সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০১৩

সংযোগে ছায়া


নাহার মনিকা

রক্তক্ষরণ দেখলে শরীরে আতংকের কাঁপন শুরু হয় ইমনের। অভ্যন্তরের কোটি কোটি শ্বেত-লৌহ কনিকার প্রবাহমান ধারা সামান্য বেরিয়ে গেলেই অহেতুক এক ভয়ের বিশাল মুখগহবরে ছোট্ট তৃণখন্ড হ’য়ে ঢুকে পড়তে তার বেশীক্ষণ লাগে না। নিজের রক্ত দেখে কয়েক মূহুর্তের সংজ্ঞালোপ তার আগেও হয়েছে। সেজন্যে হয়তো বাপের বিচলিত ভাব কম। জং ধরা পেরেকের এমন আধা ইঞ্চি প্রবিষ্ট হবার ক্ষমতা, তাও আবার পায়ের গোড়ালীর কাছে রগ বরাবর! রোদ-জলে পুড়ে, মচমচে শরীরে রক্তে হাবুডুবু খাওয়ার পর এখন তার শলাকা শরীরে আকণ্ঠ তৃষ্ণা মেটার পরিতৃপ্তি। ইমন পেরেকটা নেড়েচেড়ে দেখে।

“আজকে না গেলে হয় না? দিনটা দেখা দরকার। অত রক্ত গেলো” একাউন্টেন্ট সাহেবের পাতলা চুল, চোখের নীচে কালি, আর বেল্টের স্বাভাবিক ছিদ্রের বাইরেও বাড়তি দুই ঘরের একটায় আটকানো অবিন্যস্ত ভূড়ি। অফিস যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলো। তার নরম কন্ঠ শুনে ইমন জিন্সের গোটানো পা সোজা করে উঠে দাঁড়ায় - “না না আজকেই যাই, কিচ্ছু হবে না, বাহাত্তুর ঘণ্টার মধ্যে টিটেনাস নিলেই হবে”।
ধারালো রোদযুক্ত সকালে যুবক ছেলের আত্মবিশ্বাস বাপের চাউনিতে প্রশ্রয় যোগ করে।

আজকে ফিরে যেতে হবে। ফিরে যাওয়া কিংবা আসা এই শব্দগুলোর আপেক্ষিকতা সময় সময় তেমন কোন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয় না। ‘ইমন যেখানে যায় সেখানে অধিষ্ঠান করে না’,- দুহাত পেছনে নিয়ে মাথা হেলান দিয়ে ইমনের ভাবনা রিলাক্স করে। ‘আবার না গিয়েও কত জায়গায় জুড়ে থাকা যায়’,- প্রায় ফাঁকা ট্রেনের বগিতে ব্যাগ তুলে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নজিবরকে বিষয়টা বোঝাতে ইচ্ছে করে, কিন্ত এই যোগসূত্র সে বুঝবে?

উল্টোদিকের সীটে ব্যান্ডেজ বাঁধা পা তুলে দিয়ে বসেছে ইমন। ব্যথাটা ইট চাপা ঘাসের মত সোজা হয়ে বাড়তে পারছে না। থাকুক, আপাতত চাপা। পেইন কিলার খেয়ে নিয়েছে দুটো, এক ঘুমে যতদুর যাওয়া যায়। গত রাতে ঘুম হওয়া দরকার ছিল। ইনসোমনিয়া - টিয়া না। দুপুরের ঘুম সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ালে রাতের বেলা ঘুমের আর দোষ কি? কিন্তু এখানে এসে করবেই বা কি? মোবাইল ফোনও আসার দিন বেহুদা হারিয়ে গেল। অদ্ভুত না? ইমনের অসহিষ্ণু চোখ চশমার লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রকট হয়ে প্রকাশ পায়। বাসে, নাকি ট্রেনে কোন ষ্টেশানে, যখন ঝুঁকে জানালা দিয়ে বাইরের অরাজনৈতিক প্রকৃতি আর লোকালয় ভেদে পালটে যাওয়া ট্রেনের শব্দ অনুভব করছিল, নাকি যখন কামরার ভেতরেই ফেরীঅলার চীপ্সের প্যাকেট দরদামের সময়। সীটের ওপরেই তো রাখা ছিল, তাহলে? একটা ‘তাহলে’ দিয়ে তার বর্তমানের সঙ্গে আগামীকালের বায়ুতরঙ্গে কিছুটা ছেদ পড়ে, মনে হয় আসার দিন যে সিএনজিতে ক’রে বাসষ্ট্যান্ডে আসছিল, সীটের ওপর মনের ভুলে ফেলে আসেনিতো? নিজের মাঝারী সাইজের ব্যাগের সঙ্গে এইসব ভাবনা গুছিয়ে নামতে মফস্বলের গতানুগতিক রেল ষ্টেশানে ইমনের দেরী হয়নি। তারপরও গোটা দশ-বারো রিক্সা আর ঠেলা গাড়ীর ভিড়ে বাপ ছেলের পরস্পর পরস্পরকে খুঁজে পেতে মিনিট দশেক লেগে গিয়েছিল।

বাপের কর্মক্ষেত্রে বেড়ানোর ইচ্ছে একদম ছিল না ইমনের। কিন্তু কেমন এক পায়তারার মধ্যে পড়ে চলে আসতে হলো। পরীক্ষা শেষ হ’লে দুস্প্রাপ্য ঘ্যান ঘ্যান সস্তা হয়ে যাচ্ছিল- “যাবি না কেন, এখন তো আরো বেশী যাওয়া দরকার। না গেলে বুঝবে কি করে যে তোমার অধিকার আছে”।
তাও ইমন পাত্তা দেয় নি কিন্তু বড় সমস্যা হলো- ল্যাপটপ নষ্ট, যেটা দিয়ে ইমনের মনে হয়, মনে হয় কেন, সে বিশ্বাস করে যে তার স্নায়ুকোষ বায়ু-তরঙ্গ ছুঁতে পারে। এর মেরামতি বা আরেকটি নতুন কেনা দরকার। ওয়েবসাইট বানাবার ব্যাবসার জন্য শাহীদ আর নাজাকাতের কাছে প্রাথমিক টাকাটার যোগাড় আছে, আর লাগলে মার কাছ থেকে নিতে হবে কিন্তু কেন যে মহিলা এইবার বল তার কোর্টে ফেলে দিচ্ছে!

অগত্যা, ঢাকার বাইরে একা কোথাও না বেরুনো ইমন নিজেকে একঝাঁক মাছের দাবড়ানোর মধ্যে দেখতে দেখতে বাস ট্রেন তারপর রিক্সা জুটিয়ে নিজেকে এনে ফেললো শেষ না হওয়া কনষ্ট্রাকশনের নীচ তলায়। দোতলার ছাদে ঢালাইয়ের কাজ চলে, মিস্ত্রিরা ওঠানামা করে, বাঁশ আর তক্তার খাঁচাবন্দী সিঁড়ি আর ধুলোমাখা পায়ের ছাপ ছাদে উঠতে নিরুৎসাহ দেয়। মগবাজার দুই বেডরুমের চেয়ে বড় বাসা। উল্টোদিকে রাস্তা ঘেষে সীমানার কাঁটাতারের বেড়া। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেকে তারকাঁটার গায়ে সেঁটে জিম মরিসন, যেমন মগবাজারের দুই বেড রুমের অর্ধেকটায় দেয়ালে টানানো আছে, ল্যামিনেটেড, সেরকম বোহেমিয়ান ভাব আনতে মন চায়, কিন্তু নিজের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যের দেয়াল তাকে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে পৌঁছুতে বাঁধা দেয়।

ড্রইংরুমের লাগোয়া ঘরে ইমনের বিছানা, শাদা খয়েরী খোপ খোপ চাদরে- রোদে শুকানো চনমনে গন্ধ। লম্বা আয়নাঅলা সাবেকী ড্রেসিং টেবিলে কয়েকটা মেয়েলী জিনিস, চুলের ক্লিপ, টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখা নারকেল তেলের ব্র্যান্ড, ক্রিমের কৌটা,- নজিবর সবকিছু দুহাতে জাপ্টে ধরে নিয়ে যায় ভেতরের ঘরে। অল্প আলোর প্যাসেজে দাঁড়িয়ে ইমন দেখে, আলনায় শাড়ির বেগুনী আভাস, দরজার কাছে কাঠের সেলফে মেয়েদের কয়েক রকম স্যান্ডেল। ভেতরের ঘরটা সীমান্ত পারাপারের আনুষ্ঠানিকতার মত দরজা ভিড়িয়ে রাখে। তার দু পা, কোন রকম বিবেচনা ছাড়াই ওই দরজা পার হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

বাপের সঙ্গে খেতে বসলে বেগুনী শাড়ি আর কালো স্যান্ডেল একটা অবয়ব নিয়ে হাঁটা চলা করে, ইমন তার চোখ, নাক কিংবা ঠোঁটের ভাঁজের কোন হদিস পায় না। শাড়ির আঁচলের পাশে লম্বা বেনী দেখতে পায় শুধু। অবয়বহীন চেহারায় ইমন নিজের ইচ্ছেমাফিক মুখোশ পরিয়ে দেখে। সেই মুখোশের চোখে ভাসে কৌতুহল, অল্প সমীহ করা দূরত্ব অথবা ইর্ষার মত কিছু একটা কি? ভালো করে দেখতে গেলে তার চশমা চোখে দিতে হয়। কিন্তু মুখোশটা বেশীক্ষণ থাকেনা, খুলে প’ড়ে আবারো সেই নাই চোখ, নাই মুখের অবয়ব ঘরময় ঘুরে ঘুরে কাপড় ভাঁজ করে, বিছানা টান টান করে।

কম্প্যুটার আর নেটের অভাবে বিছানায় শুয়ে গড়িয়ে ছটফট করে ইমন। এ ঘরের দেয়ালে বারান্দার আলো চৌকোনা রেশ রেখে গেলে তার অস্থিরতা বাড়ে, অভ্যাসের চেয়েও তীব্র অস্বস্তির সঙ্গে তার আর ঘুমের অনেকক্ষণ কুস্তি চলে। এক হাত দেখে নিতে নিতে ভোরের দিকে ঘুম তাকে কাবু করতে পারে।

সকালের ভাঁজ খোলা রোদ চোখ মুখে আছড়ালে ঘুম ভাঙ্গে।বাপ বেড়িয়ে গেছে অফিসে। চায়ের কাপ রেখে সঙ্গের জিলেপি-মিষ্টি ফিরিয়ে নিতে বললে নজিবর দ্বিধা করে-“গতকাইল বাদ জুম্মা খালাম্মার কুলখানির দোয়া পড়াইছে চাচা”।

নিজে আগবাড়িয়ে ইমনের না মিটলেও চলে ধরনের কৌতুহলের একটা মীমাংসা করে নজিবর । “আপনে কাইল সকালেই জাইবেন, না হইলে তো টুম্পা আপার সাথে দেখা হইতো”।
খাবার দাবার দেয়ার পাশাপাশি, বাপ কি একে ইনফরমারের দায়িত্বও দিয়ে গেছে? মগ বাজারের দুই বেড রুমে উড়তে থাকা বাপের সঙ্গে মায়ের চড়া গলার ঝগড়ায় কত কত অপরিচিত নাম পিং পং বলের মত এদিক সেদিক টক টক শব্দে লাফালাফি করেছে। টুম্পার কথা শুনলেও, মনে পড়লেও না জানার ভান করলে নিজেকে কম কোণঠাসা মনে হয় -“টুম্পা আপা কে?”

-“আপনার বোন হয়, এইট কেলাশে পড়ে, খুব কান্দাকাটি করতেছিল, তাই নানার বাড়িত পাঠায়া দিছে চাচা। আপার মামায় আসপে পোউছায়া দিতে, শুক্কুরবার। ইস্কুল খোলা তো”।

টেবিলের ওপর টুক টাক প্রসাধনী তাহলে মা মেয়ের যৌথ ব্যবহার সামগ্রী। কিন্তু ইমন কেন এ বাড়ির কোথাও এক কিশোরীর অস্তিত্বের ছিটেফোঁটাও অনুমান করতে পারেনি। তার শোবার ঘর প্রস্তুত করতে অন্য একজনের বসবাসের সব চিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে, অথবা ক্ষীণদৃষ্টি ইমন দুরের কিছু দেখে না বলে তাকে এড়িয়ে সব ঘটনা ঘটে যায়! ………

সন্তাপ, নাকি তাকে ঘিরে অসন্তোষ ইমন বুঝতে পারেনা কিন্তু বাপের ভ্রুর ওপরে এরকম কিছুর অস্থায়ী ছাপের কারণে তার বিকেলের ঘুম গাঢ় হ’তে গিয়ে সন্ধ্যাবেলার মুখে ভেঙ্গে যায়। পশ্চিমমুখে ম্রিয়মান সূর্য দিক ভুল করছে ভেবে তার দাঁত মাজতে ইচ্ছে করে, গোসলেরও। দুপুরে খাওয়ার পরে – বন্ধ ঘরের ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে ইমন অনেকক্ষণ একা জেগেছিল। বিছানায়, তর্জনী দিয়ে ক্রস পাজল আকঁতে গিয়ে তার হাতের ওপর দিয়ে হাজার হাজার মৌমাছি ছুটে গেছে। মাথার ভেতর ঝিম ধরানো ঘোর হলেও তারা হুল ফোটায়নি। উঠে গিয়ে আয়নার সামনে টি-শার্ট খুলে নিজের দিকে চেয়ে থেকেছে, পাঁচ ফিট ছয়, পেশী না থাকার গোপন দুঃখ পাত্তা দেয় না ইমন, তার মাথা পরিস্কার। তার বুক লোমশ না তাই শাম্মী দুই বার তাকে সীমারের বংশধর বলেছিল। একবার মগবাজারের অর্ধেকে, মা বাইরে। তার খালি বুকে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে-‘একটু পুরুষালী বুকের খায়েশ ছিল’- শাম্মীর শরীরের খাঁজে তার তৎপরতা শিথিল না হ’লেও মনে মনে সে নিজেকে পাশ না করিয়ে লাল দাগ দিয়ে রেখেছিল। আরেকবার, শেষবার পাখী উড়াল দেয়ার আগে, চ্যাটে একই কথা রোমান অক্ষরে লিখে পাঠিয়েছিলো।

খুট করে জিন্সের জিপার টেনে নীচে নামায় ইমন, প্যান্টটা শ্লথ গতিতে মেঝেতে নামে, সাথে তার অন্তর্বাস। ল্যাপটপটা থাকলে ভালো হতো। কিছু রসদ ওখানে ডাউন লোড করা আছে। ফটো, ভিডিও’র অনুসঙ্গ না থাকলে ইদানিং ভালোই অভিনিবেশ লাগে এই সময়। আর এখানে বাপের ভ্রু কুচকানো দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে কি হয়? অবশ্য ড্রইং রুমের আলোতে দাঁড়িয়ে তার মনে হয় কেন খামোখা সংকোচ করছে? সংকোচের কি আছে? আট বছরে ষোলবার না হলেও দশবার তো বাপের সঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছে।

ঘুম ভাঙ্গা গাঢ় স্বরে চায়ে চুমুক দিলে – সোফা থেকে বেমানান দূরে টেলিভিশনে ‘আজকের শীর্ষ খবর’ শুরু হয়। ইমনের চোখ মুখ কৌতুহলহীন, টিভির ওপরে রাখা মেইড ইন চায়না ফটো ফ্রেমে টাই ছাড়া শাদা শার্টের হিসাব রক্ষক আর ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় বাদ পড়া ক্লাস সেভেনের ইমনকে দেখে। ঐদিন তোলা আরেকটা ফটো মগবাজারের দুই বেড রুমের অর্ধেকে আছে। ক্লাস সেভেনের পাশে মায়ের পার্ম করা চুল, পাতলা ব্লাউজের হাতায় আলগা লেস। মা সেই ফ্রেম থেকে এসে তার ঘাড়ে মাথায় হাত বোলায়-“যা বাইরে হেঁটে আয়, গা ম্যাজ ম্যাজ কমবে”। বাক্যটার শেষ অংশে বাপের গলা যুক্ত হয়-“ কী যে হয় তোমাদের, কম্পিউটার, মোবাইল ছাড়া দুই দিন টিকতে পারো না”।
বাপের কথার কোনা বেডকভারের সঙ্গে মশারী বেঁধে দেয়ার মত বেখাপ্পা ঠেকলে ইমন দেখে এটা ফটো ফ্রেমের ভেতরে স্মিত হাসির লোকটা না।

ইমন হাঁটতে বের হতে চায়, স্যান্ডেল পায়েই। অসুবিধা কি? এখানে তাকে যারা দু একজন চিনেছে, তারা তো জানেই। একাউন্টেন্ট সাহেবের ছেলে, ঢাকায় থাকে, প্রথমপক্ষের। কিন্তু ঘুমের বাইরের অন্ধকারে আতংক তাকে না দেখা ডাইনোসরের লেলিহান জিভের দিকে ঠেলতে থাকলে তার মনে হয়- লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির চেয়ে ঘুমিয়ে থাকা ভালো।

এ শহর থেকে সীমান্ত কাছে। বাপ গতরাত্রে একবার ঘুরতে যেতে বলেছিল,“এক পা ইন্ডিয়ায় আর এক পা বাংলাদেশে দিয়ে দাঁড়াইতে পারবি '।  
নাহ, সীমান্ত, মানচিত্র পোষায় না আর। ‘সে এক মানচিত্রহীন জগত আছে, যেখানে ইমন বাস করে’।
চশমার পুরু লেন্সের পেছনে ইমনের চোখ হাসে। তার বাপ মা সে জগতের খোঁজ পাবে কোথায়?

বাপ এখানে বদলী হয়েছে বছর দুই আগে, আরো দু চার জায়গায় বদলী কাটিয়ে। আর মা তদবীর, ঘোরাঘুরি আর ঠিক মানুষকে ধরে ধরে রাজধানীতে নিজের পোষ্টিং ঠেকিয়েছে গত আট বছর। এই আট বছর বাপের অস্থাবর জীবন জ্যান্ত কাঁটাগাছ হয়ে তাকে বিদ্ধ করলে সে পালিয়েছে, উটপাখির মত বালিতে ঠোঁট গুজে। তার জন্মদাতা বাবা হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি, পায়নি নাকি ইচ্ছে করে হয়নি, এই দ্বন্ধ তাকে অনেক ভুগিয়েছে। এখন সে আর ভাবে না।

-“বাইরে যাস না, তোর বন্ধু টন্ধু ডাক একদিন, দেখি?” মার কথায় ইমনের রাগ হয়।

-“বন্ধু আছে। তুমি দেখে কি করবে?”।

-“ছেলের বন্ধুকে মা দেখতে চাইতে পারে না?”

-“!! তোমার এত খবর কি আমি নিতে চাই?”, মায়ের হতভম্ব চোখের সামনে দরজা ঠাস করলে তাকে ঘাটানোও বন্ধ হয়েছে।

দরজার ওপাশে দুই বেড রুমের অর্ধেক, তার চেনা জগত, কম্পিউটার, নেট, সিডি প্লেয়ার, দেয়ালে পোষ্টার। অন্যপাশে সে অতিথির মত খেতে এলে সে শিষ দিতে চেষ্টা করে, কিন্ত ছোট বেলায় না শিখতে পারা বিদ্যা এখন আর আয়ত্ব হয় না, তার দুই ঠোঁট গোলাকার কুঞ্চিত হয়ে যে ধ্বনি জন্ম দেয় তাকে আর যাই হোক শিষ বলা যায় না। ভেতরে ভেতরে দমে গেলেও এই একটা বিষয়ে সে গোপনে অধ্যাবসায় রেখে চেষ্টা করে চলে।

বয়সী শক্ত শিরার কোল ঘেষে কচি পাতা, বাপের পাশে নিজেকে মানানসই লাগে। অফিসের পিকনিকে গিয়ে যে নিজের ছেলেকে শিষ দেয়া শেখায়। বাপের মত তীক্ষ্ণ সুর দু ঠোঁটের ঘন কেরামতিতে তুলতে পারেনা বলে ইমনের ক্লাস থ্রি হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে শুরু করে আর নোঙ্গর করা নৌকার গুলুই টাল মাটাল দোল খায়। সে ভয় পেয়ে ধুপ করে ভেজা বালির পাড়ে লাফ দিয়ে নামে, আর তারপর বসে প’রে শিষ-তাড়িত হয়ে কান্না থামায়। পাড়ে পিকনিক পার্টির আরো লোকজন, বাবুর্চিরা রান্নার আয়োজন করে। নৌকা ভর্তি আরো মানুষ দুপুরের পরিস্কার আলোয় শুদ্ধ সুরে “এই রাত তোমার আমার” শোনে। এর মধ্যেই পিকনিকের ছাগল জবাইয়ের রক্ত দেখে ইমন অজ্ঞান হলে তার বাপ শিষ বাজানো বন্ধ ক’রে অস্থির হয়ে যায়।

গত সন্ধ্যায় বাপ সামান্য উচ্ছসিত ছিল। একটা ভিজিটিং কার্ড সামনে ধরে- “হায়দার সাবের সঙ্গে কথা বললাম। ইন্টার্ণশীপ করার ব্যবস্থা করবে। খুব ভালো লোক, কিশোরগঞ্জে এক সাথে কাজ করতাম”।
বাপের হাওয়াই শার্টে একের পর এক বোতাম তার নির্দিষ্ট ঘর থেকে আলগা হয়ে খুলে গিয়ে যোগ দেয় হায়দার সাহেবের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতির বুদ্বুদে। ইমন সেই বুদ্বুদের ফেনায় ভাসতে গিয়ে আটকে যায়। বাপ তার নিজের জেনারেশানের চেয়ে পিছিয়ে নেই। অহেতুক অভিযোগ করে কেন সবাই? সবাই আবার কে? সবাই মানে তো ইমনের মা। শাদা কালো সিনেমার দৃশ্যের মত জমিবিক্রির দলিলে তার দাদার কাঁপা আঙ্গুলের টিপসই, আর কালো শক্ত অথচ বিনীত সাক্ষর দিয়ে বাপকে মানি অর্ডারের টাকা তুলে নিতে পরিস্কার দেখতে পায়, মা এই দৃশ্য কখনো দেখতে পাবেনা, ইমন জানে। তারপর হিসেব কষে কষে হিসাব রক্ষক হওয়া। একাউন্টেন্ট সাহেবের ঝুঁকি না নিয়ে সাবধানী হবার রিজনিং এর ব্যালান্সও কি মা কোন দিন করতে পারবে?

নাহ, এই সময় হাঁটতে যাবে না সে। অন্ধকার ভেদ করে ফুঁসে থাকা গাছের পাতাগুলো তার পরিচিত না। দেখলে ভয় আর বিরক্তি লাগে। অথচ একটা মানিপ্ল্যান্ট দেখে ছোটবেলা কেটেছিলো তার। আগের ডেস্কটপটা যেদিন কেনা হলো, মগবাজারের তিন তলার দুই বেড রুমে ফুর ফুরে হাওয়া। পড়ার টেবিলের কোনায় রাখা পাতা ছড়াতে থাকা সবুজাভ লতা কাঁচের বৈয়াম সমেত উচ্ছেদ হ’য়ে যায়। মার গলার ভাঁজে চিক চিক করে নোনা ঘাম আর হাসতে হাসতে কথা শুরু করে কান্না চোখে ইমনের মাথা বুকে চেপে ধরলে সে ঝটকা মেরে সরায় না, কিন্তু তার ইচ্ছে করে। কেন না তার দু দিন আগের ছুটির দুপুর তখনো পাক খেয়ে তার মাথার ভেতরে ঘোরে। স্কুল ফাইনাল শেষ, ইমন দিনগুলি নিঃসঙ্গ, কখনো কখনো সন্ধ্যেবেলাও। রাস্তার পাশে ইলেক্ট্রিসিটির খাম থেকে ঝুলে থাকা ছেঁড়া তার দেখে বাইরে বেরোতে ভয় পায়। যদি কারেন্ট নেমে আসে পীচগলা রাস্তায়, আর রাস্তা দুভাগ হয়ে তাকে টেনে কুকড়ে মুহূর্তে কড়কড়ে কয়লাখন্ড বানিয়ে দেয়! পতিত মানুষ সে, চিৎকার করার সেকেন্ডও পাবে না। এসব দৃশ্যে ইমন সব সময় নিজেকে টুপ টাপ ঝরে পড়াদের দলে আবিস্কার করে। সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারার মতো তার বরাবর বয়েজ স্কুলের বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। আট বছর আগে পর্যন্ত প্রতি দু তিন বছরে একবার সে তার ডাক টিকিটের খাতা আর দাবার বোর্ড প্যাকিং বাক্সে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে মার সাথে রিক্সায় উঠে বসেছে। আরো দু চার বছর বাদে কোলে ভারী ব্যাগ বা টাউয়েল জড়ানো সিডি প্লেয়ার, নিজেই একলা।

মগ বাজারের দুই বেডরুমের ভাড়া যোগানো কঠিন- “তোমার মায়ের বেতনে পানি গরম হয়?” এমন প্রসঙ্গে ইমনের কি বলার থাকে? বরং পাশ করে সে কি ও কেমন ধরনের ঘোড়ার ঘাস কাটবে- এই বিষয়ে আলোচনার যথার্থ পরিবেশ সৃষ্টি হলেও আগের প্রসঙ্গে তার বমিভাবের উদ্রেক হয়। নজিবর তখন ঠান্ডা সেভেন আপ আনতে সাইকেলের টূং টাং পেছনে ছড়িয়ে ষ্টেশানের দোকানের দিকে যায়। সাইকেলের বেলের শব্দে নিজেকে চারপাশের সঙ্গে প্রোথিত করার ইচ্ছে জাগে ইমনের। ইচ্ছেটা জাগে বলে মেজাজ খারাপ হয়, মেজাজের মাত্রা নিরস্ত করার কোন উপায় ভর সন্ধ্যায় ধরা ছোঁয়ার মধ্যে সে পায় না।

রাজমিস্ত্রীদের ছাদ ঢালাই পরিপূর্ণ ভাবে চারপাশ দখল ক’রে আকাশের কোনাকুনি ঝুলে থাকা চাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দিলে ইমন তার অস্বস্তি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। ছাদের পাওয়ারফুল লাইট উপযাচক হয়ে নিচতলার জানালায় মুখ বাড়ালে সে শরীরের মধ্যে সময়কে গুজে দিতে চায়। তারপর অনিচ্ছাসত্বেও ফিরে যায় সেই দিনে, মসলিনের ওপর জামদানীর কারুকাজ করা মায়ের শাড়িটা সে কুচি কুচি করে কেটেছিল। সেলাইয়ের বাক্স থেকে ঠাণ্ডা, ভারী কাঁচি নিয়ে সারা দুপুর বসে ছিল সে। গ্রিল দেয়া বারান্দায় সামনের চেয়ারে পা তুলে মাউথ অর্গান বাজানো ছাড়া আর কিছু করা যায় মাথায় আসছিলো না তার। তখনি ফোন বেজেছে, অনেকক্ষণ ধরে। একটা নারী কন্ঠ, ক্লান্ত গলায় তার বাপের কাছে অভিযোগ করতে চায়। নেই শুনে, নাকি ইমনের স্কুল ফাইনাল দেয়া শরীরের বাইরে সদ্য দলমেলা কন্ঠস্বরে তাকে সেই মুহূর্তের নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু ধরে নিয়ে নারী কন্ঠ কথা বলে যায়। ফোন রাখার আগে ইমন জেনে যায়, তার মা আজকে যে শাড়িটা পরেছে তার দাম ষোল হাজার টাকা! আর যে ভদ্রলোক তা কিনে দিয়েছেন তিনি হিসাব কিতাব বোঝেন না, তাই স্ত্রীর ভরণ পোষনের মামলায় ঝামেলা করছেন। ইমন তার মার সঙ্গে যদি কথা বলে এ বিষয়ে।

ঠান্ডা কাঁচি কোলে নিয়ে স্ক্র্যাবল খেলতে গেলে বোর্ড থেকে কাঠের অক্ষরগুলো ছুটে বের হয়ে ঘরময় দৌড়াদৌড়ি শুরু করলে ইমনের পক্ষে একটা একটা করে অক্ষর জুড়ে শব্দ বানানোর প্রক্রিয়া জটিল মনে হয়। রেলক্রসিং এর গাড়ি ঘোড়া আর দৈনন্দিন কোলাহলমূখর চারপাশ নিয়ে নিজেদের নির্জন দুই বেড্ রুমের দুপুর তার কাছে এক ঘেয়ে লাগে। তার হাত পাজামার ফিতা নিয়ে খেলে। শরীরের ভেতর ঘূণ পোকার তীক্ষ্ণ চিৎকারের মধ্যে রক্তবাহী নালি ছিঁড়ে যেতে চায়। মার শাড়িটা টান টান হয়ে যাদুর কার্পেটের মত ভেসে থাকে। অফ হোয়াইট মসলিনের জমিনে জামদানীর নকশাগুলো ইমনের দশ আঙ্গুল জাপটে ধরে সুড়ুৎ ক’রে চলে আসে সেই শাড়ি কারিগরদের কাছে যাদের হাত কব্জি থেকে কাটা, ওরা মুখে অনর্গল নির্দেশ দিয়ে যায় কিন্তু মাটি খোঁড়া সারি সারি গর্তের ভেতর লম্বা তাঁতের পাশে বসে থাকা একদল বধির লোক, ওস্তাদ কারিগরদের কথা বুঝতে না পেরে কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁকিয়ে থাকে, তারপর নিজেদের মত তাঁত বোনা শুরু করে। তাদের বুননে মসলিনের মধ্য থেকে জামদানির ডিজাইন আলাদা করতে চাইলেও পারে না। তার হাত বাঁধা। সে গোঁয়ারের মত ঘোৎ ঘোৎ ক’রে হাত ছাড়িয়ে আনতে চাইলে পাজামার ফিতা ছিঁড়ে যায়।

মা হিন্দি সিরিয়ালে মগ্ন থাকে। সিরিয়ালের মুখগুলো ক্রমাগত চোখ ধাঁধানো আগুপিছু করে। মোশানটা ইমনের ভালো লাগে। খাটের পাশে খুলে রাখা শাড়ি ব্যালকনিতে এনে কুচি কুচি করে কেটে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে দিলে টুকরোগুলো স্লো মোশানে নীচের রাস্তায় নামে।

সকালে ঢাকা রওনা দেয়ার ভাবনা অন্ধকারের দেয়াল সরিয়ে ঘাপটি মেরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেলে প্রায় সারারাত জেগে থাকার অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলে উঠে পরে ইমন। পাঁচটা দশ। ট্রেন ঠিক সময়ে ছাড়লেও হাতে ঝাড়া দু ঘণ্টা। ভোরের রাস্তায় একটু হেঁটে আসা যায়। নিঃশব্দ ড্রইয়িং রুমে মেঝেতে নজিবর ঘনশ্বাস ফেলে পড়ে থাকে। ওপরে কনষ্ট্রাকশনের মেশিনপত্র ছাদের গা উপচিয়ে বোবা হয়ে নুয়ে আছে, বাতাসে সিমেন্টের আর ধুলোর মিশেল নাকের পাটায় মৃদু ধাক্কা দেয়।

স্যান্ডেল পায়ে, পাজামা টি শার্টে বেরিয়ে শীত লাগে। কলোনীর তিন ভাগ, এই কম্পাউন্ডের বাঁ পাশে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের কোয়ার্টার, কি যেন পোশাকি ভাষা?- ফোর্থ ক্লাস এমপ্লইয়ী। মাঝখানে কাঁটা তারের বেড়া, অন্য পাশেও তাই, অফিসার্সদের ছাড়া ছাড়া বাংলোবাড়ি থেকে এই ভোরে টুপ টাপ আলো জ্বলে, জ্বলে উঠে নিভে যায়। আলোর রশ্মি বেখাপ্পা রকম ঝাপ্সা দেখালে ইমন টের পায়, চশমা ছাড়া বেরিয়েছে। অঘুমো মাথা ঠান্ডা বাতাসে ঝিম ঝিম করে। দৌড়াবে নাকি? পথের পাশে ঘাসের রং অন্ধকারকে ঠেলে দিয়ে প্রায় প্রকাশমান। দূরে কোথাও মোরগ ডাকে। বয়সী অবিভাবকের মত। ইমনের মনে হয় সে কোন এক প্রাচীন গোত্র পিতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কোন বিচারের আসামী, হাত বাঁধা। চারিদিকে ঢোলের বাজনা, সামনে কুন্ডুলী পাকানো ময়ুর, বাজনার আওয়াজে ধীরে ধীরে পেখম মেলছে- নিজের কদর্য পায়ে তার দৃষ্টি পড়েনি এখনো। ইমন দৌড় দিতে চায়- তার হাতের বাঁধন সর্বোচ্চ জোর দিয়ে ছিঁড়তে চাইলে ছিলা থেকে ছিটকে পরা ধনুকের মত সে বাড়ি খায় কাঁটা তারের বেড়াতে। মাথার ভেতরে তখনো দুন্দুভি বাজে, ফলে পায়ে বেঁধা পেরেকের অস্তিত্ব যখন টের পায়, বেড়ার দীর্ঘসঙ্গী পেরেকটি পায়ে বিঁধে গেলে ভোরের আলো অপ্রয়োজনীয় রকমে নীল রঙ্গের দেখায়।

-“এই যে ভাই, আপনার পা দিয়া রক্ত বার হয়া টেরেন ভর্তি হইল, এই যে ভাই?” ধরমড়িয়ে সোজা হতে চায় ইমন, তার সামনে পান খয়েরের দাগঅলা পাঞ্জাবী, কুলি টাইপ একজন। অন্যপাশের সীটের ওপর থেকে পা নামায়, কনকনে ব্যথা, জগদ্দল অনুভুতি। বাইরে বখাটে কিশোরের মেজাজ নিয়ে রোদ চাগিয়ে উঠেছে। ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছে সে। কুলিটাইপ লোকটি তাকে পা নিচে নামাতে বলেছে, নিজে বসবে বলে। ইমন ব্যথাঅলা পা টাকে বাঁ পায়ের ওপর আস্তে আস্তে তোলে, জুতো খুলে দেখতে হবে ভেতরে কি অবস্থা। জুতো আটোসাঁটো লাগছে, ফুলেছে। ধীরে ধীরে টান দেয় গোড়ালীর দিকে ধরে। কামরা ভর্তি লোকজন, দেখছে। পা খুললে আবার রক্ত বেরোয় যদি? আর সে যদি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে? সহযাত্রীদের মুখগুলি একচাউনিতে দেখে নিয়ে সে তার ব্যান্ডেজ বাঁধা পা আবার ঠেসেঠুসে জুতোর মধ্যে এঁটে দিতে চেষ্টা করে।*


লেখক পরিচিতি
নাহার মনিকা

জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে। পড়াশুনা ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ত্রপিক্যাল মেডিসিন।
বর্তমান নিবাস ঃ কানাডা।
গল্পগ্রন্থ  ঃ পৃষ্ঠাগুলি নিজের।
কাব্যগ্রন্থ ঃ চাঁদপুরে আমাদের বরষা ছিল।

1 টি মন্তব্য: