রবিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৩

শক্তিমতীর শিলান্যাস

রীআ মাহমুদ

শিশিরকণা  বা শৈলবালা যে নামেই ডাকা হোকনা কেন মেয়েটি সত্যিই শ্রীময়ী। শৈল শিখরের এক সাক্ষাৎ শুভেচ্ছা । এমন  শাশ্বত শ্রী  সন্দেহাতীত ভাবে শংসিত । যেন এক সৌম্য শিল্পীর আঁকা শতপত্রী রূপ শোভা  ছড়িয়ে পড়ছে শষ্পে আবৃত  শৈল প্রান্তরে । সেই শ্যামলশয্যায় শতনরি হার কণ্ঠে দুলিয়ে যখন শাদ্বলে শিঞ্জিত হয় তার চরণ তখন শাল অরণ্য শতমুখ হয়ে ওঠে সৌজন্যে । তার শুভশ্রী যেন  শ্রাবস্তীর শিল্প শৈলী ।
অনন্য শিল্পপ্রভায় সমুজ্জ্বল । শ্রুতিমধুতে গুঞ্জরণে মাতে শিলীমুখ । শুন্য কুম্ভ পূর্ণ হয় বার বার শতদ্রুর জলে । মা শতাক্ষি তাকে শেষোক্ত বর দিতে কার্পণ্য করেননিতিনি সত্যই শনাক্ত করলেন  শ্রেষ্ঠাকে । এটা তাঁর যথার্থই শ্রেয়োবোধ । এই শশশাবক সতত চকিতা ।

শঙ্কুপট্ট থেমে থাকার কথা নয় । তাই শম্পাসম এই শাশ্বতী নারী  বেড়ে উঠতে লাগলো শম্বুক গতিতে , শোভনতায় শালীনতায় শৌখিনতায় । মায়ের শঙ্কিল প্রাণে শেল বেঁধে বৈকি ! শত্রুবাহনে দিনে দিনে বেলা বাড়ে । শ্রেয়সী শকুন্তলার শেতপদ্ম রূপের  শমীতে কোনও শ্রীমান যে আহুতি দেয়নি তা  শক্ত করে বলা সম্ভব নয় । তবে শ্রীমতী শঙ্খচূড় । আষাঢ়ে কী শ্রাবণে  মন তার শঙ্খিনী । শঙ্খচিলের মত ডানা মেলে উড়ে চলে শাল বীথির শ্যামলিমায় । কখনো শবলিত শৈবালে তার ছায়া ঘনায় । ধানের শিষ সিক্ত হয় শিশিরে । হৃদিপদ্মে শিখীর নাচন । শিস দিয়ে যায়  দোয়েল সখী ।  একটি কথা সন্তর্পণে বলে রাখি – কোন এক শপ্ত ইতিহাসের শনৈশ্চরের শেকলে এই শারিকার  স্বর্ণ হৃদয় গ্রন্থিত ।

শিবস্বামীর  শনৈ শনৈ শ্রীবৃদ্ধি দেখে  শুভ বিবাহের দিন ক্ষণ ঠিক হল । যদিও শানকিতে শাকান্ন থাকলেই শ্রেয় ছিল ।  লোকে বলে শীর্ষারোহণের আকাঙ্ক্ষায় অকালে পুড়ে যায় শলভ সম প্রাণ । এ বেলায়ও হয়ত তাই হল । এত শীঘ্র যে জীবনটা কণ্টকশয্যা হবে  বোঝেনি সে । কোথায় তার সেই শরণ !  কোথা তার  শালপ্রাংশু স্বামী !  হারিয়ে  গেল তার স্মৃতিময় শারদপ্রভাত । শরদিন্দু রাত । শারদবাসরের স্বপ্ন তাকে সততই শরবিদ্ধ করে । এ যেন এক শেবধি । সযত্ন লালিত সিঁদুররেখা শিরজের অরণ্যে হারিয়ে গেছে গহন রাতে । কোন সে অর্জুনের  রচিত শরশয্যায়  শোকবিধুর হল তার জীবন শিবিকা ! সদা শর্মী  এই সধবা নারীর জীবনে নেমে এলো শর্বরী সঘন । জীবনের গতি হল শ্লথ । জীবন শলতে নিভন্তপ্রায় । শিরে সংক্রান্তি । শাল্মলি বৃক্ষের শল্কলে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল সে । দুচোখ শশব্যস্ত হয়ে কী যেন খুঁজছে । শ্মশান প্রান্তে শেষকৃত্যের চিতাগ্নি । এ কোন অগ্নি শোণিমা !  সহমরণে যাওয়াই ছিল শ্রেয়তর । সতীদাহে পুড়ছে হৃদয় ।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে । অম্বরে শশাঙ্ক বাঁকা । শশিকর আজ বড় অকৃপণ । পূর্ণ দানে আজ সে শতদল । শস্য ক্ষেত্রের বুক চিরে বেরিয়ে এলো  দীর্ঘশ্বাস । দূরে শহরতলীতে শোনা যায় বাষ্প শকটের  ঝিক ঝিক । বনের প্রান্তসীমায় শার্দূলের ডাক শোনা যায় । বৃক্ষ শিখরে শাখামৃগরা শঙ্কিত । সাড়া পেলে বাঘ নির্ঘাত করবে শিরশাতন । শান বাঁধানো ঘাটে এসে বসলো সে । সমুখে শান্ত জল টলমল ।  মনে মনে শান্তিপাঠ করল সে । তবুও কী তার শাপমোচন হবে ! শাপশাপান্তের তো শেষ নেই  শ্বশ্রূ মহলে । শম্বুক মন শঙ্কিত হল । আহা কী বিস্তর শালুক ফুটেছে সলিলে । সলজ্জ বদন। হৃদয়তন্ত্রীতে বেজে চলেছে শাহানার সুর । এ এক অন্য সুর ,  বাসর সানাই অপসৃত । এ যেন প্রকৃতির শুভাশিস জনঅরণ্যে শৌনিক ছল । শিকার আর  শিকারীর খেলা । শরব্যের শেকলে বাঁধছে সকলকে ।
অদূরে বয়ে চলেছে শাখানদী শিপ্রা । এই সেই শিপ্রা ! কে যেন খুঁজতে এসেছিল তার প্রথমা প্রিয়ারে ।

নদীর বুকে শালতিগুলোর আলো টিম টিম করে জ্বলছে ।  অকস্মাৎ  শিবিকাবাহী লোকদের কণ্ঠ স্বননে  বিদীর্ণ হল  শিখরচুম্বী পাহাড়ের শিরস্ত্রাণ । শিলালিপিতে লেখা আছে  শ্রমণদের শ্রুতিলেখা । শুক্লপক্ষ রাতে জীবনের শুশ্রূষা । শ্রমণদের সঙ্গে হেঁটে যায় শিষ্যরা । শুদ্ধ শুচিস্মিত  তাদের অভিব্যক্তি । শিশুতোষ প্রভা  ছড়িয়ে আছে শ্বেতকেতুর  আবক্ষ মূর্তিতে  নিমগ্নশোভায় । শিহরণ জাগে তার ।  কবে আসবে সেই শুভ ক্ষণ ! সবই কী শুভঙ্করের ফাঁকি !  শতরঞ্জি ক্রীড়ায় হার হল তার ।  অঙ্গে অঙ্গে শতপদী জ্বালা । কাকে শুধবে সে ?  চারিদিকে শুনশান নিরবতা । শুকতারা পূর্ব গগনে । গগন শিরীষ ছুঁয়েছে তার গ্রীবা । শিউলী ফুলের মত চোখের তারায় অশ্রুতপূর্ব  বেদনার সঙ্গীত । কালই ঝরে পড়বে শেফালী বিথানে ।  বড়ই শিষ্ট সে বড়ই শ্রান্ত ।

শৈলরাজের  সঙ্গে  গান্ধর্ব বিবাহ হল তার । তার শৌভিক সম্ভাষণে আজও সে আনতা । তার শোণিতে বইছে  শ্রুতিমধুর সেই  মধুক্ষরা ডাক ‘শ্রীময়ী । আমার শিশুমাতা শ্রী’  । শ্রবণে বাজছে তার শ্রেয় কথন । হা আমার শব্দ ইশ্বর !  ঐ তো  শামাদানে জ্বলছে দীপ ।  আজ সে দূর দ্বীপবাসিনী ।  শৈলপতি  তার জীবনে ছিল  একমাত্র শ্লাঘা । শ্বেত দ্বিপে উপবিষ্ট হয়ে সে এসেছিল বাসর শয়ানে । শ্রীমতীর হাতে ছিল শ্বেত পাথরের থালা । শ্বেত উত্তরীয় উড়ছিল হাওয়ায় । শ্যামা মেয়েরা গাইছিল  শ্রবণমুগ্ধ সঙ্গীত । শান্তি জল  ছিটিয়ে দিচ্ছিল বর্ষীয়ান সখীরা । একটি শৌক্তিক অঙ্গুরী  পরিয়ে দিয়েছিল শৌভিক  তার অনামিকায় ।  কে জানত শ্বাপদসঙ্কুল  গৃহেই আজ সে শরণাগত ।  শিউরে উঠল সে শান্তিপ্রিয় স্বামীর আকস্মিক শ্রথনে । যদিও শঠ শুম্ভ নিশুম্ভ শ্রীঘরে গেল সত্ত্বর ।  কিন্তু সেতো নিরাশ্রিতা , শিঙ্গার রিক্তা ।

আজো ভোলে নি  সে  শ্বাপদের শ্যেন দৃষ্টি ।  শ্যামা পাখির শিথিল শীৎকারে  সচকিত হল শারিকা ।
শিবনেত্রের সঙ্গে মিলন হয়েও হলনা ।  শুন্যলোকের সাথে শুভদৃষ্টির বিনিময় হল ।  শ্বেতপদ্ম বা শুক্ল পক্ষের চাঁদ এখনো তার  শুভার্থী তাদের শুভ্রতা তাকে শান্তি বর্ষণ করে ।  তারাই তার শুলঘ্না ।

জীবনের শেজবাতি  কী সত্যি নিভে গেল !  স্মৃতিতাড়িত  মনে যত তাড়াতাড়ি বিস্মৃতি আসে ততই মঙ্গল । কথায় আছে  শুভস্য শীঘ্রম ।  শুভ লগ্নে তো  শুভমিতার  সঙ্গে শুভ দর্শন হয়েছিলো ।  শিশ মহলে নাইবা থাকা হল ।   চোখের শার্শিতে জমে উঠল শিশিরাশ্রু ।  সাধিত যৌবন তার শিয়রে শমন ।

এ যেন শাঁখের করাত । শিরদাঁড়া  সোজা করে দাঁড়াতে হবে ।  শক্তি হল নারীর শিথানে শীর্ষ  মহিমা ।  শিলোঞ্ছ করে থাকা মানে  শূলাসনে থাকা ।  দুঃখকে শিখণ্ড করে থাকা তো  শাঁস কথা নয় ।

এ যে শিকস্ত ।  শাস্ত্রে কম দৃষ্টান্ত নেই । মুহূর্তে জ্বলে উঠল এক আলোক শিখা । শিমুলরাঙা দৃপ্ত শপথ শাখাচ্যুত ফলের মত ঝরে পড়ল শরমে  আনতা  নারীর যত দ্বিধা । নীবিবন্ধে  জড়িয়ে নিল শাড়ি দ্রৌপদীর । শাণিত হল তার ধী শক্তি । এইতো শ্বেতভুজার  আশীর্বাদ । একমাত্র শস্ত্র । অন্যায় শাসন কিংবা শোষণে  নতশির  হবেনা সে কোনদিন ।  সাহস তো শিকে ছিড়েঁ পড়বার ধন নয় ।  সেতো শতাক্ষির মানসপুত্রী । অসুর নিধন করে শতাক্ষি পেয়েছে  সর্ব শ্রেষ্ঠ  শিরোপা । এ শিরস্ক সকল নারীর ।

শময়িতা  মা আমার শতায়ু হোক শত্রুঘ্ন ।  শিখরবাসিনী  শিবপ্রিয়া  শমন ভবনে পাঠিয়ে দাও  শত্রু পক্ষকে । শমিকাঠে  জ্বলছে  তার শতহ্রদা চিত্ত ।  ভাঙছে স্বপ্ন , ভাঙছে শাঁখা ।  শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে , চারিদিকে জয় শঙ্খ বাজছে ।  আজ এই সবলা  নারীর জীবনে রচিত হবে শক্তিমতীর  শিলান্যাস ।*


-----------------------------------------------------------------------------------------------


লেখক পরিচিতি
রীআ মাহমুদ

জন্মস্থান : খুলনা। বেড়ে ওঠা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এস এস।
বর্তমান নিবাস : ধানমণ্ডি, ঢাকা।


প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : পাখির পালকে আগুন (সময় প্রকাশনী, যদি প্রেম দিলে না প্রাণে (পত্র উপন্যাস, ম্যাগনাম ওপাস), 
স্বপ্নের ছবি ও কবিতা।



-----------------------------------------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন