শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

দেয়ালা

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

এই গল্পটা অমিয় আর রোশন আরার।
একটা বয়স কাগজ কুঁচকে হাতপাখা বানানোর (গণিত ক্লাসে লোডশেডিং),
একটা বয়স শুকনো ফুলের পাঁপড়ি নোটবুকের ভাঁজে ডাঁই করবার অগাধ সরলতার
এবং সরল বলেই তদোধিক ন্যাকামোর। সেসময় ডুবসাঁতারে চোখ বুঁজবার সময় ঝট্‌ করে একে অন্যকে দেখে ফেলেছিল তারা। এখন বহু গোল চাঁদ চাপা পড়ে গেছে অমিয়র পেপারওয়েটের নীচে।
পুরনো ড্রয়ার খুলতেই যা ঝুরঝুর করে পড়ে যায়, যা লালচে এবং যার ব্রোমাইড জ্বলে গেছে-
তা নিয়ে এখন রোশন আরা হাসতে পারে।
অথচ একসময় কাগজগুলোর ভেতরে কত না রাঙিফল, চড়াইয়ের খড়, শীর্ণ শাদা আহিরভৈরব নদী।
গভীর জন্মযাতনা নিয়ে একটা অনাবিল শৈশব। একটি উসখুস কৈশোর। এবং একখানি উসুক যৌবন এইসব তারা একে অপরের সাথে কাটিয়েছে। ড্রয়িং খাতার খুনসুটি। লুকিয়ে পড়া প্রথম নভেল। অর্পণ-ভাগাভাগি-জবরদখল। সেই সাথে পাখির পেটের তলার গরম নীলচে ডিমটির মতো ভালবাসা।

অমিয়র অল্পবয়সের খামিরে জলীয় উপাদান (ময়দা-ঠাসা নাদুস্‌রে) বেশী ছিল বলে, তাকে ঠেসেঠুসে ব্যাটাছেলে বানানোর জন্যে ক্যাডেট কলেজে পাঠানো হয়েছিল। হুলোর গলার রাগত কান্না গিলতে গিলতে সে চলে গেল, তাকে পিন্ডি পাকিয়ে আবার লেচি কাটা হবে জন্যে।
রোশন আরা দেখলো বাসী সূর্যের রঙ বেগুনী। জরতী সন্ধ্যা।
সামনের বাড়ির কাকিমারা চলে গেছে।
দেয়ালে দেয়ালে রয়ে গেছে উঠিয়ে ফেলা ছবির চতুর্ভূজ। চৌকো চৌকো শাদা শূণ্যতা।
ধূপ পুড়বার স্থানে কালচে নিবিড় চিটচিটে দাগ।
`মেজ ছেলেটার পড়ার টেবিলের খুরের চিহ্ন মেঝেয়। পরিত্যক্ত নাকফুল।
দেয়ালে লিখে রাখা বীজগণিতের সূত্র।
ছোট মেয়েটার বড় করে আঁকা সিংহ, তাতে দেয়া পাঁশুটে মোম রঙ।
আঁকাবাঁকা হরফে লেখা ছিংগ
একটি মেয়ে পেছনের বারান্দায় এসে দাঁড়াতো। আখের ফুলের মতো নির্ভার।
তাকে আর দেখা যাবেনা অতিপ্রিয় উর্ধ্বমুখ ভঙ্গীতে।
কড়িবরগা ছুঁয়ে হারমোনিয়মের শব্দ বলবে না খেলিছে জ-অ-ল দেবী...
হঠাকরেই প্লাবন-সমতল এতো শূণ্য হয়ে গেলো বলে রোশন আরা অনেকক্ষণ কাঁদলো। (বারো বছরের মেয়ের বিরহবোধ থাকে নাকি? অস্কার কোকোশ্‌কা জানতে পারেন, ছেলেপুলেদের তিনি ঢের ভালো চিনতেন।)
কেঁদেকেটে চোখ মুছে সে চিঠি লিখতে বসলো।
ঘুলঘুলির পাখির বাসা থেকে ছানা এনে সে কোথায় লুকিয়েছে।
রঙীন বোতামগুলো-মার্বেলগুলো-পাথরগুলো সে কোন দেয়ালের গর্তে লুকিয়েছে। যদি চিঠিটা অমিয়র কাছে পৌঁছতো- তাহলে সে দিব্যি বুঝতে পেতো অমিয়র নামের ভেতরও- তেমনি কাউকে না বলে লুকিয়ে রোশন আরা অনেক কান্না গুঁজে রেখেছে। কাউকে বলতে পারেনি এই আশঙ্কায়-ঈর্ষায়, পাছে আর কেউ তেমনি কান্নার সাথে অমিয়র নাম নেয়।
    
  ছুটিতে অমিয় বাড়ি ফিরলোনা। বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে চলে গেল। এরকম আরও কয়েকবার। রোশন আরা বুঝতে পারলো- অমিয় আর খিড়কীপুকুরের নদ্‌নদে হাঁসটি নেই।
ঝিকিমিকি শৈবালরং পাখনা মেলে সে মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে পারে।
রোশন আরা যখন রক্তপাতে অভ্যস্ত,
যখন সে আর অমিয়র জন্যে বিলিতি ছবির ম্যাগাজিন থেকে ছবি কেটে জমিয়ে রাখেনা, সেরকম একটা সময়ে অমিয় বাড়ি এলো।
      
        ততদিনে সে হিটলারের ডাইরী পড়েছে (আমরা রসাতলে যেতে পারি, তবে সেখানে যাবার বেলায় দুনিয়াটাকে ট্যাঁকে গুঁজে নিয়ে যাব।)সে জানে আভা গার্ডনার প্রেম করতেন ক্রেপ-সুজ্যেত খাওয়ার বিনিময়ে আর মেরিলিন মনরো শুতেন প্রাতরাশের বিনিময়ে।
সদরদরজার পরই একটা সুরকীর ঢিপি।
একটা চালতাগোলাপ গাছ। কালাকূচ লতা উঠছে প্রাচীরের উপর।
রাজ্যের খঞ্চাতে আমসী আর থালায় করে আমতা রৌদ্রে দেয়া। মোড়া পেতে রোশন আরা সেখানে কাক তাড়াচ্ছিল।
(পৃথিবীতে আমরণ প্রেম আর শয়নঘর ছাড়া কিছু নেইঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
একঝলক অমিয়কে দেখেই রোশন আরা কত কী বুঝলো। জলমন্ডলে পুঁটিমাছের নাচন যেমন করে বোঝে নিমজ্জিত মৃণাল।
এই অমিয় (তাকে দাদাভাই ডাকতে শিখিয়েছিল রোশন আরার মা।) আর তার সাথে বসে ময়ূখ চৌধুরীর কেপ্‌ বাফেলো শিকার কাহিনী পড়বেনা।
এমনকি তার গা থেকে স্ফুরিত সরু ভিনেগারী ঘামের গন্ধও সে চেনেনা।
একটা তীক্ষ্ণ হিম অমিয়রও পায়ের তালু বেয়ে ভায়া যৌনাঙ্গ নিম্ননাভি অব্দি আসতে আসতে জানান দিল- যে কাচকড়ার পুতুল সে খেলতে খেলতে ফেলে গিয়েছিল তা আর নাই।
রোদ-কাসুন্দি-আখের গুড়-লেপা আমের ভরপুর গন্ধের ভাপে যে বসে আছে সে অন্য কেউ।
(এমনি করে শ্রাবণরজনীতে/হঠাখুশি ঘনিয়ে আসে চিতে...)
সেবার রোশন আরা আরক্ত হয়ে তাকে দেখালো সে প্যালগ্রেভ্‌স্‌ গোল্ডেন ট্রেজারি থেকে কবিতা অনুবাদ করেছে।
সময় সময় কতো লুটে নাও তুমি
জেনে যাও তবু সে মোরে গেছিল চুমি
আসনের হতে উঠিয়া তরাসে
চেয়েছিল মুখে আলোর উদ্ভাসে
মনে পড়ে আজ স্মৃতির আভাসে, সে মোরে গেছিল চুমি।
সময় সময় ঝুলি ভরে নাও তুমি
নিয়ে যাও যেথা যতো কিছু আছে-
বিত্তের বেশ, পলিত সুকেশ- যাহা আজ আছে কাছে।
শুধু জেনে যাও, স্মৃতিভারে বসে আমি
পরাজিত তবু, বহুকাল আগে সে মোরে গেছিল চুমি।
অমিয় তদ্দিনে ছেঁড়া জুতোটার ফিতেটা বাঁধতে বাঁধতে/ বেঁধে নেই মন কাব্যের প্রতিপক্ষে পড়ছে, অতএব রোশন আরার অনুবাদ-কবিতা পড়বার সময় তার কেবল খাপছাড়াভাবে রোশন আরার ঠোঁটদুটোর কথা মনে হতে লাগলো।
যাবার আগে সেবারের ছুটিতে অমিয় যা যা বই পড়তে নিয়েছিল সব ফেরত দিয়ে গেল। রোশন আরা অনিবার্যভাবে জানতো শেষ পাতায় কিছু একটা থাকবে। ছিল। অমিয়র ঝকঝকে হাতের লেখা-
যার খুশী সে যদৃচ্ছা তোমাকে জাগাক বেদনায়/হতশ্রীতে/যশ-ইচ্ছায়-
আমি-ভালবাসি রূপোর কাঠিই ছোঁয়াই তোমার পায়।
যত্ন করে ব্লেড দিয়ে শেষ পাতাটা কেটে রেখেছিল রোশন আরা। আরেকটা বইএ-
তোমার অঝোর চক্ষু, আমার চক্ষু অবনত/
মেঝের ছকে মিলিয়ে চলে সুখ বইবার ব্রত।(অমিয় যাবার সময় রোশন আরা কেঁদেছিল,সত্যিই।)

     অমিয় চলে যাবার পর রোশন আরা অনেকদিন বাদে আবার তাকে চিঠি লিখতে বসলো। চিঠিগুলি পর পর কয়েকটা গরঠিকানায় চলে যাবার পর অমিয়র একটা দাঁতমুখ খিঁচোনো চিঠি এলো।
রোশন আরা তখন সভয়ে ডক্টর জীভাগো থেকে কবিতা অনুবাদ করছিল।
..ঘরের বাইরে পা বাড়াবো আমি,
আর দেখবো তুমি দরজায় দাঁড়িয়ে।
একা, হেমন্তের পোষাক পরে-
নগ্ন শির, বরফ-জুতোহীন পা,
একমুঠো তুষার চিবোচ্ছো
আর চেষ্টা করছো স্থির থাকতে।
অমিয়র বাবা বললেন- তুই তো বৃথা শ্রম দিচ্ছিস। এই কবিতাগুলির অনুবাদ বুদ্ধদেব বসু করে গেছেন! তার চেয়ে সিনেমাটার সাউন্ডট্র্যাক শুনবি আয়। বালালাইকা বলে একটা যন্ত্র বাজানো হয়েছে বুঝলি!
রোশন আরা বালালাইকা শুনলো। চরাচরব্যাপী বরফের ভেতর টুক্‌ করে হল্‌দে ফুল জেগে ওঠা। অমিয়র বাবা বলতে লাগলেন ডেভিড লীন্‌ কি করে ওমর শরীফের আরব্য কপালকে রুশ দেখাবার জন্যে কপাল ঘিরে চুলের রেখাগুলি ওয়্যাক্স করে তুলে নিয়েছিলেন।
সব কাহন রোশন আরা শুনলোনা।
তরাই থেকে নেমে আসা বিদঘুটে শীত
ডাক পেয়েছে।
রৌদ্রে গলে উছলে পড়া তিস্তা নদী
ডাক পেয়েছে।
মাঠজোড়া ঐ তিসির শীষে
হিরন্য দিন
ডাক পেয়েছে।
কৃষ্ণাতিথির চাঁদ ঢেকে যায় সল্লীহাঁসে
ডাক পেয়েছে।
ডাক শুনেছে হাতচিরুনী-আয়না-সাবান-শেভিংক্রীম,
তুইই কেবল ডাক পাসনি হতচ্ছাড়া ঘোড়ার ডিম!
এইবার লক্ষ্যভেদ হলো, অমিয়র কাছে চিঠি পৌঁছালো। রংপুর ক্যাডেট কলেজে নৃপেন স্যার চিঠি খুলে পড়লেন, মেয়ের লেখা চিঠি বিধায় অমিয় চার-পাঁচটা বেত খেলো এবং তারপর পুলকিত প্রাপক চিঠিটা বুঝিয়া পাইলো।
সেদিন আকাশে এত মেঘ ছিল যে
একটা পলকা গোবকও ওড়েনি
পাছে তার ভার সইতে না পেরে আকাশ ভেঙে পড়ে!
জগতে ঝিঁঝি ছাড়া আর কারও সেদিন
সাহস হয়নি কিছু বলতে-
পূর্বসন্ধ্যার বিষন্ন মথ ছাড়া আর কাউকে চলতে দেখিনি আমরা
ছুটিতে আবার বাড়ি এলো অমিয়। তাস খেলা শেখাতে শেখাতে একদিন দুপুরে ভোজবাজির মতো সে খুঁজে পেল রোশন আরার মুখ-
নদীর শিলার মতো মসৃণ স্তন-
তার নীলাভ ঊর্ণাময় ত্রিবলিরেখা।
সে যখন একটা ছটফটে সাদা ঘোড়া হয়ে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঘাস খাচ্ছিল...
সে যখন বিচ্ছুরিত জ্বালায় উর্ধ্বমুখ হ্রেষা তুলছিল
যখন বল্গা ছিঁড়ে খুর বাগিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে..সে যখন তেপান্তরেই ছুটলো
যখন জ্যোতির্ময় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আবার ফিরে এসে বাধ্যমুখ নুইয়ে ঘাস খেতেই লাগলো...
গভীর রাত্রির বাতাসে কত কী থাকে, উড়াপাক দিয়ে আসা পোকামাকড়, গাছেদের সর্‌সর্‌, নেউলের দৌড়। আর সব থিতিয়ে যাবার পর নিজের মুখোমুখি হবার আতংক।
(চারণভূমির হলদে ঘাস)
শুনতে পাস? শুনতে পাস?
(উলুর মাঠে নীল শিশির)
স্বপ্ন গলে মুক্তো-নীর।
(দোলায় চেপে স্বপ্ন যায়)
দিন পালায়, দিন পালায়-
রোশন আরার দিন যাচ্ছিল। টেস্টপেপার সল্‌ভ্‌ করার দীর্ঘ দীর্ঘ বেলা। জলবসন্ত। দাগ মুছতে নিমহলুদের গোসল। নতুন কলেজ। আর ডাকবাক্সের ভেতর উড়ুক্‌ ভুড়ুক্‌ টুনটুনির মতো হঠাআসা চিঠি।

     এর মধ্যে খুচরো প্রেমে পড়েছিল অমিয়। রোশন আরার মামাতো ভাই ছিল মহফিল। মহফিল ভাইয়ের বউ লুব্‌না।
চকচকে বিনুনী।
পাতলা ভয়েল প্রিন্টের শাড়ি।
ছোট্ট ঝুম্‌কা আর চিকন চেন।
লিপস্টিকের টিপ আর সূক্ষ্ণ কালো কাজল।(ঐ একরকম সাজ ছিলনা সে দশকে!)
লুব্‌না অমিয়র চেয়ে বেশ বড়ই হবে। এঘটনা রোশন আরার কষ্টের কারণ হয়েছিল। তার নিজেরও বিবাহপ্রস্তাব আসা শুরু হয়েছিল, নিরুপায় ক্ষোভে ফুঁসতো সে। (ভোজসভা কিংবা উসবের ভিড়ে সে আর অমিয় কেবল দৃষ্টিবিনিময়ে চালিয়েছে একান্ত বিদ্যুৎ, এর বেশী করে আমি তোমার বলবার সাহস তাদের প্রকাশ্যে কখনো হয়নি।)
একটা অনতিপক্ক ফলের মতো দুফালি করে ফেলতে পারো আমাকে-
জেম্‌স্‌ ক্লীপের মতো ঠেসে রাখতে পারো প্রয়োজনীয় কাগজের সঙ্গে-
প্রয়োজন পড়লেই পোলিও টীকার মতো দুফোটা গিলতেই পারো আমাকে
ইচ্ছে হলেই খস্‌খস্‌ লিখতে পারো
আমার ওপর।
লেখাটা পছন্দ না হলে সাথে সাথে কাগজের মতো গোল্লা পাকিয়ে...
শুধু
পেরেকে সেঁটে আমাকে কখনো
দেয়াল-আয়না করে রেখোনা-
ঝকঝকে চোখ ভরে
ধোয়ামোছা হাসিমুখে
আমি কক্‌খনো তোমাদের ভালবাসতে দেখতে পারবোনা।

     অমিয়র লুব্‌না-অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সে ফিরে এসেছিল তার পোতাশ্রয়ে।
আমরা গল্প করবো সেইসব দিনের
যখন আমাদের পায়ে দেবদূতের মতো পাখা ছিল-
নিরীহ গ্রামের নামে লুকোনো ছিল পরম রোমাঞ্চ
ওরে, কী রঙীন ডানা তোর, একদিন পাশাপাশি উড়ে যাবি এলাচফুলের দ্বীপে?
তেমনি আমরাও বাঁধা জল, বাঁধা ছোলা খুঁটে খেতে খেতে
কত কী প্রতিশ্রুত ছিলাম-
একটা মাকড়সার জলের ওপর বোনা সাঁকোর চেয়ে সূক্ষ্ণ বিদ্যু
কেবল দৃষ্টিবিনিময়ে পৃথিবীতে কেবল আমরাই চালাচালি করেছি।
নেব-না নেব-না করেও রোশন আরা আবার তাকে গ্রহণ করেছিল। কেননা সে জেনে গেছিল কারো না-থাকাটা ফুলতে ফুলতে পরিব্যাপ্ত হতে হতে একসময় আকাশ-ছাওয়া থাকায় পরিণত হতে পারে।
কিন্তু সে টের পাচ্ছিল ঠিক আগের অমিয় ফিরে আসেনি। যদিও আগের মতোই সিঁড়িতে-দরজার আড়ালে-চকিত নির্জনতার সুযোগে লুব্ধ হাতে একে অন্যকে টেনে নিচ্ছিল তারা।
চন্দনের ফোঁটার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে কপাল ঘিরে।
রোশন আরার শরীরের ওপর বেদম ঘুরছে সিলিংফ্যান। অমিয়র চোখ চকচক করছে জল খেতে আসা হরিণের মতন।
রোশন আরার দশা সেই সৌভাগ্যবান গ্রহের মতো, যাকে ধুমকেতু দেখা দিয়েছে, ঘষে গেছে তার অনন্ত পুচ্ছ, অতএব পাথর আর ছাই ছাড়া তার আর কীই বা ছিল!
একটা অদ্ভুত বেড়ালের গল্প ফাঁদবো বলে
রাতদিন কলম ঘষটেই যাচ্ছি
বুঝলে রোশন আরা।
না হলো গপ্পো-
এমনকি না হলো একটা হুলোবেড়ালের আঁচড়কাটা ছবি।
সে বেড়ালটা তুমি চেনো রোশন আরা
সতর্ক তপস্বিনী
আদুরে গোল থাবা যখন তখন তুলে দেয় দেয়ালে।
দেয়াল তো আর মানুষ নয় যে (এই দেয়ালটাও বড্ড চেনা তোমার)
তুলে নেবে সনির্বন্ধ মুঠি...
দেয়াল তো আর ইঁদুরও নয় যে
ভাববে মুঠোর আড়ালে চকমক করছে ছুরিগুচ্ছ
দেয়াল দেয়ালই।
দাবীদাওয়া শ্লোগান লিখে গেলেও দেয়াল।
শ্যাওলা জমে পুরু হয়ে উঠলেও দেয়াল।
আর বেড়ালটাও বেড়ালই।
রাজ্যের এঁটোকাঁটা মেখে ছাইগাদা থেকে লাজুক মুখে উঠে আসতে
তাকে লোকে বহুবার দেখেছে। লোকে বহুবার বস্তাবন্দী করে ছেড়ে এসেছে তাকে
অচেনা জনারন্যে।

     রোশন আরার যা কিছু নতুন শস্যের মতো করোজ্জ্বল ছিল, তার ভেতর নোনাজল ঢুকে মাঠকে মাঠ জ্বলে যেতে থাকলো।
দুহাত তুলে তাকে প্রতিহত করতেও সে ক্লান্তবোধ করছিল।
ভোগ কিংবা সম্ভোগের শেষে শুধু কি একজনেরই নিজেকে ভুক্তাবশেষ লাগে? একজনেরই বুকের ঘাসপাতা হেমন্তরাত্রির বাতাস এসে নিড়িয়ে দিয়ে যায়?
অমিয় তো বাতাসে ভোঁকাট্টা ঘুড়ি। ইলেক্ট্রিক তারে জড়িয়ে মড়িয়ে গেলেও হিল্লোলে সে শারদাকাশের দোসর। রোশন আরার পরিবর্তন সে চেয়ে দেখেনি।

     অবশ্য পুরো দৃশ্যপটই এমন ধূমলরঙে আঁকা ছিলনা। মাঝেমাঝে গভীর গভীর আদর শেষে তারা অফুরন্ত অন্তরঙ্গতা বোধ করতো। সিলিং থেকে নামতো কতো অদৃশ্য রঙীন কাগজের শিকলি। খুব ভাব হয়ে যেতো দুজনের। (লেস-ফিতাওয়ালার চৌকোনা কাঁচের তোরঙ্গ থেকে হাওয়াই-মেঠাই হয়ে দাদাভাই চালভাজা খাই/রয়না মাছের মুড়ো অব্দি একসাথে দৌড় জীবনে কিছু স্থায়ী নৈকট্যের সুর রেখে যায়, প্রেম কিংবা অপ্রেমে তা মুছতোনা।)
     তখন অমিয়র আঙুল পিয়ানোয় সুরের চাবিতে এসে বসবার মতো খুঁজে পেতো নুড়ির মতো স্তন- তার নিশ্চুপ সুরের চাবি। অমিয় সেইসব বোধ করতো- যা লোকে নিজের গ্রামের ডাকঘর-পাতকুয়া কিংবা হিজলগাছের প্রতি বোধ করে।
     দুঃসময়ের মুখোমুখি তারা হলো কেবল তখনি- যখন আশিক এলাহির সাথে রোশন আরার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো।
আশিক রোশন আরাকে দেখতে এসেছিল।
রোশন আরা একটা গোলাপজামরঙা জামদানি শাড়ি পরেছিল।
আউটার সার্কুলার রোডের একটা নিরিবিলি চীনা রেস্তোঁরায় তারা খেয়েওছিল।
যথাশীঘ্রি রোশন আরার মাকে আশিক জানিয়েছিল সে রোশন আরাকে বিয়ে করতে চায়।

     নিরালা দুপুরে সারাবাড়ি যখন পাখার তলায় ভাতঘুম দিচ্ছে-তখন কাঁদতে কাঁদতে রোশন আরা অমিয়র শার্ট ভিজিয়ে ফেললো।
হতভম্ব অমিয় কেবল একটা শব্দকেই হাইপার-রুবিক্স কিউবের মতো মেলাতে চেষ্টা করছিল- ইনসেস্ট।
ব্রন্টি সিস্টার্স পড়বার সময় তারা কি দারুন একাত্মতা বোধ করেছিল হীথক্লিফ্‌ আর ক্যাথির প্রতি। (ইনসেস্ট নয়?তারা কি বেড়ে উঠবার সময় জানতোনা তারা ভাইবোন? You shall not uncover the nakedness of your sister…Leviticus 18, 7-18)
অমিয় আজ অব্দি জানেনা তারা নিষিদ্ধ সম্পর্কের অধীন কিনা। কেন হবে? বাবা-মা আলাদা, এমনকী তারা স্তন্যসমবায়ও করেনি। আহা, রোশন আরা চলো যাই ভ্যালি অফ্‌ দ্য কিংসএ, মৃত্যু-উপত্যকায় আমার সহচরী হতে তোমার বাধা নেই কোনো।

     (অমিয়র বাবাকে তাঁর স্ত্রী ছেড়ে গেছিলেন। আর রোশন আরার বাবা মারা গেছিলেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। অমিয়র বাবা যখন রোশন আরার বিধবা মাকে বিয়ে করেন- তখন সে এলিমেন্টারী স্কুলে যায়, আর রোশন আরা সেরাতে তার খালার কাছে বেঘোরে ঘুমিয়েছে।)
চোখ মুছেটুছে রোশন আরা এসে তার মাকে জানালো- সে দাদাভাইকে বিয়ে করবে। এর উত্তরে মা তাকে কি বলেছিলেন, তা রোশন আরা আমাকে কোনোদিন বলেনি (গ্লানিকর কিছুই হবে!) তাকে নির্দিষ্ট দিনে কনে সেজে বিয়ে বসতে দেখা গেল।
আর একটা কথা রোশন আরা কাউকে বলেনি।
বিয়ের আগের দিন অবধি কতবার যে ত্রস্ত হাতে একে অন্যকে টেনে নিয়েছিল তারা, দরজার আড়ালে, দেরাজের আড়ালে, ছাদের সিঁড়িতে, বাথরুমে...দীর্ঘ মরুযাত্রার আগে উটকেও বোধহয় এতো ভার বাঁধাছাঁদা করে দেয়া হয়না।

অতএব আশিক এলাহি যখন তাকে হাত ধরে বাসরঘরে এনে তুললো, তার মনে হলো হয় আশিক দস্তানা পরে আছে, অথবা সে বর্ষাতি পরে আছে। অমিয়র স্পর্শ তার শরীরে ঝন্‌ঝন্‌ করছে, সে আর কিছুই টের পেলনা।
আবছা দেখলো লাল খাপরা ছাওয়া একতলা বাড়ি, তার চালে উঠে গেছে প্রকান্ড রেঙ্গুনক্রিপার।
আঙিনায় ডালিমগাছ একটা। কামিনী। ছোট্ট মরিচক্ষেত। মেহেদীর বেড়া।
পাগাড়ের দিকে ঢোলকলমী।
হা ঈশ্বর মাখন লেপ্টে দাও আমার চোখদুটোয়।
আমার নাকের ফুটো বুঁজিয়ে দাও রসুনকোয়ায়।
আমার দুহাতের আঁজলায় গমের দানা ভরে দাও-
যেন আর কোনও দাবীতে উত্তোলিত হতে না পারে এই মুষ্টি।
এবং এইবার নির্বিঘ্নে গল্প করো স্বর্গের। দুধ মধু মদ্যের।
সবের রেশ থিতিয়ে যাবার পর রৌদ্রের দুপুরে ভেজাচুল শুকোতে শুকোতে তার মনে হতে লাগলো- হয়তো তার মা আগেই টের পেয়েছিল দাদাভাইয়ের কথা। নয়তো এত তড়িঘড়ি এইরকম হতশ্রী পরিবারে তাকে বিয়ে দিয়ে দেবে কেন?
     বড় বড় অ্যালবামে কত ডাকটিকেট। আশিক জমিয়েছে।
কত মৃত প্রজাপতি। মথ। রেশমপোকা।
সকালবেলা সে কাওন খাওয়ায় রাজ্যের চড়ুই পাখিকে।
টঙে বসে থাকে অনেক পায়রা। আশিক পুষেছে। নীলে, গোলা, গিরিবাজ, লক্কা।
পাড়ার সব বেড়াল এঁটোকাঁটা খেতে আসে এই বাড়িটায়। নেড়িকুকুরগুলোও আসে।
আশিকের একটা গরুও ছিল, বাদলা রোগে না কি ছাই রোগে মরে গেল গরুটা। আশিকের সে কী কান্না।
     কী যত্নে আশিক গরম পানিতে কুঁড়ো আর মাড় মিলিয়ে জাবনা তোয়ের করতো, এঁটুলি যাবার জন্যে বিছুটি-ঘাসের নুড়ো দিয়ে ঘষতো গাইয়ের গা, দুইবার জন্যে বাঁট ছুঁতো কতো আদরে, ডাঁশ তাড়াতো-
রোশন আরা নিজে প্রায় গরুর মতো নির্বিবাদে জীবন বইছিল।
আশিক এলাহি তার চুলে দেবার নারকেল তেলে মেথি-আমলকি-রাঙাজবা-একাঙ্গী পিষে ছোট ছোট গুলি পাকিয়ে ডুবিয়ে রাখতো, লোডশেডিং এর সময় তাকে তালপাখার হাওয়া করতো, গরমের রাতে পিঠে ঘষতো ঘামাচি পাউডার, মিলিত হতো এমন যে রোশন আরা যেন কাঁচের বোতল (হ্যান্ডল উইথ্‌ কেয়ার)।
     বিয়ের পর প্রথম রজোদর্শনে রোশন আরা কেঁদেছিল, সে ভেবেছিল সে অমিয়কে জরায়ূতে বয়ে এনেছে, আনেনি। ঈডিপাসের সন্তানদের কি হয়েছিল? অমিয়র বাপ জানবে, অনেক পড়াশোনা করতেন তিনি।
রোজা রাখলে ক্ষুধা হবে।
শবে বরাতে হালুয়ারুটি হবে।
কেটে গেলে রক্তপাত হবে।
যীশু জন্মালেই লোকে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করবে।
কন্যাজন্মে প্রতিভা দেখালে লোকে তাকে একালেও আম্রপালি করবে।
ভালবাসাবাসি দেখলেই লোকে পাথর ছুঁড়বে।
সমতলে নেমে নদীর বেগ ঢিমে হবে।
পাহাড়ের রোমকূপ থেকে আজীবন ঝর্ণাক্ষরণ হবে।
আমাদের পাড়ায় চিরকালই লোডশেডিং হবে।
আর...গলগল করে ঘামতে ঘামতে মশা তাড়াতে তাড়াতে রোশন আরার অমিয়কে মনে হবে। হবেই।

     আশিকের হাত তার অসহ্য লাগতে থাকে। সে যেন চুলে আড়ম্বর করে আড়াবেনী বেঁধে দিতে না পারে- এই জন্যে রোশন আরা চুল ছেঁটে ফেললো। নিজের খাট পাতলো উত্তরের ঘরে। যে রোশন আরা হিচ্‌ককের সিনেমা দেখতো আর পাবলো নেরুদার কবিতা অনুবাদ করবার বৃথা চেষ্টা করতো- সে কেমন করে আশিক এলাহির ঘরে জীবন কাটাতে এলো- তা সে বুঝতে পারলোনা। 

     আশিক এলাহি মাঝে মাঝে গ্রামে যেতো। বিহ্বল চেয়ে থাকতো করুগেটেড্‌ আয়রন শিট্‌ এ আর রাইস্‌মিলের চাতালে অকৃপণ জ্যোস্নায়, সিউলিপাড়া থেকে গুড় কিনে আনতো আর সদর থেকে ফুলের চারা।
প্রাণপণ পরিচর্যার পরও কেন তার চারাগুলি নেতিয়ে যেত,
কেন পাখিঘরের বদরীপাখিরা মুনিয়ারা ঠ্যাং উলটে মরে যেত,
কেন খরগোশের বাচ্চারা নালায় পড়ে মরে থাকতো,
কেন রোশন আরাও হয়ে উঠেছিল খিটখিটে!
তেমনি এক জুমাবারে সে গ্রামে এসেছিল। আর রোশন আরা এসেছিল কলোনীর দেয়াল ঘেঁষে যে কাঁচাবাজার বসে- সেখানে। কুচো চিংড়ী আর কচুর লতি কিনতে। আর একটু মুসুরির ডাল।
অমিয়ও কেন জানি সেই বাজারেই এসেছে। শিমবিচি আর টমেটো কিনতে। বেগুনবিচি চাল আর ফেরার পথে ফার্মেসী থেকে কনডম।
মুটে মজুরদের পয়সা নিঃশেষে চুকিয়ে দিলে
তোমার দয়ার শরীর।
মাথায় করে মোট বইতে আহা কি কষ্ট ওদের।
ওরাও জানলো তোমার দয়ার শরীর।
অথচ
গত এক হাজার বছর যাবত
আমি তোমার স্মৃতি (আরকপূর্ণ পিপে)
মাথায় বয়ে বেড়াচ্ছি
একবারও তুমি পাওনা মেটাবার কথা
মুখেও আনলেনা-
খুব স্বাভাবিকভাবে রোশন আরা আর অমিয় রোশন আরার বাসায় ঢুকলো। খুব অনায়াসে অমিয় রোশন আরাকে তার শাড়ি-জামা-অন্তর্বাসের আড়াল থেকে বের করে আনতে আনতে দেখলো-রোশন আরা চোখ-কপাল ঢেকে আছে হাতে- তার নীল চুড়িতে জ্বলছে জোনাকীর মতো ছোট ছোট ফুলকি। শুয়ে থাকা শরীরের ঘূর্ণায়মান উপবৃত্তগুলি-স্তূপাকার স্তনগুলি ঘিরে আছে বদ্ধ-জানালার ভোঁতা আলো। একটা শ্লথ শামুক উঠছে কচুর ফুলকে পরাগায়িত করতে।
     কোন পুরাণকাহিনীর তিন বোন কাঁদতে কাঁদতে গাছ হয়ে গেছিল?
গাছ হবার পরও তাদের শরীর থেকে ঝরতো অ্যাম্বার রঙা তৈলস্ফটিক?
বাবা জানবে। অমিয় জানেনা। সে শুধু জানলো দীর্ঘশ্বাস-ক্ষুধা-পরিতৃপ্তি-অভাববোধ এইসবের সাথে আসলে মনের কোনও সম্বন্ধ নাই, এগুলি নেহায়েত শরীর নামক স্বরলিপির এক একটা রীড্‌। (দীর্ঘদিনের অর্ধাহারীর ওরকম উদরপুর্তির সময়ও তার চোখ এড়ালোনা রোশন আরার সায়ার কাপড়ে তিলে পড়েছে। নাভির খাঁজে জমেছে ময়লা।)
সেদিন সকাল থেকে মেঘলা ছিল, দুপুরবেলা আকাশ কালো করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
অঝোর দুপুরে আলোহীন ঘরে স্যাঁতসেঁতে বিছানায় একে অন্যকে বেঁধে তারা কত হাসলো-কাঁদলো।
খাঁচার মুনিয়ারা দোল খেতে খেতে ধড়ফড় করলো।
নেড়িকুত্তাগুলি ভিজে গায়ে কাঁপতে কাঁপতে বারান্দায় এসে আশ্রয় নিলো।
পাখিঘরের ওপর মরা-পুঁইয়ের লতা, তার টিনের চালে শপ্‌শপাশপ্‌ বৃষ্টির শব্দ।
রোশন আরা উঠে গিয়ে গোসল সেরে এসেছে, চুলো ধরিয়ে ভাত-তরকারী বসিয়েছে। বৃষ্টির ভেতর নেমে গিয়ে অমিয় কয়েকটা কাঁচামরিচ তুলে এনেছে। স্নানঘরের জানালা দিয়ে যতক্ষণে পশ্চিমের আকাশের অ্যাজটেক্‌ গোল্ড আলো আসছে- বৃষ্টি ধরে যাবার পর জোলো বাতাসে হি হি করে মুখোমুখি ভাত খেতে খেতে তাদের দুজনেরই মনে হতে লাগলো- এইরকম একটা ঘর- এইরকম একটা গেরস্থালি তাদের দুজনার হতে পারতো। কখনো হবেনা।
কোনকিছু ভেঙে গড়বার নেই,
কোথাও পালিয়ে যাবার নেই- তারা কেবল লুকিয়ে লুকিয়ে পুতুলখেলা খেলতে পারে-
অমিয়কে এই পরিবেদনা কতটা তাড়া করেছিল তা আমার জানা নেই, আমি জানি রোশন আরার অংশ।
তার ব্যাকুলতা। তার রাতের পর রাত অনিদ্রা।

তবে ধরা যেতে পারে অমিয় কিছুটা হতাশ হয়েছিল। রোশন আরার ছিল কিউবার রাত্রির আকাশের মতো কাজলা নীল চুল- শুকতারার মতো ঝিকমিকে সেক্স-অ্যাপীল। এই রোশন আরার চটচটে চুলে সুতিকার তাবিজ লুকোনো থাকলে অমিয় অবাক হবেনা। অবাক হবেনা এই ধূসর নারী তার শিশুর মলদ্বারে গুড় মেখে গুঁড়াক্রিমি তাড়ানোর ব্যবস্থা করলে। হতাশা কিংবা বেদনা। যাই অমিয় বোধ করুক, রোশন আরা সেটা বাতাসে টের পেয়েছিল। পরের কটা দিন সে কাঁথাকাপড় রৌদ্রে দিয়েছিল, যা কিছু তেলচিটচিটে তার সব কেচে সাফ করেছিল। (নিজের বেলায়ও প্রযত্ন নিয়েছিল সে, তার উদাস-মাধুরী ফিরে এসেছিল। সঙ্গে একরকম ঝাঁঝালো নিষ্ঠুরতা, রোশন আরায় যা নূতন।)

আশিক আসবার কথা ছিল তিনদিন পর। এই আড়াই দিন তারা কোত্থাও যায়নি, ঘরের বার হয়নি, তেমন কথাও বলেনি কি? বাসী তরকারীর গন্ধে গুমোট হয়েছে মিটসেফ। এই আড়াই দিন তারা অবিরাম চুমু খেয়েছে আর মিলিত হয়েছে। নির্নিরোধ।
এবার গ্রাম থেকে ফিরেই আশিকের দুম্‌ করে মনে হলো- কি যেন পরিবর্তন ঘটে গেছে। ঘরদুয়ার ফট্‌ফটে পরিষ্কার। উঠান কুকুরের বিষ্ঠাহীন।
গমের দানায় ফেটে পড়ছে পাখিঘর।
আগাছা উপড়ে ডাঁই করা একপাশে।
আর অজস্র পরাগকেশরের মাঝে গর্ভমুন্ডের মতো রোশন আরা দাঁড়িয়ে-সটান সোজা, তার চোখের দৃষ্টি অব্দি ফিটকিরি দেয়া জলের মতো স্বচ্ছ।
কেবল আশিক যখন রোশন আরার পিঠে হাত রেখে মিনতি করলো-দক্ষিণের ঘরে রোশন আরা ঘুমাবে কি না, তখন রোশন আরার মনে হলো এতো অশ্লীল প্রস্তাব সে জীবনে শোনেনি। রৌদ্র ঠিক্‌রে পড়া একটি বৈদূর্যমণির মতো সে জবাব করলো- না

আশিক চাকরীর বাইরে টিউশনি করতো। ঘর দিনমানে শুনসানই থাকতো। নিরালা উঠানে বসে পাগাড়ের টিঙটিঙে ঢোলকলমী গাছে বড় বড় বেগ্‌নী ফুলের নাচন দেখতে দেখতে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠতো রোশন আরা।
তার খর চোখে সবচেয়ে লাগতো এসে- তার মা এবং অমিয়র বাবা দিব্যি স্বামী-স্ত্রীর সংসার করছে।
একে অপরকে মোটেই ভাল না বেসে। আর একবুক ভালবাসা নিয়ে সে আর অমিয় যে যার কক্ষপথে পাগলের মতো ঘুরছে। পৃথিবীময় এ কী অপচয়!
গ্রীষ্মদিন রোশন আরা কখনো ভালবাসেনাই।
যে বৃহদাকার পরীক্ষার অতৃপ্তিদায়ক ফলাফল তাহার শরীরে
যক্ষ্মাটীকার ন্যায় মিশিয়া আছে...সেসকল পরীক্ষার সকলেই কী করিয়া যেন
গ্রীষ্মকালেই অনুষ্ঠিত হইয়াছে। কৈশোরে যে বন্ধুর আকন্ঠ হৃদয়
রোশন আরা নিজের জীবনোপলব্ধি ঠাসিয়া মৌচাক বানাইয়া ফেলিয়াছিল-
তাহার নিকট হইতে হঠকারিতা পাইবার কালও গ্রীষ্মকাল।
অথচ এখন গ্রীষ্মকাল-ই।
যখন মহৎ-উজ্জ্বল সন্তদের মতো দীর্ঘায়ূ দিবস জন্মিতেছে।
রোশন আরা...তোমার পাশের লোকটি পর্যন্ত একসময় বাদ্যকারহীন মাদলের মতো চুপ করিয়া যায়।
তবু বুকের ভিতর গহন অতীত ফুঁড়িয়া যোগনিদ্রা ভাঙা পৌরাণিক ড্রাগণের উত্থান
তুমি দমাইতে পারোনা।
সেকোন কালের ভালোলাগিবার স্বয়মপ্রকাশ স্মৃতি
দহনক্ষম জীবটির গায়ে পাতালের রত্নের মতো ঝকঝক করিতেছে...
(পরের বার অমিয় যখন এলো- সে চোখ ফেরাতে পারলোনা। মেহেদী বেড়ার পাশে গেরুয়া কটকী শাড়ি আর মেরুন মখমলের চটি পরে দাঁড়িয়ে আছে রোশন আরা, শ্রোণী অব্দি অবারিত চুল।)
তারা একে অপরকে পেতো খন্ডাকারে। অল্পসময়ের জন্যে। ঘর ফাঁকা থাকলে। কিংবা আশিক দেশের বাড়ি গেলে। রোশন আরা ক্লাস পালিয়ে অমিয়র ঘরে আসতে পারতো- কিন্তু অমিয় তখনো থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে।
একবার শিক্ষাসফরের নাম করে তারা উঠে পড়লো বরিশালগামী আলোকমাতাল লঞ্চে।
ভোঁ-ধ্বনি আর জলের আঁশটে গন্ধ
আর তামাটে চাঁদের আলোর মেঘনা
আর ডিঙি নৌকার মাঝিদের আলো-দেখানি নাচ
আর নির্জন ডেকে অমিয় রোশন আরার বুক একহাতে জড়িয়ে
আর দূরে লঞ্চডুবির এলাকা ঘিরে ফেলে দাঁড়ানো এম ভি হামজা।
-ডক্টর জিভাগো দেখেছিস রোশ্‌নি? সে কেমন অনায়াসে স্ত্রীর বিছানা থেকে প্রেমিকার বিছানায় চলে যেতো- বেদনা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি কি এই ঘটনাকে এমন মহত্ত্ব দিতে পারে? দর্শক ভ্রুকুটি করবার অবকাশই পায়না... অমিয়র বাবার গলার আওয়াজ রোশন আরার মাথায় বাজতে থাকে।
তার মনে হতে থাকে সে কখনো অমিয়কে সাধ মিটিয়ে পায়নি, প্রতিটা ছুটির শেষে অমিয় ক্যাডেট কলেজে চলে যেত, কোনো কোনো ছুটিতে সে বাড়িই আসতোনা, এখনো তার অমিয়কে পেতে হচ্ছে লুকোছাপা করে, পালিয়ে- সব ফুরাবার পর নিবিড় ক্লান্তি মেখে তারা শুয়ে থাকতে পারেনা- ফিসফিস করতে পারেনা- দ্রুতহাতে কাপড় পরতে পরতে চুল ফিরিয়ে নেয় হেয়ারব্রাশে।
-আমার মন ভরেনা অমিয়। আমরা কোথাও চলে যেতে পারিনা? অন্য কোনও দেশে?
পীড়াবোধ করছিল অমিয়ও। সেও তো রোশন আরাকে পেতেই চেয়েছিল সবসময়।
কত কী নামে সে ডাকতো রোশন আরাকে। আমার স্নো-গুজ, আমার মটরশুঁটি, আমার আর্মাডিলো, আমার আন্ধারমানিক।
ঠিক হলো অমিয় প্রথমে যাবে। তারপর রোশন আরাকে নিয়ে যাবে। অমিয়র অবশ্য বিলেত যাওয়া ঠিকঠাক হয়েই ছিল।

     অমিয় চলে যাবার একসপ্তাহের মধ্যে রোশন আরা টের পেল- সে দিনরাত ঘুমোচ্ছে, পাগাড়ের দুর্গন্ধ এসে তার দম আটকে আসছে, একেক সময় একেক বস্তু খাওয়ার জন্যে প্রায় উন্মাদনা বোধ করছে সে- আর স্তনবলয় জুড়ে দপদপে যন্ত্রনা।

     আশিক এলাহি জীবনটাকে সহজভাবে নিয়েছে সবসময়। শৈশবে মায়ের মৃত্যু, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে তার খেলার সঙ্গী ছোটখালাকে। ম্যাট্রিক পরীক্ষার খারাপ রেজাল্ট। পলিটেকনিকে ভর্তি হবার পর নানান দলবাজি-মারধোর।ডিপ্লোমাদের প্রতি বি.এস.সি.দের আমূল ঘৃণা, চাকরীর ক্ষেত্রে কোনঠাসা হয়ে থাকা। প্রাণীজগতের সাথে তার অনুভবের আদানপ্রদান তাই বহুদিনের।

     কিন্তু রোশন আরার মর্নিং সিকনেস- হড়হড় বমির শব্দ তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। বলা ভাল, ঘুলিয়ে দিল। বদরীপাখি, না মুনিয়া, না পুষিবেড়াল, না টমি কুকুর...কার দিকে তাকিয়ে সে এইবার মন ভাল করবে, তা বুঝতে পারলোনা। সে যে প্রায় উদ্ভিজ্জ জীবনযাপন করে- রৌদ্রে পাতা-ফুল মেলে, নিজের খাদ্য নিজে তৈরী করে এবং একরকমের নিশ্চল ভালোমানুষিতে অপরকে তোষে...এই বোধটা তাকে পাগল করে ফেললো।
একবার ভাবলো উত্তরের ঘরে গিয়ে রোশন আরাকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মেরে ফেলে কিন্তু তার পা উঠলোনা।
গভীর রাত্রে প্রগাঢ় ঈর্ষায়-বিষন্নতায় ক্ষুর হাতে জ্যোস্নার বারান্দায় এসে বসে রইলো।
তার সাড়া পেয়ে হ্যাংলা একটা বেড়াল এসে তার পায়ে কান-গলা ঘষতে লাগলো।
ঘুমের ভিতর স্বগতঃ কুঁইকুঁই করে উঠলো টমি। আশিকের আত্মহত্যা করা হলোনা।
রোশন আরাকে খুব ভাল লেগেছিল, কুড়িয়ে পাওয়া রঙীন পাথরের মতো। সে যখন প্রথম আশিক এলাহির ঘরে এলো- আনন্দে বিস্ময়ে-কৃতজ্ঞতায় আশিক স্তব্ধ হয়ে গেছিল। তার কেলে গাই বাছুরকে যেমন গভীর মায়ায় চেটে চেটে আদর করতো- সেও তেমনি করতো। অকৈতব স্নেহ।
হয়তো রোশন আরা প্রেম চেয়েছিল।

     তৃণভোজী টাপির যেমন সমস্ত দিন বিষাক্ত লতাপাতা নির্বিচারে গিলে রাতের আঁধারে খাঁড়ির মাটি খেয়ে সে বিষ নামায়, অম্নি করে আশিক গভীর রাতের নোনা মাটি খেতে থাকে।একটা কাক, নিরুপায় কাক কোকিলের ডিমে তা দেয়, বাচ্চা ফোটায়- একটা নেকড়ে স্তন্য দেয় রোমুলাসকে- মানুষ তো উন্নততর প্রাণী, এইসব সাতপাঁচ ভেবে নিল সে! (ভালোলাগে আরবার/পৃথিবীর কোণটি?)

     তার ভালমানুষিতেও কি রোশন আরা হেসেছিল? হাসেনাই। কাঁদেনাই। (বলেনাইকো দুর!) সন্তানধারণের তাবত শারীরিক করপ্রদান করেই সে অস্থির তখন। অমিয়র চিঠি আসে। ফোনও করে সে। অসহ্য রাত্রে আশিক তার গা-হাত-পা স্পঞ্জ করে দেয়। লোডশেডিং এ পাখার বাতাস করে। মুখ বদলানোর জন্যে হাতে করে চালতা নিয়ে আসে। ভ্রার্তৃস্থানীয় প্রেমিক আর পিতৃপ্রতিম স্বামী উভয়ে রোশন আরার কুশলসাধক হয়ে ওঠে।

     আশিক এলাহির গ্রামের নাম শুকলাল। সেখানে সে প্রায়ই চলে যেতো। খেতিখোলার কাজ তদারক করতো। নিজের হিস্যার সরিষার তৈল বা শুকনামরিচ নিয়ে আসতো।
তাদের গ্রামের হাটের নাম ছিল বাগিচার হাট।
হাটবারে কলসী-নদীর খাঁড়ুজল পার হয়ে কত লোক এসে জমতো হাটে। ধুলামাটির সড়ক।
তার গা ঘেঁষে অজস্র গাছে রাঙা রাঙা পলাশফুল।
খাগড়াই আর চিনির মঠ কিনে খেতে খেতে বাড়ি ফিরতো সে।
ইটা লাল পানাপুকুর ছাড়িয়ে।
গাছের গায়ে ঝুলন্ত প্রলম্বিত স্তনাকার বেলেম্বু- তার সবুজ ছায়ার নিচ দিয়ে।
দেশের বাড়িতে থাকতো তার প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রী হাস্না। সদরের রূপকানন বিউটি পার্লারে হাস্না চাকরি করতো। আশিক যখন নওল কিশোর- তখন গোসলখানার দরজার ফুটোয় চোখ রেখে সে হাস্নার স্নানের দৃশ্য দেখেছে বহুবার। পাপবোধে পীড়িত হতে হতে। একসময় তার মনে হোত হাস্না টের পাচ্ছে আশিক তাকে দেখছে। হাস্নার পুরন্ত ফটফটে শরীর স্নানঘরের অন্ধকার ফুঁড়ে জেগে উঠতো, নিভে যেতো। বিদ্যুস্পৃষ্টের মতো স্থানু দাঁড়িয়ে থাকতো আশিক।
     হাস্না এখনো শুকলাল এ থাকে। বছরের পর বছর প্রোষিতভর্তৃকার ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আশিক তার দিকে তাকায়না পর্যন্ত। শুকলালের স্তব্ধ দিনগুলিতে সে বুঁদ হয়ে থাকে অদ্ভুত এক নৈসর্গিক সঙ্গমে- বারেবারে ফিরে পায় ক্ষুদিপানায় আচ্ছন্ন অতল যোনিমন্ডল- শিশির শোষণ করে স্ফীত হয়ে ওঠা রোশন আরার বুক- শিমলতায় জড়াজড়ি, ক্ষেতের পেঁয়াজ তুলতে তুলতে তার কামনা পরিপ্লুতি লাভ করে।
রোশন আরা- তার একদা বুনোপথে খুঁজে পাওয়া রোমশ তেলাকুচা ফুল- এসবের কিছুই জানেনা।
তার দিন কাটে অমিয়র চিঠি পড়ে পড়ে।
ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আসে মাঝেমাঝে। খাস্তাবিস্কুট, লেবু চা আর ডালমুট।
তখন তালসারির পাশ দিয়ে বাগিচার হাট থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছে আশিক, সদাইপাতি সঙ্গে করে।
দাওয়ায় পাতা চিকনপাটিতে বসে সন্ধ্যার বাতাসে গা জুড়াতে জুড়াতে গুনগুন করবে বলে (ভূষণহীনা বনদেবী কার হবি তুই দুল...)

     সেবার বুলবুলিতে এসে এন্তার কামিনীফলের লাল গোটা ঠুকরে খেল। যুক্তাক্ষরের মতো ভারি শরীর নিয়ে এঘর ওঘর আইঢাই করতে করতে রোশন আরা কত কত অলসবেলা পার করলো। একসময় তার প্রতীতি জন্মালো অমিয় আর আসবেনা। একদিন হঠাৎ। সকালবেলা। এই বিশ্বাস নিয়ে সে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠলো। 

     অমিয়র চিঠি এলো তার দুদিন পর। প্রথমে সে আদর জানিয়েছে তার আমূর টাইগ্রেস্‌কে, তারপর জানিয়েছে সে প্রেমে পড়েছে। (যেন রোশন আরা আসলেই তার নিজের গ্রাম, যাকে জীবিকার্থে প্রতিবার পরিত্যাগ করা চলে।) তারপর জানিয়েছে সে এখন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ছোট গল্প পড়ছে। রোশন আরা চিঠিটা একবার পড়লো। তারপর প্রবল অবিশ্বাসে আরো একবার। পড়তে পড়তে তার হেঁচকী উঠতে লাগলো।
কী হলো তার। চুপচাপ বসে থাকে আর কাঁদে।
গভীর রাত্রে ঘুমের ভেতর দ্রিম্‌ করে দুন্দুভী বেজে ওঠে, সে জেগে ওঠে আর কাঁদে।
ইলিবিলি রৌদ্রছায়ার আনাগোনায় বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে কাঁদে।
ডালে ডালঘুঁটুনী নাড়তে নাড়তে কাঁদে।
হিমশাদা কড়ির পাহাড়, শাঁখের পাহাড় ডিঙিয়ে কোনো রাজপুত্র আসেনাতো তাকে উদ্ধার করতে! যে আসে- সে নাতিদীর্ঘ অনুজ্জ্বল (মুখটুকুনের আড়া যদিও সুকুমার) সাধারণ লোক। তার কাছে এর উপশম নাই।
রোশন আরার গা জ্বলে যেতো ওকে দেখলে- কিন্তু আর কে-ই বা আছে!
আশিক এলাহিরও স্ত্রীর কাছে এলেই তার গর্ভস্থ অপরের সন্তানকে নিয়ে ক্লেদ বোধ হতো- কিন্তু আর কে-ই বা আছে!
গর্ভকালীন শেষ সময়টুকু তাদের মধ্যে একরকম অভিযাত্রীসুলভ মর্মিতা তৈরী হলো।

     অমিয়র বিদেশিনী প্রেমিকার প্রতি রোশন আরা প্রায়শঃ যা বোধ করতো, তা বোধহয় বৈদিক নারীরা তাদের সপত্নীকূলের প্রতি বোধ করতো। জিঘাংসা। ঘেঁয়ো নির্লোম মুমূর্ষু কুকুরও কুকুরীকে অন্বেষণ করে (ভর্তৃহরি?), আশিক এলাহী এখনো রোশন আরাকে চাইতো ঠিকই- গর্ভস্থ শিশুর অচেনা পিতার প্রতি সে যা বোধ করতো- তার নামও জিঘাংসা। অন্ধকার মশারির চৌকো পৃথিবীতে তারা যে যার ছায়াশত্রুকে আঁচড়াতো কামড়াতো নিঃশব্দে। (পরিচর্যার্থে আশিক এঘরে এসে শুতো।)
ঘুমের ভেতর হাসি পেতো রোশন আরার, একদা বেহেশ্‌তী জেওর খুঁজে সে কতো হয়রান হয়েছে- সে কি অমিয়র আল্লাতী বোন নাকি আখইয়াফী বোন, তাদের সম্পর্ক আদতে কতটা নিষিদ্ধ এইসব নিয়ে! সে তো কেউ না।

     আশিক যখন প্রথম জসীমুদ্দিন রোডের একটা বাড়িতে সাবলেট থাকতে এসেছিল- প্রেমে পড়েছিল সে।
দিনের বেলা প্রায়ই মেয়েটি হাড়ভাঙা মার খেতো তার স্বামীর হাতে।
গরমের সন্ধ্যাবেলা ছাদে উঠে বালতি বালতি পানি ঢালতো সেই মেয়ে।
আর নয়নতারা রঙ আকাশের দিকে পিঠ দিয়ে গুনগুন করতো- তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা
ফুল ছাওয়া বাগানবিলাস লতার আড়ালে নিচতলার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আশিক প্রতিদিন একই গান শুনতো।
বেগুনী শাড়ি-খোলা চুল-অপটু গলা-খয়া গড়ন।
একদিন সে ধরা পড়ে গেল। মেয়েটি তরতর করে নেমে এসে ঈষভ্রুকুটি বর্ষণ করে তাকে বলেছিল- এভাবে দাঁড়িয়ে থেকোনা
সে শোনেনাই। তুমি আমারি, তুমি আমারি, মম বিজনজীবনবিহারী।।
একদিন ছাদের ঘরে মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো- তারপরই তীব্র পাপবোধে উড়ালপায়ে পালিয়ে গেছিল সে।
তার কদিন পরই তার স্বামী বদলী হয়ে গেল অন্য কোথাও, মেয়েটি চলে গেল।
(নামও জানেনা আশিক তার। বোধহয় রানু।)

     রোশন আরাকে নিদ্রাতুর আশ্লেষে সে কখনো রানু ডাকেনাই। রোশন আরা বড় বেশী প্রত্যক্ষ- বড় স্পষ্ট রঙে আঁকা- স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। তবু স্নান সেরে রৌদ্রে শাড়ি মেলতে থাকা রোশন আরা- তার পিঠে লতিয়ে থাকা ভেজা গামছা, তার কাঁচা রঙ লেগে লাল হয়ে আসা কানের লতি- এসব রানুকে খুব মনে করিয়ে দিতো।
কিন্তু শাড়ি শুকোতে দিয়েই ঘুরে দাঁড়াতো যে- সে রোশন আরা। গর্ভের শিশুর জন্যে নদী-মোহনার মতো প্রসারিত। নির্ভুল। এবং পুর্বাপর তাবত ব্যঞ্জনাকে ছাপিয়ে প্রখর। (আশিক তাকে ভালবেসেছিল)
ভূতগ্রস্তের মতো রোদে বসে থাকতো রোশন আরা।
আশিককে সে কাছে আসতো দিতো- কিন্তু তাকে তার রুচতোনা (বরাবরের মতোই)। সে কেবল তাকে সয়ে নিতে শিখছিল।

     আশিক তার কুড়িয়ে পাওয়া একটু হাস্না- বা রানু ইত্যাদি সব রোশন আরাকে পেয়ে ভুলেছিল ঠিকই, কিন্তু রোশন আরার প্রেমিক (তার নাম আশিক জানেনা) ভ্রুণ হয়ে-ভাসন্ত শিশু হয়ে তাকে ঠেলে দিতো দূরে বারবার। বদরীপাখি-কেলে গাই-পুষি ও টমি কুকুর সত্ত্বেও এইসবে সে পশুর নিরাসক্তি অর্জন করতে পারেনি।
যতবার রোশন আরা সকালবেলা মন শক্ত করে সংসারে মন দিতো- বিকেলনাগাদ তার বুক ভেঙে যেতো।
যতবার আশিক নরুন দিয়ে স্ত্রী শব্দটার আশেপাশে বিভাময় কল্‌কা-ফুল-লতাপাতা আঁকতো, ঝুরঝুর করে সব ঝরে যেতো।
রোশন আরার গর্ভকালিন সময়ে তার মা তাকে ভালমন্দ খাওয়া পাঠাতো।
গোকুল পিঠা কিংবা মুগতক্তি।
কিন্তু নিজে আসতোনা। কখনোই। যেন সে তার মায়ের গোপনস্য গোপন পাপ।
ম্লানমুখে বিকেলের ফিকে লাল আলোয় বসে রোশন আরা তার মায়ের পাঠানো সুখাদ্য চিবোতো আর উপেন্দ্রকিশোরের ছেলেদের মহাভারত পড়তো।
বেলা পর্যন্ত সে শুয়েবসে থাকতো। একসময় সে খেয়াল করলো- বারান্দার ঝোলানো রিং এ (আশিক রিং এ ঝুলতো প্রায়ই, লম্বা হবার দূরাশায়) বুলবুলির বাসা। দুটো বাচ্চা হয়েছে তাদের। কেঁচোকেন্নো ধরে এনে বুলবুলি দম্পতি সজোরে শিস্‌ দিয়ে ছানাদের ডাকে। মুখে পুরে দেয়।
খাতা খুলে রোশন আরা অনুবাদ করতে বসলো-
তোমার মুখ আমার অন্বিষ্ট, তোমার স্বর, তোমার চুল।
নিশ্চুপ ক্ষুধায় আমি ঘুরঘুর করি রাস্তায়।
রুটি আমায় পুষ্টি দেয়না, ভোর আমায় গুঁড়িয়ে দেয়...
তোমাকে আমি ভুলতে পারিনা কেন অমিয়?
কেননা সে ভাবছে অমিয় আবার তার কাছে ফিরবে? ফিরবে কেন? প্রত্যাখ্যাত হয়ে? নিজের শয্যায় আস্ত মেওয়াফলের মতো নগ্ন প্রেমিকাকে অপরের রিরংসু আবিষ্কার করে?
রোশন আরার কাছেই ফিরবে- কেননা যতদিন অন্য কেউ না জোটে- এখানে যৌনতা সুলভ! ছিঃ রোশন আরা তোমার পিত্তি নেই! (দিব্যি আছে, চিরে দেখলেই হয়!) সুলভ এবং অনুচ্চারিত।
কিন্তু, আহা শরীর! খামিরের মতো সরল, চন্দ্রলেখা আর আপেলী বুনোপথে ছাওয়া- আদুর গা।
আয়নায় মিশ্‌কালো প্যান্থারের মতো রোশন আরা ধক্‌ধক্‌ করছে।
সিনেমায় হ্রস্ব মানুষগুলি কত বিপুল পৌরুষে-ক্ষাত্রধর্মে বলীয়ান হয়ে অন্যের ঔরসজাত শিশুকে বুকে তুলে নেয়!
আশিক এলাহি করবে ওরকম?
করলে কি রোশন আরা তাকে সইতে পারতো আর একটু? (হাঃ সন্তান কি সাঁকো নাকি? তাও অন্যের?)
একান্ত বিকেলে রোশন আরা জামা খুলে দেয়, চুল এলো করে নামিয়ে দেয় গম্বুজাকার স্তনের পাড় ধরে...আয়না তারিফে ঝকঝক করে ওঠে।
তুমি কি এই বাচ্চাটা চাও রোশন আরা? (দেবে সজোর শিস? কেঁচোটেচো ধরে এনে?)
নাকি প্রেমের একটা চিহ্ন চেয়েছিলে তুমি? ঐ যে লাল লাল জড়ুলমতন হয় ঘাড়ে-কন্ঠায়-বুকে...ঐরকম কিছু? (ভাবোনি জলাধারের চিকচিকে অজস্র সাপ খেলা করবে তোমার তলপেটে।)
প্রেম চলে যাবে। পরিত্যক্ত পাখির বাসায় উঠবে পিঁপড়েসারি।
অফিস থেকে ফিরে আশিক উঁকি দিল এঘরে। প্রতিদিন দেয়। হাসিমুখেই। ঢিল পড়া ডোবার জলের মতো দুলে উঠে সম্বৃত হয় রোশন আরা। এবং মিহি রৌদ্রমাখা শুভার্থী মুখটা দেখে তার ভালো লাগলো। হাত তুলে সে আশিককে ডাকলো (উত্তরের ঘর এমনিতেই বিষন্ন!)
বুলবুলির বাসা দেখাতে।
তোমার চিঠি
অনেকদিন হয় আমি
একটা বাক্সের ভেতর তালাবদ্ধ রেখেছি।
বাক্সের ভেতর চিঠি- চিঠির ভেতর জল- জলের ভেতর রূপোলি মাছ-
বাক্সটার বাইরে আরশোলা
খচমচ করে কত কি কুটো করে-
টেবিলের ওপর বহুরাত
টনটনে চোখে দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে গিয়ে
ভেতরের গোপন ড্রয়ারে টের পেয়েছি
খচরমচর করে বাক্সটা ডিঙিয়ে যাচ্ছে
কাঁটাপেয়ে আরশোলা।
বাক্সর ভেতর আরশোলা
বুকের মধ্যে আরশোলা
ফরফর করে উড়ে উড়ে
সরে যেতে যেতে...
ঠিক যেমন করে
ন্যাপথালিনের পাশ কেটে গা বাঁচিয়ে
ওরা সংসার করে-
মলাট কাটে, ডিম পাড়ে পৃষ্ঠা ছেঁড়ে-
ওমনি করে একটা সাবধানী আরশোলা-
কত কাগজ মাড়িয়ে-কেটেকুটে ছারখার
কেবল তোমার চিঠিগুলোর
পাশ দিয়েই পা টিপে টিপে চলাফেরা-
যদি একটি সামান্য আরশোলার পদশব্দেও
বিস্ফোরিত হয় নিমগ্ন অতীত-
কেউ কি জানে
একটা মিটমিটে আরশোলার সতর্কতা-
পৃথিবীময় বিস্ফোরণকে ঠেকিয়ে রাখে?
কাগজ রুয়ে রুয়ে কাটানো,
সাবধানী সংসারী আরশোলা?
-বুলবুলি বাপমা তাদের বাচ্চার তসম নাম রাখে, জানো আশিক?
-এরা কী নাম রেখেছে?
-হিমাংশু
ঠিক সেইসময় একটা পাখি বাসায় ফিরে শিস দেয়- হ্রীঈঈমাংশু
(অমিয় হলে বলতো- না, ওর নাম দ্রীঘাংচু!) আশিক হেসে ফেলে। আলো সরে যাওয়া ঘর- রেঙ্গুন-ক্রীপারের জংলী গন্ধ- কেবল ফাল্গুনী-নিমাই-আশুতোষ পড়া একটা লোক- অফিসফেরতা কিনে আনা ছানামুখী- রোশন আরা হঠাই আর বিষন্নবোধ করছিলনা। (অসমাপ্ত)





লেখক পরিচিতি

সাগুফতা শারমিন তানিয়া

জন্ম ৮ই ডিসেম্বর, ১৯৭৬

শৈশব কেটেছে ঢাকার বাসাবোতে।স্কুল ও কলেজ যথাক্রমে হলিক্রস স্কুল এবং হলিক্রস গার্লস কলেজ।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, স্থাপত্য অনূষদ।

২০১০ বইমেলায় প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ- ‘কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম-দিনের গান’, প্রকাশক ভাষাচিত্র
২০১১ বইমেলায় প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন্থ-‘ ভরযুবতী, বেড়াল ও বাকিরা’, প্রকাশক শুদ্ধস্বর
২০১২ বইমেলায় প্রকাশিত তৃতীয় গ্রন্থ- ‘অলস দিন-খয়েরি পাতা-বাওকুড়ানি’, প্রকাশক শুদ্ধস্বর
২০১৩ বইমেলায় প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ, যুগ্মভাবে লুনা রুশদীর সাথে, -‘আনবাড়ি’, প্রকাশক শুদ্ধস্বর

    

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                      

1 টি মন্তব্য: