রবিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৩

যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার -

ফয়সল আদনান

খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা। বুয়েট ফুঁসছে, ঈশান নামের একটা ছেলের হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে কিছু রাজনৈতিক পশু। আমার ছোট ভাই পড়ে বুয়েটে, ভীষণ অস্বস্তি আর ভয় নিয়ে বসে আছে, কি হতে যাচ্ছে। বুয়েটে আমি পড়িনি, পড়েছি চুয়েটে, সেখানে এক বছর পলিটিক্স করা হয়েছিল বেশ এক্টিভলি, মারামারি, ক্যাডারগিরিসহই।
খুব ভাল করেই তাই দেখা হয়ে গেছে মুদ্রার ঐ পিঠ। আমাদের ছাত্র রাজনীতি আমাদের ছাত্রদের  পশু বানাচ্ছে, আমর পশু হয়ে উঠছি, নিজেদের অজান্তেই। আর তাই এই পাশবিক আর্তনাদও আমাদেরই, যারা এখনো ছাত্র রাজনীতি টিকিয়ে রাখার পক্ষে বলবেন, তাদেরকে তাই লম্বা সালাম, দূরে থাকুন।

একটু আগেই আবার পড়লাম, কুয়েটে ফিস্টের টাকা মেরে দিয়েছে ছাত্রলীগের কুলাঙ্গারেরা। তার প্রতিবাদ করায় তারা বেধড়ক পেটাচ্ছে সাধারণ ছাত্রদের। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে একজন।

সেদিন চুয়েটের কিছু ছোট ভাই এসেছিল আমার কাছে, তাদের মুখ থেকে শুনলাম, চুয়েটের সোনার ছেলেরা নাকি আজকাল হল ডাইনিং থেকে প্রতি মাসে চাঁদা নিচ্ছে দু হাজার করে। ক্যাম্পাসের বাইরে ইয়ে যেসব ট্রাক যায়, তাদেরও নাকি চুয়েট গেটে টাকা দিয়ে যেতে হয়। অসাধারণ, এরাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এরাই মেধাবী, এরা ঈশানের হাত ভাঙবে, সহপাঠীর মাথায় রড মেরে মেরেই ফেলবে, খুন করবে, ধর্ষণ করবে চাঁদাবাজি করবে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখবো, চুয়েট বুয়েটে আমি নিজের চোখে দেখেছি, পরীক্ষার হলে কথা বলার মত অপরাধে দুই বা এর অধিক সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার করে দিতে, কিন্তু আজকে ঈশানের হাত ভেঙ্গে দেওয়ার মত অপরাধে শাস্তি হয় ৬ মাসের সাময়িক বহিষ্কার। এই ভিসি প্রো ভি সি কে কেন জ্যান্ত পুতে ফেলা হয় না, ন্যূনতম নৈতিক স্ট্যান্ড যাদের নাই, তারা কেনা আমদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর অভিভাবক।

এইসব প্রশ্ন অনেক উঠেছে। উত্তরতো সবারই জানা। আমরা খুব আশঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করছি, এই ছেলেগুলোর উপযুক্ত শাস্তি হবে না। এরা আবার চরে খাবে ক্যাম্পাসে, আমার ভাইটার ঘাড়ে কোপ দেবে রাম দা দিয়ে, আমার বোনটাকে সনির মতই গুলি করে মেরে ফেলবে, আমরা আক্রোশে হাত কামড়াবো, আমার মা কেঁদে ভাসাবে। আমরা কি এতই অসহায়? এতই?

যদি না হই, তবে হয়ত এখনি সময় জেগে ওঠার, সব ক্যাম্পাসের সকল সাধারণ ছাত্রছাত্রী জেগে উঠুক, আমরা মার খেয়েছি অনেক, মাথা গুজে পড়ে থেকেও, এবার যদি মার খাই, তবে যেন মাথা উঁচু রেখেই খাই। হয়ত আমাদের একটা মেরুদণ্ড আছে, হয়ত আমরা সেটা অনুভব করতে পারি, হয়ত।

আমি কি দিবাস্বপ্ন দেখছি। এমন কি অসম্ভব কিছু বলছি। এটা কি একটা ভ্যালুলেস ফেসবুক নোট, হতে পারে, কিন্তু যাদের একটু হলেও আমার মত রাগে গা জ্বলছে, কিছু একটা করার জন্য বুকের ভেতর ছাইচাপা আগুন জেগে উঠছে তাদের জন্য


                                                              যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে.
                                                             পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে।


আপডেটঃ বুয়েটের সর্বশেষ খবর এখন সবাই জানেন বোধকরি, সাধারন ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ন আন্দোলন অতঃপর সফলতার মুখ দেখেছে, অভিযুক্তদের যথোপুযুক্ত শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু এই আন্দোলন কি এখানেই শেষ। বুয়েটের ছাত্রছাত্রীরা তাদের অধিকার আদায় করে নিয়েছে, তাদের সম্মান রক্ষা করেছে, চুয়েটে যা হচ্ছে, বা কুয়েটে যা হয়ে গেল, যেরকমটা অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে, তার প্রতিবাদ কখনোই সাধারন ছাত্রছাত্রীদের মধ্য দিয়ে এভাবে হয়নি। এই সাধারন ছাত্রছাত্রীদের আমার মাঝে মাঝে অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে ইচ্ছে হয়, জাতি হিসেবে আমাদের মানসিক দারিদ্রের লক্ষন এখন বোধহয় এদের দিকে তাকালেই দেখা যায়। আত্মকেন্দ্রিকতার চূড়ান্ত। কি হবে গ্যাঞ্জাম করে, এদের শক্তির সাথে পারা যাবে না, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমরা আমাদের মা বাবার বাধ্য সন্তানেরা কোনরকমে ডিগ্রীটা বাগিয়ে বের হতে পারলেই খুশী। শুধু আমার ঘাড়ে এসে কোপ না পড়লেই হয়।


সমস্যার মূল আরো গভীরে প্রোথিত। যেই ছেলেমেয়েগুলো এভাবে মুখ গুজে পড়ে থাকছে, যদি সুযোগ থাকত, আমার কেন জানি মনে হয় এরাও একেকটা পশু হয়ে উঠত, ইশানের মত আর কারো পা ভেঙ্গে আনন্দ নৃত্য করত, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এসবতো আছেই। যদি তা নাই হত, তবে এরা ছাত্রলীগ, দল বা শিবিরের এই বর্বরগুলোর এমন সব বর্বরতা মুখ গুজে সহ্য করত না, বরং প্রতিবাদে ফেটে পারত বুয়েটের এই অসাধারন ছেলেমেয়েগুলোর মত।

আর তাই শেষবেলায়, একটা কথাই ভাবছি, এমন কি হতে পারে না, এই দূর্বল, ঊটের জীবন যে ছেলেগুলোর তারা মুখ গুজে পড়ে নেই, তারা পিঠ সোজা করে দাড়িয়ে গেছে, এতদিন যে ছেলেগুলোর ভয়ে অসহায়ের মত মাথা নিচু করে হেটেছে, তাদের সামনে গিয়ে মাথা উঁচু করে তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে।

আমি স্বপ্নবাজ মানুষ। সুখস্বপ্ন দেখতে চাই, ভাল লাগে। আমি একটা স্বপ্ন দেখছি। বাংলাদেশের সব ক্যাম্পাস থেকে একে একে অবাঞ্ছিত হয়ে গেছে এই বর্বরগুলো, পথটা অনেক বন্ধুর, অনেক বাধা আসবে। কিন্তু বুয়েটের এই ছেলেগুলো যদি পারে আর সবাইও নিশ্চিত পারবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন