মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৩

ভাষা দাও, স্বাধীনতা


বিপুল দাস

এক
বাতাসি জানে না আজ ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ। শীত সামান্য কমে আসার ফলে এখন সে তার ছেঁড়া পোশাকেও খুব ভোরে বেরোতে পারে। সে ঠিক করেছিল আজ নতুন বাড়িগুলোর পেছনের গলিতে যাবে। সে ঠিক জানে এখনও ওদের দলের কেউ ওখানে যায়নি। ওরা লক্ষ্য করেছে ওই অনেক উঁচু বাড়িগুলোর পাহারাদার মাঝে মাঝে পেছনের গলিতেও টহল দিয়ে যায়। পুব আকাশের অন্ধকার যখন একটু হালকা হতে শুরু করেছে, তখন সে তার পিঠে বস্তা ফেলে সেই গলির দিকে রওনা হল। আজ যদি প্রথম সেখানে পৌঁছতে পারে, তবে আজ তার বস্তা ভরে উঠবে। বাতাসি বোবা। বেরোবার আগে সে তার নিজস্ব সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে মাকে জানিয়ে দিল সে বেরোচ্ছে।

দুই
জি-ওয়ানের অধীর দত্ত সেভেন্টি টুতে এপারে এসেছেন। আত্মীয়স্বজন ছিল। তিনি নিজেও বেশ চালাকচতুর। যোগাযোগের জংশনগুলো ভালো চিনে নিতে পারেন। মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু দেশের বাড়ি, জমিজমা, বাগান, পুকুরের জন্য এখনও তাঁর মন যখনতখন উচাটন হয়ে ওঠে। এখানকার নদীপুকুর, ফলপাকুড়, বাতাস এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত - তাঁর মতে সবকিছুই অতি নিম্নমানের। তিনি বেশ ভালোই রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলগীতি গাইতে পারেন। কথা বলার সময় বোঝা গেলেও গানের সময় তাঁর উচ্চারণের দুষ্টতা বোঝা যায় না। তাদের হাউজিং কমপ্লেক্সের যে কোনও অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ এবং সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকেন। এবার হাউজিং-এর কমিটি তাঁকে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনের দায়িত্ব দিয়েছে। প্রভাতফেরি হবে, গান হবে, ভাষণ হবে। খুব ভোরে উঠে পড়েছেন তিনি।

তিন
পাহারাদার নন্দ মাইতি বাতাসিকে ধরে এনেছে। ভোরে উঠে অধীর দত্ত বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। শহরের সমস্ত সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে হবে - এই মর্মে গৃহীত প্রস্তাবে এফ ব্লকের রাম তিওয়ারি এবং এইচ ব্লকের শ্যাম পারেখ সই দেবে কিনা ভাবছিলেন। তখনই তিনি বাতাসিকে দেখতে পান। গার্ডরুমে নন্দকে ইন্টারকমে খবর দিতেই সে বাতাসিকে ধরে ফেলেছে।

বাতাসির বস্তা উপুড় করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটুকরো লোহা, গোটা দশেক বিভিন্ন সাইজের শূন্য মদের বোতল, অনেক প্লাস্টিক, একটা বই। বইটা হাতে নিয়ে অধীর দত্ত লাফিয়ে উঠলেন। এই তো তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া বই। মুক্তির গান। মাত্র এক ফর্মার চটি বই, দোমড়ানো মোচড়ানো ছিল। যেন কেউ এটা দিয়ে কিছু মুড়ে পেছনের গলিতে ফেলে দিয়েছিল।

কী নাম তোর? নন্দ বাতাসিকে ধমক দিল। বাতাসি তবু কথা বলে না। নন্দ এবার একটা চড় মারল বাতাসির গালে। বাতাসির চোখেই শুধু জল ফুটল।

হিন্দিতে জিগা। বাংলা মনে হয় বুঝে না।

এই, চোরি করনে আয়া। নাম বাতা জলদি, নেহি তো ... নন্দ আবার হাত তুলল। স্যার, সময়মত ধরতে না পারলে পাচিল টপকে ঠিক ভেতরে ঢুকে পড়ত। আড়চোখে বাতাসির বুকের দিকে তাকিয়ে নন্দ বলল।

মাটিতে ঢেলে ফেলা তার কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলোর দিকে বাতাসি তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে থরথর করে কেঁপে উঠছে। আস্তে আস্তে সে মুখ তুলে পুব আকাশের দিকে তাকাল। নন্দ এবং অধীর দত্ত দুজনেই ভাবল মেয়েটা ওদিকে কী দেখছে, ওর দলবল আসবে নাকি।

বাতাসি তাকিয়েই আছে পুব আকাশে। বাতাসি জানে না আজ একুশে ফেব্রুয়ারির সূর্য উঠবে আকাশে। কিন্তু সে এমনভাবে সেদিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওই সূর্য ওঠার পথেই কুড়ানি মেয়েদের নাম লেখা থাকে। যেন - এখনই পূর্বদিগন্তে ভাষাহীন বাতাসির নাম লেখা হবে।



একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক
এক
ছেড়ে দাও না মা, অত সাধাসাধির কী আছে। এর আগে অনেক নাটক করেছে ও। গায়ে আগুন দিতে গেছে, ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বেঁধেছে। যেতে চাইছে, যেতে দাও।

আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীদের আমি কী বলব। অত সকালে তোর অফিসের ভাত, অত রাত পর্যন্ত তোর বন্ধুদের মাছ ভেজে দেওয়া - কে করবে। আরতির মা আসতে আসতে বেলা সাড়ে নঞ্চটা। ওদিকে সাতটার ভেতরেই চলে যায়। আমার কোমরে মালিশের কথা ছেড়েই দে ... বাড়ি ছেড়ে চলে যাব - বললেই হল। বিকেলেই হাউজিং-এর সবার কাছে খবর চলে যাবে। সন্ধেবেলা পার্কে হাসাহাসি শুরু হয়ে যাবে। ব্যাপারটা কী বল তো?

তণ্বী ডিভোর্স চাইছে।

তুই যে বললি নাটক করছে !

ঘরের ভেতরে তণ্বী স্যুটকেস গোছাচ্ছে। কাল রাতে প্রবাল তাকে চড় মেরেছে। প্রবালের সেলফোনের ইনবক্স খুলে সে জানতে চেয়েছিল - কে পারমিতা। জিজ্ঞেস না করে অন্যের মোবাইল খোলার আস্পর্ধা দেখে প্রবাল তাকে মেরেছিল।

দুই
রন্টু প্রবাল হয়েছে। মিমি তণ্বী। রাখি সেজেছে প্রবালের মা। এম আই জি ব্লকের বি ফাইভের বারান্দার পুরোটা ওরা স্টেজ বানিয়ে নিয়েছে। মিমি ওর মায়ের শাড়ি চেয়ে এনেছে পুব আর দক্ষিণের গ্রিল ঢেকে দেওয়ার জন্য। শর্ত ছিল ওকে তণ্বীর রোল দিতে হবে। রন্টু একটু আপত্তি করেছিল। সে হল পরিচালক, ড্রামাও সেই লিখেছে। তার হচ্ছে ক্লাস থ্রি। ওদের দুজনের ওয়ান। শাড়ি বাবদ মিমিই তণ্বীর রোল পায়। রন্টু এখন রাখিকে শেখাচ্ছিল।

হচ্ছে না রাখি। "তুই যে বললি নাটক করছে' বলে চোখটা সরু করবি। ইয়েস, দ্যাটস্‌ রাইট।

রাখি ভেবেছিল এখানে চোখ বড় করে অবাক হতে হবে। কিন্তু রন্টু বলছে ভ্যাম্পের মত লুক দিতে। কী জানি। নাটকে বোধহয় এ রকমই হয়। তার সত্যিমিথ্যে গুলিয়ে যাচ্ছিল। *





লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস

জন্ম ১৯৫০ সাল, শিলিগুড়ি।
পেশা : শিক্ষকতা। 
গল্পগ্রন্থ : শঙ্খপুরীর রাজকন্যা
উপন্যাস : সরমার সন্ততি, লাল বল। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন