সাপারের সোনার আঙ্গুর ফ্রেম ঠেলে উঠে
এসেছে স্যালি। এরকম পরিস্থিতিতে কি করতে হয় শাহানা বা স্যালির বিস্মৃত হবার
কথা না। একে একে বারের বাতিগুলো বন্ধ হলে সে গান তুলে দেয় ব্রেকফাস্ট এ্যাট
টিফ্যানী। উই হ্যাভ নাথিং ইন কমন...। মোহাবিষ্টতায় সভ্যতার আগাছা ও
অর্কিড মিছমার করে তার আকাংক্ষা ক্রাল স্বচ্ছ এক নৌকা হয়ে রাই নদীর
উপত্যকা বেয়ে নেমে যেতে থাকে।
গানের শেষ শব্দ মুছে যাবার আগেই সে স্যামুয়েলের বাহু স্পর্শ করেÑ কানে
কানে বলে বাংলা কবিতা,
যে তুমি ছেনেছো আমার সকল সবুজ
পদাঘাতে ভেঙেছো আমার মাছের মন্দির
আমি তারে দেখি আর নতুন নির্মান করি।
অনুবাদহীন ভিন ভাষার এবাক্যগুলো কাব্য হয়ে ওঠে। স্যাম শুনতে থাকে। শাহানার
হাত তার গালের এলোমেলো কেশ ছুঁয়ে যায়। বিস্মিত বিনয়ে দেখে আইনজীবি
ছাড়াই ওরা বুঝে যাচ্ছে সব!
- ডাকো সামসুদ্দিন, শাহানা।
- না স্যাম। ডাকো স্যালি...
- না শাহানা।
- না সামসুদ্দিন।
- না।
এরকম সময় মাতামহীর বেহেস্তী রক্তও যা করতে পারে না তাই হল। জলে
জলে জরায়ণ ঘটলো। পাবের গুঁড়ি থেকে সে দুই মোহন মাতাল চিৎকার করে
শীতের কেক ফালি ফালি কেটে বলে উঠলো, চিয়ার্স ম্যান!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন