রবিবার, ১৯ মে, ২০১৩

রক্তে রাঙা রূপসী বাংলা

ব্রজেন্দ্রনাথ মল্লিক

(বরিশালের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলায় আটঘর কুড়িয়ানায় দেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারাবাগান অবস্থিত। এর পাশাপাশি বানারীপাড়া ও ঝালকাঠির কিছু অংশেও পেয়ারা বাগান আছে। এই এলাকাগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের নমশুদ্র অধ্যুষিত। একাত্তর সালে এই পেয়ারা বাগানে পাকবাহিনী গণহত্যা চালায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। তাদের মধ্যে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের টিম পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

এই পাকবাহিনীর গণহত্যা আর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের কাহিনীটি বলেছেন নারী মুক্তিযোদ্ধা বিভা মল্লিক। তার দাদা ব্রজেন্দ্রনাথ মল্লিক ঊনসত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।  কুড়িয়ানা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন একাত্তরে। তার অনুলিখনেই বিভা মল্লিক, শিখা, সুনন্দাদের মুক্তিযুদ্ধের ডাইরী ধারাবাহিকভাবে সচলায়তনে প্রকাশিত হবে। উন্মোচিত হবে পেয়েরা বাগানের অকথিত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অধ্যায়।)


এক
প্রতিটি মানুষ সে যত খারাপ বা চরিত্রহীন হোক না কেন তার একটা না একটা সদগুণ থাকে। কথাটা কে বলেছিল জানি না। কথাটাকে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি আরও একটা কথা। শুধু বিশ্বাস নয় জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছি অনুভূতির রসে সিঞ্চিত করে। তা হল, একটা ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন বিচার করে দেখলে তার মধ্যে একটা স্বর্ণযুগ খুঁজে পাওয়া যায়। তার জীবন-ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকে জীবনের একটা পরিসরএকটা ব্যাপ্তিকাল। অন্যের কাছে তা থাকতে পারে অজানাথাকতে পারে একান্ত গোপন। তবুও প্রতিটি ক্ষণভঙ্গুর জীবনে এক আধটু ক্ষণ বাস্তবিকই গৌরবের আলোকে আলোকিত হয়। সেটা নিছক ব্যক্তিগত হতে পারেসেটা হতে পারে কারও বাল্যজীবনে, কারও ছাত্র জীবনে, কারও বা কর্মজীবনে।
হ্যাঁ, আমার জীবন-ইতিহাসের সেই স্বর্ণযুগ এসেছিল। আমার জীবনের ভবিষ্যৎ ঘটনাগুলো এখনো ঘটতে বাকি আছে। আমি সাতাশ বছরের একটি মেয়ে মাত্র। তবুও বলব আমার জীবনের স্বর্ণযুগ চলে গেছে। চলে গেছে বলেই স্মৃতিকে রোমন্থন করে চলেছি। স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে কাগজের পাতায় তুলে ধরতে পারব এমন ধারণা আমার ছিল না।
আমার জীবন-ইতিহাসের সেই স্বর্ণযুগ ক্ষণস্থায়ী। একটা জীবনের বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরা বিচার করলে একটা মুহুর্ত বলে মনে হবে। একবার মাত্র উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে নিভে শেষ হয়ে গেছে উল্কার মত। উদাহরণটা অনেকের ভালো না লাগতে পারে অথবা কেউ ভাবতে পারেন আমি বাড়িয়ে বলছি। কিন্তু আমি বলব আমার মত সামান্য একটা মেয়ের জীবনে তা উল্কার আলোর মত
মাত্র আড়াই মাসের ঘটনা। একটা পূর্ণ জীবনের সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে থাকে। তার মধ্যে মাত্র আড়াই মাসের কিছু ঘটনা সমুদ্রের বুদ্বুদ মাত্র। নিমিষে বিলীন হয়ে যাবার অপেক্ষা শুধু।

বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ বাংলাদেশ একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম। একটা রাষ্ট্র, দেশ বা জাতির স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস মাত্র নমাসের সংগ্রামের কাহিনী। উনিশশো একাত্তরের পঁচিশে মার্চ থেকে ষোলোই ডিসেম্বরের ইতিহাসের কয়েকটা বুদ্বুদেরই মত। মহাকালের মহাসাগরে এ-কটি মাত্র বুদ্বুদ হলেও এর উপর পড়েছিল শতসূর্যের বর্ণচ্ছটা। বিভিন্ন বর্ণের প্রতিবিম্ব পড়ে ঝলমল করে উঠেছিল সেই কটি মাত্র বুদ্বুদ। ছোট বাংলাদেশটি জন্মেছিল বিশ্বের বড় বড় শক্তির চোখ রাঙানী উপেক্ষা করে। পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তিবর্গ চমকে উঠেছিল বাংলাদেশের গণভ্যুত্থানে। দৃঢ় মনোবল আর অটুট আত্মবিশ্বাস জাতীয় জীবনে দানা বাঁধলে তার মুক্তি কেউ রুখতে পারে না। তার প্রমাণ বাঙালীরা।
আজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্মরণ করছি। তার মধ্যে একান্তই ক্ষণকালের মাত্র আড়াই মাসের কিছু ঘটনার সঙ্গে আমাকে যুক্ত করতে পেরেছিলাম। সেজন্য আজ আমি গর্বিত। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তা আমি গর্বের সঙ্গেই স্মরণ করে যাব।
মৃত্যু আমার হয়ে গেছে। আত্মিক মৃত্যু। ভাবছি জাগতিক মৃত্যু হওয়াই আমার পক্ষে বাঞ্ছনীয় ছিল। আজ আমি পঙ্গুবাঁ পায়ে জোর নেই। পাক-সেনাদের গুলির শিকার হয়েছে। আমার বিয়ের চিন্তা অবান্তর। নারীজাতির একান্তকাম্য নারীত্ব এবং মাতৃত্ব থেকে আজ আমি বঞ্চিত। তাই ভাবছি সেদিন গুলিটা বুকে এসে লাগল না কেন! শরীরের নিচের দিকে গুলি লাগার ফলে আজ আমি মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছি। রোশেনারার মত ভাগ্য আমার হয়নিবাঙালির জাতীয় ইতিহাসে রোশেনারার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকল।
রোশেনারাকে আমি দেখিনি। তার সঙ্গে আমার চেহারার কি মিল বা অমিল তা আমি জানি না। তবে আমিও তার সমবয়েসী ছিলাম। সে হায়ার সেকেন্ডারীর ক্লাশের ছাত্রী ছিলআমিও ও একই ক্লাশের ছাত্রী ছিলাম। পার্থক্য শুধু সে ছিল রাজধানী ঢাকা শহরে, আর আমি ছিলাম গ্রামের নিরিবিলি এক কলেজে। ডিনামাইট নিয়ে রোশেনারার মত ট্যাঙ্কের সামনে বুক পেতে দিতে নাই বা পারলাম। কিন্তু গ্রেনেড নিয়ে যা করেছিলাম সে সময় খানসেনার গুলিটা অন্তত আমার বুকে এসে লাগতে পারত।
মানুষ দেশের জন্য আদর্শের জন্য মরতে চায়। মরতেও পারে। হাসতে হাসতে মেশিনগানের গুলির সামনে বুক পেতে দিতে পারে। ইতিহাসে তেমন অনেক শুনেছি। বারুদ জ্বলতে পারেজ্বলবার ক্ষমতা আছে। বারুদের বিভিন্ন রকমের উপাদান  ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে থাকলে তা আলাদাভাবে জ্বলবার শক্তি রাখে না। আর একত্রে মেশাবার পরেও চাই একটু আগুনের স্পর্শ। দরকার দেশলাই-এর একটা কাঠি।
শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি জীবনে একবার মাত্র দেখেছি। তিনিই সেই দেশলাই-এর কাঠিটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার মনের বারুদে। জ্বালিয়ে দিয়েছিলে্ন একদিনের বক্তৃতায়। তার কথা স্মরণ করে তাই সেদিন নির্ভিকভাবেই এগিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন ছিল আমার জীবনের প্রধান দুর্ধর্ষ অভিযান তথা মুক্তিযুদ্ধের জীবনের মেজর অপারেশন। শত্রুর ব্যুহের মধ্যে ঢুকে কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর লোমহর্ষক ঘটনা! একটু হেরফের হলেই মেশিনগানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতাম। রেণু রেণু হয়ে হাওয়ায় ভেসে যেত আমাদের দুজনের দেহ। দুজন মেয়ে মাত্র আমরা। আর আমাদের সাহায্য করেছিল জেলে যৈজ্ঞকাকা আর কালু।
স্বরূপকাঠিতে শর্ষিনার পীর সাহেবের বাড়ি। বাড়ির সঙ্গে সন্ধ্যা নদীতে বিরাট চর। চরের উপর দিয়ে লম্বা কাঠের সিঁড়ি আছে নদীর মাঝ বরাবর। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে জেটি। লঞ্চঘাট। সেই ঘাটে
অস্ত্রশস্ত্র সহ একখানা গানবোট আর দুখানা লঞ্চ। তিনখানাতেই রয়েছে পাক-সেনা। মাঝে ছোট লঞ্চে রয়েছেন কর্নের আতিক মালিক এবং ক্যাপ্টেন এজাজ। পিরোজপুরে পা দিয়েই যে কর্নেল মালিক ক্যাপ্টেন এজাজের সাহায্যে এরেস্ট  করেন এস.ডি.ও, এস.ডি.পিও ( কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ), একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সহ পিরোজপুর মহকুমার প্রশাসনের পাঁচ প্রধান ব্যক্তিকে। পরের দিনেই বলেশ্বর নদীর তীরে তাদেরকে নিয়ে গুলি করে ফেলে দিয়ে সৃষ্টি করেন চরম সন্ত্রাস। স্থানীয় শান্তিকমিটির কর্তারা দেখেলেন সমূহ বিপদ। তারা যুক্তি করে কর্নেল মালিকের গতিটাকে ঘুরিয়ে দিলেন হিন্দু এলাকার দিকে। কাফের হিন্দুদের খতম করতে মালিক-এজাজের জুড়ি নেই। তারা দশবারো দিনের মধ্যেই ছয় থেকে সাতশ হিন্দুকে খতম করে হয়ে উঠলেন দোজোখের আজরাইল। এরপরেই মালিক এজাজের হিংস্র দৃষ্টি হিন্দু-প্রধান স্বরূপকাঠি থানার দিকে পড়ল।  এই এলাকায় ধংসযজ্ঞ করার পরিকল্পনা করার জন্যই গেল শর্ষিণার পীরের বাড়ি।  এই পীরের বাড়িতে রয়েছে ট্রেনিং প্রাপ্ত এক হাজার সহস্র রাজাকার। এরা আগে ছিল আনছার বাহিনীর সদস্য। পাক-মিলিটারীর নিকট থেকে অস্ত্রশস্ত্র পেয়ে রাজাকার বাহিনীতে ঢুকে গেল রাতারাতি।
রাত নটা হবে। আমাদেরকে নিয়ে যৈজ্ঞকাকার বাচাড়ি নৌকা এসে লাগল চরের মাঝ বরাবর। একটু ওপাশেই কাঠের সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির শেষ প্রান্তে গানবোট এবং লঞ্চ। আমাদের জীবনের প্রথম গেরিলা অপারেশন। শত্রুব্যুহের মধ্যে প্রবেশ করেছি। দলে মাত্র দুজন-শিখা আর আমি। দুজনেই কোমরে আটকে নিয়েছি দুটো রিভল্ভারকাপড়ের মধ্যে হ্যান্ড গ্রেনেড দুটোকে হাত দিয়ে আন্দাজ করে নিলাম। মনে মনে জয় বাংলা বলে নেমে পড়লাম হেউলি ও নলবনের মধ্যে। চরে কাদা। পা দুখানী অনেকখানি বসে গেল কাদার মধ্যে।
লগির খোঁচা দিয়ে বাচাড়ী নৌকাটাকে দূরে নিয়ে গেল যৈজ্ঞকাকা। একবার মাঝ নদীতে পড়তে পারলেই হল। নৌকার পাছায় বৈঠা হাতে কালু।
এর মধ্যে  একখানা ছিপ ডিংগি এসে লাগল যৈজ্ঞকাকার বাচাড়ী নৌকার সঙ্গে।
আমরা হেউলি বনের মধ্যে বসে পড়লাম অন্ধকারে। শুনতে পাচ্ছি ওদের কথাবার্তা। ওরা একদম খাস পীরের বাড়ির রাজাকার। নদীতে টহলধারী গ্রুপ। ভাগ্যিস আমরা নেমে পড়ার একটু পরে এসেছে রাজাকারের দলটি।
--কে রে? রাজাকাররা টর্চ মেরে জিজ্ঞেস করল যৈজ্ঞকাকাকে।  টর্চের আলোতে ফর্সা হয়ে গেল জায়গাটা। চক চক করছে চরের কাদাবালি।
--আমি যৈজ্ঞ।
--যৈজ্ঞ কিরে? হিন্দুশালা মালাউন। বল, তোরা কোন দলের স্পাই?
--কী যে কন সাইবেরা। মোরা জাইল্যা। এই পীর সাইব আমাগো মা-বাপ। মোরা নদীতে জাল পাতি আর মাছ ধরি।
--এই রাতে কী মাছ ধরিস?
--এইতো ভাটার শেষ। জোয়ার লাগলেই আগজোয়ারে জাল পাতমু। তামাক টামাক খেইয়ে নিলাম এট্টু।
--দেখি তোদের নৌকার কি আছে? দু-তিনটে রাজাকার উঠে পড়ে বাচাড়ি নৌকার পাটাতনের উপর।
-মাছটাছ কই? মাছ দে আমাদের। বলে আরেক রাজাকার।
--জাল পাতমু তো জোয়ারে। আর জাল উডামু হেই বেয়ান (ভোর) রাইতে, এহোন মাছ পামু কই?
রাজাকাররা বাচাড়ির মধ্যেও আরো দু-একবার টর্চ মারল। কিছু না পেয়ে নিজেদের ছিপ ডিংগিতে নেমে চলে গেল। সড় সড় করে চলে গেলো ওদের নৌকা। কর্নেল মালিক রয়েছেন পীরের ঘাটে। তাই এখন টহল দেবার বিরাম নেই এদের।
তারিখটা মনে আছে স্পষ্ট করে, উনিশ শো একাত্তরের এগারোই জুন। বৃষ্টি বাদলের সময়। আকাশ আগে থেকেই মেঘলা ছিল। টিপ-টিপ করে বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। ভগবানকে ধন্যবাদ। বৃষ্টি হলে আমাদের ভালোই হয়। রাজাকারদের তৎপরতা একটু কমে যাবে। আমরা হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি হেউলিবনীর ভিতর দিয়ে। সারা গায়ে কাদা। একাকার হয়ে গেছি।
প্রায় একশ গজ দূরে পাকিস্তানী মিলিটারির লঞ্চ। গানবোট থেকে ঘুরে ঘুরে সার্চ লাইটের আলো পড়ছে নদীতে। এ পাশে আলো পড়তেই ফর্সা হয়ে যায় দিনের মত।
বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে কাদা মেখেও খানিকটা এগোলাম আমরা। হ্যান্ড গ্রেনেডের রিং হাত দিয়ে আন্দাজ করে নিচ্ছি আর একবার। ন-দশ মিনিট চলে গেল। সার্চ লাইটের আলো এমনভাবে এসে পড়ছে জলে, নামার সাহস পাচ্ছি না। লাইটের আলোতে দেখলাম কচুড়িপানার দাম ভাটির স্রোতে ভেসে গিয়ে লঞ্চের গায়ে লাগছে। লঞ্চের গা ঘেঁসে চলে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একদম মাঝের লঞ্চখানা।  আমাদের কমান্ডার ক্যাপ্টেন বেগ বলে দিয়েছেন স্টিলবডির সাদা লঞ্চে থাকবেন কর্নেল মালিক এবং কাপ্টেন এজাজ। সে লঞ্চ হয় মাঝখানে-- নয়ত পিছনে থাকবে। সেই সাদা লঞ্চখানাই রয়েছে মাঝখানে। সামনের গানবোটে কামান, অস্ত্রশস্ত্র এবং পাক-সেনা বোঝাই। পিছনের লঞ্চে হয়ত মালিক-এজাজের সিকিউরিটি ফোর্স। ওদের আলোতে আবার ভালো একবার দেখে নিলাম। স্টিলবডির সাদা লঞ্চখানির ইঞ্জিনের কাছাকাছি জায়গাটা আড়াই ফুটের মত জেগে আছে জল থেকে। আর সেখানে একটা শিকল ঝুলে আছে জলের দিকে।
জীবনের চরমতম পরীক্ষা। ক্যাপ্টেন বেগের নির্দেশ। অপারেশনে সফলকাম হতেই হবে। মনে একটু বল আনার চেষ্টা করছি। আমি রঞ্জনবাবুকে দেবতার মত ভক্তি করি। তিনি শেখ সাহেবের বন্ধু এবং প্রকৃত সহকর্মী। সেই রঞ্জনবাবুর একটা কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলতেন, স্যাক্রিফাইস করার সদিচ্ছা নেই, হঠাৎ একটা লোক মরে গেল, সে মরণের কোনো দাম নেই। স্যাক্রিফাইস করার মনোবল থাকলে তারাই গুলির সামনে দাঁড়িয়ে মরতে পারে। আর সেই মরাটা হিসাবে ওঠে। সে আত্মদানের ফলে অন্যের মনেও জেগে ওঠে আত্মপ্রেরণা। জনগণের মনে সেই প্রেরণা এক সঙ্গে জেগে উঠলেতার বিনিময়ে মুক্তি আসে জাতীয় জীবনে।
কাদার মধ্যে শুয়ে অপেক্ষা করছি। আলোতে একটা জিনিস লক্ষ্য করে শিখা আমাকে ফিসফিস করে বলল, দেখছিস তো, সার্চলাইটের আলোতে সব জায়গা পরিস্কার দেখা যায়। কিন্তু জেটির সঙ্গে সিঁড়িটা যেখানে মিশেছে সেখানে দশ-বারো গজ জায়গাতে অন্ধকার। একান্ত নিচ থেকে ঘুরিয়ে আলো না ফেললে কিছু দেখা যায় না ওখানে। আজকের অপারেশনে যদি বেঁচে যাই তাহলে ঐ জায়গাটাই হবে আমাদের আশ্রয়।
ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি এলো আবার। জোলো বাতাসে লঞ্চ থেকে ভালো রান্নার ঘ্রাণ ভেসে আসছে। খানা তৈরী হচ্ছে খান সেনাদের। কর্নেল-ক্যাপ্টেনের জন্য খাবার
কোপ্তা, কাবাব, বিরিয়ানী তো হচ্ছেই। বৃষ্টিটা জোরে আসতে আলোটাও যেন বারে বারে আসছে গানবোট থেকে।
অধীর আগ্রহে তাকয়ে আছি জলের স্রোতের দিকে। পাঁচ ছ গজের মধ্যে ভেসে আসছে দুটো কচুড়িপানার দাম। শিখা আমার হাতে টিপ দিয়ে নেমে পড়ল গলা জলে। সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লাম আমিও। আলো ঘোরাবার এক ফাঁকে কচুড়িপানা ধরে ঠেলে নেমে গেলাম স্রোতের দিকে।
তখন আমার মনের অবস্থা যে কী হয়েছিল তা এখন আর আমি বলতে পারব না। বুকের মধ্যে তখন কী ঢিপ ঢিপ করেছিল
না, একদম নিরেট হয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর আতঙ্কে, তা আমার মনে নেই। তবে হ্যাঁ মৃত্যুর আগে বা চরম বিপদের মুখে মানুষের মুখে মানুষের দেহে ও মনে এক অলৌকিক শক্তির উদয় হয়। সেই শক্তি দেহটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তেমন একটা মহাশক্তির অনুভূতি আমার হয়েছিল।
কচুড়িপানা মাথায় দিয়ে স্রোতের সঙ্গে গিয়ে লেগে গেলাম সাদা লঞ্চের গায়ে। ইঞ্জিনের পাশে ঝুলানো শিকলটা ধরলাম। ধরল শিখাও। একটু আরাম বোধ করলাম। শ্বাস-প্রশ্বাসটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। শিখার নাকের গরম নিঃশ্বাস আমার কাঁধের উপর লাগছে। আমার কাঁধে শিখা একটু চাপ দিল। সে যেন এক বিদ্যুতের স্পর্শ। আর অপেক্ষা নেইমরিয়া হয়ে দাঁতে কামড়ে ধরেছি গ্রেনেডের রিং। মুহুর্তমাত্র।  ফিতাটাকে টান মেরে ছুড়ে মারলাম ইঞ্জিন লক্ষ্য করে। শিখাও মারল একই সঙ্গে।
মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড। কী যে ঘটে গেল তা একের পর এক মনে করতে অনেকটা ভাবতে হয়। এখন সেই স্মৃতি মনে পড়লে আতঙ্কে কাঁপুনি ওঠে।
দু-দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই ভীষণ গর্জন করে ছিন্ন ভিন্ন করে দিল অমন মজবুত লঞ্চের ভিতরের সব কিছু। আর কয়েক সেকেন্ড পরেই গর্জে উঠল গানবোটের মেশিনগান। কামানের গোলা ছুটল নদীর ওপারে, নদীর অপর পারের ভুরিয়ারী গ্রামের নারকেল শুপারির বাগান ছিন্ন ভিন্ন করে
আর আমরা দুজন? কী করে যে জেটির দক্ষিণ পাশ ঘেঁসে সেই সিঁড়ির নিচে এসেছি, কী করে খুঁটির সঙ্গে আটকানো তেরছি বেয়ে সিঁড়ির পাটাতনের একেবারে তক্তার নিচে গিয়ে দুজনে উঠেছি, তা মনে করতে এখন আমার চৈতন্যকে অনেকখানি পীড়া দিতে হয়।
সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম আমি আর শিখা। বেঁচে গিয়েছিলেন কুখ্যাত মালিক-এজাজ জুটিও। তারা দুজনে তখন ঐ একদম পিছনের লঞ্চে ছিলেন। তবে কজন পাকসেনার সঙ্গে তাদের দুই সহকারী অফিসার মারা গিয়েছিল। তা আমরা পরে জানতে পেরেছিলাম।

দুই
আগুনের মধ্যে পোড়া না দিলে কোনটা খাঁটি সোনা ঠিক চেনা যায় না। বিপদ ঘনিয়ে আসে ভয়ঙ্কর দুর্দিনে। তখন চেনা যায় মানুষের আসল রূপ। পাক-সেনা তাণ্ডবের ভয়ঙ্কর দুর্দিনে কিছু লোককে চিনেছিলাম। তার মধ্যে দুজন লোকের কথা একটু খুটিয়ে না বললে ত্রুটি থেকে যাবে। তাদের মধ্যে আমাদের যৈজ্ঞকাকা--আরেক জন ফকির মাঝি। দুজনেই তেমন লেখাপড়া জানে না এবং সমাজের উঁচু স্তরে তাদের বাস নয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তারা যে কাজ করেছেযে আত্মত্যাগ করেছে তা মানুষের চরিত্রে বিরল। একজন যৈজ্ঞকাকা মরে শহীদ হয়ে অমর হয়ে থাকল আমাদের স্মৃতিতে। অন্যজন ফকির মাঝি জীবিত থেকেও মৃতপ্রায়। আশি বছরের বৃদ্ধ করুণ নয়নে তাকিয়ে আছে পরপারের দিকে। তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে বিশ্বাস ঘাতক ছেলের কথা।  তাদের কথা মনে মনে ভাবছি কত অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এভাবে প্রাণ বিলীন করে দিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, কে তাদের হিসাব রাখবে?
আমাদের পুব পাড়ায় যৈজ্ঞকাকার বাড়ি। নদীতে মাছধরা আর মাছ বিক্রি করা তার পেশা। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি বিয়াল্লিশ ঈঞ্চি বুকের ছিনাওয়ালা সেই শক্ত সামর্থ মানুষটিকে। নির্ভীক দুঃসাহসী। আমরা তাকে কাকা বলে ডাকতাম।
যৈজ্ঞকাকার বাচারি নৌকা থাকত সন্ধ্যা নদীতে। সে নদীতে পাততো ছান্দিজাল আর বাদাজাল। তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ঢাকায়। আমরা হিন্দুরা আর বের হতাম না এলাকার বাইরে। যৈজ্ঞকাকা তখনও নিয়মিত জাল পাততে যেত সন্ধ্যা নদীতে। শর্ষিনার পীরসাহেবের বাড়ি আর স্বরূপকাঠি থানাএর মাঝ বরাবর নদীতে থাকত তার নৌকা। দিনে রাতে গোণ মত জাল পাততো সেই মাছ বিক্রি করত স্বরূপকাঠি বাজারে।
 এই যৈজ্ঞকাকার কাছে মিলিটারিদের খবর পেতাম আমরা। এক কথায় কাকা ছিল আমাদের স্পাই। কী করে সে এই খবর সংগ্রহের কাজে বহাল হয়েছিল সেও এক ইতিহাস।
পীর সাহেবের পেয়ারা লোক শরীফ মিয়া। শরীফ মিয়া ছিলেন মুসলিম লীগের জোর পাণ্ডা। তার যাতায়াত ছিল পীর সাহেবের বাড়িতে আর স্বরূপকাঠির থানায়। পাক-সেনাদেরো তখন প্রধান যোগাযোগ ছিল পীর সাহেবের বাড়িতে এবং থানায়। আর মিলিটারির খবর  পীরের বাড়িতে কখন কে আসে তা জানতেন শরীফ ময়া।
শরীফ মিয়ার ভাইপো হাসেম থার্ড ইয়ারের ছাত্র সে মনে প্রাণে আওয়ামী লীগে বিশ্বাসী। সহজ সরল জোয়ান ছেলে। এই জোয়ান ছেলেরা অধিকাংশই তখন শেখ সাহেবের কথায় চলে। হাসেমও আওয়ামী লীগের কাজ করার জন্য মনে প্রাণে প্রস্তুত। চাচা শরীফ মিয়ার নিকট থেকে পাকসেনাদের অনেক খবরই সংগ্রহ করার চেষ্টা করত হাসেম। আর সেই খবর অতি গোপনে আমাদের এলাকায় পাচার করতো যৈজ্ঞকাকার মারফত
ধূর্ত শরীফ মিয়ার কাছে হাসেমের মতিগতি ঠিক ভাল লাগছিল না। তিনি একদিন হাসেমকে ডেকে সরাসরি বলে দিলেন, কলেজে পড়ে ওসব আওয়ামী লীগ করা চলবে না হাসেম। কথায় বলে নুন খাই যার গুণ গাই তার। আইজ পশ্চিমা খানেদের নুন খাইয়া নিমকহারামি? বলে একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন হাসেমের মুখের দিকে
হাসেম চুপচাপ ছিল কোনো কথা না বলে।
শরীফ মিয়া কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় করে বললেন, হারামি, আওয়ামী লীগের বেবাক কাফের আর হারামি। ক্যা মেয়া, পাকিস্তান আমাগো বাদশা। তাগো বিরুদ্ধে তোমরা লড়বা ক্যা? একজন খাঁটি মোছলমান হইয়া আর একজন মোছলমানের গায়ে অস্তর ধরবা ক্যা? কাফের, আওয়ামী লীগের বেবাক শালা কাফের আর নিমকহারাম।
শরীফ মিয়ার মুখের উপর তর্ক করার সাহস তখনও হাসেমের হয় নি। তবুও একটু আমতা আমতা করে বলল, পশ্চিম পাকিস্তানের খানেরা যে আমাদের শোষণ
হাসেমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে শরীফ মিয়া আরও শক্তভাবে বলতে লাগলেন, আইজ সুযোগ পাইয়া ভাইরে তোমরা ভুইলা যাও? তো তোমাগো কলেজে পড়ার দোষ। এই পীরের মাদ্রাসায় কেতাব পড়লে অমন বেনামাজি আর বেয়াদব হইতে পারতা না। ক্যা মেয়া, হিন্দু গো লগে বোঝপাড়া কইরা পশ্চিমা খানসেনারাই পাকিস্তান ভাগ কইরা আনছে সে কেরামতি তোমাগো কি আছে মিয়া? আইজ পশ্চিমা খানে গো লগে কাইজা কইরা পাকিস্তানডারে দুই ভাগ করতে চাও? আর এট্টা আলাদা দ্যাশ বানাইতে চাও? নেমক হারামি খোদাতাল্লা সইবে না। ঘাস নিড়াবার কাঁচি দিয়া করবা লড়াই?
স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হতেই শরীফ মিয়া হাসেমকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করলেন। হাসেমকে এলাকার বাইরে বের হতেই দিতেন না।
তখনও আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় পাকিস্তানী মিলিটারি অপারেশন হয়নি। বরিশাল শহরের পতনের পর পাক মিলিটারির কাছে খবর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় নদীবন্দর ঝালকাঠির অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা হিন্দু। পাল এন্ড কোম্পানীর সব ব্যবসা এবং বার্মাশেল অয়েল কোম্পানির এজেন্সি প্রাপ্ত তাদের অয়েল ট্যাংকারো ঝালকাঠিতে। বরিশালের পাক সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল আতিক মালিকের নির্দেশে ঝালকাঠি বন্দর জ্বালিয়ে দেওয়া হল রাতারাতি। তারপর তিনি নিজেই তার দ্লবল নিয়ে চলে এলেন পিরোজপুরে। ক্যাপ্টেন এজাজের সহযোগিতায় এক প্রস্থ কাফের খতম করলেন। ক্যাপ্টেন এজাজকে পিরোজপুরে রেখে তিনি পটুয়াখালি অভিযানের ছক কষলেন। সেখানে তার ধ্বংসের কাজ এবং কাফের খতমের সঙ্গী হলেন দোজখের আরেক আজরাইল মেজর ইয়াহিয়া হামিদ।
বরিশাল শহরের উপকণ্ঠে সাগরদীতে ওয়াপদার বিরাট চত্বর। সেখানে পাক-মিলিটারির ক্যান্টনমেন্ট হল বরিশাল-পটুয়াখালি সদর দপ্তর। কর্নেল মালিক সাগরদীর এই প্রধান মিলিটারির ঘাঁটি থেকেই তার যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।
শর্ষিণা পীরের বাড়িতে বিড়াট জামিয়া উলেমা মাদ্রাসা। তাতে প্রায় হাজার দশেক ছাত্র। এও অবৈতনিক মাদ্রাসার সব খরচ চলত মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় এবং পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাই পীর সাহেব পাকিস্তান সরকারের প্রতি চির-অনুগত এবং বিশ্বস্ত।
পীরসাহেবের বাড়িতে আনছার ট্রেনিং-এর  ক্যাম্প ছিল অনেক আগে থেকে। প্রায় হাজারের কাছাকাছি আনছার সংগ্রহ করতে পীরকে দূরে যেতে হয়নি। মাদ্রাসার ছাত্র থেকেই সব নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আনছারদের কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। ওদিকে আটঘর-কুড়িয়ানায় মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং শুরু হয়েছে। পীর সাহেবের কাছে সেই কাফেরদের বাড়বাড়ন্তের খবর ছিল। সেজন্য পীরের রাতে ঘুম ছিল না। টাইটেল পাশ উর্দু জানা এক আনছার কমান্ডার পীরসাহেবের হয়ে ফোন করল সাগরদী ক্যান্ট্নমেন্টে ফোনে জানিয়েছিলেন আটঘর-কুড়িয়ানা সব হিন্দু কাফেরদের এলাকা। তারা সব পাকিস্তানের দুশমন। বিরাট এক মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি সেখানে। সেখানে মুক্তিবাহিনীর আটটা সেক্টর কাজ করত। ভারত থেকে গোপন পথে অস্ত্রশস্ত্র আনছে ওয়ারলেসে তারা খবর পাঠায় ভারতে। তারা যে-কোনো দিন আমাদের মাদ্রাসাও আক্রমণ করতে পারে। সেখানে মিলিটারি অপারেশন না হলে আমরা সুস্থ হয়ে ঘুমাতেও পারছি না ইত্যাদি।
বরিশালের সাগরদী ক্যান্টনমেন্ট থেকে ওয়ারলেসে অর্ডার এল পিরোজপুরের ক্যাপ্টেন এজাজের কাছে। সে অর্ডারের বিষয় ছিল : স্বরূপকাঠি যাও, শর্ষিণা পীরের বাড়ি যাও, তাঁকে সেফগার্ড দেও। আটঘর-কুড়িয়ানা সরেজমিনে তদন্ত করো। সেখানে এপারেশন করে দুশমন খতম করোকাফের খতম করো।
সেই অর্ডার পেয়ে পিরোজপুরের ক্যাপ্টেন এজাজের অফিসের একজন ফোন ধরলেন শর্ষিণার পীরের বাড়িতে। ফোনের খবর সংক্ষিপ্ত : ক্যাপ্টেন এজাজ পরের দিনই পীরের বাড়ি আসছেন। তিনি পীরকে নিয়ে প্রথমে যাবেন স্বরূপকাঠি থানায়। তারপর তিনি আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় যাবেন। সঙ্গে যেতে হবে থানার .সি. এবং পীর সাহেবকে। তাদের দুজনের কাজ হবে মিলিটারিদের পথঘাট চিনিয়ে দেওয়া। এবং কোথায় দুষমন বা কাফের আছে তাদের হাল হকিকত বলে দেওয়া।
ফোন পেয়ে গলা শুকিয়ে গেল খোদ পীর সাহেবের। পাক-সেনা যাবে হিন্দু এলাকায়, লড়াই করবে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে। তাতে পীরকে নিয়ে টানাটানি কেন, বাবা? তোরা বল অন্য কাজের লোক তোদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেই। তা নয় স্বয়ং পীরকে নিয়ে টানাটানি।
পীর সাহেবের চামচা শরীফ মিয়া উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তিনি বললেন, আপনি ফাও এত ভয় পাইতেছেন, ক্যা, সাইব। মিলিটারি আইবো তার ফোর্স নিয়া। তাতে অত ভয়ডরের কথা কী আছে?
--তুমি তার কী বুঝবে শরীফ মিয়া? আটঘর-কুড়িয়ানা এখনও হিন্দুস্থান। ভারত থেকে সুন্দরবনের পথে অস্ত্রশস্ত্র আসছে সেখানে। সেখানে কাফেরদের মুক্তিবাহিনীর আড্ডা। আমাকে যেতে হবে সেই খোদ হিন্দু এলাকায়খাস কাফেরদের আড্ডার মধ্যে?
ধূর্ত শরীফ মিয়ার গোল গোল চোখের মণি ঘুরছিল। তিনি নুয়ে  পীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কী যে কন সাইব? যত রাজ্যের গুজব। অস্ত্র যদি আইসাও থাকে তা চালাবার মত কেরামতি থাকন লাগে। ফুঃ সব গর্তের ইঁদুরেরা অস্ত্র চালাবে?
--গর্তের ইঁদুর?
--, সব গর্তের ইঁদুর গাছের দু একটা কচি শিকড় কাটতে পারে। আর খান সেনারা হইল গিয়া এক একটা বাঘ পাকিস্তানী ফোর্সের সামনে আইসা দেখুক না একেবারে মালাউনরা।
শরীফ মিয়া পীর সাহেবের মনে এমনি করে সাহস যোগানোর চেষ্টা করতে থাকেন।
পীর সাহেব ভাবতে থাকেন। তার উদ্বেগ কমে না। বললেন, আবার একবার ফোনটা ধর না শরীফ ক্যাপ্টেন সাহেব ফোর্স নিয়া আসবে কি না কথাটা একটু জান তো ভালো করে। পীর সাহেবের কণ্ঠে অনুনয়ের সুর।
শরীফ মিয়ার ভয়টা কী? খান সেনাদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা নয় যে একটু এদিক ওদিক হলেই গুলি লাগিয়ে দেবে। তিনি এই পীরের মাদ্রাসায় পরার সময় উর্দুও শিখেছিলেন।
শরীফ মিয়া মনের আনন্দে ফোন ধরলেন পিরোজপুর ক্যান্টনমেন্টে। আধা উর্দু আধা বাংলায় জানতে চাইলেন আগামীদিন কোনো ফোর্স স্বরূপকাঠি আসবে কিনা।
ফোনের প্রান্ত থেকে ভেসে এলো বাঘের গর্জন, কেয়া, ফোর্স কেয়া?
পরক্ষণেই প্রান্তের লোক পালটে গেল। এবারে পরিস্কার বাংলায়। এখন খানসেনারা অন্যত্র অপারেশন করছে। কোনো গানবোট থাকবে না। লড়াই করতে তারা যাচ্ছে না। যাবে শুধু এলাকাটা চিনতে। এটাই বরিশালের ডিস্ট্রিক-মিলিটারি হেড কোয়ার্টার্সের অর্ডার।
পীর সাহেব তখন রাগে ভয়ে এবং আতঙ্কে কেঁদে ফেলেন আর কি।
ঠিক সে সময় পীরসাহেবের আর এক সহকারি জয়নাল এসে প্রবেশ করেন সেখানে।
ধূর্ত শরীফ মিয়াই তখন পীর সাহেবকে মিলিটারির হাত থেকে এড়িয়ে যাবার পথ বাতলে দিলেন একটু চালাকি করে।
জয়নাল ভয়ঙ্কর রকমের হিন্দু বিদ্বেষী। তার বাড়িটা ছিল আটঘর-কুড়িয়ানার হিন্দু এলাকার কাছাকাছি। কুড়িয়ানা ইউনিয়ন এলাকার মধ্যে তার কিছু জমি-জমা ছিল। এই শরীফ মিয়াই একবার যুক্তি করে জয়নালকে ভোটার করে দিয়েছিলেন আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের। হিন্দু মালাউনদের কী করে শায়েস্তা করা যায়তার ফন্দি-ফিকিরের চিন্তা সব সময় চলতে থাকত শরীফ মিয়ার মাথায়। আইয়ুব খানের প্রথম আমলে এই শরীফ মিয়াই বুদ্ধি করে সরকারি নমিনেশনে জয়নালকে মেম্বর করে দিয়েছিলেন আটঘর-কুড়িয়ানার ইউনিয়নের। তারপর পীর সাহেবের সঙ্গে যুক্তি করে আর এক কৌশলে জয়নালকে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান করে দিলেন সরাসরি।
জয়নাল মিয়া প্রবেশ করতেই শরীফ মিয়া বলে উঠলেন, আপনার কথাই হইছিল, চাচা মিয়া।
--আমার কথা!
--, আপনারে লইয়া মিলিটারী যাইব কুড়িয়ানায়।
পীরসাহেব বললেন, তোমাকে তো যেতেই হবে জয়নাল। তোমাদের এলাকা, তুমি ছিলে সেখানকার চেয়ারম্যান। সব এলাকা তোমার চেনা। থানার দারোগা আর চেয়ারম্যানরাই তো মিলিটাইরির সঙ্গে থাকে এলাকা চিনাবার জন্য। স্বরূপকাঠি থানার দারোগা পালিয়েছে। তুমি তো আর পালাতে পারবে না বাড়ি ছেড়ে।
--না না, পালাব কেন? মিলিটারি তো চাই- আমরা, বললেন জয়নাল।

পীর সাহেব আশার আলো দেখলেন এবার। জয়নাল যে এতো অল্পতেই রাজী হয়ে যাবেন তা তিনি ভাবতে পারেন নি।
জয়নাল চলে গেলেন। শরীফ মিয়া পীর সাহেবকে দিয়ে ডাকালেন মাদ্রাসার উর্দু মাওলানাকে। মাওলানা সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানের লোক। তাঁকে দিয়েই ফোন করালেন বরিশালের সাগরদি ক্যান্টনমেন্টে। বিশেষভাবে অনুরোধ করে বলা হল কর্নেল সাহেবকে যে বর্তমান গদিনশীন পীরের বাবা মূল পীর নেছারুদ্দিন সাহেবের ইন্তিকালের দিন হল আগামীকাল। আগামীকাল সারাদিন তাঁর মাজার জিয়ারত করতে হবে। পীর সাহেবের বহু মুরীদ সেখানে উপস্থিত থাকবেন। পীর সাহেব তাই মিলিটারির সঙ্গে যেতে পারবেন না। মিলিটারির সঙ্গে যাবে এলাকার একজন উপুযুক্ত লোক সে এই এলাকার এক্স চেয়ারম্যানতার এলাকা সম্পর্কে ভালো চেনা-জানা আছে।
পীর সাহেব দোহাই দিলেন মূল পীর সাহেবের। তাঁর দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইলেন যাতে তাকে কাফেরদের এলাকায় যেতে না হয়। অথচ মূল পীর সাহেব নেছারুদ্দিন সাহেবের কাছে হিন্দু-মুসলমানের কোনো বিভেদ ছিল না। তার যেমন ছিল মুসলমান মুরীদতেমন ছিল হিন্দু ভক্ত। তাঁর মাজারে মুসলমানরা জিয়ারত করে। হিন্দুরাও সে কবরে গিয়ে মোমবাতী দেয়, মানত করে। পরিবারের মঙ্গল কামনায় দোয়া করে।
আজ তারই বাড়িতে চলছে হিন্দু  খতমের প্রস্তুতি। হিন্দু নিধনের জন্য চলছে রাজাকারের ট্রেনিং। কবরে বসে তিনি এটা দেখে নিশ্চয়ই বিচলিত হয়ে পড়েছেন।, শিউরে উঠছেন। আর এই অশান্তি নিয়েই হয়ত থাকবেন রোজ কেয়ামতের অপেক্ষায়।



তিন
শরীফ মিয়া ফিক ফিক করে হাসছিলেন আর হুকোতে তামাক টানছিলেন। মরিয়ম বিবি বাইরে থকে বারান্দায় এল সে বলল, মিয়া সাহেবের চোখে মুখে খুশীর ফোয়ারা? ঘটনা কি?
শরীফ মিয়া ফুক করে তামাকের ধোঁয়া ছাড়লেন। বললেন, আমাদের পীর শুধু নামেই পীর, পেটে বুদ্ধি নাই মোটেও।
মরিয়ম বিবির মুখ হা হয়ে গেল। বললেন, একি কইলেন। এতো বড় পীর তার পেটে বুদ্ধি নাই!
--বুদ্ধি ছিল, মিলিটারির কথা শুনে সব বুদ্ধি মগজ থেকে ধোঁয়া হয়ে বেরিয়ে গেছে।
--
মিলিটারি!
এতক্ষণ হাসির কারণটা বিবিজানের কাছে বলতে না পেরে স্বস্তি ছিল না শরীফ মিয়ার। তিনিখানা স্পীডবোটে পাকমিলিটারি আসছে। তার মধ্যে থাকবেন স্বয়ং ক্যাপ্টেন, তারা সকাল দেষ্টায় যাবে কুড়িয়ানায়। তাতে পীরসাহেবের উদ্বেগ, এবং কী বুদ্ধি করে তিনি জয়নালকে তাদের সঙ্গে পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেনসব খবরই বলে ফেললেন বিবিজানের কাছে।
এই সব খবর বিবিজানের কাছ থেকে পেয়ে গেল হাসেম। হাসেম একখানা হাত চিঠি লিখে তা সঙ্গে সঙ্গে পাচার করে দিল যৈজ্ঞকাকার হাতে। যৈজ্ঞকাকা কালুকে দিয়ে তা সরাসরি পাঠিয়ে দিল ক্যাপ্টেন বেগের কাছে।
আমাদের এলাকার কোনো হিন্দু তখন মুসলমান-এলাকায় বের হতে সাহস পেত না। তার মধ্যেও যৈজ্ঞকাকা, কালু এবং আরও কিছু লোক ওদের এলাকার মধ্যে হাটে বাজারে যেত। এর একটা কারণ আছে।
লেঃ জেঃ নিয়াজী স্বয়ং এসেছিলেন বরিশাল সদরে। আর্মির লোকজন এবং রাজাকারদের নিয়ে এক মিটিং- সাব্যস্ত হয়, হিন্দু-মালাউন সফ কাফের। এরা সবাই মিসক্রিয়ান্টসবই ভারতের দালাল। কুফফর খতম কর’—এই হল মিলিটারিদের প্রতি তার পরিস্কার নির্দেশ। কিন্তু পীরসাহেব জানতেন কিছু পেশাদারি হিন্দু রয়েছে, ওরা কামার, কুমার, জেলে, নাপিত, ধোপা। এসব পেশাদারি লোক মুসলমানদের মধ্যে নেই, এদের ছাড়া হাট-বাজার এমনকি সমাজই চলতে পারে না। পীরসাহেব তার অসংখ্য মুরীদদের মধ্যে এসব বুঝিয়ে এক ফতোয়া জারী করে দিলেন, কামার, কুমার, জেলে, নাপিত, ধোঁপারা খাঁটি হিন্দু নয়। তাদের উপর কোনো অত্যাচার করা চলবে না। তারা নিরিবিলিতে বাজার-হাট করতে পারবে। মিলিটারি এলেও যাতে তাদের কোনো বিপদ না হয় তার জন্য একখানা করে নিরাপত্তা পরিচয়পত্র দেওয়া হল মেজরের সই করা। যার জন্য যৈজ্ঞকাকা আর কালুর চলাফেরায় কোনো বাধা ছিল না।
মাস দেড়েক আগে আমাদের মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। কদিন আগে ক্যাপ্টেন আমাদের ট্রেনিং দেখতে এসেছিলেন। দুদিন হল নীরদ স্যারকে নিয়ে তিনি কোথায় চলে গেছেন। বেগ সাহেব শিখাকে করে দিয়ে গেছেন আমাদের ছয় নং মেয়ে গ্রুপের ক্যাপ্টেন। নীরোদ স্যার দুদিন নেই বলে আমাদের মেয়ে গ্রুপ শিখার চার্জেই রয়েছি।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেছি। কিছুক্ষণ পরেই মার্চ করার সময়। হাত-মুখ ধুয়ে আমরা যার যার পোশাক-আশাক পরে তৈরি হচ্ছি। এর মধ্যেই রিসিভারে খস খস করে শব্দ হল। বোঝা গেল  ব্যাটারি চার্জ করে রিং করা হচ্ছে। প্রভা রিসিভার ধরেই শিখাকে ডাকল। কেন্দ্রীয় সেক্টর থেকে স্বয়ং বেগ বলছেন শিখা ছুটে এসে রিসিভার ধরল। বলল, হ্যাঁ স্যার, আমি শিখা বলছি..., স্যার আমরা সবাই একই জায়গায় আছি।
শিখা ফোন রেখে দিল। আমরা সবাই উদ্গ্রীব হয়ে শিখার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। শিখা বলল, কেউ দূরে যাবে না। সবাই সতর্ক থাক। যে-কোনো মুহূর্তে জরুরী অবস্থা দেখা দিতে পারে পরবর্তী খবর একটু পরেই জানা যাবে।
একটু পরেই আবার খবর, আজ দশটায় মিলিটারি আসবে। আমরা সবাই যেন এলার্ট থাকি।
খানিকটা উত্তেজনা অনুভব করলাম। জীবনে এরকম অর্ডার কোনোদিন পাই নি। মুক্তিবাহিনীতে এই প্রথম সরাসরি মিলিটারির বিরুধে চার্জ নেবার অর্ডার। টমিগানের ট্রিগারে বারে বারে হাত লাগাচ্ছি। ভাবছি ঠিক সময় ট্রিগার টানতে পারব তো?
শিখা বলল, কী ভাবছিস? আগে থাকতেই কিছু খেয়ে নিতে হয়। সবাইকে কালকের রুটিগুলো খেয়ে নিতে বল।
সবাই হাতে হাতে রুটি নিয়েছি আমরা। হঠাৎ রিসিভার বেজে উঠল। শিখা রিসিভার ধরেই ছিল। এবারের খবর আরো জরুরি। জনসাধারণ সবাই যেন পেয়ারা বাগানের মধ্যে ইন্টেরিয়ারে চলে যায়। খালের পারে সদর রাস্তায় যেন কোনো লোক না থাকে।
আমাদের পশ্চিম দিকে এক নম্বর ভিজিলেন্স গ্রুপ কাজ করছিল। তাদের একজন খাঁটি খবর নিয়ে এল স্বরূপকাঠি থানা থেকে। সে বলল, তিনখানা স্পীডবোট স্বরূপকাঠি-থানার ঘাটে। জন ত্রিশেক খান সেনা থাকবে সেই বোটে। মাঝের বোটে থাকবেন তাদের ক্যাপ্টেন। পরে তার নামটা জানতে পেরেছিলামতিনিই ক্যাপ্টেন এজাজ। তারা ঠিক দশটায় স্টার্ট দেবে কুড়িয়ানার উদ্দেশ্যে থানার ঘাট থেকে।
সন্ধ্যা নদী থেকে উঠে এসেছে স্বরূপকাঠি খাল। সেই খালের উত্তর পারে স্বরূপকাঠি থানা। থানা বরাবর সেই খালে এসে মিলেছে কুড়িয়ানার বড় খালের সঙ্গে। এই দুই খালকে যোগ করেছে কুড়িয়ানার ভারানি খাল। সেই ভারানি খালের পরিসর খুবই কম। তা থেকে কোনো লঞ্চ যেতে পারে না। স্পীডবোট চলতে পারেতাও স্পীড কমিয়ে।
সে ভারানি খালটা হল মুক্তিবাহিনীর এক নম্বর গ্রুপের অধীন। গ্রুপ কমান্ডার মোহাম্মদ সেলিম। আমাদের সেলিম ভাই। কেন্দ্রীয় গ্রুপের সঙ্গে এক নম্বর এবং ছয় নম্বর মেয়ে গ্রুপের একটাই ফোন লাইন। খস খস করে বেজে উঠল রিসিভার। কেন্দ্রীয় গ্রুপ থেকে খবর আসছে--স্বয়ং বেগের অর্ডার। একই লাইন বলে আমরাও শুনতে পাচ্ছি। বেগসাহেব বলছেন, এক্ষুণি তৈরি থাকতে হবে ছয় নম্বরকে বারোখানা হ্যান্ডগ্রেনেড নিয়ে। কুড়িয়ানা ভারানি খালের উত্তর পারে মণ্ডলদের বিরাট পেয়ারা বাগান। সেখানে থাকতে হবে আত্মগোপন করে। মিলিটারি বোট যখন খালের মধ্যে ঢুকবে তখন নয়-- ফিরতি পথে যাবার সময় চার্জ করতে হবে গ্রেনেড। আসার সময় শুধু ওয়াচ রাখতে হবে ছোট্ট খালে ঢুকে স্পীড কতটা কমিয়ে তারা বোট চালাচ্ছে। সেই হিসেব ক্যালকুলেশন করে রেডি থাকতে হবে। ফেরার পথে যেই স্পীড কমে যাবে বোটের, তখনি করতে হবে গ্রেনেড চার্জ। প্রতি বোটের জন্য একটি গ্রেনেডই যথেষ্ট। তবুও একটা যদি মিস হয়? তাই প্রতি বোটের উপর ডাবল চার্জ করতে হবে পর পর।
একটু পরেই ক্যাপ্টেন বেগ আবার বলছেন, এখনি ভারানি খালের পারে তৈরি থাক। পেয়ারা গাছের আড়ালে বস্তে হবে ঝোপের মধ্যে। ছোট খাল, কোনো অসুবিধা নেই। ফিরতি পথে স্পীড কমে এলে চার্জ করতে হবে।
এক নম্বর গ্রুপ থেকে উত্তর দিচ্ছে সেলিম, কোনো চিন্তা নেই স্যার, ছয়জনকেই পাঠিয়েছিতিনটা গ্রুপে।
--তুমি ওয়াচ করছ তো? ওরা ঠিকমত এগিয়ে যাচ্ছে কিনা।
--আমি রেডি স্যার। ওদের পিছনে পিছন যাচ্ছি।
--কাকে কাকে পাঠিয়েছ?
--সুজিতনুরু, মীর্জা, নির্মল, ঝংকার আর ধীরেন।
--পিছনে তুমি আনোয়ারকে সঙ্গে নিও।
--হ্যাঁ, আমি এখনই যাচ্ছি।
কুড়িয়ানা থেকে আটঘর। একখানা সোজা খালের বাঁক। প্রায় দেড় কিলোমিটার হবে। এই খালের পারে আমাদের মুক্তি বাহিনী তিনটে গ্রুপ রয়েছে। এক নম্বর গ্রুপ হল কুড়িয়ানা স্কুলের পশ্চিম পাশে। তাদের উপর হল গ্রেনেড চার্জ করার আদেশ। দুনম্বর গ্রুপ রয়েছে বাঁকের মাথায় আটঘরের পুলের গোড়ায়, খালের দক্ষিণ পারে। আর আমরা ছয় নম্বর মেয়ে গ্রুপ পজিশন নিয়েছি এই দুই গ্রুপের মাঝ বরাবর।
দুই নম্বর এবং আমাদের ছয় নম্বর গ্রুপের উপর নির্দেশ হল, আমরা নদীর পারে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা পেরিয়ে একটু দূরে পজিশন নেব। আমরা কাউকে আক্রমণ করব না। আমাদের কাজ হল ওদের স্পীডবোটের কার্জকলাপ লক্ষ করা। আর আমাদের কাছাকাছি কোথাও পাকসেনা নামলে সুযোগ বুঝে গ্রেনেড চার্জ এবং ্যান্ডম ফায়ারিং করা।
রাস্তার পাশে নারকেল সুপারির একটা পুরানো ভিটা। সেখানে দুটো মঠ আছে পাশাপাশি। দুটোই সমাধি মন্দির। জোড়া মঠের মাঝখানে কার্নিশের উপর উঠে বসল শিখা। রাস্তা বা খালের দিক থেকে তাকে দেখা যায় না। পাশেই ঢেকিলতা, কচুবন এবং ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পজিশন নিয়েছি।
পাশেই নবীন জেঠার ঘর। জেঠা জেঠির সঙ্গে ঝগড়া করছেন টের পেলাম। তাঁদের ঝগড়ার বিষয় আজকের এই মিলিটারি আসার ঘটনা। জেঠি জেঠাকে বললেন, ওগো শুনছ, আইজ নাকি মিলিটারি আইবো?
--আয় নাকি তোমার বাড়ি। খাইয়া দাইয়া আর কাম নাইত মিলিটারির।
--কথাডা এক্কেরে হাইস্যা উড়াইয়া দিলা? আমি হাঁচা কতা কইলাম কি না তাই।
--তুমি হাঁচা কথা ছাড়া মিছা কথা কবেই বা কইলা? জেঠা জেঠিকে ঠেস দিয়ে কথা বলেন।
জেঠি এবার একটু জোরে বলেন, হাঁচা না তয় কী? হিস্যার গ্যানা, রাজেন সবাই পেয়ারা বাগানে চইল্যা গ্যাছে। লও, আমরা দক্ষিণ কোলায় (মাঠ) যাই।
--ইচ্ছা থাকলে তুমি যাও। মিলিটারি আইবো, চেনো, মিলিটারি কারে কয়?
--আহা, আমি চিনুমডা কি? বেবাকে কইল
--যারা কইল তাগো লগে পালাও গিয়া। এই বিলের মধ্যেআইবো মিলিটারি। যত রাজ্যের গুজব।
- বাড়ির নগেন ঠাকুরপোই তো খবরটা কইল। হেও তো পোলা-মাইয়া লইয়া বাগানে চইল্যা গ্যাছে।
নগেন কাকা আমাদের স্কুলের শিক্ষক। জেঠি তার দোহাই দিয়ে খবরটার সত্যতা প্রমাণ করতে চায়।
নবীন জেঠা তার উত্তরে বলেন, নগার কথা? এট্টা মাইয়াছেইলা সব সময়ই মিনমিন করে। যাও, নগার লগে ইঁদুরের গর্তে ঢোকো গিয়া তুমিও। বলেই নবীন জেঠা বেড়া থেকে হুঁকো হাতে নিয়ে বারান্দায় উঠে যান তামাক সাজতে।
জেঠি তার কথা শেষ কথা বলেন, কইলে তো শোনবা না, মিলিটারি আইলে আর দৌড়ানোর সময় পাইবানা, কইয়া রাখলাম।
এঁদের কথায় আমরা ডিস্টার্বড হচ্ছি। এদের রান্নাঘরের লাগ পিছনেই আমরা পজিশন নিয়ে রয়েছি। প্রভা বলল, শিখাদি, আমি ওদের এখান থেকে সরে যেতে বলে আসি। বলেই নিভা, শেফালি আর মায়াকে নিয়ে জেঠার উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল জেঠি তখন ঝুড়ি হাতে গোয়াল ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। এস.এল.আর হাতে মেয়েদের দেখতে পায়ে ওমা বলেই বসে পড়ল সেখানে।
জেঠা কল্কিতে আগুন তুলছেন। টান দিতে যাবেন হুঁকোতে। বললেন, কী হইল, মিলিটারি আইল নাকি? বলেই উঠোনে দুপা দিয়েএদের চেহারা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন তিনি। ঠিক সেই মুহুর্তেই আমরা পশ্চিম দিকে স্পীড-বোটের শব্দ শুনতে পেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই কয়েক রাউন্ড ফায়ারিং। শব্দটা একেবারে কানের কাছেই।
--ওরে বাবারে। বলে জেঠি লাফিয়ে পড়লেন গোয়াল ঘরের পাশে ডোবাটার মধ্যে। জেঠার হাতের হুকো পড়ে গড়িয়ে গেল। তিনিও গড়িয়ে পড়লেন জেঠির গায়ের উপর। প্রভারা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে পজিশন নিল
আমি শিখাকে জিজ্ঞেস করলাম, গ্রেনেড চার্জ কি হল নাকি? আর তো শব্দ শুনছি না।
শিখা মঠের কার্নিশের উপর। জোড়ামঠের ফাঁকা দিয়ে তাকিয়ে ছিল। ব্যস্তভাবে বলে উঠল, একটা লোক গুলি খেয়েছে, আর বউটা
কথা শেষ হবার আগেই সাঁ করে তিন খানা স্পিডবোট পশ্চিম দিক থেকে পুব দিকে বেরিয়ে গেল। আমরা দেখলাম জন ত্রিশেক খান সেনা রয়েছে তাতে।
মাথা উঁচু করে দেখলাম একটা ছোটো নৌকো খালের মধ্যে বেহাল হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। কে একজন সাঁতার কেটে খালের এপারে আমাদের দিকেই আসছে।
শিখা বলল, আমি ঠিকই দেখেছি লোকটা গুলি খেলো আর বাচ্চা ছেলেটা ছিটকে খালে পড়ে গেল। হয়ত তার গায়েও গুলি লেগেছিল। আর বউটা ঝাঁপিয়ে পড়েছে জলে। বউটা বেঁচে গেছে।
আমরা খালের  কাছে এগিয়ে যাই। চরের উপর এলিয়ে পড়া বউটাকে ধরে তুলি। দেখে যেন চিনি চিনি মনে হল আমার। সে তখন ফুলঝরার মত কাঁপছে। তার কথা বলার শক্তি নেই। তাকে ধরে নবীন জেঠার ছোট্ট উঠোনে নিয়ে এলাম।
নবীব জেঠা কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হইল?
আমি বললাম, একটা লোক গুলি খেয়ে জলে ছিটকে পড়েছে, আর তার ছেলেটা
জেঠি বউটার দিকে তাকাতেই তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। তিনি বলে উঠলেন, যে আমাগো ওপারের নরেনের বউ।
আমিও চিনতে পারলাম। উত্তর পারের নরেন হালদারের বউ। এবারে ফায়ারিং-এর শব্দের মানেটা বুঝতে পারলাম। নরেনদা তার বউ আর বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে নৌকায় করে এপারে আসছিল। সেই মুহুর্তেই খান সেনারা এসে পড়ে। তারা প্রায় আধ কিলোমিটার দূর থেকে গুলি করেছে। অব্যর্থ নিশানা-অব্যর্থ লক্ষ্য। গুলি খেয়ে খালে ছিটকে পড়ে নরেনদা।
জেঠিকে দেখতে পেয়ে আমার খোকা, আমার খোকা বলেই পড়ে গেল নরেনদার বউ।
জেঠি একটু সুর চড়িয়ে বললেন, আয় হায়রে, নরেন মইর্যা গেল, বাচ্চা পোলাডাও গেল, বউডার কী হবে রে? জেঠাকে উদ্ধেশ্য করে জেঠি সুর আর একটু চড়ালেন, আমি যে এত কথা কই তা শোনবা না, এখন দ্যাখলা তো তুমিআমার কথা হাঁচা না---
আর বউটা কেবল আমার খোকাআমার কী হবে রে, বলে কপাল চাপড়াতে লাগল।
আমি তাদের কথা বলতে বারণ করছি। তাতেও জেঠির সুর চড়েই যাচ্ছে। সে প্রায় আধা পাগলের মত চিৎকার আর সঙ্গে সঙ্গে কাঁপুনি তো আছেই।
শিখা এস.এল.আর এর ব্যারেল জেঠির দিকে ঘুরিয়ে বলল, চুপ করুন। নইলে বাকি গুলিটা আমরাই দিচ্ছি যান, তাড়াতাড়ি, এই বউদিকে নিয়ে চলে যানএকদম পেয়ারা বাগানের ভিতর।
নরেনের বউকে ধরে জেঠি চলল দক্ষিণ দিকে। তার পিছনে পিছন কাঁপতে কাঁপতে চললেন সাহসী নবীন জেঠা। জেঠির মুখ চলতেই থাকে। কিছুদূর যাবার পরেও শুনতে পাচ্ছি জেঠির গলা, ওরে বাবা, মাইয়ারা কম নাকি? এক্কেরে মিলিটারির লাহান তেজ। তুই কান্দিস না বউ, মোরাও কি আর বাঁচুম? ওগো শুনছ, মিলিটারির হাতেও কি রকম বন্দুক আছে?
--আরে লও দেহি, আর বন্দুকে কাম নাই। জেঠার উত্তর আমাদের কানে আসে।
কয়েক মিনিট পরে স্পীডবোটের শব্দ মিলিয়ে গেল। পূব দিকে অনেক দূরে ফায়ারিংএর শব্দ টের পেলাম। আমরা শুধু বসে বসে অপেক্ষা করছি। খানিক পরে স্পীডবোট তিনখানা সাঁ করে পশ্চিমদিকে বেরিয়ে গেল।
আমরা কান পেতে আছি। হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ হলে শব্দ টের পাব। পাল্টা ফাইট হলে দুর্দান্ত ফায়ারিং হবে। তখন বুকের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর উত্তেজনা
কিন্তু না, কোনো শব্দই টের পেলাম না।
আমি বললাম, কী হল শিখা, কোনো শব্দ টের পাচ্ছি না।
--বোঝা তো যাচ্ছে না কিছুই। শিখারও নিস্পৃহ জবাব।
আধঘণ্টা চলে গেল। আমাদের কাছে কোনো খবর এলো না। আমরা তখন আমাদের আস্তানার দিকে ফিরব কিনা ভাবছি। দেখি ঝঙ্কার আর ধীরেন এদিকেই আসছে। আমরা তিন তালি বাজালাম।
ওরা কাছে আমাদের কাছে এল। শিখা জিজ্ঞেস করল, ধীরেনদা, খবর কী?
ধীরেন বলল, জান শিখাদি, কী উত্তেজনা নিয়ে ঝোপের মধ্যে পজিশন নিয়ে ছিলাম। সামনে ওরা জনহাতে -খানা গ্রেনেড। পিছনে হেল্পিং গ্রুপে ছিলাম আমরা চারজন। একদম রেডি। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে আছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছনে জোড়া জোড়া করে হাততালি।
--চারটে হাততালি। আমরা সবাই অবাক।
--হ্যাঁ, চারটে হাততালি। আর পিছন ফিরে দেখি জাহাঙ্গীর সাহেব দাঁড়িয়ে।
--জাহাঙ্গীর সাহেব। এবারে অবাক হই আমরা।
--হ্যাঁ, জাহাঙ্গীর বলেই তো ...থেমে গেল ওরা। তা-না হলে গ্রেনেড চার্জ করেই বসত।
জাহাঙ্গীর হলেন ক্যাপ্টেন বেগের খোদ এসিস্ট্যান্ট নম্বর ওয়ান। মারাত্মক জরুরি ব্যাপার  হলে বেগসাহেব সেখানে জাহাঙ্গীরকে পাঠান
জোড়া জোড়া চারটে হাততালি হল স্টপ অর্ডারের ইঙ্গিত। যেমন তিনটে হাততালির শব্দ হল—‘আমরা এখানে আছি খবরটা নিজেদের লোককে জানিয়ে দেওয়া। পাঁচটা শব্দ হল বিপদ সঙ্কেত অর্থাৎ আমরা বিপদে পড়েছিআমাদের সাহায্য করো।
ঠিক সন্ধ্যার সময় শুনেছিলাম আসল ঘটনা। ক্যাপ্টেন বেগ এসেছিলেন এক নম্বর গ্রুপে। রাতে নিরোদ স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন আমাদের এলাকার জন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাঁদের আলাপ-আলোচনায় কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। পরে নীরোদ স্যারের মুখে শুনেছিলাম পুরো ঘটনাটা।
সামরিক আর বেসামরিকদুটো শব্দ এরা সম্পুর্ণ আলাদা দুটো জাত। একের যেটা কর্তব্য অন্যের কাছে তা করা অন্যায়। একের কাছে যা নীতি অন্যের কাছে তা দুর্নীতি। যার জন্য সামরিক বিভাগ সব সময় স্বয়ং সম্পুর্ণ থাকে। সিভিল মানুষের সঙ্গে তারা কোনো যোগাযোগ রাখে না। জনসাধারণ পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকে। তাদের আছে আবেগ, আছে অনুভূতি। কিন্তু মিলিটারিদের কাছে আবেগ অনুভূতির কোনো স্থান নেই। অনুভূতি প্রবণ মন নিয়ে মিলিটারি কি যুদ্ধ করতে পারে?
ক্যাপ্টেন বেগ ভুল করেছিলেন সেকথা বলব না। তবে আমাদের এলাকার দুর্গতি আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। আমাদের এলাকার লোকজনও মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করেছিল ব্যাপারটা। জনসাধারণের কথা রাখতে গিয়ে বেগসাহেব তিনবার তাঁর অর্ডার তুলে নিয়েছিলেনসরে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নীতি থেকে। তাতে এই এলাকার জনগণের লাভ কিছুই হয়নি। বরং লোকসান হয়েছিল আমাদের। অন্তত আরও কিছু খানসেনাদের সমাধি রচনা করতে পারতাম আটঘর-কুড়িয়ানার গভীর বিলে।
আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। প্রতি পদক্ষেপে জনসাধারণের সাহায্য আমাদের দরকার। তাই বেগসাহেব জনগণের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেন নি। প্রথম দিনেই আমাদের এলাকায় খান সেনাদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতে গিয়ে অর্ডার তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে। তুলে নিয়েছিলেন গভীর দুঃখে। তিরিশ জন খানসেনা একেবারে হাতের মুঠোর মধ্যে এসেও বেরিয়ে গেল বিনা বাঁধায়।
ধূর্ত শরীফ মিয়া বুদ্ধি খাটিয়ে পীরের পরিবর্তে জয়নালকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মিলিটারির সঙ্গে। জয়নাল জানত আটঘর-কুড়িয়ানার মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং চলছে।
মিলিটারির সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কোনো সংঘর্ষ হলে দুই দলের মাঝখানে পড়ে জয়নালের বিপদ হবে বেশি। তাই জয়নালও এক বুদ্ধি বাতলালো। আমাদের এলাকার রজনীবাবু একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। জয়নাল তার কাছে একখানা চিঠি লিখল। সে চিঠির বয়ান ছিলরজনীবাবু, আমি আপনাদের আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলাম। আমি আপনাদেরই লোক। আমি ইউনিয়নটাকে ভালোবাসি। তাই আপনাদের হিন্দু এলাকাটাকে বাঁচাবার জন্য গতকাল পীর সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। পীর সাহেব আমার প্রস্তাবে রাজী হয়েছেন। আমরা খানসেনাদের বলেছিআটঘর-কুড়িয়ানায় কোনো দুশমন বা দুস্কৃতকারী নেই। মিলিটারিরা এলাকাটাকে সরেজমিনে দেখতে আসছেন। তাতে আপনাদের ভয় নেই। আমি সঙ্গে থাকব। মিলিটারি যদি আঁচ করতে পারে যে ওখানে মুক্তিবাহিনী আছে, অথবা কেউ যদি তাদের সামান্যতমও ক্ষতি করার চেষ্টা করে তবে কিন্তু আপনাদের এলাকার ধ্বংস ডেকে আনবেন। আমি চেষ্টা করব আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকাকে বাঁচাতে।
ইতিজয়নাল মিয়া।
কামার,কুমোর জেলে মিলে সার আটখানা হিন্দুর দোকান তখন খোলা ছিল স্বরূপকাঠি বাজারে। তাদের কাছে পীরের পরিচয় পত্রও আছে। তাদের একজনকে দিয়ে জয়নাল মিয়া চিঠিটা পাঠিয়ে দিল রজনী বাবুর কাছে।
কথাটা সঙ্গে সঙ্গে চাউর হয়ে গেল আমাদের এলাকায়। এলাকার জনগণ গিয়ে ধরেছিল নগেনবাবু, অরুণবাবু এবং দাদাকে। এঁদের কথায় ক্যাপ্টেন বেগ মূল্য দেবেন এই ছিল এলাকাবাসীর ধারণা। আগেও একটা ব্যাপারে বেগ সাহেব অনুরোধ রেখেছিলেন।
সময় থাকতেই তারা তিনজন গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন বেগের কাছে। মিলিটারিকে বাঁধা না দেবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন তাঁকে।
বেগসাহেব কথাগুলো শুনে দাদার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, এখনও আপনারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন, মাস্টারবাবু?
দাদা বেগকে বলেছিলেন, আমার কথা নয় মি. বেগ। কিন্তু সাধারণ মানুষতো তাই চায়।
ক্যাপ্টেন বেগ বললেন, এখনো আপনারা যার যার বাড়িতে আছেন। কিন্তু যে ছেলেরা বাড়িঘর ত্যাগ করে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেছে, বাবা-মা, আত্মীয়-বন্ধু ভুলে, না খেয়ে, না ঘুমিয়ে নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিচ্ছে, তাদের কথা ভাবছেন কিছু?
দাদা কিছু জবাব দিতে পারলেন না। অরুণবাবু বললেন, সবই বুঝি মি. বেগ। কিন্তু সব লোক যদি বুঝে বসে আপনারাই এলাকা ধ্বংসের কারণ, তাহলে তো তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাবেন না। এবং লোকজনও সব পালিয়ে যাবে। আমাদের একটা অনুরোধ আমাদের ইউনিয়নের এলাকাটুকুর বাইরে যা করার করুন। শুনে ক্যাপ্টেন বেগ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন কয়েক সেকেন্ড। তিনি ডাকলেন তাঁর প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীরকে। তিনি তাকে বললেন, তাড়াতাড়ি চলে যাও জাহাঙ্গীরওদেরকে স্টপ অর্ডার জানাও।
জাহাঙ্গীর চলে গেলে বেগ সাহেব বললেন, আপনাদের ইউনিয়ন এলাকার মধ্যে আমরা খান সেনাদের বাঁধা দেব না। তবে এলাকার বাইরের ব্যাপারে আপনারা কোনো অনুরোধ কখনও করবেন না।
পরে একদিন কথা প্রসঙ্গে ক্যাপ্টেন বেগ দাদাকে বলেছিলেন, জানেন মাস্টারবাবু, সেদিন কেন আপনাদের অনুরোধে গ্রেনেড চার্জ করা বন্ধ করেছিলাম? তবে শুনুন, আমি মুসলমান হয়ে আপনাদের হিন্দু এলাকার ধ্বংসের কারণ হবো এই চিন্তা আপনারা করবেন সেই ভয়েই যে আমার অর্ডার তুলে নিয়েছিতা নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধা আমরা হিন্দুও মুসলিমও নই। আমাদের কর্তব্যবোধের কাছে হিন্দু-মুসলমান সব সমান। আমরা জানি খানসেনারা আপনাদের এলাকা ধ্বংস করবেই। মরবেন আপনারা ঠিকইকেউই বাঁচতে পারবেন না। তবে আমরা খানসেনাদের বাধা দেবার পরে যদি মরেন, মরার মুহুর্তে ক্যাপ্টেন বেগকে একটা অভিশাপ দিয়ে মরবেন। আর বলবেন লোকটার জন্য মরলাম। আমি তাই বাধা দেবার অর্ডার তুলে নিলাম। এবং আপনাদের ইউনিয়নের মধ্যে বাধা দেব না বলেও কথা দিয়েছি। এখন যদি খানসেনাদের হাতে মরেন, তবে গুলিটা খাবার পরে ক্যাপ্টেন বেগের কথা এই বিলে স্মরণ করবেন, নাঃ, বেগ বুঝেছিল ঠিকই। মরলাম, তবে শত্রু একজন মেরে মরাই ভালো ছিল।

চার.
এরপর দু-তিন দিন বেগ সাহেবের কোনো খবর পাই নি। তিনি কোথায় গিয়েছেন তা আমাদের নীরোদস্যারও জানেন না। তৃতীয় দিনে খবর পেলাম বেগ সাহেব ফিরেছেন। তিনি হঠাৎ আমাদের গ্রুপ কমান্ডারদের এক এক করে ডাকলেন, শিখাও গেল দেখা করতে।
দুপু্র বেলা ফিরে এল শিখা। আমি বললাম, খেয়ে নে।
লক্ষ করছি শিখা কেমন অন্যমনস্ক। খাবার দিকেও তার মন নেই। আমি বললাম, খাচ্ছিস না কেন?
শিখা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, করতে পারবি?
আমি বললাম, মানে?
--ক্যাপ্টেন বেগ যদি মরতে বলেন?
-তাহলে পারব না বলেও তো রেহাই নেই। মরতে হবেই।
--আমি তাকে কথা দিয়ে এসেছি। তোকে নিয়েই যাব বলেছি। তিনি অর্ডার দিয়েছেন আমাদের দুজনের উপর।
গোপন অর্ডার। জানানো হয়নি কাউকে। গ্রুপ কমান্ডার পর্যন্ত জানত না এ পরামর্শ। সকাল থেকেই দেখছি নীরোদস্যারের মুখ গম্ভীর। তাঁর মুখখানা কালো হয়ে আছে।
আমি আর শিখা শুয়ে পড়েছিলাম পাশাপাশি। চোখে ঘুম নেইনেই আলস্য বা তন্দ্রার ভাব। আমি নীরোদস্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি যেন খুব দুশ্চিন্তা করছেন, স্যার?
--আপনজনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে কেউ নিশ্চিন্তে থাকতে পারে, মা?
আমি উঠে বসি। বললাম, বিপদের একদম শেষ অবস্থা তো মৃত্যু। অস্ত্র হাতে নেবার দিন থেকেই তো মৃত্যুর ট্রেনিং নিচ্ছি স্যার। আগে থেকে মন তৈরী হয়ে আছে মরার জন্য। মরণটা এবার সহজ হবে।
নীরোদস্যার আমার মাথার কাছে এলেন। বললেন, এই শিক্ষা কি তোদের দিতে পেরেছি, মা?
--এ শিক্ষা তো কাউকে দিতে হয় না স্যার। আপনার মনের ভাবটাই আমার বিবেক থেকে সহজাত ভাবেই উঠে এসেছে।
নীরোদ স্যারের চোখ দুটো ছল-ছল করে উঠল। তিনি তাঁর ডান হাতখানা আমার মাথার উপর রাখলেন।
সেদিন ছিল স্বরূপকাঠি হাটের দিন। বিকেলবেলা আমি ও শিখা উঠে যৈজ্ঞকাকার বাচারি নৌকায়। ছই-এর আগচালটা টেনে বাড়িয়ে দেওয়া ছিল। যাতে সহজেই কেউ বাইরে থেকে আমাদের দেখতে পাবে না।
খালে চলছিল হাটুরে নৌকাগুলি। তার মধ্যেই বেরিয়ে গেল কাকার বাচারি নৌকা।
মাছের বাজারের কাছে পৌছে যাইবাইরে থেকে একজনের গলা টের পেলাম, ও যৈজ্ঞ ভাই, কী মাছ আনছ?
--গত রাইতে জাল পাতি নাই। মাছ আইব না আইজ।
লোকটা জুল জুল করে তাকিয়েছিল ছই-এর ফাঁকা দিয়ে। বলল, নৌকার মধ্যে মেইয়া-ছেইলা দেখছি, বাজারে ওডবা না?
--নৌকায় আমার মেইয়া আছে। মেইয়ার ননদ আইছিল গেল হাটবারেআইজ মেইয়ারে তার শ্বশুরবাড়ি দিয়া আইবার যাইতাছি। দিনকালের অবস্থা ভাল ঠেকছিল না। যাদের বউ তাগো বাড়ি দিয়া আসি।
সন্ধ্যা নাগাদ সন্ধ্যা নদীতে পৌঁছাই আমরা। বিকেল থেকেই আকাশে মেঘ ছিলবৃষ্টিও এল ঝিরি ঝিরি।
এরপরের ঘটনা আগেই বলেছি। সেই পীরের ঘাটে মিলিটারীর লঞ্চ ডোবানোর কাহিনী।
পীরের ঘাটের অপারেশনের পরে খানসেনারা এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছিল। ফায়ারিং করতে করতে তারা ফিরে গিয়েছিল পিরোজপুরে।
পরের দিন ভোরবেলা। ক্যাপ্টেন এজাজ পায়চারি করছিলেন পিরোজপুরের অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টে। তিনি অসহিষ্ণু, অস্থির। আগের দিন পিরোজপুর টাউনের হেডমাস্টারদের ডেকেছিলেন এক মিটিং-এ। তখন বিদেশি সব সাংবাদিক ঢুকে পড়ে পড়েছিল পূর্ব-পাকিস্তানে। দেশের অবস্থা স্বাভাবিক এটা দেখাতে হবে তাদের। জেঃ নিয়াজির এই নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছিল সব ক্যান্টনমেন্টে। তাই ক্যাপ্টেন এজাজ হেডমাস্টারদের ডেকে অর্ডার দিলেন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা সব খোলা রাখতে হবে। হাট-বাজার সব মিলবেপিরোজপুর আদর্শ হাইস্কুলের হেডমাস্টার ফররুখ আহমদ সাহেব উপস্থিত ছিলেন সেই মিটংএ। তাঁর স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন হিন্দু। তাঁরা সব ভয়ে পালিয়ে গেছেন। তিনি কী করে স্কুল খোলা রাখবেন? তাই তিনি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, হোয়াট এবাউট হিন্দু টিচারস?
--হিন্দু! কুফফর?
ক্যাপ্টেন এজাজের গোল গোল চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল বাইরে।
চেয়ার থেকে এক লাফ মেরে উঠে এলেন তিনি। ফররুখ সাহেবের একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর কাঁধের উপর আলতো করে দুটো গাট্টা মেরে বললেন, ডু ইউ নো জেটি?
--জেটি বাই দি রিভারসাইড?
এই জেটি পিরোজপুর শহরের খেয়াঘাট। এখান থেকে গত দশ দিনে প্রায় সাতশো হিন্দুকে গুলি করে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলেশ্বর নদীতে। এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক হল কুখ্যাত মালেক এজাজ জুটি।
আর তার একদিন পরেই মুক্তিবাহিনী কুখ্যাত মালেক-এজাজের লঞ্চ ডুবিয়ে দিয়েছে সন্ধ্যা নদীতে--খাস পীরের জেটি ঘাটে। সেই লঞ্চে মারা গেছে তার দুজন সহকর্মী মিলিটারি অফিসার।
দুপুরবেলা ক্যাপ্টেনের অস্থিরতা বাড়ল। সিকিউরিটি অফিসার নিয়ে গট গট করে উঠে গেলেন তার গান বোটে।
বেলা একটায় ক্যাপ্টেন এজাজের গান বোট এসে লাগলো স্বরূপকাঠির থানার সামনের খালে। সঙ্গে আজও রয়েছে দুখানা স্পীডবোট। গান বোট ভিড়িয়ে গট গট করে উপরে উঠে গেলেন এজাজ। পিছনে তার সিকিউরিটি ফোর্স তো রয়েছেই। থানার অফিস ঘরের সমুখে সেন্ট্রিকে প্রশ্ন করলেন, ও.সি. কাঁহা হ্যায়?
মিলিটারি দেখেই সেন্ট্রির কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। মুখে কোনো কথা সরছে না তার। হাত তুলে ও.সি.র বাসা কোনোমতে ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিল।
ও.সি. সবেমাত্র খেয়ে উঠেছিল। লুঙ্গি পরা অবস্থায় বারান্দায় বেরোলেন। এক সেপাই দৌঁড়ে এসে খবর দিল যে থানায় মিলিটারি এসেছে।
ও.সি. তড়িঘড়ি করে ইউনিফর্ম পরবার জন্য ঘরের দিকে পা বাড়াতে যান। ক্যাপ্টেন এসে সোজা দাঁড়ালেন তার সামনে।
--শালা কুত্তাকা বাচ্ছা। তুম দুশমন পাশ রহে হো?
প্যান্টালুন আর পরা হল না ও.সি.র। হাত দিয়ে লুঙ্গিটা ভাল করে কোমরে আটকে নিতে না নিতেই তার ভুড়িওয়ালা পেটের উপর বুটের গুঁতো পড়ল ক্যাপ্টেনের।
--তোমহারা থানা এলাকামে সব জানা মিসক্রিয়ান্ট হ্যায়। কাল তোমহারে আঁখোকে সামনে এয়সা অপারেশন হো গয়া। দো অফিসার মর গিয়া। আউর শালা তুম আরামসে সো রহে হো?
দারোগার গলা শুকিয়ে গেল। তিনি শুধু আমতা আমতা করতে লাগলেন।
ক্যাপ্টেনের রাগ তাতে বেড়ে যায় আরো। সজোরে আর এক বুটের লাথি তার পেটের উপর পড়লআর চেঁচিয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন, তুম দুশমন কাফেরকো মদদ কর রহে হো, শালা।
ও.সি. পড়ে যেতেও নিজেকে সামলা্লেন কোনো মতে। কোনোরকমে বলতে যান, নেহিনেহি, স্যার।
--হোয়াট? কেয়া বোলতা হ্যায়? তুম এক ঘণ্টাকে অন্তর বিশ কাফেরকো পাকড় করে লাও। নেহি তুমসে মার ডালেঙ্গে।
গট গট করে অফিস ঘরের মধ্যে চলে এলেন ক্যাপ্টেন এজাজ এবং তারপরেই সোজা গানবোটে।
এদিকে দুখানা স্পীডবোট তৈরি। তাতে জন পনেরো সশস্ত্র পাকসেনা। ও.সি-ও তার পুলিশ নিয়ে উঠলেন বোটে। তারা বেরিয়ে পড়লেন সন্ধ্যা নদীতে।
দুখানা বাচারি নৌকায় জেলেরা ছান্দিজাল পাতছিল নদীতে। দু নৌকার চৌদ্দজন লোক। তাদের মধ্যে ছিল আমাদের যৈজ্ঞকাকা ও তার ভাইপো কালু।
আপন মনে সারি গান গেয়ে জাল ফেলছিল জেলেরা।
মাঝ-গাঙ্গের জলে/ ঝাঁকে ইলসা চলে/ও ভাইভাইরে ফেল জাল গহীন গাঙ্গের জলে।
রোজই এমন করে জাল ফেলে জেলেরা। মিলিটারি লঞ্চ দু-একবার পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। আজ দুখানা স্পীডবোট বাচারি নৌকার দুপাশে এসে থেমে গেল।
ঝপ করে থেমে গেল সারি গান। জাল বৌঠা যে যার হাতে করে নিস্পলক তাকিয়ে আছে হা করে। যৈজ্ঞকাকা বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারটা। এটা গতদিনের ঘটনার জের। সে শুকনো চোখেই কালুকে ইঙ্গিত করল নদীতে ঝাঁপ দিতে।
স্পীডবোটের খান সেনারা বন্দুক উচিয়েই ছিল। লাফ ঝাপ দিলেই গুলি। পালাবার পথ নেই আর।
এর মধ্যে ও.সি.র বোট নৌকাটা এল। পুলিশের বাচারিতে উঠে পিঠমোড়া করে বাঁধতে লাগল এক এক করে।
কালুর বাঁধনটা একটু ঢিলে ছিল। জোরে টান দিয়ে বাঁধা থাকলেও বেশ নাড়ানো যাবে। সে সুযোগ খুঁজছিল পালাবার। বাচারি থেকে বোটে তোলার এক ফাঁকে কালু লাফ দিয়ে পড়ে যায় নদীতে। কেউ দেখতে পায়নি। দুনৌকার মাঝখান থেকে ডুব সাঁতার দিয়ে একদম জলের রেতে চলে যায়। সে কচুরিপানার দাম ধরে ভাসতে  ভাস্তে নদীর পারে পৌঁছে যায়।
অন্য সবাইকে বেঁধে বোটে করে নিয়ে এল থানায়। একখানা কাগজে কী যেন লিখে সেনারা নিয়ে গেল গানবোটে। কাগজখানার ওপর সই করে দিলেন ক্যাপ্টেন এজাজ
পিঠমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় তেরোজনকে নামানো হল নদীর চরে। শুধুমাত্র এস.এল.আর.-র কয়েক রাউন্ড ফায়ারিং। পরে সব চুপ।
মাত্রে আঠারো দিন আমাদের কাজ করেছিল যৈজ্ঞকাকা। মিলিটারি ভিজিলেন্স সেই দিনের ঘটনায় বুঝে ফেলেছিলজেলেরা ছাড়া আর কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারে না। তাই যৈজ্ঞকাকার এই পরিণতি। তার কথা স্মরণ করে আজও দুঃখ হয়। দুফোটা চোখের জল ফেলি। দুঃসাহদিক কাজে তাকে ভয় করতে দেখিনি কোনোদিন
মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে পিছনের কিছু ঘটনা মনে পড়ছে। কী করে আমাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মনোভাব দানা বেঁধে উঠেছিল, কারাই-বা আমাদের জীবনে মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। হয়ত আমার ব্যক্তিগত জীবনের খানিক অংশের কথা আমাকে বলতে হবে। যাঁদের সান্নিধ্যে আমরা আসতে পেরেছিলামতাঁদের কথা এখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে যাব।
শেখ সাহেবের কথা আগে উল্লেখ করেছি। তার কাছাকাছি যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আর হবে কিনা তাও জানি না (এই ডায়েরী লেখার সময়ে শেখ সাহেব জীবিত ছিলেন)। তবে সেদিনের বক্তৃতার কথা মনে পড়লেই আজও মনে হয় শেখ সাহেব যেন আমার চোখের সামনে দঁড়িয়ে আছেন
সেদিন কলেজ মাঠে হাজার বিশেক লোকের সমাবেশ। শেখ সাহেব বক্তৃতা করবেন। দলে দলে ছুটে এসেছিল বালক, বৃদ্ধ, যুবা। মেয়েরাও এসেছিল শেখ সাহেবকে দেখতে। শিখা সেদিন বক্তৃতা করেছিল। তাকে একটা টুলের উপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল শ্রোতাদের অনুরোধে যাতে সেই বেটে-খাটো মেয়েটির মুখ সকলে দেখতে পায়। শেখ সাহেব বক্তৃতা করতে উঠলেন বিশাল হাততালির মধ্যে। দরাজ গলায় বক্তৃতা শুরু হতেই সভা একদম নীরব। সে কী ওজোস্বিনী ভাষাকী মনের জোর। সেদিনের বক্তৃতায় তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে কী উদাত্ত আহবান। শ্রোতারা সব মন্ত্রমুগ্ধ। সেদিনের বক্তৃতায় তিনি আমাদের মনে আমার মত আরো কয়েকটি মেয়ের বিপ্লবী মনের অর্গল খুলে দিয়েছিলেন। সেই কলেজের মাঠে বক্তৃতা শুনেই আমার বিপ্লবীজীবনের নবজন্ম হয়েছিল।

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন