রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৩

দেশ যখন সামাজিক প্রত্যয়

ইমতিয়ার শামীম

সাহিত্যে স্বাধীন দেশের আবাহন আমরা শুনেছিলাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বরে সেই আবাহন আর কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে বাঙালির কথাসাহিত্যও সুস্পষ্ট এক আদল পেয়েছিল। তার আগেও গদ্য ছিল, কিন্তু সেই গদ্যে ছিল না বাঙালির সামাজিক-অসামাজিক জীবনের স্বাদ ও গড়ন ছিল না নিরীক্ষণ ছিল না যাকে এখন বলি ‘বিটুয়িন দ্য লাইনস সেসবের অস্তিত্ব। বঙ্কিম হয়ে উঠেছিলেন একইসঙ্গে আমাদের কথাসাহিত্যের জনক ও আত্মজ।



তবে কেবল কথাসাহিত্যেরই আদল দেন নি তিনি, তৈরি করেছিলেন সাহিত্যে মৌলবাদের গড়ন; যদিও কথাটা শুনতে খুবই লাগে, কেবল কানে নয়, কান ছাড়িয়ে হৃদয়েরও মধ্যে। সাহিত্য তো শুধু বাস্তবতা নয়, সাহিত্য বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে, অতিক্রমও করে। আত্তীকরণ ও অতিক্রমণের মধ্যে দিয়েই সাহিত্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সাহিত্যিক বঙ্কিম তাঁর আশেপাশের সাম্প্রদায়িক বাস্তবতাকে আত্মস্থ করতে পারেন নি। আত্মস্থ করার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত পারেন নি হজম করে ফেলতে এবং প্রচণ্ড বিবমিষায় উগড়ে ফেলেছেন ভেতর থেকে। উল্টেপাল্টে ফেরত আসা সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার সে গন্ধ তাই ভয়াবহ উৎকট। সাম্প্রদায়িকতাকে অতিক্রম করতে গিয়ে তিনি অনতিক্রান্ত এক বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছেন এবং সম্প্রদায়কেই মনে করেছেন মুক্তির কাণ্ডারী। এসব কথা মানতে কষ্ট হয়, বিশেষত সেই বঙ্কিমের কথা মনে হলে,- যে-বঙ্কিমকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘শিক্ষিতশ্রেষ্ঠ’। এত যে সুকৃতি তাঁর, সাম্প্রদায়িকতা সেসবের মধ্যে একেবারেই বিসদৃশ, চৌবাচ্চাভর্তি খাঁটি দুধে একফোঁটা প্রস্রাব পড়ার মতো। মাত্র একটি ফোঁটা, কিন্তু স্বাদ ও পবিত্রতা নষ্ট করার জন্যে যথেষ্ট ওইটুকুই। অনেকে দুর্বোধ্যতাকে হালআমলের গদ্যের প্রধান দুর্বলতা বলেন; কিন্তু বঙ্কিম পাঠের মধ্যে দিয়ে আমরা অনুভব করতে পারি, দুর্বোধ্যতা নয়- যুগে যুগে কথাসাহিত্যের প্রধান সংকট হলো গতিহীনতা। এই গতিহীনতা লেখকের ভাষাকে মৃত করে তোলে। কিন্তু গতিময়তা ছিল বলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাক্যগঠন ও শব্দব্যবহার অত দুর্বোধ্য হওয়ার পরও শিক্ষিত মানুষ থেকে শুরু করে একেবারে মুদির দোকানদার পর্যন্ত সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।

আহমদ শরীফ অবশ্য আমৃত্য দাবি করেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও জাতীয়তাবাদী। বলেছেন, দেশকে প্রথম মাতৃরূপে জেনেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক অর্থে একটি ভৌগলিক স্বদেশ ও স্বজাতির অনুসন্ধানে নামেন। সুবা-ই-বাঙ্গলা বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে স্বদেশ হিসেবে মূর্ত করে তোলেন তাঁর লেখায়। এর অধিবাসীদেরও তিনি তাঁর স্বজাতির করে নেন। এ অঞ্চলের জনতার জন্যে বাঙালি অভিধা তিনিই ফিরিয়ে আনেন এবং তাঁর সেই বাঙালি কেবল বাঙালি হিন্দু নয়, বাঙালি মুসলমান কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সবাই- যারা ছিল বিহার এবং উড়িষ্যারও অধিবাসী। এদের সবাইকে নিয়েই তিনি লিখেছিলেন, বন্দে মাতরম। অনেকে এ গানটিকে সাম্প্রদায়িকতাপুষ্ট বলেন। কিন্তু আহমদ শরীফ তা মনে করেন না। তিনি বলেন, এতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী কোটি কোটি মানুষকে একত্রিত করেই এক হিন্দুস্তানের কথা বলা হয়েছে, হিন্দুস্তানকে নিছক ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন নি বঙ্কিম। তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস সম্পর্কে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে আহমদ শরীফ সেক্সপিয়রের লেখা ‘মার্চেন্টস অব ভেনিস’-এর শাইলকের কথা তুলে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, তা হলে কি বলব সেক্সপিয়র ইহুদিবিদ্বেষী ছিলেন? যুক্তি আছে তাঁর কথায়, আমাদেরও মনে হয়, হিন্দু শব্দটি প্রয়োগ করার সময় বঙ্কিমের পর্যবেক্ষণকে প্রভাবিত করেছিল আর্যদের ধ্যানধারণা- যে-ধ্যানধারণা অনুযায়ী সিন্ধুতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষেরা পরিচিতি পায় হিন্দুস্তানের হিন্দু নামে।

বঙ্কিম বুঝেছিলেন দেশটা কেবল হিন্দু বা মুসলমানের নয়, দেশটা সবার, এমনকি নিরীশ্বরবাদীরও। তাঁর লেখায় ঈর্ষণীয় সংখ্যক মুসলমান চরিত্র ছড়িয়ে আছে এবং এটি তাঁর সমালোচকদের অনেকেরই জানা নেই। আবার মুসলমান চরিত্র রবীন্দ্রসাহিত্যে একেবারে অনুপস্থিত বলে আমাদের মৌলবাদীরা সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রনাথকে খোঁচা দেয়ার চেষ্টা চালান। ‘মুসলমানীর গল্প’ না লিখলে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি ও অনুভূতির এক জগত অনালোকিত ও অনালোচিতই থেকে যেত। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের বেশির ভাগ পাঠক প্রবন্ধ পড়তে আগ্রহী নন, ফলে অনেকেই জানেন না, রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ আর আলোচনায় বার বার হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে। সম্প্রদায়ের ও সাম্প্রদায়িকতার সংকটের কথা বার বার তুলে ধরেছেন তিনি। সমাধানের পথ খুঁজেছেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র অন্য ধাঁচের। প্রথম দিকে সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়েই তাঁর উন্নাসিকতা ছিল, নিরীশ্বরবাদী ছিলেন মনেপ্রাণে। পরে পাল্টে গিয়ে ঠিক উল্টো হয়ে গেলেন এবং সম্প্রদায়ই তাঁর আত্মপরিচয়ের একমাত্র জগত হয়ে উঠল। ‘সাম্য’ তাঁর প্রথমদিককার জীবন ও দর্শনের সাক্ষী। হিন্দু-মুসলমানের সমস্যা আলাদা করে খতিয়ে দেখতে কোনও আগ্রহ ছিল না তখন, তারও বেশি আগ্রহ ছিল মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়ার ব্যাপারে। তবে কথাসাহিত্যে তিনি এই সমস্যা পুষিয়ে দিয়ে গেছেন। পরান শাহ, হাসিম শেখ, আয়েশা, জেবুন্নিসা, ওসমান, দলভী, মীর কাসিম, মোহাম্মদ আলী, মোবারক, দরিয়া, চাঁদশাহ এরকম অনেক মুসলমান চরিত্রই দেখি তাঁর লেখাতে।

কিন্তু এটা তো স্বীকার করতেই হবে, জীবনের শেষ দিকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তার বদলে তখন ছাপিয়েছিলেন ‘প্রচার’ নামের পত্রিকা। সেই পত্রিকার মাহাত্ম্যও কমবেশি জানি আমরা। বঙ্কিমচন্দ্রকে তাঁর উপন্যাস দিয়ে বুঝবার চেষ্টা বাদ দিলেও তাঁর সাম্প্রদায়িক অনুপ্রাস খুঁজে পাওয়ার অনেক পথই এভাবে দেখতে পাওয়া যায়। তাই বঙ্কিমের শেষ গন্তব্য নিয়ে আহমদ শরীফের চেয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মন্তব্য অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইঙ্গিত করেন বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদের অবলম্বন জাত্যভিমানের দিকে। মিথ্যা নয় তাঁর ওই ইঙ্গিত। উপনিবেশের এক অনুগত কর্মকর্তা তিনি, এই নীরব দংশন তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয় নি কোনওদিন। অক্ষমতার ক্রোধ একসময় তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বড় করে তোলে জাত্যভিমানকে। জাতীয়তাবাদের স্পৃহার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর এই জাত্যভিমান। তাই তিনি প্ররোচিত হন ‘নিজস্বতা’ আঁকড়ে ধরার দিকে। নিঃসঙ্গ, জাত্যভিমানী বঙ্কিমচন্দ্র হাতের কাছে ধর্ম, আরও স্পষ্ট করে বললে তাঁর জাতধর্ম ছাড়া অন্য কোনও নিজস্বতা খুঁজে পান নি। অতএব তিনি মৌলবাদী হয়ে ওঠেন। ধর্মীয় মুক্তির মধ্যে জাতির মুক্তি খোঁজেন।

কিন্তু এই মুক্তি খোঁজার পথে ধর্মীয় আক্রোশ কতটা প্রবল ছিল তা লেখা বা বলা মুশকিল। তবে বিন্দু থেকেও সিন্ধু হতে পারে এবং আমাদের দেশে তাই হয়েছে। বঙ্কিম থেকেই দেখি আমরা, বাংলাসাহিত্যে সাম্য আর সাম্প্রদায়িকতা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে এল। তাতে গদ্যের যত না ক্ষতি হয়েছে তারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বঙ্কিমের নিজের, ক্ষতি হয়েছে মানুষের আর মননের। যে-বঙ্কিম একসময় সন্ত্রাসের সাধক ছিলেন, সশস্ত্র যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন সেই বঙ্কিম নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার মধ্যে দিয়ে কেবল নিজের নয়, গোটা বাঙালি জাতির মৃত্যুসনদ লিখে দিলেন। এটা ঠিক, সন্ত্রাস আর সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বললেও তিনি বেরিয়ে আসতে পারেন নি জাতীয়তাবাদের বৃত্ত থেকে, নিজেই লিখেছিলেন, ‘আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি’; কিন্তু জাতীয়তাবাদিতা থেকে জাত্যাভিমানের যে কূপে তিনি জেনেশুনে ঝাঁপ দিলেন তাতে তাঁকে উদ্ধার করতে আমাদেরও নামতে হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, দম আটকে ফেলা সেই কূপের ভেতর। এখনকার বঙ্কিম তাই এক খণ্ডিত বঙ্কিম, যেমন খণ্ডিত কাজী নজরুল ইসলাম – তাঁদের স্বদেশ ও সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার উপযোগ বানানোর জন্যে মরিয়া আজকের মৌলবাদীরা। সামগ্রিক বঙ্কিমচন্দ্রকে আমাদের সঙ্গে পরিচিত করানো হয় না কোনও সময়। এক শ্রেণীর পাঠক আছেন, যারা কেবল বঙ্কিমের ‘সাম্য’ আর ‘বাংলার কৃষক’ ধরণের লেখাগুলির কথাই জানেন কিংবা এ লেখাগুলোকেই তুলে ধরেন। আরেক শ্রেণীর পাঠক,- তারা বঙ্কিমের নাম শুনলে তাদের অপছন্দের লেখাগুলোর নাম বলারও ধারেকাছে যান না, তার আগেই হুংকার দিয়ে বলেন, ‘সে লোক তো চরম সামপ্রদায়িক।’

বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশী বাঙালিদের পরিচয় করানোর চেষ্টা চালানো হয় ‘দেবীচৌধুরাণী’ দিয়ে, ‘আনন্দমঠ’ আর ‘সীতারাম’ দিয়ে। ‘সাম্যে’র বঙ্কিমকে সেইখানে আমরা খুঁজে পাই না। বঙ্কিম মুক্তি খুঁজেছিলেন, কিন্তু ছিলেন নিঃসঙ্গ। সংঘ ছিল না তাঁর। কিন্তু মানুষের এই এক প্রবল অসহায়তা- ব্যক্তির মুক্তিও একক ব্যক্তি আনতে পারে না, ব্যক্তির মুক্তির জন্যেও প্রয়োজন হয় সংঘবদ্ধতা। অতএব নিঃসঙ্গ মানুষ যখন মুক্তি খোঁজে তখন সে ডুবে যেতে থাকে পারলৌকিকতার ভেতর। এই নিঃসঙ্গতা প্রসঙ্গে আমাদের কালের দ্বিধাহীন ও নিষ্কম্প রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কর্নেল তাহের ফাঁসি হওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘যখন আমি একা থাকি, তখন পৃথিবীর সব লোভ এসে আমাকে ঘিরে ধরে।’ নিঃসঙ্গতা অবশ্য বিবেকানন্দকে লোভী করে নি, তবে শিখিয়েছিল মুখকে দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে নিতে। বিবেকানন্দের মতো বিদ্যাসাগরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি সংঘের নৈকট্যে ছিলেন, তাই পারলৌকিকতা তাঁকে গ্রাস করতে পারে নি, তবে ঠেলে দিয়েছিল নির্জনতায়। তিনি চলে গিয়েছিলেন সাঁওতালদের মধ্যে। সেও তো এক নির্বাসনে যাওয়ার মতোই।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় উত্তেজিত হয়ে ‘প্রতিশোধ’ নিতে মরিয়া হয়ে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখলেন ‘রায়নন্দিনী’। সাহিত্য যে রাজনীতি থেকে দূরে থাকে না, হাতেকলমে সেটা বুঝানোর জন্যে ঋণী হয়ে রইলাম আমরা তাদের দুজনের কাছে। অনেক বাঙালি মুসলমান আজও গর্ব করেন ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ওই ‘রায়নন্দিনী’ নিয়ে। প্রতিশোধের পরিতৃপ্তি-সর্বস্ব এই গর্ব এইভাবে যুগের পর যুগ ধরে জিইয়ে রাখে নিম্ন সাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক রুচি। জীবন ও সংস্কৃতির যে নিম্নমাত্রা বঙ্কিম শেষজীবনের অসহায় নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে জন্ম দিলেন ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রাণপনে চেষ্টা চালালেন সেটার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার। প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারলেন না, কিন্তু আশপাশের অনেককেই সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে নিমজ্জিত করে গেলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ে উন্নত কোনও সাংস্কৃতিক মান তৈরি করতে পারলেন না, বরং পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেদের বিকৃতিকে আরও প্রকট করে তুললেন, জীবন ও সংস্কৃতির মাত্রাকে আরও নিচে নামিয়ে গেলেন। সাম্প্রদায়িকতার কাছে অসহায় মানুষ উপজীব্য হলো না তাদের কারও কাছে, অসহায় মানুষকে কীভাবে আরও সাম্প্রদায়িক করে তোলা যায় সাহিত্যে তারই এক জঘন্য প্রতিযোগিতা হলো তাদের মাধ্যমে। শিল্পরুচিকে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী করে তোলার কাজটি করে রেখে গেলেন তাঁরা দুজন।

তারপরও বঙ্কিমের সামগ্রিকতা ম্লান হয় নি, কেননা তাঁর সাহিত্য ছিল হৃদয়ের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। কিন্তু ইসমাইল হোসেনের সামগ্রিকতা মানেই সাম্প্রদায়িকতা, তার হাতে কেবল ‘অনলপ্রবাহ’ ছিল, কিন্তু ‘সাম্য’ কিংবা ‘বাংলার কৃষক’ ছিল না কোনও কালেই। শিল্পরুচির সাম্প্রদায়িকতা ওইসময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বাজে, আরও মারাত্মক পরিস্থিতি হতে পারত। কিন্তু রাজনীতি তখন যত তীব্র সাম্প্রদায়িকতাই তৈরি করুক, শিল্পসাহিত্যের সাম্প্রদায়িকতা তত তীব্র হতে পারে নি। সাহিত্যের এই সাম্প্রদায়িকতা যে মানুষকে গ্রাস করে নি তার একটি বড় কারণ, বেশির ভাগ মানুষই ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন আর যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রচারমাধ্যমও ছিল দুর্বল। নিরক্ষরতা যে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয় তার মধ্যে অন্ধত্ব থাকে, অসহায়তা থাকে। কিন্তু শিক্ষা যে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয় তাতে একমুখো যুক্তি থাকে, হিংস্রতা থাকে। আমাদের শিক্ষিত মানুষরাই তাই শিল্পসংস্কৃতিচর্চা থেকে দূরবর্তী নিরক্ষরদের তুলনায় অনেক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা হয়ে থাকেন। কেননা তারা তাদের শিক্ষাকর্মটি সম্পন্ন করেন এমন এক শিক্ষানীতির আলোয় যে শিক্ষানীতি মূলত সাম্প্রদায়িক, গণবিরোধী। পারিবারিক ঐতিহ্য না থাকলে কিংবা নিজের একান্ত একাগ্র আগ্রহ না থাকলে তাই যে-কেউ এই শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিবার্যভাবেই হয়ে ওঠেন সাম্প্রদায়িক। শিক্ষিত হওয়ায় এরা তাদের সাম্প্রদায়িকতার সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর ক্ষমতা রাখেন। এবং তারা তাদের সাম্প্রদায়িকতাকে খুব সুন্দরভাবে পুষে রাখতেও শেখেন। তবে বাঙালি মুসলমানের শিক্ষিত হয়ে ওঠার প্রারম্ভিক পর্বে শিল্পরুচিকে সাম্প্রদায়িক করে তোলাটা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল। কেননা তখন কেবল কর্মসংস্থানের বাজার নয়, মানুষের সহজাত শুভবোধও শিক্ষিত হতে চাওয়ার কারণ ছিল। নিরক্ষর নিম্ন ও মধ্যবর্গের একটি পরিবার থেকে কোনও ছেলেকে শিক্ষাঙ্গনে পাঠানোর পেছনে যতটা না কর্মসংস্থানের প্রণোদনা থাকত তারও চেয়ে অনেক বেশি থাকত শিক্ষা ও কর্মের মেলবন্ধনে ভাল কিছু করার তাগিদ।

দুই

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা তারপর কম হয় নি। আজও সে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক ভুলের শিল্পরুচি জন্ম নিলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকশিত হওয়ার আগেই,- ভুল রাজনীতি সেই শিল্পরুচিকে প্রাত্যহিক রুচিতে পরিণত করল। শিক্ষার অগ্রগতি সেই রুচিকে চিরস্থায়ী রূপও দিল। তাই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার অবিরাম চেষ্টায়ও আর কাজ হলো কই! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টা করেছিলেন ‘মুসলমানির গল্প’ দিয়ে। তবে ওই গল্পে সাম্প্রদায়িকতাকে তছনছ করার চেয়ে তিনি অনেক বেশি কাটাকাটি করেছিলেন হিন্দুদেরই জাত-ধর্মের গ্লানিবোধকে। এ গল্প এক অর্থে ইতিহাসের পুনর্পঠন, যাতে ইতিহাসের এক প্রশ্নোত্তরের ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়, কেন একসময় দলে দলে নিম্নবর্গের হিন্দুরা ভিন্নধর্ম বেছে নিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের পথ আর রবীন্দ্রনাথের পথ আলাদা ছিল। নাস্তিক বঙ্কিমচন্দ্র পয়তাল্লিশ বছরের পর ধর্মনিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন আর রক্ষণশীল রবীন্দ্রনাথ সাতচল্লিশ বয়সের পর থেকে তাঁর গণ্ডি এড়িয়ে বৈশ্বিক হয়ে উঠছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাম্য লেখাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে চোখ বুজে শান্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রবল আঁকুতি নিয়ে বরং চোখ মেলেছিলেন সভ্যতার সংকটের দিকে, নিজের শান্তির চেয়ে উত্তরাধিকারের শান্তিই ছিল তাঁর ভীষণ আকাঙ্ক্ষিত।

বঙ্কিমের মতো আত্মদীর্ন ও দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত ধর্মের কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পনকারীর ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে ইসমাইল হোসেন সিরাজী তুলে ধরেছিলেন সদ্য শিক্ষিত মুসলমানের হৃদয়বৃত্তির দীনতা। প্রতিশোধস্পৃহা ছিল তাদের, ছিল হিন্দুদের প্রতিযোগী হয়ে ওঠার দুর্মর ইচ্ছা; কেবল ছিল না ইউরোপিয় শিক্ষার মূল স্পিরিট অনুযায়ী হৃদয় আর চিন্তাজগতের পরিধি বাড়ানোর ন্যুনতম ইচ্ছা। তাই শিক্ষিত মুসলমানদের অনেকেই রাজনীতিতে এলেন, কিন্তু তাদের রাজনীতি মুখ ফেরালো কেবল সম্প্রদায়ের দিকে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতার ভয়ে ভীত শিক্ষিত হিন্দুরাও সাম্প্রদায়িকতার পিঠে সওয়ার হলেন। তীব্র থেকে তীব্রতর হলো সেই সাম্প্রদায়িকতা। সাহিত্যে ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মধ্যে দিয়ে তারই অভিক্ষেপ বেরিয়ে এলো।

তবে আবুল মনসুর আহমদ পুনরাবৃত্তি ঘটান নি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ভুলভ্রান্তির। খুব বড় মানের সাহিত্যিক হয়তো তাকে বলা যাবে না। কিংবা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও সবসময় আশাব্যঞ্জক ছিল না। কিন্তু মহৎ সাহিত্যিকদের শিল্পরুচির কারণেই শিল্পসৃজনে নিজের শ্রেণীকে ছাপিয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়; তাঁর লেখাতেও আমরা সেই প্রবণতা দেখি। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কথাসাহিত্যে উঠে এসেছে ইসলাম ধর্মের নামে শোষণ আর অনিয়ম-প্রতারণার বিভিন্ন চিত্র। তীব্র কটাক্ষ আর পরিহাসের মধ্যে দিয়ে, কৌতুকের মধ্যে দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন ইসলামী রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা, ইসলাম প্রচারের নামে হুজুর শ্রেণীর মানুষের প্রতারণা ইত্যাদি। তাঁর ‘আয়না’ আর ‘ফুড কনফারেন্স’ বই দুটি ছিল সাম্প্রদায়িক শিল্পরুচির মুখে তীব্র চপেটাঘাত। আমাদের দেশের যেসব মৌলবাদী ও সংস্কারবাদী আবুল মনসুর আহমদের নাম শুনে গদগদ হয়ে ওঠেন, তারা যদি একটু মনযোগ দিয়ে এ বই দুটি পড়তেন তা হলে তাদের মনোভাবই পাল্টে যেত। হয় তারা তাঁর নাম শুনে রেগেমেগে উঠতেন, না হয় অসাম্প্রদায়িক হয়ে যেতেন। এই আমলে কোনও লেখক আবুল মনসুর আহমদের ‘হুজুর কেবলা’র মতো গল্প লিখলে মৌলবাদীরা তাঁকে মুরতাদ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিত,- শিল্পরুচি এখন এত বেশি মৌলবাদআক্রান্ত! বেশ কয়েক বছর আগে বি.এ (পাশ) শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে তাঁর এই গল্পটি বাদ দেয়ার দাবি উঠেছিল। এই মৌলবাদীদের দাবির তোড়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক থেকে সংযুক্ত করার বছরেই বাতিল হয়েছে শাহেদ আলীর গল্প ‘জিবরাইলের ডানা’। রাজনৈতিক কারণে মৌলবাদীরা শাহেদ আলীকে যতই তোষণ করুক, ‘জিবরাইলের ডানা’কে সহ্য করতে পারে না তারা। একটি ছেলে ঘুড়ি ওড়ায়, ঘুড়িকে পৌঁছে দিতে চায় খোদার আরশে, যাতে তার মায়ের রোগমুক্তি ঘটে,- এতিম ছেলের এই সহজ সরল আকাঙ্ক্ষা সহ্য করতে পারে নি আমাদের মৌলবাদীরা। তাদের মনে হয়েছে এই গল্পে বরং খোদাকে হেয় করা হয়েছে।

শাহেদ আলীদেরই এই হাল মৌলবাদীদের হাতে! হুমায়ুন আজাদদের কথা আর কী বলব!


তিন

কিন্তু মৌলবাদী উন্মাদনা নয়, সাম্প্রদায়িক শিল্পরুচি নয়, সাহিত্যে শেষ পর্যন্ত জয় হয় মানবতার, অসাম্প্রদায়িকতার। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী রাজনীতির তোড়ে ভাসতে ভাসতে সাধারণ মানুষের অর্জিত অভিজ্ঞতাই সম্ভবপর করে তোলে এ বিজয়। লেখক সেই সংগ্রামযজ্ঞে নিমিত্তমাত্র। লেখক না থাকলে অন্য কোনওভাবে এই অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হতো, ধারাবাহিকভাবে সংযুক্ত হতো মানুষের চলার পথে। উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আর ভয়াবহ সব দাঙ্গা, ভারতভাঙনের যাবতীয় নির্মমতা, দীনতা, গ্লানি, আতংক, ক্রোধ ও হতাশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে এ অঞ্চলের সাহিত্যের মধ্যে; কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, হিন্দি, উর্দু, গুজরাতি ইত্যাদি ভাষাতেও। হিন্দি সাহিত্যের যশপাল, রাঙ্গেয় রাঘো, উর্দু সাহিত্যের মুন্সী প্রেমচন্দ, সাদত হাসান মান্টো, খাজা আহমদ আব্বাস আর কৃষণ চন্দর, পাঞ্জাবি সাহিত্যের ভীষ্ম সাহানী কিংবা কুলবন্ত সিং বির্ক-এর নাম এ প্রসঙ্গে আমরা অনায়াসে মনে করতে পারি। এর মধ্যে কৃষণ চন্দরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। রাজনৈতিক চেতনা কৃষণ চন্দরকে দিয়েছিল ভিন্নধর্মী লেখার অভাবনীয় শক্তি। ষাটের দশকে তিনি তাঁর আদর্শের পথ থেকে সরে দাঁড়ান ঠিকই, কিন্তু এখনও তিনি মানুষের মনে অনুরণন তোলেন তাঁর সেইসব লেখা দিয়ে।

ভারত স্বাধীন হচ্ছে, পাকিস্তান স্বাধীন হচ্ছে; কিন্তু স্বাধীনতার সেই উল্লাস আমরা কৃষণ চন্দরের লেখায় খুঁজে পাই না। কৃষণ চন্দর দেখেন তাঁর দেশ খান খান হয়ে যাচ্ছে, মানুষের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে, চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। দাঙ্গা আর কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের অভিজ্ঞতা কৃষণ চন্দরকে ঋদ্ধ করেছিল। মানুষ কীভাবে এক মিছিলে দাঁড়ায়, সাম্প্রদায়িকতা কীভাবে সেই একতাকে ভেঙেচুরে দেয়, কেমন করে মানুষের ঘরবাড়ি, জমিন আর শরীর যতটা না ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয় তারও চেয়ে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয় মন ও হৃদয়,- এসব তিনি তুলে আনেন অনায়াসে। ‘অমৃতসর’, ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’, ‘লালবাগ’- কৃষণ চন্দরের এইসব গল্প কেবল গল্প নয়, ভাষাহীন মানুষের অব্যক্ত মন ও অচেনা এক ‘স্বাধীন’ দেশের উদ্দেশে নিরর্থক যাত্রার অবিস্মরণীয় দলিল। কৃষণ চন্দরের চেনা পাঞ্জাব পাল্টে যায় মুহূর্তের মধ্যে। তিনি যে পাঞ্জাবকে চিনতেন সেখানে একসময় হিন্দু মুসলমান আর শিখ এক হয়ে সংগ্রাম করেছিল। কিন্তু অচেনা পাঞ্জাবে অবিরাম রক্ত ঝরে, হিন্দু-মুসলমান-শিখের রক্ত নিয়ে হোলিখেলা হয়। ‘তিন গুণ্ডা’ গল্পে তিনি শেষ পর্যন্ত সক্ষম হন দাঙ্গাকে পরাজিত করতে। আমরা দেখি ধর্মঘটী আন্দোলনকারী জাহাজী শ্রমিক শ্রেণীকে বিজয়ী হতে। একদিকে শ্রমিকদের ধর্মঘট চলছে অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক অমানুষদের দাঙ্গা চলছে। মালিক শ্রেণী রীতিমতো ছক এঁকে দাঙ্গার দানব লেলিয়ে দিয়েছে, চেষ্টা করছে ধর্মের ধুয়া তুলে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শ্রমিকদের ঐক্য নষ্ট করার। কিন্তু দাঙ্গাকে পরাস্ত করে এই মেহনতী শ্রমিকরা এসে দাঁড়ায় জাহাজের ধর্মঘটী শ্রমিকদের পাশাপাশি। মানুষ দেখে তাদের বুকের রক্তে লাল হয়ে গেছে মুসলিম লীগের চানতারা পতাকা, লাল হয়ে গেছে কংগ্রেসের তিনরঙা পতাকা। কারও পক্ষেই আর দাবি করা সম্ভব নয় ‘এই পতাকা আমার।’ রক্তে রঞ্জিত সেই পতাকা হয়ে উঠেছে জনতার একতার লাল পতাকা। কৃষণ চন্দরের আরেকটি বই ‘এক বেশ্যার চিঠি’। এতে তিনি এমন এক পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেন যেখানে নেহরু আর জিন্নাহ দুজনই হয়ে ওঠেন ভয়ানক সাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’ গল্পটি লিখেছেন তিনি স্বীকারোক্তির আদলে। পেশোয়ার এক্সপ্রেস যাচ্ছে, স্টেশনে স্টেশনে থামছে যাত্রী ওঠানোর জন্যে, কোনওখানে আবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই তাকে থেমে পড়তে হচ্ছে দাঙ্গাবাজদের কারণে। এইসব যাত্রীদের অসহায়তা আর দাঙ্গাবাজদের উন্মত্ততা দেখছে নিষ্প্রাণ পেশোয়ার এক্সপ্রেস। আত্মকথনের স্বরে ট্রেনটি এক নিমগ্নতায় ডুবে যেতে যেতে বলছে ভয়াবহ সেইসব ঘটনা। এই হিংসা, উন্মত্ততা, রক্তের লহরী, পৈশাচিকতা এবং করুণ আর্তনাদ ও কান্নার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে শেষ স্টেশনে গিয়ে সে প্রার্থনা করছে, নতুন স্বপ্নের বিভোরতায় বলে উঠছে,


নিষ্প্রাণ কাঠে গড়া এক খালি গাড়ি ছাড়া আমি আর কিছু নই। তবু তোমাদের কাছে আমার প্রার্থনা, জঘন্য প্রতিহিংসা আর অসহ্য ঘৃণার ভারে তোমরা আমার দম আটকে দিয়ো না।



নতুন এক যাত্রার স্বপ্ন দেখে পেশোয়ার এক্সপ্রেস,


আমার সেই নবযাত্রা কী অপরূপ!… যার টাটকা হাওয়ায় সমুদ্রের স্বাদ। যেখানে হিন্দু বলে কেউ নেই, মুসলমান বলেও কেউ নেই। আছে কেবল মানুষ, প্রকৃতির আশ্চর্য সৃষ্টি।

হ্যাঁ, মানুষ – - কেবল মানুষ।

রাষ্ট্র মানুষকে আসলে কোন দেশ দিয়েছিল সেই সাতচল্লিশ সালে? সে দেশের ‘সামান্য’ ঠিকুজি খুঁজে পাই আমরা রাঙ্গেয় রাখোর ‘ঘরের খোঁজে’ গল্পে। সেখানে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া এক মানুষ তার স্ত্রী আর বোনকে নিয়ে কাতর হয়ে ছোটাছুটি করে আশ্রয় ও ঘরের আশায়। কিন্তু পাণ্ডারা তাকে ঘর দেবে না, শরণার্থী শিবিরে ঘরের জন্যে যে সেলামী দিতে হবে সেই সেলামী দেয়ার সামর্থ্য নেই তার। উদ্ধত চোখে তার সামনেই পাণ্ডা তাকিয়ে থাকে তার বোনের দিকে, কিন্তু সে বাধা দিতে পারে না। সে দেখে তার স্ত্রী আর বোনের মধ্যে চোখে চোখে কথা হচ্ছে, কিন্তু তাদের সেই চোখের ভাষা সে আর বুঝতে পারে না। তবে সে দেখে, একটি ঘর জুটেছে এবং সে ঘরের জন্যে কোনও সেলামীও দিতে হবে না। উদ্বাস্তু মানুষটি পাগলের মতো কাজের জন্যে নেতাদের কাছে দৌড়াদৌড়ি করে, কিন্তু নেতারা কোনও প্রতিশ্রুতিই দিতে পারে না তাকে। সন্ধ্যার পর শরণার্থী শিবিরে ফিরে মানুষটি দেখতে পায়, তার বউ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঘরে যেতে চায়, কিন্তু বউ তাকে মানা করে। অপরাধীর ভঙ্গিতে বউ বলে তাকে, ‘বিশ্বাস কর, আমাকে লোকটা পছন্দ করল না কিছুতেই।’ তারপরই সে বেশ আস্থার সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় সেলামী আর দিতে হবে না এবং সান্ত্বনার স্বরে বলে, “বিদেশ-বিভুঁয়ে আমাদের আর কি ইজ্জত আছে!” ধর্ম তার জন্যে যে-দেশ নির্মাণ করল সেটা তার কাছে বিদেশ-বিভুঁই, সেখানে সে আর ইজ্জতের প্রত্যাশা করে না,- সাতচল্লিশে পাওয়া দেশ হলো এই।


চার

হিন্দি, পাঞ্জাবি কিংবা উর্দু সাহিত্যের এই বিষয়জমিনের সঙ্গে ভাষাগত আল ছাড়া বাংলা সাহিত্যের তেমন তফাৎ নেই। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসন, শাসনপদ্ধতি, ঔপনিবেশিক রাজনীতির ধরণ আর বিভক্ত রাজনীতিবিদরা এভাবেই এখানকার সাহিত্যের জন্যে বিশেষ এক গড়ন তৈরি করে দেন। কিন্তু সেই সাহিত্য রাজনীতির অনুগামী হয় নি, বঙ্কিম কিংবা সিরাজীরও অনুসারী হয় নি। বঙ্কিম কিংবা সিরাজীদের সাম্প্রদায়িক শিল্পরুচি বরং সঙ্গতকারণেই বিকাশমান বাংলা কথাসাহিত্যে প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখোমুখি হয়। ঔপনিবেশিক রাজনীতির কাছে যা ছিল প্রধান অবলম্বন, সাহিত্যে তার কোনও পরিপূরক ধারা তৈরি হতে পারে নি। বরং সাহিত্য তার সৃজনশক্তি দিয়ে পুষ্ট করেছে মৌলবাদবিরোধী রাজনীতির ধারা। এক ভয়ানক অভিজ্ঞতার জন্ম নিয়েছে ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের মধ্যে দিয়ে। তারপর থেকে সেই অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ছে তো বাড়ছেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (প্রসঙ্গত লেখা দরকার, পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী লেখকদের সঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের বাংলাভাষী লেখকদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে) কিংবা অন্যান্য জায়গার বাংলাভাষা থেকে বাংলাদেশের বাংলা ভাষা সঙ্গতকারণেই অন্যরকম হয়ে উঠেছে, যদিও এই অভিজ্ঞতার উদ্গীরণকে তা রোধ করতে পারে নি। পৃথিবীর অন্য কোনও ভাষার কথাসাহিত্য এত মৌলবাদবিরোধী গড়ন পেয়েছে কি না তা গবেষণার ব্যাপার।


এই সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদবিরোধিতা থাকার পরও ভারতবিভক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষা আলাদা হওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতিপর্ব শেষ হয়ে যায়। জ্যোতির্ময়ী দেবী (সেই ছেলেটি), বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় (আচার্য কৃপালনী কলোনি, ভিড়), মানিক বন্দোপাধ্যায় (ছেলেমানুষী, স্থানে ও স্তানে) থেকে হাসান আজিজুল হক (পরবাসী) পর্যন্ত আসতে আসতে ভাষার এই ভিন্নধর্মিতা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি ভারতবিভক্তির তিক্ত টাটকা স্বাদ লেগে থাকা সতীনাথ ভাদুড়ির ‘গণনায়ক’ গল্পের পাশাপাশি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ পড়তে গেলে অজান্তেই আমরা বাংলা ভাষার এই ভিন্নমুখী অভিযাত্রা টের পেয়ে যাই।


পাঁচ

কিন্তু ভাষার গন্তব্য নয়, আমরা দেখতে চাই ভাষার ভিন্নতা থাকার পরও একই অভিজ্ঞতার নির্যাসে সিক্ত এক ভারত উপমহাদেশ। হিন্দু, মুসলমান, শিখ সবাই এই অভিজ্ঞতার অসহায় এক শিকার। একই বাংলার মানুষ, কিন্তু এক পার থেকে চলে যাচ্ছে অন্য পারে। একই পাঞ্জাবের মানুষ, কিন্তু নতুন এক সীমারেখা আলাদা করে দিয়েছে তাদের, তারা চলে যাচ্ছে একখান থেকে অন্যখানে। ধর্ম তাদের জন্যে নতুন অধিবাস নির্ধারণ করে দিয়েছে, স্থানান্তর অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আমাদের সামাজিক পরিভাষায় দেশ বলতে কেবল রাষ্ট্র বোঝায় না, দেশ ব্যবহৃত হয় কোনও কোনও সময় আরও সীমিত স্থানিক পরিসরে, এবং সেই স্থানিক পরিসরের সঙ্গে যোগ থাকে ব্যক্তিমনের সীমাহীন অনুভূতির, বিকাশের বিশালতার। কিন্তু মৌলবাদীরা তো বটেই আমাদের দেশের আরও অনেকেই এই সহজ সত্যটি জেনেও না জানার ভান করেন, বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করেন। তাই যখন বলা হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়েছিল, তখন তারা তেড়েমেড়ে পারলে মারতে আসেন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে যতটা, দেশ-এর সঙ্গে সামাজিকতার যোগ তার চেয়ে অনেক প্রবল; মননের যোগও রাষ্ট্রের চেয়ে দেশের সঙ্গে অনেক বেশি। ‘স্থান ও স্তান’- মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গল্পের এই নাম থেকেই অনায়াসে বুঝে নেয়া যায় দেশ নামক সামাজিক প্রত্যয়ের ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ার যন্ত্রণা-বেদনা। সতীনাথ ভাদুড়ির ‘গণনায়ক’ উন্মূল হওয়ার সেই কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমানকে যুক্ত করেন রাজনীতির ভূগোলের সঙ্গে। পূর্ণিয়া জেলার গোপালপুর থানা আর দিনাজপুর জেলার শ্রীপুর থানার কোনটা পাকিস্তানে আর কোনটা ভারতে তথা হিন্দুস্থানে যাবে তাই নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে সেখানকার সাধারণ হিন্দুমুসলমান। দু থানার সীমারেখা টেনে দিয়েছে নাগর নদী। নড়বড়ে কাঠের পুল তার ওপরে। আর তার পশ্চিমে আরুয়াখোয়ার হাট। এরকম এক ভৌগলিক বিন্যাসের হিন্দুমুসলমানের যাবতীয় উদ্বেগকে পুঁজি করে পতাকার ব্যবসা করেন, চোরাচালান করেন মুনীমজি আর হাজী সাহেব। কমিশন কি করবে তাই নিয়ে জল্পনাকল্পনা বাড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে, বাড়ে উদ্বেগ, ক্ষোভও বাড়ে কারও কারও; কিন্তু হাজী সাহেবের জন্যে ঠিকই চোরাপথের চিনি নিয়ে আসেন মুনীমজি, তাদের অলিখিত শ্রেণীবন্ধনে কোনও চিড় ধরে না। উদ্বিগ্ন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে শহর থেকে আসা মুনীমজির কাছে থেকে দেশের হালচাল শুনবে বলে। কেননা তারা যে দেশকে চেনে, সেই দেশ ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে, দেশের খবর জানতে তাই তাদের দাঁড়াতে হচ্ছে মুনীমজির সামনে। কিন্তু মুনীমজি ভীষণ নির্বিকার। তিনি ধীরেসুস্থে দাঁতন করতে থাকেন। সমবেত মানুষেরা উদ্বিগ্ন হয়, এরপর যদি তিনি স্নান করতে যান তা হলে তো আরও দেরি হবে। তার অনুগত সাঁওজিও খবর শোনার আশায় সেদিন আর জিজ্ঞেস করে না, স্নানের জন্যে তেল আনতে হবে কি না। মুনীমজি দইচিঁড়া আনতে দিয়ে বাদবাকি পয়সা ট্যাঁকে গুঁজতে গুঁজতে খুব শান্ত গলায় বলেন, ‘আর কী, দিনাজপুর জেলা তো পাকিস্তান হয়ে গেল।’ সতীনাথ ভাদুড়ি লেখেন, “কথার সুরে মনে হয় এ একটা সাধারণ খবর, হামেশাই এ-রকম বহু জেলা পাকিস্তান হয়ে থাকে।” কেউ তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করে ‘আর আড়ুয়াখোয়া?’ কিন্তু মুনীমজি আশ্বস্ত করেন তাকে, ‘আড়ুয়াখোয়া হিন্দুস্থানেই আছে, এখানে আর কারও টু ফ্যাঁ চলবে না।’ ভিড়ের মধ্যে ছিল সাধারণ এক মুসলমান হাটুরে অছিমদ্দি জানতে চায়, মীরপুর কোনখানে পড়েছে। মীরপুর হরিশচন্দ্র থানায় মালদা জেলায় জানার পর মুনীমজি জানান, ওটা পড়েছে পাকিস্তানে। আল্লার এই অসীম করুণায় অভিভূত অছিমদ্দি আর কোনও কথাই বলতে পারে না। কিন্তু কথা বলে বজরগাঁর পোড়াগোঁসাই। বজরগাঁ তথা জলপাইগুড়ি হিন্দুস্থানেই পড়েছে শুনে সে বলে ওঠে, “পড়বে না? বাপ-পিতাম’র আমল থেকে আমরা রয়েছি বজরগাঁয়ে। পাকিস্তানে চলে গেলেই হল! জল্পেশ্বরের এলাকা, মহাকালের রাজ্য, চলে যাবে পাকিস্তানে? বড়োলাট ভারি সমজদার লোক! নারায়ণ! নারায়ণ!” বলতে বলতে ভিড়ের মধ্যে প্রায় নিঃসঙ্গ অছিমদ্দির দিকে জলন্ত দৃষ্টি ফেলে চলে যায় সে।

কিন্তু আল্লার প্রতি অভিভূত হয়ে নয়, অছিমদ্দি প্রকৃতার্থে আশ্বস্ত হয় ভিটে ছেড়ে যেতে হবে না বলে; নারায়ণের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নয়, পোড়াগোঁসাইয়ের দৃষ্টি আসলে জ্বলে ওঠে দেশে থাকার অধিকার আছে জানার ফলে। ধর্ম তাদের কাছে উপলক্ষ, দেশই আসল কথা। তারা ধর্মের কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়, কেননা ধর্ম তাদের দেশেই থাকার মতো সামান্য স্বস্তি দিতে পেরেছে। যদিও ভাঙচুর থামে না, থামে না রক্তক্ষরণ,কেননা সবাই তো আর তাদের দেশে থাকতে পারে না, ধর্ম তাদের নিজের দেশে রাখতে পারে না। মুনীমজি সেই ভাঙচুর আর রক্তক্ষরণকে পুঁজি করে একবার হিন্দুস্থানের পতাকা বেচেন, আরেকবার পাকিস্তানের পতাকা বেচেন। হিন্দুস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার গুজবে সেই পতাকা উড়িয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে হিন্দুর দল, পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার গুজবে চিৎকার করতে করতে পতাকা ওড়ায় মুসলমানের দল। পাকিস্তানের পতাকা রাখা যাবে না, সবাই ফ্ল্যাগ জমা দেয় মুনীমজির কাছে, তিনি সেই পতাকা নিয়ে আবার ছোটেন নতুন এক এলাকাতে, যেখানে সেই পতাকা বেচা যাবে।

আরও এক দেশের কথা জানতে পারি আমরা সলিল চৌধুরীর কাছে থেকে। তাঁকে অবশ্য আমরা চিনি একজন উঁচু মানের সঙ্গীতকার হিসেবে। কিন্তু ‘ড্রেসিং টেবিল’- এই এক গল্পই তাঁকে ভাস্বর করে রেখেছে। এক সাধারণ মেয়ে নন্দার বিয়ের পর কলকাতায় চাকরি পাওয়া স্বামীর কাছে বাসায় ওঠার আগে একটাই বায়না ছিল : সংসারের জন্যে ভাল একটি ড্রেসিং টেবিল কিনতে হবে। বাপের বাড়ির ভাঙা আয়না তাকে জন্ম থেকেই দুঃখী করে রেখেছিল। যা থাকে কপালে, মাইনে পেয়ে বেতনের অর্ধেক দিয়ে নন্দার স্বামী কিনেছিল ড্রেসিং টেবিল। আর নন্দা উল্লসিত হয়ে উঠেছিল সেটি পেয়ে। আয়নার সামনে আত্মমগ্ন প্রচণ্ড হাসিখুশি নন্দাকে দেখতে দেখতে তাঁর স্বামী ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে নন্দার দু চোখ কাঁদতে কাঁদতে ফুলে উঠেছে, সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। কী হয়েছে জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আবারও কেঁদে উঠে আয়নাটা ফেরৎ দিয়ে আসতে বলে। স্বামীর ধারণা হয়, একটু পুরনো ড্রেসিং টেবিল বলেই নন্দা এইভাবে কাঁদছে। কিন্তু তা নয়। নন্দার কান্নার কারণ, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে পাওয়া কয়েকটি চিঠিপত্র। বাগেরহাট থেকে রহিমুদ্দিন চৌধুরী নামের এক শিল্পী চিঠি লিখেছে হাওড়ার উজানীপাড়ায় থাকা আমিনা চৌধুরীর কাছে। এই চিঠিগুলোর একটায় লেখা হয়েছে,

… অমল চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছে- মালপত্র বাঁধাছাদা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই ওরা পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতায় রওনা হবে। আমাকে ওরা আশা করেনি- অমলের বৌ একটু ফিকে হাসল।

‘ব্যাপার কী, অমল? কী খবর বৌদি? তোমরাও শেষকালে চললে?’

বৌদি হাসবার চেষ্টা করল, ‘তোমাদের দেশে তো আর আমাদের জায়গা হবে না ঠাকুরপো!’


‘আমাদের দেশ? আমাদের দেশ মানে? খুলনা তো অমলের দেশ- আমার দেশ ২৪ পরগণা- যাচ্ছ তো আমার দেশেই শুনছি।’

‘আজকাল আর তা নয়- এখন মোছলমানের দেশ পাকিস্তান আর হিন্দুর দেশ হিন্দুস্তান।’


এইভাবে দেশকে রাজনীতিকরা এবং অচেতন হিন্দু আর মুসলমানরা মিলে হিন্দু কিংবা মুসলমানের রাষ্ট্র বানায়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী, নিরুপায় ও নিরর্থক যাত্রার মুখোমুখি দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ উচ্চারণ থেকেই বোঝা যায় ধর্মের সেই রাষ্ট্র তাদের হৃদয়ের দেশ নয়। তাদের হৃদয়ের দেশকে টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলছে ধর্মের দেশ। তারপর সংক্ষেপে বললে, হাওড়ার উজানিপাড়া থেকে আমিনা চৌধুরীর ড্রেসিং টেবিলটি চলে আসে কসবার আসবাবপত্রের দোকানে। কেন আসে, কীভাবে আসে বলার নিশ্চয়ই দরকার নেই। এই গল্পেই দেখছি, মুসলমান বলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার দীনতা কেবল এখানকার মৌলবাদীদের একচেটিয়া নয়। দেশবিভাজনের সেই সময়ে সলিলের গল্পের আমিনা চৌধুরীকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্লাস নেয়া বন্ধ করতে হয়। মুসলমানের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা ঠিক নয় বলে হিন্দু ছাত্রছাত্রীরা বয়কট করে তাকে। রহিমুদ্দি আমিনাকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠি লেখে – তোমাকে দেখে যারা কথা না-বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আমি অন্তত বিশ্বাস করি তাদের রবীন্দ্রসংগীত শেখবার কোন অধিকার নেই, কিন্তু এ-বিশ্বাস হারিও না যে এরা সবাই ভালো- এদের বাদ দিয়ে একা তুমি যাবে কোথায়?


চিঠিগুলো, ড্রেসিং টেবিলটি নন্দা আর নন্দার স্বামী যত্ন করে রেখে দেয়, নন্দার স্বামী চিঠিগুলো নিয়ে গল্প লেখে এই আশায় যে, কোনওদিন হয়ত তা রহিমুদ্দিন কিংবা আমিনার চোখে পড়বে। তখন তারা ড্রেসিং টেবিল আর চিঠিগুলো ফেরৎ নিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের কাছে কেউ আসে না। বরং একদিন নন্দার স্বামীর চোখে পড়ে একটি বাংলা কাগজে ছাপা হওয়া ছোট্ট খবর :

হাওড়া স্টেশনের নিকট গতকাল এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করিতে দেখিয়া পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাহার কাছে একটা ব্যাগের মধ্যে কয়েকটি তুলি ও কিছু স্কেচ ছবি পাওয়া গিয়াছে। সন্দেহ হয় সে হাওড়া স্টেশন ও পুলের প্ল্যান আঁকিয়া নিতেছিল। নাম জিজ্ঞাসা করিলে সে পাগলের ভান করে ও বলে : ‘একজন মানুষ।’ খবরের হেডলাইনে লেখা- ‘পাকিস্তানের গুপ্তচর গ্রেপ্তার।’


সলিল চৌধুরীর গল্পের শেষবাক্য, গুপ্তচর প্রসঙ্গ আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশশাসন ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রে আমরা গুপ্তচর ধরার এই যোগ্যতা অর্জন করেছি। খুব সহজেই এখানে নাশকতা খুঁজে পাওয়া যায়, বিদেশী চক্রান্ত খুঁজে পাওয়া যায়, গুপ্তচরও খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা আমাদের শাসকরা চান দেশ নামের সামাজিক প্রত্যয়টিকে মনের গহীন থেকে নষ্ট করে ফেলতে, তার বদলে রাষ্ট্র নামের ভয়াল বিকটাকার দৈত্যকে আরও বড় করে তুলতে। তাই অনায়াসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী কাউকে আমরা খুঁজে বের করতে পারি, যেমন গল্পের রহিমুদ্দিন চৌধুরীকে পেয়েছিল ভারতের সরকার, বাস্তবে ঠিক একইভাবে আমাদের জোট সরকার পেয়েছিল শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, সালিম সামাদ, প্রিসিলা রাজ কিংবা পার্থকে।


পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, অনেক বেশি সংঘবদ্ধ রাষ্ট্র খুঁজে পেয়েছি আমরা এতদিনে। এই রাষ্ট্র এত ‘নির্মোহ’ যে অনায়াসে একসময় যারা দেশের মতো রাষ্ট্রগঠনের বিরোধিতা করেছিল তাদের আত্মস্থ করে ফেলতে পারে। কিন্তু এ রাষ্ট্রকাঠামো তীব্রভাবে ঘৃণা করে তাদের সবাইকে যারা মনে, হৃদয়ে, মৃত্তিকায় দেশ খুঁজে ফেরে, দেশকেই রাষ্ট্র বানাতে চায়, ধর্মকে নয়। অনেক আগে দাঙ্গার ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ রচনার মধ্যে দিয়ে পূর্ববাংলার বাঙালিরা শুরু করে তাদের সেই আপন দেশের অনুসন্ধান। কিন্তু হাসান আজিজুল হক অবধি এসেও তাদের সেই অনুসন্ধান শেষ হয় না, বরং তারা আরও বেশি পরবাসী হয়ে যায়। কেননা সামাজিক প্রত্যয়ের বিকাশ, বিস্তৃতি আর উদ্ভাস হয় রাজনীতির চেয়েও অনেক অনেক মন্থরগতিতে। হঠাৎ করে তা দেখা দেয় না, হঠাৎ করে তেমনি লোপ পায় না। হাসান আজিজুল হক দাঙ্গার সময় পেরিয়ে, দেশভাগের অনেক পরে লিখেছেন তাঁর ‘পরবাসী’ গল্প। অন্য এক দশকের ঝাপটায় গল্পের ভাষাকাঠামো আলাদা হয়ে গেছে, পাঠকের স্বাদ অন্যরকম হয়ে গেছে, আর এই ভিন্নতা বিষয়বস্তুতেও এসেছে অনেক গোছালোভাব। কিন্তু এত কিছুর পরও পাল্টায় নি পরিণতি। কেননা দেশ খোঁজার পরিণতি সব যুগেই একইরকম। ‘পরবাসী’তে অনন্যোপায় এক উদ্বাস্তু সীমান্ত পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গুলি এসে তার গতি রুদ্ধ করে। গল্পের শেষে আমরা দেখি,


চোখের ওপর থেকে অন্ধকার পরদাটা যেন সরে গেল আর তার চোখের পানিতে ধূসর হয়ে এলো দু’টি পৃথিবী- যাকে সে ছেড়ে এলো এবং যেখানে সে যাচ্ছে।


ছয়

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভারতবিভক্তি, পঞ্চাশ কিংবা চৌষট্টির দাঙ্গার পর আমাদের সামনে আবারও এক বড় ধরণের প্রশ্নবোধক চিহ্ন‎ হয়ে উঠেছে ২০০১ সালের নির্বাচনপরবর্তী পরিস্থিতি। একইভাবে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলাম একাত্তরেও। সঙ্গতকারণেই মনে হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ নামের ছোট্ট এক উপন্যাসের কথা। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ আমাদের জানিয়ে দেয় যুদ্ধোন্মাদনার সঙ্গে ধর্মোন্মাদনাকে মিলিয়ে একজন হিন্দু নারীকে কতভাবে ইন্টারোগেশন করা যায়, মানসিক কষ্ট দেয়া যায় এবং তার শরীরকেও কত বিকৃতভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যায়। সৈয়দ শামসুল হকের চেয়ে অনেক পরের গল্পকার রাশেদ উন নবীর আশির দশকে লেখা এক গল্প ‘কৃষ্ণপ্রতিপদ’-এও দেখি, মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার অনেক পরে সীমান্তের ছোট্ট শহর নওগাঁ থেকে খুব আস্তে করে মুছে যাচ্ছে কপালে টিপ দেয়া মাধুরীদের সুখদুঃখ, হাসিকান্না। তারপর আমরা এক ঝটকায় ২০০১ সালে চলে আসি। এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য তেমন কোনও সাহিত্য খুঁজে পাই না দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার নাড়িছেঁড়া বোবা কান্না নিয়ে।

তবে কি আমরা শেষ পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা ইসমাইল হোসেন সিরাজীর পাপস্খলন করতে পারব না? সাহিত্যের শিল্পরুচিতেও থাকবে না মৌলবাদবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা? একটি দেশ, যার আর কোনও অস্তিত্ব নেই, কিন্তু যে-দেশ অস্তিত্ব না থাকার পরও বেঁচে থাকে রাষ্ট্রপক্ষের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, সেই দেশের কোনও অস্তিত্ব আর থাকবে না কোনওখানে? ভূগোলে সে বিলীন হয়ে গেছে, রাজনীতিতে সে আছে বিকৃত হয়ে, সাহিত্য ছিল তার শেষ আশ্রয়। সেই সাহিত্য থেকেও কি তবে বিলীন হয়ে যাবে অনুভূতিময় সেই সামাজিক দেশ?*





লেখক পরিচিতি
ইমতিয়ার শামীম

গল্পকার, উপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন