শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

যমক

অর্ক চট্টোপাধ্যায় 
সর্বদ্রষ্টা। এতোটা ওপরে থাকলে নিজেকে কেমন রাজা রাজা মনে হয়। উচ্চতার পরিবর্তন আজকাল। নিচের কোনো কিছুই  আর চোখের আড়াল হয় না। আস্তে আস্তে পরতগুলো ঠাহর করা যায়। সন্ধে ৭টা, ২৫/৮/২০০৬। পুরী হোটেলের আট তলার একটা সি-ফেসিং রুম। স্যার বুক করে দিয়েছেন। কারণ সমুদ্র, স্থান-কাল-পাত্র। আর ওরা: আমার দ্রষ্টব্য। এই নিভন-আলোয় যতটুকু দেখা যায়! খাঁজ বরাবর দৃষ্টি দুর্বল হয়ে আসে আস্তে আস্তে আর তখনি ওদের একটু একটু করে দেখা যায়; সাদা কালো ছকের বাইরে উঁকি মারা যাবৎ সময়ের ঘুঁটিকতক! চোখের আগল ঠেলে বেরিয়ে আসে।

"Hello Sir, reporting Sir. Yes, Sir, there are there. All there. Bit by bit. All. Bit by bit. But all now. Yes Sir. Over Sir."

স্যার বলেছিলেন ওদের কথা, ওদের থাকার কথা। বছর আটেকের তিনটে ছেলে। সমুদ্রের ধারে একটা কালো বল নিয়ে ক্যাচ ক্যাচ খেলছে।  তিন আষ্টে চব্বিশ, হাতে রইলো একবালির ওপর। তাদের ডান পাশে বালি ফুঁড়ে সটান একটা লাইটপোস্ট। আলো তৈরী করছে। আমিও চাই, আলো তৈরী করতে, কিন্তু আমার শরীরে বাধে। হাল্কা হলুদ আলোর আভায় খেলা চলছে। আজ আমি আলোরও ওপরে। আমি আছি, আলো নেই। শুধু আমি। আমি আছি, তাকিয়ে আছি। শুধু আমিশুধু তাকানো। নিষ্পলক। এটাই আমার কাজ। I have been appointed for this, so...

আটটা। বাচ্চাগুলো খেলছে। হলুদ আলোয় কালো বল এহাত ওহাত ঘুরে চলেছে। সমুদ্রতীরে লোক কমছে। ছায়া কমছে। কিন্তু পাশাপাশিই ওদের তিনজনের ছায়াগুলো একটু একটু করে বড় হচ্ছে!  বেশ, পৃথিবীতে এখনো ছায়া পড়ে! লাইটপোস্টটা স্থির। নিভছে না। কথাও নয়। স্যার বলেছিলেন। আমার বারান্দা অন্ধকার, তাই ছায়াটা স্পষ্ট নয়। ঘরের আলো নেভানো, প্রায় নেই বললেই চলে। আমার ছায়া। যতটা ছায়া ঠিক ততটাই সময়। ছায়া নেই। সময়ও নেই। আমি আছি, তাকিয়ে আছি। শুধু আমিশুধু তাকানো। নিষ্পলক। এটাই আমার কাজ। I have been appointed for this, so...ইতিমধ্যে আবার: 

"Hello Sir, reporting Sir. Yes, Sir, they are there. All of them now. There sir. Their there. I am observing them Sir. Yes Sir. Will. Over Sir"

নটা। বাচ্চাগুলো। বলটা। সমুদ্রতীর। প্রায় শূন্যতা। লাইটপোস্টের আলোটা এখনো অক্ষত হলুদ। শক্তিশালী। স্যার বলেছিলেন। আমার বারান্দা। আমি একা। আরো একা ছেলে  তিনটে, তারপর বলটাঅবশেষ সমুদ্রতীর। ছায়াগুলো ক্রমশ বড় হচ্ছে। ছেলেগুলোকে ঢেকে দিয়ে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশে। তিনটে ছেলের ছায়া। একটা বলের। আরেকটা খেলার। একটাই। বড্ড তাড়াতাড়ি বাড়ছে। চড়চড়িয়ে।   

"Hello Sir. Yes Sir. They are there. Their there Sir. Shadows increasing Sir. Rapidly Sir. Too rapidly. What should I do? What? What Sir? What? OK Sir...OK...I will get back to you...Over Sir"

টেলিফোন কেটে আবার সামনে তাকালাম। খেলা থামিয়ে ছেলে তিনটে ঘুরে দাড়িয়েছে। প্রথমজন দ্বিতীয়জনের পেছনে আর তৃতীয়জন দ্বিতীয়জনের সামনে। তিনজন একই সরলরেখায়। একটাই। চড়চড় করে বেড়ে চলেছে বালির ওপর হলুদ আলোর পাশাপাশি আর ওপরনিচ। সময়ও বেড়ে চলেছে সাথেসাথে। লাইটপোস্ট পেরিয়ে আমার বারান্দার দিকে, চকিতে। একলাফে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। বাইরে ধুন্ধুমার হতে লাগলো। ১০-১৫ মিনিট। তারপর আবার সব শান্ত হয়ে এলো। খেয়াল হলো তাড়াহুড়োয় টেলিফোনটা বারান্দায় ফেলে এসেছি। বাইরে তো একবার যেতেই হবে। স্যারকে না জানালে চলবে না! ছায়াগুলো বাড়ছে সময় বরাবর। দিনগুলো কি তবে এসেই গেলো? এই জন্যই তো আমিI এই জন্যই তো থাকা, যতদিন ছায়ারা থেকে যায়...এটাই আমার কাজ। I have been appointed for this, so... 

দরজাটা খুলতে যাবো তখনি ফোনটা বেজে উঠলো বারান্দায়। বাজছে...বাজছে! কিন্তু দরজাটা খুলতে পারছি না! আটকে গেছে মনে হচ্ছে! দু-তিনবার চেষ্টা করেও খুলতে পারলাম না আর ফোনের রিংটাও থেমে গেল। বারান্দায় ফোনটা কেউ ধরেছে। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? কে? স্যার তো তা বলেননি। যতদিন ছায়া পড়ে ততদিনই থাকা যায়, তারপর হুউউশ! ছায়া শেষ হলে সময়ও শেষ! চোখের কোণে দিনকয়েকের জমাট পিচুটি কানের গভীরে ছায়া ফেললো আর স্পিকারফোনে শুনতে পেলাম স্যারের গলা, স্পষ্ট, বারান্দা থেকে: 

"Hello Sir. Yes Sir. They are here. There is here Sir. Yes Sir, all of them Sir. Bit by bit but now all here Sir. OK Sir...OK...I will get back to you...Thank you Sir...Over Sir...All Over."


লেখক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায় 
 কলকাতা শহরের উপকন্ঠে উত্তরপাড়ায় বাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ, এমএ এবং এম-ফিল। বর্তমানে সিডনিতে গবেষণারত। দশ বছর ধরে গল্প-গদ্য লেখালিখি। নবেন্দু বিকাশ রায়ের সাথে বিগত ৬ বছর ধরে অ্যাশট্রে নামক লিটল ম্যাগের সম্পাদনা। বর্তমানে অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ওয়েবজিন বাক-এর 'গল্পনা' বিভাগের সম্পাদক। শূন্য দশকের বিভিন্ন লিটল ম্যাগের সাথে যোগাযোগ এবং লেখালিখি। কয়েকটি বন্ধু পত্রিকা: বৈখরী ভাষ্য, অবসরডাঙা, অক্ষরযাত্রা, প্রতিষেধক, জার্নি ৯০জ, কালিমাটি, কৌরব, নতুন কবিতা, অপর ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন