রবিবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৩

সেই এক কর্নেলের গল্প—

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর


সময়ের অনিবার্য পরিণতিতে কর্নেল জেলখানার নির্জন সেল থেকেই কোনো একসময় খবর পাঠান যে, তিনি আর কোনোদিন কাজলাতে ফিরতে পারবেন না। এ খবর কাজলা নামের গ্রামটাতে প্রথমে পান ১০৫ বছরের বৃদ্ধ ছমেদ ব্যাপারী। যার ফলে কর্নেলের ফিরে আসা না আসা সংক্রান্ত কেনো সন্দেহই আর থাকে না। কারণ তিনি সম্পর্কের পদ বিচারে কর্নেলের আপন দাদাই নন, কর্নেলকে তিনি রীতিমতো আপন সন্তানের মতই লালন-পালন করেছেন। কর্নেলকে পাঁচ বছরের শিশু অবস্থাই রেখেই মারা যান কর্নেলের বাবা। এ সব নিয়েও তারা ভাবেন। এবং কাজলার অনেকেই ভয় মেশানো ঝিমানির কবলে পড়ে। এই ধরনের ভাবনা তাদের আসতেই থাকে। কর্নেলের ফিরে না আসার খবরটি তাদের কানে কানে ছড়ায় এবং তা হয় লবণাক্ত। এ ফিসফিসানি কাজলায় ছড়াতে থাকে। এমনই অনেকে জানায়, তাদের কর্নেল মানুষের ধারে-কাছে এলে একসুর পয়দা করে। এমর তেলেসমাতি ওরা বাপের জন্মে শুনেনি। তাদের স্টেশন মাস্টারের পোলাটা এ কোন কিসিমের পাগলামি শুরু করল! তবে কাজলা নামের গ্রাম কি কর্নেলকে দেখার তাগদ পাবে বলে মনে হয়? এবং একসময় এতসব ঝামেলার ভিদর থেকে সবকিছু ভুলে যাওয়ার কায়দা কানুনে মনোযোগ দেয় তারা। নিচের বিষয়টি হয়ত তারও অনেকদিন পরের, তবে স্বর্ণলতার ঢঙে তা কাজলার জন্মদাগের মতোই জ্বলজ্বল করে।

সেদিন অনডিউটি ডক্টর ভীষণ চমকে ওঠেন। ঘটনাটিও সারা থানা হাসপাতালে তখনই আলাদা মর্যাদাও পেতে থাকে এই কারণে, নবাগত শিশুটির শরীরে কম করে হলেও দুটি অদেখা চিহ্ন লেগে আছে। ১মটি হচ্ছে- এর ডান পাটি হাঁটুর উপর থেকে একেবারেই নেই; যার খোলা অংশে বারুদ, রক্ত আর যুদ্ধের স্মৃতি আটকে আছে। ২য়টি হচ্ছে-গলায় ফাঁসির আলামত নিয়ে জন্মরশিটি পেঁচিয়ে আছে। এমন অ্যাবনর্মাল কেসে ডাক্তারের ভয় পাওয়া টেনশন বাড়ে। এটি আরো বাড়তে থাকে, কারণ অনেকের ভাবনায় এর ভিতর কোনো আজগুবি বিষয় আশয়ের বিবেচনা বাদ দিতে পারে না। তবু সব গোছানো এখানে, ডাক্তারের ভয়ও। তাই ডাক্তারকে ভাবতে হয় দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিবেন কিনা। কিন্তু তার কী আর জো আছে, সারা শরীরে নাপাক লেগে আছে, তাতে আর ওজু কমপ্লিট করাই তো মুশকিল। টি.এইচ.এ. আবিদ ভাইকে জানিয়ে রাখলেও তো হয়। থানায় জিডিও করা যায় অথবা অল কনসার্ন ম্যাসেজ দিয়ে দিলে কেমন হয়? কে কোন ফেকরা লাগায়! নাকি তিনি সিম্পলি ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায় করবেন কাজলাবাসীকে।

হাসপাতালের বাইরেও অনেকদূর পর্যন্ত এ খবরটি পৌঁছে যে, শিশুটি এসেছে স্মৃতি বিতরণের পয়গাম নিয়ে! থানা মসজিদের পেশ ইমাম তো এমনই ইশারা দিলেন। নিশ্চয়ই কোনো আলামত তিনি পেয়েছেন; তা না হলে এমনটি বলবেন কেন? এখনো তা রক্তের ভেতর একেবারে লেপ্টে আছে। তার এ স্বল্পায়ু জীবনের ঋণ যেন শুধু একদলা রক্তের জন্যই। হাসপাতালের সামনের লোকগুলির কণ্ঠ এভাবে বদলে গেল কী করে; রক্তের ঝাঁজ কী সেখানে লাগল? এরা এত নিচুস্বরে কথা বলে যেন কথার শরীরসমূহ থেকে অনবরত ঘাম ঝরছে। না কি কফিনের গন্ধ মিশে গেল! বৃদ্ধটি কী কোনো যন্ত্রণা বয়ে বেড়ায়; রোজ কেয়ামতের কোনো আলামত লেগে নেই তো আবার। ইমাম সাহেবের অত ফিসফিসানিতে একই কথা বেরয়-জীবিতের সঙ্গে মৃতের কোনো সম্পর্ক নেই। রাব্বুল আলামীনের দান কার জীবনটাই আসল।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো সেই হিসেব করতেই তাদের যাবতীয় শক্তি ক্ষয় করতে উদ্যত এখন_ জীবিতের থেকে মৃতের এমনকি দূরত্ব; ৪০ কদম না হয় এক চিক্কুর? দুনিয়া তো ধরতে গেলে আসা আর যাওয়ার ব্যাপার; ঘাটে ঘাটে কেবলই স্নেহ মমতা প্রেম পীরিতির বাঁধনে আটকা পড়া। এখানে অত মমতা কি করে রাখে স্টেশন মাস্টারের ছেলেটা। এ জগতের সঙ্গে তার কোন কিসিমের উল্টাসিধা লেনদেন? হাসপাতালে শায়িত বাচ্চাটি সবাইকে কি দেখছে। নড়তে দিচ্ছে না আর যেন তাদেরই সমুদয় স্মৃতির বাহন হয়ে থাকে। তার কথা এভাবে খোদাই করছে তাতে তাদের হাড়ের ভিতর সেই তেজ নাড়া দিচ্ছে। যেভাবে ডাক্তারের শরীর নড়ছে তাতে ভূমিকম্প বলে ধরার আগেই নিজের ক্লান্তির কথাই মনে এল। একি বাচ্চাটার জন্মান্তরের কোনো লীলাকীর্তন! ১০৫ বছরের ঘোলাচোখের বৃদ্ধের মনে হয় তার তো আর কিছু নেয়ার নেই; এখনকার এই বিস্ময়টুকু ছাড়া। তার অনুশোচনা হতে পারে ওর বয়সটার জন্যই। মাপজোখ করা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বেরয় বুক ছিঁড়ে। ৩৩ বছর পূর্বেকার সেই যুদ্ধের বছরের গন্ধটুকুই ঠেলেঠুলে আবার বেরয়।

বাচ্চাটি কি টাসকি ছড়ানোর জামিনদারিই নিল? নিজেকে অদৃশ্যের ভিতর রেখে অনেক জন্মের ভিতরই নিজের চলাচলতি জারি রাখে শিশুটি। কাজলা গ্রামের লোকগুলো ধারণা নিতে গিয়ে ভয় পায় যে তারা যেন একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সময়টাই সত্য শুধু স্থান আলাদা। কিন্তু এমন বিশ্বাসের ভিতর হাসপাতালের সামনের কাজলাবাসী নিজেদেরকে রাখতে পারে না। বিকালের জং ধরা রোদকে নাড়িয়ে হঠাৎই চিৎকারটি আসে। চিৎকারটি দেয় প্রসূতি বিভাগের আয়া বিলকিস বানু- স্যার গো, হের বাপ মা কোনহানে চাইপ্যে গেল? একটা পুক্অদি নাই! সকলের ভিতর আরো এক নীরবতা নামে। যেন শুধু শিশুটির প্রাচীনত্বসহ জেগে আছে এখানে। শিশুর মালিকানা তখন রাষ্ট্রের উপর পড়তে থাকে। খাকি রং গন্ধ আসে সবখানে। আবার পুলিশের ঝামেলাই পড়তে হয় কিনা? ক্রমান্বয়ে ভিড় পাতলা হতে থাকে। বিকাল অবশেষে খাকি রঙ বিলায়। ছামেদ ব্যাপারির এখনকার স্মুতিকে টেক্কা দেয়ার জন্যই হয়ত ৭১’র যুদ্ধের বছরে এ কর্নেলের সঙ্গে একই সেক্টরে যুদ্ধ করা আব্দুল হক আরো স্মুতির ভিতর এদেরকে ঠেসে ধরে। এমন স্মৃতির ভারে তারা রীতিমতন হাঁপায়। কারণ সেই স্মৃতিটা এখন থেকে কমসে কম ৩৩ বছরের পুরনো হলেও তা এক্কেবারে স্পষ্ট। সেই সময়েই তাদের এ কর্নেল পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে আর্মি অফিসার হিসেবে তার নামটি লেখায়। হাসু, জহির, মোতালেবও বেজায় মুশকিলে পড়ে। এমনকি মাস্টারের ছেলে যেদিন ঢাকা হয়ে উড়োজাহাজে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য এক্কেবারে রেডি হয় তখনই তারা তাকে নালিশের মতো করে জানাতে থাকে- তর মনে যুদি অত শয়তানি বুদ্ধি আছিলো, তো অইলে লাট সাবের লাগান অত লাম্বাচুরা বক্তিতা দিছিলো কেরে? এই তর দেশ সাদীনের কিসিম? তখনই স্টেশন মাস্টারের ছেলেটি পেটের ভেতরের কথা বলে, মনে কর এইডাও যুদ্ধের আয়োজন। -কেমনে? – ট্রেনিংডা কি খালি আমার থাকবো; তামাম কাজলার ভিত্রে ঢুকাইয়া দেম; দেহিছ তরা।

পাঞ্জাবি, বেলুচ আর পাঠানদের কাতারে নাম উঠানো কী যা তা আলাপ? সে একদিন ট্রেনিংও শেষ করল। কিন্তু তারপরও কি তার একরতি শান্তি আছে? ছুটিতে এসেই যেভাবে ডামি দিয়ে জোয়ান ছেলেদের ট্রেনিং দেয়ানো শুরু করে তাতে আইয়ুব খানের হাতে গড়া, ঢাকা রাওয়ালপিন্ডির খাসির রান খাওয়া মেম্বাররাও ঝামেলার ভিতর থাকে। তারপর তো একসময় শালার আইয়ুব খানও গেল। বিপদ তা হলে চেয়ারম্যান মেম্বারদের বেশি দূরে নাই!

ইলেকশনও হয়ে গেল অবশেষে। তা হলে এখন বাঙালিকে গদিটা দিয়ে দিলেই চলে। কিন্তু তা যে হচ্ছেই না। সেই কেরামতির অপেক্ষাই ছিল কাজলাবাসীর। শেখের বেটাকে কেন রাজা বানাচ্ছে না শালার পাঞ্জাবিরা। রাজা বানিয়ে দিলেই তো সব ঝামেলা শেষ হয়ে যেত। নৌকা মার্কা তো পাসই করল। কাজলাবাসী একবারেই বুঝতে পারে না, এ কেমন কেয়ামত শুরু হল দেশটাতে। ঢাকা শহরেই নাকি হাজার হাজার মানুষ মারছে। মেয়েমানুষের ইজ্জত নিয়ে পর্যন্ত ইতরামি শুরু করেছে। সারা শহরে খালি নাকি কার্ফ্যু আর মানুষের পঁচাগন্ধ লাশ ছাড়া কিচ্ছু নাই। কাজলার কতিবুদ্দীর বড়োছেলেটা তার একপাল বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছে। রহিম মিয়ার মেয়ের জামাইটা রাজশাহী থেকে তার মেয়েটাকে নিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে বসে আছে। গ্রামের কামলা কিষাণ এমন গবেষণাই মনোযোগ দেয় যে, যত সুখ আল্লাই লিখেছে তা ঐ চাকরীজীবীদের কপালেই। এই যে মিলিটারির দৌঁড়ানি খেয়ে গৈ গেরামে ঠাঁই নিল, দেশটা একটু ঠাণ্ডা হলেই তো সব ঠিকঠাক করে ফেলবে এরা। শেখের বেটা যে কোথায় কী করছে? যুদ্ধের একটা ডাক দিলেও তো পারে। মানুষের এমনই আলাপের ভিতর শহর-গঞ্জ থেকে কাতারে কাতারে মানুষ আসা ছাড়া কিচ্ছুই হয়না। তখনই রইছালীর ছেলে ফরিদ মিয়া আর মনোতোষের ভাইপো শ্রীধাম এমনই আশার মাঝে ফিরে আসবে। কারণ ৫/৬ দিন আগেও সেই নাকি জয়পুরহাট ক্যান্টনম্যান্ট দিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছে যুদ্ধ ছাড়া আর বোধ হায় বাঁচার কোনো রাস্তা নাই। কারণ তার পাঞ্জাবি সঙ্গীসাথী অনেকেই নাকি ঢাকার হেলিকপ্টারে উঠা শুরু করেছে, তারা ঢাকা বিমান বন্দরে নামা শুরু করেছে। এ অবস্থায় তাদের মাস্টারের ছেলেটা কি বেহুদাই বসে থাকবে পশ্চিম পাকিস্তানে?

অবশেষে ছমেদ ব্যাপারির মাধ্যমে এ খবরটিও রটে যায় যে, তাদের কাজলার এ ছেলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথাতেই অবশেষে ইন্ডিয়া হয়ে অলরেডি যদ্ধে জয়েন করে ফেলেছে। এখন বান্দির বাচ্চা পাঞ্জাবিরা যাবে কোথায়? একটা ফায়ার মিস হবে তার? কলজে সই করে করে সমানে গুলি করার সংবাদ আসতে আর কদিন। তার সঙ্গে এরি মধ্যে অন্তত ১০টা জোয়ান তাগড়া ছেলে ঐ সেক্টরে যুদ্ধে জয়েন করেছে। এমনই এক সিদ্ধান্তে কাজলা নামের গ্রামটি পৌঁছে যায় যে, তাদের তামাম বালা মুসিবত আর উজান ভাটির খেলা চলবে, তার সব দায়িত্বই তাদের মাস্টারের বেটার।

এমনই আশ্চর্যের কাণ্ডকীর্তি, যুদ্ধের এ নেতা নাকি লুঙ্গি গামছা পড়েই তাদের চিফ বসের সঙ্গে রক্তারক্তি তর্ক করে ফেলেন। এমনই এক জলজ্রান্ত সাক্ষাতের বিবরণ অতঃপর সারা কাজলায় ঘুরপাক খায়। চিফ বস কথা বলেন এভাবে- হ্যালো মিস্টার, তোমার এ ড্রেস কেন? কথা কয়টি যেন তাবু ফেটে বাইরেও আছড়ে পড়ে। তাদের মাস্টারের ছেলে সেই সেক্টর কমান্ডার কথা বলতেই গিয়েই গলার আরো এক হিসহিসে ভয় পায়। কথাটকে আবার গুছিয়ে নেয়ার তাগদেই ফের গলাখাঁকারি দেয়- কী রকম স্যার?- এমন ড্রেস পড়ার মানেটা কী?- না মানে স্যার এটা তো কনভেনশনাল ওয়ার নয়। এটা স্যার..। সেক্টর কমান্ডারের এ কথাসমূহ অতঃপর চিফ বসের সোজাসাপ্টা কথার তেজে পড়ে থেঁৎলে যেতে থাকে- এ সব ভরং বাদ দাও। আমি সব খবরই পাই। আর্মির ডিসিপ্লিন একবারে ভুলে গেলে? চেইন অব কমান্ড ভেঙে কেউ পার পাবে?- তবুও স্যার…। -প্লিজ, স্টপ ইট ফরএভার। ঠিক আছে তুমি চাইলে তোমার সমস্ত রিপোর্টই হাইয়ার অথোরিটির কাছে ফরওয়ার্ড করে দিবো। তারপর যা বোঝার তুমিই বুঝবে। -ও.কে.? যুদ্ধের চিফ বস এ সবের পরই কেবল টিস্যু পেপার দিয়ে বাড়তি ঘাম মুছতে থাকেন।

তারও বেশ পরে কামালপুরে পাঞ্জবিদের সঙ্গে সেক্টর কমান্ডের বাহিনীর তুমূল যুদ্ধের খবরটি আসে কাজলাতে। তাদের এ যোদ্ধার ডান পাটি নাকি অনেকটাই উড়ে গেছে সেদিনের যুদ্ধে। একসময় এ খবরও পাকাপোক্ত হয়েই আসে, তার পাটি নাকি আর রাখার কোনো সম্ভাবনাই নাই। আসামের গোহাটিতে তার চিকিৎসা চলে। ইন্দিরা গান্ধি নিজে তাকে দেখতে আসেন। কিন্তু তাদের যোদ্ধাটির আর বোধহয় যুদ্ধ করা হবে না। এভাবেই একসময় যুদ্ধও শেষ হয়। তবে কাজলার অনেকের ভিতর আবারো অচানক এক মতিছাড়া ভাব টের পায়। কারণ যুবক বয়সের অনেকেই অস্ত্র তো জমা দেয়ই না; এমনকি তার অবুঝের মতো বলতে থাকে যে, তাদের যুদ্ধ নাকি এখনো শেষ হয়নি। তার এও বলে- কিয়ের বালের যুদ্ধ করলাম, কষ্টই ত ছুটে না। যারফলে অন্য কিসিমের যুদ্ধের সম্ভাবনা আরো বহুগুণ ওজন নিয়ে ছড়াতে থাকে; কারণ ততদিনে কর্নেলের প্রমোশন পাওয়া তাদের যোদ্ধাটি কানে কানে শোনায় যে, এখনকার এ যুদ্ধই আসল যুদ্ধ, কী আশ্চর্য কথা! এত বড় পাষাণের মতো পাঞ্জাবিদের হারানোর পর আর কোন যুদ্ধ থাকে?

মইজালী বন্ধ গেটটাতে ধাক্কা খাওয়ার আগে খেয়ালই করতে পারেনি এটি আসলে বন্ধ। গেটম্যান তার খোলাশরীরের ঘাড়টাতে ধাক্কা দিয়ে সেই কথাটাই মনে করিয়ে দেয়- হালায় বুদায়, গেট যে বন্ধ হেইডাও বুঝে না; খোলা বুঝে না। এখন তাকে ভাবতে হয়, তাহলে এদ্দূর সে এল কি করে? শেষরাতের সেই তেন্দরমার্কা খোয়াবটাই এ কাজটা করল! গেটম্যান আবারো বলা শুরু করে শালার রাতগুলোর এখন চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে, খালি খোয়াবে ভর্তি হয়ে থাকে। শেখ তজিবুদ্দীনর আপন ভাগ্নে এখন স্পেশাল পাহাড়া বসাবে সারাটা রাতজুড়ে। কাজলার কোনো হারামজাদা যেন উল্টাপাল্টা রাতের বেলায় খোয়াব না দেখে। এ সবের পিছনেও নিজ ফর্মুলাই যুদ্ধ করা কর্নেলের হাত আছে নিশ্চয়। এখন গেটম্যানের লাঠির গুঁতা খেয়ে মইজালী সেই কথাটাই ভাবছে- রইছুদ্দী ভায়ের কথাটাই ঠিক, শেখ বাড়ির গেটের সামনের অংশ বন্ধই থাকে। কেবল শেখ তজিবুদ্দী তার দরবারে বসার টাইমে এক ঝিলিক খোলে। আসলে পিছনের দরজাই নাকি চারটা দারোয়ান ২৪টা ঘণ্টা একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এতক্ষণ জীবনের ভাব-নমুনা সব ঐ পথেই চলে।

কর্নেলের সঙ্গের অনেকেই বলাবলি করে যে, কাজলার উপরে এক বদজ্বিন আছর করছে। কী ঝামেলাই পড়ল কাজলা। মানুষজন যতকিছু বেতাল আয় রুজগার করে, এসব কিছুর উপরই নাকি কার না কার হক আছে! এমনকি জাগতিক ভাবনা জাতীয়করণের একটা তদ্বির চলে চৌদিকে। কাজলার মসজিদের ইমাম যখন এশার জামাতের পর নিজের মাথায় কোরান নিয়ে কিরা কসম কাটে যে, যে যত বদনামই দিক, গত বছর দেড়েক ধরে কুদরতি রোশনাই পড়েছে দেশটার উপর। যার ফলে এর আরো আয় উন্নতি বাড়বেই ইনশাল্লাহ।

একসময় কাজলাবাসীর সামনে জলজ্যান্ত কর্নেল উপস্থিত হলে তারা নতুন ভাব-চক্করে পড়ে। অনেকেই আচার বিচারের আন্ধা চক্করে বৈষম্য মুছনের তাগিদ অনুভব করে। কিন্তু তাদের চোখের সামনে ভাসতে থাকে, কর্নেলের ডান পাটি সত্যিই উরুর উপর থেকে সমূলে নাই। পায়ের কোন অংশ থেকে যেন মরা রক্তের স্যাঁতস্যাঁতে বদগন্ধ টের পায় এরা। সেই গন্ধ থেকে বাঁচার তাগিদে অনেকেই নাকে মুখে লুঙ্গি চেপে ধরে। এখন অনেকের ভিতরই যুদ্ধের স্মৃতি জেগে ওঠে। এরই ভিতর জয়নালের মাটা কুই কুই করে কাঁদতে থাকে। এখনো অনেকের ভিতরই এটা অতি স্পষ্ট যে, এ জয়নাল তাদের কর্নেলের সঙ্গেই কামালপুরের সেই যুদ্ধে বুকে চার চারটি তাজা গুলি খেয়ে সাথে সাথেই মরে যায়। তাকে ওরা কবরও দিতে পারে নি। কারণ তার আগেই পাঞ্জাবিরা তাকে প্রকাশ্যে হাটে শ শ মানুষের সামনে বটগাছে দিনেদুপুরে লাশ টাঙ্গিয়ে নিচে থেকে আগুন জ্বালিয়ে কয়লা বানিয়ে ফেলে। অনেকেই এতদিন পর আবারো ব্যাকুলতায় পড়ে। এবং এ ব্যাকুলতার প্রত্যক্ষ চাপে ঝুরঝুরে কান্নায় কাজলাকে ক্রমাগত ভারি করে তোলে। কর্নেল বেতাল মনোতৃষ্ণার ভিতর লক্ষ করতে থাকেন, আসলে কাজলাতে একজনকেও পাওয়া যাচ্ছে না যাদের ভিতর কোনো না কোনো কান্না নাই! একসময় কর্নেল আবারো নতুন যুদ্ধের ভিতর তাদেরকে রাখতে চেয়ে জলখেলির কোলঘেঁষে কোথায় না জানি অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর কেবলই অন্ধকারে নিজেকে প্রকাশ করে। একসময় কর্নেল মাঠের দিকে হাঁটা দেয়। এমনকি দিনের বেলায় কাশেমালীর ছেলে খুকখুক করে কাশে। এখন কথা শুরু করার আগে নিরব হাসি ঘামে ভেজাশরীরে ঝরে ঝরে পড়ে। বসা থেকে উঠতে উঠতে সে বলে-ভাইজান, ইতান কী করুইন-গো! কর্নেল লাঙলের হাতলে ডান হাতের পাঁচটি আঙুল রেখেই বলতে থাকে- অরে পাগলের দল, হাতে কলমে শিক্ষা না নিলে কীয়ের বিপ্লব? বাঁ হাতে লাঙলের হাতলটি ধরে ডান হাতে গরু দুটির পিঠ বরাবর বাড়ি মারলেই এরা হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। কর্নেলকে ডানপাশ থেকে রইছালী না ধরলে ঝুপ করে ক্ষেতেই তিনি পড়ে যেতেন। ক্ষেতের উপর ক্র্যাচের মাথার একটা গোলাকৃতি দাগ বসে যায়। কাজলার কিষাণদের ভিতর এ গবেষণাই চলে কিছুদিন। তাদের মাথার ভিতর বহুমুখী ভাবনা গজায়-

তাইনেরার অইলো গিয়া সাইন্সের মাথা; দেখবা এ চাষে কি ফসিলডা ফলে।

আরে দুরু, মাস্টারের পুলাডা অক্করে পাগল অইয়া গেছে।

আরে খুঁজ লইয়া দেহ, ইন্ডিয়ান হাসপাতালে থাহনের টাইমে শালার তাইনের শইল্যে মালাউনরা পয়জন ঢুহাইয়া দিলো কিনা?

কিয়ো কনু ভাই, রেজাকাররার লাগান আবক্তালী বহ দি; হাহাহা!

জ্বিন-পরীরে পিছা মারছেনি দেহো।

এরাই যহন দেশটা সাদীন করছে, দেকবা কত চেডের চিনেমা দেহাইবো।

এমন বহুমাত্রিক কথা বলতে থাকা ছয়জন সেই ৩৩ বছর পর কাজলা হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়। তারা আরো আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করে এ শিশুটি বুকের বাঁ পাশটাতে গোলাকৃতি একটা গভীর ক্ষত বসে আছে। ভেজা ধুলামাটির মতোই তা ফ্যাকাসে। কাজলার মাঠের সেই চিহ্ন শিশুটির শরীরেও দেখে টের পায় কর্নেলের সেই ফেলে যাওয়া জীবন থেকে তারা বের হতে পারবে না।

একসময় এমন খবরও কাজলায় আসে যে, কর্নেল চাকুরি ছেড়ে দিয়ে আবারও এক যুদ্ধের ভিতর নিজেকে ষোলআনা সঁপে দিয়েছে। এমনকি এ গ্রামের কেউ কেউ অস্ত্রপাতিসহ আবারো রাতবিরাতে সারা কাজলা চষে বেড়ায়। এ দলটি গায়ে গতরে অতি অল্প সময়ে কুমারীর স্তনের মতোই বাড়তে থাকে। কোথায় কোথায় নাকি সামনে ডাকাতি হচ্ছে। বড়োলোকের গলাও কাটা শুরু হয়ে গেছে। গরিব ধনী একলাইনে আনার এ কেমন তেলেসমাতি শুরু হলো? কী ঘটছে তবে দেশটায়! সময়ের ধারাবাহিকতায় শেখ সা’বকে মেরে ফেলার পর জেলখানার ভিতর কয়েকজন নেতাকে আন্ধাগুন্ধা গুলি করে কারা নাকি মেরে ফেলেছে!

কাজলার অনেকেই তাদের লালিত ভাবনার সাথে এ ভাবনা মিলাতে পারে না। কেবলই অসুখে পড়া মুরগীর মতোই ঝিমুতে থাকে তারা। তবে এমন পরিবর্তনের পরও খুব বেশিদিন কাজলার মানুষজন আলাদা ভাবনার ভিতর থাকতে পারে না। তাদের কর্নেল আবারো কাজলাকে ব্যাপক পরিবর্তনের ভিতর রাখতে পারবে বলে মনে হয়। তারা অনেকেই আশ্চর্য হয়ে একসময় শোনে, দেশের মিলিটারি স্যারকে নজরবন্দি থেকে উদ্ধার করে তাদের কর্নেল। যুদ্ধের সেই সাথী কাজলার কর্নেলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বরেন যে-থ্যাংয়ু কমরেড, ইউ হেভ সেভ্ড্ মাই লাইফ।

কাজলাবাসী আন্ধাগুন্ধা এক জোছনায় নিজেদের ভেজানো স্টার্ট করে। তাদের ভাবচেতনাই আবারো উল্টো গিঁট পড়ে। এ খবরটি কাজলায় আসতে খুব বেশি সময় লাগে না যে, তাদের কর্নেলকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বন্দি করা হয়েছে। একদিন এ খবরও আসে, নির্জন সেলে তাকে বেশিদিন রাখা হয়নি। কর্নেলের নিজ জীবনের বাণী ঘুরপাক খায় তামাম কাজলাতে। তার ফাঁসি হয়ে যায় অতি দ্রুতই। ভয় লাগা ঠাণ্ডার ভিতর হেলিকপ্টার করেই একসময লাশ এসে কাজলাতে পৌঁছায়। তাদের কর্নেলের বউ তিনমাইল হেঁটে কাজলায় আসেন। এখন তারা রীতিমতো ভুলে যায়, কী করে এমন এক বউয়ের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তাদের অনেকেই এমন ভয় পায় যে, সেই ভয়ের তাপে বারবার নিজেদের গলাতে হাত বুলায়। এখন অনেকেই গলায় মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে রীতিতো আঁতকে ওঠে। অতঃপর নোনতা জলের জমাট গন্ধ ছাড়া আর কিছু তারা টের পায় না। লালচে চাঁদের ভিতর পউষের শীতের মতোই হিহি করে কাঁপাতে থাকে তারা।

কাজলাকে আবারো চমকে উঠতে হয়, কারণ দেখা যায় যে, কর্নেলকে চূড়ান্ত বিচারে শায়েস্তা করার পরও বিচার শেষ হয় না। জলপাই শাসনের জামিনদারিতে পড়ে যায় সেই কবর। ক্রমাগত ২১ দিনে সেই এক আন্ধার থাকে। সেদিন রাতের শেষ প্রহরটাও ফুরাতে চায় না। কাজলার নির্জন শরীরে লালচে সর জমতে থাকে। ঘিনঘিনে একটা ছায়া গ্রাম থেকে দূরই হয় না। হলুদ ফ্যাকাসে আলো বেরয মরা-জোছনা থেকে। মরামানুষের গন্ধ ওঠে আসে এ সবের ভিতর থেকে। কাজলার অনেকেই অসহায়তার ভিতর শিরশির তাপে কাঁপে। ঘাম যেন কাজলার শরীর থেকেই ফেটে ফেটে বেরোতে থাকে। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন, আবারো… এভাবেই সময় ঘুরপাক খায়। তাদের কর্নেল বুটের ভারে নানাবিধ জন্ম কিংবা মৃত্যুর ভারে ক্রমাগত থেঁতলে যাচ্ছেন।


(জুন ২০০২)



লেখক পরিচিতি : 
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

তাঁর জন্ম ১৯৬৩-এ, মামাবাড়িতে। কিশোরগঞ্জস্থ বাজিতপুর থানার সরিষাপুর গ্রামে শৈশব- কৈশোর, যৌবনের প্রাথমিক পর্যায় কাটান তিনি। স্কুল-কলেজের পড়াশোনা করেছেন গ্রাম ও

গ্রামঘেঁষা শহরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একাডেমিক পড়াশুনা করেন চট্টগ্রামে। লেখাজোখা তাঁর কাছে অফুরন্ত এক জীবনপ্রবাহের নাম। মানুষের অন্তর্জগতে একধরনের প্রগতিশীল বোধ তৈরিতে তাঁর আকাক্সক্ষা লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন জায়গায়--ছোট বা বড়োকাগজে তিনি লিখে যাচ্ছেন।

কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ কথা’র সম্পাদক। কথা সম্পাদনার জন্য তাকে ‘লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরষ্কার ২০১১’ প্রদান করা হয়।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ -- মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (জাগৃতি প্রকাশনী), স্বপ্নবাজি (ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ), কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প (শুদ্ধস্বর)

উপন্যাস-- পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী ’(মাওলা ব্রাদার্স),

প্রবন্ধগ্রন্থ-- উপন্যাসের বিনির্মাণ, উপন্যাসের জাদু (জোনাকী)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন