সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩

কথা নিয়ে কিছু কথা / কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

[‘কথা’ সাহিত্যের পাঠকের কাছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লিটল ম্যাগাজিন। প্রকাশের পর থেকেই ‘কথা’ তার চরিত্র দিয়ে, এই গুরুত্ব ও মনোযোগ আদায় করেছে। আমরা ‘কথা’র সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কাছে, ‘কথা’র কমিটমেন্ট, স্বপ্ন ও বাস্তবতা সম্পর্কে, জানতে চেয়েছিলাম। প্রিয় পাঠক, আসুন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের কাগজ হিসেবে অন্যতর শ্রদ্ধার দাবীদার এই কাগজটি সম্পর্কে জেনে নিই। -লাল জীপের ডায়েরী]
সময়টা আমরা আমাদের করতে চাইলাম, আমরা আমাদের সময়কে কথা দিয়ে ভরাট করতে চাইলাম- সেই সময় ২০০২ এর মাঝামাঝি তখন। তখনই কথাসাহিত্য নিয়ে একটা ছোটকাগজ করার কথা ভাবি আমরা।
আমার যদ্দূর মনে পড়ছে আমি প্রথমেই মনোবাসনার কথা গল্পকার-কবি আহমেদ মুনিরকে জানাই। একে-একে নির্মাণ সম্পাদক রেজাউল করিম সুমন আর উত্তরমেঘ সম্পাদক নাসিরুল ইসলাম জুয়েলকে বলি। একেবারে প্রাথমিকভাবে কার্যত আমরা চারজনই এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা চালাচালি করি। পরিকল্পনা গড়ি, ফের তা আমরাই লন্ডভণ্ড করি। আবার নানানভাবে একে সাজানোর বায়না ধরি! একপর্যায়ে এর সাথে অনুবাদক-সাহিত্যিক জি.এইচ. হাবীবকে আমাদের সঙ্গী হিসাবে পাই। চট্টগ্রামস্থ ফুলকি, বৌদ্ধমন্দিরের পাশের লাকি হোটেল, ডিসি হিল, আমার বাসায় অনেক কথা হয়, অনেক পরিকল্পনা চলতে থাকে। গল্পকার হুমায়ূন মালিক, মোহাম্মদ শামছুজ্জামান, জাহেদ মোতালেবও একসময় তাতে যুক্ত হন। আমার মনে পড়ছে, ছোটকাগজটির নামকরণ ঠিক করতেই আমরা ম্যালা কথাবার্তা চালাই। কারণ আর ঠিক করতেই পারছিলাম না। গল্পকথা, গল্পসমূহ, কথকতা, কথা, কথকতা, এবং গল্প, শাহেরজাদ ইত্যাদির পর অনেকটা হুট করে আমরা কথাতেই স্থির হই।
একটি সাক্ষাৎকার, কিছু গল্প, গল্প বা কথাসাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ, বই আলোচনা, অনূদিত গল্প ইত্যাদি নিয়ে আমরা এর শরীর ভরাট করতে চাই। আমরা ওই সময় প্রগতিশীলতাকেই মূল স্পিরিট হিসাবে নিই।
এর প্রথম সম্পাদকীয়টি এতে যুক্ত করলেই বিষয়টি আরও ক্লিয়ার হবে।
 ধুলিমাখা শব্দসমূহ কখনও কখনও ভরাপূর্ণিমাকে স্পর্শ করতে চায়
                   ‘কথাসাহিত্যচর্চার একধরনের তীব্র-আকাঙক্ষা থেকেই এ ছোটকাগজটির জন্ম। আমরা কথাসাহিত্যের কথাগুলো আমাদের মতো করেই বলতে চাই। কাগজ প্রকাশে আমাদের প্রধান বিবেচনার বিষয় – মানবিক প্রেরণায় প্রগতিশীলতার উন্মেষ। এও জীবনকে চেনার, মানুষের স্বপ্নকে ভিন্নমাত্রায় দেখার তীব্র-আকাঙক্ষারই  প্রকাশ মাত্র। আমরা মানুষের সে-ই স্বপ্নের বিসতৃতি চাই যাদের স্বপ্নলোক সম্পদের মানবিক বন্টনেই আলোকিত হয় কেবল। এ কাজে নতুন লেখক, নবতর ভাবনা, সাহিত্যের ইতিবাচক বাঁকবদল, প্রকাশনার নতুন ধরন – এসবকে কথকতা অবশ্যই স্বাগত জানাবে।
                যে কোনো জীবনবাদী কথাশিল্পী – রাষ্ট্র বা সমাজের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে পারেন না কখনো। রাষ্ট্র-সমাজের অগণতান্ত্রিক-অবৈধ-অনৈতিক সশস্ত্রতায় আমরা শঙ্কিত; আমরা চাই শুভবোধসম্পন্ন গণতন্ত্রের বিকাশ । রাষ্ট্রপালিত কথাসমূহ যদি সংক্রামক-নিবীর্য হয়, তবে আমরা তা মানতে পারি না। ছোটকাগজ, বড়োকাগজ কিংবা সাহিত্যে গোষ্ঠীপ্রথার কোনো  অপকৌশলই আমরা থাকতে পারি না। যে কোনো কাগজের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে আমরা ঘৃণা করি। আর সমাজবিন্যাসের পরিপক্বতার স্তর নিশ্চয় এমন নয় যে প্রতিষ্ঠানকে ষোলআনা অস্বীকার করা উচিত বা এর ভিতর থেকে কল্যাণকর কোনো সহযোগীতা নেয়া যাবে না। কথাসাহিত্য তথা সাহিত্যকর্মের সুস্থ-মানবিক-শিল্পসম্মত বিস্তৃতিই বড়ো বিষয়। কথিত প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতার বিষয়টা কি কেবল ছোটকাগজ বের করার একটা স্টাইল হিসেবে থাকবে, নাকি সামগ্রিক অপশক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গড়ে তোলাটাই বেশি প্রয়োজন – তাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজনীয় নয় কি?
                হাজার রজনীর গল্প বলা শাহেরজাদের বাগদাদ নগরী ইঙ্গো-মার্কিনী নগ্ন হামলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল – মেসোপটেমিয়া নামের সভ্যতা আজ ভূলুণ্ঠিত। নগ্ন-নোংরা সামরিক পুঁজি তছনছ করছে ইরাক-প্যালেস্টাইনসহ বিশ্বের সমগ্র শান্তিকামী মানুষের শুভ মূল্যবোধ। জাতিসংঘ নামের নপুংসক সংগঠনটি যেন এক নতজানু দপ্তর। মানবকুলের হৃৎপিণ্ড এখন বারুদের দখলে। দজলা-ফোরাতের জলপ্রবাহে রক্তের গন্ধ। প্রগতিশীল মানবই পারে সমুদয় নগ্নতাকে রুখতে। আমরা এমনই জাগরণের প্রত্যাশী। একদিন পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকামী মানুষ দজলা-ফোরাতের বিশুদ্ধ জলস্রোতে হাত ধুয়ে শুদ্ধতম মানুষ হয়ে উঠবে।
                ১/৭/০৩ তারিখে নেয়া হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার অত দেরিতে ছাপানোর কারণ হিসেবে ছোটকাগজের যে কোনো কর্মীর মতো আমরাও লেখা জোগাড়ে চেষ্টা-তদ্বির করা আর অর্থের সমস্যার কথাই বলব।
                সামনেই রোজার ঈদ ।  ছেঁড়া নেকড়ার মতো, শুয়োরের পালের মতো অধিকাংশ মানুষ এখন মানবেতর জীবনযাপন  করছে ।  পুঁজির দাপটে লোকজীবনও বিপর্যস্ত। এমনই বিধ্বস্ত কালে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর স্পর্ধা আমাদের নেই।
                     সম্প্রতি প্রয়াত কবি সিকদার আমিনুল হক’কে আমরা অত্যন- শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
                   আহমদ শরীফ, আখতারজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, জাহানারা ইমাম, কামাল বিন মাহতাব  ও আসহাবউদ্দীন আহমদ’কে শ্রদ্ধায় আর প্রেরণায় স্মরণ করি।’
…………………………………………………………………………………………….……..….
আমরা প্রথমেই হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার নিই। তাতেও আমি মুনির, জুয়েল আর সুমন অংশ গ্রহণ করি। এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার হয় সেটা। প্রায় ৭ ঘণ্টা আমরা কথা বলি। তখন তো এখনকার মতো ই-মাইক্রোক্যাসেটে তা ধারণ করিনি। অডিও ক্যাসেটে তার ধারণ করি। আর তা ট্রান্সস্ক্র্রিক্ট করতে কী যে কষ্ট হয়েছিল আমাদের! তবে সব কষ্টই জলের মতোই স্নিগ্ধ সরল হয়ে যায় যখন আমরা সংখ্যাটি প্রকাশ করতে পারতাম। সেই সংখ্যাই শহীদুল জহিরের গল্প ‘ডলু নদীর হাওয়া’ ছাপতে পারি। তখন তো এখনকার মতো সেলফোনের সুবিধা ছিল না। তার সাথে অফিস বা বাসায় ল্যান্ডফোনেই কথা বলতাম তখন। মামুন হুসাইনের নভেলেট ছাপি, তাতে থাকে মহিবুল আজিজের গল্প। এতে অন্য গল্পকাররা ছিলেন মুহাম্মদ শামছুজ্জামান, দেবাশীষ ভট্টাচার্য, আহমেদ মুনির, আর কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর। জিএইচ হাবীবকৃত বোর্হেসের অনূদিত গল্প আলিফ ছাপি। জাহেদ মোতালেবের অনুগল্প ছাপা হয়। আমরা এ সংখ্যা দারণ উৎফুল্ল ছিলাম।
কথা’র পরিকল্পিত বিষয় হচ্ছে সাক্ষাৎকার। আমরা এ পর্যন্ত আরও যাদের সাক্ষাৎকার ছাপলাম তারা হচ্ছেন যথাক্রমে শহীদুল জহির, সেলিম মোরশেদ, মামুন হুসাইন, কাজল শাহনেওয়াজ, মহীবুল আজিজ, শাহাদুজ্জামান।
আমরা সবসময় চেষ্টা করি, একেবারে নতুন ধারার কিছু লেখা সংযোজনের। আমরা গোষ্ঠীবদ্ধতায় কখনও ছিলাম, নাইও। যারা সাহিত্যকে নতুনভাবে, ট্র্যাডিশন ভেঙে নবমাত্রায় দেখতে চায়, তাদের প্রতি ক্রমাগত ভালোবাসা আমরা লালন করতে চাই। প্রতিষ্ঠানের সাথে সাহিত্যের একটা বোঝাপড়া/মোকাবেলা করেই তাকে সাহিত্য করতে হয়। জগতের কোনো প্রতিষ্ঠানই শিল্প-সংস্কৃতির বাঁধনহীন বিকাশ চায় না। সাহিত্য-সাময়িকীতে লিখলেই কম্প্রমাইজ করা হয়, আমরা তা মানতে চাই না। আমার লেখা যদি আমার মতোই ছাপায় তাতে সেখানে তা ছাপাতে কোনো সমস্যা দেখি না। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সাময়িকীসমূহ প্রতিষ্ঠান হিসাবে এমনভাবে দাঁড়ায়নি যে তাতে শিল্পচর্চা করাই যাবে না। আমরা সাময়িকীকে শ্রেণীশত্রু মনে করে তাতেই শুধু লিখব না, আর অন্যসব প্রতিষ্ঠানের সাথে কম্প্রমাইজ করে যাবো- আমরা এমনতর বাসনাকে সঠিক মনে করি না। প্রতি সংখ্যায় ২/৩টি গ্রন্থ আলোচনা ছাপা হয়। এর নামলিপি বরাবরই রেজাউল করিম সুমন করে থাকেন। এর ৫ম সংখ্যাটির প্রচ্ছদ করিয়েছিলাম ১১ বছরের রেনেসাঁ জামান ঐশীকে দিয়ে। তখন আবার দেশে চলছে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন শাসিত আধাখেচড়া সামরিক শাসন। এবং আমরা রিস্ক নিয়ে এই অদ্ভুত শাসনকে ব্যাঙ্গ করেই প্রচ্ছদটি করিয়েছিলাম।
কথাসাহিত্য বিশেষত গল্পভূবনকে আলাদা মাত্রা হিসাবে দেখানোর বাসনা আমাদের বরাবরই। আমরা যখন এটি প্রকাশ করি তখন রবিউল করিমের ব্যাসই ছিল বলতে গেলে একমাত্র গল্পপত্রিকা। একসময় বের হতো কামাল বিন মাহতাবের ছোটগল্প, পারভেজ হোসেনদের সংবেদ। পাপড়ি রহমানের ধূলিপত্র জেসমিন মুন্‌নীর দ্রাঘিমা বের হয়েছে। এখন তো গল্পপত্র, গল্পকথা নামে দুইটা  ছোটকাগজ বার হচ্ছে। কবিতার কাগজ কিন্তু অনেক আছে। ছোটগল্পের বিকাশের স্বার্থে, একে  আরও সজীব প্রাণবন্ত করার জন্য কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ আরও বের হওয়া দরকার। কথাই যেন সব, কথাই জীবন, একসময় গল্প মানেই ছিল কথা- সেই কথাকে আমরা সামনে এগিয়ে নিতে চাই। সেই যাত্রায় পাঠকও এর অংশীদার। সকলের মিলনে সকলের কথার জয় হোক!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন