বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

সাদৃশ্যের সন্ধানে : ভি এস নাইপল ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' এবং 'কুবেরের বিষয় আশয়'

শাহনেওয়াজ বিপ্লব


ভি এস নাইপল বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। 'টাইম' 'দ্য নিউ ইয়র্ক বুক রিভিউ' ম্যাগাজিন তাঁকে অভিহিত করেছে ইংরেজি গদ্যসাহিত্যের 'নতুন দ্রষ্টা' 'কিংবদন্তি' হিসেবে। পৃথিবীতে এযাবৎকালে লেখা সব উপন্যাসকে বিবেচনায় এনে টাইম ম্যাগাজিন তাঁর 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস'কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৭২তম উপন্যাস হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া ভি এস নাইপলের তুলনায় বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বিশ্বসাহিত্যে একেবারেই অচেনা। বড় পুরস্কার বলতে আকাদেমী পুরস্কার (১৯৯৩) পেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের কোঠা শূন্য। অপরদিকে নাইপল পেয়েছেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), বুকার পুরস্কার (১৯৭১) এবং ব্রিটিশ লিটারেচার পুরস্কার (১৯৯৩) ছাড়া আরো এক ডজনের বেশি দেশি-বিদেশি পুরস্কার। সেই বিবেচনায় নাইপলের সাহিত্য-সম্মান ও সাহিত্য-প্রভাবের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেন না শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, গপৎৎড় িঐরষষ প্রকাশনী থেকে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ভি এস নাইপলের 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' উপন্যাসটিকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কুবেরের বিষয় আশয়'-১৯৬৩ উপন্যাসটির সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে যেকোনো পাঠক এ দুটি উপন্যাসের সাদৃশ্য বিবেচনা করে কেবলই অবাক হবেন।
'
এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস'-এর নায়ক মোহন বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিলেন হাতে ছয়টি আঙুল নিয়ে, হিন্দু সংস্কার মতে অমঙ্গলের প্রতীক হয়ে। ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কুবেরের বিষয় আশয়' উপন্যাসের নায়কের ক্ষেত্রেও। এ উপন্যাসেও নায়ক কুবেরের জন্ম এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের রাতে। সেটাও অলক্ষুণে হিসেবে বিবেচিত হয়েছে উপন্যাসে।
মি. মোহন বিশ্বাস বহু প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে শেষ পর্যন্ত নিজের একটি পরিচয় চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন নিজের একটি ঘর, যে ঘরে তিনি তাঁর স্বাধীনতা নিয়েই থাকবেন, যে ঘরটি মি. বিশ্বাসের ঘর হিসেবেই চিহ্নিত হবে। সংঘবদ্ধ গণ্ডির ভেতর থেকে বেরিয়ে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণের চেষ্টা 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। অন্যদিকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের দরিদ্র কুবেরও অজস্র প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাঁর সব বিষয়-আশয়ের ভেতর তাঁর নিজের এবং পরিবারের জন্য বড় একটি ঘর তৈরির স্বপ্নকে টেনে নিয়ে গেছেন। সেই স্বপ্নের ভেতর ছিল--ঘরের সামনে থাকবে আঙিনা, বাড়ির সামনের পুকুরে থাকবে টলমল জল আর মাছ।
কুবের এবং মোহন বিশ্বাস দুজনই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য খুঁজেছেন নিজেদের ঘর নির্মাণের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুটি উপন্যাসেই নাইপল এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একই পরিণতি টেনেছেন। 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস'-এ নায়ক মোহন বিশ্বাস উপন্যাসের শেষে এসে মৃত্যুবরণ করেছেন। কুবেরেরও হয়েছে একই পরিণতি। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কুবেরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাস শেষ করেছেন।
নাইপল তুলসী পরিবারের প্রেক্ষাপটে একটি বড় পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে মি. বিশ্বাসকে বের করে নিয়ে এসেছেন, যেমনটি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ও করেছেন তাঁর 'কুবেরের বিষয় আশয়' উপন্যাসে। কুবেরকে তিনি দেবেন্দ্র লাল সাধু খাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র 'কুবের' করে তুলেছেন।
হিন্দু ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও উপন্যাস দুটিতে সাদৃশ্য দেখা যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং ভি এস নাইপল দুজনের উপন্যাসেই চরিত্রগুলো হিন্দু ধর্মীয় অনুশাসন মেনে নিয়েছে।
'
এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' এবং 'কুবেরের বিষয় আশয়' উপন্যাস দুটির কাঠামোও প্রায় একই রকম। উপন্যাস দুটির ঘটনা একটানা বর্ণিত হয়নি। বরং দুটি উপন্যাসেই চরিত্রগুলো, নায়ককে সামনে রেখে নানা পর্ববিভক্ত হয়ে মূল কাহিনীকে টেনে নিয়ে গেছে।
এমনকি ভাষাশৈলীতেও একই রকম সাদৃশ্যের দেখা মেলে নাইপলের 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কুবেরের বিষয় আশয়' উপন্যাসে। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের অভিমত--ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ গদ্য সৌকর্য বিন্যস্ত হয়েছে 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস'-এ। একটি উদাহরণ 'গ্রিন ভ্যাল' থেকে : 'সে খাচ্ছিল তার কক্ষের সবুজ টেবিলে বসে। বড় দরজার আড়ালে জানালাকে পেছনে ফেলে বসেছিল সে এবং প্রতিজ্ঞা ছিল--সে ঘরের ভেতরে ছাদ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া স্যাঁতসেতে ঝুলকালি মাখানো পুরনো কালো লোহার রডের দিকে তাকাবে না। ঘরের ভেতর পুরনো পত্রিকা, তামাকের গন্ধ মনে করিয়ে দিচ্ছিল তাকে বিছানার নিচে রাখা বাবার বাঙ্টির কথা, যে বাঙ্ েবাবা শায়িত আছেন মাটির নিচে, কবরে।'
'
কুবেরের বিষয় আশয়' থেকে দ্বিতীয় উদাহরণ : 'জলের দর কথাটা শুনলে কুবেরের বড় দুঃখ হয়। ইস্, তখন যদি বয়স্ক থাকতাম, হাতে টাকা থাকত! একেক দিন ট্রেনে বসে দুপাশের মাঠ দেখে মনে হয়, সাইজমতো বিরাট একলপ্তে অনেকটা জমি গালগল্পের জলের দরে পাওয়া যেতো যদি, এদানী ব্রহ্মোত্তর দেয় না কেউ। তাহলে একেবারে কলবাড়ি করে তুলত। ভদ্রআসন, পুকুর, ফলের বাসা, সম্বচ্চরের ধান মলানোর মাঠ সব--সব একসঙ্গে হয়ে যেতো।'
নাইপলের উপন্যাসে মি. বিশ্বাসের জন্য একটি ঘরের স্বপ্নের আকাঙ্ক্ষায় ব্যক্ত হয়েছে মোহন বিশ্বাসের হতাশা, বিচ্ছিন্নতা আর কলোনিয়াল সমাজব্যবস্থার অসারতার মধ্যে ব্যক্তি পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য বড় হয়ে উঠেছে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কুবেরের বিষয় আশয়'-এর কুবেরও মোহন বিশ্বাসের মতোই হতাশ হয়েছে। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের স্বপ্ন তাঁর ভেতরও তীব্রভাবে ছিল। অস্তিত্ববাদী এই বোধ তাকে তাড়িয়ে ফিরছে।
'
এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬১ সালে। ভি এস নাইপল জন্ম নিয়েছিলেন ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাসে। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট। অপরদিকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জন্মেছেন বাংলাদেশে, বরিশালে ১৯৩৩ সালে। বড় হয়েছেন এবং বাকি জীবন কাটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। বয়সের হিসাবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নাইপলের চেয়ে এক বছরের ছোট। অপরদিকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কুবেরের বিষয় আশয়' প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬৩ সালে। প্রকাশকাল হিসেবে এ দুটি গ্রন্থের মধ্যে ব্যবধান মাত্র দেড় বছরের মতো, যদিও ভি এস নাইপলের গ্রন্থ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আগে প্রকাশিত হয়েছে। সেই বিচারে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নাইপল দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তার কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। চিন্তা ও বোধের এই ঘটতেই পারে।
দুটি উপন্যাসই পাশাপাশি রেখে পড়লে মনে হবে, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের কুবের আর ভি এস নাইপলের উপন্যাসের মোহন বিশ্বাস যেন একে অপরের যমজ ভাই। উপন্যাস দুটিও যেন একে অপরের যমজ। নাইপল এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যেন একই সঙ্গে বসে লিখেছেন উপন্যাস দুটি--একই রকম চরিত্র, একই রকম ঘটনাপ্রবাহ, ভাষাভঙ্গি এবং একই রকমের ঘটনার সাদৃশ্যে।
উপন্যাস দুটির ঘটনা পরম্পরার এই আশ্চর্য মিল বয়স বিবেচনা, একই রকম উপন্যাস পরিণতি এবং একই রকম উপসংহার সাধারণ পাঠককে তো বটেই, সাহিত্য গবেষকদেরও অবাক করে বটে।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম মহাদেশ হিসেবে এশিয়ায়। পশ্চিমবঙ্গেই তিনি বড় হয়েছেন এবং জীবন কাটিয়েছেন। তাই তিনি উপন্যাসের পটভূমি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাকে। অপরদিকে ভি এস নাইপল জন্মেছেন আমেরিকা মহাদেশের ক্যারিবীয় দ্বীপ ত্রিনিদাদে। ফলে তিনি উপন্যাসের পটভূমি করেছেন ত্রিনিদাদকে। দুজন দুই মহাদেশে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁদের উপন্যাসে আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে। আসলে মানবিক ঘটনার বর্ণনায় বিশ্বের সব লেখকই শেষ পর্যন্ত একই রকম ভাবনার বাঁধনে বাঁধা।
নিজ দেশের সীমানার গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকেও মানবিক সংকটের বিবরণে সব লেখকই শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক। আর সে জন্য সম্ভবত 'এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস' উপন্যাসের ৩৫ বছর বয়সী মি. বিশ্বাসের সঙ্গে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের কুবেরকে মিলিয়ে দেখলে খুব বেশি পার্থক্য ধরা পড়ে না। দুজনের দুঃখেই তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের হৃদয় সমান ব্যথিত হয়।
বৈশ্বিক মানবিক ঘটনার বর্ণনায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং ভি এস নাইপল--সব লেখকই শেষ পর্যন্ত একই রকম বৃহৎ ভাবনার বাঁধনে বাঁধা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন