রবিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৩

শরীর । শরীর

 সাগুফতা শারমিন তানিয়া

জুলাই মাসের এক অসহ্য গরম সকালে বহুক্ষণ নিজের ঘরের মেঝেয় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ফ্যান্সীর ছোটকাকা পাগল হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে সে দাঁড়িয়েছিল বহুক্ষণ। আগের রাত থেকেই।
     ফ্যান্সী গানের স্কুলে যায়, ন্যান্সী যায় নাচের স্কুলে। সকালবেলা ফ্যান্সী তার হারমোনিয়ম নিয়ে একঘন্টা রেওয়াজ করে।

রাগ খাম্বাজ সুনাও সাখীরি মোহে
সব্‌ সুর শুদ্ধ অওর নি কোমল কর...
লক্ষণগীত শিখছে সে।
বিলাবল। কাফি। ভৈঁরো। ইমন। তোড়ি।

প্রথমে কিছুক্ষণ ক্লাসিক্যাল, তান-স্বরবিস্তার, তারপর স্বরলিপি দেখে দেখে- ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি
ফ্যান্সী যখন ‘উলসিত তটিনী’ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তখন হঠাৎ তার ছোটকাকার চোখে গরমের সকালের সূর্যটা তুষারমন্ডের মতো শাদা হয়ে এলো। আর সোনালী হলোনা।
বুয়া এসে আবিষ্কার করলো তাদের ছোটকাকা কামরার মাঝখানে ফ্যান্সীর মায়ের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে।

এইবেলা বলে রাখা ভালো, ফ্যান্সীর ছোটকাকার নাম ‘ফ্যান্সীর ছোটকাকা’ না। তার একটা ভালোনাম আছে। একটা ছদ্মনাম আছে। সেই ছদ্মনামে সে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করতো। এবাড়িতে একদিন চিঠি এসেছিল, মেয়েলি হাতের লেখা, প্রাপক ‘পল্লব পারিজাত। ফ্যান্সীর দাদাজান বেঁচে থাকলে শাহ আলমকে খড়মপেটা করতেন। দাদাজান বেঁচে নাই এইটা একদিক থেকে ভালো হয়েছে।

ফ্যান্সী-ন্যান্সীর ছোটকাকার নাম তাহলে শাহ আলম (মোগল সম্রাট শাহ আলমের নামে, সম্রাট শাহ আলম/দিল্লি সে পালম!), ডাকনাম দিলু। ফ্যান্সীদের বুয়ার নাম পারুল বেগম। পারুল বেগম খুব পরিপাটি কাজ করে, তার মাথা ঠান্ডা এবং সে দ্রুত চিন্তা করতে পারে। পাড়ার ডাক্তারখানার কম্পাউন্ডারকে সেই ডেকে আনলো। কম্পাউন্ডার নুরুল কেবল প্রয়োজনে সুঁই দিতে জানে, ফ্যান্সীর ছোটকাকার কান্ড দেখে তার হাতপা ঠান্ডা হয়ে এলো। ঘরময় হামাগুড়িরত শাহ আলমকে ছাদের ঘরে আপাততঃ বন্ধ রাখার বুদ্ধিটাও পারুলবুয়ার মাথায়ই প্রথম এলো অবশ্য।

ফ্যান্সী-ন্যান্সী সেদিন স্কুলে গেলোনা। তাদের মায়ের নাম মঞ্জু, মঞ্জুর সেদিন বাড়িওয়ালার ছেলের সাথে সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা। সিনেমার নাম দূরদেশ।মঞ্জুর সেদিন ‘দূরদেশ’ দেখা হলোনা। মেয়েদের বাবা আসছেন পরের মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই। অতএব মঞ্জু ট্রাংকল করলোনা।

দিলুর বড়ভাই আসার আগ পর্যন্ত দিলু ছাদের ঘরেই বন্দী রইলো। ছাদটা ছিল দিলুর খুব আপনার।
মরসুমের আচার-লেবুর জারক-আমসত্ত্ব ইত্যাদি রৌদ্রে তেতে উঠতো।
ছোটবড় কিছু গাছ ছিল ছাদে। গোলাপ। বেলী। ঢেঁড়স। থানকুনি।
কার্নিশে প্রায়ই জেগে উঠতো নয়নতারা। কেউ সাধ করে লাগায়নি- তবু চারাগাছটা ভরে উঠতো সন্ধ্যাকাশ রঙের ফুলে।

দিলু ছাদে পায়চারী করতে করতে পড়া মুখস্থ করতো। ক্যারোলাস লিনিয়াস কেন একটা ফুলের নাম ক্লীটোরিয়া দিয়েছিলেন, তা মনে করে আপনমনে হাসতো। বটানির ছাত্র ছিল সে।
আশ্বিন-কার্তিক মাসে দুরন্ত মঞ্জু সেই ছাদে ঘুড়ি ওড়াতো। ঘুড়ি কিনে আনতো দিলু।
ফ্যান্সী সিনেমার গান করতো আর ন্যান্সী নাচতো।

শীতের সময় পারুলবুয়া সেই ছাদে মাটির চুলায় পিঠা বানাতো। মুগপাকন। চন্দ্রপুলি। আন্দোশা।এলোকেশী।
অত আনন্দের স্মৃতিময় ছাদে স্মৃতিভ্রষ্ট দিলুর বন্দী থাকতে কেমন লেগেছে তা আমরা কেউ জানিনা। জানার কোন উপায় নেই।

ফ্যান্সীর আব্বু আসবার আগে ফ্যান্সী আর একটা নজরুলগীতি শিখে গেল--
কানন গিরি ও সিন্ধুপার / 
ফিরিনু পথিক দেশ-বিদেশ

দিলুর বড়ভাই বাহরাইন থেকে অনেক খরিদসমেত বাড়ি ফিরলেন। এবং ঘাবড়ে না গিয়ে দিলুকে মিরপুরের একটা পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে এলেন। দিলু সেখানে সিগারেট খাওয়া শিখে-বাগানের গাছের গোড়ায় খুরপী চালিয়ে গুপ্তধন খুঁজে- পাশের খাটের লোকটাকে যে শকুনের মাংস খাইয়ে তার স্ত্রীই পাগল বানিয়ে ফেলেছে এইসব বিশ্বাস করে দিব্যি দিন কাটাতে লাগলো।

মঞ্জুর দিন কাটলো স্বামীর প্রিয় পদগুলি রান্না করে।
চাপিলা মাছ ভাজি। কচি শসার ডাল।কবুতর ভুনা।

ফ্যান্সীদের আব্বুর স্বাস্থ্য আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। বিয়ের সময় তাকে দেখে মঞ্জুর মোটেই পছন্দ হয়নি। (মঞ্জু নিজে ছিল ডাকের সুন্দরী- রূপকথার রাজকন্যার মতো ঝিলমিলে চোখ- এই লম্বা চুল! আর কোথায় তার পাশে একটা উই-ধরা চেহারার ঢলঢলে শার্ট-প্যান্ট পরা লোক!)

তবে আর সব কিছুর মতোই সে পুরো ব্যাপারটা গ্রহণ করেছিল শান্তভাবে। যেভাবে মানুষ গ্রহণ করে নিজের পূর্ণনাম, পিতামাতার মুখ, সহোদর, জন্মপরিচয়- অনেকটা সেভাবেই। স্বামী। তার অভ্যাস। তার পরবাস। দু’টি যমজ শিশু।
ফ্যান্সী হারমোনিয়ম বাজিয়ে গায়- ‘আলমপিয়া রহে কৌন্‌ বিদেশভা/কাগুয়া তু যা যারে লাও সন্দেশভা’ ।
কাক ডাকে ঠা ঠা দুপুরে।
মঞ্জু জানালায় দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে যায়।
ঘুড়ির সুতো মাঞ্জা দেবার জন্যে কাঁচ গুঁড়ো করে।
মাড় জ্বাল দেয়।
তার নিস্তরঙ্গ দিন কাটে এভাবেই। যতদিন না ফ্যান্সী-ন্যান্সীর বাবা আসে!

আসলেই কি তাই? মঞ্জুর অঢেল প্রাণশক্তি- তার নিটুট স্বাস্থ্য-তার কলংকময় প্রগলভতা এবাড়ির দেয়াল ছাপিয়ে উঠেছে কতবার! দিলু, তার প্রাণের বন্ধু বলতো-“তুমি প্রাণী না, তুমি আসলে উদ্ভিদ- গাছপালা-লতাপাতা। এদিকে ছেঁটে দিলে ওদিকে গজিয়ে ওঠো, তোমার বাইনমিয়াল নমেনক্লেচার করা লাগবে!”

মঞ্জু হাসতো। তার ব্যাকরণহীন জীবন- তার ছাঁচবিহীন মাতৃত্ব- এইসব তাকে ভাবাতোনা মোটেই। তবে ভোগাতো।
দিলুর বড়ভাই সেই লোকটা- যাকে আমি-আপনি অজস্রবার দেখেছি
বাসস্ট্যান্ডে-
পোস্ট অফিসে-
ফেরীঘাটে-
টি হাউজে কিংবা বিক্রমপুর লন্ড্রীর সামনে।
যাকে দেখলে কেউ আমূল চমকে ওঠেনা।

নারীশরীরের সৌন্দর্য যাকে একই সঙ্গে লোলুপ এবং ভয়ার্ত করতে পারে। অতএব, মঞ্জুকে তার স্বামী ভালবেসেছে কেবল শরীর-শরীর খেলবার সময়।

বাকিটা সময় শাসন করেছে। দন্ডবিধান করেছে- কার্যকর করেছে।

অতএব, মঞ্জুর যে দিন কাটে প্রবাসী স্বামীর পথ চেয়ে- এটা সর্বৈব মিথ্যা। তার দিন কাটে বন্ধুত্বপুর্ণ পরিবেশে। সেখানে মিত্র দিলু। প্রাণসখী পারুল। (হয়তো মেয়েরাও তার সখী। নাচিবি ঘিরি ঘিরি গাহিবি গান।)

স্ত্রী হিসেবে তার অক্ষমতাগুলি সম্পর্কে সে সচেতন নয়। কখনো ছিলনা। গৃহকর্মে সে ছিল অপটু, মঞ্জুর রান্না ঠিক অখাদ্য নয়, আহামরিও নয় (রাঁধে মূলতঃ পারুল বেগম), মঞ্জু তেমন মনোযোগী মা-ও নয়। তার মেয়েরা ইস্কুলের ড্রেস্‌ পরে বাকি বেলা কাটিয়ে দেয়- লাল ফ্রকের নিচে আকাশি শেমিজ পরে...মঞ্জু কিচ্ছু বলেনা। মঞ্জু অনেকসময় খেয়াল করে ঘুমের ভেতর ন্যান্সীর দাঁত কিড়মিড় করছে- কিন্তু সকালবেলা সে পারুল বেগমকে ‘কিরমি’বন্ধ হবার ওষুধ কিনতে ফার্মেসীতে পাঠাতে ভুলে যায়।

এইখানে আপনি আশা করতে পারেন- মঞ্জু হয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখে কিংবা হয়তো বিয়ের আগে সে গান গাইতো- (বিয়ের পর ছেড়ে দিতে হয়েছে) কিন্তু দুঃখের বিষয় মঞ্জুর এমন কোনও সঙ্গোপণ জীবনই নেই, সে বিনষ্ট সম্ভাবনা নয়। সে যা তাই- প্রকাশ্য। নির্লজ্জ রকমের সুস্থ। ঘাসের শীষের মতো জন্মস্বাধীন- বাহারহীন-নির্বিশেষ। (ধরার খুশী ধরে না গো/ঐ যে উছলে...)

ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে দিয়ে মঞ্জুর বিয়ে হয়ে যায়। তার স্বামী তাকে নেড়েচেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যায় বাহরাইন। আসন্ন পরীক্ষার বিভীষিকা মাথায় করে মঞ্জু মুমূর্ষু শাশুড়ির দেখভাল করতে এবাড়িতে আসে। দিলু খুব উৎসাহ নিয়ে মঞ্জুকে টেস্ট পেপার সল্‌ভ্‌ করায় ক’দিন। রচনা লিখে দেয় ‘একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা’। পরীক্ষা দেবার বলপয়েন্টগুলি লিখে লিখে তরতরে করে রাখে।

কিন্তু সব আয়োজন ব্যর্থ করে দিয়ে মঞ্জু ইংরেজীতে ফে’ল করে, আর আবিষ্কার করে তার সন্তান সম্ভাবনা। এই হচ্ছে মঞ্জু। এই টুকুন-ই।

কখনো তার উচ্ছলতা করতালির মতো দিলুর ভেতর বেজেছিলো কিনা, কবি ‘পল্লব পারিজাত’ কখনো মঞ্জুকে নিয়ে কোনও লিরিক/লিমেরিক মক্‌শো করেছিলেন কিনা- তা আমরা জানিনা।

প্রবাসী স্বামীর চিঠি এলে মঞ্জু ভয়ে অস্থির হয়ে উঠতো। যেন কোতোয়াল এসেছে শমন্‌ নিয়ে। মঞ্জুর হাতের লেখা ছিল বাজে, বানান জ্ঞান প্রায় আদিম। মজার বিষয়- দিলুর বড়ভাইয়ের চিঠির উত্তর আসলে লিখতো দিলুই। চিঠিতে ‘সঞ্চিতা’ বা ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে কোটেশন্‌ দিতো সে, মঞ্জু হাসতে হাসতে মরে যেতো। চিঠি পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো বাহরাইন।

এতোক্ষণে তাহলে ধরেছেন ঠিক, মঞ্জু ছিল মঞ্চনায়িকা।
নেপথ্যে অনবদ্য খেসারির ডাল দিয়ে কচি লাউ রাঁধতো পারুল বেগম।
নেপথ্যে চিঠি লিখতো দিলু।
দিলুর বড়ভাইয়ের জন্যে আমারি রীতিমত মায়া হচ্ছে।

আচ্ছা, দিলুর কথা বলি।শাহ আলম থেকে ‘পল্লব পারিজাত’ হতে গিয়ে যে হঠাৎ মূককীট দশায় বন্দী হয়ে রইলো।
দিলু ছিল সকলের মিত্র। কলরবহীন। গভীর। ভীরু।

ভাইয়ের ছোট্ট মেয়েদের এলোচুলে বিকেলবেলা সে আড়াবেনী বেঁধে দিতো।
আগেই বলেছি ভাইয়ের জন্যে প্রেমপত্রও লিখতো সে।

ছুটির দিনে সে টিউশানির পয়সায় মরশুমের আমড়া-লুকলুকি-কয়েতবেল ইত্যাদি কিনে আনতো মেয়েদের জন্যে।
পারুল বেগমকে গফরগাঁও আনা-নেওয়া করতো সে।
আর ঘুড়ি উড়াতো মঞ্জুর সাথে।

দিলু তার ভাইকে ভালবাসতো। পাশের ঘর থেকে সে শুনতে পেতো লোডশেডিং এর অন্ধকারে তালপাখার হাওয়া খেতে খেতে তার বড়ভাই মধ্যপ্রাচ্যের কমলাফুলি লেমোনেড খাওয়ার বিবরণ শোনাচ্ছে।গরম মশল্লায় গোলাপজলে সেদ্ধ মাংসে  কেমন থরে থরে সাজানো হয় সবুজ পুদিনা আর রুবীর দানার মতো আনার দানা। দিলু প্রায় নিশ্চিত জানতো অর্ধাহারীর চোখে দেখা সেই ভোজ্য-বর্নাঢ্যতায় মঞ্জু একটুও কান দিচ্ছেনা। সে সেফটিপিন্‌ দিয়ে মাড়ির দাঁতের গর্ত খোচাচ্ছে, ঘুমে জড়িয়ে আসছে তার চোখ।ভাইয়ের জন্যে মমতায় দিলুর প্রায় গলাবন্ধ হয়ে আসতো।
এই দিলু রি-হ্যাবে গিয়ে মানুষের কি সেবাই না করছে।

ঘুম থেকে জেগে উঠে কেউ পিপাসায় আইঢাই- দিলু হাজির পানির গ্লাস নিয়ে।

কেউ হাউমাউ করে প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতায় কাঁদছে- দিলু তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আছে।
দিলুর বড়ভাই তাকে দেখতে এসে এক ঠোঙা কমলালেবু দিয়ে গেছে- দিলু সবাইকে ডেকে কমলা খাওয়াচ্ছে।
পাশের খাটের লোকটার শার্ট ছিঁড়ে গেছে মারামারি করতে গিয়ে, বোতাম লাগাচ্ছে দিলু, রিফুকর্ম দিলু।

যে লোকটাকে তার স্ত্রী শকুনের মাংস রেঁধে খাইয়ে পাগল করে ফেলেছে- তার হাতপা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। দিলু তার জখমে হাত বুলিয়ে দেয়, ঘামাচি গেলে দেয়। লোকটা নিচু গলায় তার স্ত্রীর শরীরের নিখুঁত বর্ননা দেয়- দিলুর খুব লজ্জা করে- তবু সে মন দিয়ে শোনে। পাছে লোকটা কিছু মনে করে-
কেন্দ্রের একপাশে কাঁটাতারের বাইরে ছিল ক্ষেত।
হল্‌দে হয়ে আসা উদলা মাটি।
একমুষ্টি কলাইশাক।
মাঠের মাঝখানে একটা বড়সড় খেজুরগাছ।

একটা ডুমুর গাছ (তার সারা কান্ড ফুঁড়ে লিঙ্গচিহ্নের মতো গজিয়ে উঠছে অজস্র ডুমুর)।
রৌদ্রের দিনে ঐমাঠটুকু থেকে জংলী ঘ্রাণ এসে ভরে উঠতো দিলুর জানালা, নীল বাটির মতো গোল আকাশ, ঘরের ভেতর আকছার ঢুকে যাওয়া ডুমো ডুমো মৌমাছি, মাঠের বাঁশী- এইসব কি ‘পল্লব পারিজাত’কে নাড়া দিতো?
কিংবা দিলু কি উদাস হয়ে ভাবতো- গতবার এই সময়ে পারুল বেগম একদিন আলু-আর পেঁয়াজ দিয়ে দুর্দান্ত ডুমুরের তরকারী রেঁধেছিল!

এইসব জানার কোনো উপায় নেই। রি-হ্যাবের দিলু বেগুনী মুখ করে কোনো অদেখা নারীর স্তনের বিবরণ শুনছে।
এবারের ছুটিতে এসে দিলুর বড়ভাই প্রায় সময়ই মনমরা রইলো।মেয়েদের পড়তে বসিয়ে চড়চাপড় মারতে ভুলে গেলো। নির্দিষ্ট সময়ে ছুটি ফুরালে সে কাপড়চোপড় গুছিয়ে সোনালী স্যুটটা পরে চলে গেলো।
মঞ্জু ঠিক হৃদয়হীন নয়। তবে সে দিলুর জন্যে শোক করতে শুরু করলো স্বামী যাবার পরে।
এইবার তার মনে হতে লাগলো সে একলা। অরক্ষিত। বন্ধুহীন। শ্বাপদবেষ্টিত।

মেয়েরা কলরব করে একে অন্যকে বলে- “ভ্যাঙ্গাইলে ব্যাঙ খায়/মরা গরুর ঠ্যাঙ খায়” কিংবা হেসে লুটিয়ে পড়ে যখন “বেত গেলো ভাইঙ্গা/স্যার দিলো কাইন্দা”- মঞ্জু বিরক্ত হয়ে ভাবে চারদিকে এতো শব্দ কেন?

সন্ধ্যার আকাশ টনটনে আনারদানার মতো লাল হয়ে আসে- ছাদে বসে মঞ্জুর কেবলি কান্না পেতে থাকে।
সিনেমা পত্রিকার রোজিনা-শাবানা-জসীম-ওয়াসিম-অলিভিয়া তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
সংসারের এই উদভ্রান্ত দশা দেখে পারুল বেগম একদিন ফ্যান্সী-ন্যান্সীকে একত্র করে বলে- এইটা তাদের ঘোর বিপদের সময়। এখন তাদের ইয়েলো বার্ডস এর নীলুর মতো সংসারের হাল ধরতে হবে। (মেয়েরা ইস্কুলে ‘হলুদ পাখি’ এবং স্কাউটদের কর্তব্য শিখছে সম্প্রতি।)মাকে সাহায্য করতে হবে। ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ। আগেই বলেছি পারুল বুয়ার মাথা খুব ফর্সা। ফ্যান্সী-ন্যান্সী ‘হলুদ পাখি’ হিসেবে মায়াবৃক্ষের কাছে শপথ করেছে না? (আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে খোদা ও দেশের প্রতি আমি আমার কর্তব্য পালন করিবো। প্রত্যহ অন্যকে বিশেষ করিয়া ঘরের কাজে সাহায্য করিবো।)পারুল বুয়া সে গল্প শুনেছে। অতএব মেয়েরা খুদে খুদে গোল মুঠিতে বেছে তুলতে লাগলো চাল-ডাল। বুয়ার মাথার পাকা চুল তুলে দিতে লাগলো।

মঞ্জু অবিলম্বে টের পেলো- সে গর্ভবতী। তার যন্ত্রনার সীমা রইলোনা। সে মনে করতে থাকলো-যমজ শিশু পেটে থাকা অবস্থায় দিলু তার কি সেবাটাই না করেছে। যখন যা খেতে মর্জি হয়েছে- কাঁচা টমেটো ভর্তা, তেঁতুল, আইসক্রীম...দিলু যোগাড় করে দিয়েছে। অতএব মাতৃহীনা মঞ্জু ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে। ফ্যান্সী-ন্যান্সী আরও বেদম বেগে ঘরের কাজে পারুল বেগমকে সাহায্য করতে থাকে।

মঞ্জুর গর্ভকালীন দিন কাটলো অলস, নতুন ভিসিআর এ ছবি চালিয়ে চালিয়ে। জিতেন্দ্র। জয়া প্রদা। মিঠুন। শ্রীদেবী। অনীতারাজ। কাদের খান। অমরেশ পুরী। (মেয়েরা একসাথে দেখলো- আননুকা বন্ধন...ঐ রামের সুমতি আর কি!)
আচ্ছা, মঞ্জু টিভি দেখতে ভালোবাসে।
চৌকো একটা বাক্সের ভিতর কত না ভোজবাজি।
চিরবসন্ত স্থির হয়ে আছে সেখানে।
গাছে গাছে গোলাপফুল, সবুজ ঢাল বেয়ে চুমকী-জরির ঘাগরা পরে দৌড়াদৌড়ি।

ফ্যান্সী যখন হারমোনিয়ম বাজিয়ে গাইতে শিখেছে- ‘কানহা মোহে আশাবরী রাগ সুনাভে’ আর ন্যান্সী নাচতে শিখেছে ‘মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে’ সেইরকম একদিন মঞ্জু ‘ফরিদা-ক্লিনিক’ এ গেলো। ফিরে এলো দিব্যি মোটাসোটা একটা ছেলে কোলে করে।

এইবার জীবনে প্রথম দিলুকে ছাড়াই মঞ্জু স্বামীকে চিঠি লিখতে বসলো।দিলুর বড়ভাই এর বড়ো শখ ছিল ছেলের। দিলুর বড়ভাই এই খবরে আশ্চর্য হলোনা। মগ্ন হয়ে চিন্তা করতে করতে, আধা মাতাল অবস্থায় প্রলাপ বকতে বকতে, কিংবা প্রবাসে নেহাত সর্দিজ্বরে ভুগতে ভুগতে এই সম্ভাবনার কথা সে বহুবার ভেবেছে।

সেবার কার্তিকমাসের সন্ধ্যাবেলা কত্তো খবরের কাগজরঙা মথ গোত্তা খেলো মঞ্জুদের কাঁচের শার্সিতে-
শীতের চোরা আভাস ছিল বাতাসে-
পারুল বেগম সেদিন কেন জানি পিঠার চাল ভিজিয়েছে।

রেডিও চালিয়ে শাহনাজ রহমতুল্লার গান শুনছিল মঞ্জু আর ছোট্ট শিশুটির গায়ে তেল মালিশ করছিল। (মেয়েরা ছোট্ট থাকতে পারুল বেগম মালিশ করতে দিয়েছিল নাড়ুর তেল-মালপোভোগ ভাজার তেল- তাতে মেয়েরা পরবর্তীতে নির্লোম হয়। এ তো ব্যাটা ছেলে- এর জন্যে তাই সরিষার তেল। নির্লোম হবার ঝামেলা তো এর হবেনা কখনো...)
সেদিন সন্ধ্যাবেলা কোনো জানান না দিয়ে হঠাৎ করেই মঞ্জুর স্বামী এসে হাজির। কার্তিকমাসের বেলা ফুরিয়ে আসছিল দ্রুত-
বাতাসে ভাপের মতো কুয়াশা-
একপশলা বৃষ্টি হবার পরে একটু রোদ উঠেছিল- তাও কালকাসুন্দ গাছেদের মগডালে জড়ানো।
পাশের বাড়ির উমামাসী ধুনো জ্বেলেছেন, চোখ জ্বলছিল মঞ্জুদের।
মশার উৎপাত বেড়েছে, দেয়াল ছেয়ে ফেলেছে দেওয়ালি পোকা-
মঞ্জুর ছোট্ট ছেলে ঘুঘুর মতো সুর তুলে তুলে কাঁদছিল।

জানালায় দূরে মসজিদের গম্বুজে চিন্নিটিকরির চাঁদ-তারা-আনারস শেষবেলার রৌদ্রে ঝলসাচ্ছিল।

     বাড়িতে একটা খুশীর ঢেউ উঠলো- ফ্যান্সী ন্যান্সী চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। তাদের আব্বু তাদের জন্যে পুতুল-চকোলেট-ফ্রক এইসব অনেককিছু এনেছেন। মঞ্জু ছেলেকে পাউডার বুলিয়ে কাজল পরিয়ে অস্থির করে তুললো। নতুন শিশুকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলো মঞ্জুর স্বামী। একবার শুধু অস্ফুট স্বরে বললো- আমার ছেলে!’
     পারুল বেগম ততক্ষণে চিকন চালের পোলাও বসিয়েছে রান্নাঘরে। মঞ্জু তার আটপৌরে শাড়ি বদলে একটা তোলা জরিপাড় শাড়ি পরে রান্নায় হাত লাগাতে এলো। পারুল বেগম স্বগতোক্তি করলো- ‘গ্যান্দার বাপ’ হয়ে সাহেবের হুঁশ নাই, ঠাটা পড়া মানুষের মতো হয়ে গেছে।

     ফ্যান্সী-ন্যান্সীদের মনে হতে লাগলো আজকে ঈদ। তাদের ছোট ভাইটিও নানান উপভোগের শব্দ করে মুখে ফেনার বুদ্বুদ তুলতে লাগলো- যেন এ উৎসবে সেও ভাগিদার।

     ‘ঠাটা’ পড়লো অবশ্য ভোররাতে।মঞ্জুর স্বামী মশারির ভেতর বসে থেকে জানালো- যে ‘...’ (অশ্রাব্য) মহিলা দেবরের সাথে ‘...’ (অশ্রাব্য)করে বাচ্চা ফুটায় তার স্থান ‘...’(অশ্রাব্য)।
দিলুর বড়ভাই এমন জাতের মানুষ না যে এইধরনের ‘...’(অশ্রাব্য) মহিলার চালাকি ধরতে পারবেনা। কবে দিলু পাগল হয়ে গেল আর তার কতদিন পরে এই ‘...’(অশ্রাব্য)পয়দা হলো?

     মঞ্জু ঠিক বুঝতে পারলোনা আসলেই এই ঘটনা ঘটছে কিনা। আকাট মূর্খ যেভাবে ‘ব্রহ্মপুত্র’ বানানের দিকে তাকিয়ে থাকবে- সে সেইভাবে তার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
(তার হঠাৎ মনে পড়তে লাগলো- কালকে রাতে সে পাক করেছে পোলাও আর খাসীর মাংস।
নতুন শাড়িটা পরেছে।
স্নো মেখেছে।
রাতে শুতে এসে শরীর দিয়েছে।)

এমনকি দিলুর বড়ভাই যখন প্রায় উড়ে এসে তাকে কিল-ঘুষি-লাথি মারতে লাগলো তখনো তার বিস্ময় কাটলোনা।
ইথারগ্রস্তের মতো সে তাবত লাঞ্ছনার উপর ভাসতে লাগলো।

     আচ্ছা, আমরা এই ঘরে আর দাঁড়িয়ে না থাকি। পাশের ঘরে পারুলবুয়ার বুকে-পিঠে গুটিসুটি মেরে ফ্যান্সী-ন্যান্সী কাঁপছে- ঐ ঘরেও আমাদের জন্যে আর কিছু নেই। কিছু বিচিত্রা। পুরাতন কাঁথা। মহাজাতকের রাশিফল। দেয়ালে রঙীন কাগজের শিকলি, কোনো এক জন্মদিনের।

     আসুন আমরা গড্‌স্‌ আই ভিউয়ে সমস্ত ঘটনাগুলি দেখি।
দেখি একটা ছোট্ট ঘরে দিলু তার ছাত্রী শেলীকে পড়াচ্ছে।
হরলাল রায়ের রচনা বই।
বইয়ের পাশে চায়ের কাপ, নাশতার পিরিচ।
বইয়ের ভিতর চিঠি। শুকনো গোলাপফুল।ঝাউপাতা।
দেখি অভিভাবকহীন সন্ধ্যায় দিলু আর শেলী আবার সেই ঘরে।
শেলীর মুখ ফস্‌ফরাসের মতো জ্বলছে।
এতদিনের গভীর প্রেম দিলুকে জ্বরের মতো ছেড়ে পালিয়েছে।

অসম্ভব ভয়ে দিলুর সমস্ত শরীর পেন্ডুলামের মতো হয়ে গেছে। ঝুলন্ত। নিরাবলম্ব। নগ্ন অবস্থায়ই শেলী দিলুকে ‘ঠাটায়া’ একটা থাপ্পড় দিলো।

দেখি দিলুর ঘরে দিলু মেঝেয় দাঁড়িয়ে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করছে সে অক্ষম। মুখস্ত করার চেষ্টা করছে তার শরীর উত্থানহীন।

আচ্ছা ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে, ঐ সুপারীগাছ-সিদ্ধ ডিম-অলা-ভিডিওক্লাব ছাড়িয়ে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমরা দিলুর বড়ভাইএর ঘরে চলে যাই। ড্রাইভারের চাকরি নিয়ে প্রবাসে কি কষ্ট করেই না সে অর্থ উপার্জন করে...আচ্ছা এঘরে কিছুক্ষণ আগে যে আরবী মহিলা শুয়ে ছিলেন- এখন যে ঝিনুক ফুঁড়ে বেরুনো আদি ভেনাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মা নিশ্চয়! চেহারায় কি মিল!মা-মেয়ে-তাদের গাড়ি সবকিছু ‘সচল’ (অশ্রাব্য) রাখতে যে কত কষ্ট তা যদি আর কেউ জানতো!

দেখি দিলুর বড়ভাই মুনিবের কন্যাকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছে, বাহ!
বেদুঈনের দুর্নিবার রক্ত তার গায়ে।
গজালা হরিণের মতো চোখ।
ঝিনুকের মতো পাতলা গোলাপি আভাময় কান।

আজকে দিলুর বড়ভাই বাংলাদেশ থেকে ফিরবে।ল্যাম্ব মুফাল্লাক্‌ ভালবাসে সে, ঠেসে টমেটো-পেঁয়াজ আর ছাগীর দুধের মাখন দিয়ে। তার আরবী স্ত্রী তাই রেঁধেছে কি?

আরও শূণ্যে উঠে যাই। আমার গড্‌স্‌ আই ভিউ বড় ভাললাগে।উর্ধ্বাকাশে মরুভূমির নীল। অনন্ত নীল। নীচে বেদুঈন নারী স্বামীকে তালাক দেবার পর তাম্বুর দরজা বদলাচ্ছে। আগে যদি উত্তরমুখী দরজা থাকে তো এখন দক্ষিণমুখী। আগে যদি পূর্বমুখী, তো এখন দরোজা পশ্চিমমুখী। এর মানে তালাক। এর মানে মরুভূমির প্রথা।
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন