বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০১৩

নেতা যেভাবে রক্তের গন্ধ পান

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

কোমল-সরবতাসহ নেতা একদা নিচে নামতে থাকেন। তাঁর ডানে, বাঁয়ে কিংবা সামনে-পিছনে, উপরে-নিচে এমনকি পায়ে পায়ে ’শ খানেক নেতাকর্মীও একই ধারায় পা ফেলছে। এ মুহূর্তে এত ধীরলয়ে হাঁটছেন তিনি, যেন তার গা-ঘেঁষা মানুষের স্বাদ নিচ্ছেন। তাঁর সর্বাঙ্গ অনবরত খোলাবাতাসের ঝাপ্টা সামলায়; তাতে চেম্বারের না-শীত না-গরম হাওয়ার গন্ধ ক্রমেই ঝাপসা হচ্ছে।

নেতার সাথে চলা লোকগুলো ওই সময়ে মার্চপাস্টের মতো তাঁকে অনুসরণ করছে। ওরা ওদের বুকের ভিতর জমে থাকা নির্জন-ফোঁপানি বহন করতে-করতে সামনে এগোয়। তাদের মুখে, চোখে, গালে, বুকে মাত্র মাসখানেক আগে সৃষ্ট তালবিহীন উস্মা ছড়িয়ে আছে। তিন তলা থেকে নেমে যে পথটা একেবারে সিঁড়ির মুখ পেরিয়ে রাস্তার কাছে চলে গেছে সেই দিকে হাঁটতে গিয়েও নেতা ডানে-বাঁয়ে তাকান। এমনকি বিল্ডিংটির ছাদও দেখেন তিনি। বুক ঝাঁজরা-হয়ে-যাওয়ার-মতো শ্বাস নেন, ফের খালি করেন। বাইরের চিৎকার আর শ্লোগানের ভারে তাঁর ভাবনা তছনছ হতে থাকে। আলো পিছলে পড়া টাইল্স্ বসানো মেঝের উপর দিয়ে মেপে-মেপে হাঁটেন তিনি। সামনের রাস্তাটি একইঞ্চিও খালি নেই; মানুষের ঘন কোলাহলে তা বেশ আগেই ভরে গেছে। নেতা তাকান ওদের দিকে। ঘনবাতাসের মুহুর্মুহু করতালি, কোলাহল, গায়ে-গায়ে লাগা শ্লোগান তার গায়ে, সামনে, চারপাশে গড়িয়ে পড়ে। একেবারে পিছনের খালি জায়গাসমূহ এসবের দাপটেই ভরপুর হচ্ছে। এবার নেতা হাতের মোলায়েম ইশারায় তাদের থামতে বলেন। তিনি এমন নির্বিঘেœ কথা বলছেন যেন চকচকে তাজা ইলিশের জোয়ার নামে গলায়, তাতে যে কারও মনে হতে পারে টিভি-প্রোগ্রামের রিহার্সাল দিচ্ছেন তিনিÑ মাপজোখ করা কথা। একসময় তাজ্জব কায়দার আওতায় পড়ে তাঁর ঘর্ম প্রণালী ম্যালাগুণ বেড়ে যায়। তাঁর কথা সঠিকভাবে বলানোর জন্য যথার্থ নির্জনতা তৈরি করছেন একজন সহচর-নেতা, যিনি গতকালই নগর কমিটি থেকে স্বেচ্ছায় রিজাইন দিয়েছেন। নাম তার আহসানুল করিম। তিনি এখন নেতার নিত্যসহচর।


আমাদের এই পরিচিত নেতা কর্তৃক এই পরিকল্পনা সেদিনই পাকাপোক্ত করা হ’ল যেদিন দেশ-বিদেশের মান্যগণ্য ব্যক্তি নেতার অফিসে এসেছিলেন। তিনি কথা সৃজন করেন, চা-না¯তা খান, গল্পগুজবে মাতেন। সেদিন নেতার পরনে ছিল পেপার সিল্ক পাঞ্জাবির উপর ছাই রঙের শেরওয়ানি; মোগল ঘরানার নাগরা জুতা। তিনি কথা বলেছিলেন কমই। ওরা চলে যাওয়ার সময়ও তিনি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ফটোসেশনেও অংশ নেন। সেই রাতে নেতার ঘুমে আরও ঝামেলা বাড়ে। বলতে গেলে তিনি ঘুমাতেই পারেন না। মেধাবহুল রাজনীতিচর্চার কামড় তার তামাম মগজব্যাপী বাড়তে থাকে। এবং তাদের ভিতর এ সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয় যে এদেশ থেকে কচুরিপানার মতো, সোডিয়াম লাইটের মতো, ধূলাবালির মতো গজিয়ে উঠা সন্ত্রাসকে নির্মূল করতে হবে। জালিম, ধোকাবাজ নগরপতিকে গদি থেকে সমূলে সরাতেই হবে।

গুঁইসাপের পিঠের মতো সিঁড়ি বেয়ে তিনি নিচে নামতে শুরু করলেন। জনতার করতালির ভিতর হাত নেড়ে তিনি সবাইকে অভিবাদন জানান। তিনি সিঁড়ি বেয়ে, তুলতুলে পায়ে জনতার এত কাছে আসতে থাকেন, যেন প্রত্যেকের গায়ের সুগন্ধি নিজের গায়ে গেঁথে নিবেন! বাসার সামনে মেইনরোডে দাঁড়ানো পঞ্চাশটি গাড়িও হুড়মুড় করে যেন সেলুট দেয় তাকে! নেতার পাঞ্জাবি-আবৃত-শুভ্র-হাত আবারও এর জবাব দেয়। তাঁর একেবারে বুকের বাঁ পাশে এসে দাঁড়ান এই শহরের পানীয় কম্পানির হেড ডিরেক্টর সৌমিক কবির। চুলমুক্ত মাথা, তেলতেলে মুখ বেয়ে অনবরত ঘাম ঝরতে থাকে তার। তিনি নেতার এত কাছে দাঁড়িয়ে তার হাসি-হাসি মুখের সুবাস নিচ্ছেন যে তিনি ভুলে যাচ্ছেন তার নিজের ঘর্মাক্ত মুখের কথা। নেতা টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে এভাবে দাঁড়ান যাতে মুখের প্রোফাইল সাবলিলভাবে আসে। এ জন্য টিভির লোকজনের ন্যূনতম সহযোগিতাও নিতে হয় না তাঁর। উপস্থিত মানুষজন নেতার এহেন কার্যকলাপে যথার্থ তৃপ্ত হন। কারণ নেতার এ ভঙ্গির সাথে তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয়।

নেতার শরীর থেকে তখনও চেয়ার ছেড়ে আসার গন্ধটি দূর হয়নি। তিনি আজ মুক্ত এলাকায় ভাষণ দিবেন। জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তা-ই শোনার জন্য। তিনি তার সামনে দাঁড়ানো লোকজনদের আবারও তাদের যাত্রাপথের বর্ণনা করতে থাকেন। তিনি এও জানান, যত জেল-জুলুমই আসুক তাদের এ পথকে কেউ থামাতে পারবে না। জয় তাদের হবেই। সারাটি এলাকা তিনি ঘুরে-নেড়ে-ঘষে দেখেন। আবারও ঘামেভেজা হাসি তার পুরা মুখে বি¯তৃত হয়। তিনি তার জন্য নির্ধারিত পিঠখোলা জিপে উঠার আগে উপস্থিত জনতাকেই শুধু নয়, রাস্তার দুপাশের বাসা-বাড়িতে অপেক্ষমাণ জনতাকে হাত নেড়ে বিজয়-শুভেচ্ছা জানাতে ভুলেন না।

নেতার বড়ো ছেলে মিছিলটিকে ইশারা দেয় পশ্চিমদিকে এগোনোর জন্য। সেই মাফিক মিছিলটি শ্লোগানসমেত নড়ে উঠার প্রস্তুতি নেয়। রোদের গন্ধ নিয়ে, ঘামে ভিজে, জনস্রোতটি আড়মোড়া ভাঙার সময়ই অতি ব্যাপক স্বরে বোমা ফাটে। তাও উপেক্ষা করে ওরা সামনে এগোয়। কিন্তু নেতা প্রথমে আটকা পড়লেন একেবারে তারই চেম্বারের সামনে। মুরগি-জব্বার যে এমনটি করতে পারে তা ভেবে দেখার ফুরসত না-দিয়েই সে বলতে থাকে-- বেশি লাড়াচাড়া কোলে¬ পাওয়ের নলিকান বাইঙ্গা আতে লটকাইয়া দিমু। জনতার শ্লোগানের ভিতর এমন আচরণে বিস্মিত তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি একজন আইন রক্ষাকারী বাহিনীর অফিসারকে তর্জনির ইশারায় কাছে ডাকেন, অফিসারটির আঙুলে তখনও বেনসন সিগ্রেটের ধোঁয়া নড়েচড়ে উঠছে-নামছে। এর ফাঁক-ফোকরেই নেতার আদেশ ঝরে পড়ে -- দেখুন আপনারা পুলিশের লোক, আপনাদের তো ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নাই। এইসব জনগণকে বোঝান। আমরা মিটিং করতে যাচ্ছি, আপনারা শান্তিরক্ষাকারী বাহিনী, আপনারা দেশের সম্পদ; নেতার গলা আরও চড়ে -- আপনারা আপনাদের কাজ করবেন, আমরা আমাদের কাজ করব। তাঁর মোলায়েম ঠোঁটের মাঝখানে তৃপ্তির হাসি বাড়ন্ত হতেই তা ধপ্ করে গিলেও ফেলেন। প্রথমেই পুলিশ অফিসারটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তোতলাতে থাকে। কারণ এত ধীরস্থিরভাবে নেতা কথা বলেন যেন আগামী মাসছয়েকের ভিতরই তাঁরা ক্ষমতা দখল করছেন এবং সিকিউরিটি ভবনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও নিশ্চুপ ইশারায় তাকে দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তার এমন ভাবনা বহুক্ষণ চলনশীল হয় না। তার কোমড়ে পেঁচানো সেল ফোনটি চু-উ-রু-র চু-উ-রু-র করে মেসেজের সংকেত জানায়। হাত দশেকের ভিতরই বোমা ফাটানোর চিৎকারের ভিতর সে সেটি পড়তে থাকে। কপালে ভাঁজ পড়ে অনবরত। তাই মুছে দিতে দিতে নেতার একেবারে কাছাকাছি চলে আসে সে। তার জরুরি মেসেজটি তাকে সচল করে এভাবে-- মনে করেন স্যার, এইদিকে গণ্ডুগোল হইতে পারে, কাজেই এইখানে কোনো মিছিল বা শ্লোগান দেওন যাইবো না। আমাদের কাছে ইনফর্মেশন আছে, এই দিকে রাষ্ট্রদ্রোহীরা অ্যাটাক করবার পারে। পাঁচজনের বেশি একলগে লম্বা দম নেউনও নিষেদ। কড়া অর্ডার স্যার হাহাহা। তার হাসির কবলে পড়ে মেদবহুল ভুঁড়ি আপন খেয়াল-খুশিতে উঠানামা করে। রাষ্ট্রের চিন্তা নেতার কপালেও ভর করে --তাহলে উপায়?

তখনও নেতার দিকে ৪০/৫০ গাড়ি আর অসুস্থ মানুষ আকুল পরানে তাকিয়ে আছে। যে করতালি শুরু হয়েছিল তার আগমনে, বর্ষার জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রবহমাণও ছিল, তাই বাধা পেয়ে লণ্ডভণ্ড হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সিল্কের মতো চামড়ায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম গড়িয়ে-ছড়িয়ে পড়ে নেতার। তিনি তাঁর জনতার দিকে তাকান, তাকান ঘড়ির দিকেও। তিনটার মতো বাজলেও কমসে কম ৬টার মধ্যে তো মুক্তাঞ্চলে পৌঁছতে হবে। ব্যবসায়ী সহকর্মীর দিকে তাকান তিনি। নেতার বড়ো ছেলে কানে কানে গাড়ির বহরের দিকে ইশারা দিলেও নেতার কানে তা পুরোমাত্রায় প্রবেশ করে বলে মনে হয় না। তিনি নিমগ্ন থাকেন কী করে মিছিলসহ মিটিংয়ের জায়গায় যাওয়া যায় তারই ভাবনায়। এবার একজন উকিল সহকারী একটা উকিল নোটিশ রেডি করার কথা বলেন -- স্যার, দেশটা কি মগের মুল্লুক হইয়া গেলো? মার্শল ল চোলতাছে? মিছিল করতে দিতো না কেন্? তারই রেশ ধরে নেতার গ্রামের বাড়ির একজন মুরব্বি বলতে থাকেন -- সা’ব, এইডা কেমুন বেইজ্জতি কারবার কইন দেহি, মিছিল দেকলে শালাগো পুটকি ফাডে কেরে? নেতার গমন ঘটে মানুষের দিকে। নেতার বড়ো ছেলেটাকে বাস্তুহারা কলোনির একনেতা রক্তাক্ত কলরবে বলতে থাকে --ভাইব্যা কাম করুইন, বেশি তেড়িবেড়ি কলে¬ একটা কেল¬াও থাকতো না। কথাগুলো অত জোর দিয়ে বলে যে, দশহাত দূরে দাঁড়ানো নেতার বড়ো ছেলের গায়েও এর তাপ আছড়ে পড়ে। তা-ই নেতার ছেলে তার বাবাকে জানায়। বাবা তাকান আইনরক্ষাকারী বাহিনীর দিকে Ñ আইনের সেই কর্তা তখনও মিষ্টিপানের ভিতর মজে আছে।


নেতার গাড়ির মিছিল দক্ষিণ দিকে গমনে যায়। গাড়ির গহ্বর থেকেই এবার শ্লোগান আসে -- -আমাদের নেতা আসছে, সারা বাংলা কাঁপছে। বাংলার জনতা এক হও/ লড়াই করো। দুপুরের রোদ গলে গলে পড়ে পিচ-বসানো-রাস্তার উপর। গাড়ির বহর আর মিছিলের প্রেসারে নগরীর জীবন বিস্ময় বোধ করে যেন। মিছিলটি কতক্ষণ চলার পর দোকান, মানুষের তাকানো আর অ্যাম্বেসেডরের বাসাগুলোই যেন বদলে যায়, সামনের মসৃণ রাস্তা ভেদ করে মোটা কাঁটাতারের বেরিকেট জাগ্রত হয়। কাঁটাগুলো সাপের ফণার মতো হাঁ করে আছে। রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো তীব্র আর্তনাদের ভিতর যেন কাঁপছে। রোদ আরও ঝলসে উঠছে। যেন পুড়িয়ে দিবে অনেক কিছু। তাদের সামনের এই নগরের চিহ্ন মুছে যাচ্ছে! যেখানে বৃটিশ হাই কমিশনারের অফিস থাকার কথা সেখানে শুধু আইন রক্ষাকারী বাহিনীর মাথা। বন্দুক উঁচিয়ে হো হো নীরবতা পয়দা করছে এরা। নেতার শ্বাস দীর্ঘজীবী হয়। বুক ভেঙে আসা শ্বাসের চাপে একসময় রীতিমতো হাঁপানির মতো লাগে। নেতা গাড়ি থেকে লোকজনকে নামতে ইশারা দেন। লোকগুলো শ্লোগান দেওয়ার আগেই দুড়মুড় করে বেশকিছু মানুষ নেতার একেবারে সামনে এসে পড়ে, উপদেশ দেওয়ার মতো একজন বলতে থাকে Ñ স্যার আফ্নেরে কই, আজাইরে কাম বাদ দেইন। গদি লইয়া পুন্দাপুন্দি কইরে কুনু লাভ নাই; বাড়িত্ গিয়া বিদেশি মাল কাইয়া লাম্বা ঘুম দেইন। এবার নেতা লোকটার বুকের কাছে গিয়ে দাঁড়ান, একটু থামেন, দীর্ঘশ্বাস হজম করেন এবং মিটিমিটি করে হাসির ভিতর বলতে থাকেন Ñ আরে মিয়া, কাম দেকলে কই; খালি তো নাম ঘোষণা দিমু, এতেই তুমরা কাইত অইয়া গেলা? একেবারে পিছন থেকে ১০ দিনের হ্যাংওভারসহ একজন বলতে থাকে Ñ মাদারচুত, আর একটা কতা কইলে তর মুখটারে তামাম জিন্দেগির লাইগা সিলাই কইরা দিমু। শাদা-পোশাকের আইন রক্ষাকারীর ইনচার্জ হিহি করে হেসে উঠলে নেতার শরীরটা নড়ে ওঠে। তিনি এবার আকুল শরীরে ঘামতে থাকেন। যেন ঘামের রায়ট শুরু হয়ে গেছে। তিনি তার কথাসমূহ গুছিয়ে নেওয়ার টাইম পান না, আবারও অর্ডার আসে Ñ আরে দূর মিঞা, বাসাত্ যান গিয়া। নেতা আবারও চমকে ওঠেন। এ কেমন বেয়াদবি!! নেতা তার দিকে তাকিয়ে অবাক হন; কারণ একেবারে পিছন থেকে আবারও একজন বলতে থাকে -- রা¯তাঘাটে ফাইজলামি করে চুডুলুক। আফ্নের একটা ইজ্জত আছে না? হেই ইজ্জত আফ্নে পতেঘাডে কেরে খর্চা করতাইন? এর চাইয়া রুগিরার গোয়া মারলে রোগিরও লাভ আফ্নেরও লাভ হাহাহা।


চোইতমাসের কড়ারোদে ধুলাবালি রাস্তায় ছড়ানো-- মিছিলের চিৎকারসহ মিছিল আবারও আরেক পথে হাঁটে। মোটরসাইকেলে নেতা দুইজন আর অন্যরা হেঁটে চলে। একসময় মিছিলটি রেলগেইটের দরুন আটকা পড়ে। ঝিকির ঝিকির শব্দের তালে ট্রেইন উধাও হয় একসময়। একটা শব্দ চারপাশে ঘুরঘুর করে মিনিটখানেক। তাও মরে যায়। এবার নেতা গেইটের উপর হুঙ্কার দিয়ে বলতে থাকেন-- অই মিয়া গেইট খুলো। কিন্তু গেইট খোলার কোনো নাম-গন্ধই নেই। মিছিল, মানুষ আর গাড়ি সবই আটকে দেয়। মাথা, মুখ, বুক এমনকি পেট নিচু করে তাঁকে গেইটের একপাশ পেরোতে হয়। এবং দলবলসমেত তিনি ধূলাবালির মধ্যেই বসে পড়েন। মিছিল আর শ্লোগানের সরবতার ভিতর অপেক্ষা চলে অনেকক্ষণ। গেইট যে খুলে না, যেন রোজ কেয়ামত পর্যন্ত এটি আর ওঠবে না। এমনই একপর্যায়ে রেললাইনে, পিচঢালা পথে, খালি রাস্তায়, পাথরের উপর বসে পড়ে ওরা। একজন এগিয়ে আসে তাঁর দিকে; মিনি রেকর্ড-পে¬য়ারটি নীরবে এগিয়ে ধরে নেতার সামনে --


প্লিজ, আপনার এই মুহূর্তের অনুভূতির কথা বলেন। 

দেখতেই তো পাচ্ছেন ঘাস, পাথর আর ধূলাবালির ভিতর বসে আছি।

তার মানে ঘাস, পাথর আর ধূলাবালি এখন আপনাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে আছে।

শুনুন, আসলে আমরা ঘাসতন্ত্রেই বিশ্বাসী।

একটু যদি ব্যাখ্যা করতেন।

ঘাস যেমন পিলপিল করে সারা বাংলাদেশ দখল করে রাখে, তেমনি আমরাও ভোটারদের জাগিয়ে তুলব, এই নমরুদ-ফেরাউনদের উৎখাত করব।

আপনাকে মিছিল-মিটিং করতে দিচ্ছে না -- কেন?

বুঝতে পারছেন না কেন এসব করছে? আরে সরকার তো নার্ভাস হয়ে গেছে।

আচ্ছা, ঠিক কয়দিন লাগবে আপনাদের আন্দোলন সফল করতে?

জনগণ চাইলে এখনই হতে পারে। সবই আল্লার রহমত (এত জোর দিয়ে কথাটা তিনি বলেন যেন ঈশ্বরনির্মিত ভাবনা আবারও তামাম দেশ চষে বেড়াচ্ছে)।

(পেশাগত নিরাকার ভাবনার কবলে পড়ে সে) তবু স্যার, ঠিক কতদিন লাগতে পারে।

(এবার নেতা উপরের দিকে মানে সৃষ্টিকর্তার দিকে আঙুল নির্দেশ করেন শুধু) আকাংক্ষার কোনো বয়স নাই।

আপনাদের সংগঠনকে কতদিনে ফুলে-ফলে সুশোভিত করতে পারবেন বলে মনে হয়?

দেখুন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এইভাবে ভাববেন না। এখন ভাবেন জালিমশাহীর নিপীড়নের কথা।

স্যার আপনি তো মেধার রাজনীতি খুব পছন্দ করেন?

হ্যাঁ, আমার প্রিয় বিষয় রাজনীতি; মেধাবহুল পরিচ্ছন্ন রাজনীতি Ñ জনগণের রাজনীতি।

মেধা নির্ণয়ের মাপকাঠি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

এটা একটা প্রশ্ন হলো? এখন এই প্রশ্ন করার সময়!

না মানে, অনেকদিন পর মেধা নিয়ে হঠাৎ ব্যস্ত হলেন তো!

মেধা হলো তাই যেখানে জনগণের স্বপ্নের ভিতর থেকে স্বপ্ন নির্ণয় করা যায়।

ও তাই, আচ্ছা আপনার ওই জনগণ ঠিক কারা?

জনগণ মানে জনগণ, মানে জনগণ যাদেরকে জনগণ বলে স্বীকার করে আর-কী। জনগণ ছাড়া তো রাজনীতি হয় না।

রাজনীতি তো আপনাদের আদিকালের নেশা?

তা বলতে পারেন।

স্যার, এটা কি স্ত্রী সঙ্গমের চেয়েও সহজ কাজ? (কথাগুলো ঠোঁট, জিহ্বা আর মুখসৃষ্ট নীরব-হাসির কবলে পড়ে ভিজে-ভিজে যায়)

নেতা এসব অদ্ভুত কথার কবলে পড়ে যান এবং উত্তর দিতে সময়ও নেন। নিশ্চয়ই এর ভিতরে কোনো না কোনো সাবোটেজ পেঁচিয়ে আছে। এসবের মাঝেই অনেক সময় পেরিয়ে যায় । এরই ফাঁকে একমুঠ বাদাম এগিয়ে দেয় জনৈক পথিক Ñ স্যার বাদাম খান, বাদামের মেলা ফজিলত। মনে করেন রাস্তা বন্ধ করে বাদাম খাওয়াও ক্ষমতায় যাওয়ার একটা মহৎ পথ। বাদামের শূন্য খোসা জমা হয় তাদের আশপাশে। জং-ধরা পা, মোলায়েম পা, শুকনা কিংবা তাজা শরীর তাদেরকে ঘিরে রাখে। নেতা বিড়বিড় করে কোরান তেলাওয়াতের সুরে কী যেন পড়ছেন। তাঁর মাথা খোয়াবের অচিন গহ্বরে পড়ে যেন স্থির হয়ে আছে। দূর্বাঘাসের মতো গিঁটঅলা অনেক মুখ এদের আশপাশে জমাট বাঁধতে থাকে। তাঁরা দীর্ঘসময় এখানে বসে থাকে। আহসানুল করিম আর নেতার বড়ো ছেলে রেলের গেইটমেনকে খুঁজে কোথাও পায় না। আধমাইল দূর থেকে আনা একজন লাল পতাকাধারীকে জিজ্ঞেস করলেও এই হদিস মেলে না ঠিক কখন বা কবে এই রেলগেইটটি খোলবে। অবশেষে তাঁরা হেঁটেই মুক্ত অঞ্চলের দিকে রওয়ানা দেন।

ঐ তো ঐ দেখা যায় মুক্ত অঞ্চল। মানুষ দেখার আকাঙ্ক্ষার, প্রাণ খুলে কথা বলার আকাংক্ষা নেতার ভিতর গোছগাছ হতে থকে। কিন্তু নেতার দলটি সামনে এগোতে গিয়ে থমকে যায়। সেখানে তাদের লোক কোথায়! সারা এলাকা মিছিল, চিল্লাপাল্লা আর জটলায় ভরপুর। সেই স্থলে একটা ব্যানার সারাটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। বিদেশি থার্টি ফাইভ/ সিক্সটি ফাইভ টেট্রন কাপড়ের উপর লেখা --সন্ত্রাসের কালো হাত / ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।এক দফা এক দাবি / সন্ত্রাস তুই কবে যাবি। লাল অক্ষরে নিচে ডানে লেখা --ইহা একটি সন্ত্রাস নির্মূল কার্যক্রম। সেই স্থানটির দিকে যেতেই ৫০/৬০ জনের একটা দল হৈরৈ করে নেতার মিছিলের দিকে এগিয়ে আসে। ওরা আট-দশজনকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে ধারালো চাপাতি আর চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপাতে থাকে। রক্ত ঝরে কয়েকজনের মাথা-হাত-রান-বুক ছিঁড়ে-ফেটে-ফেঁড়ে। নেতা একটা ফিলিং ষ্টেশনের দিকে দৌড় দেন। হৈহৈ করে ৪-৫ জনের একটা দল তাঁকে ধরে ফেলে। এবার নেতাকে এরা চাপাতি-রামদা-চাইনিজ কুড়াল দিয়ে ফালি ফালি করতে থাকে। রক্তের ফোয়ারা ছোটে তাঁর। রক্তে রক্তের গন্ধ জাগে। চারপাশে রক্তের আলামত টের পান। সেই আলামতের ভিতর ডুবতে-ডুবতে ভাসতে-ভাসতে দৌড়তে দৌড়তে আরও এক গন্ধ পান তিনি। ব্যবসায়ী নেতাটির মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত পড়তে থাকে। এসবের ভিতর ভিজতে ভিজতে দৌড়ায় সে। নেতার ছেলে বক্তৃতা শুরু করে। তার গলার মুখের রগ দড়ির মতো পাকিয়ে ওঠে; যেন ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরে -- ভাইসব আপনারা লক্ষ করুন ..., একটা ইট এসে পড়ে তার মুখে। ব্যাকুল ধারায় রক্ত ঝরে, সামনের একটা দাঁত পট্ করে নিচে পড়ে যায়। একসময় তার কথাগুলো আর্তনাদ হয়ে কাঁপতে থাকে এবং বুকে জমে উঠা রক্তের দলা পেঁচিয়ে কথাগুলোকে সামনে ঠেলে দেয়। জমায়েতটি ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরও সেখানে বাস্তুহারা সমিতির ব্যানারটি ঝুলে থাকে।

সেই কত বছর আগের কথা -- আরও এক নেতার মৃত্যুর সময় সেই হলদে মগজের গন্ধ আবারও উঠে আসে নেতার মগজে। সার্কিট হাউসের দোতলায় নেতার মৃতদেহ পড়ে থাকে সেদিন। কিন্তু এখন তাঁর মগজ বেয়ে হল্দে আলো গলে গলে পড়ে। নেতা মৃত্যুঠাণ্ডা গন্ধের ভিতর দৌড়ে যান একটা পুলিশভ্যানের দিকে -- রক্তাক্ত স্বর ছিটিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠেন পুলিশ ভ্যানে। রাস্তার ধূলাবালি, চিৎকার, দোকানপাট পটাপট বন্ধ হওয়ার ভিতর ভ্যানটি সামনে দৌড়ায়। ড্রাইভারের কাছে নেতার সামনাসামনি বসা মহিলা-পুলিশটি নেতাকে দেখে। একসময় তার দেখাও থামে। হঠাৎই ও কুটকুট করে হেসে-গড়িয়ে যেতে-যেতে ড্রাইভারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তার গলা বেয়ে কথাগুলো এভাবেই ঝরতে থাকে যেন হলদে-উষ্ণ পেচ্ছাব তীব্র জলস্রোতের মতো বইছে -- কেরামত ভাইগো, পুরুষ মাইন্ষের পেশাবের গন্ধ এমুন কড়া!

পুলিশভ্যান থেকে অতি ধীরে নামেন তিনি। পা রাখেন তাঁরই ক্লিনিক কাম বাসভবনে। করিডরের বিশাল এলাকায় তিনি ধীরে ধীরে চলতে থাকেন-- তারও পর ভিতরের দিকে পা বাড়ান। এখন তিনি অত হাঁপিয়ে-নীরবে হাঁটছেন যেন দূর্বল হৃৎপিণ্ডের শব্দ গুনছেন। এবার তিনি বাসভবনের দোতলায় বসে কমিটির লিস্টটি পড়তে গিয়েই টের পান যে ভয়, লজ্জা আর শঙ্কা তাঁর কথা ক্রমে ক্রমে ক্রমাগত আটকে দিচ্ছে। তা-ই পরিষ্কার করতে গিয়ে বুঝতে পারেন, তাঁর তামাম বুকপিঞ্জর থেকে যক্ষা রোগীর মতো থোকা থোকা রক্ত ছিটকে পড়ছে। তার তামাম শরীরটি হলদে মগজের মতন, রোদের মতন, কুয়াশার মতন ক্রমাগত গলে-গলে যাচ্ছে। এবং এই ভাবে এক-একটা পালা চলতেই থাকে হয়ত!


লেখক পরিচিতি
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
জন্ম : জন্ম ১৯৬৩। বাজিতপুর। কিশোরগঞ্জ।
গল্পকার। প্রবন্ধকার। সম্পাদকক ঃ কথা।
পেশা : চিকিৎসা।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (জাগৃতি প্রকাশনী),স্বপ্নবাজি ((ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ) কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প (শুদ্ধস্বর)।

উপন্যাস--পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী (মাওলা ব্রাদার্স)।
প্রবন্ধ : কথাশিল্পের জল-হাওয়া (শুদ্ধস্বর)।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন