মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৩

অনন্তপুর


সুনন্দা মুখোপাধ্যায়


সন্দেহ হয়, তুই কি এই চিঠিটাও পড়বি? কত চিঠি-ই তো তোকে এ-পর্যন্ত পাঠালাম, তাই না? ই-মেইল করলাম গুচ্ছ গুচ্ছ, উত্তর নেই, ফোন করলে কেটে দিস। তোর কলকাতার বাড়িতে ফোন করলে কাকিমা মিথ্যে মিথ্যে অবাক হওয়া গলায় বলে: ও মা, অলি তোর ফোন তোলে না কি রে? এই তো পরশুই বলছিল প্রমিতাকে জন্মদিনে উইশ করেছিলে, মা? আমি একদম ভুলে গিয়েছি রে! কি কিনলি, এবার জন্মদিনে? একদিন চলে আয় না, রণ তো বাড়িতেই থাকেনা, আমরা বুড়োবুড়ি সারাক্ষণ একা একা।" নির্জলা মিথ্যে কথা। কাকিমা দিব্যি আছে। সেদিন ই মধুমিতাদির বিয়ের গিফট কিনতে ন্যু মার্কেটে গিয়েছিলাম ক'জন, দেখলাম কাকিমা পার্ক থেকে বেরোচ্ছে, সাথে আরো জনা পাঁচেক তোদের এন্ক্লেভের ওই কিটি পার্টি টাইপ গিন্নিগুলো। ওই যে সাদা পাটকাঠির মত মিসেস বাগচী, কালো শিফন আর হাত খোলা জামার ভিতর থেকে মুরগির হাড়ের মত কন্ঠনালী বের করে তাকিয়ে ছিল, ওটাকে চিনতে পারলাম। তুই কাকিমাকে দেখলে মূর্ছা যেতিস, অলি। কি রকম জরি, পাথর বসানো মুঘল আমলের পর্দার মত একটা শাড়ি পরেছিল, অমন শাড়ি কাকিমাকে কে কিনে দিল রে? আর টনস অফ জাংক, গলায় হাতে কানে, সর্বাঙ্গে। আমায় সেদিন বলছিল"অলি বলে, মা তুমি ফ্যাশনেবল জামা-কাপড় কিনবে। বুড়িদের মত যেন না সাজতে দেখি" বলে খিল খিল করে হাসছিল কাকিমা- সো আনলাইক হার!

বাট দেন, এভরিথিং ইজ সো, অলি। সো আনলাইক ইউ। তুই তো বলে যাসনি যে এরকম হবে। কি হলো রে?

নাহ, সব প্রশ্নই তোকে একবার করে করা হয়ে গেছে। কখনো রাগ, কখনো অভিমান, কখনো কান্না, বাঁকানো কথা , কোনো কিছুই কি তোকে আর আঘাত করবে না? আমি তা হলে কি করব, অলি?

জানিস, আমি খুব শিগগির বুড়িয়ে যাচ্ছি। সাড়ে আটটার বর্ধমানটা ধরতে না পারলে দশটার মধ্যে স্কুল পৌঁছতে পারিনা, সাতটায়, সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে পড়তে হয়, দুটো ট্রেন বদলানো, ফিরতে ফিরতে রাত। মা আজকাল আর বাজারটাও করে উঠতে পারে না, সপ্তাহে দু দিন আমি ই করে দিই। স্কুলের ওদিকে খুব ফ্রেশ সবজি পাওয়া যায়, ওখান থেকেও নিয়ে আসি। হাত টনটন করে, কিন্তু অনেক কম দাম তো! খুব ভালো লাগে এই চকচকে বেগুন, কেমিক্যাল ছাড়া পালং দেখলে, কিনবার জন্য হাত নিশপিশ করে। তারপর অবশ্য খুব কষ্ট হয় বয়ে নিয়ে যেতে। আমাকে বাজারের ব্যাগ হাতে দেখলে তুই নিশ্চয়ই খুব রেগে যাবি, তাই না?

এখনো ভাবতে ভালো লাগে যে তুই রেগে যাবি। আমার পুরনো শান্তিনিকেতনী ঝোলাটা ফেলে দিয়েছিলি তুই কলেজে , মনে আছে? আর প্রথমবার স্টেটস থেকে এসে কত দামী দামী জামাকাপড় ভরে দিয়ে গিয়েছিলি আমার রং-চটা স্টিল আলমারিটাতে? ওসব জামা আমি আর কোথায় পরবো, বল তো! এখনো ট্যাগ অব্দি খোলা হয়নি জামাগুলোর। শুধু সেই যে সেই আকাশরঙা জামাটা, যেটা আমায় পরিয়ে তার মস্ত বড় কাটা গলার ফাঁক দিয়ে তুই মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিলি আমার বুকে, আর দম আটকানো গলায় বলেছিলিস- আই মিস ইউ সো মাচ মিতু.......আই মিস ইওর টেস্ট, ইওর স্মেল-শিগ্গির চলে আয় , প্লিজ, তোর জন্য একটা গোটা এপার্টমেন্ট সাজিয়ে রেখেছি আমি.....

ওই জামাটার ট্যাগ তুই খুলে দিয়েছিলি, না কি ওটার প্রাইস ট্যাগ ছিলনা?

কত জায়গায় ঘুরছিস তুই, অলি, ফেসবুক খুলে আমার আর বসা হয়না, তোর কথাতেই একটা একাউন্ট খুলেছিলাম, তুই ই একমাত্তর ফ্রেন্ড ছিলি, হঠাত দেখলাম আমার ফ্রেন্ড লিস্ট এ আর কেউই নেই, তোর ছবিগুলো ও আর দেখতে পাইনা। ওগুলো দেখে দেখে একটু তো ঘোরা হত আমার? তুই তো আর আসিস না, ছবি পাঠাস না ডাকে, লম্বা লম্বা সেই চিঠিগুলো ও তো আর আসে না। এভাবে আমাকে ছিঁড়ে কেটে ডাস্টবিনে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠলি কেন তুই? আমি তো অতীত নই!

জানি আমি, জি আর ই টা এখনো দিতে পারিনি বলে তোর খুব রাগ, কিন্তু বিশ্বাস কর অলি, আমি দেব, ঠিক দিয়ে দেব, শুধু পড়তে বসারই টাইম পাই না। তুই যে বই পত্র গুলো দিয়েছিলি সেগুলো সব আছে, অঙ্ক নিয়ে তো তত অসুবিধে নেই, শুধু ভোক্যাব টা- বাপিটার অসময়ে ক্যান্সার টা না হলে এসব কিছুই হতনা তুই তো জানিস। কি করি আমি। মা'র হার্ট এর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে, টিউশন আর বাবার পেনসন , সবই ডাক্তারের পিছনে যায়, সেই এম এস সির পর স্কুল এর চাকরিটা পেয়ে মনে হয়েছিল ভগবানের আশীর্বাদ। কি করে চাকরি ছাড়ব তখন? এক পয়সা সঞ্চয় নেই, আমার পরীক্ষার ফি, এসেসসির ফি, সবই তো তুই ই দিয়েছিলি। আমাকে বলেছিলি, ঠিক আছে, কটা মাস চাকরি টা কর,আমি ওখানে হালত বুঝে নিই, তারপর টাকা পাঠাব, জি আর ই টা তোকে দিতেই হবে। আর তারপর , সুন, সুন আমরা একসাথে থাকব,-ফার্স্ট স্টেপ টু ফ্রিডম!"

শাল এর তলা দিয়ে সাহসী হাতটা আমার বুকে বুলিয়ে নিয়েছিলি তুই, আর ভিজে গলায় বলেছিলি.আজ তোদের বাড়ি?

আই মিস ইউ অলি! রাত্রির মধ্যযামে আমার শরীর বেঁকে যেতে থাকে তেষ্টায়, আমি কল্পনা করি তুই নীলচে গ্রে একটা কোট পরে হেঁটে যাচ্ছিস হলুদ লাল পাতার মধ্য দিয়ে.....আমার কল্পনায় চিরকাল সব বিদেশ ই যে লাল হলুদ পাতার দেশ। মেপল আর ওক আর বার্চ.....তোর প্রথম দিকের চিঠিগুলোতে ক্যাম্পাসের বর্ণনা। আমার খুব হিংসে হত অলি, কিন্তু ভাবতাম যাব, একদিন ঠিক যাব আমি তোর কাছে। তোর বাঁকানো হাতের লেখায় আমার শরীরের আনাচে কানাচে তোর বন্ধহীন ঘুরে বেড়ানো আমায় ভিজিয়ে দিত- কি সব কথাই না তুই লিখিস, অলি! সব চিঠিগুলো লুকিয়ে রাখতাম, ছোটবেলার একটা টিনের সুটকেসে, আর বার বার দেখতে ইচ্ছে হত.......দুপুর বেলায় মিড ডে মিলের তদারকি করতে করতে, রোকেয়া, শাহবানু, নির্মল, লক্ষ্মীমণিদের কালো খসখসে চামড়া আর শিশু-হাসির দিকে তাকিয়ে, সবজি কিম্বা ডিম ভরা ব্যাগ হাতে লেডিস কামরায় উঠতে উঠতে, অথবা অঝোর বৃষ্টির পথে ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসে অনন্তপুর সেকেন্ডারী স্কুল পৌঁছনোর আগে অকস্মাৎ খাড়া হয়ে উঠত আমার সব রোম আর স্তনবৃন্ত। আমি ভাবতাম, এখন যে তোর রাত্রি! নিশ্চয়ই অন্ধকারে ঘুম ভেঙ্গে আদর করছিস আমাকে, বুকের মধ্যে শক্ত হাতে চেপে রেখে দম আটকে দিচ্ছিস, অথবা জিভে তুলে নিচ্ছিস ঠান্ডা স্বেদবিন্দু--- তোর চিঠিতে পড়তাম কেমন ওদেশে আমাদের কথা কিছুটা হলেও বলা চলে কোথাও কোথাও। ভাবতাম, হবে, একদিন সব ঠিক হবে। সারাদিন পর বাড়ি ফিরে শুধু শরীর ভেঙ্গে আসত আমার, টেবিলের উপর জড়ো করা পরীক্ষার খাতা, সেসব সরিয়ে জি আর ই র বইগুলো অব্দি পৌঁছনোর আগেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়তাম আমি, নি:সাড় তলিয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তার অতলান্তিকের নিচে-

অলি এবার শোন রে একটু। তুই ও যদি না শুনিস তা হলে আমি কাকে বলি বল তো? তুই তো জানিস চিরকাল ই আমি চুপচাপ। হর্ষ ব্যথা কোনটাই ঠিকঠাক প্রকাশ করে উঠতে পারিনা। বাবা যখন মরে গেল তখনও আমার কান্না পায় নি...অবশ্য বাবা আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে আমার এম এস সি পাস করাটাও হত না বোধ হয়। যা কিছু জমিয়েছিল একটা ছোট্ট ব্যবসা থেকে সব ই নিজের কেমো আর সার্জারির খরচে শেষ করে পুট করে মরে গেল, মায়ের গয়না তো আগেই গিয়েছিল, বাড়ি তৈরীর সময়। কি করে যে এই মাঝের সময়টা কেটেছিল এখন আর মনে পড়ে না রে অলি। এখন আমার একটা চাকরি আছে, তোর মত অত ভালো নয়, তবু চাকরি তো? আমি নিজের শাড়ি কিনি, সংসার চালাই, মা'কে সাবধানে রাখি, টাকাপয়সা অবশ্য জমে না......আর সেই বৃষ্টি ভেজা পথে অনন্তপুর ইস্কুলে যাই। আমার বুকের মধ্যে যে আগুন-পাখি ডানা ঝাপটায় তার পাখার আওয়াজ তুই ছাড়া আর কেউ কি চেনে?

আমার খুব ভয় করছে। অলি একটিবার সাড়া দে আমায়! আমি যে নিজেকেই ভীষণ ভয় পাচ্ছি!

আমার স্কুলে পড়ায়, সুচিন্তন, মানে আগে পড়াত। এবার কলেজে পেয়ে গেছে, কলকাতায়। আমরা প্রায় ই একসাথে ফিরতাম, তারপর একদিন, ওর কলেজের চাকরিটা পাকা হয়ে যাওয়ার পর, ফিরতি রাস্তায় ও আমাকে বলল-"শনিবার আমার বাড়িতে এস? আর তো এরপর দেখা হবে না?" শনিবার হাফ্ছুটি. সেদিন, ওর বাড়িতে ওর মা, আর বোন এর সাথে খাওয়া দাওয়া আর আড্ডার পর, ওর মা আমায় জিগ্যেস করলেন, "কি, বল, কবে যাব তোমার মা'র সাথে দেখা করতে?" আমি কিছুই বুঝতে পারিনি রে, অলি! আমি হেসে হেসে বোকার মত বললাম, আসুন না, যে কোনো দিন, মা তো বাড়িতেই থাকে! সপ্তাহ খানেক পর, ওর মা, আর ও আমাদের বাড়িতে এলো...আর ওর মা, মা কে বললেন, "ছেলের তো আপনার মেয়েকে খুব পছন্দ, মেয়ের বিয়ে দেবেন তো এখন? চাকরি বাকরিও করবে, কাছাকাছিও থাকবে......আর আমার ছেলে বলে বলছিনা, ছেলে আমার খুব ঠান্ডা আর শান্ত. আর আমাদেরও পছন্দ আপনার মেয়েকে, লক্ষ্মীমন্ত , বুঝদার..." মা হেসে কেঁদে কুল পায়না! আমাকে পাশের ঘরে সুচিন্তন জিজ্ঞেস করলো..."কি বল, আমায় দিয়ে চলবে?" ওর মুখে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ মজা ছড়ানো থাকে সব সময়, সেদিকে তাকিয়ে আমি শুধু ফিস ফিস করে বললাম..."আমি তো জানতাম না...একটু সময়...আর একটু.." আমার ভিতরে তোর রাগী মুখটা মাথা ঝাঁকাচ্ছিল, আমার চোখের ভিতর দিকের দেয়াল দিয়ে জল গড়াচ্ছিল অঝোর, অঝোর, অদৃশ্য! আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বিব্রত সুচিন্তন মৃদু স্বরে বলল, "সে তো নিশ্চয়ই; সময় নাও; তোমার তো কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই ; তুমি বলেছিলে, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মনে আছে? এই জন্যই জিজ্ঞেস করেছিলাম...তাই, আমি ভাবলাম...মানে তোমার উপর তো বাড়ির অনেক দায়িত্ব, তাই মনে হলো এভাবে বলাই ভালো..ফ্যামিলি র থ্রু দিয়ে..মানে অফকোর্স তুমি মায়ের সব দায়িত্বই আগের মতই নেবে, যদি রাজি হও..আমিও থাকব....তোমায় এত কিছু একা করতে হবে না.." আর একটু একটু থেমে অপ্রস্তুত গলায় বিড়বিড় করে শেষ করলো" আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে প্রমিতা, তাই..রাজি না হলে আমি কিছু মনে করব না.. " ওর চোখে একটা সিনসিয়ারিটি আর উদ্বেগ একই সঙ্গে খেলা করছিল...

আমার খুব লোভ হচ্ছিল, জানিস অলি, ভীষণ! কতদিন, কতদিন কারুর উপর নির্ভর করি নি. তুই চলে যাওয়ার পর থেকে সব কিছু অপেক্ষা, বিবর্ণ, অর্থহীন, নিষিদ্ধ, অস্বীকৃত! তুই শেষের দিকের চিঠিগুলোতে অধৈর্য্য, উদ্ভ্রান্ত হয়ে উঠ্ছিলি...কেন রে, অলি? আর তার পর, ছ মাস, চিঠি না, মেল না, ফোন না...কেন অলি? তুই ও কি এই রকম...অন্য কোনো সুচিন্তন...অন্য কোনো প্রমিতা... তুই ও কি অনিশ্চয়তা র সাথে লড়তে লড়তে ক্লান্ত? তুই তো কখনো বলিস না দুর্বলতার কথা? মাথা ঝাঁকাস, যেন সব চিন্তাগুলো অমনি ই ঝরে পড়ে যাবে...দু হাত দিয়ে আমায় আড়াল করিস, আর নিজের দিকে ছুটে আসা তীরগুলোকে হেলায় শরীর বাঁকিয়ে ডজ করে যাস! যাদবপুরে মেকানিক্যালের বারান্দায় বসে যেদিন নয়না আমাকে বলেছিল তুই তো খালি হাতখরচ আর লাঞ্চের জন্য অলির সাথে ঘুরিস...তোর তো ম্যাথ, ওর সাথে তোর কি দরকার? সেদিন নখে দাঁতে ওকে প্রায় ছিঁড়ে ফেলেছিলিস তুই! আর পিকনিকের সময় যেদিন তোকে বিচ্ছিরি ভাবে নিবেদন, অঞ্জনা, রক্তিমদের গ্রুপ হোমো বলে হিউমিলিয়েট করার চেষ্টা করছিল, সেদিন কেমন চুপ করে একটা বই খুলে বসে ছিলি তুই আর মিটি মিটি হাসছিলি..আমি তো মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম প্রায়, ভয়ে! ওদের বিভিন্ন রকম কথা শেষ হয়ে গেলে একটু ঘাড় বাঁকিয়ে রক্তিম কে বললি.."তোর প্রপোজাল যেহেতু এক্সেপ্ট করিনি, অমনি আমি হোমো হয়ে গেলাম? কি লজিক মাইরি!" গার্গীর সেই বড় হয়ে যাওয়া চোখ আর রক্তিমের তোতলানো, আর তারপর গার্গীর দৌড়ে চলে যাওয়া, আর রক্তিমের তার পিছনে ছুট আমি কোনদিন ভুলতে পারবনা, এখনো মনে পড়লেই মারাত্মক হাসি পায়. গার্গীর সাথে সেদিন ই বোধহয় রক্তিমের কেটে গিয়েছিল, আর পুরো ব্যাপারটা কি ভাবে আমাদের দিক থেকে ঘুরে গেল...

আর তুই যখন রাত্রে তোর সেই ছোট্ট সৌখিন খাটের নরম বিছানায় আমার উপর উঠে এসেছিস তখন আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রক্তিম সত্যি তোকে প্রপোজ করেছিল? আমার গলায় মুখ ঘষতে ঘষতে তুই বললি.."করেছিল, তবে ক্লাস সেভেনে. ও-ও সাউথ পয়েন্ট এ পড়ত তো! ". আমি সোজা উঠে বসলাম" কি? ক্লাস সেভেনে? আর তুই সেটা ওখানে বললি? রক্তিম যদি বলত ?" কি বলত? বললেই গার্গী বিশ্বাস করত? নিজেকে বাঁচাতে শেখ। আর এখন তোর এই সব ইনোসেন্ট কোয়েশ্চেন রাখ তো,এদিকে আয়! একেই খাটটা ছোট" এক টানে আমায় আবার শুইয়ে দিয়েছিলি তুই, আর একে অন্যের গায়ে মুখ গুঁজে আমরা কতক্ষণ যে হেসেছিলাম!

আমার গোটা কলেজ জীবনের খরচ তুই চালিয়েছিস! জানিনা কখন সেসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা আর হিসেব করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজের পড়া করেও, অবলীলাক্রমে, কতদিন আমার অঙ্কের নোট কপি করে দিয়েছিস তুই। যে মাসে টিউশন এর মাইনে অন্য কাজে খরচা হয়ে যেত সে মাসে কোচিং এর ফীজ আমার ব্যাগে গুঁজে রাখতিস। কতদিন, কতবার মাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবার আগের দিন জোর করে আমায় টাকা ধরিয়ে দিতিস. কখন আমার সব দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছিলি তুই, অলি...আমি আর কখনো কারোর দিকে তাকাই নি, সেই উন্মেষের বয়েস থেকে. জানি নি পুরুষের ছোঁয়া কি রকম, বাস এ ট্রাম এ বিরক্তিকর স্পর্শলোভী হাত ছাড়া. আমি জানতাম, আমি দত্তা ! য়্যান্ড হ্যাপিলি সো !

কিন্তু সেই নির্ভর কোথায় গেল?

পৃথিবী নাকি খুব ছোট হয়ে এসেছে...সেদিন অধরার সাথে দেখা হলো, তোর মনে আছে, ফিজিক্স এর যে মেয়েটা আমার সাথে মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরত বলে তুই খুব রেগে যেতিস...ও বলল ওর নাকি অনেকের সাথে যোগাযোগ আছে...কার কার নাম করলো আমি ভালো করে মনেও করতে পারলামনা! আমি কি তোকে ছাড়া পৃথিবীতে কাউকেই চিনেছি সেভাবে? আর অনন্তপুর স্কুলের অঙ্কদিদিমনি এখন ট্রেন এর কামরায় খবরের কাগজ পড়ে, কিংবা একটু ঘুমিয়ে নেয়. বাড়ি ফেরার সময় পেয়ারা আর কাসুন্দি মাখা খেতে খেতে ভাষাহীন চোখে মটরশুটির খেতের দিকে তাকিয়ে থাকে. আর বাড়ি এসে ঘুমন্ত চোখে কম্পিউটার খোলে, ভীষণ স্লো নেট কানেক্ট করে, মেল খোলে আর তোকে খোঁজে. তোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই ভরসার ছোট্ট পৃথিবী আমার...আমি তো স্বনির্ভর নই অলি, কোনদিন ছিলাম না, কোনদিন হতেও চাইনি...তোর মত এমফ্যাটিকালি নিজের চাওয়ার কথা বলা আর তার জন্য শেষ অব্দি লড়ে যাওয়ার হিম্মত আমার তো ছিল না! কিন্তু তুই তো ছিলি! শেষ অব্দি যে তোর থাকার কথা ছিল, তোর না থাকার সিচুয়েশন তো আমায় কখনো ভাবতে হবে জানতাম না!

পৃথিবী জুড়ে এত বিপ্লবের মহোত্সব, অলি! তুই তো আমায় দেখাতিস স্বপ্নের দিকে উড়ে চলার রাস্তা. আর তুই আছিস বলেই না আমার মনে হত শেষ সিঁড়িতে এখান থেকেও পা রাখা যায়! অনন্তপুর থেকে স্টোনওয়াল খুব বেশি দূর নয়. আর কোনো এক দিন একটা বৃষ্টির বিকেলে আকাশে জোড়া রামধনু উঠবে যখন, রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে তোর ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে পারব, নিশ্চয়ই।

তোর অনুপস্থিতির সুযোগে নরম টিপি টিপি পায়ে আমার রাস্তায় এগিয়ে আসছে সুচিন্তন, নিশ্চিত জীবনের আশা, প্রেম, তার সমস্ত আনপ্রেডিকটেবিলিটি নিয়ে, তোর হাত ধরে ভাঙ্গা সব কটা সিঁড়ির উচ্চতা কে শূন্য করে দিয়ে. আমি কি এগিয়ে যাব? আরামের অতল গহ্বরের দিকে?

তুই ই বলে দে? সিকিওরিটি কি ইলিউশন? না কি সে সত্যি ই আছে? কোথায় সবচেয়ে সিকিওরড আমি? ধুস, আমি ওসব বিপ্লব টিপ্লব জানিনা অলি! আমি শুধু তোকে আমার পাশে দেখতে চাই, সকালে, বিকেলে, শুনতে চাই তোর ইষৎ অন্যমনস্ক গলায় গুনগুনানি. ছুঁয়ে থাকতে চাই তোকে.এইটুকু চাইবার জন্য বিপ্লব করতে হবে?

অলি, আমার এই অনন্তপুরে তুই একদিন ঠিক ফিরে আসবি,বল ? আমার অনেকগুলো ওয়ার্ড লিস্ট মুখস্থ হয়ে গেছে, সত্যি! সুচিন্তন তো সেকথা জানেনা, বেচারা! এই চিঠিটার জবাব দিবি তো? তুই আছিস তো অলি? আমি কিন্তু আছি দেখ...আমার অল্প বিস্তর রুপোলি চুলের ঝিকিমিকি নিয়ে, আমার সারাদিনের ছোটাছুটির ক্লান্তি নিয়ে, আমার মেধার অব্যবহারের যন্ত্রণা নিয়ে...আমি তো আছি অলি. তুই আছিস তো? কেমন আছিস রে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন