সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সাথে নূর কামরুন্নাহারের কথাবার্তা


Kamruzzaman Jahangir

কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের জীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হল। এই উপলক্ষ্যে কথাশিল্পী নূর কামরুন্নাহার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাশিল্পী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের *
---------------------------------------------------------

৫০ বছর পূর্ণ করার অভিজ্ঞতা কেমন_ মানে আপনার অনুভূতি জানতে চাইছি।
--
এটা ভালোই তো। ফেসবুক, সেলফোন ইত্যাদির ফলে জন্মদিন কিন্তু আলাদা এক মর্যাদা পেয়েছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, গ্রামেই আমার জন্ম, বিশুদ্ধ গ্রাম বলতে যা বোঝাই আর-কি, তখন জন্মদিন বিষয়টাই সেভাবে জানতাম না। এ কালচার এখন খারাপ লাগে না। আর ৫০ বছর জীবনের এক চিহ্ন বটে!

মৃত্যু নিয়েও কি ভাবেন?
--
এটা ভাবতে হয় না; কারণ এটা তো আমাদের নিত্যসহযাত্রী। তবে কোনো কোনো মৃত্যু আমায় দারুণ বিহ্বল, এমনকি সংকুচিত করে। আবার মনে হয়, আমিই থাকব না, আর সারাটা দুনিয়া এভাবেই চলবে, ভাবলে অবাক লাগে। মৃত্যু তো আসবেই, একে উদ্ভাসিত করা দরকার। মহিমান্বিত করা যায় কিনা তাও দেখা যেতে পারে।

এবার তো আপনি কথার জন্য লিটলম্যাগ পুরস্কার পেলেন_ অনুষ্ঠানটাও আমি দেখলাম। আপনার অনূভূতি জানতে চাই।
--
তাও ভালো লাগছে; কারণ এটি যেন আমাদের নিজস্ব একটা ব্যাপার। 'লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ' তো আমাদেরই একটা জায়গা। তবে আমি চেষ্টা করি, একধরনের সততার ভিতর থাকতে, এর ভিতর দিয়ে কথাশিল্পের জন্য নতুন কিছু করতে। পুরস্কার পাওয়াতে দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল মনে হয়।

আপনি কথার সম্পাদক_ 'কথা' কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ। এধরনের একটি ছোটকাগজ সম্পাদনায় আপনি কেন নিবেদিত হলেন?
--
আসলে কোনো লিটলম্যাগ বার করার পিছনে নিবেদনের কোনো ব্যাপারই থাকে না। এটি একটি আয়োজন, একটা লড়াই-সংগ্রামও বটে। আমি তো প্রায়ই বলি বা স্মরণে রাখি যে, একটা ছোটকাগজ মানেই আধাসের প্রবন্ধ, একমুঠ কাব্য আর তিন আঙুলের প্রথম ভাঁজের সমান গল্প সংগ্রহ করে একটা সাহিত্য পত্রিকা বার করা নয়। তা একধরনের অ্যারেঞ্জমেন্ট বহন করে। সুবিমল মিশ্র বলেন, ছোটটকাগজ আন্দোলন একটা টোটাল ব্যাপার, আমি বলি এটি নিজেকে প্রতিমুহূর্তে লড়াই-সংগ্রামে জড়িয়ে রাখার, নিজেকে শুদ্ধ করার একটা ওয়ার্কশপ।
আমরা যখন এটি বার করার চিন্তাভাবনা করি, তখন মার্কসীয় নান্দনিকতাই মুখ্য বিষয় ছিল, এখনও অনেকটাই তাই আছে, তবে এতে মার্কসিজমের গণতন্ত্রায়ণ, মানবসত্তার তুমুল বিকাশ, যৌনতার মুক্তি ইত্যাদি নিয়ে নানামুখি ভাবনা আমার আছে।

আপনার কি মনে হয় কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ আরো প্রয়োজন।
--
অবশ্যই। প্রতিদিন কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ বের হোক, আমার কিন্তু সেটাই ইচ্ছা। আমি যখন কথা বার করি তখন কামাল বিন মাহতাবের ছোটগল্প, হাসান আজিজুল হকের প্রাকৃত, রবিউল করিম-এর ব্যাসই ছিল। এখন কিন্তু কথাসাহিত্যভিত্তিক অনেক কাগজই চোখে পড়ে, বদরুন নাহারের শূন্যপুরাণ, পাপড়ি রহমানের ধূলিচিত্র, জেসমিন মুন্নীর দ্রাঘিমা ইদানিং মাসউদ আহমাদ বার করছে গল্পপত্র, চন্দন আনোয়ার বার করছেন গল্পকথা, আর আপনি তো এর প্রক্রিয়ার ভিতর আছেন?
হ্যাঁ, আমি অনেকদিন ধরেই গল্পকথা নামে...
--
আচ্ছা, এই নামে তো রাজশাহীর চন্দন আনোয়ার অলরেডি একটা ছোটকাগজ বের করেছে।
তাই নাকি, কিন্তু আমি তো এই নামে একটা কাগজ করব বলে পরিকল্পনা করছি...
--
তবে এখানে মুশকিল হচ্ছে, ও যেহেতু আগেই করে ফেলেছে, তা কিন্তু... আপনি অন্য নামেও তা বের করতে পারেন। যাই হোক, নতুন নতুন কাগজ আসা মানেই নতুন অনেক ভাবনার সমাহার ঘটে যাওয়া। আগেই আমি বলেছি এতে আমার শুদ্ধতা অর্জিত হয়। আমরা যখন কথা বার করার কথা ভাবছি, সেই ২০০৩ সালের গোড়ার কথা, তখন নানান নাম আমাদের জাগিয়ে রাখত, যেমন কথাসূত্র, কথামৃত, কথাসমূহ, কথাশিল্প, কথন, কথাসরিৎসাগর, এমনকি গল্পকার আহমেদ মুনির বলেছিল জগদীশ গুপ্ত রাখার জন্য। নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীর শাহেরজাদ নামটি...
শাহেরজাদ?
--
হ্যাঁ, আরব্য রজনীর শাহেরজাদ, যে প্রতিরাতে কথাসৃজনে মত্ত থাকত, নিজেকে গল্পের মাধ্যমে সাজাতো, জাগিয়ে বাঁচিয়ে রাখত। তাতে বাদশাজাদার চিন্তার মৌলিকত্বে পরিবর্তন এল। শাহেরজাদ নিজেকে বাঁচালো, দেশের মানুষকে বাঁচালো, প্রতিদিন নবতর সত্তার উন্মেষ ঘটাল। এমন পটেনিশিয়েল গল্পকার কিন্তু আর নেই। আপনি চাইলে এ নামটিও রাখতে পারেন।

আপনি বা যারা ছোটকাগজের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলন বলে মনে করেন তাদের কাছে কি মনে হচ্ছে ছোটকাগজ তার চরিত্রটি ঠিক ভাবে ধরে রাখছে? --হাহাহা, আপনাকে কখনও কি বলেছি যে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী? আর একটা ছোটকাগজকে তো ওজু করিয়ে পাক-পবিত্র রাখার কিছু নেই। প্রতিপলে তার অন্তর্জগতে সৃষ্টিশীলতা চলতে, নিজেকে ভেঙে ফের গড়বে; নিত্য আবিষ্কারের একটা বিষয় তো এর আছে!
না, মানে...
--
শুনুন, প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আমার বা আমরা যারা কথার সাথে যুক্ত, তাদের কিন্তু নানামুখী ভাবনা আছে। আমরা প্রতিষ্ঠানকে চিনে রাখতে চাই, একে মোকাবেলা করতে চাই, এমনকি ব্যবহারও করতে চাই। এই যে আপনার সাথে ফোন, ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে একধরনের রিলেশন তৈরি করছি, তা কি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যারেঞ্জমেন্টের বাইরের কিছু? এই যে আমি পড়াশুনা করলাম, কথা বলছি, তা কি প্রাষ্ঠিানিকতার বাইরের ব্যাপার? তবে আমরা প্রতিষ্ঠানকে বদলাতে চাই। নিজের সাথে, ফ্যামিলির সাথে, সমাজ-ধর্ম-রাষ্ট্রের সাথে প্রতিনিয়ত আমাদের একটা দ্বন্দ্বমুখর সম্পর্ক কিন্তু আছে। এবং তা থাকবে। আর ছোটকাগজের চরিত্রের কি যেন বললেন...
ছোটকাগজ তার চরিত্রটি ধরে রাখতে পারছেন কিনা?
--
কী ধরনের চরিত্রবৈশিষ্ঠ্য আপনি কামনা করছেন?

মানে, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ব্যাপারটা...
--
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি ছোটকাগজ শুধু প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা দ্বারা গঠিত নয়। আমি মনে করি একটা ছোটকাগজের চরিত্র হচ্ছে এর টোটাল অ্যারেঞ্জমেন্টটাই; এর লেখালেখি, লেখকদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, আকাক্সক্ষা, কাগজটির ভিতরকার চেহারা_ এর প্রচ্ছদ, গেটাপ-মেকাপ, সম্পাদকীয়, টোটাল এটিচিউডই বলে দিবে ছোটকাগজটির কাজ কি? মতাদর্শ জারি করে, ইশতেহার দিয়ে-টিয়ে কিছু করার নেই। কারণ ছোটকাগজ কোনো ওহি নাজিলে আস্থা রাখে বলে মনে হয় না। ছোটকাগজটি তার কাজের ভিতর দিয়েই একটি নান্দনিকতাকে বহন করে।

প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে আপনার তো আর প্রতিষ্ঠানিক অঙ্গনেও হারহামেশাই লিখছেন? এ বিষয়টি কি স্ববিরোধিতা নয়!
--
এর উত্তর ইতিমধ্যে দেয়া হয়ে গেছে। দেখুন, প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত লেখকগণ সারাজীবনই ফেস করতে বাধ্য হন। আমি প্রতিষ্ঠানকে সেইটুকুই ব্যবহার করতে চাই, যেইটুকু আমার আকাংক্ষাকে বহন করতে পারে। আসলে আমাদের চারপাশে গড়পরতা তিনধরনের লিটলম্যাগ দেখবেন। ১. যারা শিল্পসংস্কৃতিকে একটা লড়াই-সংগ্রাম মনে করে তাদের সত্তার বিকাশ ঘটান, প্রতিষ্ঠানকেও তার চেতনাসাপেক্ষে ব্যবহার করেন। আমি এই ধারাটিকে লাইক করি। নিসর্গ, চারবাক, যোগাযোগ, লোক, শালুক, ময়মনসিংহ জং, খেয়া, পর্ব, নন্দন, সূনৃত, ঘুড়ি, খড়িমাটি, পত্তর, তৃণমূল, ব্যাস, কথা ইত্যাদি এই ধারার কাগজ। ২. নানাবিধ প্রতিষ্ঠানকে তো তারা ফেস করেনই, আবার সাময়িকীকে কার্যত প্রধান শত্রু মনে করেন। এদেরকে আমি ছোটকাগজের গেরিলাধারা বলতেই পছন্দ করি হাহাহা,_ প্রতিশিল্প, চালচিত্র, জঙশন, ওপেন টেক্সট, দ্রষ্টব্য, গাণ্ডিব, লিরিক, অনিন্দ্য ইত্যাদি এই ধারার ছোটকাগজ। ৩. ছোটকাগজের আরেকটা ধারা আছে, তিনাদেরকে আমি মইবাদী ধারাবলতে চাই, কারণ তিনারা তিনাদের কাগজের মাধ্যমে উপরে উঠার, নিজেকে জাহির করার মই হিসাবেই ব্যবহার করছেন।

প্রকৃতপক্ষে ছোটকাগজের যারা আন্দোলন করছে বা শুদ্ধ সাহিত্যের কথা বলছে তারাওতো বিভিন্নভাবে নির্দিষ্ট একটা লেখক গোষ্ঠী বা গ্রপকেই প্রেট্টোনাইজ করছে। এটি কি ছোট কাগজের উদ্দেশ্যের সাথে একধরনের বিরোধ নয়? কারণ ছোটকাগজ তো নতুন নতুন লেখক সৃষ্টি করবে_ শুদ্ধ সাহিত্যের চর্চা করবে।
--
দেখুন, ছোটকাগজ কিন্তু আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, রামকৃষ্ণ মিশন বা দরগা শরীফের দানবাক্স নয়, নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়ার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। যে যার মতো যা-তা লিখবে তাও সঠিক নয়। এটি একটি সাহিত্যিক প্রক্রিয়া, এতে প্রকৃত/অপ্রকৃত নির্ণয় করা মুশকিল। যে যার কাজটি নিজেদের শুদ্ধতা, প্রগতিশীলতা দিয়ে করাটাই জরুরি। অনেকেই এটাকে লেখক তৈরির কারখানা মনে করেন, নতুন লেখকদের ঠিকানা মনে করেন। বিষয়টির কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও একটা ছোটকাগজের মূল কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত নিজেকে আবিষ্কার করা এবং লেখক-পাঠকদের সাথে একধরনের সখিতা করে যাওয়া।

এবার আমি আপনার লেখার আসি, আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম গ্রন্থের শিরোনাম গল্পটি নিয়ে কিছু বলেন, এইযে আপনি মৃত এবং রক্তের জগতে স্বাগতম জানাচ্ছেন অথবা রক্ত বা ঐতিহ্য নিয়ে এই যে আপনার রক্তক্ষরণ এটি কি আপনাকে সবসময় তাড়িত করে?
--
আসলে তা নিয়ে বিস্তৃতভাবে বোধ হয় বলার ক্ষেত্র এটি নয়। আমরা তো একটা রক্তাক্ত জনযুদ্ধের মাধ্যমেই একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেলাম। তাতে কিন্তু জনসংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন হলো। মানুষের ভিতর সার্বিক মুক্তির একটা বিষয় একবারে জলজ্যান্ত করে গেল। বাম-প্রগতিশীল আন্দোলনের ব্যাপক বি¯তৃতি ঘটল। মুক্তিযু্দ্ধের ভিতর দিয়ে মানুষের মননে রক্তজ মনস্তাত্ত্বিক যে পরিবর্তনটা ঘটল, তার নিবৃত্তির তেমন ব্যবস্থাই আমরা দেখলাম না। হত্যা, রাহাজানি, লুণ্ঠনবৃত্তির প্রসার ঘটল। মানুষ কিন্তু রক্তাক্ত অবস্থা থেকে, মৃতের অবয়ব থেকে মুক্তি পেল না। মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম নামের গল্পেও দেখবেন একটি মিউজিয়ামের আদলে দেশের এই রক্তাক্ত হত্যামুখর অবস্থাকেই দেখানোর চেষ্টা করেছি।
তার মানে আমাদের নিয়তি শুধু রক্তেই ভরপুর...
--
না তাও নয়, আমার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থের নামই কিন্তু স্বপ্নবাজি।

মৃত/রক্ত ইত্যাদি থেকে স্বপ্নের দিকে কিভাবে এলেন?
--
স্বপ্ন তো শুধু সুখ-সুখ অনুভূতির বিষয় নয়। তবে এখানে মানুষের ভিতর পরিশুদ্ধ নান্দনিকতার বিকাশের বিষয়সমূহ হয়ত আছে। এক মানুষই আসলে অনেক রকম। আর আমরা তো হত্যা, আন্দোলন শুধু নয়, সামরিক শাসন, সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি নানান কিছু দেখছি। এর ভিতর মানুষের জাগরণের স্বপ্নও কিন্তু আছে।

তবে ছায়ার গল্প-এর রানিমাকে আপনি আসলে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
--
এটিকে আপনি সরাসরি বানানো গল্প বলতে পারেন, আমি সাধারণত এ কাজটি করি না। আমার গল্পসমূহের চরিত্র, ঘটনা, পরিবেশ ইত্যাদি সামহাউ আমাদের একেবারে পরিচিত। কিন্তু এ তবে ছায়ার গল্পবলতে পারেন, আমার স্বপ্নগমনের একটি প্রক্রিয়ার অংশ। এটি একজন স্বপ্নাচারী মানুষের গল্প, এখানে রানিমা একটি অনুসঙ্গ মাত্র। যুবকটির সাথে যুক্ত থাকা ছায়া আসলে সত্তার প্রতীক। জ্ঞানতাড়িত একটি প্রক্রিয়া কিন্তু এখানে আছে। রানিমা সেই যুবকের কাছে যেন উন্মোচিত হয়। নিজের মুক্তি খুঁজে। কিন্তু রাষ্ট্র তো মানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব চায় না। প্রতিষ্ঠানের কাজই সৌন্দর্যকে, সুকুমার স্পৃহাকে দাবিয়ে রাখা। ফলে যুবক, কিংবা রানিমা, কিংবা মানুষজন হিংস্র কবলিত জীবনেই থাকে।

গল্পটির কাব্যিক আয়োজন সম্পর্কে কিছু বলুন।
--
আমি তো আগেই বলেছি, এটি একেবারেই বানানো গল্প, সাহিত্যিক আয়োজন। তবে এটি আমার একটি প্রিয় গল্প। ছায়া, মায়া, কায়াকে একাকার করে মানুষের সামগ্রিক মুক্তির বিষয়টাই প্রতীকী ধরনে আনতে চেয়েছি আমি। ভাষার কাব্যিক জোরটা হয়ত সেখান থেকেই এসেছে।

ঝিমঝিমাইন্যে কান্দন গল্পে আপনি সম্ভবত আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মনে হচ্ছে সে ভাষার ধারাবাহিকতাটি রক্ষা হয়নি আঞ্চলিক ভাষার সাথে চলতি ভাষার মিশ্রন ঘটেছে। এটি কি আপনার নিজস্ব কোন স্টাইল নাকি বিচ্যুতি।
--
আমি মনে করি, পৃথিবীর তাবত সাহিত্যকর্মেই কৃত্রিমতা থাকে। লেখক সৃজন করেন, এটি তার ব্যাপার, লেখা কিন্তু স্টিল ফটোগ্রাফি নয়। ঝিমঝিমাইন্যে কান্দন লিখতে গিয়ে মনে হয়েছিল এ গল্পের জন্য আলাদা একটা ভাষা দরকার। প্রচলিত মানভাষা আমার টোটাল মেজাজকে এক্ষেত্রে ধারণ করবে না, এ গল্পের জন্য আলাদা ভাষা অপরিহার্যই মনে হয়েছিল। এখানে মূলত জল-কাদা-নদী-হাওর তথা আমাদের এই জনপদকেই প্রতীকায়িত করে আনতে চেয়েছি। শ্যামল-বাঙলার সাথে ভাটিবাঙলার মেলবন্ধন কিন্তু এখানে আছে। সবজি বাগান, গাঙের নিরালা কান্দন একজন নারীকে খোঁজার বিষয় মিলে মানুষের না-পাওয়ার একটা আহাজারিও এখানে আছে।
আর ভাষার বিষয়টা নিয়ে এখানে কিছু বলতে চাই, আমরা যে ভাষাআয়োজন বা একাডেমিক একটা ধারণার ভিতর আছি, তাতে কলোনিয়াল একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে। এই জনপদের লড়াই-সংগ্রাম, বেঁচে থাকার ধরন, জলকাদার আবহ মিলে যে একটা জীবনের ভিতর আমরা আছি, তাতে রাষ্ট্রলালিত প্রমিত ভাষা আমায় স্বস্তি দিচ্ছে না। আমি এ থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। এ গল্পে সেই চেষ্টাটাও আছে। এখানে শুধু রিয়েলিস্টিক ইমেজ আনার জন্য তা করিনি। এটি চলমান ভাষিক আয়োজনের সাথে আমার একধরনের বোঝাপড়াও বটে।

আপনার গল্পগুলো যাকে নিরীক্ষামূলক গল্প অথবা যেটা বলা হয় কাহিনীহীন গল্প, এগুলো সাধারণ পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন কিনা...
--
আমি নীরিক্ষামূলত বিষয়টা সম্পর্কে অত জ্ঞাত নই। আমি তখনই গল্প লিখি যখন তা লেখার প্রয়োজন মনে করি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর আমি সচেতনভাবে কোনো গল্পকেই নীরিক্ষার দিকে নিয়ে যাই না। গল্প যদি আমার কথা না শুনে, বেয়াদব হয়ে যায় তাহলে আমি কি করব হাহাহা। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, গল্প একটি প্রক্রিয়ার নাম, সামগ্রিক জীবনের নিত্যপ্র¯তৃতিরও নাম। আমি একটা গল্প একমাস ধরে লিখলাম, আমি কিন্তু চাইব, আমার পাঠকও প্রয়োজনে খানিক শ্রমযোগে তা পাঠ করুক। আমি কিন্তু পাঠকের সৃজনশীলতার উপর খুব আস্থা রাখি। পাঠকই আমার গল্পের দেবতা; কাজেই তাকে হরহামেশাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা আমার নেইই।
আপনার প্রযোজিত ভাষা নিয়ে কিছু বলুন। কেউ কেউ আপনার ভাষার প্রয়োগকে সাপোর্ট করেন না।
দেকুন, আমি মনে করি কথাশিল্পের ভাষার আলাদা জাত আছে, চিহ্ন-প্রক্রিয়া থাকা দরকার। সৃজনশীল সাহিত্যের আলাদা অভিধান থাকা দরকার। আমার বাক্য, চিহ্ন, লেখার ধরন কেউ কেউ মানেন না। বা, ভিন্নমত পোষণ করেন। কেউ আবার একে সঠিকও মনে করেন না। আমি এভাবে ভাবি না। কথাশির্পের ভাবনা আমারই হবে। আমিই এর ঈশ্বর হাহাহা।

আপনি তো পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী নামের একটা উপন্যাসও লিখেছেন?
--
হ্যাঁ, তা মাওলা ব্রাদার্স থেকে ২০০৬-এ বার হয়েছিল। এর বিষয়টা একটু অন্যধরনের। গোয়ালন্দঘাটের দৌলতদিয়ার পদ্মাপাড়ের দেহজীবীদের নিয়ে লেখা উপন্যাস ওইটি।
তো এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বলুন।
--
এর প্রতিক্রিয়া যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। কারণ পরিবার বা সমাজের নানান মানুষজন তো এমন একটা বিষয়কে সহজভাবে নেয় না। এর ভাষা নিয়েও কিছু কথাবার্তা হয়েছিল।
কি ধরনের সেটা?
--
আমি আসলে ভাষার প্রচলিত রীতিকে নিজের ধারণার ভিতর থেকেই ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছি। বাক্য বা যতি-টতি ব্যবহারেও আমার নিজস্ব কিছু রূপ দিয়েছি। ভাষায় লৌকিকতা ব্যবহার করতে চেয়েছি। যা কেউ কেউ এসবের সাথে দ্বিমত করেছেন_এসব আর-কি।

আচ্ছা, এবার শিল্পের জায়গা-জমিন নিয়ে কিছু কথা বলি_ আপনি Art for art’s sake এ বিশ্বাস করেন?
--
আসলে আমার বোধ হয় কিছুতেই আর বিশ্বাস নেই। একসময় মার্কসিজমকে তাবিজ-কবজের মতোই জপ করতাম। মনে করতাম, আমার নিজের কিছুরই প্রয়োজন নেই_ মানুষের সকল শৃঙ্খল মোচনেই আছে যাবতীয় মুক্তি, লেখকও একজন শ্রমিক ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন মনে হয়, পলিটিকেল লিডারশিপের সাথে সৃজনশীলতার একটা দ্বন্দ্ব অনিবার্য। তবে শিল্পের জন্য শিল্প বললে শিল্পকে একেবারে এতিম মনে হয়। প্তবে এখানেও প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করার বিষয় আছে। ব্যক্তির উন্মেষ আছে। রগতিশীলতার সাথে এর আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা কেমন হবে তা কিন্তু ভেবে দেখার একটা বিষয়। সৃজনশীলতার সার্বিক মুক্তিই আমার কাম্য। এও ভাবি যে, ঘরের চাবি আর ক্ষেতের আইলই দুনিয়ার যাবতীয় ঝামেলার মূলে আছে। আমি রাষ্ট্রহীন নাগরিক হতে চাই।

পাঠককে ধরে রাখা বা বোঝানোর দায়িত্ব কি লেখকের নাকি পাঠকের?
--
এটি পারস্পরিক বোঝাপড়া বা মোকাবেলার বিষয়। গল্প চিরকালই একটা 'স্লো আইটেম', এর পাঠক স্বভাবতই পত্রিকার পাঠকের মতো হবে না। তবে গল্পগ্রন্থ যখন প্রকাশকরা বের করতে চাই না, গল্পের বই তেমন বিক্রি হয় না, তখন মনে হয় বিষয়টা নিয়ে গল্পকারদের ভাবার দরকার আছে। আমি তো লিখছি পাঠকের সাথে একটা বোঝাপড়ার জন্যই, পাঠকবিহীন গল্পের কথা তো আমি ভাবতে পারি না। কারণ তা হলে তো একটা গল্প লিখে বালিশের তলায় চাপা দিয়েই রাখতাম_ তাই না?

কথাসাহিত্যের ভবিষ্যৎ কেমন বলে মনে করেন?
--
হাহাহা, তা কী করে বলি_ আমি তো গণক নই। তবে কথাসাহিত্যে নানান ইতিহাস এসে মিশেছে। একসময় শুধু কথাই ছিল ভরসা, তারপর প্রিন্টিংয়ের বিষয়টা এল, মুখের কথা বা কাহিনী নিয়েও যে সাহিত্য হতে পারে তাও আমরা পেলাম। এখন আবার ওয়েবসাইট ম্যাগাজিনে গল্পের পঠন, প্রকাশভঙ্গি, পাঠকের সাথে ইন্টারেকশন বদলে যাচ্ছে। পাঠক তাজা বিষয়ের তাজা মতামত দিতে পারছে। কথাসাহিত্য হারিয়ে যাওয়ার কোনো বিষয় নয়, এ নিয়ে আমি তত শঙ্কিতও নই। তবে কর্পোরেট পুঁজি, এনজিও, তথ্যপ্রযুক্তি যেভাবে মানুষের চৈতন্যে প্রতিনিয়ত তার আগ্রাসী বিষয়গুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে_ একে মোকাবেলার জন্য বিকল্প ধারণা আমাদের বের করতেই হবে।

একটা অভিযোগ আছে যে ইদানীং ভালো গল্প লেখা হচ্ছে না। যদি সত্য হয় কেন গল্প হচ্ছে না কেন? আর যদি মনে করেন গল্প হচ্ছে তাহলে কোন গল্পগুলোকে আপনার মনে হচ্ছে ভালো গল্প।
--
এটি একেবারে ব্যক্তিক মতামতের বিষয়। আপনার কি মনে হয়_ ভালো গল্প হচ্ছে না?

না, মানে, আমি আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।
--
ভালো/খারাপ সারা মুহূর্তের এক রিলেটিভ বিষয়। এই যে আপনি গল্প লিখছেন, আমি খেয়াল করেছি যে, আপনার গল্পে উচ্চমধ্যবিত্ত থাকে, প্রায়শই থাকে তিনটি চরিত্র, এবং তাদের অন্তর্গত কিছু বিষয়-আশয়। ঠিক কিনা?

তা অনেকটা ঠিক, তবে আমার গল্পে তো সাধারণ মানুষও থাকে...
--
তা থাকে, তবে তারাও উচ্চমধ্যবিত্ত দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। তো, আপনার সেই গল্পসমূহ কি খারাপ? আমি যা লিখছি, তা আপনার মতো সহজিয়া রূপে নাই, বর্ণনায়ও অন্যরকম, কখনও কখনও একটা উপমাকেই গল্প করতে চাই। যাই হোক, প্রথম কথা হচ্ছে, ভালো গল্পে গল্পত্বের একটা প্রাণপ্রবাহ থাকতে হবে। সেটা কি? তা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। তবে আমি মনে করি, ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা ধরনের রাবীন্দ্রিক ব্যাকুলতা থেকে গল্প মুক্তি পেয়েছে। গল্প কখনও উপন্যাসের ব্যাপকতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বোর্হেস একবার এধরনের কথাই বলেছিলেন, আমি যদি দশ পৃষ্ঠার গল্পে যাবতীয় কিছু নিয়ে আসতে পারি, তাহলে অত বিশাল আকারের ওয়ার এন্ড পিস কেন লিখব? কথা সেটাও নয়, গল্পের জায়গায় গল্প, উপন্যাসের জায়গায় উপন্যাস। তবে কোনটা গল্প হবে সেটা হবে সেটা নির্ণয় করা বা সাজানোই একটা ব্যাপার। প্লট, চরিত্রকথা, ন্যারেশন, ডায়লগ ইত্যাদির ভিতর দিয়েই দিয়ে যে গল্প একটা নিজস্ব অনুরণন পাঠকের চিত্তে খোদাই করতে পারে, সেটাই ভালো গল্প।
এখন কী করছেন বা লিখছেন?
--
কতকিছুই লিখছি, কোনোই স্থিরতা নেই। ফেসবুক বা নেট-সাহিত্য হয়ত সেই স্থিরতা যাবজ্জীবনের জন্যই নষ্ট করে ফেলেছে হাহাহা।
প্রকাশনা নিয়ে বলুন।
--
একুশের বইমেলায় একটা উপন্যাস যখন তারা যুদ্ধে জোনাকী থেকে বের হওয়ার কথা। দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ, কথাশিল্পের জল-হাওয়া শুদ্ধস্বর থেকে আর গল্পের গল্প জোনাকী থেকে বের হওয়ার কথা। কথা তো বের হবেই।

তার মানে আপনি নিত্য সাহিত্যলগ্ন মানুষ...
--
হাহাহা, তা হয়ত বলতে পারেন।
৩১.১.১৩


সাক্ষাৎগ্রহণকারীর পরিচিতি
নূর কামরুন্নাহার -------------------------------------------------------


তিনি মূলত কথাশিল্পী। তিনি কার্যত লিখছেন নয় দশকের মাঝামাঝি থেকে। তার দুটি গল্পগ্রন্থ হচ্ছে_ 'গল্পগুচ্ছ', 'শিস দেয়া রাত'; তিনটি উপন্যাস : 'জলরঙে আঁকা', 'আলো', 'কা'; একটি প্রবন্ধগ্রন্থ : 'নারী ক্ষমতায়নস্বপ্ন ও বাস্তবতা'। এই একুশের মেলায় রোদেলা প্রকাশনী থেকে 'বিকেলের চিলনামে একটা গল্পগ্রন্থ বার হওযার প্রকিয়ায় আছে। ফেরারী নামের একটা সাহিত্য পত্রিকারও সম্পাদক। এ সাক্ষাৎকারটি মূলত তারই সম্পাদিত গল্পকথা নামের কথাসাহিত্যভিভিত্তক একটা ছোটকাগজে দেয়ার কথা ছিল। এটি ওই সাক্ষাৎকারের একটা বিস্তৃত রূপ। কিন্তু ছোটকাগজটি শেষতক বার হয়নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন