বুধবার, ১ মে, ২০১৩

বাটা ঝিলমিল বাটা ঝিলমিল বন্ধু খাওরে বাটার প্রাণ

সামরান হুদা
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুণ নৈরামণি কন্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই।।(শবরপাদানাম/চর্যাপদ-২৮)

হৃদয় তাম্বুলে কর্পূর (দিয়া) খাইল মহানপ্রীতি।
শূ্ন্য(ও) না-নারী গলাগলি করি প্রেমে পোহাইল রাতি।। (সুকুমার সেন/ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/ প্রথম খন্ড)


দাদির শাশুড়ি ছিলেন পাগল। পৃথিবীর কোন হুঁশ-জ্ঞান তাঁর ছিল না। থাকতেন বাপের বাড়িতে। একমাত্র মেয়ে ছিলেন তিনি, আমার দাদা তাঁর একমাত্র সন্তান।
সন্তান পেটে থাকাকালীনই তাঁর মাথা খারাপ হয়ে যায়, তাঁর বাবা, বড় মৌলভী সাহেব নিজে গিয়ে জমিদার তোফা মিঞা সাহেবের পাগল-গর্ভবতী ছেলের বৌকে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন। সেই যে আসেন, আর কোনদিন শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাননি নান্নী বিবি। আট মাসে ছেলের জন্ম দেন, সেই ছেলে বড় হয় নানা-নানীর কোলে। সে’যুগে যত রকমের চিকিৎসা করা সম্ভব, সবই চেষ্টা করেছেন মৌলভী সাহেব কিন্তু মেয়ের মাথা সুস্থ হয়নি শেষদিন অবধি। কাউকে চিনতেন না, নিজের ছেলেকেও না।
বেঁচে ছিলেন ছেলের বিয়ে হওয়া অব্দি, দুই নাতির জন্ম ইস্তক। পাগল অবস্থাতেই মারাও যান। তোফা মিঞা সাহেব অনেক চেষ্টা করেন নাতিকে নিজের বাড়িতে, নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যে কিন্তু নানা-নানী ছাড়েননি তাঁকে। দাদা বড় হন, বিয়ে হয়। সাতগাঁওয়ের চৌধুরী বাড়ির মেয়ে জোবায়দা খাতুন চৌধুরানী, আমার দাদি, এলেন বৌ হয়ে শাহবাজপুরের বড় মৌলভীবাড়িতে। ছোটখাটো গোলগাল গড়নের, একটু বোঁচা আর ছড়ানো নাকের অসম্ভব ফর্সা আর সুন্দরী দেখতে আমার দাদী প্রথম থেকেই খুব আদরের ছিলেন নানা এবং নানীশাশুড়ির।
বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে আসার পর নানা এবং নানীশাশুড়ি যেসব জিনিসপত্র দেন নতুন বৌকে, তার মধ্যে অন্যতম একটা জাঁদরেল মেহগনি কাঠের আলমারি। বিশাল আকারের সেই আলমারি কতকালের পুরনো, সে দাদী জিজ্ঞেস করে শুনেছিল। নানাশ্বশুরের মায়ের নাকি ছিল সেই আলমারি। উপহার হিসেবে গয়না-গাটি, কাপড়-জামা বাদে দাদি তাঁর নানীশাশুড়ির কাছ থেকে পায় তাঁর নিজের সখের কিছু জিনিস। এগুলো দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বড় সখের জিনিস গো বৌ, যত্ন কইরো।’ সেই জিনিসগুলো ছিল একখানা কাঠের সাজবাক্স, একখানা পেতলের পানের বাটা, বাটার সঙ্গেই পানদান, পিকদান, পানের মশলার ছোট ছোট সব কৌটো, সবই পেতলের।
দাদির এই সাজবাক্সটা এক অদ্ভুত সুন্দর আর মজার জিনিস। বেশ বড়, একটা মাঝারি স্যুটকেসের মাপের। ডালাটা পেছন দিকে কব্জা দিয়ে লাগানো, এই বাক্সে কোনো হাতল নেই, কোনো তালা-চাবিরও ব্যবস্থা নেই। ভেতরে ছোট-বড় সব চৌকো চৌকো খোপ করা একটা আলগা ডালা, খোপগুলো ধরে উপরদিকে টানলে ডালাটা উঠে চলে আসে। নিচের অংশে আরও বেশ কিছু খোপ, সেগুলোও চৌকো। প্রথম ডালায় থাকে দাদির প্রসাধনী সামগ্রী। যেমন রকমারি সুগন্ধী আতর, চন্দনের টুকরো, আরবি সুর্মা যেগুলোকে দাদি ছোট্ট হামানদিস্তায় গুড়ো করে রূপোর সুর্মাদানীতে ভরে রাখে। আর থাকত বিলিতি সব ছাপ মারা ক্রিম। গোলাপি ঢাকনা মানে গরম কালের, নীল ঢাকনা শীতকালের। এই ক্রিমগুলো যে মওসুমের যেটা, প্রতিদিনই ব্যবহারের জন্যে আলমারির ভেতরকার সাজবাক্স থেকে বের হয় আর ব্যবহারের পর আবার তারা চলে যায় সাজবাক্সে, আলমারির ভেতরে। আর ঐ যে ডালার নিচের ওই গোপন কুঠুরী, তাতে দাদির সব গয়না। নানান রকমের চুড়ি-বালা, ঝুমকো, কানপাশার সঙ্গেই ছিল গলার তক্তিছড়া, মাদুলিছড়া, মাথার সীতাপাটি আমরা যাকে বলি টায়রা, বিনুনি-ছড়া, খোপার কাঁটা, বাজুবন্ধ, কোমরবন্ধ আর পায়ের একজোড়া ভারী তোড়া। এই তোড়াটা শুধুই গয়না ছিল, এতে ঘুঙরু ছিল না, নাতবৌ তোড়া পায়ে ছমছম শব্দে ঘুরে বেড়াবে এটা নানীশাশুড়ির পছন্দ ছিল না। তাই তার ঘুঙরু ছাড়া তোড়া।
পেতলের এক পানবাটা সঙ্গে বড়সড় থালার মত দেখতে সামান্য ঢেউ খেলানো ওঠানো কানা, খোদাই করা নকশাদার এক থালি- পানদান। মাঝারি আকারের গোল এক পানবাটা। জলের ঘটির মত দেখতে অনেকটা কিন্তু ঘটির যেমন মুখটা বাইরের দিকে কানা বের করা থাকে আর গলাটা সরু হয়, এ ঠিক সেরকম নয়। এর কোন কানা বের করা নেই, আর গলাও নেই। নিচে থেকে সামান্য চওড়া হয়ে উপরে উঠে মুখের দিকটা একটু সরু হয়ে প্রান্তভাগ একটু ভেতর দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে। বেশ উঁচু। এরকম পানবাটা আর কোথাও দেখিনি। থালির মত দেখতে বাটার উপর বসানো পেতলের নকশাদার ঢাকনা আর সেই ঢাকনার উপরে বসানো পেতলেরই ছোট ছোট গোল চ্যাপ্টা মত দেখতে ঢাকনা দেওয়া কৌটো, মশলাদানি ওগুলো। ওইরকম মশলাদানি এখন বাজারে পাওয়া যায় স্টিলের চ্যাপ্টা গোল কৌটোর ভেতরে ওগুলো বসানো থাকে। বড় কৌটোর ভেতরে থাকে বলে এগুলোতে অবশ্য ঢাকনা থাকে না, যাতে সাধারণত সবাই রান্নার মশলাপাতি রাখেন।
একই রকমের পেতলের নকশাদার ফুলদানীর মত দেখতে পিকদান। নানীশাশুড়ির ব্যবহারে বা বলা ভাল অতিব্যবহারে সবই বেশ পুরনো কিন্তু সমস্তই দেখতে একেবারে ঝাঁ চকচকে। এগুলো নাকি তিনি পেয়েছিলেন বিয়ের সময়, বাপের বাড়ি থেকে এসেছিল তাঁর সঙ্গে। দাদির অসম্ভব প্রিয় ছিল নানীশাশুড়ির দেওয়া এই পানবাটা ও সঙ্গের জিনিসগুলো। দু-চারদিন পরপরই গোসলের আগে পানবাটা, মশলার সব কৌটো, পানদান খালি করে পুকুরঘাটে দাদি নিজে গিয়ে বসতো  কালো হয়ে যাওয়া পুরনো তেঁতুল নিয়ে। সেই তেঁতুল দিয়ে মেজে ঘষে চকচকে করে তুলত এই পানবাটা। যার জন্যে বোঝার উপায় ছিল না যে কত পুরুষ পুরনো এই বাটা। জিনিসগুলোর যত্ন দাদি এভাবেই করে গেছে আজীবন।

-দুই-
নয়নের কাজলরে বন্ধু আরে বন্ধু তুমি গলার মালা।
একাকিনী ঘরে কান্দি অভাগিনী লীলা।
না যাইও না যাইও বন্ধুরে চরাইতে ধেনু।
আতপে শুকাইয়া গেছেরে বন্ধু তোমার সোনার তনু।।
আইস আইস বন্ধু খাওরে বাটার পান।
তালের পাংখায় বাতাস করি জুড়াক রে পরাণ।।
আহারে প্রাণের বন্ধু তুমি ছিলে কৈ।
তোমার লাইগা ছিকায় তোলা গামছা-বান্দা দৈ।।
গামছা-বান্দা দৈরে বন্ধু শালিধানের চিড়া।
তোমারে খাওয়াইব বন্ধু সামনে থাক্যা খাড়া।। (কঙ্ক ও লীলা/ দামোদর দাস, রঘুসুত, শ্রীনাথ বেনিয়া এবং নয়ানচাঁদ ঘোষ/ মৈমনসিংহ গীতিকা)

পানবাটার ভেতরে লাল মলমলের উপর বিছানো থাকত দাদির থাক থাক পান। আরেক টুকরো মলমলে পানপাতাদের ঢেকে দিয়ে বাটায় ঢাকনা দেয়া থাকত। সিলেটি খাসিয়া পান, ওই অঞ্চলের খাসিয়া উপজাতিরা উৎপাদন করে বলে তাঁদের জাতির নামেই এই পানের পরিচিতি, সে পান দাদি খেত না। সে বেশ ঝাঁঝালো পান। দেখতে বেশ বড় বড়, গাঢ় সব্‌জে রঙের ছড়ানো, অন্য যে কোনো পানপাতার চাইতে একটু বেশি ভারী-মোটা পাতা, উল্টোদিকে বেশ উঠে থাকা সব শিরা। পানের সোজা দিকেও খাঁজকাটা বলে মনে হয়, ডগা আর সব পানের মতই, ছুঁচালো, কিন্তু দেখলেই চেনা যায় যে এ সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া পান। টাটকা পান দেখলেই মনে হয় যেন মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কড়মড় শব্দে ভাঙবে এই পাতা।
এই খাসিয়া পান আমার দাদির পছন্দ নয়, তাঁর চাই মিষ্টি পাতা। বগুড়া, রংপুরের দিকে যে পান হয়, মিষ্টি পাতা, হাটবার করে সেই পান আসত আমাদের বাড়িতে এক বিড়া অর্থাত চৌষট্টিটা করে। অত পান দাদি একা খেত না, দাদির সঙ্গে পান খাওয়ার জন্যে হামেশাই কেউ না কেউ জুটে যেত। ছোট ছোট দেখতে একটু কালচে সবুজ রঙের পান, পানের উলটো পিঠের শিরা হাতে লাগে না এমন মসৃণ আর মুখে দিলেই মিষ্টি রসে ভরে ওঠে মুখ। যাঁরা খুব ঝাঁঝওয়ালা পান খেতে ভালবাসেন, তাঁরা খান এই খাসিয়া পান। যেমন আমার বড়কাকা। দাদির মিষ্টি পাতা তার চলে না, ঝাঁঝওয়ালা খাসিয়া পান না খেলে নাকি পান যে খাওয়া হচ্ছে সেটাই বোঝা যায় না। কোনো সময় বাজারে সেটা না পাওয়া গেলে কাকা খুঁজে খুঁজে বার করে বিভিন্ন বাজার ঘুরে ঘুরে।
আগডোম বাগডোম ঘোড়াডোম সাজে
ঢা কিরকেল ঝাঁঝর বাজে।
বাজতে বাজতে লাগলে ঠুলি
কে কে যাবে মঙ্গলফুলি।
মঙ্গলফুলির টিয়েটা
সুজ্জিমামার বিয়েটা
আয় সুজ্জি হাটে যাই
দুটা পান কিনে খাই।
পানের মধ্যে ফাঁপোড়া
মামা মিয়ার ঝাকোড়া। ( রাজশাহীর ছড়া/আলমগীর জলিল)

বেতের বোনা ঝাঁঝরিতে করে পুকুরঘাটে গিয়ে কেউ একজন ধুয়ে নিয়ে আসত সেই পান। বাড়িতে থাকলে বাজার থেকে পান আসা মাত্রই পানের বিড়া বার করে নিতাম থলে থেকে। খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে পেরেকে ঝোলানো ঝাঁঝরি নামিয়ে কেউ কিছু বলার আগেই এক ছুট্টে পুকুরঘাটে পৌঁছে যেতাম। পেছন থেকে দাদির গলা পাওয়া যেত, ‘একটার লগে আরেকটার পাতা ঘইষ্যা ঘইষ্যা ধুইস, হুকনার দ্যাশের পান, বালু লাইগ্যা থাকব নইলে।’ পান ধোওয়ারও একটা তরিকা আছে। কাজের বুবু যখন পান ধোয়, তার সঙ্গে বসে আমিও দুটো-চারটে পান ধুয়ে ধুয়ে শিখে নিয়েছি সেটা। দুটো পান দুই হাতে দিয়ে পানের শিরা বের করা উলটো পিঠের দিক দিয়ে একটা পাতার সঙ্গে আরেকটা পাতা ঘষে ঘষে ধুতে হয়, নইলে বালি লেগে থাকে পানে। এভাবে প্রত্যেকটা পান আলাদা আলাদা করে ধুয়ে সব কটা পানের ডাঁটিকে একসঙ্গে ধরে পানগুলোকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জল ঝরিয়ে তবেই তাদের বাটায় বিছানো হয় মলমলের উপর। পানের গায়ে জল লেগে থাকলে আসছে হাটবার অব্দি থাকবে না, পচে যাবে। হাটবার ছাড়া এমনি দিনে এই পান পাওয়াও যায় না। পানের ব্যপারী, যারা ভৈরবের পানের আড়ত থেকে বস্তা বস্তা পান নিয়ে আসে আর বেতের ঝাঁকায় ভেজানো লাল কাপড়ে ঢেকে বিভিন্ন গাঁয়ের হাটে গিয়ে বসে সেই পান নিয়ে হাটবার করে, আমাদের গাঁয়ের হাটেও তারা আসে সেই শনিবারের বড় হাটে।

-তিন-
মরি হে মরি হে মরি হে শ্যাম
শয়নে স্বপনে তোমার নাম
বরার বাড়ি ছাঁচি রে পান
পয়সা দিয়া শ্যাম কিনিয়া আন
আনো রে গুয়া পান কাটো রে খাই
হাসিমনে শ্যাম চলিয়া যাই।। (ভাওয়াইয়া গান/ প্রতিমা বড়ুয়া)

বড়ফুফু যখন বাপের বাড়ি আসত, বড় কৌটো ভর্তি করে দাদির জন্যে সুপুরি কেটে রেখে যেত। কি ভীষণ মিহি করে সুপুরি কাটত বড়ফুফু! গোটা গোটা সুপুরি রাতভর জলে ভিজিয়ে রাখা হতো, কাটার সময় যেন গুড়ো গুড়ো না হয়ে যায়। পান মুখে দিয়ে বারান্দায় সে গুছিয়ে বসত কেবল সুপুরি কাটার জন্যে। গল্প করার জন্যে একে একে অনেকেই জুটে যেত। যে বসত, তাকেই পাশে রাখা দাদির বাটা থেকে এক খিলি পান সেজে দিত ফুফু। এমনিতে যে পান খায় না, সেও খেত সেই সময়। পানের খিলি মুখে নিয়ে যে বসত সেও একসময় হাঁক দিত, ‘কই গো, আরেকখান ছরোতা দ্যাও দেহি।’ এক সময় দেখা যেত, একসঙ্গে আট-দশজনায় বসে সুপুরি কাটছে। পাশেরজন কেমন কাটছে সেদিকে খেয়াল থাকত সকলেরই, নিজের কাটা সুপুরি যেন মোটা না হয়ে যায়। সমস্ত সুপুরি কাটা হয়ে গেলে বেতের ডালায় করে রোদে শুকিয়ে নিয়ে কৌটোয় ভরে রাখা। বড়ফুফু আরেকবার বাপের বাড়ি বেড়াতে আসা অব্দি কয়েকমাস চলবে এই সুপুরি দিয়ে।
সুপুরিও কাটা হতো দু’রকম করে। বড়কাকাও বরাবর দাদির সঙ্গে বসে পান খায় দাদির বাটা থেকে কিন্তু দাদির জন্যে কাটা ওই মিহি সুপুরি কাকার পছন্দ নয়। বলে, ‘ইতা কিতা সুবাড়ি কাডে সব? মুখে দেওনের লগে লগে মিলাইয়া যায়গা!’ তার চাই টুকরো টুকরো করে কাটা সুপুরি। দোকানে পান কিনতে গেলে যেমন টুকরো সুপুরি দিয়ে পান সেজে দেয় ঠিক সেই রকম। আমাদের বাড়ির কাজের লোকেরাও সব টুকরো সুপুরি দিয়েই পান খায় কাজেই অন্য কৌটোয় ভরা থাকে মোটা আর টুকরোয় কাটা সুপুরি। ফলে বড়কাকার সুপুরিও চলে আসে সঙ্গে সঙ্গেই।
বানা হাতে বাড়ে বাড়ে তোলে পানের খিলি
ওরে মোর সুন্দর বানা,
বানা তুই বোলে তোর দাদারে দুলালী
কই দেছে তোক ঘর সামটানী দাসী,
বানা হাতে বাড়ে বাড়ে তোলে পানের খিলি
ওরে মোর সুন্দর বানা।। (পানগীতি/ রংপুর/ গায়ে হলুদ- শাহীদা আখতার)

বাড়িতে প্রচুর পরিমানে সুপুরি হলেও আমাদের যেহেতু কাদামাটির দেশ, খুব একটা ভাল হয় না সুপুরির মান। এ অঞ্চলে কোথাও ফলন ভাল হলেও ভেতরের দানা হয় ছোট। স্বাদে কখনও আবার একটু তিতকুটে ভাবও হয়। দেখতেও হয় কালচে মতন, দাদির তাই মনে হয়। গাছের সুপুরি দাদি বেশির ভাগই বিলি করে করে দেয় আশে পাশের বাড়িঘর থেকে চাইতে আসা বউ-ঝিদের। তারা খুশি হয়েই নিয়ে যায় সেই সুপুরি। দাদির জন্যে সুপুরি আসে চাটগাঁ থেকে। সমুদ্রের ধার ধরে বালুমাটিতে যে সুপুরি হয় সে নাকি খুব ভাল হয়, দাদি তো তাই বলে। বড় বড় দানা, গোলাকার সুপুরির বাইরেটা দেখতে সাদা হয়, কাটার পর বেরোয় সুপুরির আসল রঙ। সরু সরু ঝিরিকাটা সুপুরি, ভীষণ হালকা খয়েরি রঙের। বাটিতে খয়ের গুলে রাখলে যেমন সাদাটে রঙের একটা রূপ ধরে, সুপুরি কাটার পর দেখতে লাগে অনেকটা সেই রঙের, ভেতরে গাঢ় কালচে খয়েরি শিরা-উপশিরা। সে এক অদ্ভুত সুন্দর!

-চার-
ওরে বান্ধিনু বাড়ী
গুয়া উনু সারি সারি,
গুয়ার বাগিচায় ঘিরিয়া লইলে বাড়ীরে।।

আসিবে মোর প্রাণের শুয়া,
তায় পাড়াইবে গাছর গুয়া,
মুই নারীটা ফাঁকিয়া খাইম তাক।।

ওরে আসিবে মোর প্রাণের নাথ,
তায় কাটিবে কলার পাত,
মুই নারীটা বসিয়া খাইম বোল ভাত।।

ওকি ও প্রাণ কালা রে,
ওরে মহাকালের ফল যেমন, মড় নারীর যৈবন তেমন,
খায়া দেখ কালা যৈবন কেমন মিঠা রে।। ( বাংলার লোকসাহিত্য- ৩য় খন্ড/ আশুতোষ ভট্টাচার্য)

সুপুরি। আমাদের কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলে যাঁকে বলে গুয়া। আমাদের বারবাড়ির সীমানা ধরে সার বেঁধে লাগানো আছে সেই গুয়াগাছ । সরু ডিগডিগে গুয়া গাছ, একহারা লম্বা। পাল্লা দিয়ে মাথায় উঁচু, আর মাথার দিকে তাল-নারকেলের মত ছড়ানো কিছু পাতা। পাতারা যেখান থেকে শুরু হয়, সেখানেই গুয়া ধরে। থোকায় থোকায় কাঁদি থেকে গুয়া ঝোলে খেজুরের মত। কাঁচা গুয়া হয় ঘন কালচে সবুজ। যখন পেকে যায়, গাঢ় কমলায় হলুদে মেশানো এক রঙ হয় তার। বোটার দিকটা তখনও সবুজ থাকে। সুপুরি পেকে যাওয়ার পরেও কিছুদিন গাছেই রেখে দেওয়া হয়, যাতে করে ভেতরের যে দানা-সুপুরি, সেটা পোক্ত হয়। একটা সময় পাকা সুপুরির গায়ের রঙ কালচে হয়ে আসে। তখন লোক ডেকে আনে বড়কাকা, গাছ থেকে সুপুরি নামানোর জন্যে।
লুঙ্গিটাকে নেংটির মত করে পরে, দুই পায়ের গোড়ালিতে এক অদ্ভুত কায়দায় দড়ি বেঁধে দুই হাতে গাছকে ধরে ব্যালেন্স করে তরতর করে উঠে যায় সরু লিকলিকে সুপুরি গাছের মাথায়। যেখানে থোকায় থোকায় ঝুলছে শুকিয়ে কালচে হয়ে আসা সব সুপুরি। গাছাটা এদিক ওদিক দোল খায়। নিচে দাঁড়িয়ে সুপুরি পাড়া দেখতে আশে পাশের বাড়িগুলো থেকে আসা বাচ্চাগুলো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গাছের ঐ উপরদিকে, যেখানে লোকটি সুপুরি পাড়তে উঠেছে। ভয় পায়, এই বুঝি গাছটা ভেঙে পড়ল। কেউ কেউ আবার অস্ফুটে নিজেদের মধ্যে কথা বলে, ‘আমিও না গুয়াগাছো উঠতা ফারি!’ ব্যস ঐ পর্যন্ত। চোখ উপরে। উপরের লোকটি তখন সময়ের আগে এসে পড়া সুপারম্যান। যতক্ষণ গাছের দোল চলে, লোকটি গাছ আঁকড়ে ঝুলে থাকে, কারো কোনো কথা নেই। এক সময় গাছের দোল খাওয়া বন্ধ হয়। নেংটি করে পরা লুঙ্গিতে গোঁজা ধারালো কাস্তে দিয়ে সুপুরির কাঁদির গোড়া থেকে কেটে নেয়, যাতে থোকায় থোকায় আধশুকনো কালচে সুপুরি ঝুলছে। ঝপাং করে নিচে পড়ে সুপুরির কাঁদি। এতখানি উপর থেকে পড়ার ফলে এদিক ওদিক ছিটকে যায় বেশ কিছু সুপুরি। বাচ্চারা সব দৌড়ায় সুপুরি কুড়োতে, কেউ জামার কোচড়ে তো কেউ ছোট্ট লুঙ্গিখানির কোচড়ে জড়ো করে কুড়োনো সুপুরি।
গাছের সব সুপুরির কাঁদি কাটা শেষ হলে কাকা নিচে থেকে আওয়াজ দেয়, ‘অ মিঞা, কুছু ডালও কাইট্যা ফ্যালাও দিহি, নিছের সব ডাল কাইট্যা দ্যাও, নতুন ডাল অইব আবার।’ ডাল কাটা শেষ হলে নিচে নেমে আসে লোকটি এক অদ্ভুত উপায়ে। গাছটাকে জড়িয়ে ধরে রেখে শরীরটাকে যেন ছেড়ে দেয় গাছের গায়ে। পায়ের দড়ি খুলে নিয়েছে ইতিমধ্যেই, পিছলে নেমে আসে সড়সড় করে। মাটির কাছাকাছি আসতেই গাছের গা থেকে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে লাফ দেয় নিচের দিকে, ঝপাং! এভাবে একের পর এক সব গাছ থেকে সুপুরি নামায়। কুড়িয়ে আনা সুপুরিগুলো কোচোড় থেকে বেতের খলইতে ঢেলে দেয় সব বাচ্চাগুলো। কাকা তাদের দুই হাতের আঁজলা ভরে সুপুরি দেয়। বাচ্চারা তবুও দাঁড়িয়ে থাকে। কাকা বুঝতে পারে, ‘বলে গুয়ার ডাগ্যার লাইগ্যা খাড়ইয়া রইছস তো? নে, লইয়া যা কয়ডা নিবি।‘ দুজন মিলে একটা করে সুপুরির ডাল নেয়। ডালের গোড়ার দিকটা একটু চওড়া, সেখানে কোনোমতে একটা বাচ্চা বসে, অপর বাচ্চাটি ধরে পাতার দিকটি। স্লেজগাড়ির মত টেনে নিয়ে যায় সুপুরির ডালকে। যে ডালের গোড়ার দিকে বসেছে সে সামনের দিকে ঝুঁকে দুই হাতে ধরে রেখেছে যেখান থেকে পাতা শুরু হচ্ছে সেদিকটা। এখন চলবে এই সুপুরির ডালের স্লেজগাড়ির খেলা সারা দিনমান, বদলে বদলে যাবে শুধু সওয়ারী আর সারথী।

-পাঁচ-
সোনার বাটিতে চান্দ খায় গুয়াপান।
দুই বিড়া পান দিল তাহার বিদ্যমান।।
দুই বিড়া পান দিল চার ঘা গুয়া।
হস্তে করিয়া বলে কি করিব ইহা।।
চান্দ বলে হের দেখ সাক্ষাতে খাই।
চুন গুয়া পান খাইলে বড় স্বাদ পাই।।
এতেক কোতোয়াল আনন্দ হৃদয়।
দধি জ্ঞানে চুন বেটা কতগুলি খায়।।
চুন খাইয়া তার জিহ্বার গেল ছাল।
থুথু করি ফেলে বলে ঘটিছে জঞ্জাল।।
ধনার দিকে চাহিয়া হাসেন সদাগর।
বুঝিলাম এদেশের লোক বড়ই বর্বর।।
ঠাকুর চতুর যার সেবক বিচক্ষণ।
সমুখে বসিয়া যোগায় তখন।।
পান খাইয়া কোতোয়ালের আনন্দিত মন।
রাঙা জিহ্বা করিয়া চাহে ঘন ঘন।।
চান্দ বলে কোতোয়াল শুনহ বচন।
দর্পণ আনিয়া দেখ মুখের পত্তন।। (যাত্রাপাটন পালা/ মনসা মঙ্গল/ বিজয়গুপ্ত)

ভৈরবের বাজার থেকে জমাট বাঁধা চুন নিয়ে আসত বড়কাকা। মাটির হাড়িতে করে সেই চুন ভিজিয়ে খাটের তলায় রেখে দিত দাদি। যখন যেমন দরকার ছোট চামচে করে তুলে কৌটোয় তুলে রেখে দিত অন্য সব মশলার সঙ্গেই। পানবাটায় পান থাকত সব ডাঁটি সহ। পান সাজার সময় ডাঁটি গুলো ভেঙে নিয়ে পানদানে রেখে দিত সাজা পানের সঙ্গে, চুন বরাবরই কৌটোতেই দেয়া হতো। পানের ডাঁটি সঙ্গে দিত যেন ওই ডাঁটিতে করে চুন নিয়ে খাওয়া যায়। কেউ হাত দিয়ে চুন তুলবে এটা দাদির পছন্দ নয়।
পান মিডা মুখত দিয়ম
চুনর বদল নুন মিশাইয়ম
সুয়ারির বদল দিয়ম মরিচ গুড়া
তারপরে দিয়ম চিনি
কমিব মুখর জ্বালানি
মজা হইব মজা হইব
খাইলে দুলা ভাই
চাইলে আয়।। (সনজিত আচার্য/ চট্টগ্রাম)

বাংলাদেশে যে খয়ের পাওয়া যায়, সে কেমন কালচে চকচকে কাঁচের মত দেখতে। সে খয়ের দাদির পছন্দ নয়। দাদির বড়ভাই, আমার বড়দাদা কলকাতায় থাকতেন। সেখানকার আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। নিজের মায়ের জন্যে জরদা-খয়ের এসব কলকাতা থেকে নিয়ে যেতেন তিনি। দাদি সেই খয়ের পানে খেয়ে অভ্যস্ত। বিয়ে হয়ে মৌলভীবাড়িতে আসার পর দাদি সেখানেও পেয়ে গেল কলকাতার খয়ের। বৌ কলকাতার খয়ের সখ করে খায় জানতে পেরে নানাশ্বশুর কলকাতায় বসবাসকারী আত্মীয়কে চিঠি লিখে যে জিনিসটি চেয়ে পাঠালেন, সে হচ্ছে খয়ের! এক পোয়া ওজনের হালকা মাটি মাটি রঙের টুকরো খয়ের ছ’মাসে ন’মাসে একবার করে পৌঁছেই যেত কলকাতা থেকে। এছাড়াও বাপের বাড়ি নাইওর গেলে সেখান থেকে পিঠা-পুলি ও অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে যে বস্তুটি আসত, সে ঐ হালকা মেটে রঙের খয়ের! দাদি বরাবরই তার সখের জিনিসপত্র নানাশ্বশুরের দেওয়া সেই কালো কাঠের আলমারিতে রাখত, কাগজে মোড়ানো খয়েরেরও জায়গা ছিল সেখানেই। ছোট্ট টুকরো বের করে নিয়ে হামনদিস্তায় মিহি গুড়ো করে পানবাটার উপরে ছোট্ট মশলার কৌটোয় রাখত সেই মহার্ঘ বস্তুটি। যবে থেকে আমি কলকাতায় এলাম, দেশে যাওয়ার সময় দাদির জন্যে অবশ্য করে সঙ্গে নিয়ে যেতাম জানবাজার থেকে কেনা সেই মেটে রঙের খয়ের।
পানের বাটার ঢাকনার উপর যে ছোট ছোট পেতলের মশলাদানি তার কোনোটায় হামানদিস্তায় গুড়ো করা খয়ের, কোনটায় সুগন্ধী জরদা, কোনোটায় ভাজা মৌরী তো কোনোটায় কাঁচা মৌরী। খুব কড়া জরদা দাদি খায় না। জরদা সুগন্ধি হতে হবে, আব্বা নিয়ে আসত দাদির জন্যে এই জরদা, কাকাও সিলেট বা চাটগাঁ গেলে নিয়ে আসত। মিষ্টি একটা নেশালু গন্ধে ঘর ভরে যেত জরদার কৌটো খুললেই। দু-চার দানা জরদা দাদি নিত পানে, একটু বেশি নিলেই দাদির মাথা ঘুরতে শুরু করত। আব্বা কখনই জরদা নেয় না, খয়েরও না। পান খেত শুধু চুন-সুপুরি, অল্প ভাজা মৌরি দিয়ে। কাকা আবার খয়ের জরদা সব বেশি বেশি খায়। দাদির পানে যায় মুচমুচে ভাজা মৌরি। অন্যদের যার যেমন পছন্দ তেমন জিজ্ঞেস করে দেওয়া হয় আনুষঙ্গিক।
খয়ের বেশি চুন কম দিতাম
সুয়ারি কিছু হাদা লইতাম
খিলি পান বানাইতাম
নিজে খাইতাম মজা পাইতাম
আনা ধরি চাইতাম
আঁরে ক্যান সোন্দর লাগে। (গীতিকার ও সুরকার- এম এন আখতার/ চট্টগ্রাম)
-ছয়-
ওকি বাওই রে,
ওরে ঝাকে উড়াই ঝাকে পাড়ে রে।।

বাওই তাকসেন বলো রে পাকী,
একা হয়া ডালে পড়ো
সেই না দুক্কে মরি হে বাওই, সেই না দুক্কে মরি।।
ওকি বাওইরে,
ওরে গুয়া খায়া পিক ঢালিছো রে বাওই,
ঠোট বা করিচো আংগা,
ঠোটের ওপর মানিক অতন, বাওই তিলফোটা।
ওকি বাওইরে,
নলের আগে নলখাগড়া রে বাওই,
বাঁশের আগায় রে টিয়া,
সইত্য করি কও কতা বাওই, কইরচো নাহিন বিয়া রে।। ( উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য/ সামীইয়ূল ইসলাম)
বড় একটা ঘর,দু’পাশে দু’খানা বিশাল খাট। একটা দাদার, একটা দাদির। দুই খাটের মাঝখানে দাদির মেহগনি কাঠের আলমারি,বেতের গোল টেবিল- যা সব সময় হাতের কাজ করা টেবলক্লথ দিয়ে ঢাকা থাকে। খাটের মাথার দিকে দেওয়ালের গায়ে মাঝারি এক খাবার টেবিল। দক্ষিণের জানালার ধারে দাদির পড়ার টেবিল। টেবিলের উপর থাক থাক সব বই,বিশাল তাদের আকার। কী ছিল না সেখানে, কোরান শরীফ, বোখারী শরীফ, সমগ্র হাদীস সমুহ, গুলিস্তাঁ,বোস্তাঁ থেকে শুরু করে বহু ফারসি বই। নামগুলোও এখন আর মনে নেই আমার। দাদির বিছানাটা ছিল তুলতুলে নরম। জাজিমের উপরে কম করে চারখানা শিমুল তুলোর তোষক ছিল পাতা,যেগুলো প্রায় প্রতিদিনই ছাদে যেত রোদ খাওয়ার জন্যে। সেই বিছানায় শোওয়ামাত্র মনে হত যেন পৃথিবীর যাবতীয় ওম,আরাম আর শান্তি বোধহয় এখানে, দাদির এই বিছানাটিতেই রয়েছে। দাদির খাটের পাশে বড় আলমারির সামনে যে কাপড়ে ঢাকা বেতের টেবিল তাতে পানের বাটার সঙ্গেই ওলটানো থাকে পেতলের বড় পানদান, টেবিলের তলায় পেতলের পিকদান। ওই পিকদানে কেউ পানের পিক ফ্যালে না যদিও কিন্তু রাখা থাকে। মেহমান কেউ এলে এগিয়েও দেয় দাদি, কেউ যদি পানের পিক ফেলতে চায় তার জন্যে। পানবাটা, পানদানের যেমন রোজকার ব্যবহার ছিল এই পিকদানের ব্যবহার সেভাবে হতো না। কিন্তু যখনই দাদি পানের বাটা মাজতে বসত, বা কাউকে দিত পরিস্কার করার জন্যে তখন এই পিকদানও একইসঙ্গে পরিস্কার করা হত তেঁতুল ঘষে ঘষে। যাতে পুরনো দেখতে না হয়, চকচকে ভাবটা থাকে।
বাড়ির কোনো বাচ্চা একটু বেশি কাঁদলে ছুঁচোলো ডগা দেখে ডাঁটিওয়ালা পান নিয়ে, পানের দু’দিকেই সর্ষের তেল মাখিয়ে পেটে বুলিয়ে কী সব ঝাঁড়-ফুঁক দিত দাদি। বাচ্চার উপর কারো বদ নজর লেগেছে, তাই কাঁদছে। নজর লাগলে নাকি পেটে ব্যথা হয়, তখন এই পান দিয়ে ঝেড়ে দিলে নজরটা চলে আসে পানে- এমনটাই ছিল বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই থেমে যায় বাচ্চার কান্না, আর সত্যিই সে ঘুমিয়ে পড়ে। যে পান দিয়ে নজর ঝাড়া হয়েছে, সেটা রান্নার সময় বা এমনি চুলোতে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত। যে পান যত বেশি শব্দে ফাটবে, পানপোড়া গন্ধ যত বেশি বেরুবে, বোঝা যাবে কতখানি নজর লেগেছিল। খুব জোর পটাশ পটাশ শব্দে পান ফাটা মানে ভয়ানক নজর লেগেছিল! ঠিক একইভাবে বড়দেরও নজর ঝাড়ত দাদি। খেতে ইচ্ছে করছে না? গা বমি করছে? নির্ঘাত নজর লেগেছে পাড়া-পড়শিদের। অগাধ বিশ্বাস নিয়ে দাদি নজর ঝেড়ে দিত পান দিয়ে, আর পুড়িয়ে দিত পান। এখন এই কাজটা আম্মা, ফুফুরা করে। শাশুড়ির কাছ থেকে পান খাওয়া না শিখলেও পান দিয়ে কখনও বা পানের সঙ্গে ডাঁটিওয়ালা সাতখানা বড় বড় শুকনো লঙ্কা দিয়ে নজর ঝেড়ে দেওয়া শিখে দাদিকে ধরে রেখেছে আম্মা। নাতি-নাতনীদের উপর নজর তো আকছারই ঝাড়ে, আমরা, ভাই-বোনেরা বাড়ি গেলে কোনো কারণে একটু অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গেই দোকান থেকে পান আনিয়ে আম্মা এসে দাঁড়ায় নজর ঝাড়ার জন্যে!
ইংরেজি এল আকৃতির বিশাল বারান্দার দক্ষিণদিকে যে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারখানি, তাতে একসময় আমার দাদা বসত। পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁসে পাশাপাশি দুখানি বেতের সোফা, একটা সিঙ্গল আরেকখানি দু’জনের বসার। দুটো সোফার মাঝে একটা উঁচু বেতের মোড়া। সিঙ্গল সোফায় দাদি বসে পানের বাটাখানি রাখত মোড়ার উপর। পাশের বড় সোফাখানিতে আব্বা বা কাকা। কখনও দুজনে একসঙ্গে বসত, একজন সোফায় অন্যজন মোড়ায়। ফুফুরা এলে ভেতর থেকে মোড়া টেনে নিত বা লাল সিমেন্টের ঝকঝকে তকতকে মেঝেতে বসত আসন করে। বাইরের কেউ এলে তাদের জন্যে চেয়ার বা মোড়া আনতে বলত কাউকে। পাড়ার মহিলারা দাদির সঙ্গে গল্প করতে এসে নিজেরাই ভেতর থেকে নিয়ে এসে বিছিয়ে নিত শীতল পাটি। খাবার পরে বা এমনিতেও যখন বারান্দায় গিয়ে বসে আমার দাদি, সঙ্গে যায় পানের বাটা। হাতলওয়ালা যে চেয়ারখানিতে দাদা বসত, দাদা চলে যাওয়ার পর থেকে দাদি বসে সেই চেয়ারে। আব্বা বসে দাদির সিঙ্গল সোফায়, কাকা বাড়িতে থাকলে এসে বসে বড় সোফাখানিতে নইলে এমনিতে ফাঁকাই পড়ে থাকে। তাছাড়া আব্বাও তো সব সময় বাড়িতে থাকে না, সপ্তাহান্তের দিনগুলো শুধু। দাদা চলে যাওয়ার পর থেকে একদিন করে বেশি থাকে বাড়িতে আর বড়কাকাও বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি না করে বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই কাটায়। মায়ের সঙ্গে বারান্দায় বসে থাকে বড় সোফার একপাশ ধরে, মায়ে ছেলেতে পান খায় আর সংসারের গল্প করে। যে ক’দিন আব্বা বাড়িতে থাকে, সারাদিনই মায়ের সঙ্গে হয় বারান্দার সোফায় নইলে ঘরে দাদার বিছানায় শুয়ে বসে সময় কাটায়। কখনও গল্প করে তো কখনও এমনি বসে থাকে চুপচাপ।

-সাত-
শালমলী শিমিলার গাছ, তারে হইল পাঞ্চ ডাল সই,
তার উপর বইশে কাকাতুয়া।
পাড়ার পড়োশী সই, স্যাও প্রাণের বৈরী,
সই রে, কার হস্তে পেঠাইম বন্ধুর গুয়া।

কাকাতুয়া, বলোঁ তোক, ঠোঁটে করি গুয়া তুই,
নিয়া যা প্রাণ বন্ধুয়ার দ্যাশে। ( ভাওয়াইয়া গান/ প্রান্ত-উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত/ নির্মলেন্দু ভৌমিক)
মেজকাকার বিয়ের কথা চলছে যখন, প্রথম শুনি পানচিনি শব্দটা। যেদিন বসে ঠিক করা হয় বিয়ের তারিখ সেই দিনটির নামই ‘পানচিনি’। বড়কাকার বিয়ে তো হল যুদ্ধের মাঝখানে; তো কোথায় পান আর কোথায় চিনি! পানচিনির আমোদ আমরা পেলাম সেজকাকার বিয়েতে। সে এক রবিবারে, তখন বাংলাদেশে রবিবারেই ছুটির দিন ছিল, এখনকার মত শুক্রবারে নয়। কাকার পানচিনি হবে, বাড়িতে দারুণ হই চই, সব ফুফুরা যার যার শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে হাজির। আমরা চাচাতো ফুফাতো ভাই-বোনেরা তো একসপ্তাহ আগে থেকেই বাড়িতে। সাজ সাজ রব। এদিকে আমার মাথায় মহা দুশ্চিন্তা! পানচিনি নাম কেন একে-তাকে অনেককে জিজ্ঞেস করেও মন মতন উত্তর পেলাম না, অথচ এদিকে দ্যাখো সকলেই প্রবল ব্যস্ত পানচিনির আয়োজনে। বড়রা যারা কিছুই বলতে পারে না ‘পানচিনি’টা কী বস্তু তারাই কিনা সবাই যাবে নতুন চাচির পানচিনি দিতে!
একমাত্র পিসিমা, যে কিনা শুধু বড়ফুফুর কাছ থেকে নিয়ে নিয়ে খিলিপান খায় আর ঘুরে ঘুরে তদারকি করে সবকিছুর। সকাল দুপুর বা বিকেল যখন তখন একে তাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে এসে বারান্দার পশ্চিমদিকের আদ্ধেকটা দখল করে গীত গায় সদলবলে, সেই পিসিমাকে গিয়ে ধরলাম টানা চলতে থাকা গীতের মাঝখানে গুয়া-পানের বিরতির জন্যে একটু থামতেই। ‘পিসিমা, অ পিসিমা, পানচিনি কিতা গো?’ পিসিমা বোঝায়, ‘যেদিন বিয়ের তারিখ পাকা হয়, সেদিন বাড়ির সব মুরুব্বিরা কইন্যার বাড়িতে যায় ম্যালা ম্যালা পান-গুয়া, চিনির বাতাসা আর নিমকি-মিষ্টি লইয়া। কইন্যার লাগি শাড়ি-আংটি বা কানের জিনিসও দেওন লাগে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দেওন লাগে গুয়া-পান আর বাতাসা, এই কারণে তারিখের দিনেরে কয় পানচিনি।’ জানলাম, গুয়া-পান আর বাতাসা পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজন সক্কলের বাড়িতে বিলোতে হয়। বড় ডালায় পাঁচটা করে পান, পানের উপরেই রাখা গোটা দুই-তিন সুপুরি আর একমুঠো বাতাসা। কেউ যখন এরকম ডালায় করে পাড়া ঘুরে ঘুরে পান-বাতাসা কোরবানীর গোশতের মত বিলি করে বেড়ায় তখন সকলেই জেনে যায়, আমাদের মেয়ের পরের ঘরে যাওয়ার দিন এবার ঠিক হয়ে গেল।
আব্বা আর বড়কাকা গেল দশ মাইল দূরের শহরে, পানচিনির সরঞ্জাম আর অন্যান্য বাজার-হাট করতে। তাদের ফিরতে ফিরতে সেই দুপুর পার। কলসির আকারের এক মটকায় বিড়া বিড়া মিষ্টি পান, বড় মাটির হাঁড়িতে একটা একটা করে বেছে বেছে কেনা আমলকির আকারের সুপুরি, বড় বড় সব হাড়ি ভর্তি কয়েক রকমের মিষ্টি আর সবচেয়ে বড় হাঁড়িতে বাতাসা। রঙিন কাগজ দিয়ে মুখ বন্ধ করা সবকটা হাঁড়ি-মটকার। ছোটফুফু তক্ষুণি বসে গেল বাটিতে চালবাটা গুলে নিয়ে, সবকটা হাঁড়িতে সাদা নকশা কেটে সাজিয়ে দেওয়ার জন্যে। পানচিনির গুয়া-পানের হাঁড়ি হোক বা গায়ে হলুদের, মেহেন্দীর কুলা-ডালা, মিষ্টির হাঁড়ি, বিয়ের দিনের মিষ্টি, কনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার যে বিশালাকারের ‘যাত্রা’র মাছ, কোনোটাই তো আর না সাজিয়ে পাঠানো যায় না! এই সব সাজানো-গোছানোর কাজ ছোটফুফু করে। সে অবশ্য প্রচুর হাঁক-ডাকও করে সঙ্গে, ‘এই সামি, এইডা দে, অই স্বপ্নি, হেইডা আন!’ সবকিছুই হাতের কাছে আছে কিন্তু তবু চেঁচামেচি করে দৌড় করানো চাই। আমারাও অবশ্য দৌড়াতে থাকি তার তালে তাল মিলিয়ে।
আজকাল বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। সাজানো কুলা, ডালা, এমনকি কলসি, মটকা অব্দি। পানচিনির সামগ্রী দিয়ে সাজানো ডালা, গায়ে হলুদের যা যা লাগে সব দিয়ে সাজিয়ে একেবারে প্যাক করা কুলা, মেহেন্দীর ডালা-কুলা সমস্তই বাজারে পাওয়া যায় এক্কেবারে সাজানো-গোছানো অবস্থায়। কিন্তু তখন, যখন আমার কাকা-ফুফুদের বিয়ে হয়, এইসব চল ছিল না। বাড়ির মেয়ে-বউরা সব যে যার নিজের মত করে ঘরবাড়ি সাজাত। ডালা-কুলা, কলসিতে নকশা, গায়ে হলুদের মাউরা, সব নিজেরাই করত। মেয়ে বা ছেলে সে তো কেবল এই বাড়ির নয়, পাড়ার ছেলেরা মিলে সব দল বেঁধে বিয়েবাড়ির তোরণ সাজাত। কোনো ভাড়াটে লোক বা ভাড়ার তোরণের গল্প ছিল না। খানিক পর পর শুধু পাড়ার ছেলেদের, মেয়ে- বউদের, যাঁরা বিভিন্ন কাজে হাত লাগাতে এসেছে, গীত গাইছে, পিঠে কাটছে, তাদের চা-নাশ্‌তা দেওয়া আর থালায় করে খিলিপান। ব্যস।
বাজারে যাওয়ার সময় আব্বার হাতে ছোটফুফু যে তালিকা ধরিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল নানান রঙের কাগজ, রঙ, তুলি, সুতলির গোলা ইত্যাদি। সবই এসেছে তবু ফুফু যেন কিছুই খুঁজে পায় না, তার তো কাজ কম হাঁক-ডাক বেশি। এদিকে তাকে যদি বলি, কাঁচিটা দাও, আমি কাগজের ঝালর কাটব, নিশান কাটব, তা দেবে না। ‘না না, তুই ফারতি না, নষ্ট কইরা ফ্যালাইবি!’ এমনকি চালবাটা গোলা দিয়ে একটা কলসী বা মটকাতে নকশাও আঁকতে দেবে না, ডালা-কুলা সাজানো তো বহুদূর! যতই বলা হোক না কেন ইশকুলে তো আমি আঁকা শিখছিই।

-আট-
ভোরেত উঠিয়া কন্যা ভোরের সিনান করে।
শুদ্ধ শান্তে যায় কন্যা রন্ধনশালার ঘরে।।
উবু কইরা বান্ধ্যা কেশ আইট্যা বসন পরে।
গাঙ্গের না পানি দিয়া ঘর মাজন করে।।
মশল্লা পিটালি লইল পাটাতে বাটিয়া।
মানকচু লইল কন্যা কাটিয়া কুটিয়া।।
জোরা কইতর রান্ধে আর মাছ নানা জাতি।
পায়েস পরমান্ন রান্ধে সুন্দর যুবতী।।
নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত।
চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রের আকিরত।।
চই চপড়ি পোয়া সুরস রসাল।
তা’ দিয়া সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল।।
ক্ষীরপুলি করে কন্যা ক্ষীরেতে ভারিয়া।
রসাল করিল তায় চিনির ভাজ দিয়া।।
উত্তম কাঁঠের পিড়ি ঘরেতে পাতিল।
ছিটা ছড়া দিয়া কন্যা পরিচ্ছন্ন কইল।।
সোনার থালে বাড়ে কন্যা চিক্কণ সাইলের ভাত।
ঘরে ছিল পাতি নেম্বু কাইট্যা দিল তাত।।
সোনার বাটিতে রাখে দধি দুগ্ধ ক্ষীর।
ঘরে মজা সবরি কলা কইলা দিল চির।।
সোনার ঝাড়ি ভইরা রাখে আচমনের পানি।
তাম্বুলে সাজায় কন্যা সোনার বাটাখানি।।
কেওয়া খয়ার দিল কন্যা গন্ধের লাগিয়া।
রন্ধনশালা ঘরে রইল রান্ধিয়া বাড়িয়া।। (কাজলরেখা/ মৈমনসিংহ গীতিকা)

বিকেল বিকেল গ্রামের সব মুরুব্বিরা হাজির। পানচিনি করতে বাড়ির লোকই শুধু যাবে না, গ্রামের অমুক চাচা, তমুক মামারাও যাবেন। দাদা, আব্বা, বড় কাকা, দাদির ছোটভাই ইউনুস দাদা সবাই পাজামা-পাঞ্জাবী পরে রওয়ানা দিল গ্রামেরই শেষ মাথায়, বড় রাস্তার ওপারে, ‘নতুন চাচিআম্মা’র বাড়ির দিকে। সকলেরই হাতে হাতে মিষ্টি, নিমকি, গুয়া-পানের হাঁড়ি-মটকা। সাজানো কুলায় পানচিনির শাড়ি-আংটি চকচকে রঙিন কাগজে মুড়ে বার্লি জ্বাল দিয়ে বানানো আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে ছোটফুফু। যেহেতু গ্রামেই বিয়ে, আর খুব বেশি দূরেও নয় তাই সকলেই যাবে পায়ে হেঁটে।  দাদা শুধু গাড়িতে যাবে, কাঁচা সড়ক দিয়ে হাঁটতে পারবে না বলে। তখনও অব্দি পানচিনিতে শুধু পুরুষেরাই যেতেন, বাড়ির মেয়েরা নয়। কিন্তু আমরা যারা ছোট, বাচ্চামানুষ পানচিনি দেখতে আর খেতে যাওয়ার বায়না ধরেছে বলে অনুমতি মিলল। দাদা যদিও সাবধান করে দিল, মাথায় যেন ঘোড়ার ল্যাজ না বাঁধি আর ওখানে গিয়ে যেন ঘোড়ার মত না লাফাই! আমি আর বড়ফুফুর মেয়ে স্বপ্না দুজনে মিলে দুজনে দু’খানা সাজানো কুলা নিয়ে চললাম সবার সঙ্গে, পানচিনি করতে।
বারবাড়ির বৈথক- বাংলাঘরে মেঝেতে সতরঞ্চি পাতা, তার উপর ভারী চাদর পেতে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। খুব একটা কিছু মজার বিষয় নয় বড়রা যখন বসে বিয়ের দিন-তারিখ, দেনমোহর ইত্যাদি ঠিক করেন। কত বরযাত্রী আসবে, কোনো দেনা-পাওনার হিসেব আছে কিনা এই সব ভারী ভারী গম্ভীর কথাবার্তা। বাঁচা গেল যখন নতুন চাচির ভাই এসে আমাকে, স্বপ্নাকে ডেকে নিয়ে গেল ভেতরে, সোজা একেবারে নতুন চাচির কাছে। ইয়াবড় এক ঘোমটা দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে একজন, কিছুতেই সে মাথা তোলে না, কথাও বলে না। কানে কানে স্বপ্না বলে, নতুন বৌ’র এমনি করেই বসে থাকতে হয়! ততক্ষণে পানচিনির সাজানো কুলা খুলে চাচির বোনেরা তাকে পরিয়ে দিয়েছে শাড়ি, আংটি। একঝলক দেখা গেল চাচিকে, দেখতে কী ভীষণ মিষ্টি! একবার শুধু নাম জিজ্ঞেস করল, তারপর আবার ঘোমটার নিচে, মাথা নিচু! ব্যস। শেষ হয়ে গেল বুঝি পানচিনি, চিনচিন করে ওঠে বুকের ভিতর। চাচির বোনেরা তখন নানা রকম ঠাট্টা-মশকরায় ব্যস্ত।
নাহ। শেষ নয় পুরোপুরি। দুধের শরবত দিয়ে যে অতিথি আপ্যায়ন শুরু হয়েছিল, তাতে সংযোজিত হলো  ফুলপিঠা, নারকেলের সমোসা, পাক্কন পিঠা, পোয়া পিঠা আর হরেক রকম মিষ্টি। যা কিনা  নাশতা। রুপোলি থালিতে এল সাজা খিলি পান, প্রত্যেকটা খিলি চুলের কাঁটার মত লবঙ্গ দিয়ে আটকানো, যাতে খিলি খুলে না যায়।  মোরগ মুসল্লাম দিয়ে বিশাল বিশাল গোলাকার চিনামাটির থাল সাজিয়ে এল রাতের খাবার। প্রতি থালে আস্ত এক একটা মুরগি, পোলাওয়ের বিছানার উপর শোওয়া। পাশ বালিশের মত দুই পাশে ছড়ানো সব মুরগির ঠ্যাং। তিনজন করে একটা থালে খাবে, এমনটাই আয়োজন। সারাদিনের দৌড়-ঝাঁপ, নতুন চাচি দেখা, হাতে কলমে পানচিনি জানার উত্তেজনা, আর রাজসিক পোলাও আর মোরগ- সব শেষ হওয়ার মাঝে কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছি, জানি না। তখন আমায় দাদার সঙ্গে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাকিরা আবার ধরল পায়ে হাঁটা পথ।

-নয়-
জামাইর মা গো করুণা
হলদি গিলা বাইট্য না।
জামাই গেছে নদীর কূল,
ছিটট্যা পড়ছে চাম্পা ফুল।
চাম্পা ফুলের গন্ধে,
জামাই আইছে আনন্দে।
খাওগো জামাই বাটার পান
সুন্দরীরে করব দান।( মেয়েলী ছড়া/ লোক-সাহিত্য ছড়া- ২য় সংস্করণ/মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী)

শুভ কাজে নাকি দেরি করতে নেই তাই ঠিক হল পনের দিন পর বিয়ে। আব্বা, মেজকাকা, সেজকাকা সব চলে গেল কর্মস্থলে, আমরা রয়ে গেলাম বাড়িতেই। ফফুরাও রয়ে গেল এক্কেবারে বিয়ে মিটিয়ে যাবে বলে। বড়কাকা তো বাড়িতেই থাকে। তার কাজ হলো ঘুরে ঘুরে কাছে-দূরের সব আত্মীয় স্বজন, গ্রামের লোকজন সবাইকে দাদার হাতে লেখা দাওয়াৎএর চিঠি পৌছানো। বাজার হাট, অন্যান্য আয়োজনের তদারকি করাও কাকারই দায়িত্ব। আম্মা, বড়চাচি আর ফুফুরা সবাই মিলে একের পর এক ফর্দ বানিয়ে দিয়েছে। বিয়ের বাজার, গায়ে হলুদের বাজারে কি কি লাগবে। বিশাল লম্বা সেই একেকটা ফর্দ! বাড়িতে কাজের দায়িত্ব সবাই ভাগ করে নিয়েছ্। ঘর-দোর ঝাড়পোঁছ, হলুদের গোসল করানোর জায়গা-মাউরা বানানো এবং সাজানো, নতুন বৌয়ের ঘর সাজানোর দায়িত্ব ছোট ফুফু ও আমাদের, ছোটদের। আম্মা আর বড়চাচি তো সারাদিন রান্নাঘরেই ব্যস্ত, অত মানুষ বাড়িতে, এদিকে বিয়ের অন্তত তিন দিন আগে থেকেই আত্মীয়-স্বজনেরা আসতে শুরু করবে। পিঠা-পুলির দায়িত্ব মেজফুফুর, বড় ফুফু দেখবে মশলাপাতি কোটা ও বিয়েবাড়ির সুপুরি কাটা। পিসিমা সকলের সকল কাজের তদারকি করবে বরাবরের মত, আর গীত গাইবে পড়শি সব মেয়ে-বৌদের নিয়ে।
রঙিন কাগজ কেটে বড় বড় ফুল বানিয়ে বার্লির আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে দেওয়া হল সব দেওয়ালে দেওয়ালে। সবকটা দরজার মাথার উপর চৌকাঠে লাগানো হলো কাগজ কেটে বানানো নকশাদার ঝালর। ছোট ছোট তিনকোণা নিশান কাটা হলো সমস্ত রঙের কাগজ দিয়ে, লাল, নীল, হলুদ, বেগুনী, সবুজ আর সাদা। দেখতে ঠিক যেন খিলি করা পান। সরু সুতলিতে সেই সব খিলিপানের মতো নিশানগুলোকে আটকে দেওয়া হল আঠা দিয়ে, গোটা উঠোন ঢেকে গেল এই রং-বেরঙের নিশানের চাঁদোয়াতে। বারবাড়িতে, সেই পুকুরের দখিণ পার থেকে শুরু করে বাংলাঘরের দরজা অব্দি বাঁশের খুঁটি পুঁতে রাস্তা বানিয়ে টাঙিয়ে দেওয়া হল সুতলিতে আটকানো সব নিশান। বাংলা ঘরের কাঠের পালাগুলো (টিনের চালের বাড়ির কাঠের খুঁটিগুলো) সব মুড়ে দেওয়া হলো রঙিন কাগজ দিয়ে। ভেতরবাড়ির মত বাংলাঘরের দরজা-জানালাতেও লাগানো হলো কাগজের নকশাদার ফুল, ঝালর। পাড়ার ছেলেরা পুকুরের উত্তরপারের ছোট্ট বাঁশঝাঁড় থেকে বাঁশ কেটে এনে তৈরি করে দিল বিয়েবাড়ির তোরণ। সেই তোরণও সাজানো হলো রঙিন কাগজ, বিভিন্ন গাছের ডাল-পালা, লতা-পাতা দিয়ে।
পাতা সহ চারখানা কলাগাছ গোড়া থেকে কেটে এনে উঠোনের একদিকে চারকোণায় চারখানা পুঁতে দিয়ে সেই কলাগাছকে মোড়ানো হলো রঙিন কাগজে। সরু করে তোলা বেত খিলানের মত করে গেঁথে দেওয়া হলো একটা থেকে আরেকটা গাছের গায়, সেই বেতের খিলান ঢেকে দেওয়া হলো কাগজের ঝালরে। সামনের দিকটা খোলা রেখে তিনদিক ঘিরে এই বেতের খিলান। সাজানো হয়ে যাওয়ার পর দেখতে লাগছে ঠিক যেন ছোট্ট একখানা ঝলমলে চানঘর, তৈরি হয়ে গেল মাউরা। সেই সাজানো মাউরার ভেতরে বসানো হলো দাদির নামাজের চারপেয়ে ছোট্ট চৌকি। সেজে উঠল এই চৌকিও রঙিন কাগজের টুকরোয়। এতে বসিয়েই মেজকাকার গায়ে হলুদ মাখানো হবে, বিয়ের গোসলও এখানেই দেওয়া হবে।
শুনলাম শনি-মঙ্গলবারে নাকি গায়ে হলুদ দেওয়া যায় না। কেন কী বৃত্তান্ত সেসবও শুনেছিলাম কিন্তু এখন আর মনে নেই। রবিবারে বিয়ে কাজেই শুক্কুরবারে কাকার গায়ে হলুদ। নতুন চাচির জন্যে এল লালপাড় হলুদ গরদের শাড়ি সঙ্গে একখানা একই রঙের তাঁতের শাড়ি। লাল ব্লাউজ-পেটিকোট, বাটা থেকে কেনা লাল ফিতের চটি, চন্দনের টুকরো, আলতা, চিরুনী, লাল-হুলুদ রেশমী চুড়ি, তোয়ালে-সাবান ও কিছু প্রসাধনী সামগ্রী। এর সঙ্গে গেল ছোট্ট একখানা পাটি, যাতে লাল রঙ দিয়ে ফুল, লতা-পাতা, পালকি নকশা এঁকে দিয়েছে ছোটফুফু। এই পাটিতে  বসিয়েই কনেকে হলুদ দেওয়া হবে, সেই পাটিও মুড়ে রাখা হয় ডালাতেই। নতুন বেতের ডালাকে রঙিন কাগজে মুড়ে সোনালী জরির ঝালর দিয়ে ডালাকে ঘিরে দিয়ে তার উপরে সমস্ত জিনিসপত্র রেখে দেয় ছোটফুফু। হাত লাগায় পিসিমাও। লাল রঙের জরি বসানো চকচকে সাটিনের রুমাল আকারের কাপড় দিয়ে ঢাকা হয় ডালা। এই ঢাকনাও বাড়িতেই বানানো। একইভাবে সাজানো কুলায় রাখা হয় ছোট ছোট নতুন বাটিতে কাঁচা হলুদ বাটা, সোঁন্ধা বাটা, মেথি বাটা, মেহেন্দী বাটা। বিশাল এক ডালাকে একইভাবে কাগজে মুড়ে, সাজিয়ে তার উপর ডালার ধার ধরে ধরে এক গোছার উপর আরেক গোছা রেখে সাজানো হয় ধুয়ে মুছে শুকনো করা পান। এই পানগুলোর ডাঁটি-ল্যাজা কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দেওয়া। সারির পর সারি দিয়ে পান সাজিয়ে মাঝখানের খানিকটা গোলাকার ফাঁকা জায়গায় রাখা হয় গোটা গোটা সুপুরি। এই ডালায় সুপুরি অল্পই ধরে, আলাদা করে পানপাতা আঁকা মাটির হাড়িতে দেওয়া হয় সুপুরি।
শুকিয়ে আসা আদার মত দেখতে সোঁন্ধা, মাটির তলায় হয়। ঝাঁঝালো একটা মাদক গন্ধ হয় সোঁন্ধাবাটায়। সুগন্ধের জন্যে হলুদ মাখানোর পরে সোঁন্ধাবাটা গায়ে মাখিয়ে দেওয়া হয়। মেথিবাটার সঙ্গে মিশিয়ে মাখানো হয় চুলেও। ‘তেলাই’এর জন্যে সেদ্ধ করা শুকনো হলুদ বাটা যাতে সর্ষের তেল মাখানো। বিকেলবেলা গায়ে হলদি দিয়ে গোসল দেওয়ার পরে রাতে হবে তেলাই। রাতে একবার তেলাই হয়ে যাওয়ার পর হাতে পরানো হবে মেহেন্দী। সারারাত ধরে চলবে কনের হাত-পা মেহেন্দীতে সাজানো, বাড়ির সমস্ত মেয়েরাও রাত জেগে মেহেন্দী পরবে আর গীত গাইবে। দু’দিন ধরে চলবে এই তেলাই। যাতে সমস্ত শরীরে পাকা হলুদের রঙ বসে যায়। বিয়ের দিন সকালে শেষবার মাখিয়ে গোসল দেওয়া হবে। মোটা একগাছি রঙিন সুতোয় গেঁথে দেওয়া হয় টুকরো হলুদ, ছোট্ট টুকরো সোনা, রূপো আর লোহা। সবকটা জিনিসেরই মাঝখানে ফুটো করা। বিয়ে বাড়িতে লাগে বলে প্রায় সকলেই বাড়িতে রাখেন এই জিনিসগুলো। সোনা-রূপো-লোহা মাঝখানে রেখে দুপাশে হলুদ গাঁথা হয়। তৈরি হয় কাঙ্গেনা। গায়ে হলুদ দেওয়ার আগে এটা বেঁধে দেওয়া হবে নতুন চাচির ডানহাতে। চাচি এটা পরে থাকবে সেই বৌভাত অব্দি। এই যে এত রকমের সুগন্ধি মাখানো হবে চাচির গায়ে, সেই সুগন্ধে যেন কোন খারাপ জ্বীন-প্রেতের নজর না পড়ে সেজন্যেই তৈরি হল এই রক্ষাবন্ধন, এই কাঙ্গেনা।

-দশ-
আঁটুল বাঁটুল শিমলে শাঁটুল
শিমলে গেছে হাটে
গুয়া কাট কাটে
মালীদের মেয়েগুলো
খাটে বসে কাঁদে।
আর কেঁদো না
আর কেঁদো না
কলাই ভাজা দেব
আর কাঁদলে
দাদাকে বলে দেব
দাদা দাদা ডাক ছাড়ি
দাদা গেছে কার বাড়ি।
ও পথেতে যেও না গো
বঁধু এসেছে
বঁধুর পান খেও না গো
ভাব লেগেছে
ভাব ভাব কসমের ফুল
ফুটে রয়েছে
হাত বাড়িয়ে তুলতে গেলাম
দাদা রয়েছে
দাদার হাতের বাজুবন্ধন
ছুঁড়ে মেরেছে
উহু হু বডড লেগেছে। (ছড়াঃ হুগলীর ভাঙ্গামোড়া হইতে সংগৃহীত/ অম্বিকাচরণ গুপ্ত/ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা/১৩০৩)
বিয়ের এক সপ্তাহ বাকি থাকতে বড়ফুফু রাতের বেলা ভিজিয়ে রাখল বড় বালতিতে এক বালতি সুপুরি। কাল সকালে সুপুরি কাটতে বসা হবে। পাঁচটা করে পান, পাঁচটা সুপুরি আর মিষ্টি দিয়ে প্রতিবেশী বউ-ঝিদের দাওয়াৎ দিয়ে এল বড়ফুফু, সুপুরি কাটার দাওয়াৎ। সকাল থেকে দল বেঁধে সবাই এসে বসবে সুপুরি কাটতে, চলবে সন্ধ্যে অব্দি। সকলের দুপুরের খাওয়া আমাদের বাড়িতে, সঙ্গে চা-নাশতা-পান তো আছেই। সবাইকেই যার যার ছরোতা নিয়ে আসতে বলে এল ফুফু। আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা আছে বটে কিন্তু দশ-বারোজন বসলে কাটবে কী দিয়ে যদি ছরোতা না থাকে? আমাদের দেশ-গ্রামে জাঁতির নাম ছরোতা। আমার দাদির একখানা রুপোলি রঙের ছরোতা আছে। খুবই ছোট দেখতে। বহু পুরনো, ব্যবহারে ব্যবহারে ধার গেছে মরে। মাঝে মাঝে দেওয়া হয়েছে পাড়াগাঁয়ের কামারশালায়। এই ছরোতাখানি কলকাতা থেকে কেনা। দাদির বড়ভাই, আমার বড়দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে তাকে দিয়েছিলেন সেই যুবক বয়েসে। আমার দাদি তো কোনো জিনিস হারায় না, খুব যত্ন করে রাখে নিজের সখের সব জিনিসপত্র। তবে এই ছরোতায় এখন আর সুপুরি কাটা যায় না, এতটাই ভোঁতা হয়ে গিয়েছে তবু দাদির যত্নে তার চকচকে ভাব যায়নি। এই ছরোতাটিকে বরাবর দেখে এসেছি দাদির পানদানে রাখা, তাঁর গোল টেবিলে। সঙ্গেই রাখা একটা লোহার সুপুরি কাটার ছরোতা। সেই দিৎপুরার কামারবাড়ি থেকে করিয়ে এনে দিয়েছিল বড়কাকা। সেও বোধ হয় বহুকাল আগে। কিন্তু তাতে ধার খুব এখনো! এটা দিয়ে সাধারণত ঘরের রোজকার সুপুরি কাটা হয়। দাদির অবশ্য বেশ কয়েকটা ছরোতা রাখা আছে বিয়ে-সুন্নত বা যে কোনো রকমের জেয়াফতে প্রচুর পরিমাণে সুপুরি কাটার সময় লাগে বলে। সেগুলোও সেই দিৎপুরার কামারবাড়ি থেকেই বড়কাকার করিয়ে আনা। কিন্তু বিয়েবাড়ি-সুন্নতের বা বড় জেয়াফতে যখন গুয়া কাটার জেয়াফত দিতে হয়, তখন কম পড়ে এই পাঁচ-ছয়খান ছরোতাতেও। তাই সবাইকে বলে দেওয়া থাকে, যে যার ছরোতা যেন নিয়ে আসে।
যথারীতি গ্রামে সকাল হয় খুব সকালে। ভোর ভোর উঠে দাদার জন্যে সুজির হালুয়া, বাকিদের সকলের জন্যে চা-বিস্কুট, আটটা বাজার আগেই সকালের নাশতা তৈরি। দুপুরের খাবার আয়োজনও শুরু হয়ে যায় রান্নাঘরে চার-পাঁচজন সাহায্যকারী নিয়ে আম্মা, বড় চাচির। দুপুরে পাড়ার সব বৌ-ঝিয়েরা খাবে, সুপুরি কাটার জেয়াফত যে আজকে। বড়ফুফু আমাদের লম্বা টানা বারান্দার পশ্চিম দিকটা ধরে বসেছে সবাইকে নিয়ে। পাশেই বড়ফফুর নিজের পানবাটা, যাতে ভর্তি সারাদিনের মত পান খাওয়ার আয়োজন। সুপুরি কাটতে কাটতে নিজেও খায়, অন্য সকলকেও একটা করে খিলি ধরিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যেই রান্নাঘরের দিকে রাজহাঁসের মত গলা উজিয়ে আওয়াজ দেয়- ‘অ মেজভাবি, চা পাডাইতা পারবানি এট্টু?’ বড়ফুফুর সুপুরি কাটার মেহমানদের পাশেই পিসিমা বসে তার গীতের দল নিয়ে। এদিকে সুপুরি কাটা চলে ওদিকে গীত। মাঝে-মধ্যেই দাদা হাঁক দেয়, ‘এইবার থামাস না এই গীত-বাদ্য, আমার কান ব্যাদনা করত্যাসে!’ ক্ষণিক থামে। দাদা অন্যদিকে সরে গেলেই আবার শুরু হয়ে যায় গীত। মাঝে মধ্যেই গলা মেলায় বড়ফুফুও।
সজো রে সাজো রে কইন্যা বিয়ার সাজন
দামান মিঞা আইলো চলি বাজাইয়া বিয়ার বাজন।।
পরথমে তোর হাতো পায়ো মেন্দি লাগাইব
গোলাপ পানি দীয়া তোরে গোসল করাইব।।
এমন সাজ সাজাও কইন্যারে, যেমন কইন্যা সুন্দরী
ঢেউ তোলা চুলে কইন্যার বান্ধিও কবরী।।
সিতায় দিন সিতাপাটি, নাকো নাকফুল
মাঁথায় দিব সোনার কাঁটা, কানে দিব দুল।।
হাতে দিব বাজুবন্ধ চুড়ি বেলোয়ারী
দামান্দেরে দেখাইবি কইন্যা হাত লারি লারি।।
নাকেতে বেসর দিব হাতে সোনার চুড়
কোমরেতে বিছা দিব পায়েতে নুপুর।।
মুখেতে তাম্বুল কইন্যার চোখেতে কাজল
দামান মিঞা দেখলে তোরে হইব যে পাগল।। (চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিয়ের গীত। সৌজন্যে কল্যাণী ঘোষ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।)

-এগারো-
ঢাক বাজে ঢোল বাজে আর বাজে সানাই।
নাইচ গান হয় কত জুড়িয়া আঙ্গিনায়।।
জয়াদি জুকার গীত হয় ঘরে ঘরে।
বাড়ী ভরিয়া পাছে লোক আথারে পাথারে।।
চারি ভইরা ময়রা মিঠাই বানায়।
হাজারে বিজারে গোয়াল দই জমায়।।
সাজাইল পুরীখানি ঝলমল করে।
এরে দেখ্যা চান্দ যেমন লুকায় অন্ধকারে।। (কমলা/ দ্বিজ ঈশান/ মৈমনসিংহ গীতিকা) 

এগিয়ে আসে বিয়ের দিন। একে একে সকলেই পৌঁছোয় বাড়িতে। বিশাল এক পেতলের থালায় অল্প পানি দিয়ে ধান-দুর্বা রাখা। বিয়ের অতিথি যারাই আসছে, তাদেরকেই ধান-দুব্বায় বরণ করা হচ্ছে। বৌভাতের জন্যে চান্দুরার হাট থেকে রেওয়াজি খাঁসি, মুরগি সব দাদা আর বড়কাকা মিলে কিনে নিয়ে এসেছে। মশলা কোটাও শেষ, শেষ সুপুরি কাটা, মেজফুফুর ফুল আর পাক্কনও কাটা হয়ে গেছে গায়ে হলুদের আগের দিন। ফুরোয় না শুধু বড়কাকার দৌড়াদৌড়ি। একবার ভৈরবের বাজার, একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া তো আবার চান্দুরা-মাধবপুরের হাট করে বেড়াচ্ছে।
আমাদের বাড়িতে কখনও বাজারের ঘি আসে না। বিয়ে-সুন্নত বা কোনো জেয়াফত থাকলে বাড়ির মুনিষ মহিদ লশকর গিয়ে খবর দিয়ে আসেপাশের ছোট্ট গ্রাম দেওরা’র সকল দুধ ব্যাপারীকে। তারা যেন এক হপ্তা-দশদিনের সমস্ত জমানো সর থেকে তৈরি মাখন, তা এনে দিয়ে যায়। দেওরার প্রায় সকলেরই দুধের ব্যবসা। সকলের ঘরে ঘরে দুগ্ধবতী গরু বেশ কয়েকটা করে। গরুগুলো বাঁধা থাকে খুঁটিতে, বাছুরেরা থাকে ছাড়া। এদিক ওদিক চরে ঘাস খায়, খানিক পর পরই এসে মায়ের কাছ থেকে দুধ খেয়ে যায়। গরুর মালিক, গোয়ালা দু’বেলা দুধ দুয়ে নিয়ে দুধের বালতি এগিয়ে দেয় গোয়ালিনির দিকে, এর পরের সমস্ত কাজ গোয়ালিনির।
বড় লোহার কড়াইতে দুধ জ্বাল দেয় সে, দুধ ফুটে গেলে পরে উনুন থেকে জ্বালের কাঠ তুলে নেয়। কড়াই চাপা দেয় বড় বড় ফাঁক ফাঁক করে বোনা বিশাল আকারের বেতের চালুনি দিয়ে। নিভু নিভু কয়লার আগুনে দুধে মোটা সর পড়ে। দুধ যত ঠান্ডা হয়, সর তত মোটা হয়। হাতায় করে তুলে নেয় আধা-পৌন ইঞ্চি মোটা সর, জমিয়ে রাখে বড় বালতিতে। সেই বালতিতে আগে থেকেই দেওয়া থাকে দইয়ের ‘সাজ’। জ্বাল দেওয়া-সর তুলে নেওয়া দুধ কলসি ভরে চলে যায় আগে থেকে বায়না দিয়ে রাখা মিষ্টির দোকানগুলিতে। দু-তিন দিনেই বালতি ভরে ওঠে, দইয়ের টক গন্ধে উঠোন-বাড়ি ম ম করে।
বড় খোলা মুখের মাটির মটকায় দইয়ের সাজ দিয়ে জমানো সর ঢেলে কাঠের বিশাল বড় ডালঘুটনির মত দেখতে একটা ঘুটনি দিয়ে সেই সর ঘোটা হয় ভোর ভোর অন্ধকারে। বেলা বাড়লে গরম পড়ে, মাখন গলে গলে যায়, তাই রাত থাকতে উঠে সর ঘুটে মাখন বের করে নেওয়া হয় রোদ ওঠার আগেই। খানিকক্ষণ ঘোটার পরেই দলা দলা মাখনে মটকার মুখ ভরে যায়, ঘুটনি আর চলতে চায় না। কাঠের বড় হাতা দিয়ে গোয়ালিনি ধপধপে সাদা দলা দলা মাখন তুলে দেয় মাটির মটকায়। কোনো বিয়ে বা জেয়াফত বাড়িতে বায়না থাকলে মটকা ভরে গোয়ালা দিয়ে আসে ধপধপে সাদা মাখন। বায়না না থাকলে বড় লোহার কড়াইতে করে গোয়ালিনি জ্বাল দেয় সেই মাখন, বানায় সোনালী ঘি।
মাখন তুলে নেওয়ার পর মটকায় যেটা পড়ে থাকে সে হচ্ছে মাঠা। মাঠার উপর ফুটি ফুটি বিন্দু বিন্দু মাখন ভাসে। গোয়ালা সেই মটকা ভারে বসিয়ে, ভার কাঁধে নিয়ে সকাল সকাল আশে-পাশের গাঁয়ের ঘরে ঘরে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে, মাঠা নিবেননি সাব মাঠা! কেউ ছোট কলসে করে মাঠা কেনে তো ছোট জগে। সকালবেলায় এই বিন্দু বিন্দু মাখন ভাসতে থাকা ঘন মাঠা অল্প চিনি বা নুন দিয়ে খাওয়া, আহাঃ, সে এক স্বর্গীয় বস্তু! এরারুট বিস্কুটের খালি বড় টিনে গোয়ালিনি ঢালে ঘি। দুটো টিন যখন ঘি’তে ঘরে যায়, গোয়ালা ভারে চাপায় সেই ঘি ভর্তি টিন। একইভাবে কাছে-দূরের গ্রামে-শহরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করে সেই পাকা সোনার রঙের দানা জমে ওঠা ঘি।
মহিদদাদা। আমাদের বাড়ির পাশের লশকর বাড়ির লোক। ষাটের ঘরে বয়েস, শক্তপোক্ত পাকানো রোদেপোড়া চেহারা, নাকের নিচে পাকানো বিশাল গোঁফ। লুঙ্গির উপরে কোমরে গামছাখানি বাঁধা, শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস উদোম গা। একসময় পাকা লাঠিয়াল ছিল, যবে থেকে লাঠি নামিয়ে রেখেছে ক্ষেতের কাজ করে। আমাদের জমি-জমা, বাড়ির গরু-বাছুর সব মহিদদাদার দায়িত্বে। পাড়ার সম্পর্কে দাদাকে ভাইছাব বলে ডাকে। আব্বা-কাকাদের সে মহিদকাহা, আমাদের মহিদদাদা। সারাদিন এবাড়িতেই, দাদার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। দাদা যেখানে যায়, দাদার সঙ্গে যায়। কাজ না থাকলে দুপুরে খেয়ে-দেয়ে বাংলাঘরেই ঘুমায়। নিজের বাড়িতে যায় শুধু রাতের বেলা, ঘুমুতে। সুন্নত-বিয়ে, ঈদ-কোরবানিতে মহিদদাদা এ’বাড়ির সবচেয়ে বড় ভরসা। 
উঠোনের সবচেয়ে দক্ষিণকোণাটি বেছে নিয়ে ইঁটের চুলা বানিয়ে তাতে বসায় বিশাল এক লোহার কড়াই। তেঁতুল কাঠের আগুনে তাতে মাখন জ্বাল দেয় মহিদদাদা। বাড়িতে বানানো বিশাল লম্বা এক কাঠের খুন্তি দিয়ে অনবরত নেড়ে যায় সেই মাখন। একটু দূরেই সব সময়কার সঙ্গী লাঠিটা নিয়ে দাদা তার হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে থাকে। ডান পায়ের থেকে বাঁ পা’টা বেশ একটু ফোলা দাদার। যেবার দাদা হজ্বে গেল, মক্কার ক্বাবা শরীফকে বৃত্ত করে সাতপাক ঘোরার নিয়মটি পালন করার সময় এক বিশালদেহী আফ্রিকান ভীড়ের মধ্যে মাড়িয়ে দেয় দাদার বাঁ পায়ের পাতা। কড়ে আঙুলটি ভেঙ্গে যায় দাদার, তখন চিকিৎসা করানোর সময় ছিল না। ওই ভাঙ্গা আঙ্গুল নিয়েই দাদা হজ্বের বাকি সব নিয়ম পালন করে, হাঁটতে অসুবিধে হত বলে একটা লাঠি শুধু কিনে নিয়েছিল। সেই থেকে দাদার বাঁ পায়ে বাতে ভর করে রেখেছে, সাদাসিধে দেখতে লাঠিটা সেই থেকে সর্বক্ষণের সঙ্গী। যখন চেয়ারে বসে, চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে দেয় কখনো বা লাঠিটা হাতে নিয়েই বসে থাকে। বেশিক্ষণ একভাবে বসে থাকতে পারে না ফোলা পায়ে ব্যথা বলে। ডান পায়ের উপর বাঁ পা তুলে বসে থাকে দাদা আমার। যখনই বাঁ পা অবশ হয়ে আসে, আস্তে আস্তে বদল করে পা, ধীরে ধীরে নাড়ায় ব্যথার পা।
এদিক ওদিক দৌড়-ঝাঁপ করে বিয়েবাড়ির সব তদারকি করে খানিক পরপরই গিয়ে দাঁড়াই দাদার চেয়ারের পেছন ঘেঁষে। হাত বুলিয়ে দেই দাদার প্রায় সাদা হয়ে আসা কদমছাট চুলে। দাদা বলে, ‘কিচ্ছু কইবা সামাবিবি?’ দাদাকে বলি, ‘আপনের পাও ব্যাদনা করে না? আইয়েন পাও টিপ্যা দেই। ‘দাদা বলে, ‘যেই সুমায় বিছনাত যাই হেই সুমায় তো তুমারে পাই না বুবু।’ দাদার হাত ধরে টানি, ‘অক্ষণে চলেন।’ লাঠি ভর করে দাদা উঠে দাঁড়ায়, হাত ধরে হাঁটি ঘরের দিকে। পেছনে ধীমে ধীমে ধোঁয়া বিহীন তেঁতুল কাঠের আগুনে মাখন জ্বাল হয়ে ঘি হতে থাকে। প্রথমে মাঠার একটা টক টক গন্ধ ছড়ায় তারপর ধীরে ধীরে ঘিয়ের সুবাস ভাসতে থাকে বাতাসে, গোটা মৌলভীবাড়িকে সেই সুবাসে ভরিয়ে দিয়ে ছড়িয়ে যায় গোটা পাড়ায়। কড়াইয়ের তলায় পড়ে থাকে জ্বাল হয়ে হয়ে মুচমুচে হয়ে যাওয়া কিছু কালচে গুড়ো, কড়াই ভরে যায় পাকা সোনার রঙের ঘিতে।

-বারো-
কুন কুন সখী যাইবা জলে, আইয়ো আমার সঙ্গে গো
জলে যাইতাম।
কেউয়ের পিন্ধন লাল নীল, কেউর পিন্ধন সাদা গো
জলে যাইতাম।
ভেলুয়া সুন্দরীর পিন্ধন কৃষ্ণ নীলাম্বরী গো
জলে যাইতাম।
কেউয়ের হাতে লোটা-ঘটি—কেউয়ের হাতে কলসি গো
জলে যাইতাম।
ভেলুয়া সুন্দরীর কাঙ্খে সোনার কলসি গো
জলে যাইতাম।
কেউ বা হাঁটে রইয়া রইয়া- কেউ বা হাঁটে ধায়া গো
জলে যাইতাম।
ভেলুয়া সুন্দরী হাঁটে ঝলিয়া ঝলিয়া গো
জলে যাইতাম। (পানিভরণ গীত/ কিশোরগঞ্জ)

একটু আগে-ভাগেই দুপুরের খাওয়া সারা হল সেদিন, সবাই মিলে যাবে ‘গোসল’এর পানি তুলতে। বাড়িতে এত আত্মীয় স্বজন যে রান্নাঘরে আম্মা-বড়চাচির পক্ষে সবার জন্যে নাশতা-পানি, তিনবেলার খাওয়া, বারে বারে চা ইত্যাদি করা সম্ভব নয় বলে হলুদের দিন থেকেই রান্নার দায়িত্ব মহিদদাদার তদারকিতে গাঁয়েরই দুই বাবুর্চির। তারা এবাড়িতেই থাকবে এখন বৌভাত শেষ হওয়া ইস্তক। রান্নাঘরে শুধু চা-নাশতা হবে, বাদবাকি সবকিছু তাদের দায়িত্বে।
আগের দিন সন্ধ্যেবেলায় বড়চাচি-বড়ফুফু মিলে গোটা পাড়ায় ঘুরে ঘুরে হলুদের দাওয়াৎ দিয়ে এসেছে। বিকেল গড়ানোর আগেই যেন সকলে চলে আসেন সেটা সবাইকেই বারবার করে বলে দিল ফুফু। প্রত্যেক বাড়ির বয়স্ক মহিলারা নতুন জামাইয়ের কপালে-গালে হলুদ ছুঁইয়ে দেবেন। দুপুরের খাওয়ার পাট চুকে গেলে মহিলারা দল বেঁধে পুকুরঘাটের দিকে রওনা দেয়, গোসলের পানি তুলতে। প্রায় সকলেরই কাঁখে কলসি। সবার আগে আম্মা- বাড়ির বড়বউ, সঙ্গে বড়চাচি, আর তিন ফুফু।  আম্মার হাতে ছোট্ট একটা নতুন কুলা তাতে জোড়া গুয়া পান। পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দেয় আম্মা পান-গুয়া। ভাসতে ভাসতে খানিক দূরে যায় সেই গুয়া পান। বাঁধানো ঘাটের যে সিঁড়িটি পানির তলায়, সকলেই শাড়ি খানিকটা তুলে দাঁড়ায় পানিতে ডুবে থাকা সিঁড়ির উপর। আম্মা সরে যায়, প্রথমে পানি তোলে চাচি তারপর একে একে সকলেই পানি ভরে কলসিতে। বিয়ের গোসলের জন্যে চাই পাঁচ কলসি পানি কিন্তু সবাই পানি ভরছে কারণ মেজকাকার গায়ে হলদি দেওয়ার পরেই শুরু হয়ে যাবে হলুদ খেলা, পানি খেলা আর রঙখেলা। ছোটফুফু আর তার বান্ধবীরা মিলে চুপি চুপি অনেক রঙ কিনে এনে লুকিয়ে রেখেছে, হলদির পর সবাইকে মাখাবে বলে।
তার পরে গেল যে তারা সিনান করিবারে।
সব সখী মিল্যা গাষ্ট ঘিলা মাজন করে।।
হলুদ মাখিয়া গায়ে যতেক সুন্দরী।
ভরা কলসীর জল ঢালে ত্বরা করি।।
সিনানের গীত হইল যত জানা ছিল।
ছান করি বরকন্যা ঘরেতে আসিল।।
বাদ্যভান্ড বাজে কত তার সীমা নাই।
সাজন করে বরকন্যার সখীগণ সবাই।। ( কমলা/ দ্বিজ ঈশান/ মৈমনসিংহ গীতিকা)

হলুদের দিনে বাড়ির মেয়েরা যখন নতুন বৌয়ের ডালা-কুলা সাজাতে ব্যস্ত, আব্বা- কাকা তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছের বাজারে। কাকা আগে থেকেই পরিচিত মাছওয়ালাকে বলে রেখেছিল, শুক্কুরবারে সকালে যেন বড় পাকা রুই বা কাতলা নিদেনপক্ষে একখান বড় পাঙাশ যোগাড় করে রাখে। সে মাছ যেন দশ সেরের নিচে হলে হবে না, যাত্রা’র মাছ বলে কথা! বিয়েবাড়িতে আকছার বড় মাছের যোগান দিতে হয় বলে মাছওয়ালা জানে যাত্রা’র মাছ কিভাবে দিতে হয়। তেল-সিঁদুর দিয়ে মাছওয়ালাই সাজিয়ে দেয় মাছ। জানে, মুসলমানের বাড়িতে সিঁদুর থাকে না। আগেকার দিনে জমিদার বাড়িতে কিংবা সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোতে যাত্রার এই মাছের মুখে সোনা-রূপোর মোহর পুরে দেওয়া হতো। কনের বাড়ি যাওয়ার পরে মাছ যে কুটবে সেই মোহর তার। মাছওয়ালা জানতে চায়, ‘মাছের মুখে কিতা দিবাইন সাব?’ বড় একখানা নোট মাছের মুখে পুরে সেই মাছ পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে কাকা গাড়িতে ওঠে। হলুদের সামগ্রীর সঙ্গেই নতুন চাচির বাড়িতে চলে যাবে এই মাছ। গায়ে হলুদ হয়ে যাওয়ার পর বর বা বউকে বিয়ে অব্দি আর মাছ খেতে দেওয়া হয় না। মাংস-তরকারি খাবে শুধু। আমার সবেতেই প্রশ্ন, এটা কেন? ওটা কেন? বেশ কয়েকবার বকা খেয়েছি, কেউ উত্তর দিয়েছে তো কেউ ‘কাজ আছে, জ্বালাইস না দেহি’ বলে কাজে মন দিয়েছে। মাছ কেন খাবে না এটা তিন-চারজনকে জিজ্ঞেস করে অবশেষে উত্তর পেলাম, মাছে ভুত-প্রেতের নজর থাকে, কোনো বদনজর যেন না পড়ে সেজন্যেই বর-কনেকে মাছ দেওয়া হয় না।
তখনও চল ছিল কনের বাড়ির মহিলারা এসে জামাইকে হলুদ লাগিয়ে যাবেন, বরের বাড়ির মহিলারাও গিয়ে নতুন বৌকে হলুদ মাখিয়ে দিয়ে আসবেন। কিন্তু হলুদ একই দিনে দু’বাড়িতেই দেওয়া হচ্ছে বলে এই অনুষ্ঠান হলো না। বড় কাকা সমস্ত জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে নিয়ে ও’বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এল সকাল সকাল। ও’বাড়ি থেকেও নতুন চাচির ভাই এসে হলুদের জিনিসপত্র সব পৌছে দিয়ে গেল। সাজানো সব ডালা, কুলো, মিষ্টি আর গুয়া-পান। সকাল থেকেই বড় আর মেজফুফু দু’জনে পান নিয়ে বসেছে। বিশাল বড় থালায়, যাতে করে দাদি বরই বা আমলকী শুকায় আচারের জন্যে, সেই থালিতে কাঁচি দিয়ে পান কেটে দু’ভাগ করে ডাঁটি-ল্যাজা বাদ দিয়ে থাক দিয়ে রাখে। থালিতেই আলাদা আলাদা সব বাটিতে রেখে দেয় দু’রকম করে কাটা সুপুরি, মৌরি, গুড়ো খয়ের, সুগন্ধী জরদা আর চুন। ডাঁটিগুলো সব আগা-মাথা কেটে বাদ দিয়ে মুঠো মুঠো রেখে দেয় পানের পাশেই, চুন তোলার জন্যে। সেই থালি রেখে দেয় দাদির খাবার টেবিলে, সারাদিনে যে যত পান খাবে এখান থেকেই নিজের ইচ্ছেমতন তুলে নিয়ে খাবে। ফুরিয়ে আসছে দেখলেই আবার ভর্তি করে দেয় সবকটা বাটি, সাজিয়ে দেয় পান।
আইও রে আইও রে কুডুম
দুলা হাজাইতাম
কাঁচি হলইদ আন রে বাডি
আন রে মিডা পান। (আব্দুল গফুর আলী/ চট্টগ্রাম)

বিকেলের নামাজ হয়ে গেলে পরে কাকাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো হলুদের জামা-কাপড় পরিয়ে এনে বসানো হয় মাউরায়। প্রথমে দাদি এক চিমটি হলুদ তুলে নেয়, নিজের কপালে আগে ছোঁওয়ায় তারপর ছেলের কপালে গালে হলুদ মাখিয়ে দেয়। নিজের কপালে ছোঁওয়ানোর উদ্দেশ্য– আপদ-বালাই যা কিছু আছে সব যেন তাঁর উপর দিয়েই যায়, ছেলে যেন থাকে নিরাপদে। হলুদের গীতের আওয়াজ জোর পায় পাড়া-পড়শিরাও গলা মেলানোতে। একে একে আম্মা, বড়চাচি, সব ফুফুরা, আত্মীয়-স্বজনেরা, এসে একইভাবে আগে নিজের কপালে ছুঁইয়ে তারপর বরের গায়ে হলুদ মাখিয়ে দিয়ে যায়। হলুদের অনুষ্ঠানের জন্যে যেটুকু হলুদ দরকার ছিল, সেটুকু বাটা হয়ে যাওয়ার পরে শিল ভর্তি ভর্তি হলুদ বাটা হয়েছে। সেগুলো বড় থালায় করে একজন হাজির। এক এক খাবলা করে তুলে নিয়ে প্রত্যেকে প্রত্যেককে মাখাচ্ছে, কেউ মাখতে না চাইলে জোরাজুরি করে মাখানো হচ্ছে এমনকি এক একজন উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে সারা শরীরে হলুদ মেখে। তাতেও রক্ষে নেই, কলসি করে জল এনে ঢালা হচ্ছে তার গায়। দাদি বারান্দায় নিজের আসনে বসা, কখনও চেঁচিয়ে বারণ করছে থামার জন্যে তো কখনো নিজেই হেসে কুটিপাটি হচ্ছে। ছোটফুফুর বান্ধবিরা বালতিতে রঙ গুলে হাজির। লাল, নীল, কালো, সবুজ, বেগুনি যত রকমের রঙ পাওয়া যায় সমস্তই আনিয়েছে তারা। খানিকটা গুলেছে, খানিকটা গুড়ো রঙ হাতে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই মাখিয়ে দিচ্ছে সমস্ত রঙের মিক্সচার। সমস্ত উঠোন জলে কাদায় হলুদে-রঙে একসা। বাচ্চা ছেলের দল ফাটায় বাজি-পটকা। ঠাস ঠাস শব্দে ফাটে ছোট চকলেট বোম। বড়চাচি, বড়ফুফু ততক্ষণে কাকাকে কলসি কলসি জল ঢেলে বিয়ের গোসল করিয়ে দিয়েছে। অন্ধকার হয়ে আসে। বাংলা উঠোন থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসে। যারা রঙ আর হলুদ খেলায় মত্ত ছিল কিম্ভুত চেহারা নিয়ে সকলেই পুকুরঘাটের দিকে এগোয়, এরপরেও রঙ খেললে দাদা সক্কলকে লাঠিপেটা করবে!

-তের-
পাঞ্চ কুলা লইয়া আমরা
মেন্দি তুলবার যাই গো
নাইচের তালে তালে দামান্দ সাজাই
আমরা বালিরে সাজাই গো।। (মেহেদী তোলার গীত/ ময়মনসিংহ)
বিকেলে একই সঙ্গে দুই বাড়িতে হলদি হলো, যে হলদি আমরা বেটে পাঠালাম সেটা চাচিকে মাখিয়ে গোসল দেওয়া হল। ঠিক তেমনি করে চাচির বাড়ি থেকেও হলদি-মেহেন্দী এল। ডালা-কুলো, পাঞ্জাবী-লুঙ্গি, আনুষঙ্গিক আরও যা কিছু সবই এল, সেগুলো কাকার জন্যে। বৃহস্পতিবারেই রাত জেগে হলদির ডালা-কুলো, গোসলের পানি তোলার সব কলসিতে চালবাটা গোলা, লাল-হলুদ-সবুজ রঙ দিয়ে সমস্ত কলসিগুলোয় নকশা আঁকা সারা। বৃহস্পতিবার বিকেলে নতুন কুলায় করে পাঁচখানা পান পাঁচখানা সুপুরি নিয়ে আমরা যাই মেহেন্দী তুলতে। বাচ্চাদের মেহেন্দী তোলা, হলদি-মেহেন্দী বাটা বারণ। মেহেন্দী তোলা, হলদি বাটা এগুলো করে বড়চাচি আর ফুফুরা মিলে, যাদের নাকি বিয়ে হয়ে গেছে!
আমাদের ভেতরবাড়ি থেকে পুকুর অব্দি যেতে যে জমিখানি আছে, সেটা আমার দাদির ফলের বাগান। এই বাগানের মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা মেটে পথ, যার দু’দিকে দাদি লাগিয়েছে সার দিয়ে মেহেন্দী গাছ। লিকলিকে সরু ডালের মত মেহেন্দী গাছ কোনোটা সোজা উঠে যায় এক মানুষ সমান, কোনোটা আবার সরু সরু ডাল ছড়াতে শুরু করে গোড়া থেকেই। ভীষণ নরম হয় ডাল, একটু জোরে টানলেই ভেঙ্গে হাতে চলে আসে পাতা সমেত মেহেন্দীর ডাল। সরু, একটু লম্বাটে মতন পাতা, নতুন পাতার রঙ কচি সবুজ। ভীষণ পাতলা আর মোলায়েম, দেখে মনে হয় ছুঁয়ে দিলেই যেন হাতে লাল ছড়াবে! পাতা যত পুরনো হয়, কালচে সবুজ রঙ ধরে আর একটু ভারী হয়। ডালের গায়ে আবার সরু সরু ডাল হয়। গোড়া থেকে ডগা অব্দি ছেয়ে থাকে কচি সবুজ, ঘন সবুজ আর কালচে সবুজ পাতায়। একটু পোক্ত দেখে ডাল ভেঙ্গে নিয়ে অন্য জায়গায় লাগিয়ে দিলে সেই ডাল এক-দু’দিন একটু ঝিমিয়ে থাকে, দেখে মনে হয় যেন শুকিয়ে যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে। দু-তিন দিনের মাথাতেই দেখা যায় পাতাগুলো সজীব হয়ে উঠেছে, বেঁচে উঠেছে ভেঙ্গে আনা ডাল! মেহেন্দী গাছে সাদা সাদা ছোট্ট ছোট্ট ফুল হয়, সেই ফুলে থাকে বীজ। বড় গাছের গোড়ায় আশে-পাশে সেই বীজ পড়ে, নতুন গাছ জন্মায়। কেউ মেহেন্দীর ডাল চাইতে এলে দাদি নতুন জন্মানো চারা তুলে দেয়, বড় গাছের ডাল ভাঙে না। বড় গাছেদের গোড়ায় ছোট গাছগুলিকে দাদি নিজেই ছেঁটে দেয়, বেশি বাড়তে দেয় না। ফলে মেহেন্দীর ঘন বেড়া দাদির ফলের বাগানে। ডাল ছাঁটা হয় না বলে সব কটা গাছই ঝাঁকড়া আর পাতায় ভর্তি। বড়কাকা মাঝে মধ্যেই দাদির সঙ্গে ঝগড়া করে এই মেহেন্দী গাছগুলোকে ছেঁটে ছোট করে দেওয়ার জন্যে। গাছ ছাঁটার নাম শুনলেই দাদি লাঠি নিয়ে তাড়া করে বড়কাকাকে।
মেহেন্দী তোমার কুনখানে জনম হে?
হামার জনম বাবু ঘেরে বাগানে হে।
মেহেন্দী তুমি কুন কামে লাগ হে?
আমি লাগি দামান্দ কইন্যার হাতে হে। (মেহেদীর গীত/ নবাবগঞ্জ)
সার বাঁধা মেহেন্দি গাছেদের দিকে কুলা নিয়ে আমরা সব যাই, ডানদিকের প্রথম গাছটির গোড়ায় কুলার পান নামিয়ে রাখে চাচি তারপর বিস্‌মিল্লাহ বলে মেহেন্দীর প্রথম পাতাটা তোলে। এখানে আমরা, বাচ্চারা সব দর্শকমাত্র। কচি সবুজ পাতায় রঙ গাঢ় হয় না বলে সব কটা গাছ থেকেই পুরনো কালচে হয়ে আসা পাতা বেছে বেছে তোলা হয়। কুলা ভরে উঠলে সবাই বাড়ি ফিরে আসি। ওই মেহেন্দী গাছের পাশ দিয়ে পুকুরের দিকে প্রথম যে যাবে, সে তুলে নেবে গাছের গোড়ায় রাখা গুয়া-পান। বিয়ের হলদি মেহেন্দী বাটার জন্যে সবার বাড়িতেই থাকে আলাদা শিল-নোড়া। মশলা বাটার শিলে বিয়ের হলদি-মেহেন্দী বাটা হয় না। আমাদের বাড়িতে এরকম দুখানা শিল-নোড়া আছে, সেগুলোতে সারা রাত ধরে চলে এই হলদি-মেহেন্দী বাটা। কখনও চাচি বসে তো কখনও ফুফু। বাচ্চাদের এই বিয়ের হলদি-মেহেন্দীও বাটা বারণ!
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে বারান্দায় বড় বড় হ্যাজাকের আলোতে পাটি বিছিয়ে কাকাকে এনে বসানো হয়। চাচি নিয়ে আসে মেহেন্দীর কুলা। মাটির প্রদীপে জ্বলছে ঘিয়ের বাতি। কুলায় রাখা পান-সুপুরি, আর মেহেন্দী। ছেলের হাতে তো নকশা করা হয় না, তার শুধু দুই হাতের কড়ে আঙুলে মেহেন্দীর একটা করে টুপি পরিয়ে হাতের তালুতে একখানা পূর্ণচন্দ্র বানিয়ে দেওয়া হয় মেহেন্দি দিয়ে, তারপর একটা পানপাতা দিয়ে হাতদুটোকে জোড়হাত করে দিয়ে বরের মেহেন্দী শেষ! সেটা চাচি আর ফুফু মিলে করে। আমরা, ছোটরা বায়না করতে শুরু করি, মেহেন্দী পরিয়ে দাও, নকশা করে দাও! হাতের কব্জীতে মেহেদির গোল পাতলা লেপ বানিয়ে চাচি সেটা থেকে সরু কাঠি দিয়ে মেহেন্দী কেটে কেটে হাতে ফুল, লতা, পাতা এঁকে দেয়। ছোটফুফু মন দিয়ে নিজে নিজে মেহেন্দি পরে।

ওগো রঙ্গিলা দামান
কে তোমারে এই মেন্দি পইন্দাইছে
আমার দ্যাশের ভাওতোরা বড়ই সন্ধি জানে
আকন মেন্দি বাটিয়া
ঢোল বাজনা বাজাইয়া
এই মেন্দি পরাইছে (মেহেদীর গীত/কিশোরগঞ্জ)
দাদি দুই হাত ভর্তি করে লেপ মেহেন্দী পরে, তার কোনো নকশা চলে না। সবকটা আঙুলের মাথায় মেহেন্দীর টুপি, দুই হাতের মধ্যিখানে পানপাতা রেখে হাত জোড় করে আরও মেহেন্দী লাগিয়ে দিতে বলে চাচিকে। চাচি দুটো হাতকেই জুড়ে দেয় মেহেন্দীর লেপ দিয়ে। দাদি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে তোয়ালের উপর হাত রেখে। দাদি যখন ফজরের নামাজের জন্যে রাত থাকতে উঠে হাত ধোবে, ততক্ষণে দুটো হাতই কালচে লাল হয়ে যাবে।

-চোদ্দ-
ও কি ও মোর দানতাল হাতীর মাহুত রে,
সেইদিন মাহুত শিকার যান, নারীর মন মোর ঝুরিয়া রয় রে।।

তোমার কারণে মাহুত সকালে ধুইসুঁ গাও।
খাসি মারিয়া রসাই করিসুঁ, ভাতো খাইয়া যাও।।

না খাই তোমার ভাতো কন্যা হে, শ্বশুরে দিবে গালি।
বাবা আসিলে বলিয়া দিবো, শিয়ালে মারিসে খাসি।।

ভাতো না খাইতে মাহুত রে, মুখে দিলেন পান।
ঘরে থাকিতে নিদয়া মাহুত আউলাইলেন পরাণ।। ( চটকা গান/ প্রান্ত- উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত/ নির্মলেন্দু ভৌমিক)


বেশ কিছুকাল হবে বোধ হয়,  মাঝে সাঝে পান খেতে শুরু করি, ঠিক কবে সে আর মনে পড়ে না।  আমাদের বাড়িতে আম্মা পান খায় না, দাদি খেত, বড়ফুফু, মেজফুফুরা খায়। যদ্দিন দাদির দাঁত ছিল সরু-মিহি করে কাটা সুপুরি, চুন-খয়ের দিয়ে পান সেজে খেত। একটা সময় এল, যখন দাদি আর সাজা পান চিবিয়ে খেতে পারে না। হামানদিস্তায় থেঁতো করে নিত। মজাটা হল, আব্বার তো দাঁত ছিল কিন্তু আব্বাও নিজের পান হামানদিস্তাতেই দিয়ে দিত, ছেঁচা পান দুজনে মিলে ভাগ করে খেত। দাদির হামনাদিস্তাখানি আব্বার কিনে দেওয়া। দাদির আরও পানবাটা, সৌখিন পানদান আছে, যেগুলো আব্বা দাদীকে হজ্ব করাতে নিয়ে গেল যেবার, সেখান থেকে কিনে দিয়েছে। রূপোলী রঙের এক লম্বা গোল ডাঁটিতে উপর নিচে করে পানপাতার আকারের তিনখানা নকশা করা পাতা, যেন একটা সোজা ডালের মধ্যে তিনখানা রূপো রঙের ফুলকারি পাতা। পাতাগুলো উপর দিকে ঠেকে দিলে বন্ধ হয়ে গিয়ে ডালের গায়ে লেগে যায় যেন পাপড়ি না মেলা কোনো ফুল। ডাঁটির উপরের প্রান্তভাগে একটা ছোট্ট কলির মত, চকচকে পালিশ করা রূপোর মত দেখতে এক কলি। বন্ধ এই পানদানটিকে দেখতে লাগত ঠিক যেন না ফোটা অচেনা কোনো এক রূপোলী রঙের ফুল! এই পানদান দাদী কাঁচের পাল্লা দেওয়া আলমারিতে সাজিয়ে রেখে দিত, বিশেষ মেহমান এলে তবেই বের করে পান সাজিয়ে দিত ওই পানদানীতে করে। আমার খুব লোভ ছিল দাদীর এই রুপোলী রঙের বাহারি তিনখানি পানপাতাওয়ালা পানদানখানির উপর, আব্বাকে বলেছিও সেকথা, কেন আমার জন্যে কেনা হয়নি, কেন শুধু দাদির জন্যেই আসে সব ভাল ভাল জিনিস? আব্বা হেসে বলেছে, ‘তুমি যখন পান খাইবা, তুমার পোলায় এর চেয়েও সুন্দর পানদানি আইন্যা দিব তুমারে, আমি যেমন আমার মায়ের লাইগা আনি, তোমার পোলায় আনব তুমার লাইগা!’ আমার বয়েস তখন সাত, পোলার কথা শুনে হাঁ করে খানিক তাকিয়েছিলাম আব্বার দিকে, তখন দাদিই বলে, ‘আইচ্ছা, নে, গোঁসা করিস না, এই পানদান আমি তোরেই দিয়া যামু নে।’
বাটা ঝিলমিল বাটা ঝিলমিল
বাটা ভরা পান
দুলাভাই খানতো বাটার পান।
ঐ বাটার পান খাইয়া দুলাভাই
বুবুক করবো দান
দুলাভাই খানতো বাটার পান।
ওই না বাটার পান খাইয়া দুলাভাই
গরু পাইবেন দান।
দুলাভাই খানতো বাটার পান।। (পানগীতি/ নাটোর/ গায়ে হলুদ- শাহীদা আখতার)

আমরা, ছোটরা তখন দাদির মুখের চিবুনো পান খেতাম। অনেকক্ষণ ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে পান খেত না দাদি। খানিকক্ষন চিবিয়ে রসটা খেয়ে নিয়ে পানটা হাতে নিয়ে আওয়াজ দিত, ‘পান কেডা খাইবি আয় রে’ বলে। ততক্ষণে পানের রসে টুকটুকে লাল হয়ে যেত টকটকে ফর্সা দাদির দুই ঠোঁট আর ঠোঁটের কষ। তাকালে দেখা যেত অপূর্ব এক লালের আভা ছড়িয়েছে ঠোঁট ছাড়িয়ে চিবুকের খাঁজে, বয়েসের ভাঁজে। একটা দুটো হাত সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে যেত সেই চিবুনো পান খাওয়ার জন্যে। সকালের নাশ্‌তা বা দুপুরের খাওয়া বা বিকেলের চায়ের পরে আব্বা যখন বারান্দায় দাদির বেতের সোফার পাশে দ্বিতীয় সোফাখানিতে গিয়ে বসত, তখন একখিলি করে পান এগিয়ে দিত দাদি। মায়ের পাশে বসে গল্প করতে করতে পান চিবুতো আব্বা।
দাদি চলে গেছে অনেকদিন। এখন আর আব্বা পান খায় না কিন্তু মাঝে মধ্যেই দাদির পেতলের পানের বাটা আর হামানদিস্তার খোঁজ করে, যাতে দাদির পান থাকত, সেই থালি, যাতে দাদি সাজা পান দিত, সেই হামানদিস্তা, যাতে দাদি খয়ের গুড়ো করত, পান থেঁতো করত। বলে, বাটা আর হামানদিস্তাখান থাকলে পান খাওন যাইত! যেন অন্য কোনো বাটায় রাখা পান, অন্য হামানদিস্তায় থেঁতো করা পান খাওয়ারই যোগ্য নয়!বলে ‘কেডায় জানে কই আছে আম্মার সখের জিনিসপত্র, কার কাছে আছে, যার কাছেই থাক, যত্নেই আছে নিশ্চয়ই...’
সেবার আব্বার কাছে তাঁর মায়ের হামানদিস্তাখানির জন্যে আফ্‌শোস করতে শুনি। ‘আম্মার হামানদিস্তাখান জানি কই, থাকলে পান ছেঁইচ্যা খাওন যাইত।’ পরেরবার বাড়ি যাওয়ার সময় আব্বার জন্যে স্টিলের একটা ছোট হামানদিস্তা নিয়ে যাই, বাড়ি গিয়ে পানও কিনে আনি, শোকেস থেকে সুন্দর কাঁচের থালা বের করে পান, ঝিরিকাটা সুপুরি, আর চুন নিয়ে আব্বার সঙ্গে বারান্দায় গিয়ে বসি। দাদার সেই কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ার এখন আমাদের বারান্দায়, যাতে একসময় দাদা বসে থাকত, দাদা চলে যাওয়ার পরে দাদি। দাদি চলে যাওয়ার পরে কবে যেন আব্বা এই চেয়ারখানি নিয়ে আসে। বারান্দায় রাখে ওই চেয়ার, দিনের বেশির ভাগ সময় আব্বা এখন ওতেই বসে থাকে । একদিকের একটা হাতল ভেঙ্গে গেছে কিন্তু আব্বা ওটা সারায় না। বলে ‘থাক, কিতা আর অইব, আমার তো এই ভাঙ্গা চেয়ারই ভালা লাগে।’ আব্বার চেয়ারের পাশে মোড়া টেনে নিয়ে বসি আমি, হামানদিস্তা বের করে দিই আব্বাকে, বলি, ‘নেইন, এইবার পান ছেঁইচ্যা খাইন।’ আব্বা প্রথমে খুব খুশি হয় হামানদিস্তা দেখে, পানও থেঁতো করে গল্প করতে করতে। আম্মাকে জিজ্ঞেস করি পান খাবে কিনা, আম্মা হাসে, বলে , ‘না, আমি পান খাই না, তুমরা বাপে-ঝিয়ে খাও।’ ছেঁচা পান মুখে দেয় আব্বা, খানিক চিবিয়ে নিয়ে বলে, ‘নাহ, ভাল্লাগে না, পানে অহন আর হেই স্বাদ নাই।’ হামানদিস্তা পড়ে থাকে টেবিলের উপর। আব্বা আর কখনও পান খাওয়ার কথা বলে না।


লেখক পরিচিত
সামরান হুদা
জন্ম  : আগস্ট ৮,
সিলেট।
এখন থাকেনন ঃ হাওড়া, কোলকাতা।
ব্লগার, লেখক। 


কৃতজ্ঞতা স্বীকার : গুরুচণ্ডালী

1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন লিখনী!
    মুগ্ধপাঠ!
    এক সময় সিলেটে পান গুয়া ছাড়া আপ্যায়ন হতোই না!

    উত্তরমুছুন