মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৩

বন্দরের সান্ধ্যভাষা

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম পর্ব

দ্বীপান্তরের কাল

১।

১৭৮৯ সালের কথা, অর্থাৎ, যে বছর ফ্রান্সে বিপ্লব হল। জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে লন্ডনের ওল্ড বেইলি কোর্টে তোলা হল এক গরিব লন্ডনবালিকাকে। তার নাম মেরি ওয়েড। কোর্টে তোলার সময় তার বয়স ছিল দশের কিছু বেশি। মেয়েটি রাস্তায় ভিক্ষে করত। যদিও তার মা আদালতে জানান, যে, মেয়েকে ভিক্ষে করতে তিনি শেখাননি। অন্য বড়ো মেয়েদের পাল্লায় পড়ে মেয়ে নিজেই বখে গিয়েছিল, আর মা পিছন ফিরলেই সে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত ভিক্ষের কাজে। ভিক্ষা করার জন্য অবশ্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। হয়েছিল, অন্য এক অপরাধে, ওল্ড বেইলি কোর্টের আইনী দস্তাবেজ অনুযায়ী তার নাম, "থেফট উইথ ভায়োলেন্স : হাইওয়ে রবারি' ।

মেয়েটি যা করেছিল, তার বিবরণ শুনলে অবশ্য ঠিক "রাজপথে ডাকাতি' জাতীয় কঠিন একটা ব্যাপার বলে মনে হয়না। অন্তত: আজকের দুনিয়ায় বসে। বস্তুত: দশ বছরের মেয়ের পক্ষে এমনিতেই "ডাকাতি' করা ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হয়। মেরি, তার মায়ের বর্ণনায়, যাদের পাল্লায় পড়ে বখে গিয়েছিল, সেইরকম আরেকটি মেয়ে হল জেন। জেন, মেরির চেয়ে বছর চারেকের বড়ো। আদালতের বিবরণ থেকে যা জানা যায়, যে, এরা দুজনে মিলে, প্রকাশ্য রাজপথে, আরেকটি ছোটো মেয়ের গা থেকে জোর করে পোশাক আশাক খুলে নিয়েছিল। সেই মেয়েটির বয়স ছিল আট। এবং তার নাম মেরি ফিলিপস। মেরি ওয়েড আর জেন, যাযা নিয়েছিল, আদালতের বিবরণে তারও একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়। সেই তালিকায় আছে, এক) একটি সুতির ফ্রক (যা মেয়েটি পরেছিল), দুই) একটি টিপেট (tippet),তিন) লিনেনের একটি টুপি।

বয়সে বড়ো দুটি মেয়ের হাতে সমস্ত পোশাক আশাক খুইয়ে মেরি ফিলিপস তারপর বাড়ি চলে যায়। কোনো বাধাদান ছাড়াই। সে চেঁচামেচি করেছিল, বা প্রতিবাদ করেছিল, আদালতের নথি অন্তত: সেরকম কোনো সাক্ষ্য দিচ্ছেনা। মেয়েটি কেন চেঁচামেচি করেনি বা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি, বলা খুব শক্ত। আদালতে তার দেওয়া সাক্ষ্য থেকেও সেটা খুব স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছেনা, যদিও এই প্রশ্নটি বিচারককেও ভাবিয়েছিল, জেরার ধরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আদালতে বিচারকের সাথে "ডাকাতি'র স্বীকার এই মেয়েটির দুদফায় কথা হয়। প্রথম দফাটি এরকম:

তোমার বয়স কতো?

-- আট বছর।

তুমি কি জানো তুমি কেন এখানে এসেছ?

-- হ্যাঁ।

কেন?

-- আমার ফ্রকের জন্য।

তুমি কি সত্য আর মিথ্যার তফাত জানো?

-- না।

আট বছরের মেয়ে, ভয়ের কারণেই হোক, বা ঘাবড়ে গিয়েই হোক, আদালতে খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করছে না সেটা বোঝাই যায়। দ্বিতীয় দফায় অবশ্য সে তুলনায় একটু বেশি স্বাভাবিক:

তুমি কিকরে ওদেরকে তোমার জামাকাপড় খুলে নিতে দিলে?

-- আমি জানিনা ওরা আমাকে আরেকটা বোতল দেবে বলেছিল (আগের বোতলটা ভেঙে গিয়েছিল --লেখক); ওরা আমাকে কাঁদতে বারণ করল; ছোটো মেয়েটা (মেরি ওয়েড -- লেখক) করল।

কিন্তু তুমি খুব ভালো করেই জানতে তোমার জামাকাপড়ের সঙ্গে ওদের কোনো কারবার নেই?

-- হ্যাঁ।

তাহলে কীকরে? তুমি কীকরে ওদেরকে তোমার জামাকাপড় খুলে নিতে দিলে?

-- আমি ভেবেছিলাম ওরা আবার পরিয়ে দেবে। কিন্তু পরিয়ে না দিয়ে ওরা দৌড়ে পালিয়ে গেল।

তুমি খুলে নিতে দিলে কেন?

-- আমি জানতামনা ওরা জামাকাপড় খুলে নেবে।

কিন্তু তোমার ফ্রক খুলে নিল, সেটা তো জানতে?

-- হ্যাঁ; ওরা তারপর আমার দুটো পেটিকোট খুলে নিল, আমার পকেট খুলে নিল, আবার পরিয়ে দেবে।

তোমাকে ওরা শুধু এইটুকুই করেছে তো?

-- হ্যাঁ।

কেউ মেরেছিল?

-- না।

কেউ আঘাত করেছিল?

--না।

"ডাকাতি'র স্বীকার মেরি ফিলিপসের সঙ্গে আদালতের আদানপ্রদান এখানেই শেষ। এরপর, নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, বিচারক অভিযুক্ত মেরি ওয়েডকে ঠিক তিনটি প্রশ্ন করেন:

তোমার বয়স কতো?

-- এগারোয় পড়েছি।

তোমার কোনো বন্ধু আছে?

-- হ্যাঁ।

এখানে তারা আছে?

-- না। ওরা ওয়েস্টমিনিস্টারে থাকে। ওরা আজ এখানেই ছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে ভিতরে আসতে পারেনি।

বিচারক মেরি ওয়েডকে আর কোনো প্রশ্ন করেননি। প্রশ্ন করার কিছু ছিলওনা। দুটি বাচ্চা মেয়ে আরেকটি ছোটো মেয়ের জামাকাপড় খুলে নিয়েছিল লন্ডনের রাস্তায়, ঘটনা বলতে এইটুকুই। কেন খুলেছিল স্পষ্ট নয়, কারণ তারা জামাকাপড় বেচে দেবার কোনো চেষ্টা করেছিল বলে দেখা যাচ্ছেনা। কোনো প্রচ্ছন্ন যৌন ইঙ্গিতও, অন্তত: আদালতের নথিতে নেই। স্পষ্টত:ই, আজকের নৈতিকতার বিচারে, এই বিচার এবং জেরা এবং গোটা অপরাধটিকেই আপাত:দৃষ্টিতে প্রহসন মনে হয়। বাচ্চাদের খেলাধুলা, মারামারিকে যেন হঠাৎই আদালতের গম্ভীর বিচারের বিষয় করে তোলা হয়েছে।

কিন্তু আদালতের বিচারে এই বিষয়টি এতো সরল ছিলনা। বিচারক এই পর্যন্ত শুনে, কেস ডিসমিস করে দিয়ে চলে গেলে, এই লেখা ফাঁদারই কোনো দরকার হতনা। ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, আদালত, এবং আইনব্যবস্থা অপরাধটিকে লঘু ভাবে দেখেনি। আজকের নৈতিকতার আলোতেও বিচার করেনি। বরং তাদের কাছে, এই আপাত:তুচ্ছ বিষয়টিও আইনের শৃঙ্খলা, বা ঐ জাতীয় কোনো বড়োসড়ো ব্যাপারের দ্যোতক ছিল।

অতএব, এরপর, আদালত মেরির মাকে ভর্ৎসনা করে :"আপনার সন্তান কেমন আচরণ করেছে, আপনাকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কোনো অর্থ নেই;আপনিও তার সঙ্গে সমান দোষে দোষী। তার যথাযোগ্য প্রতিপালন না করে, ঘরে বসিয়ে এইসব ব্যাপারে দক্ষ করে তুলে; ওকে রাস্তায় অবাধে ঘুরে বেড়াতে দিয়ে আপনিই এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন; তাই ওর কথা পরে হবে, বরং আপনাকে এইটুকু জিজ্ঞাসা করা উচিত, আপনার নিজের হয়ে কি বলার আছে?'

উত্তরে মা বলছেন -- "অন্য মেয়েদের পাল্লায় পড়ে ও বাইরে বেরোতো, যখনই আমি পিছন ঘুরতাম, তখনই ওদের সঙ্গে ভিক্ষে করতে বেরোতো। আমি কখনই ওকে ভিক্ষে করতে নিয়ে আসিনি; ওখানকার সব কসাইরাই আমাকে খুব ভালো করে চেনে। আমার ওদের সঙ্গে খুব ভালো মেলামেশা।

আমি আশা করব, বাকিটা আপনি দেখবেন, নইলে ওরা সবাই ফাঁসিকাঠে ঝুলবে।'

এরপর আদালত জুরিদের বলে, যে, যদিও তেমন হিংসাত্মক ব্যাপার স্যাপার এই ঘটনায় লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা, তবুও, "একজন শিশু যে পরিপ্রেক্ষিতে দুজন অপরিচিতের কবলে পড়ে, যদিও সেই অপরিচিতরা কমবয়সীই, তাকে দাঁড় করিয়ে জামাকাপড় খুলে নেওয়া হয়, সেটা একজন পূর্ণবয়স্কর বুকে পিস্তল ঠেকানোর সমতুল্য; তাই, এটা যে ডাকাতির চেয়ে কম কিছু, সে কথা আমি বলতে পারছিনা; এই কাজের ফল হল, তাদের জীবন দিয়ে এর উত্তর দিতে হবে।' ... I think you must say they are guilty of the crime for which they stand indicted, robbery, and not larceny.'

অত:পর, মেরি ওয়েডের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। শুনে যদি কেউ আঁতকে ওঠেন, তাঁকে শুধু এইটুকু স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক, যে, সালটা ১৭৮৯। মাসটা জানুয়ারি। বাস্তিলের পতন হতে তখনও মাস ছয়েক বাকি, অতএব মুক্ত দুনিয়া, সাম্য, ইত্যাদি আজকের ক্যাটেগরিগুলি এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তখনও প্রতিশোধমূলক শাস্তির যুগ। ওল্ড বেইলির রেকর্ডে দেখছি, ঠিক তার আগের বছরই রাজার বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে দুজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার আদেশ দেওয়া হয়েছে। (১)

ফাঁসির আগে মেরিকে নিয়ে যাওয়া হয় নিউগেট জেলে। এটি তৎকালীন লন্ডনের একটি কুখ্যাত কারাগার। সাধারণভাবে দ্বীপান্তরে যাবার অপেক্ষায় থাকা অপরাধীদের আর ফাঁসির আসামীদের সেখানে রাখা হত। সাড়ে সাতশোর মতো অপরাধীর সঙ্গে আরও একজন হিসাবে মেরির ঠাঁই হয়ে যায় সেখানে। অপেক্ষা করতে থাকে শেষ দিনটির।


২।

এবার একটু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি খতিয়ে দেখা যাক। বছরটা বাস্তিল পতনের, আগেই বলা হয়েছে। ইংল্যান্ডে তখন "পাগলা' রাজা তৃতীয় জর্জের রাজত্ব। ব্রিটেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে হার স্বীকার করেছে কয়েক বছর আগে। বছর পনেরো আগে, ১৭৭৫ সালে এসে গেছে জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন। গ্রেট ব্রিটেনে শুরু হয়ে গেছে বহু আলোচিত শিল্পবিপ্লব। লন্ডন, লোকসংখ্যার বিচারে, বিশ্বের বৃহত্তম শহরে পরিণত হতে চলেছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে, লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, আর ১৭৫০ সালে সাত লক্ষ। এই সংখ্যা ১৮০০ সালে যা পরিণত হয় দশ লক্ষে, এবং ১৮৫০ সালের মধ্যে কুড়ি লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। অথচ, অষ্টাদশ শতক ইংল্যান্ডের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে, অতি ধীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির শতক হিসাবে। শিশুদের কম জন্মহার, বিয়ের বেশি বয়স, এবং উচ্চ শিশুমৃত্যুর হার দিয়ে শতকটি চিহ্নিত। ফলে, অষ্টাদশ শতকের শেষ তিন বা চারটি দশকের বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মূলত: লন্ডন শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষদের অবদান। এর একটা অংশ এসেছিল হয় গৃহভৃত্য হিসাবে, অথবা কোনো না কোনো কাজের শিক্ষানবিশি নিয়ে। একটা অংশ ছিল আইরিশদের।

এর বছর পঞ্চাশ পরে, ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হবে এঙ্গেলসের বিখ্যাত বই "ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা', যাতে এই পুরো প্রেক্ষাপটটার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ১৭৬৪ সালে আবিষ্কৃত হয় সুতো কাটার (স্পিনিং) যন্ত্র "জেনি'। এই যন্ত্রটির বৈশিষ্ট্য হল, এটাতে একজন লোকই ষোল থেকে আঠারো খানা মাকু (স্পিন্ডল) একই সঙ্গে চালাতে পারত, যেখানে সাধারণ চরকাতে (স্পিনিং হুইল) থাকতো একটি মাত্র মাকু। অচিরেই সুতো কাটার জগতে পুরোনো চরকাকে হটিয়ে দিয়ে এই যন্ত্রটি একাধিপত্য বিস্তার করে। আগে যারা চরকায় সুতো কাটত, তারা এই যন্ত্রটি কিনতে বাধ্য হয়। যাদের সেই সামর্থ্য ছিলনা, তারা পরিণত হয় মজুরি শ্রমিকে। এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন, যে, এই বিশেষ যন্ত্রটিই ইংল্যান্ডে প্রথম প্রজন্মের মজুরি নির্ভর শ্রমিকের জন্ম দেয়, যারা জীবনধারণের জন্য কেবলমাত্র মজুরির উপরেই নির্ভরশীল।

ক্রমশ: শিল্প বিপ্লবের চাকা ঘুরতে শুরু করে আরও দ্রুতগতিতে, এবং আরও আরও অধিক ক্ষমতাশালী, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আবিষ্কৃত হতে থাকে, এবং আরও বেশি বেশি করে দীর্ঘ হতে থাকে মজুরদের লম্বা লাইন। এরা মূলত: পূর্বেকার কৃষক পরিবার। শিল্প বিপ্লব যাদের জমি এবং পুরোনো জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করেছিল। এই একই প্রক্রিয়া, এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন, গ্রামাঞ্চলে জমির কেন্দ্রীভবনেরও সূচনা করে, আরও বেশি বেশি লোক ভূমিচ্যুত হন, এবং তৈরি হয় "কৃষি সর্বহারা'র দল।

মূলত: জমি ও জীবিকাহারা এইসব মজুরি শ্রমিকরা ভিড় জমায় শহরগুলিতে। লন্ডন এবং অন্যান্য শহরগুলির বিপুল জনসংখ্যাবৃদ্ধির পিছনে আছে জমি ও কর্মচ্যুত এইসব "সর্বহারা'দের শহরে এসে কাজ খোঁজার উপাখ্যান। এঙ্গেলসের দেওয়া তালিকা থেকে বিভিন্ন শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা তালিকাও পাই আমরা:
           

Year:1801
Year:1831
Bradford
29,000
77,000
Halifax
63,000
130,000
Huddersfield
15,000
34,000
Leeds
53,000
125,000



অবশ্য এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু ইংলন্ডের গ্রামাঞ্চলের ভূমিহীনদের অবদান নয়। এর একটা বড়ো অংশ ছিল আইরিশও। আইরিশ অভিবাসন সম্পর্কে গোটা একটা পরিচ্ছেদ আছে এঙ্গেলসের বইটিতে। তার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো যাচ্ছেনা (যদিও মূল লেখার হিউমারটা মনে হয় অনুবাদে খানিকটা নষ্ট হয়ে গেল)।

""হিসাব করা হয়েছে, যে, এক মিলিয়নের বেশি ইতিমধ্যেই ইমিগ্রেট করেছে, এবং পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি প্রতি বছর আসছে, যাদের প্রায় প্রত্যেকেই শিল্প জেলাগুলিতে, বিশেষ করে বড়ো শহরগুলিতে ঢুকছে, এবং জনসমষ্টির সর্বনিম্ন স্তরটিকে তৈরি করছে। ফলে লন্ডনে ১২০,০০০; ম্যাঞ্চেস্টারে ৪০,০০০; লিভারপুলে ৩৪,০০০; ব্রিস্টলে ২৪,০০০, গ্লাসগোতে ৪০,০০০; এডিনবরায় ২৯,০০০, গরীব আইরিশ জনতার বাস। এরা বেড়ে উঠেছে সভ্যতার প্রায় বিন্দুমাত্র ছোঁয়া ছাড়া, এরা জন্ম থেকেই সমস্ত রকম স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবে অভ্যস্ত, দুর্বিনীত, মাদকাসক্ত,এবং অজ্ঞ, ইংরেজ জনসমষ্টি যাদের বাস্তবিকই শিক্ষা এবং নৈতিকতার দিকে একটি ঝোঁক আছে তাদের মধ্যে এরা নিয়ে আসে নিজেদের যাবতীয় বর্বর অভ্যাসমূহকে।

.....

আরব যেমন নিজের ঘোড়াকে ভালোবাসে, আইরিশম্যান ঠিক তেমনই ভালোবাসে নিজের শুয়োরকে, তফাত একটাই যে শুয়োরটা মারার মতো মোটা হলেই সে বেচে দেয়। অন্যথায়, সে ওর সঙ্গেই খায় এবং শোয়, তার ছেলেমেয়েরা শুয়োরের সঙ্গেই খেলে, পিঠে চড়ে, ময়লায় গড়াগড়ি দেয়, এ জিনিস ইংল্যান্ডের বড়ো শহরগুলিতে হাজারবার পুনরাবৃত্ত হতে দেখা গেছে। তাদের বাড়িতে যে নোংরা এবং স্বাচ্ছন্দ্যহীনতা বিরাজ করে তা বর্ণনা করা অসম্ভব। আইরিশম্যানের আসবাবে অভ্যাস নেই; তার রাতের গদি হল একটা খড়ের গাদা আর ব্যবহার করার অযোগ্য কয়েকটা কম্বল। রান্নাঘর, যা কিনা তার বসার এবং শোবার ঘরও বটে, তাতে থাকে একটা কাঠের টুকরো, একটা ভাঙা চেয়ার, টেবিলের বদলে একটা পুরোনো আলমারি, একটা চায়ের কেটলি, কটা থালা আর বাটি। তার যখন জ্বালানি দরকার হয়, তখন হাতের কাছে দাহ্য যা কিছু পায়, চেয়ার, দরজার খুঁটি, মোল্ডিং, কাঠের মেঝে, সব কিছুই চিমনি দিয়ে উড়ে যায়। তার চেয়েও বড়ো কথা, আরও বেশি জায়গা লাগবে কেন? দেশে তার মাটির কুঁড়েতে যাবতীয় গার্হস্থ প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার একখানাই ঘর ছিল; ইংল্যান্ডে তার পরিবারের জন্য এক খানার বেশি ঘর দরকার নেই। তাই এক ঘরে অনেক লোককে ঠেসে দেবার যে পদ্ধতিটি এখন সার্বজনীন, তার উৎস মূলত: আইরিশ অভিবাসন। এবং যেহেতু এই বেচারা বদমাশের অন্তত: একটা আনন্দের উপকরণ দরকার, এবং সমাজ বাকি সব দরজাগুলোই দিয়েছে বন্ধ করে, তাই সে মদে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়।
.....

এইরকম একজন প্রতিযোগীর সঙ্গে ইংলিশ শ্রমিককে যুঝতে হয়, এমন একজন প্রতিযোগী যে সভ্য সমাজের পক্ষে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন স্তরে বাস করে, এবং এই কারণেই যার মজুরির চাহিদা অন্য সকলের চাইতে কম। ফলে কার্লাইল যেমন বলেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছু হওয়া অসম্ভব, প্রতিটি জায়গায় আইরিশরা যেখানেই প্রতিযোগিতা করছে, সেখানেই ইংলিশ শ্রমিকের মজুরি ক্রমশ বেশি বেশি করে নিচে নেমে আসবে। এবং এই প্রতিযোগিতার জায়গাগুলি বহুসংখ্যক।'' (২)


যদিও অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু এখানে একটা জিনিস লক্ষ্য না করে পারা যাচ্ছেনা। সেটা হল এঙ্গেলসের ভাষা। আইরিশ অভিবাসন নিয়ে কার্লাইলের লেখা পড়লে মনে হয় যেন মুম্বইতে বাংলাদেশী অভিবাসন নিয়ে শিবসেনার বক্তব্য পড়ছি, অথবা মেক্সিকান অভিবাসন নিয়ে আমেরিকান নিও কনজার্ভেটিভদের। ততটা না গেলেও, এঙ্গেলসের বক্তব্যের শ্লেষ লক্ষ্যণীয়, যাতে বিন্দুমাত্র সহানুভূতির ছোঁয়া নেই। উচ্ছেদ হওয়া কৃষকদের সম্পর্কেও এই একই বইয়ে এঙ্গেলস বিন্দুমাত্র সহানুভূতিশীল নন। সেটা আজকের দুনিয়ার আমাদের চোখে লাগে, যদিও চোখে লাগার কোনো কারণ নেই, কারণ "ভূমিপুত্রের অধিকার' জাতীয় ধারণাগুলি তখনও দিনের আলো দেখেনি। আর কৃষক উচ্ছেদ হয়ে শহরে আসছে, এবং পরিণত হচ্ছে "সর্বহারা'য়, এটা এঙ্গেলসের কাছে বেশ "স্বাভাবিক' ব্যাপার।তো, এই ব্যাপারটা বাদ দিলে, মোদ্দা কথাটা হল, গাদাগাদা অশিক্ষিত, অসভ্য, গরিব আইরিশে ভরে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের শহরাঞ্চলগুলি। এবং খাস ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের মজুরির প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে এমন একদল লোকেদের সঙ্গে যারা মজুরির মূল্যের প্রশ্নে সভ্যজগতে যতটা নিচে নামা যায়, তার চেয়েও বেশি নিচে নামতে রাজি।

ফলে লন্ডনের অবস্থাটা ঠিক কি ছিল সেইসময়, সেটা এই বিবরণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। ভিটেমাটিছাড়া এক বিরাট সংখ্যক শিল্পমজুররা একে অপরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে চাকরির জন্য, মজুরির জন্য। সঙ্গে আছে প্রবল এক জনবিস্ফোরণ। অপরাধের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, এঙ্গেলসের বইটি ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত, আমাদের আলোচ্য ১৭৮৯ সাল থেকে পঞ্চান্ন বছর পরে। ততদিনে শিল্পায়নের চাকা দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে। তবে, বোঝাই যায়, ১৭৮৯ সালে অবস্থা ঠিক এতটা খারাপ না হলেও, এই দিকেই এগোচ্ছিল। অন্তত: অপরাধের পরিসংখ্যান সেরকমই সাক্ষ্য দেয়। আমাদের চিরপুরাতন ওলড বেইলি কোর্টের নথিপত্র ঘেঁটে যে তথ্য পাচ্ছি, তা এইরকম :

১৭০০ -- ১৭৫০ : নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ১৮১৫৪।
১৭৫০ -- ১৮০০ : নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ২৮৯৫৩।
১৮০০ -- ১৮৫০ : নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ৪৭৭৪৪। (৩)

এই তথ্যসমূহকে হরেকরকম ভাবে পড়া যেতে পারে। কিন্তু আপাতত: ১৭৬৪ তে "জেনি' আবিষ্কার, ১৭৭৫ এ প্রথম স্টিম ইঞ্জিন থেকে শুরু করে ১৮৪১ সালে বাহান্ন কোটি পাউন্ড তুলো আমদানির যে সিঁড়িভাঙা অঙ্ক, তার সঙ্গে এই সংখ্যারাশি একদম খাপেখাপ মিলে যায়। যে, লোকসংখ্যা বাড়ছে, অপরাধ বাড়ছে, ক্রমশ:ভর্তি হয়ে যাচ্ছে কারাগার। ১৭৮৯ সালে, আমাদের আলোচনার অভাগা মেয়েটি, অর্থাৎ ফাঁসির আসামী মেরি ওয়েডকে নিউগেট নামক যে জেলখানাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তাতে তখন সাড়ে সাতশোর মতো আসামী ছিল, যদিও, জানা যাচ্ছে, জেলটির ধারণক্ষমতা ছিল এর অর্ধেকেরও কম। ফলে কারাগারের ভিতরে, এবং কারাগারের বাইরের লন্ডন ও তৎসহ ইংল্যান্ডের শিল্পাঞ্চল সমূহ, একই সঙ্গে মোটামুটি "ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই' নামক একই পরিণতির দিকে এগিয়ে চলছিল ১৭৮৯ সালে। লোক বেশি, কাজ কম। অপরাধী বেশি জেলখানা কম।

এর সঙ্গে আরও একটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য আমরা দেখতে পাই, যে, অপরাধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, এই সময়কালে বেড়ে চলেছে, একটি বিশেষ সাজা, যার নাম "দ্বীপান্তর'। ঐ ওল্ড বেইলি কোর্টের নথি থেকেই এ সংক্রান্ত যা তথ্য পাচ্ছি, তা এইরকম :

১৭০০ -- ১৭৫০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ৬৭২৭।

১৭৫০ -- ১৮০০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ৯০৭০।

১৮০০ -- ১৮৫০ : দ্বীপান্তরের সংখ্যা ১৪৫৬৬। (৪)

(এই হিসাবে কিঞ্চিৎ জটিলতা আছে। কারণ, এর মধ্যে রাজা যাদের "ক্ষমা' করে দ্বীপান্তরে পাঠিয়েছেন, তাদের হিসেব নেই। তাছাড়াও ১৭০০ থেকে ১৮৫০, এই দীর্ঘ ১৫০ বছরে দ্বীপান্তর আইনের বেশ কিছু পরিবর্তন হয়। এই আলোচনায় সেই জটিলতায় আমরা ঢুকছিনা, আমাদের হিসাবের জন্য এটা মোটামুটি কাজের হিসেব।)

একই সঙ্গে দেখছি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে "স্বেচ্ছায়' অভিবাসীদের সংখ্যাও। ১৮২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় বাৎসরিক ইউরোপিয়ান অভিবাসীদের সংখ্যা দশ হাজারের নিচে ছিল। ১৮২০ থেকে সংখ্যাটা নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। আর ১৮৪৫ থেকে ১৮৬০ এর মধ্যে ৩৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ ইউরোপ আর গ্রেট ব্রিটেন থেকে পাড়ি জমান আমেরিকায়। এই পরিসংখ্যানটাও আগেরটা, অর্থাৎ দ্বীপান্তরের সংখ্যারাশি আর শিল্পবিপ্লবের টাইমটেবলের সঙ্গে একদম খাপেখাপ মিলে যায়। ফলে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, যে, শিল্পবিপ্লবের স্বর্ণযুগে, দুনিয়াজোড়া লুণ্ঠনোপোযোগী খোলা বাজারের যুগেও, ব্রিটিশ সিংহ সমস্ত উচ্ছেদ হওয়া মানুষকে বিকল্প কাজ দিতে সক্ষম হয়নি। সেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে, যারা মূলত: সমাজের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া আবর্জনা, তাদেরকে পাড়ি দিতে হয়েছিল সাগরপারের নতুন দুনিয়ায়, নতুন কাজের খোঁজে।

সে যুগের দুই ধুরন্ধর ক্ষমতার তাত্ত্বিক, যথাক্রমে মার্কস এবং এঙ্গেলস, শিল্পবিপ্লবের বিশ্লেষণে, এই ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন মনে করেননি।



৩।

তো, কথা হচ্ছিল মেরি ওয়েডের। এই সেই সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যখন মেরি ওয়েডের মৃত্যুদন্ড হল। তখন তার বয়স দশ বছর দুমাস। এবং তাকে নিয়ে যাওয়া হল কুখ্যাত নিউগেট প্রিজনে। আগেই বলা হয়েছে, তখন সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ মানুষের বাস, যারা মূলত: মৃত্যুদন্ডের মতো কোনো কঠিন শাস্তির প্রতীক্ষায়।

ঠিক এই সময়েই, মেরির জীবনে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ১১ই মার্চ ১৭৮৯, "পাগলা' রাজা তৃতীয় জর্জ, এক অজানা মানসিক রোগের কবল থেকে হঠাৎই "সুস্থ' হয়ে ওঠেন। এই রাজকীয় আনন্দে, এর পাঁচ দিন পরে, সমস্ত মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধিনীদের মৃত্যুদন্ড মকুব করে দেওয়া হয়। মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে সাজা দেওয়া হয় দ্বীপান্তর। ঠিক হয়, এদেরকে পাঠানো হবে অস্ট্রেলিয়ায়। এই অপরাধিনীদের তালিকায় মেরি ওয়েডও ছিল।

ব্যাপারটা কতটা আকস্মিক, এ নিয়ে অবশ্য সন্দেহ আছে। যুদ্ধের কারণে এর বছর পনেরো কুড়ি আগে থেকেই আমেরিকায় কয়েদিদের পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে (স্মর্তব্য : আমেরিকা যুক্তরাষ্টের স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাই, ১৭৭৬)। এদিকে কয়েদিদের ভিড়ে উপচে পড়ছে সমস্ত কারাগার। যুদ্ধে হারার ফলে ব্রিটেন আরও বহুকিছুর সঙ্গে হারিয়েছে কয়েদিদের নির্বাসনে পাঠানোর একটি চমৎকার জায়গা। এরই মধ্যে ১৭৬৮ সালে জেমস কুক পৌঁছেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে কয়েদিদের ভারে ভারাক্রান্ত ব্রিটেন, বাধ্য হয়েই স্থির করে, যে দ্বীপান্তরে দন্ডিত অপরাধীদের পাঠানো হবে অস্ট্রেলিয়ায়। সেই মতো, ১৭৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বোটানি বে'র উদ্দেশ্যে রওনা হয় একটি নৌবহর, যাতে ছিল ৭৫৯ জন অপরাধী এবং ১৩ জন বাচ্চাকাচ্চা। এছাড়াও ছিল, গোরু, শস্যদানা, এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিরা। এই বহরটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে "ফার্স্ট ফ্লিট' নামে পরিচিত, এবং এরাই পত্তন করে একটি পেনাল কলোনির, যা কালে কালে পরিণত হবে সিডনি শহরে।

এই পেনাল কলোনিটি শুরু থেকেই সমস্যায় ভুগছিল, নতুন নগরের পত্তনে সবসময়েই যা হয় আর কি। স্কার্ভির প্রকোপ ছিল। আর ছিল আমাশা। ঐ পরিবেশে চাষাবাদ করায় অভ্যস্ত যথেষ্ট সংখ্যায় শ্রমিক/চাষী ছিলনা। দক্ষতাতেও ঘাটতি ছিল। জাহাজে করে আনা খাবার দাবার কমতির দিকে, ওদিকে শস্য উৎপাদনও ঠিকঠাক হয়নি, ফলে কলোনিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। লোকজন স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মেয়েদের ধর্ষণ করার অভিযোগও শোনা যায়। এই চরম বিশৃঙ্খলার খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছলে হোম আন্ডার সেক্রেটারি ইভান নেপান আসরে নামেন। তাঁর ধারণা হয়, যে, শুধু পুরুষমানুষদের নিয়ে কলোনি বানানো সম্ভব নয়। একটি স্থিতিশীল কলোনি বানানোর জন্য চাই মহিলাদের। চাই পারিবারিক বন্ধন। নেপান তাই ঠিক করেন, যে, একটি মহিলা ভর্তি জাহাজ ওখানে পাঠানো দরকার। এবং জাহাজের মেয়েরা অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে বিয়েশাদিতে জড়িয়ে পড়লেই মঙ্গল। এই মর্মে তিনি লিখিত নোটও পাঠান : " " upon landing, promote a matrimonial connection to improve morals and secure settlement. ''

এতকিছু আগেভাগে ঠিক হয়ে যাবার পর তৃতীয় জর্জ হঠাৎই "সুস্থ' হয়ে ওঠেন, এবং সমস্ত মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধিনীদের মৃত্যুদন্ড মকুব করে পরিবর্তে সাজা দেওয়া হয় দ্বীপান্তর। ফলে মেরি ওয়েডের জায়গা থেকে দেখলে, যদিও পুরো ঘটনাটাই আকস্মিক এবং প্রায় অলৌকিক বলে মনে হয়, কিন্তু একটু বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে সেই একই জিনিসকে মনে হয় নেহাৎই পূর্বনির্ধারিত। শিল্পায়নের উদ্বৃত্ত মানবজঞ্জালকে পুনর্বাসন দেবার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে দরকার ছিল গ্রেট ব্রিটেনের। আর সেখানে কলোনি বা জনবসতি গড়ে তোলার জন্য পুরুষের পাশাপাশি দরকার ছিল নারীর। মূলত: পুরুষের যৌন ক্ষিধে মেটানোর জন্য, পারিবারিক বন্ধন তৈরির জন্য, এবং সন্তান প্রজননের জন্য। এই কাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণা স্বেচ্ছাসেবিকা আর কোথায় পাওয়া যাবে, একমাত্র জেলখানা ছাড়া?

অতএব, ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে, ২২৫ (মতান্তরে ২২৬) জন মেয়ে কয়েদিকে নিয়ে "লেডি জুলিয়ানা' নামক জাহাজটি ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তাদের মধ্যে মেরি ওয়েড একজন। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন থমাস এডগার, যিনি নাকি একদা জেমস কুকের সঙ্গী ছিলেন। মেয়েদের বেশিরভাগ অংশটাই ছিল চোর, ছিঁচকে চোর এবং যৌনকর্মী। জাহাজটি দীর্ঘ দশমাস নেয় ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পোঁছতে, যা সেই সময়ের নিরিখে একটি রেকর্ড (সবচেয়ে বেশি সময় নেবার জন্য) । তার যথেষ্ট কারণও ছিল। এবং গোটা এই সুদীর্ঘ যাত্রাটিই অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। পরবর্তীকালে অত্যন্ত বিচিত্র এই জাহাজযাত্রার একটি বিবরণ লেখেন স্টুয়ার্ড জন নিকোল। বিভিন্ন সূত্র থেকে এই জাহাজযাত্রা সম্পর্কে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা এইরকম:

জাহাজটি দশ মাস সময় নেয় ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছতে। এর মধ্যে দেড় মাস খানেক থেমেছিল রিও-ডি-জেনিরো তো। উত্তমাশা অন্তরীপে থেমেছিল উনিশ দিন। স্রেফ শ দুয়েক "সিঙ্গল' মেয়েকে নিয়ে সমুদ্রে ভাসা, সে যুগের ইতিহাসে একটি বিরলতম ঘটনা, ফলে জাহাজটি মূলত: পরিণত হয় একটি প্রমোদ তরণীতে। শোনা যায়, একটি "ভাসমান পতিতাপল্লী' হিসাবে জাহাজটি নাম কিনেছিল। সমুদ্রে বেশ কিছুদূর যাবার পর, নিকোলের বিবরণ থেকে জানা যাচ্ছে, জাহাজের প্রতিটি পুরুষ (ক্রু এবং অন্যান্য কর্মীরা), মেয়েদের মধ্যে থেকে একটি করে "স্ত্রী' বেছে নিয়েছিলেন। মেয়েরাও নাকি আপত্তি করেনি (অবশ্য আপত্তি করলেই বা শুনতো কে )। এছাড়াও প্রতিটি বন্দরে অন্যান্য জাহাজের নাবিকরা ফুর্তির জন্য অবাধে আসতো এই "ভাসমান পতিতাপল্লী'তে। বোঝাই যাচ্ছে, ক্যাপ্টেন এবং জাহাজ কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটাতে বাধা তো দেনইনি বরং উৎসাহ দিয়েছিলেন। (৫)

এখানে একটা কথা আবার বলে নেওয়া ভালো, যে, সালটা ১৭৮৯। যৌন নৈতিকতা এবং আনন্দের ধারণা সে যুগে আজকের মতো ছিলনা। মেয়েদের অধিকার সংক্রান্ত ধারণাগুলি তখনও আসতে কয়েক শতাব্দী বাকি। উপরন্তু যে সমস্ত মেয়েরা এই জাহাজে ছিল, নিকোলের বিবরণ অনুযায়ী তারা ছিল বিশৃঙ্খল এবং অ্যালকোহলপ্রিয়, নিজেদের মধ্যে মারপিটও ছিল রোজকার ব্যাপার। এরা সমাজের ঝড়তি-পড়তি তলানি,একটা বড়ো অংশ ছিল পেশাদার যৌনকর্মী, সবাই এসেছে জেলখানা নামক একটি নরক এবং মৃত্যুভয় থেকে ছাড়া পেয়ে। জাহাজে তারা পেয়েছে অবাধে বিচরণের "স্বাধীনতা' -- ডেক সহ গোটা জাহাজেই অবাধে বিচরণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল তাদের। ফলে "মেয়েরা আপত্তি করেনি' ব্যাপারটা একটা অন্য কোণ থেকেও দেখা যেতে পারে, যদিও এ কথা অনস্বীকার্য, যে, এই মেয়েদের এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিলনা।

এই মেয়েদের তালিকায় বেশ কয়েকটি কৌতুহলোদ্দীপক চরিত্র ছিল। জাহাজে ছিলেন এলিজাবেথ বার্নসলি নামক এক ধনী মহিলা। শপলিফটিং করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েন। তাঁর অর্থ এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি মেয়েদের জন্য ভালো জায়গায় থাকা, শোয়া, জাতীয় বেশ কয়েকটি অধিকার আদায় করেন। এমনকি জাহাজে এবং বন্দরে বন্দরে ব্যবসাবাণিজ্যও শুরু হয়েছিল তাঁর উদ্যোগে। সবচেয়ে বড়ো ব্যবসা অবশ্য ছিল নারীমাংসের। জাহাজে ছিল র‌্যাচেল হুডির মতো যৌনকর্মী, যে নিউগেট কারাগার থেকেই মেরি ওয়েডের সঙ্গী। একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে, জেল থেকে জাহাজে এসে এরা "মুক্তি'র আনন্দ পেয়েছিল। এবং স্বেচ্ছায় শরীর সহ অন্য পণ্যের কারবার ফেঁদে বসে। এবং দু-পয়সা উপার্জনও করে, যা ভবিষ্যতে নির্বাসন জীবনে কাজে লাগবে। (পুঁজি সঞ্চয়ের এই অভিনব কায়দাটি জানতে পারলে মার্কস যে আঁতকে উঠতেন, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।) একথাও, মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে, এইসব কাজের সুবিধের জন্য এদের একটা অংশ "স্বেচ্ছা'য় জাহাজের যে কোনো এক পুরুষের সাময়িক "স্ত্রী' হতে রাজি ছিল।

"স্বেচ্ছা'য় বা "অনিচ্ছা'য়, যাই হোক, শারীরিক ভাবে এই মেয়েরা যে বহাল তবিয়তে ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খাবার-দাবার অঢেল ছিল, খোলা হাওয়া-বাতাস এবং অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা ছিল। গোটা যাত্রায় মারা গিয়েছিল মাত্র পাঁচ জন। এই পরিসংখ্যানটি অবশ্য তুলনামূলক বিচারে বুঝতে হবে। ১৭৯০ সালেই, আরও তিনটি জাহাজ, মূলত: পুরুষবন্দীদের নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া যায় । যাত্রার শুরুতে সেই তিনটি জাহাজে সব মিলিয়ে ১০২৬ জন বন্দী ছিল। একটি জাহাজে বন্দীদের ডেকে ওঠার অনুমতি দেওয়া হতনা, আরেকটিতে যথেষ্ট পরিমানে রসদ থাকা সত্ত্বেও খাবার-দাবারের জোগান ঠিক হতনা। এবং যাত্রাপথে মোট ২৬৭ জন মারা যায়।

এই তিনটি জাহাজের বহর, যা সেকেন্ড ফ্লিট নামে পরিচিত, তারা অস্ট্রেলিয়া পৌঁছয় লেডি জুলিয়ানার তিন সপ্তাহ পরে। মাঝখানে তারা শুধু একটি ছোট্টো বিরতি নিয়েছিল। উত্তমাশা অন্তরীপে। আর বহু ঘাটে বহু জল খেয়ে "ভাসমান পতিতাপল্লী' লেডি জুলিয়ানা পৌঁছয় ১৭৯০ এর জুন মাসে। তখন পেনাল কলোনির অবস্থা আরও সঙ্গীন। রসদ ফুরিয়ে এসেছে, লোকজনের "মরাল' কমতে কমতে যার নিচে আর নামা যায়না এমন এক জায়গায়। বলাবাহুল্য, শারীরিক ভাবে সুস্থ অবস্থায় পৌঁছলেও, কলোনি তাদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়নি। খাবারদাবারের নামগন্ধ নেই,এক কর্তাব্যক্তির ভাষায় " a cargo so unnecessary and so unprofitable as 222 females, instead of a cargo of provisions ' এসে উপস্থিত। আর এক কর্তাব্যক্তি, লেফটেনান্ট ক্লার্ক, তো প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলেন, একপাল damned whores এসে উপস্থিত হওয়ায়।

তো, সে যাই হোক, এইভাবেই মেরি ওয়েড মৃত্যুদন্ডের হাত থেকে রেহাই পেয়ে পৌঁছল নতুন দেশে। সুস্থ শরীরে। তার বয়স তখন এগারো পেরিয়েছে।





৪।

এরপর মেরি ওয়েডের খবর আর দীর্ঘদিন পাওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে, কিঞ্চিৎ তত্ত্বালোচনা করে নেওয়া যাক।

আগেই লিখেছি, যে, এক বিপুল সংখ্যক অভিবাসী, শিল্পবিপ্লবের ঠেলা সামলাতে না পেরে বিভিন্ন কলোনিতে চলে যেতে বাধ্য হয়। সেটা উনবিংশ শতাব্দীর ঘটনা, অষ্টাদশ শতকের মেরি ওয়েড এবং লেডি জুলিয়ানা, যার সূচনাবিন্দু মাত্র। সংখ্যার বিচারে দেখলে এই স্বেচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত অভিবাসন, শিল্পবিপ্লবকালীন ইউরোপের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদিও শিল্পবিপ্লবের কালের দুই ধুরন্ধর তাত্ত্বিক, মার্কস এবং এঙ্গেলস, এই ব্যাপারটিকে আদৌ গুরুত্ব দেননি। এঙ্গেলস উল্টে আইরিশ অভিবাসীদের নিয়ে লঘু চালে ঠাট্টা করেছেন। আর উচ্ছেদ হতে বসা কৃষকদের সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হল But intellectually, they were dead; lived only for their petty, private interest, for their looms and gardens, and knew nothing of the mighty movement which, beyond their horizon, was sweeping through mankind. সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও নেই।

ব্যাপারটা কৌতুহলোদ্দীপক, যদিও বুদ্ধির অগম্য নয়। মার্কসীয় তাত্ত্বিক কাঠামোয় ইউরোপের শিল্পবিপ্লব হল এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। আর পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা হল সামন্ততন্ত্রের চেয়ে উন্নততর একটি ব্যবস্থা। শিল্পবিপ্লব স্থবির সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। উৎপাদন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক অগ্রগতির সূচনা করে। উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে করে তোলে সামাজিক। অর্থাৎ একজন কারিগর আর একটি জিনিস বানাচ্ছেনা, বরং বহু শ্রমিক অ্যাসেম্বলি লাইনে দাঁড়িয়ে অংশগ্রহণ করছে উৎপাদনে। এইভাবে তৈরি হয় শ্রমিক শ্রেণী। স্থবির, মৃতপ্রায়, জড়বৎ কৃষককে জমি থেকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদ রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মজুরি শ্রমিক বানিয়ে তোলে। একটি উন্নততর সামাজিক ব্যবস্থায়, উন্নততর সামাজিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে এক নতুন উন্নততর শ্রেণী, যার নাম শ্রমিক শ্রেণী। এদের হাতেই শেষমেষ পুঁজিবাদের পতন ও মৃত্যু হবে।

এই তাত্ত্বিক কাঠামোয় অভিবাসনকে ঢোকানোর কোনো জায়গা নেই। যদি দেখা যায়, যে এমনকি পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগে, যখন দুনিয়াজোড়া বিরাট বাজার ইউরোপীয় পুঁজির করায়ত্ত্ব, তখনও পুঁজি উচ্ছেদ হওয়া কৃষককুলের একটা বিরাট অংশকে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অংশ করে তুলতে পারছেনা, তাহলে পুঁজিবাদ যে সামন্ততন্ত্রের চেয়ে "উন্নত' একটি ব্যবস্থা, সেই ধারণাটাই প্রশ্নচিহ্নের সামনে পড়ে যায়। তাহলে সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণকে একটি সার্বজনীন প্রক্রিয়া বলে ঘোষণা করা যাবেনা, বরং এই উত্তরণের পূর্বশর্ত হিসাবে নিয়ে আসতে হবে কলোনির ধারণাকে। অর্থাৎ, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ তখনই হবে, যদি থাকে এক) এক বা একাধিক বিরাট উপনিবেশ, যেখানে মাল বিক্রি করা যাবে, দুই) আরও কিছু উপনিবেশ, যেখানে চালান করা যাবে উদ্বৃত্ত শ্রমিকদেরকে। এতো খানি পূর্বশর্ত স্বীকার করে নিলে মার্কসবাদী সার্বজনীন নিয়মগুলি ভেঙে পড়বে।

ফলে মার্কসবাদী আলোচনায় অভিবাসন প্রসঙ্গ নেই, সেটা আশ্‌চর্যজনক কিছু না। ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হয়। তখনও মার্কসবাদী বিপ্লবের ডিসকোর্সে কলোনির কোনো জায়গা নেই। মার্কস ভারতবর্ষ নিয়ে গোটা কতক লেখা লিখেছেন, সে শুধু সাংবাদিকের কৌতুহলে, কিন্তু মূল গল্পটা তখনও খাঁটি ইউরোপীয়। ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলো প্রায় প্রাকৃতিক কোনো এক নিয়মে সমাজতন্ত্রে উত্তরিত হবে। এই ধারণায় প্রথম ছেদ দেখব রুশ বিপ্লবের আগে। লেনিন লিখবেন সাম্রাজ্যবাদই পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর, এবং পুঁজিবাদের দুনিয়াজোড়া শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটাতেই আঘাত করতে হবে। এই প্রথম আমরা জানতে পারব, যে, তুলনায় অনুন্নত দেশগুলিতেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব। মার্কসীয় ডিসকোর্সে কলোনিরা বা পূর্বতন কলোনিরা যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে আরও পরে, এবং অবশেষে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে মাও সে তুং কলোনিদের জাতে তুলবেন। ফলে কলোনিরা যে প্রথম যুগের মার্কসীয় প্রতিবেদনে অনুপস্থিত, সেটা বিস্ময়কর কিছু না।

তুলনায় কৌতুহলজনক এই ব্যাপারটা, যে, গত শতাব্দীর আর এক ধুরন্ধর ক্ষমতার তাত্ত্বিক, মিশেল ফুকোর লেখালিখিতেও বিষয়টির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছেনা। ফুকো অভিবাসন নিয়ে লেখেননি, কিন্তু শাস্তি ও শৃঙ্খলার প্রকরণ নিয়ে তাঁর বিস্তর লেখালিখি আছে। কিন্তু সেখানে দ্বীপান্তর নামক শাস্তির প্রসঙ্গটি নেই। যদিও, আর কিছু না হলেও, অন্তত: সংখ্যার বিচারে বিষয়টা কিঞ্চিৎ গুরুত্ব দাবী করে। স্রেফ ওল্ড বেইলি কোর্টের নথি থেকেই দেখতে পাচ্ছি, সেই সতেরোশো সাল থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত মোট অপরাধের অন্তত: এক তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান হত দ্বীপান্তর। পুরো দেড় শতাব্দী সময়সীমা ধরেই এই অনুপাতটা মোটামুটি অপরিবর্তনীয়। এছাড়াও রাজকীয় দয়াপ্রদর্শনের ফলে কিছু লোকজনও দ্বীপান্তরে যেতেন, সেই সংখ্যাটার সম্ভবত: কোনো যথার্থ পরিসংখ্যান নেই।

তো, এই আকর্ষণীয় বিষয়টায় আমরা ঢুকব, কিন্তু তার আগে মেরি ওয়েডের শেষপর্যন্ত ভবিতব্য কি দাঁড়াল সেটা দেখে নেওয়া যাক।

মেরি ওয়েড নতুন দেশে পৌঁছয় ১৭৯০ সালে। তার বয়স তখন এগারো। এর পর দীর্ঘদিন তার কোনো খবরাখবর আর পাওয়া যাচ্ছেনা। তার সঙ্গী র‌্যাচেল হুডি সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, যে, সেই মহিলা বিয়ে করে সংসার পাতেন, এবং তাঁর নতুন নাম হয় র‌্যাচেল উইলিয়ামস। কিন্তু মেরির সম্পর্কে কোনো সূত্র পাওয়া যাবেনা দীর্ঘদিন। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে দুশো বছরেরও বেশি। অপেক্ষা করতে হবে তিনজন একবিংশ শতাব্দীর অস্ট্রেলিয় মহিলার জন্য, যাঁরা নিজেদের আদিপরিচয় জানার জন্য খুঁড়ে বার করবেন কলোনির ইতিহাস। খুঁড়ে বার করবেন লেডি জুলিয়ানার ইতিবৃত্ত। সেই সুবাদে বেরিয়ে আসবে মেরি ওয়েডের শেষ দিনগুলি সম্পর্কিত সামান্য কিছু তথ্য।

এই তিন মহিলার নাম, মিগেন বেনসন, হেলেন ফিলিপস এবং ডেলিয়া ড্রে। পুরোনো সংবাদপত্রের সংগ্রহ, আদালতের দলিল, আরও নানা টুকরোটাকরা জিনিস তন্নতন্ন করে খুঁজে এঁরা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এঁদের প্রথম পূর্বসুরীদেরকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হন। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল, খুঁড়ে বার করতে সক্ষম হন সেই ইতিহাসও। এবং সেই ইতিহাস মূলত: সাফল্যের। পূর্বতন পতিতা, চুরির দায়ে অভিযুক্ত, দেশান্তরী র‌্যাচেল উইলিয়ামস পরিণত হন এক সফল ব্যবসায়ীতে। ঐ এলাকার প্রাচীনতম বার এবং মদের দোকানগুলির একটি ছিল র‌্যাচেলের প্রতিষ্ঠিত। এবং অস্ট্রেলিয়া উপমহাদেশের প্রথম সফল বিজনেস উওম্যানদের মধ্যে তিনি একজন। হোবার্ট টাউন গেজেটের ১৮২৩ সালের একটি সংখ্যা থেকে জানা যাচ্ছে, যে, হোবার্ট টাউনে মদ, ওয়াইন এবং বিয়ার বিক্রির বৈধ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল র‌্যাচেল উইলিয়ামসকে।

তবে লেডি জুলিয়ানার মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল বিজনেস ওম্যান খুব সম্ভবত: অ্যান মার্শ। শোনা যায় ইনি খোদ গভর্নরের পার্টিতেও আমন্ত্রিত হতেন। এই সফল ব্যবসায়ী মহিলাটি একটি ফেরি সার্ভিসটি চালু করেন, তাতে পুরুষ কর্মচারি নিয়োগ করার জন্য গভর্নরের কাছ থেকে লোক চান। এই ফেরি সার্ভিসটি আজও চালু আছে।

মেরি ওয়েড অবশ্য ব্যবসা করেছিল বলে জানা নেই। স্থানীয় সংবাদপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ৮৭ বছর বয়সে নিজের ছেলের বাড়িতে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। অস্ট্রেলিয়া উপমহাদেশে সন্তান সন্ততি নাতি পুতি মিলিয়ে তাঁর তখন ৩০০র বেশি বংশধর সমেত ভরভরন্ত সংসার। গোটা কলোনিতেই তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে এক বিরাট পরিবারের গোষ্ঠীমাতার সম্মান দেওয়া হত।

এইভাবেই শেষ হয় মেরি ওয়েডের জীবনকাহিনী। দশ বছর বয়সে লন্ডনের রাস্তায় ভিক্ষে করা যে মেয়েটিকে ডাকাতির অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল, সভ্য সমাজের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা হিসাবে সে জীবন শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়। (৬)


৫।

মেরি ওয়েডের যে আখ্যানটি এতোক্ষণ ধরে বর্ণনা করা হল, তাকে যদি স্রেফ আখ্যান হিসাবেই পড়ি, খুঁটিয়ে দেখি, তাহলে তার কম্পোজিশান, একদম শেষ অংশটিতে কেমন যেন খাপছাড়া লাগে। দশ বছর বয়সে যার মৃত্যুদন্ড হয়, "ভাসমান পতিতাপল্লী'তে চড়ে যে বালিকাকে এগারো বছর বয়সে এসে নামতে হয় সম্পূর্ণ সহায় সম্বলহীন অবস্থায় অজানা এক পেনাল কলোনিতে, প্রত্যাশিত, যে, তার জীবনের শেষ অংশে অপেক্ষা করে আছে প্রান্তসীমার বাইরের মানুষের যা অন্তিম পরিণতি, অর্থাৎ ক্ষমতার বিরাট চাকার নিচে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে বিস্মৃতির আবর্জনাস্তূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভবিতব্য। মেরি ওয়েডের গ্রেট ব্রিটেনচ্যুত হবার কাহিনীর প্রথমাংশ, আপাত:দৃষ্টিতে, তো মূলত: অস্পৃশ্য সমাজচ্যুত হয়ে প্রান্তসীমার বাইরে নিক্ষিপ্ত হবার গল্প। এবং সাধারণভাবে কয়েদিদের দ্বীপান্তরের গোটা গল্পটাই আপাত:দৃষ্টিতে তাইই। সমাজের "তলানি'র এক মানুষের দঙ্গলকে অপরাধী সাব্যস্ত করছে আদালত, মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করছে। তারপর আংশিক দয়া (benefit of clergy) দেখিয়ে, খতম না করে, তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দ্বীপান্তরে। যাবার আগে শরীরে পুড়িয়ে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে দাগী অপরাধীর চিহ্ন, যাতে তারা আর দ্বীপান্তর থেকে ফিরে না আসে। এবং ফিরে এলে তার শাস্তি : মৃত্যু। সবাই না হলেও অপরাধীদের একটা বড়ো অংশের গল্প এইই। অত:পর তাদের তুলে দেওয়া হচ্ছে বিরাট বিরাট অপরাধীবাহী জাহাজে, যারা এই বিরাট দঙ্গলকে নিয়ে যাবে অচেনা কোনো এক জগতে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায়না। আধি-ব্যধি-শ্বাপদসঙ্কুল অজানা সেই দ্বীপ,কয়েদিরা জানেনা তারা কোথায় যাচ্ছে, শুধু এটুকু জানা আছে, যে, তারা বহিষ্কৃত, ফিরে আসার অধিকাররহিত।

এই অপরাধীবহনকারী নৌবহরের সঙ্গে আরেকটি পুরাতন ইউরোপীয় ধারণার ভীষণ মিল আছে, যার নাম "শিপ অফ ফুলস' বা উন্মাদের নৌবহর। শিপ অফ ফুলস একটি পুরাতন ইউরোপিয়ান ধারণা, যা সাহিত্য এবং চিত্রকলার জগতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। উন্মাদের নৌবহর হল আদতে এই পৃথিবী ও তার জনসমাজ; এমন একটি জাহাজ, যার যাত্রীরা জানেনা তারা কোথায় যাচ্ছে এবং তারা তার পরোয়াও করেনা। ফুকো দেখাচ্ছেন, এই উন্মাদের নৌবহর মোটেই স্রেফ কোনো সাহিত্যিক গালগল্প নয়, বা শুধু প্রতীকি কোনো আখ্যান নয়, যে, শিল্পীর কল্পনায়ই তার অস্তিত্ব, বরং ভীষণভাবে বাস্তব। এই জাহাজের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল। সত্যিই কিছু জাহাজ ছিল যারা উন্মাদদের বহন করে নিয়ে নিয়ে যেতো জলরাশির ওপারে। ইউরোপীয় শহরগুলি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হত উন্মাদদের, বিতাড়িত করা হত নগরসভ্যতা থেকে, আর উন্মাদের নৌবহর সেই ইনসেন কার্গোকে বেড়াল পার করে দিয়ে আসতো অন্য কোনোখানে। জাহাজভর্তি উন্মাদ, তারা প্রান্তসীমার বাইরে নিক্ষিপ্ত, নগর থেকে বিতাড়িত, এক বা একাধিক জাহাজ তাদের বয়ে নিয়ে চলেছে অজানা কোনো গন্তব্যে,যাত্রীরা জানেনা তারা কোথায় যাচ্ছে, তারা তার পরোয়াও করেনা,-- পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় শহরগুলি এই দৃশ্য কতোবার দেখেছে।

অবিকল এই শিপ অফ ফুলসের উন্মাদদের মতো বেড়াল-পার করা হতো অপরাধীদেরও। ব্রিটেনের ১৭১৮ সালের দ্বীপান্তর আইনে দু ধরণের অপরাধের শাস্তি দেওয়া হত। দুটোই ক্যাপিটাল ফেলনি (যার শাস্তি মৃত্যু)। একটি আংশিক দয়া (benefit of clergy) পাবার যোগ্য, অন্যটি নয়। প্রথম ক্ষেত্রে, কোর্টের অধিকার ছিল মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে সরাসরি দ্বীপান্তরে পাঠানোর। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আদালত মৃত্যুদন্ডই দিত। এইসব অপরাধীদেরও দ্বীপান্তরে যাবার সুযোগ ছিল, তবে, তা একমাত্র রাজকীয় ক্ষমাপ্রদর্শনের মাধ্যমে। একমাত্র রাজাই পারতেন এইসব অপরাধীদের "ক্ষমা' করতে এবং মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে দ্বীপান্তরে পাঠাতে।

এই দয়া বা ক্ষমা পাবার অধিকার মাত্র একবারই ছিল একজন অপরাধীর। সেকারণে তাদের বুড়ো আঙুলে পুড়িয়ে ক্ষমাপ্রদর্শনের চিরস্থায়ী চিহ্ন এঁকে দেওয়া হত, যাতে দ্বিতীয়বার কোনোভাবেই এই সুযোগ না নিতে পারে অপরাধীরা। এবং এই ক্ষমাপ্রদর্শনের পরেও, সাজার পুরো সময়ের জন্যই এরা মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীই থেকে যেত, মৃত্যুর পরিবর্তে যে দ্বীপান্তর দেওয়া হচ্ছে, তাতে আইনী বা সামাজিক অবস্থান বদলাতো না। অষ্টাদশ শতাব্দীর "সাধারণ আইন' বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন জানাচ্ছেন, যে, মৃত্যুদন্ড দেওয়া মাত্রই অপরাধী "আইনের চোখে মৃত'। তাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হত। তাদের সম্পত্তির অধিকার ছিলনা। আদালতে মামলা ঠোকার অধিকার ছিলনা। এবং আদালতে সাক্ষী হিসাবে তাদের গণ্য করা হতনা। যদিও এরা মারা যায়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও, দ্বীপান্তরের সাজার পুরো সময়ের জন্য (সাত বছর/চোদ্দ বছর বা সারা জীবন) এরা ছিল মৃত মানুষ। আর শরীরের ওই পুড়িয়ে দেওয়া দাগ মূলত: একটি চিহ্ন, যা বহিষ্কারের প্রতীক। যে, এই শরীরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হল। "জীবিত' শরীরগুলিকে আলাদা করে রাখা হল পচনশীল "মৃত' শরীর থেকে। তার পচনের দুর্গন্ধ থেকে, সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে বাঁচানোর জন্য, "জীবিত' শরীরগুলিকে "শুদ্ধ' পরিবেশে বাঁচানোর জন্য, মৃত শরীরগুলিকে চালান করে দেওয়া হল দূরে, বহুদূরে। (একটা কথা এখানে অবশ্য বলে রাখা উচিত, যে, মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত অপরাধীদের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য, বাকিদের ক্ষেত্রে আইন এতটা কড়া ছিলনা। এবং মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত অপরাধীরাই যে দ্বীপান্তরের আসামীদের একটা বড়ো অংশ ছিল, সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।)

ফলে, এই "অপরাধীদের জাহাজ' গুলি ছিল মূলত: মৃত মানুষদের জাহাজ। যারা কোথায় যাচ্ছে জানেনা এবং তার পরোয়াও করেনা, কারণ, মৃত্যুর এলাকা ছেড়ে তারা মূলত: পালাচ্ছে। কোথায় গিয়ে পৌঁছল তাতে তাদের কিছু যায় আসেনা। থরে থরে মৃত মানুষের দঙ্গল নিয়ে চলেছে বোকাদের জাহাজ, যা খালাস করা হবে অজানা কোনো বন্দরে, যার নাম সিডনি। ফলে সিডনি আদতে একটি মৃত মানুষদের প্রত্নতাত্ত্বিক শহর, আর অস্ট্রেলিয়া একটি মৃত মানুষদের দেশ।

"" একজন উন্মাদকে নাবিকদের হাতে তুলে দেবার অর্থ হল, সে যে শহরের চার দেওয়ালের মধ্যে ঘুরে বেড়াবেনা এব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া; নিশ্চিত করা, যে সে দূরে বহুদূরে চলে যাবে; নিজের প্রস্থানকেই তার কারাগার বানিয়ে তোলা হয়। আর জলরাশি এর সঙ্গে যোগ করে তার নিজের মূল্যের ধূসর ভার; শুধু বহন নয়, আরও অধিক কিছু করে; বিশুদ্ধ করে তোলে। এই যাত্রা মানুষকে ভাগ্যের অনিশ্চয়তার হাতে অর্পণ করে; জলরাশিতে ভাসমান অবস্থায় প্রত্যেকেই তার নিজের ভবিতব্যের হাতে অর্পিত; প্রতিটি যাত্রাই, হতেও পারে, শেষ যাত্রা। বোকার নৌকোয় উন্মাদের যাত্রা শুরু হয় যার জন্য, সে এক অন্য পৃথিবী; যখন সে সেই নৌকো থেকে নামে, যেখান থেকে সে এসেছে সেও এক অন্য পৃথিবী। উন্মাদের নৌবহর একই সঙ্গে এক কঠোর বিভাজনরেখা এবং এক অন্তিম যাত্রা। এক অর্থে, এক আধা-বাস্তব আধা-কাল্পনিক ভূগোলকে ঘিরে, মধ্যযুগীয় চিন্তনের দিগন্তে উন্মাদের প্রান্তিক অবস্থানকে নির্মান করে এই নৌবহর ... ''

এই চমৎকার প্যারাগ্রাফটি ফুকো বিরচিত (অনুবাদ লেখকের) (৭)। লক্ষ্যণীয় এইটুকুই, যে, এখানে আদতে "বোকাদের নৌবহর'এর বিবরণ দেওয়া হলেও, এক অর্থে এটি "দ্বীপান্তরের জাহাজ' এরও বর্ণনা। শুধু "উন্মাদ' শব্দটি সরিয়ে "অপরাধী' শব্দটা বসিয়ে দিলেই আমরা পাচ্ছি দ্বীপান্তরের জাহাজের এক চমৎকার বিবরণ। "" দ্বীপান্তরের জাহাজে একজন অপরাধীকে তুলে দেবার অর্থ হল, যে, সে আর জনপদের মধ্যে ঘুরে বেড়াবেনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া; নিশ্চিত করা, যে সে দূরে বহুদূরে চলে যাবে; নিজের প্রস্থানকেই তার কারাগার বানিয়ে তোলা হয় ... '' ইত্যাদি।

কিন্তু এতো মিল সত্ত্বেও, শিপ অফ ফুলসের সঙ্গে দ্বীপান্তরের তুলনা একটি অতিসরলীকরণ হবে। কারণ, দুটো গল্পের শেষটা মেলেনা। কারণ, আগেই আমরা দেখেছি, মেরি ওয়েডের গল্পের শেষটা কেমন যেন কম্পোজিশনের সিমেট্রির বাইরে চলে যায়, যদিও উন্মাদদের গল্পটা যায়না। উন্মাদদের গল্পের শেষ অংশ মূলত: প্রান্তিকতার সীমানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবার গল্প। শহরের মধ্যে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াতো যে পাগল, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল উন্মাদের নৌবহরে। ছেড়ে দেওয়া হল, দূরে, বহুদূরে অন্য কোনো খানে। সেই শহর থেকেও সে হয়তো বিতাড়িত হল আরেকবার। শহরের চার দেওয়ালের বাইরে উন্মুক্ত মাঠেঘাটে ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়িয়ে তার জীবন কিভাবে শেষ হল, তা আর জানা যাবেনা, কারণ, সে ততদিনে সভ্যতার ডিসকোর্সের বাইরে চলে গেছে। পৌঁছে গেছে সীমানার বাইরের কৃষ্ণগহ্বরে, যেখান থেকে কোনো সংকেত আর এ মরপৃথিবীতে এসে পৌঁছয় না।

অন্য দিকে মেরি ওয়েডকেও ছুঁড়ে ফেলা হবে সভ্যতার বাইরে। কোনো ইউরোপীয় শহরে নয়, বরং পৃথিবীর বিপরীতপ্রান্তে, এক অজানা জগতে। কিন্তু প্রান্তসীমার বাইরে ছুঁড়ে ফেলা মানুষের সাধারণ গল্পের গ্র্যান্ড কম্পোজিশনটিকে অস্বীকার করে, সে টিকে থাকবে, বেঁচে থাকবে সভ্যতার অলিন্দে। এবং মেরি ওয়েড কোনো ব্যতিক্রম নয়। সামগ্রিক ভাবে গোটা অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার ইতিহাসই তাই। পৃথিবীতে আমরা দু ধরণের ব্রিটিশ উপনিবেশ দেখি। এক, ভারতবর্ষের মতো উপনিবেশ, যারা "স্বাধীন' হবার পরে পরিচিত হবে তৃতীয় বিশ্ব হিসাবে। দুই, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া, যারা ইউরোপে অবস্থান না করেও হয়ে উঠবে পশ্চিমী দেশ। "প্রকৃত' পশ্চিমে না থেকেও এরা পশ্চিম, যাদেরকে এই রচনায় এখন থেকে উদ্বৃত্ত পশ্চিম বলে ডাকা হবে। এই উদ্বৃত্ত পশ্চিমে মূলত: ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে অপরাধীদের এবং "প্রকৃত' পশ্চিমী সমাজের তলানিকে, কিন্তু তারা কৃষ্ণগহ্বরে বিলীন হয়ে যায়নি, বরং গড়ে তুলেছে বৃহত্তর এক দুনিয়াজোড়া পশ্চিমকে। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এই "অপরাধী'রাই তৈরি করেছে, বা এদের দিয়ে তৈরি করানো হয়েছে উদ্বৃত্ত পশ্চিমের ভিত্তিকে এবং সেই কাঠামোয় পরবর্তীকালে এসে ঢুকে গেছে সমাজের অন্য তলানিরা। একই পদ্ধতিতে। আমেরিকার ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি একটু জটিল। আমেরিকা, কখনই বিশুদ্ধ কোনো পেনাল কলোনি ছিলনা। অভিবাসীরা এবং অপরাধীরা হাতে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছে আধুনিক আমেরিকার কাঠামো। সমাজের তলানি এবং অপরাধীরা এই প্রক্রিয়ায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, আমেরিকা তাদের মধ্যে কোনো তফাত করেনি। এবং এই গল্প শিপ অফ ফুলসের গল্পের গ্র্যান্ড ডিজাইনের সঙ্গে একটুও মেলেনা।

ফলে শুধুমাত্র অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে উন্মাদের অন্তিম যাত্রা নয়, দ্বীপান্তরের মধ্যে বেঁচে থাকার, বেঁচে ওঠার ফুলকিও দেখা যায়। এক দিক থেকে দ্বীপান্তরের জাহাজগুলি যেন মৃত মানুষের কফিন বহন করে চলে, আবার অন্যদিকে, হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা, সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর, তেমনই নতুন দ্বীপও যেন দেখা যায় দিগন্তে। একদিকে লেডি জুলিয়ানার মেয়েরা পরিণত হয় জাহাজে ক্রুদের বাধ্যতামূলক "স্ত্রী' তে, অন্যদিকে সেই শরীরকেই বেচে বা তার বিনিময়ে তারা পায় প্লেজার ও অর্থ, যা প্রমাণ করে শরীরটি তখনও জ্যান্ত, যদিও সেই শরীরেরই বুড়ো আঙুলের পোড়া দাগে তারা তখনও বহন করে নিয়ে চলেছে প্রতীকী মৃত্যুকে।


৬।

দ্বীপান্তর যে কেবল মৃত্যুর দিকে যাত্রা নয়, আদতে পশ্চিম থেকে উদ্বৃত্ত পশ্চিমের দিকে যাত্রা, সে প্রসঙ্গে আমরা ঢুকব। কিন্তু তার সঙ্গে আগের পরিচ্ছেদের আরেকটি দাবীকে একটু খুঁটিয়ে দেখাও প্রয়োজন। আগের পরিচ্ছেদের শেষ দুটি প্যারাগ্রাফে আলতো করে দাবী করা হয়েছে, যে, আইনসম্মত অভিবাসীরা আর অপরাধীরা নতুন জগতে প্রবেশ করে মূলত: একই পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, একটা সাধারণীকরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এতক্ষণ কলোনিতে অপরাধীদের ছুঁড়ে ফেলা নিয়ে যে আখ্যানটি ফাঁদা হয়েছে, সেটা শুধু অপরাধীদের আখ্যান নয়, ইউরোপ থেকে "সাধারণ' মানুষও একই পদ্ধতিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল কলোনিতে। ফলে অপরাধীদের গল্পটি বিশেষ নয়, একটি সাধারণ গল্প। শিপ অফ ফুলসও শুধু অপরাধীদের জাহাজ নয়। ইউরোপ থেকে কলোনির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রতিটি জাহাজই আসলে উন্মাদের নৌবহরের অংশ। অপরাধী আর "সাধারণ' মানুষ, কলোনির পরিপ্রেক্ষিতে, দেশ থেকে বাইরে নিক্ষিপ্ত হবার প্রশ্নে, নির্বাসিত হবার প্রশ্নে, এক ও অবিভাজ্য।

এই দাবীটিকে খুঁটিয়ে দেখার জন্য আইনসম্মত দরিদ্র অভিবাসী, যারা নাকি সমাজের "তলানি', তাদের সঙ্গে অপরাধী অভিবাসীদের একটি তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সেটা আমরা ছোট্টো করে এখানে করার চেষ্টা করব। তার আগে একথা বলে নেওয়া দরকার, যে, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এই তুলনামূলক পর্যবেক্ষণে কিঞ্চিৎ অসুবিধা আছে। গোড়া থেকেই নিউ সাউথ ওয়েলস একটি বিশুদ্ধ পেনাল কলোনি। সেখানে অপরাধীদের গণচালান করা বন্ধ হয় মোটামুটিভাবে ১৮৪০ সাল নাগাদ। গোড়ার দিকে এখানে "মুক্ত' অভিবাসীদের সংখ্যা নগণ্য ছিল। এবং অপরাধীদের ঘিরেই গড়ে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়ান "সমাজ'। ফলে "মুক্ত' সমাজে অপরাধীদের কী স্থান ছিল, বা, মুক্ত অভিবাসী এবং অপরাধীদের তুলনামূলক আলোচনা করাটা সূচনালগ্নের অস্ট্রেলিয়ায় সম্ভব নয়।

এই তুলনাটির জন্য আমাদের যেতে হবে আরও আগে, কলোনিয়াল আমেরিকায়। দ্বীপান্তরের আদি যুগে। যা আমাদের আলোচনায় কিঞ্চিৎ প্রক্ষিপ্ত, কিন্তু জরুরী। এই আলোচনায় আমেরিকাকে ঢোকানোর সুবিধে দুটো। এক। আমেরিকা কখনই একটি বিশুদ্ধ পেনাল কলোনি ছিলনা। অপরাধীদের এখানে পাঠানো হত, একই সঙ্গে আসত মুক্ত অভিবাসীরাও, ফলে তুলনামূলক আলোচনাটি সম্ভব। দুই। আমেরিকাকে দেখলে দ্বীপান্তরের একদম আদি যুগে আমরা আলোকপাত করতে পারব। হয়তো এমন কিছু অজানা কলকব্জা খুব সহজে চোখে আসতে পারে, যাদের পরবর্তীকালে আর চট করে খুঁজে পাওয়া যাবেনা, পেতে গেলে বিস্তর খাটাখাটনি করতে হবে।

এই ছোট্টো তুলনামূলক পর্যবেক্ষণে আমরা অষ্টাদশ শতকের দুই ধরণের আমেরিকান অভিবাসীদের দেখব। এক। অপরাধী, যাদের দ্বীপান্তরের সাজা হয়েছে। দুই। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক, যারা "মুক্ত', কিন্তু কাজ করবার চুক্তিতে আমেরিকা এসেছে। আরেক ধরণের শ্রমিক আমরা আমেরিকার ইতিহাসে পাই, যারা মূলত: আফ্রিকা থেকে আসা দাস, কিন্তু এই আলোচনায় আফ্রিকান-আমেরিকানদের প্রসঙ্গে সাধারণভাবে ঢোকা হবেনা।

১৭১৮ সালে নতুন দ্বীপান্তর আইন হবার পর থেকে ১৭৭৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০০০০ ব্রিটিশ অপরাধীকে জাহাজে করে আমেরিকা চালান করা হয়েছিল(৮)। এই দ্বীপান্তরের পদ্ধতির বেশ কয়েকটি কৌতুহলোদ্দীপক দিক আছে। এক এক করে সেগুলোতে ঢোকা যাক।

অপরাধী চালান করা ছিল, শাস্তিদানের পদ্ধতির বেসরকারিকরণের একটি প্রয়াস। অপরাধীদের দ্বীপান্তরে পাঠাতে গেলে সরকারের বেশ কিছু খরচ হবার কথা। গোটা একটা জাহাজ, মাঝি-মাল্লা, জাহাজের ক্রু এবং অপরাধীদের দীর্ঘ জাহাজযাত্রার রসদ, সব মিলিয়ে একটি বৃহৎ অঙ্ক। যে যুগে বন্দীদের কারাগারে রেখে মুফতে খাওয়ানোটা বাজে খরচ হিসাবে গণ্য করা হতো, সে যুগের পক্ষে তো অঙ্কটা খুবই বড়ো। সরকার তাই দ্বীপান্তরের পদ্ধতিতে খরচ কমানোর উদ্যোগ নেয়। এবং সরকারি খরচ কমানোর সহজ উপায় হিসাবে, দেখা যাচ্ছে, সে যুগেও প্রেসক্রিপশন একই ছিল। অর্থাৎ বেসরকারিকরণ এবং আউটসোর্সিং। সরকারি পয়সায় হাতি পোষার চেয়ে পুরো দ্বীপান্তরের প্রক্রিয়াটাকেই বেসরকারি হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, জাহাজ চালাবে বেসরকারি কোম্পানি, সরকার শুধু জেলখানা থেকে বন্দী সরবরাহ করবে, এবং বেসরকারি জাহাজ, তাদেরকে সমুদ্রের ওপারে দিয়ে আসবে।

এবার কথাটা হল, যে, বেসরকারি জাহাজও তো ব্যাপারটা বিনামূল্যে করবেনা, তাদেরও কারবারটা থেকে লাভ করতে হবে। পুরো পরিবহনের খরচা তাদের দিতে হলে এমন কিছু অর্থসাশ্রয় হবেনা বোঝাই যাচ্ছে। ফলে বিকল্প পথ খোঁজা শুরু হল।

এর আগে থেকেই ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যে শ্রমিকশরীর রপ্তানির একটি বেসরকারি ব্যবস্থা চালু ছিল। লন্ডন সহ ব্রিটেনের অন্যান্য অঞ্চলে সমাজের "তলানি'তে কাজ খুঁজছে এরকম লোকের সংখ্যা কম ছিলনা। ওদিকে আমেরিকায় তখন শ্রমিকের দরকার। ফলে তৈরি হয়েছিল একটি আড়কাঠি বণিক সম্প্রদায়, যারা ব্রিটেন থেকে শ্রমিকশরীর তুলে নিয়ে আমেরিকায় রপ্তানি করবে। এরাই হল সেই চুক্তিবদ্ধ (indentured) শ্রমিক, যাদের কথা আগে আমরা বলেছি। নামে "চুক্তিবদ্ধ' হলেও আদতে এরা ছিল বন্ডেড লেবার। চুক্তির বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এরা নিজেদের শরীরকে তুলে দিত আড়কাঠিদের হাতে। তারা এই জ্যান্ত শরীরগুলিকে নিয়ে গিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন শ্রমের বাজারে বেচে দিত। এই বিশেষ কারবারটির জন্য সেযুগের ব্রিটেনে বেশ কিছু কোম্পানি গড়ে উঠেছিল।

দ্বীপান্তরের প্রক্রিয়ার খরচ কমানোর জন্য, ব্রিটিশ রাজ অত:পর এই "শরীর পরিবহন' কোম্পানিগুলিকে ব্যবহার করার কথা স্থির করে। চুক্তিবদ্ধ শরীর চালানের যে সোজা পথটি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, সেই একই পথ দিয়েই চালান করা হতে থাকে অপরাধীদেরও। এবং এই পদ্ধতিতেই মসৃণ ভাবে কাজ চলতে থাকে আমেরিকার স্বাধীনতালাভ, অর্থাৎ আমেরিকায় ব্রিটিশ অপরাধীচালানের শেষ দিনটি পর্যন্ত। এই পদ্ধতিতে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং অপরাধীদের মধ্যে বহু বহু জিনিস ছিল একেবারে এক। দুজনেই ব্রিটেন থেকে বেসরকারি হাতে সমর্পিত হত (একজন চুক্তির পথে, অন্যজন আইনী পথে)। উভয়কেই আমেরিকায় শ্রমিকের বাজারে নিলামে তোলা হত, যে ব্যক্তিমালিক সবচেয়ে বেশি দর দিত, তার হাতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেচে দেওয়া হত। বহু জাহাজ চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং অপরাধী, দুইরকম দেহই বয়ে নিয়ে আসত।

পুরোটাই অবিকল একই পদ্ধতি, উভয়ের ক্ষেত্রেই, শুধু তফাত একটাই। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিজের ইচ্ছায় জাহাজে উঠত আর অপরাধী উঠত ব্রিটিশ রাজের ইচ্ছায়। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে,পার্থক্যটা আদৌ বিরাট কিছু নয়। কেন? নতুন মালিকের কাছে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকশরীর কতদিন বন্দী থাকবে, তার সময়সীমার মাপকাঠি দেখলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। এই সময়সীমা ছিল উভয়েরই ইচ্ছানিরপেক্ষ। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারিত হত খোলাখুলি বাজারের ইচ্ছায়। প্রত্যাশিতভাবেই। অন্যদিকে অপরাধীর নির্বাসনের সময়সীমা নির্ধারণের পদ্ধতিটি কি ছিল? সেটা খুব আকর্ষণীয়। কতদিন অপরাধী ব্যক্তি মালিকের কাছে বিক্রি হয়ে বেগার খাটবে, সেটা স্পষ্টত:ই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল। এ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক, যে, অপরাধের মাত্রার সঙ্গে শাস্তির একটা সম্পর্ক ছিল, অন্তত: সেটাই স্বাভাবিক। যে বেশি অপরাধ করেছে, সে বেশিদিন বেগার খাটবে, যে কম, সে কমদিন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যে, অপরাধীদের বেশিরভাগ অংশের (৭৫%) শাস্তির মেয়াদ ছিল ৭ বছর। কেন সাত বছর? গ্রাব দেখাচ্ছেন, যে, ৭৫% এর বেশি "স্বাধীন' চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের চুক্তির মেয়াদ ছিল ৬ বছরের কম। সেই কারণেই অপরাধীদের শাস্তির মেয়াদ ছিল একটু বেশি, ৭ বছর, -- ঠিক যেভাবে আজকের প্রতিযোগিতার মুক্ত বাজারে একটি ব্র্যান্ড আরেকটির তুলনায় ডিউরেবল, "চলে অনেকদিন বেশি', অবিকল সেই জিনিস। এটার আরও প্রয়োজন হয়েছিল এই কারণে, যে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মালের গুণাবলী যাচাই করে তারপরই কর্তৃপক্ষ জাহাজে তুলতেন। কিন্তু কয়েদিদের ক্ষেত্রে বেছে নেবার সুবিধে ছিলনা -- মুড়ি মুড়কির এক দর। ফলে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের তুলনায় একটু বেশি সুবিধা না পেলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে লাভে কয়েদিদের ব্যবসা চালানো একটু কঠিনই হত।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, কেন ৭ বছর, ১৪/২০ বা সারাজীবন কেন নয়? এরও সহজ উত্তর আছে। প্রথমত: খুব বেশিদিনের শাস্তির মেয়াদ হলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে সেই মাল গছানো একটু কঠিন হয়ে যেত। ক্রেতারা সন্দেহ করত, যে, এই আইটেমটি খুঁতো, অর্থাৎ ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ করে এসেছে। অতোখানি দাগী আসামীকে ঘরে নিতে ক্রেতারা রাজি হতনা। দ্বিতীয়ত: ব্রিটেনের জনতা ছোটোখাটো অপরাধের জন্য ৭ বছরের বেগার খাটা যথেষ্ট শাস্তি বলেই মনে করত। যদিও প্রতিশোধমূলক শাস্তিরই যুগ, কিন্তু তারও একটা মাত্রা ছিল। সামান্য অপরাধের জন্য সারাজীবনের দাসত্বের মতো দন্ড গণহারে দেওয়া হলে তার একটা সামাজিক প্রভাব পড়ারও সম্ভাবনা ছিল। (৯)

ফলে, দেখা যাচ্ছে, শাস্তির মেয়াদ আসলে অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলনা, বরং সম্পর্কিত ছিল বাজারের সঙ্গে। বাজারের নিয়মে "স্বাধীন' চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের শ্রমের সময়সীমা নির্ধারিত হত সাধারণভাবে ৬ বছরের কম। একই কারণে অপরাধীদের মেয়াদ ছিল ৭ বছর। শাস্তিটাস্তি নয়, আসলে যোগান ও চাহিদার অঙ্ক। এবং ব্রিটিশ রাজশক্তির মূল মোটিভটা ছিল শ্রমের বাজারের মূল স্রোতে অপরাধীদের মিশিয়ে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা আস্তে আস্তে মিশে যাবে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের দঙ্গলে। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের দেহ আইনত: "জীবিত'। ফলে জীবিত শরীরগুলির সঙ্গে মিশে যাবে অপরাধীদের মরদেহগুলি, এবং নতুন দুনিয়ায় তাদের পুনরুজ্জীবন ঘটবে।

লিগাল রাইটের প্রশ্নে অবশ্য কলোনি আমেরিকায় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং অপরাধীদের সবসময় একই সারিতে রাখা যায়না। ব্রুস কার্চার দেখাচ্ছেন, যে, এই পুরো সময়টা ধরে আমেরিকায় অপরাধীদের লিগাল রাইট একটি সরলরৈখিক পথে এগোয়নি। কখনও তাদের আদালতে সাক্ষ্য দেবার অধিকার দেওয়া হয়েছে, কখনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত অধিকারও বদলেছে। কিন্তু মোটের উপর চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক আর অপরাধীদের সামাজিক অবস্থান মোটামুটি একই ছিল।(১০)

এবং বাজারের নিয়ম মেনে যেভাবে অপরাধীদের মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল শ্রমিকের শরীরের বাজারের সঙ্গে, সেই একই বাজারের নিয়মেই ক্রমশ: অপরাধীদের আমেরিকায় রপ্তানির অবসান ঘটে। দেখা যায়, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের বাজারে অপরাধীদের ঢুকিয়ে দেবার প্রচেষ্টা ক্রমশ: অর্থনৈতিক ভাবে অদক্ষ হয়ে উঠছে। ব্রিটেনের রাজকারাগার দেখা যায় ভর্তি হয়ে উঠছে নারী ও কমবয়সী অপরাধীতে। কারাগারের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও এমনই, যে একটি নির্দিষ্ট সময় কারাগারে থাকার পরে বন্দীদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। ফলে শ্রমিকের বাজারে সব মিলিয়ে কমে যাচ্ছে অপরাধী শরীরের গড় দাম। ওদিকে আমেরিকার শ্রমিক বাজারে ক্রমশ: বেশি বেশি করে আমদানি করা হচ্ছে কালো আফ্রিকান শরীর। বাছা বাছা, শক্তিশালী, শ্রমে পারদর্শী কালো শরীর। ফলে রুগ্ন অপরাধীশরীরের চাহিদা কমে যাচ্ছে। অপরাধী চালানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে, স্থানীয় প্রশাসন অপরাধীদের ঢুকতে দিতে অস্বীকার করছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এই সময়েই তাঁর বিখ্যাত বক্তব্যটি রাখেন, যে, ব্রিটেন থেকে অপরাধী চালানের পরিবর্তে আমেরিকার উচিত ব্রিটেনে র‌্যাটল স্নেক চালান করা।

ফলে শ্রমবাজারে অপরাধীদের মিশিয়ে দেবার রাজকীয় প্রোজেক্ট ক্রমশ: মুখ থুবড়ে পড়ে। শরীর রপ্তানিকারক সংস্থাগুলিকে অপরাধীপিছু পাঁচ পাউন্ড ভরতুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষমেশ ১৭৭৬ সালে এই মুখ থুবড়ে পড়া প্রকল্পের কফিনের উপর শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়ে যায়। অপরাধীদের গ্রহণ করতে সরকারিভাবে আমেরিকা অস্বীকার করে। ব্রিটেন যুদ্ধে হারে, আমেরিকা স্বাধীন হয়। একটি জীবিত কলোনিতে মৃতদের মিশিয়ে দেবার প্রথার ইতি হয়। সরকারিভাবে।

অভিবাসীদের আমেরিকা আসা অবশ্য বন্ধ হয়না। অপরাধীরা না এলেও জাহাজে করে সমাজের তলানিরা আসতেই থাকে নতুন পৃথিবীতে। একই ভাবে। অপরাধীদের পুনর্বাসন প্রকল্প যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, তার ছায়া ছাপ ফেলে এই আইনসঙ্গত অভিবাসীদের পুনর্বাসনের ছবিতেও। পুরোনো আমেরিকান এবং নতুন অভিবাসীদের মধ্যে তিক্ততা, সংঘর্ষ চলতে থাকে, চলতেই থাকে দীর্ঘ, দীর্ঘদিন। আর ব্রিটেন তার বাতিল মানবজঞ্জালকে চালান করার জন্য খুঁজতে থাকে নতুন প্রকল্প। নতুন মহাদেশ। নতুন দিগন্ত।


৭।

ফলে আমরা কি দেখলাম? এক। মেরি ওয়েডের গল্পের সঙ্গে শিপ অফ ফুলসের মিল থাকলেও, আদতে, অপরাধীদের আখ্যানটি ঠিক উন্মাদের নৌবহরের গল্প নয়। উন্মাদদের মতই অপরাধীদের ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে সভ্যতার বাইরে। কোনো ইউরোপীয় শহরে নয়, বরং পৃথিবীর বিপরীতপ্রান্তে, এক অজানা জগতে। কিন্তু প্রান্তসীমার বাইরে ছুঁড়ে ফেলা মানুষের সাধারণ গল্পের গ্র্যান্ড কম্পোজিশনটিকে অস্বীকার করে, সে টিকে থাকবে, বেঁচে থাকবে সভ্যতার অলিন্দে। এই পদ্ধতির কারিগরিটি আমরা ক্রমশ: খুঁটিয়ে দেখব। দুই। অপরাধীদের গল্পটা শুধু অপরাধীদের গল্প নয়। বৃহত্তর জনসমাজেরও গল্প। জীবিত ও মৃত শরীরের মিশে যাবার গল্প। দেখা যাচ্ছে, যে অপরাধী নামক মৃতশরীরকে লাশকাটা ঘরে ছুঁড়ে ফেলা নয়, বরং দ্বীপান্তরের প্রক্রিয়ায় মৃত শরীরগুলিকে আদতে জীবিত শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল। যা আমেরিকার ক্ষেত্রে সফল কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা করা হয়েছিল এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। চেষ্টা করা হয়েছিল পুনরুজ্জীবনের, মানব শরীরগুলিকে জ্যান্ত করে, ক্ষমতার কোনো একটি প্রান্তে, ভিন্ন কোনো কক্ষপথে পুন:স্থাপনের। ব্রিটেন নামক প্রকোষ্ঠে যে শরীরগুলি মৃত, তাদেরকে ঠিক ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়নি, বরং স্থান দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল আমেরিকা নামক একটি ভিন্ন প্রকোষ্ঠে।

বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে বিভিন্ন অংশকে পৃথক করে রাখা, এবং তাদের পুনরুজ্জীবন ঘটানো/দক্ষতা বৃদ্ধির যে পদ্ধতি সাধারণভাবে পশ্চিমী সমাজ গ্রহণ করেছে, তা নিয়েও ফুকোর একটি উপাখ্যান আছে। অষ্টাদশ শতকের একটি মডেলকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে এই সম্পর্কিত ফুকোর প্রকল্পটি। সেই মডেলটির নাম প্যানপ্‌টিকন, যা ফুকোর ক্ষমতা সম্পর্কিত তত্ত্বের হৎপিন্ড। এই পরিচ্ছেদে আমরা ফুকোর প্রকল্পটি খুঁটিয়ে দেখব। দ্বীপান্তরের আখ্যানকে সেই প্রকল্পে ফেলে দেখার চেষ্টা করব, এবং ফুকোর আখ্যানটিকে ফেলব প্রশ্নচিহ্নের সামনে।

প্যানপ্‌টিকন নামক মডেলটির জন্ম দেন বেন্থাম, এই অষ্টাদশ শতকেই। প্যানপ্‌টিকন একটি বিশেষ ধরণের স্থাপত্য, যা নজরদারির পদ্ধতি হিসাবে তুলনাহীন। জিনিসটা আর কিছুই না, একটি গোলাকার প্রাসাদ/কারখানা/জেলখানা, তাতে আছে ছোটো ছোটো আলাদা করা সারিসারি কুঠুরি, যার একটা থেকে আরেকটা দেখা যায়না, এবং বাইরের দিকটাও দেখা যায়না। এই কুঠুরিগুলো থাকে স্থাপত্যের পরিধির দিকে। আর কেন্দ্রে থাকে নজরদারির জায়গা। স্থাপত্যটি এমনই, যাতে করে কেন্দ্রস্থলের কুঠুরিটি থেকে পরিধির সবকটা কুঠুরির ভিতরটা পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু পরিধির কুঠুরি থেকে কেন্দ্রের কুঠুরিটা আদৌ দেখা যায়না।

এই স্থাপত্যের অসাধারণত্ব দুটি কারণে। এক, পৃথকীকরণের পদ্ধতি। বিভিন্ন ধরণের লোককে বিভিন্ন কুঠুরিতে আলাদা করে রাখা হচ্ছে, যাতে তারা একে অপরের সঙ্গে মিশতে না পারে। দুই, নজরদারির পদ্ধতিকে এখানে দক্ষতার শীর্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যেহেতু একটি মাত্র কেন্দ্রস্থিত প্রকোষ্ঠ থেকে বাকি সবগুলি কুঠুরিকে দেখা সম্ভব, তাই কেবলমাত্র একজন নিরীক্ষকের পক্ষেই সবার উপর নজর রাখা সম্ভব। শারীরিকভাবে সেটা সম্ভব না হলেও, কার্যক্ষেত্রে ব্যাপারটা তাইই। কারণ পরিধির প্রকোষ্ঠগুলি থেকে নজরদারকে দেখা সম্ভব নয়। আবার নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও সম্ভব নয়। প্রত্যেক কুঠুরিবাসীই আলাদা আলাদা। বিচ্ছিন্ন। এবং তারা জানে যে মাথার উপরে ঈশ্বরের মতো একজন পর্যবেক্ষক আছেন। তাঁকে দেখা যায়না, কিন্তু তিনি সব কিছুই দেখেন। তাই প্রতিটি কুঠুরির প্রত্যেকটি লোকই ভাববে সে সর্বক্ষণ নজরদারির আওতায়। কেবলমাত্র তার উপরেই নজর রাখা হচ্ছে। এবং এই পুরো ব্যাপারটা ঘটবে, এমনকি যদি আদপেই কোনো পর্যবেক্ষক কেন্দ্রস্থলের কুঠুরিতে না থাকে, তাহলেও। সেক্ষেত্রেও প্রতিটি কুঠুরিবাসীর ধারণা হবে তারা নজরদারির আওতাতেই আছে, কেউ নজর রাখুক বা না রাখুক, নজরদারী থাকবেই।

ফলে এইভাবে এমন একটি নজরদারীর প্রথা নির্মান করা যাবে, যা চুড়ান্ত এফিশিয়েন্ট। ন্যূনতম প্রচেষ্টায় পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ মানের ফলাফল। একজন মাত্র নজরদার থাকলেই, এমনকি কোনো নজরদার না থাকলেও প্রত্যেকেই থাকবে নজরদারির আওতায়। প্রত্যেকে নিজেই নিজের উপরে নজর রাখবে, কারণ সে জানে, সে সদাসর্বদা নজরদারীর আওতায়। ফুকো তাঁর ক্ষমতার ডিসকোর্সে এই স্থাপত্যটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। ফুকো দেখাচ্ছেন, শুধু কারখানা বা জেলখানা নয়, এই প্যানপ্‌টিকন আধুনিক সমাজের সর্বত্র, প্রতিটি বিন্দুতে বিদ্যমান। জেলখানার সীমানা থেকে মুক্ত করে এই দক্ষ ব্যবস্থাটিকে আশ্রয় দেওয়া হয় ক্ষমতার প্রতিটি অলিন্দে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে চালু হয় পৃথকীকরণের পদ্ধতি। প্রতিটি গোষ্ঠীকে আলাদা আলাদা করে ভরে ফেলা হয় প্রকোষ্ঠে। অপরাধীদের আলাদা করে রাখা হয় জেলখানায়, মানসিক রোগীদের অ্যাসাইলামে, ছাত্রদের ছাত্রাবাসে, শ্রমিকদের কারখানায়। আর এই আলাদা কুঠুরিগুলিতে চলতে থাকে শরীরকে আরও দক্ষ আরও কার্যকর করে তোলার ট্রেনিং। ব্যক্তি মানুষের নজরদারীর পরিবর্তে আসে, কিছু ধারণার নজরদারী, যাদেরকে বলা হয় "বিজ্ঞান' বা "সত্য'। এই ধারণাগুলির নজরদারী চলতে থাকে ভিতর-বাইরে সর্বত্র। কোনো বলপ্রয়োগে নয়, সত্য সম্পর্কে অবগত হবার পর, এই মানবশরীরগুলি "স্বেচ্ছায়' ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে, অংশগ্রহণ করে নিজের উপর নজরদারীতে, চলতে থাকে ট্রেনিং, এবং শরীর ক্রমশ: দক্ষ থেকে দক্ষতর হয়ে ওঠে। (১১)

এ ব্যাপারে ফুকোর একটা উদাহরণই নেওয়া যাক (১২)। ফুকো দেখাচ্ছেন, অষ্টাদশ শতকের আগে ইউরোপে হস্তমৈথুনের উপর কোনো বিধিনিষেধ ছিলনা। কিন্তু তারপরে হঠাৎই দিগন্তে একটা আতঙ্কের চিত্র দেখা গেল, পশ্চিমী দুনিয়ায় হঠাৎই যেন দেখা গেল এক ভয়াবহ অসুস্থতা জন্ম নিয়েছে। কি সেটা? না, কিশোররা হস্তমৈথুন করে। তৎক্ষণাৎ এই যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা ব্যবস্থা করা হল। কিশোরের যৌনতাকে চিহ্নিত করা, এবং কর্পোরাল পানিশমেন্টের মাধ্যমে তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার একটা পদ্ধতি তৈরি হল। এই কাজে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকেও ব্যবহার করা হল। তৈরি হল, কঠোর শৃঙ্খলা, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তির একটি পদ্ধতি। পারিবারিক উদ্যোগে না হলেও, তাদেরই মধ্যস্থতায় শিশুশরীরের উপরে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার, যৌনতাকে চিহ্নিত করে কর্পোরাল পারসেকুইশনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হল।

কিন্তু এই ধরণের নজরদারী অত্যন্ত অদক্ষ। প্রথমত: সর্বক্ষণ কিশোরদের চোখে চোখে রাখার জন্য লোক নিয়োগ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত: যৌনতাকে সুতীব্র নজরদারীর, কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসার পদ্ধতি, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি ব্যক্তির আকাঙ্খাকে তীব্রভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা এই ব্যবস্থার পক্ষে একটি বড়ো বিপদ। ফলে শরীর ক্রমশ: হয়ে ওঠে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। কিশোর ও তার বাবা-মার মধ্যে সংঘাত। কিশোর ও তার উপরে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির মধ্যে সংঘাত। নিয়ন্ত্রণ এবং খর্ব করার বিরুদ্ধে যৌন শরীরের বিদ্রোহ ক্রমশ: হয়ে ওঠে অনিবার্য একটি পরিণতি।

এই অনিবার্য বিদ্রোহের বিপরীতে ক্ষমতা কি ব্যবস্থা নেয়? অধিকতর নিয়ন্ত্রণ? না। ক্ষমতা এর জবাব দেয় অর্থনৈতিক এবং মতাদর্শগতভাবে যৌনতার উপাখ্যানকে ব্যবহার করে। চামড়া ট্যান করার প্রোডাক্ট থেকে শুরু করে পর্নোগ্রাফি পর্যন্ত একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে যায় এই ব্যবহারের সীমান্ত। যৌন নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে শরীরের যে বিদ্রোহ, তার জবাবে পাওয়া যায় এক সম্পূর্ণ নতুন ধরণের পদ্ধতির পিছনে বিপুল বিনিয়োগ। অবদমনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে তৈরি হয় নতুন একটি ধারণা, স্টিমুলেশানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ। নগ্ন হও ক্ষতি নেই, ক্ষমতা বলে, কিন্তু তার আগে শরীরকে সুগঠিত করো, স্লিম করো, স্বাস্থোজ্জ্বল বানাও। এই স্লোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আসে স্বাস্থ্যের "বৈজ্ঞানিক' সত্যগুলি (যেমন অতিরিক্ত মেদ/ওজন শরীরের পক্ষে খারাপ)। আসে প্লেজারের ধারণা। ফলে কিশোর নিজেই যেতে শুরু করে জিমে। নিজেই নজর রাখতে শুরু করে নিজের শরীরের উপর। এই ভাবে তৈরি হয় একটি সুদক্ষ নজরদারির ব্যবস্থা। একটি নিখুঁত প্যানপটিকন।

এই ধারণাটি কেন বৈপ্লবিক, সেটা পূর্বে বর্ণিত শিপ অফ ফুলসের ধারণার সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায়। খুব সোজা করে দেখলে, বোকাদের জাহাজ ছিল মূলত: প্রান্তিকদের সমাজ থেকে বহিষ্কারের যন্ত্র। পাগল বা কুষ্ঠরোগী বা অপরাধীরা ছিল শৃঙ্খলার পক্ষে মূর্তিমান বিপদ বিশেষ। ফলে মৃত শরীরদের যেমন জীবিতদের থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়, পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাটির বহু নিচে, এদেরকেও একই পদ্ধতিতে দূর করে দেওয়া হত। দূরে, বহু দূরে, যেখানে থাকলে এরা সমাজের জীবিত শরীরের মধ্যে আর পচন ধরাতে পারবেনা। কুষ্ঠরোগীদের দেওয়া হত তাড়িয়ে। আর অপরাধীদের খতম করে দেওয়া হত (দ্বীপান্তরের প্রসঙ্গে পরে আসা হচ্ছে)। এটি একটি পদ্ধতি, যা, মূলত: দমনমূলক। নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটি এখানে নিপীড়নমূলক।

উল্টোদিকের নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসাবে প্যানপ্‌টিকন যায় ঠিক এর বিপরীতে। শরীরগুলিকে বহিষ্কার করা হয়না, খতম তো করা হয়ইনা। পরিবর্তে, তাদেরকে আলাদা করে দেওয়া হয়। হাসপাতালে, জেলখানায়, বা স্কুলে। তারপর তাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। শরীরকে নষ্ট করে ফেলার বদলে তাকে পরিশোধিত করা হয়। রিসাইকল করা হয়।

নিপীড়নমূলক নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি অদক্ষ। কারণ, প্রথমত:, কঠোর নজরদারী সবসময়েই সঙ্গে নিয়ে আসে অতিরিক্ত ওভারহেড, নজরদারী যত কঠোর হবে, তত বেশি বেশি করে প্রয়োজন হবে নজরদার এজেন্সিগুলির, ফিজিকাল সার্ভিলিয়ান্সের। দ্বিতীয়ত: একটি শরীরকে বহিষ্কার/খতম করার সঙ্গে সঙ্গে সেই শরীরকে কাজে লাগানোর অসীম সম্ভাবনাটিরও মৃত্যু ঘটে, অপমৃত্যু ঘটে রিসোর্সের। যে গাড়িটিকে একটু মেরামত করে নিলেই দিব্যি চলতে পারত, এমনকি ঠিকঠাক মেরামত করলে আগের চেয়ে হয়তো অনেক ভালো চলতে পারত, এই প্রক্রিয়ায় তাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। প্যানপ্‌টিকন ক্ষমতার অদক্ষতার এই ত্রুটিগুলিকে শুধরে নেয়। ফলে প্যানপটিকনের পৃথকীকরণ/নজরদারির ধারণাটি নি:সন্দেহে একটি প্যারাডাইম শিফট।

আমেরিকায় শরীর চালানের গল্পটি মাথায় রাখলে, মনে হয় শিপ অফ ফুলস নয়, শরীর চালানের গল্পটি আসলে প্যানপ্‌টিকনের সঙ্গে খাঁজে খাঁজে মিলে যায়। শরীরগুলিকে চালান করে দেওয়া হল ভিন্ন একটি প্রকোষ্ঠে, তারপর তাকে দক্ষ করে তোলার জন্য চালানো হল ট্রেনিং আর এক্সপেরিমেন্ট। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু, বলাবাহুল্য, গল্পটা এতো সোজা নয়। কেন নয়, সেটা এবারে একটু দেখা যাক।

আগেই বলা হয়েছে, প্যানপ্‌টিকনের জন্মলগ্ন অষ্টাদশ শতকে। বেন্থামের হাতে। সেই সময়ে দ্বীপান্তর একটি ব্যবস্থা হিসাবে পুরোমাত্রায় চালু। এবং পরবর্তীকালে ফুকো একে এড়িয়ে গেলেও সেই সময়ে বেন্থাম দ্বীপান্তর নিয়ে বিরাট মাত্রায় ভাবিত ছিলেন। বস্তুত: নিউ সাউথ ওয়েলসে, অর্থাৎ আজকের অস্ট্রেলিয়ায়, অপরাধী চালানের ব্যবস্থা শুরু হবার পর, তিনি "প্যানপ্‌টিকন বনাম নিউ সাউথ ওয়েলস' নামক রচনাটি প্রকাশ করেন। এই লেখাটি মূলত: দ্বীপান্তরের বিরুদ্ধতা করে এবং তার বিকল্প হিসাবে প্যানপ্‌টিকনের পক্ষে ওকালতি করে লেখা। অন্যত্রও দ্বীপান্তর নিয়ে বেন্থাম দু-চার কথা লিখেছেন। যথা, "র‌্যাশনাল অফ পানিশমেন্ট' এর দ্বীপান্তর বিষয়ক লেখাটি। এবং এই লেখাগুলিতে দ্বীপান্তর সম্পর্কে বেন্থামের আপত্তির মধ্যে দিয়ে প্যানপ্‌টিকনের সঙ্গে দ্বীপান্তরের বিরোধের জায়গাগুলো চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

বেন্থাম বলছেন, শাস্তি এবং ন্যয়বিচারের মূল উদ্দেশ্য হল উদাহরণ স্থাপন করা। একই ধরণের অপরাধ দ্বিতীয়বার সংঘটিত না হতে দেওয়া। প্রিভেনশান। একটি অপরাধে একজনকে যখন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, দ্বিতীয়জন তা দেখে শিক্ষা নেবে, যে, এই অপরাধ করলে তাকেও যেতে হবে শাস্তিভোগের একই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। শাস্তির এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি দ্বীপান্তরে খুঁজে পাওয়া যায়না। বহু হাজার মাইল দূরে নিউ সাউথ ওয়েলসে যখনই পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীকে, তখনই তার শাস্তির প্রক্রিয়াটিকে লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে বাকিদের চোখের সামনে থেকে, সম্ভাব্য অপরাধীদের চোখের সামনে থেকে। ব্রিটেন আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে রয়েছে এক "বিস্মৃতির সমুদ্র' এর ব্যবধান -- অস্ট্রেলিয়ায় দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের কি অবস্থা, কি ভাবে তারা দিন কাটাচ্ছে, কি শাস্তি পাচ্ছে, সেইসব ছবি ব্রিটেনে এসে পৌঁছয়না। এটি দ্বীপান্তরের একটি "নিরাময়াতীত' খুঁত।

দ্বিতীয়ত:, শাস্তির দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হল সংশোধন। রিফর্মেশন। একটি অপরাধের জন্য একজনকে শাস্তি দেবার উদ্দেশ্য হল, যাতে সে দ্বিতীয়বার সেই অপরাধটি না করে। শাস্তির উদ্দেশ্য হল অপরাধীর মধ্যে থেকে তার অপরাধ করবার ইচ্ছাটিকেই কেড়ে নেওয়া। বেন্থাম বলছেন, আমেরিকার তুলনায় নিউ সাউথ ওয়েলস এই জায়গাতেও ভীষণ ব্যর্থ। আমেরিকার ক্ষেত্রে, প্রভুর অধীনে কাজ করলেও অপরাধী থাকত একটি সমাজের মধ্যে, যা তাকে সততার পথে চালিত করতে উৎসাহ যোগাত। তার আচরণের দিকে নজর রাখত গোটা পরিবার, সে নিজেও চেষ্টা করত প্রভুর সুনজরে পড়ার। ফলে সব মিলিয়ে সংশোধনের একটা জায়গা ছিল। উল্টোদিকে, নিউ সাউথ ওয়েলসে, অপরাধী কোথায় গিয়ে পড়ল? একদল অপরাধীর দঙ্গলের মধ্যে, বলছেন বেন্থাম। অপরাধী ছাড়া সেখানে আছেন সামান্য কিছু প্রশাসনিক কর্তা, আর সামান্য সংখ্যক মিলিটারি। জাহাজ থেকে নেমেই যে অপরাধী একদল "মনুষ্যরূপী দানব'এর হাতে পড়ে, তার সংশোধনের সম্ভাবনা যে নেই বললেই চলে, তাতে আর সন্দেহের কি আছে।(১৩)

বেন্থামের কথার মধ্যে দিয়ে সদ্য গড়ে ওঠা নিউ সাউথ ওয়েলস কলোনিটির গঠনের একটি আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নিউ সাউথ ওয়েলস প্রসঙ্গে আমরা ঢুকব, কিন্তু তার আগে বেন্থামের পয়েন্টগুলো একটু দেখে নেওয়া দরকার। দেখা যাচ্ছে, ওনার আপত্তিটা ছিল মূলত: দূরত্ব বিষয়ক। দুইটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব এবং তার চেয়েও বেশি সমাজ থেকে দূরত্ব। সমাজ থেকে দূরে পাঠিয়ে দিয়ে, সমাজ থেকে ব্যক্তিকে এক্সক্লুড করে, বহিষ্কার করে, ব্যক্তির উপর প্যানপ্‌টিকন মডেলটি প্রয়োগ করা যায়না। একপাল ভেড়া এক জায়গায় থাকলে নিজেরাই নিজেদের উপর শৃঙ্খলা আরোপ করতে পারেনা, তার জন্য দরকার মেষপালকদের। এবং মেষপালকদের থেকে ভেড়াদের দূরে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের উপর নজরদারি তথা শৃঙ্খলা আরোপ করা যায়না -- এই হল মোদ্দা বক্তব্য।

আপত্তিটি নি:সন্দেহে বৈধ। পরবর্তীকালে ফুকো যে প্যানপ্‌টিকনের বর্ণনা দিয়েছেন, তা আদতে একটি উভমুখী প্রক্রিয়া। একে তুলনা করা যায় অ্যাসেম্বলি লাইনে ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরি হবার প্রক্রিয়ার সঙ্গে। উভমুখী অর্থে, কাঁচামাল আসবে বাইরে থেকে অ্যাসেম্বলি লাইনে, অর্থাৎ প্রক্রিয়ার ভিতরে। আর ফিনিশড গুড যাবে অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে বেরিয়ে সেই দুনিয়ায়, যেখান থেকে কাঁচামাল এসেছিল, অর্থাৎ প্রক্রিয়া থেকে বাইরে। এই বাইরে থেকে ভিতরে ও ভিতর থেকে বাইরে, এক্সক্লুশন ও ইনক্লুশনের উভমুখী পদ্ধতি প্যানপ্‌টিকনের হৃদয়। অন্যদিকে দ্বীপান্তরে যে প্রক্রিয়াটি কাজ করে তা শুধু ভিতর থেকে বাইরে। অর্থাৎ মানবশরীরগুলিকে এক্সক্লুড করা হয়, কিন্তু ফিরিয়ে নেওয়া হয়না। দ্বীপান্তরের ক্ষেত্রে ফিরে আসার শাস্তি মৃত্যু। বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ফিরে আসার কোনো আইনী বাধা নেই, কিন্তু জাহাজে করে শরীরচালানের পদ্ধতিটি আমাদের দেখায়, যে প্রক্রিয়াটি তাদের ক্ষেত্রেও মূলত: একমুখী। অর্থাৎ ইউরোপ থেকে উপনিবেশের দিকে, মূল ভূখন্ড থেকে কলোনির দিকে, ফিরে আসার পথটি খোলা না রেখেই।

ফলে, দ্বীপান্তর যে প্যানপ্‌টিকনের মডেলে বেমানান, তা বোঝা যাচ্ছে। দ্বীপান্তরের মডেলে কিছু "অনিরাময়যোগ্য খুঁত' আছে। এই "খুঁত'গুলি, বেন্থামের মতে, প্যানপটিকনের ডিজাইনে নেই। বা অন্যভাবে বললে বলা যায়, এই "খুঁত' গুলিকে "সংশোধন' করেই গড়ে উঠেছে বেন্থামের প্যানপটিকন। বস্তুত: দ্বীপান্তর নিয়ে বেন্থাম বিরাট মাত্রায় চিন্তিত ছিলেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন বোঝা যায়, যখন প্যানপ্‌টিকন বনাম দ্বীপান্তর শীর্ষক একটি লেখা লিখে ফেলেন। র‌্যাশনাল অফ পানিশমেন্টেও দ্বীপান্তর বিষয়ে রচনাটি আসে প্যানপ্‌টিকন বিষয়ক লেখাটির ঠিক আগেই। এক অর্থে, দ্বীপান্তরের ধারণাকে নেগেট করেই যেহেতু প্যানপ্‌টিকনের বাড়বৃদ্ধি, দ্বীপান্তর তাই এক রকম করে নির্ধারিত করে প্যানপ্‌টিকনের ধারণাকে। ভারতের জাতীয়তাবাদের ধারণাকে যেমন এক ভাবে বোঝা যায় পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে, ভারতীয় এবং পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ যেভাবে একে অপরকে নির্ধারিত করে, একই ভাবে প্যানপটিকনের রহস্যকেও খুঁজতে হবে দ্বীপান্তরের ধারণার বিপরীতে। বেন্থামে দ্বীপান্তর ও প্যান্‌পটিকন একে অপরকে নির্ধারণ করে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বোঝা সম্ভব নয়।

মজা হচ্ছে, ফুকো বেন্থামকে খুব গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসালেও, দ্বীপান্তরকে মূলত: এড়িয়ে গেছেন। প্যানপ্‌টিকন প্রসঙ্গে বেন্থাম দ্বীপান্তরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, ফুকো আবার বেন্থামকে অত্যন্ত গুরুত্বের আসনে বসিয়েছেন, প্যানপ্‌টিকন ফুকোর ক্ষমতার ডিসকোর্সের একটি স্তম্ভ বিশেষ, কিন্তু ফুকো দ্বীপান্তরে ঢোকেননি। ফলে ফুকোর প্যানপ্‌টিকন আর বেন্থামের প্যানপ্‌টিকনে একটি গুরুত্বপূর্ন তফাত আছে। বেন্থামের প্যানপ্‌টিকন দ্বীপান্তরময় হলেও গুরুত্বের হায়ারার্কিতে দ্বীপান্তরের স্থান নিচে। দ্বীপান্তরকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননা, কিন্তু তাতে তিনি খুঁজে পান "অনিরাময়যোগ্য খুঁত'। ফলে দ্বীপান্তর একটি নিচু মানের পদ্ধতি। অন্যদিকে প্যানপটিকন শাস্তি/সুবিচারের পদ্ধতি হিসাবে খুঁতহীন, নিটোল ও বিশুদ্ধ। দ্বীপান্তরের চেয়ে অনেক উঁচুতে তার অবস্থান। ফলে বেন্থামের ডিসকোর্সে একটি হায়ারার্কি তৈরি হয় "বিশুদ্ধ' ও "অশুদ্ধ', "খুঁতহীন' ও "খুঁতযুক্ত'র মধ্যে। এবং দ্বীপান্তরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নিচু জায়গায়। ফুকো এই হায়ারার্কিতে সরকারি শিলমোহর লাগান। ফুকোর প্যানপটিকনে দ্বীপান্তর নেইই, দ্বীপান্তরকে তিনি ঠেলে পাঠিয়ে দেন মার্জিনের বাইরে। ফুকোতে প্যানপটিকন একটি নিটোল ব্যবস্থা, যা একা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। যা সর্বব্যাপী এবং অ্যাবসলিউট। এবং একে অ্যাবসলিউট বানাতে গিয়ে প্রতিবেদন থেকে এক্সক্লুড করা হয় দ্বীপান্তরকে। একই সঙ্গে ইনক্লুশন-এক্সক্লুশনের জটিল মেকানিজমকে এক্সক্লুড করে গুরুত্ব দেওয়া হয় শরীরের ট্রেনিংকে। ফলে, ফুকোর প্যানপ্‌টিকন হয়ে ওঠে একটি উত্তরাধুনিক জিমনাসিয়াম, একটি উত্তরাধুনিক "ঈশ্বর' বা "সত্য', দ্বীপান্তর যার "সিম্পটম', অর্থাৎ ইউরোপীয় জিমনাসিয়ামের বাইরে দ্বীপান্তরের স্পেসে এসে এ প্রতিবেদন ভেঙে পড়ে।

ডিসকার্সিভ স্পেস থেকে বেরিয়ে এসে খুব গোদা ভাবে বললে বিষয়টা এই, যে, ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার একটি নিছক পশ্চিমী ঘটনা। এমনকি পশ্চিমের আপামর জনসাধারণের সকলেও এই ফলটি চাখতে পারেনি। নোয়ার নৌকার মতই এতে আশ্রয় পেয়েছিল শুধু সিলেক্টেড ফিউ। সক্কলে নয়। বাকিদের জাহাজে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নতুন দুনিয়ায়। দ্বীপান্তর ছিল যার সূচনাবিন্দু। বেন্থামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বীপান্তর, বিশেষ করে নিউ সাউথ ওয়েলসের দ্বীপান্তর, ছিল একটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনি। ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার যেভাবে পশ্চিমের প্রতিটি কোণে নিজের থাবা বাড়িয়েছে, ঠিক একই সঙ্গে তার খুঁতযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বীপান্তরও বেড়ে চলেছে তার খুঁতটুকুকে সঙ্গে নিয়েই। অপরাধীদের জাহাজগুলি উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় বয়ে নিয়ে গেছে হাজারে হাজারে অপরাধীদের। সেই একই পথ ধরে স্বেচ্ছা অভিবাসনের পথ ধরেছে পশ্চিমের "তলানি'র একটা বিরাট অংশ। অপরাধী আর স্বেচ্ছা-অভিবাসী, উভয়ের জন্যই প্রক্রিয়াটা ছিল মোটামুটি এক। এই প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য দুটি। এক। ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের মতো এ শুধু শরীরকে আরও দক্ষ করে তোলার জন্য ক্ষমতার অভিযান নয়। ফুকো বর্ণিত জিমনাসিয়াম নয়। বরং সভ্যতা থেকে, ইউরোপ থেকে শরীরকে বহিষ্কার করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি। দুই। কিন্তু এক্সক্লুশন হলেও, তা অ্যাবসলিউট নয়। শিপ অফ ফুলসের মতো চরম এক্সক্লুশন নয়।

এই দুখানা বৈশিষ্ট্যসহ এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করার মতো কোনো ক্যাটিগরি আমরা পশ্চিমের মসৃণ ক্ষমতার ডিসকোর্সে পাবনা, উদ্বৃত্ত পশ্চিমের নির্মানের জন্য ইনক্লুশন ও এক্সক্লুশনের বাইরে এ মূলত: এক তৃতীয় বিকল্প, যার কোনো নাম নেই।



দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় বিকল্প

১।

অতএব, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদ, কৃষির পরেই শিল্পবিপ্লব, জাতীয় আপ্তবাক্যগুলি সার্বজনীন নয়। এগুলি বিশুদ্ধ ইউরোপীয় ঘটনা, যার আবশ্যক শর্ত হল উপনিবেশ ও শরীর চালানের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার উপস্থিতি। উপনিবেশের স্পেসে এসে এই আপ্তবাক্যগুলি ভেঙে পড়ে। একই ভাবে, ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার, তার যাবতীয় "খুঁতহীন' কলকব্জা নিয়েও, ইথারের মতো সর্বব্যাপী নয়। উপনিবেশের প্রতিবেদনকে, দ্বীপান্তরের ডিসকোর্সকে সে তার মডেলে অস্বীকার করে। ধ্রুপদী মার্কসবাদ উপনিবেশকে অস্বীকার করে, আর ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের আখ্যান "সর্বশক্তিমান কারণ ইহা সর্বত্র বিরাজমান' হয়ে উঠতে গিয়ে বেন্থামের আদি প্যানপ্‌টিকনের মডেলকে সেন্সর করে। সর্বব্যাপী বিরাজমান বিরাটাকায় জিমনাসিয়ামের এক স্বপ্নকল্পনা তৈরি করে, যা আসলে ততটা বৃহদায়তন নয়। ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের থাবার বাইরে, পশ্চিমের মসৃণ ক্ষমতার ডিসকোর্সের বাইরে, খুঁত হিসেবে রয়ে যায় উদ্বৃত্ত পশ্চিমের নির্মানের এক তৃতীয় বিকল্প। ইনক্লুশন ও এক্সক্লুশনের বাইনারি বিভাজনের বাইরে।

অত:পর আমরা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই "তৃতীয় বিকল্প'টি খুঁটিয়ে দেখব। একদম জন্মলগ্ন থেকে। খুঁটিয়ে দেখব এমন একটি বিচিত্র ব্যবস্থাকে যা, অপরাধীদের জন্য নির্মিত, অপরাধীদের দ্বারা পরিচালিত, একটি অপরাধীদের কলোনি, বিশ্বের ইতিহাসে, বোধহয়, যার আর দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ নেই।

আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অপরাধী চালানের ব্যবস্থাটিকে বানানো হয় একেবারে অন্যরকম। এর মূল দুখানা বৈশিষ্ট্য হল:

এক। আমেরিকায় পুরো ব্যবস্থাটাই ছিল বেসরকারি। পুরো একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে নিউ সাউথ ওয়েলসে পুরোটাই হয়ে দাঁড়াল সরকারি। ভরতুকি দিয়ে বেসরকারি ব্যবসাকে আর প্রোমোট করা নয়, অপরাধীদের পাঠানো শুরু হল সরকারি জাহাজে। ফার্স্ট ফ্লিট, অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অপরাধীদের প্রথম নৌবহরের জাহাজগুলি ছিল নেভি বোর্ডের চার্টার করা জাহাজ। এই চার্টার করা জাহাজগুলির সঙ্গে ছিল দুখানা নৌবাহিনীর জাহাজ। পরবর্তীকালেও মূলত: এই পদ্ধতিতেই অপরাধীদের চালান করা হয়েছে, কিছু অপরাধী অবশ্য খোদ নৌবাহিনীর জাহাজে চড়েও এসেছে। (কার্চার)

দুই। আমেরিকায় শরীরের বাজারে ফেলে দেওয়া হত অপরাধীদের। মুক্ত দুনিয়ায় ছিল মুক্ত বাজার, যা অপরাধী শরীর আর শ্রমিকের শরীরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতনা। সমাজের মূল স্রোতে মিশে যেত অপরাধীরা। এখানে সে গল্প নেই। অপরাধীরা এখানে সরাসরি সরকারি সম্পত্তি। অপরাধী, স্রেফ অপরাধীদের দিয়ে এখানে তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশুদ্ধ পেনাল কলোনি। অপরাধীরা শুরুর দিকে বেগার খাটনি দিত রাজশক্তিকে। পরবর্তীকালে ব্যক্তিমালিকের হাতেও তাদের দেওয়া শুরু হল, কিন্তু সেটা শুধু গভর্নরের "ডিসক্রিশন'। কেনা-বেচার কোনো প্রশ্নই নেই। জাহাজ কোম্পানিরা স্রেফ সরকারের ভাড়া খাটত, বয়ে নিয়ে যেত অপরাধীদের। কিন্তু অপরাধী শরীর বা তার শ্রমের উপর তাদের কোনো অধিকার ছিলনা। (১৪)

ফলে, সব মিলিয়ে, ব্যাপারটা ছিল আপসাইড ডাউন। আমেরিকার ক্ষেত্রে চেষ্টা করা হয়েছিল ইতিমধ্যেই বর্তমান একটি ব্যবস্থায় অপরাধীদের মিশিয়ে দেবার। আর এখানে প্রকল্প ছিল অপরাধীদের দিয়ে আগে একটি ব্যবস্থা বানানো, তারপর সেই ব্যবস্থায় বাকি "তলানি'দের মিশিয়ে নেওয়া।

এই নতুন ব্যবস্থা বানানোর প্রক্রিয়াটি তাহলে কি ছিল? একটি বিরাট মাপের জেলখানা বানানো, যা সাইবেরিয়ার পূর্বসূরী? সেখানে রিফর্মেশনের যন্ত্র চালিয়ে অপরাধীদের শুদ্ধিকরণ করে কলোনির বাজারে ছেড়ে দেওয়া? আগেই দেখেছি, যে কলোনির ক্ষেত্রে, বা বৃহত্তর পশ্চিমের ক্ষেত্রে ক্ষমতার এই সরল বয়ানটি খাপে খাপে মেলেনা। শরীরের ট্রেনিং নয়, বরং ইনক্লুশন ও এক্সক্লুশনের একটি জটিল বয়ানের মধ্য দিয়ে এগোয় পুরো পদ্ধতিটা। এই পরিচ্ছেদে, সেই পদ্ধতির কিছু টুকরো নিয়ে আমরা আলোচনা করব। টুকরো-টাকরা কিছু পর্যবেক্ষণ করব, এবং তাদের জোড়াতালি দিয়ে দেখব কোনো উপসংহারে পৌঁছনো যাচ্ছে কিনা।

একদঙ্গল অপরাধীকে নিয়ে বোটানি বে'তে পৌঁছে, একটি কলোনি স্থাপনের গুরুদায়িত্ব যাঁর কাঁধে অর্পিত হয়েছিল, তাঁর নাম আর্থার ফিলিপ, যিনি নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম ব্রিটিশ গভর্নর। এই অজানা দ্বীপ মহাদেশে কলোনির স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে বসতি এবং আইন শৃঙ্খলার পত্তন পর্যন্ত যাবতীয় দায়িত্বই ছিল ফিলিপের। ফিলিপই বোটানি বে'পরিবর্তে সিডনি কোভ এ নোঙ্গর করে সেখানেই প্রাথমিকভাবে কলোনির পত্তন করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে এক অর্থে ফিলিপকেই সিডনি নগরীর প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়।

কলোনির একদম প্রথম দিনগুলির বিবরণ পাওয়া যায় ফিলিপের জার্নাল থেকে। বোটানি বে'র পরিবর্তে সিডনি কোভকে বেছে নেওয়া, অস্ট্রেলিয় আদিবাসীদের সঙ্গে প্রথম মোলাকাত, স্কার্ভির উপদ্রব, ইত্যাদি ইত্যাদির সঙ্গে, ফিলিপের জার্নাল থেকে পাওয়া যায় কলোনির প্রথম ক্রিমিনাল কোর্টের কথা। সম্ভবত: এটি একটি অ্যাড হক ধরণের কোর্ট ছিল, যার সে অর্থে কোনো রাজকীয় স্বীকৃতি ছিলনা। ফিলিপের জার্নাল থেকে জানা যাচ্ছে, ১৭৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে এই কোর্টটি বসে, যাতে ছ জন অপরাধীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এরা ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল। অপরাধীদলের পান্ডাকে সেদিনই মেরে ফেলা হয়। বাকিদের মধ্যে একজনকে ক্ষমা করা হয়। অবশিষ্ট চারজনকে কাছেই একটি ছোটো দ্বীপে "নির্বাসন'এ পাঠানো হয়। তাদের খাবার জন্য স্রেফ রুটি আর জল দেওয়া হয়েছিল। (১৫)

এখানে একটি জিনিস লক্ষ্যণীয়। দেখা যাচ্ছে, শাস্তির ধরণটি এখানে অবিকল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মিনিয়েচার ফর্ম। এখানেও মৃত্যুদন্ড আছে, ক্ষমা আছে, এবং অবশ্যই মিনি দ্বীপান্তর আছে। বৃহদাকার কোনো জেলখানা নয়, মনে হচ্ছে যেন "প্রকৃত' পশ্চিমের একটি কার্বন কপি বানানো হচ্ছে। সাম্রাজ্যের বাইরে আরেকটি উদ্বৃত্ত সাম্রাজ্য বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে , যা আকারে ছোটো, কিন্তু গুণে নয়। দ্বীপান্তরের মাধ্যমে বানানো হচ্ছে একটি কলোনি, যার ভিতরে শাস্তির প্রকরণ হিসাবে আবার পাচ্ছি দ্বীপান্তরকে। ফলে ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অপরাধীদের পাঠানো মূলত: এমন একটি বহিষ্কারের প্রকরণ, যা সম্পূর্ণ এবং অ্যাবসলিউট বহিষ্কার নয়, বরং বহিষ্কারের মাধ্যমে একটি উদ্বৃত্ত অস্তিত্ব তৈরির প্রক্রিয়া। এই সেই প্রক্রিয়া, যা "প্রকৃত' পশ্চিম থেকে বহিষ্কৃত, কিন্তু তারই কপিবিশেষ, তারই বর্ধিত অংশ, উদ্বৃত্ত পশ্চিমের জন্ম দেয়।

এখানে যে আদালতটির কথা বলা হল, তা সম্ভবত: কোনো স্বীকৃত আদালতের রায় নয়। কারণ এটি শুধু ফিলিপের জার্নালেই পাওয়া যাচ্ছে, আদালতের নথীতে নয়। ১৭৮৭ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস কোর্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম যে আদালতটি গঠিত হয়েছিল, তার নথিতে প্রথম কেস হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে অন্য একটি মামলাকে। অস্ট্রেলিয় কলোনির ইতিহাসে বহু আলোচিত এই কেসটি হল, কেবল বনাম সিনক্লেয়ার। (১৬)

কেবল মনাম সিনক্লেয়ার মামলার গল্পটা মোটামুটি এইরকম: ১৭৮৩ সালে উনিশ বছরের সুসানা হোমস নামক একটি তরুণীকে ব্রিটেনের আদালত মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল হাউস ব্রেক এবং চুরির অপরাধে। হেনরি কেবল নামক আরেক ব্যক্তিও মৃত্যুদন্ড পায় অনুরূপ অপরাধের জন্য। দুজনকেই পরে ক্ষমা করা হয় এবং মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে দ্বীপান্তরের সাজা হয়। জেলেই দুজনের মেলামেশা হয়, এবং তার ফলশ্রুতিতে ১৭৮৬ সালে সুসানা গর্ভবতী হয়। আমেরিকার স্বাধীনতার ফলে দুজনেই তখন জেলে, দ্বীপান্তরের প্রতীক্ষায়। সুজানা এবং হেনরি বিয়ের অনুমতি চায়, কিন্তু পায়না। কারণটা সহজবোধ্য -- "মৃত' মানুষদের কখনও বিয়ে হয়না।

সেই বছরই, অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রথম নৌবহর, "ফার্স্ট ফ্লিট' এর প্রস্তুতি চলছিল। নরউইচ ক্যাসল জেলের অন্যান্য নারী অপরাধীদের সঙ্গে সুসানাকেও প্লিমাউথে নিয়ে আসা হয়, এই নৌবহরে জায়গা দেওয়া হবে বলে। ততদিনে শিশুটি জন্মে গেছে। মরিয়া হেনরি,আরেকবার সুসানাকে বিয়ে করার এবং তার সন্তানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া যাবার অনুমতি চায়, এবং আবার প্রত্যাখ্যাত হয়। সুসানাকে জাহাজে তোলা হয়, এবং ক্যাপ্টেনের আদেশে বাচ্চাটিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। এই সময়ে জনৈক "টার্নকি', জন সিম্পসন ঘটনাটি দেখেন, শিশুটিকে গ্রহণ করেন, এবং তাকে নিয়ে সাতশ মাইল পার করে সিধে চলে যান হোম সেক্রেটারি লর্ড সিডনির কাছে। ধরণা দিতে। অত:পর বাবাকে বাচ্চা ও তার মায়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াগামী জাহাজে চড়ার অনুমতি দেওয়া হয় (এর মধ্যে কোনো এক সময়ে তাদের বিয়েও হয়, কারণ পরবর্তীকালের অস্ট্রেলিয়ান আদালতের নথীতে দেখছি সুসানাকে হেনরির স্ত্রী বলে উল্লেখ করা হয়েছে)। ঘটনাটি যথেষ্ট প্রচার পায়, বোঝা যায়, কারণ জনতা চাঁদা তুলে কেবল পরিবারের জন্য জামাকাপড় এবং অন্যান্য বিভিন্ন জিনিসপত্রের একটি পার্সেল জাহাজে তুলে দেয়।

এরপর ফার্স্ট ফ্লিটে চড়ে কেবল পরিবার পৌঁছয় নিউ সাউথ ওয়েলসে। এবং পৌঁছে দেখা যায়, জাহাজ থেকে পার্সেলটি খোয়া গেছে। কেবল দম্পতি তখন উপনিবেশের সদ্যগঠিত আদালতে জাহাজের ক্যাপ্টেন সিনক্লেয়ারের বিরুদ্ধে মামলা ঠোকেন। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এইটিই প্রথম দেওয়ানি মামলা। শুনানি টুনানির পর এই আদালত কেবলদের পক্ষেই রায় দেয়, এবং সিনক্লেয়ারকে ১৫ পাউন্ড জরিমানা করে।

এই রায়টি সদ্যগঠিত অপরাধী উপনিবেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্রিটেনে এই মামলাটি লড়া হলে কেবলদের জেতার তো কোনো প্রশ্নই ছিলনা, এমনকি কেবলরা এই মামলাটি লড়তেই পারতেন না। কারণ, আগেই বলা হয়েছে, মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীদের, সাধারণ আইন অনুযায়ী,সম্পত্তির অধিকার ছিলনা, সাক্ষ্য দেবার আধিকার ছিলনা, এবং "সু' করার অধিকারও ছিলনা । আইন অনুযায়ী, কেবলদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতেই পারেনা, যা হারিয়ে যেতে পারে। ফলে এ নিয়ে কোনো অভিযোগও করার কোনো মানে হয়না। আর অভিযোগ করার কোনো আইনসঙ্গত অধিকারও কেবলদের ছিলনা, কারণ, তারা মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামী।

কিন্তু মজা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া, তাত্ত্বিকভাবে একটি ব্রিটিশ কলোনি হলেও, তাত্ত্বিকভাবে একই "সাধারণ আইন' এর আওতায় থাকলেও,দেখা যাচ্ছে, কেবলদের এই মামলা লড়তে দেওয়া হয়েছিল, এবং শুধু তাইই নয়, জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়ে, "সাধারণ আইন' এর বিরুদ্ধে গিয়ে তাদের দাবীকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ফলে একটা জিনিস পরিষ্কার। ব্রিটিশ অপরাধীরা, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঠিক "বিশুদ্ধ' অপরাধী ছিলনা। নিউ সাউথ ওয়েলসও ঠিক বর্ধিত একটি ব্রিটিশ কারাগার ছিলনা। বরং, আগের দুটো ঘটনা থেকে মনে হয়, ব্রিটিশ কাঠামোর একটি নিখুঁত কপি বানানোর চেষ্টা চলছিল। যেখানে ন্যায়বিচার আছে, শাস্তি আছে, দ্বীপান্তর আছে। অবিকল "প্রকৃত' পশ্চিমের মতো। কিন্তু পশ্চিম হলেও এ পুরো পশ্চিম নয়। কারণ, এই রাজ্যে তারাই "নাগরিক', ব্রিটেনে যারা পরিত্যক্ত। সম্মানীয় ভদ্রলোকদের নয়, আদতে এ এক অপরাধীদের রাজত্ব। ফলে সবকিছুর পরেও তাই গোড়ার দিকের এই নিউথ সাউথ ওয়েলস মূলত: পশ্চিমের নকলনবিশি। এক উদ্বৃত্ত পশ্চিমের উপাখ্যান, আকারে যা বামন, ফলে সতত:ই তা পূর্ণাঙ্গদের নকল করতে চায়।

এখানে একটা জিনিস উল্লেখ করা দরকার, যে, এই দুটি উদাহরণের মানে এই নয়, যে, অস্ট্রেলিয় অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ "নাগরিক' অধিকার ছিল। বরং এটাই স্বাভাবিক, যে, উপনিবেশটি যেমন ছিল "প্রকৃত' পশ্চিমের ভান, আসল নয় আসলের "মতো', একই ভাবে অপরাধীরাও "প্রকৃত' নাগরিক নয়, ছিল নাগরিকের মতো। অপরাধীরা "মুক্ত' মানুষ ছিলনা। বরং তারা সাধারণভাবে ছিল সরকারি সম্পত্তি। তাদের সরকারি কাজে লাগানো হত। কখনও কখনও বেসরকারি মালিকদের হাতেও পাঠানো হত। আইনত: অস্ট্রেলিয় কলোনি ছিল বৃটিশ "সাধারণ আইন' এর অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটেনের, রাজশক্তির দিক থেকে চাপ ছিল কঠোর ভাবে "সাধারণ আইন' প্রয়োগ করার। কিন্তু এসবের পরেও, অস্ট্রেলিয়ার, তার কলোনিকাঠামোর, একটি "কলোনিয়াল ডিজায়ার' ছিল, যে, তাকে পশ্চিমের "সমান' হতে হবে। ফলে অপরাধীরা ব্রিটেনের চেয়ে তো বটেই, এমনকি আমেরিকার চেয়েও অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করত। এই কলোনিয়াল ডিজায়ারের একটি অনিবার্য ফলশ্রুতি ছিল রাজশক্তির আইনের সঙ্গে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়া, যা কলোনির প্রথম যুগের ইতিহাসে বহু বহু বার দেখা গেছে। কিঞ্চিৎ সংঘর্ষ ও অনিবার্য আপোস, রাজার দিক থেকে চাপ এবং কৌশলে তার পাশ কাটিয়ে যাওয়া, আইনের কায়দা করে ব্যাখ্যা করা, ইত্যাদি বহুবিধ কৌশলের সাক্ষী আদি যুগের কলোনি, ব্রুস কার্চার যে আইনী ইতিহাসের একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

কার্চার দেখাচ্ছেন, কেবল বনাম সিনক্লেয়ার মামলায় ব্রিটিশ "ল অফ অ্যাটেন্ট' ( অপরাধীদের অধিকারহীনতার আইন) কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার পর, সেই আইনকে টুকরো-টাকরায় জোড়াতালি দিয়ে আবার প্রয়োগ করার চেষ্টা শুরু হয়। তার প্রতিক্রিয়ায় অস্ট্রেলিয় আদালতও আইনী "জবাব' দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৮০১ সালে একটি নির্দেশ জারি করা হয়, যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রধান আদালত, কোর্ট অফ সিভিল জুরিসডিকশনে অপরাধীদের "সু' করা যাবেনা, এবং অপরাধীরা কাউকে "সু' করতেও পারবেনা। এটা ঠিক "সাধারণ আইনানুগ' না হলেও, এতে অপরাধীদের কিছু অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জবাবে কোর্ট কর্তৃপক্ষ তখন স্মরণ করিয়ে দেন, যে, "সু' করা এবং "সু' হওয়া দুইটিই চলবে ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে, যাদের অপরাধীদের উপর "জেনারাল জুরিসডিকশন' আছে। ১৮০১ সালের এই নির্দেশের এক নিজস্ব ব্যাখ্যায় আদালত আরও জানায়, যে, অপরাধীদের সম্পত্তির অধিকার বৈধ। এমনকি তারা সাক্ষ্যও দিতে পারে, কারণ এটাই হল, "ইউনিফর্ম প্র্যাকটিস অফ দা কোর্টস ইন দিস কলোনি'।

এর পরে ১৮১৪ সালে তৈরি হয় অস্ট্রেলীয় সুপ্রিম কোর্ট, যেখানে ইংলিশ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করার কথা। তাত্ত্বিকভাবে ইংরাজ ল অফ অ্যাটেন্টও নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করার কথা, যার অর্থ হল, অপরাধীদের সকল প্রকার অধিকারের জলাঞ্জলি। তারা সাক্ষ্য দিতে পারবেনা, সম্পত্তির অধিকার পাবেনা, ইত্যাদি। কার্চার দেখাচ্ছেন, আদালত এই পরিস্থিতিতেও ইংল্যান্ডের আইনকে এড়িয়ে যাবার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। অপরাধীদের সাক্ষ্য দেবার অধিকারের প্রশ্ন উঠলেই, বিচারপতিরা অপরাধীর অপরাধ এবং তাকে দেওয়া শাস্তির যথাযথ ও নিখুঁত প্রমাণ চাইতেন। এই নিখুঁত প্রমাণ, অর্থাৎ কিনা ব্রিটিশ আদালতের কাগজপত্র, তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী কলোনিতে পাঠানো হতনা, তা থাকত পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে। ফলে তা আদালতে দাখিল করার কোনো প্রশ্নই ছিলনা, এবং এই ফাঁক দিয়ে অপরাধীদের অধিকারের "আইনসঙ্গত' অধিকারের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হত। (১৭)

এইভাবে, আদালত, গোড়া থেকেই, অপরাধীদের অধিকার রক্ষা করার লড়াই চালিয়ে গেছে। যুদ্ধ ঘোষণা করে নয়, বরং আইনী পদ্ধতিতে। আদালতে আইনের ব্যাখ্যা, মারপ্যাঁচ ও কূটকচালির মাধ্যমে। কেউ কেউ দাবী করেন, যে, এই সময়ে অস্ট্রেলীয় আদালত একটি "ডিফ্যাক্টো পার্লামেন্ট' এর মতো কাজ করেছে (১৮)। তো, এখানেও সেই একই গল্প। অস্ট্রেলিয়ার পুরোদস্তুর পার্লামেন্ট নেই, কিন্তু পার্লামেন্ট থাকার আকাঙ্খা আছে। কলোনিয়াল ডিজায়ার আছে। খন্ডিত, অতিরিক্ত পশ্চিমের "প্রকৃত' পশ্চিম হয়ে ওঠার বাসনা আছে। ফলে এই পুরো আখ্যানের একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই এরকম (যেটা আগেই দেওয়া হয়েছে), যে, সবকিছুর পরেও তাই গোড়ার দিকের এই নিউথ সাউথ ওয়েলস মূলত: পশ্চিমের নকলনবিশি। এক উদ্বৃত্ত পশ্চিমের উপাখ্যান, আকারে যা বামন, ফলে সতত:ই তা পূর্ণাঙ্গদের নকল করতে চায়।


২।

কিন্তু এটা তো শুধু ল্যাক অফ কনফিডেন্সের গল্প হল, যা হরবখত আমরা অন্য উপনিবেশগুলিতেও দেখতে পাই, সেই সব উপনিবেশে, যাদেরকে আমরা পরে তৃতীয় বিশ্ব বলে জানব। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া তো তৃতীয় বিশ্ব নয়, বরং উদ্বৃত্ত পশ্চিম। ফলে স্রেফ ল্যাক অফ কনফিডেন্স দিয়ে এই আখ্যানের বর্ণনা দেওয়া যাবেনা। সারপ্লাস মিনিং যেমন মিনিং থেকেই জাত, কিন্তু মিনিং এর দাস নয়, উদ্বৃত্ত পশ্চিমও তেমনি স্রেফ খন্ডিত পশ্চিম নয়। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া শুধুমাত্র পশ্চিমের নকলনবিশী নয়, মিমিক্রি নয়, গল্পটাও কেবলমাত্র আত্মবিশ্বাসহীনতা, আত্মপরিচয়হীনতার নয়। পশ্চিম এবং অতিরিক্ত পশ্চিমের গল্পের বয়ানটি জটিল। এটি স্রেফ কেন্দ্র আর পরিধির গল্প নয়, বরং কেন্দ্রের পরিধি আর পরিধির কেন্দ্র হয়ে ওঠারও গল্প, সোজা ভাষায় বললে অষ্টাদশ শতকের আমেরিকার আজকের আমেরিকা এবং সূর্যাস্তহীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আজকের ব্রিটেন হয়ে ওঠারও গল্প। এই গল্পের সূচনার কিছু আভাস আমরা অষ্টাদশ শতকেই পাই, যখন কলোনির একদম গোড়ার দিকের অভিবাসী (অপরাধী) দের মধ্যে গড়ে উঠতে দেখি একটি ঐক্যের আখ্যান। যে প্রবাদপ্রতিম অভিব্যক্তি পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয় একতায় পরিণত হবে, পরিণত হবে অস্ট্রেলিয় আত্মপরিচয়ে, তার সূচনাবিন্দুটি কলোনির একদম আদি যুগেরই। এখানে অস্ট্রেলিয় অপরাধীদের আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস, ঐক্যের একদম সূচনালগ্নের একটি বর্গকে আমরা খুঁটিয়ে দেখব, যা আস্ট্রেলিয় অপরাধীদের প্রবাদপ্রতিম একতার একটি অভিব্যক্তি। বর্গটির নাম "মেটশিপ'।

মেটশিপ মূলত: অস্ট্রেলিয়ার জন্মরহস্যের লোককথা। পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের বিভিন্ন আখ্যানের মতই। একটি জনপদের গড়ে ওঠার রহস্য, তার জন্মের মিথ, অপরাধী, বা সামগ্রিকভাবে অস্ট্রেলিয় অভিবাসীদের একতার মিথ,অস্ট্রেলিয়ার ঐক্যের এক পপুলার ধারণা। অস্ট্রেলিয়ার কালচারের সরকারি ওয়েবসাইট বলছে :""মেটশিপ এমন একটি ধারণা, যার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় সেই ঔপনিবেশিক সময় থেকেই। অপরাধী এবং নতুন অভিবাসীরা (অস্ট্রেলিয়ায়) যে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের আবিষ্কার করত, তাতে পুরুষ এবং নারীদের একে অপরের উপর সমস্ত ধরণের সাহায্যের জন্য নির্ভর করতে হত। অস্ট্রেলিয়ায় "মেট' শুধু বন্ধু নয়, আরও বেশি কিছু। এই শব্দটি একটি যৌথ অভিজ্ঞতার কথা বলে, আর বলে পারস্পিক সম্মান এবং নি:শর্ত সহায়তার কথা।

মেটশিপ কথাটা প্রথাগতভাবে পুরুষদের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, এবং সংকটের সময় পুরুষদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। মেটশিপের জনপ্রিয় ধারণাটি সামনে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। সেই সময় মেট শব্দটি "ডিগার'এর সঙ্গে সমার্থক হয়ে ওঠে, যার উৎস ১৮৫০ সালের সোনা খোঁড়া ...'' (১৯)

অতএব মেটশিপ মূলত: এক নিম্নবর্গীয় একতার গল্প, যে একতা ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ার কঠিন যাত্রাপথে তৈরি হত, কঠোরতম পরিস্থিতি যাকে পোক্ত করে তুলত, এবং কলোনিতে অপরাধীদের একটি বন্ধনে বেঁধে রেখে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করত। যেহেতু মিথ, তাই সরকারি ওয়েবসাইটের বক্তব্যের সত্যমিথ্যা এখানে আলোচ্য নয়, আলোচ্য শুধু মিথটুকু। লোকগাথায় যে অতীতের কথা পাওয়া যায়, তা একরকম করে অতীতের নির্মান, এখানে নির্মানটুকুই লক্ষ্যণীয়। এই মিথ, এই নির্মিত অতীত, ক্রমশ: অস্ট্রেলিয় গণযাপনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। ডিগার, অর্থাৎ স্বর্ণখনি শ্রমিকরা (ডিগার আর মেট মূলত: সমার্থক) অস্ট্রেলিয়ার ফোকলোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। মেটশিপ নিয়ে রচিত হয় গান, আখ্যান, এমনকি সিনেমা (গ্যালিপলি, ১৯৮১)। সরকারি ওয়েবসাইটেই পাচ্ছি, নিউ সাউথ ওয়েলসের পার্লামেন্টের জনৈকা সদস্যা ১৯৯৫ সালেও বলছেন : ""পরের জন্মে আমি অবশ্যই একজন মেটকে বিয়ে করব, আমার ভাই হবে একজন মেট'' (২০)। মেটশিপ নামক মিথটি, মেট নামক নির্মানটি এই ভাবেই দুই শতাব্দী অতিক্রম করেও টিকে থাকে -- অস্টেলিয়ান ইংরিজিতে আজও "মেট' একটি অত্যন্ত চালু এবং ব্যবহৃত শব্দ।

এর মানে অবশ্যই এই নয়, যে, মেটশিপ মূলত: গল্পকথা। মিথ এবং জনজীবন তো একে অপরকে নির্ধারণ করে, ফলে সেই "শিপ অফ ফুলস' এর মতো এরও কিছু বাস্তব ভিত্তি আছে। এবং তার ইতিহাস কলোনির একদম প্রথম যুগের। বস্তুত: উপনিবেশের ইতিহাসে মেটশিপের প্রথম যে আখ্যান পাওয়া যায়, তা ১৭৯৮ সালের। গল্পটি এরকম:১৭৯৮ সালে, গভর্নর হান্টার আদেশ দেন, যে, প্রতিটি অপরাধীকেই "রিলিজিয়াস সার্ভিস' এ উপস্থিত থাকতে হবে। জবাবে, জনৈক অপরাধী, চার্চেই আগুন ধরিয়ে দেয়। এবং চার্চটি পুড়ে যায়। অপরাধী কে, জানা যায়না। গভর্নর হান্টার প্রবল ক্ষিপ্ত হয়ে পুরষ্কার ঘোষণা করেন। খবর দিলেই, এমনকি ইনফর্মার যদি যাবজ্জীবন দন্ডে দন্ডিত হয় তাহলেও, পুরষ্কার হিসাবে পাওয়া যাবে নি:শর্ত ক্ষমা, বিনা পয়সায় ঘরে (ইংল্যান্ডে) ফেরার খরচা। এবং তৎসহ অতিরিক্ত ৫০ পাউন্ড। বলাবাহুল্য, খবর দিতে, অপরাধীদের একজনও এগিয়ে আসেনি (২১)। প্রবল প্রলোভনের মুখেও তারা মেটশিপের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল।

এখানে যেটা লক্ষ্যণীয়, যে, কলোনির ঐ প্রাথমিক যুগেই গড়ে উঠছে, পশ্চিম বিবর্জিত একটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান বর্গ। অস্ট্রেলিয় ঐক্য, অস্ট্রেলিয় আইডেন্টিটিকে ব্যক্ত করার জন্য আর কোনো পশ্চিমী ক্যাটেগরির প্রয়োজন হচ্ছেনা। বরং ব্যবহৃত হচ্ছে একটি বিশুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান বর্গ, যার নাম মেটশিপ।

এই মেটশিপ একটি জটিল জিনিস। কলোনির জটিল ইতিহাসের মতই জটিল। একদিকে, একটু হাল্কা করে বললে, মুজতবা আলি যেমন বলেছিলেন, যে পাঠানের ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত শিক্ষা-অশিক্ষা অতি সূক্ষ্ম আস্তরণ, একটু খোঁচা লাগলেই বেরিয়ে ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ে আসল পাঠানত্ব, তেমনই উপনিবেশ অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে বলা যায়, রোগা-মোটা শ্রমিক-কৃষক অতি ফালতু জিনিস, একটু খোঁচা লাগলেই বেরিয়ে পড়ে অন্তরের মেটত্ব। ব্রেথওয়েট দেখাচ্ছেন, ১৮২২সালেই অপরাধীরা,মজুরি বৃদ্ধির দাবীতে সংগঠিত হয়েছিল। অপরাধীরা, যাদের মেয়াদ খাটা তখনও শেষ হয়নি, তারাই গড়ে তুলেছিল প্রিন্টার্স ইউনিয়ন। ওয়ার্ডকে উদ্ধৃত করে তিনি বলছেন ""অপরাধী এবং অভিবাসীদের মেটশিপ ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি প্রবাদবিশেষ(লেজেন্ড), এবং গ্রামীণ শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামই গড়ে তুলেছিল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। সেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনই পুরুষপ্রধান মেটশিপকে নিয়ে যায় শহরে''। এছাড়াও, ""এটি একটি স্বাক্ষর ওয়ার্কিং ক্লাস যা রাজনীতি নিয়ে প্রচুর পড়েছে এবং কথা বলেছে, কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ঠাট্টা করেছে। এটা অস্ট্রেলিয়াকে কোনো ইগালিটারিয়ান বিংশ শতাব্দী উপহার দিতে পারেনি, বরং নিজের দঙ্গলের বাইরের লোকেদের উপহাস করেছে, বেছে নিয়েছে এক ইনফর্মাল মেটশিপ, যা রাজনৈতিক একতাকে একাধারে ঠাট্টা করেছে, এবং তারই সঙ্গে যুক্ত থেকে তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তুলেছে।'' (২২)

সব মিলিয়ে, মেটশিপ একটি গৌরবগাথা। গৌরবের অভিব্যক্তি। যা অভিবাসীচৈতন্যকে গড়ে তুলেছে, এবং একই সঙ্গে এটি অভিবাসীচৈতন্যের অভিব্যক্তিসূচক একটি বর্গও বটে। এবং, বোল্ড ও আন্ডারলাইন দিয়ে ছত্রিশ পয়েন্টে যা লেখা উচিত, যে, এটি, একটি বিশুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান বর্গ। একটি বিশুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান গৌরবসূচক বর্গ, যা পশ্চিমের জাতি/নেশন/জাতীয়তাবাদ জাতীয় বর্গগুলির বিপরীতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন একটি বিশ্বাস ও অস্তিত্বের অভিব্যক্তি, যা অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব, যার জন্য পশ্চিমের দিকে নকলনবিশীর জন্য তাকাতে হয়নি। ঠিক এই জায়গাতেই উদ্বৃত্ত পশ্চিম আলাদা হয়ে যায় তৃতীয় বিশ্বের কলোনিসমূহ থেকে, যেখানে এই জাতীয় কোনো অভিব্যক্তি চোখে পড়েনা। কলোনির ইতিহাসে উদ্বৃত্ত পশ্চিম ও তৃতীয় বিশ্বের কলোনিগুলির মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজনরেখা যদি থাকে সেটি এইটিই। তৃতীয় বিশ্বের কলোনিগুলির নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে এমন কোনো বর্গ সাধারণভাবে নেই, যা তার নিজস্ব। যে বর্গগুলি টিকে আছে, তার নিজস্বতার খোলসটুকু শুধু পড়ে আছে, শব্দটি একই আছে, শুধু ফুটপাথ বদলে গেছে মধ্যরাত্রে। তার গৌরবের উপাখ্যানগুলি মূলত: আত্মবিশ্বাসহীনতার অভিব্যক্তি, নকলনবিশীর উদাহরণ।

একটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। বাংলায় "জাতি' নামক বর্গটি বহুল প্রচলিত। কলোনি যুগের সূচনায় (এমনকি উত্তর-কলোনি যুগেও কোথাও-কোথাও) বঙ্গীয় হিন্দু সমাজে এটি যে অর্থে ব্যবহৃত হত, তা ইংরিজি "কাস্ট' এর কাছাকাছি। উচ্চবর্ণ না নিম্ন, ব্রাহ্মণ না কায়স্থ, শূদ্র না বিধর্মী, এই অর্থে ব্যবহৃত হত জাতি বর্গটি। বলাবাহুল্য এই বর্গটি কলোনির নিজস্ব বর্গ ছিল, যা পশ্চিমী রেস/স্টেট/নেশন জাতীয় বর্গগুলির সম্পূর্ণ উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অভিব্যক্তি, যা তার নিজের অস্তিত্বের জন্য কোনো পশ্চিমী বর্গের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে রেস/জাতি এই দুটি বর্গ একে অপরের সঙ্গে কোথাও মেলেনা(মিলতনা), কলোনিবাসী ও কলোনিপ্রভুদের দুনিয়ার দুটি আলাদা অস্তিত্ব হিসাবে সমানে সমানে সামনাসামনি দাঁড়াত বুক ঠুকে। বন্দী, কিরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা কর? না, রাজার প্রতি রাজার যে রূপ ব্যবহার।

কিন্তু হায়, বন্দী তখনই রাজা হয়, যদি বিজয়ী রাজার পুতুলখেলার শখ হয়, দয়া হয়। ঠিক এই জায়গাতেই কলোনিয়াল সম্পর্ক তার নিজের খেলা খেলে। বর্ণ, কাস্ট, প্রভুর জগতে একটি অপরিচিত বর্গ। অতএব তা গৌরবের অভিব্যক্তি নয়। তা আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি নয়। অতএব কলোনির বর্গ প্রভুর সমান হতে চায়। প্রভুর মতো হতে চায়। প্রভুর গৌরবের বিপরীতে তার নিজের গৌরবগাথা শোনাতে চায় প্রভুকে, প্রভুর নিজের ভাষায়। অতএব, "জাতি' বদলে ফেলে আত্মপরিচয়। "জাতি' থেকে বর্ণ-কাস্ট-আত্মপরিচয় মুছে ফেলা হয়, জাতির আদি অর্থকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রান্তিক অবস্থানে। শুধু খোলসটুকু থেকে যায়, পোশাকটুকু থেকে যায়, জাতি আদতে হয়ে ওঠে রেস। এবার এই "জাতি' নামক বর্গটি দিয়ে সে রচনা করবে, নির্মান করবে নিজের আত্মপরিচয়। প্রভুর সমান হতে চাইবে। প্রভুর যদি জাতির "ইতিহাস', "গৌরব', "আত্মপরিচয়' থাকে, কলোনিবাসীকেও জাতির গৌরব, ইতিহাস আত্মপরিচয় রচনা করতে হবে। কলোনিবাসীকে প্রভুর মতো হতে হবে। ফলে জাতি হয়ে উঠবে এমন একটি বর্গ, যা তার নিজস্ব নয়, পশ্চিমের নকলনবিশী মাত্র। যা তার আত্মবিশ্বাসহীনতা, ল্যাক অফ কনফিডেন্সের চিরস্থায়ী চিহ্ন হয়ে থাকবে মাত্র।

ফলে, তৃতীয় বিশ্বের নিজস্ব ভাষা নেই, নিজস্ব বর্গ নেই, আত্মবিশ্বাস নেই। তার বর্গ মূলত: পশ্চিমের অনুকরণের অভিব্যক্তি। তার নিজের কোনো আলো নেই। ঠিক এই জায়গাতেই উদ্বৃত্ত পশ্চিমের থেকে তৃতীয় বিশ্ব আলাদা হয়ে যায় তার কলোনিয়াল অতীতের সমগ্রতা নিয়ে। ইউরোপ থেকে জাত হলেও, উদ্বৃত্ত পশ্চিমের নিজস্ব ভাষা ছিল। নিজের বর্গ ছিল। নিজস্ব গৌরবগাথা ছিল। আত্মবিশ্বাস ছিল। ঐক্য ছিল। যার নাম মেটশিপ। যা, সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পশ্চিমী বর্গগুলির সামনে। পশ্চিম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আবার পশ্চিম হয়ে ওঠার চেষ্টা নয়, উদ্বৃত্ত পশ্চিম অন্যরকম হতে চেয়েছে, পশ্চিমের মতো নয়, নিজের মতো হতে চেয়েছে।

ব্রেথওয়েট বলেছেন, ফুকোর মডেলে নয়, অস্ট্রেলিয়াকে দেখতে হবে ইনক্লুশন এবং এক্সক্লুশনের ধারণার উপর জোর দিয়ে(২৩)। আদতে তাও না, এই বস্তুটিকে বুঝতে হবে ওভারডিটার্মিনেশনের মডেলে ঢেলে। কারণ সেই মডেলটিই এখানে খাপে খাপ মিলে যায়। পশ্চিম এবং উদ্বৃত্ত পশ্চিম একে অপরকে নির্ধারণ করে। নির্মান করে। ডিসকার্সিভলি করে। (তার বাইরেও করে, মানে যেটা আমি আপনি বুঝি, কিন্তু বুঝিয়ে বলতে পারিনা।) একদিকে পশ্চিমী রেস/নেশন/স্টেট মেটশিপকে এক্সক্লুড করে, এবং একই ভাবে মেটশিপও গড়ে ওঠে এদেরকে এক্সক্লুড করে। মিউচুয়াল এক্সক্লুশন। অন্যদিকে নেশন/স্টেট/ন্যাশানালিজমের ধারণাকে অস্ট্রেলিয়া একরকম ভাবে গ্রহণ করে, তার মেটচৈতন্যের উপর বসিয়েই, মেটচৈতন্যকে এভাবেই একরকম অর্থে নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম । পশ্চিমকেও বিনিময়ে নিয়ন্ত্রিত হতে হয় মেটচৈতন্য দিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ধারণাগুলি দিয়ে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, ঔপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়া বেশ কয়েকটি বর্গ নির্মান করে তার আদি যুগেই, "আবিষ্কার' করে শাসনতান্ত্রিকতার বেশ কয়েকটি নিজস্ব কূটকৌশল, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় নেশন/স্টেট/গভর্নমেন্টালিটিকে নির্ধারণ করবে। এক এক করে এখানে তার কয়েকটা উদাহরণ দেখা যাক।

ক। টিকেট-অফ লিভ। এটি একটি অপরাধীসংক্রান্ত প্রশাসনিক ধারণা। অপরাধীরা যখন জাহাজে চড়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে পৌঁছত তখন, আগেই বলা হয়েছে, তারা ছিল রাষ্টীয় সম্পত্তি। গভর্নরের আদেশে তাদের বেগার খাটতে হত হয় উপনিবেশের প্রশাসনের হয়ে, অথবা কোনো ব্যক্তিমালিকের কাছে। এর পর তাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে, এবং/অথবা তাদের সম্পূর্ণ "ক্ষমা' করা হলে, তারা উপনিবেশের "মুক্ত' মানুষ হয়ে যেত। ফলে, অপরাধীদের অবস্থানের দুটি স্তর ছিল। এক, পরাধীন। দুই, স্বাধীন। বোঝাই যাচ্ছে, ধারণাটি তৎকালীন ন্যায়বিচার/শাস্তিপ্রদানের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যার মূল কথা হল দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ। এই ধারণাটি, আগেই দেখেছি, আধুনিক নিয়ন্ত্রণের ধারণার তুলনায় অতীব অদক্ষ। উপনিবেশের অল্প কিছু সেনা ও প্রশাসনিক কর্তাদ্বারা চালিত ব্যবস্থায় এই ধারণার অদক্ষতা আরও বেশি বেশি করে প্রকট হয়ে উঠত। ফলে মোটামুটিভাবে ১৮০১ সালে এই দুইটি স্তরের মধ্যে অবস্থিত তৃতীয় একটি স্তর "আবিষ্কার' করা হয়, যার নাম টিকেট অফ লিভ। এটি "পরাধীন' এবং "স্বাধীন' এর মধ্যবর্তী একটি অবস্থান। যে সমস্ত অপরাধীরা টিকেট অফ লিভ পেত, তারা তখনও শাস্তির আওতায়, কিন্তু বাধ্যতামূলক শ্রমদানের বেগার খাটনি থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকার দেওয়া হত। কিন্তু তারা "স্বাধীন' ছিলনা, বরং প্রশাসনিক সার্ভিলিয়ান্সের আওতায় বসবাস করত। বেগড়বাঁই দেখলে টিকেট অফ লিভ নামক সুবিধাটি "রিভোক' করাও হতে পারত।

অবিকল এই ধারণাটি পরবর্তীকালের পশ্চিম টুকে দেয়। এবং একে আমরা আজ জানি প্যারোল (parole) হিসাবে। আজ হোম অ্যারেস্ট-প্রোবেশন-কারাগার এগুলিকে মূলত: ওয়েলফেয়ার স্টেটের বৈশিষ্ট্য বলে ধরা হয়, যার প্রাথমিক উৎস প্রথম যুগের ঔপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ায়। (২৪)

খ। রেস্টোরেটিভ জাস্টিস। ন্যায়বিচার সংক্রান্ত এই ধারণাটি অস্ট্রেলিয়াতেই প্রথম "আবিষ্কৃত' হয়। ব্রেথওয়েট দেখাচ্ছেন, যে, গভর্নর মার্কারিকেই এই ধারণাটির আবিষ্কর্তা বলা চলে। এটাও সেই উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা, যখন গভর্নর মার্কারি,'সম্মানীয়' সমাজে অপরাধীদের স্থানকে পুনরুদ্ধার (রেস্টোর) করার কথা বারবার বলেছেন, এবং বহিষ্কারপন্থীরা যার সমালোচনা করেছে। এই সংক্রান্ত অস্ট্রেলিয় আবিষ্কারটি ছিল "সার্টিফিকেট অফ ফ্রিডম'। এই সার্টিফিকেট যাদের দেওয়া হত, তারা restored to all the rights and privileges of free subjects ''z (২৫)

গ। ওয়েলফেয়ার স্টেট। আগের দুটো উদাহরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ক্ষমতা এবং শাসনতান্ত্রিকতা সংক্রান্ত বেশ কিছু স্বাধীন ধারণা , পরীক্ষানিরীক্ষার জন্মভূমি এই দ্বীপমহাদেশটি। এই সব পরীক্ষানিরীক্ষা স্রেফ এক্সপেরিমেন্ট ফর এক্সপেরিমেন্টস সেক নয়। বরং টিকে থাকার দাবীতেই এইসব নিজস্ব পথ খোঁজার প্রচেষ্টা। কলোনির একদম প্রথম যুগের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। একদল অপরাধী, যাদের মধ্যে অনেকেই ভায়োলেন্ট, অনেকেই নয়ও, বিচরণ করে বেড়াচ্ছে দ্বীপভূমিটিতে। অপরাধী বলে চিহ্নিত মানুষের সংখ্যা জনপদে একশ শতাংশে কাছাকাছি, এবং নজরদার সামান্য। ফলে বোঝাই যাচ্ছে অপরাধী শাসনের তৎকালীন চালু প্রথাগুলি হুবহু কলোনিতে চালু করে দেওয়া যাবেনা। দমনমূলক নজরদারি এমনিতেই একটি অদক্ষ পন্থা, একশ শতাংশ মানুষের উপর সেই পন্থা নিখুঁতভাবে চালানো অসম্ভব। ফলে, স্রেফ বেঁচে থাকা, টিকে থাকার জন্যই কলোনিকে খুঁজতে হয়েছিল শাসনতান্ত্রিকতার নতুন নতুন বর্গ। অপরাধীকে স্রেফ অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করে দমন করার বদলে অপরাধীকে সমাজে পুন:স্থাপনের কৌশল উদ্ভাবন করতে হয়েছিল। এই প্রকৌশলের অংশ হিসাবেই বেরিয়ে আসে টিকেট অফ লিভ এবং রেস্টোরেটিভ জাস্টিস সংক্রান্ত ধারণাগুলি, যা সঙ্গে নিয়ে আসে কল্যাণমূলক সমাজ/রাষ্টের ধারণাকে।

এ ব্যাপারে ব্রেথওয়েট প্রদত্ত হাতে গরম উদাহরণ আছে তাসমানিয়ার। দ্বীপমহাদেশের প্রান্তের এই দ্বীপটি, যার আদি নাম ছিল Van Diemen's Land, অপরাধীর শতাংশ প্রথম থেকেই মূল ভূখন্ডের অস্ট্রেলিয়ার থেকে বেশি। এবং একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার জন্যও দ্বীপটি কুখ্যাত। ১৮৫৭ সালের সেন্সাসে দেখা যাচ্ছে, তখনও জনসংখ্যার ৫০% ই অপরাধী বা প্রাক্তন অপরাধী। শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ছিল ৬০%। আর অপরাধের হার ছিল গোটা দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার তিনগুণ। এই অপরাধীদের সিংহভাগই ছিল দ্বীপান্তরিত লোকজন, ১৮৪৮/৪৯ সালে এর অপরাধীদের মধ্যে ৯৩% ই ছিল দ্বীপান্তরিত লোকজন।

ব্রেথওয়েট দেখাচ্ছেন, এই বিপুল অপরাধের পরিমান নাটকীয় ভাবে কমতে শুরু করে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জায়গা থেকে। ১৮৫৬-৬৫ এই দশ বছরে তাসমানিয়ায় ৪৪ টি ফাঁসি হয়েছিল। আর তার পরের দশ বছরে ১৮৬৬-৭৫ তে হয়েছিল মাত্র ৪ টি। তার পরের দশ বছরে ১৮৭৬-৮৪ তে খুনের অভিযোগ পাওয়া যায় মাত্র ২২ টি। এবং পরের খুনের ঘটনাটি হয় এর ৩২ বছর পরে, ১৯১৬ তে। ঐ দশ বছরে ধর্ষণ হয় ২৫ টি এবং পরের ধর্ষণটি হয় ১৯০০ সালে। ঐ দশ বছরে ডাকাতি হয় ৫৯ টি, পরের দশ বছরে হয় ৩টি এবং তার পরের দশ বছর কোনো ডাকাতি হয়নি। সবচেয়ে অপরাধীপ্রবণ একটি অঞ্চল থেকে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেই তাসমানিয়া পরিণত হয় একটি সর্বোচ্চ শান্তিপূর্ণ এলাকায়।

কি ভাবে ঘটেছিল এই আপাত: অলৌকিক ঘটনা? অন্য আরও চারটি জিনিসের সঙ্গে ব্রেথওয়েট দেখাচ্ছেন, যে, ""তাসমানিয়া সবসময়েই বুঝেছিল, যে, অর্থনীতি এবং সরকার চালানোর জন্য যে ধরণের মানবসম্পদের সরবরাহ করা হচ্ছিল, সমস্যা ছিল সেখানেই। তাসমানিয়ায় চালান করা হয়েছে অধিকতর সংখ্যায় অপরাধী এবং অধিকতর সংখ্যায় নিকৃষ্টতম ধরণের অপরাধী, এবং এটা করা হয়েছে অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে দীর্ঘতর সময় ধরে। অভিবাসী মানবসম্পদ দিয়ে এই খামতিকে পূরণ করার আশাও ছিল অন্যদের তুলনায় কম। তাই তাসমানিয়া বিনিয়োগ করেছিল সামাজিক কল্যাণ এবং একটি নির্দিষ্ট ধরণের পুলিশিং এ, যা এই অপরাধীদের ভালো নাগরিকে পরিণত করবে। রেনল্ডস দেখাচ্ছেন, যে, কারাগার এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যয় করেছিল অন্যান্য কলোনিগুলির থেকে বেশি পরিমান অর্থ। দ্বীপান্তর শেষ হবার এক দশক পরে ১৮৬৬ সালে তাসমানিয়ার বাজেটে এই ব্যয়ের পরিমান ছিল ১৭%, যেখানে নিউ সাউথ ওয়েলসের ছিল ৬% আর ভিক্টোরিয়ার ৪%। মূল ভূখন্ডের বর্ধিষ্ণু কলোনিগুলির তুলনায় তাসমানিয়া গরীব ছিল, অর্থ ব্যয়ের সামর্থও কম ছিল, কিন্তু ১৮৬৬ সালে প্রতি ১০০০ জন পিছু চ্যারিটিতে তাসমানিয়া ব্যয় করেছিল ৩০৫ পাউন্ড, যেখানে মূল ভূখন্ডের রাজ্যগুলি করেছিল ১৩৮ পাউন্ড। রেনল্ডস সিদ্ধান্ত করছেন, যে, তাসমানিয়া "অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে খরচসাপেক্ষ এবং উন্নত ওয়েলফেয়ার পলিসির জন্ম দিয়েছিল'।''

এর সঙ্গে ছিল পুলিশি নজরদারি। দমন নয় ছিল সার্ভিলিয়েন্স। পুলিশ নিয়মিতভাবেই টিকিট অফ লিভ হোল্ডারদের বাড়ি গিয়ে তাদের উপর নজর রাখত। জনতাকে জানিয়ে দেওয়া হত, যে, তারা রয়েছে সম্পূর্ণ নজরদারির আওতায়। ""কল্যাণ-নজরদারির ঠিক কি কৌশল এতোখানি সাফল্যলাভ করেছিল, তা আমরা পুনর্নিমান করতে পারবনা। কিন্তু আমরা একটা ব্যাপারে নিশ্‌চিত হতে পারি, যে, এগুলিকে কার্যকরি করার জন্য যেন এক দৈব বিনিয়োগ করা হয়েছিল, এবং সেই সাফল্য শুধু অপরাধের হার কমিয়ে আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা''। (২৬)

কথাগুলো আমাদের চেনাচেনা লাগে, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপীয় কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার খুব কাছাকাছি যায় এরা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এই ধারণাটি আসে উনবিংশ শতাব্দী শেষ হবার আগেই। পরে, বহু পরে, কেবলমাত্র সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক কল্যাণের ধারণা বাজারে আসার পরেই, ইউরোপ খুঁজতে শুরু করবে বিকল্প, এবং খুঁজে বার করবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা, যার জন্ম হয়েছিল অনেক কাল আগে পৃথিবীর অন্য গোলার্ধের কোনো এক ছোট্টো দ্বীপে।

এই তিনটি উদাহরণ থেকে পরিষ্কার, যে, পশ্চিম এবং উদ্বৃত্ত পশ্চিমের আখ্যানটি কেবলমাত্র ইনক্লুশন এবং এক্সক্লুশন দিয়ে বোঝা যাবেনা। এরা একে অপরকে নির্ধারণ করে। পশ্চিম এক ভাবে উদ্বৃত্ত পশ্চিমকে এক্সক্লুড করে। আবার উদ্বৃত্ত পশ্চিমও পশ্চিমকে এক্সক্লুড করে অন্য এক ধরণে। অন্যদিকে উদ্বৃত্ত পশ্চিম নকল করে পশ্চিমকে। একই ভাবে পশ্চিমও নকল করে তার উদ্বৃত্ত কাউন্টারপার্টকে।

ফলে সব মিলিয়ে যা পেলাম, তা, নিছক এক বামন ও এক পূর্ণাঙ্গের গল্প নয়, যে বামন সততই পূর্ণাঙ্গের সমান হতে চায়। নিছক নকলনবিশীর গল্প নয়, যে অতিরিক্ত পশ্চিম সততই অনুকরণ করতে চায় প্রকৃত পশ্চিমকে। অবশ্যই অনুকরণ আছে, কিন্তু এই পরিচ্ছেদের শুরুতেই যেভাবে বলা হয়েছিল, গল্পটি শুধু কেন্দ্র আর পরিধির চিরাচরিত গল্প নয়,বরং পরিধি আর কেন্দ্রের স্থানপরিবর্তনেরও গল্প, পশ্চিম ও তার কলোনির উল্টে পাল্টে যাওয়া সম্পর্কেরও গল্প। তাই নিছক ইনক্লুশন এবং এক্সক্লুশন নয়, যথাযথ ক্যাটেগরিটি এখানে ওভারডিটার্মিনেশন, যা গড়ে ওঠে পারস্পরিক এক্সক্লুশন এবং পারস্পরিক অনুকরণ/অনুসরণের মধ্যে দিয়ে। যে পদ্ধতি একমুখী কার্যকরণ সম্পর্কে গাঁথা নয়, বরং উভমুখী এবং সাইমাল্টেনিয়াস।





৩।

কিন্তু এহ বাহ্য। অতিনিয়ন্ত্রণই শেষ কথা নয়, তারও একটি সীমান্ত আছে (২৭)। এই উদ্বৃত্ত পশ্চিমেও তা বিলক্ষণ বর্তমান। আমরা এই পরিচ্ছেদে শুধু ছোট্টো করে ছুঁয়ে যাব প্রসঙ্গটিকে। গভীরে ঢুকবনা (তার জন্য আরও একটি গাব্দা প্রবন্ধ লেখা দরকার), তারপর পরের পরিচ্ছেদে পৌঁছে যাব উপসংহারে।

আগের পরিচ্ছেদে অস্ট্রেলীয় কাঠামোর যে বিপুল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলা হল, তার সাক্ষী হিসবে সম্পূর্ণ অপ্রতত্যাশিতভাবে আমরা পাই আরও একজন মানুষকে, যাঁর নাম চার্লস ডারউইন। উনবিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে তাঁর বিখ্যাত যাত্রায় অংশ নিয়ে ডারউইন পৌঁছন কলোনি অস্ট্রেলিয়ায়। এবং অস্ট্রেলিয় কলোনির একটি চমকপ্রদ, অভূতপূর্ব বর্ণনা পাওয়া যায় ডারউইনের লেখা থেকে। একজন আউটসাইডার, যিনি আদতে নিস্পৃহ একজন বিজ্ঞানী, খুঁটিয়ে দেখছেন নবীন কলোনিকে, শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, তাঁর লেখায় আসছে মানুষ এবং কলোনির সংগঠনের প্রশ্ন। ডারউইন সমাজের শ্রেণীবিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, অপরাধীদের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কলোনিটি ভবিষ্যতে আমেরিকার মতো ধনী হয়ে উঠবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং এতো অল্প সময়ে অল্প দেখা এবং বেশি শোনার উপর নির্ভরশীল নিজের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। এবং এসবের পর শেষমেশ যেটা বলছেন, সেটা তাঁর নিজের ভাষাতেই থাক,কারণ এতো পুরোনো ইংরিজিতে লেখা জীববিজ্ঞানীর রাজনীতি বিষয়ক রচনা অনুবাদ করতে ভরসা পাচ্ছিনা :

""With respect to the state of the convicts, I had still fewer opportunities of judging than on other points. The first question is, whether their condition is at all one of punishment: no one will maintain that it is a very severe one. This, however, I suppose, is of little consequence as long as it continues to be an object of dread to criminals at home. The corporeal wants of the convicts are tolerably well supplied: their prospect of future liberty and comfort is not distant, and, after good conduct, certain. A 'ticket of leave', which, as long as a man keeps clear of suspicion as well as of crime, makes him free within a certain district, is given upon good conduct, after years proportional to the length of the sentence; yet with all this, and overlooking the previous imprisonment and wretched passage out, I believe the years of assignment are passed away with discontent and unhappiness. As an intelligent man remarked to me, the convicts know no pleasure beyond sensuality, and in this they are not gratified. The enormous bribe which Government possesses in offering free pardons, together with the deep horror of the secluded penal settlements, destroys confidence between the convicts, and so prevents crime. As to a sense of shame, such a feeling does not appear to be known, and of this I witnessed some very singular proofs. Though it is a curious fact, I was universally told that the character of the convict population is one of arrant cowardice: not unfrequently some become desperate, and quite indifferent as to life, yet a plan requiring cool or continued courage is seldom put into execution. The worst feature in the whole case is, that although there exists what may be called a legal reform, and comparatively little is committed which the law can touch, yet that any moral reform should take place appears to be quite out of the question. I was assured by well-informed people, that a man who should try to improve, could not while living with other assigned servants; -- his life would be one of intolerable misery and persecution. Nor must the contamination of the convict-ships and prisons, both here and in England, be forgotten. On the whole, as a place of punishment, the object is scarcely gained; as a real system of reform it has failed, as perhaps would every other plan; but as a means of making men outwardly honest, -- of converting vagabonds, most useless in one hemisphere, into active citizens of another, and thus giving birth to a new and splendid country -- a grand centre of civilization -- it has succeeded to a degree perhaps unparalleled in history. (২৮)

এখানে লক্ষ্যণীয় একটা জিনিস। মতাদর্শগতভাবে ডারউইন এখানে বেন্থামের পক্ষে। তিনি মেনে নিচ্ছেন, যে, রিফর্মের একটি সত্যিকারের ব্যবস্থা হিসাবে অস্ট্রেলিয়া ব্যর্থ। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর নিরাসক্ত পর্যবেক্ষণ তাঁকে একথাও স্বীকার করতে বাধ্য করছে, যে, একটি গোলার্ধের সবচেয়ে ওঁচাটে মানবসত্ত্বাগুলিকে ,এই পদ্ধতি, অভূতপূর্ব এক কায়দায় সক্রিয় নাগরিকে পরিণত করেছে, হয়ে উঠেছে এক অপূর্ব সভ্যতার কেন্দ্র। এবং এর কোনো তুলনা ইতিহাসে নেই। লক্ষ্যণীয় এটাই, যে মতাদর্শগত আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও, নিজের নিরাসক্ত বিশ্লেষণভঙ্গীটিতে ডারউইন মতাদর্শের কোনো প্রভাব ফেলতে দেন নি, যে বিশ্লেষণভঙ্গীতে মার্কস মুগ্‌ধ হয়েছিলেন, যা নাকি ন্যাচারাল হিস্ট্রি সম্পর্কিত মাক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিভূমি। মজা হচ্ছে, ডারউইনের এই ভঙ্গীটিকে কিন্তু উপনিবেশের ক্ষেত্রে মার্ক্স গ্রহণ করেননি। ডারউইনের উপনিবেশ সম্পর্কিত এই পর্যবেক্ষণটিকে তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন।

তো, যে কথা হচ্ছিল। ডারউইনের এই নিরাসক্ত বিশ্লেষণভঙ্গীর কাছে, প্রকৃতিবিজ্ঞানীর শ্যেনচক্ষুতে আরও একটি জিনিসের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। প্রকৃতি ও মানুষকে একজন বহিরাগত বিজ্ঞানীর চোখে দেখতে গিয়ে, অভূতপূর্ব এক সভ্যতার জন্ম ছাড়াও তিনি আরও একটি জিনিস দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন আরও এক মানবগোষ্ঠীকে, যারা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অচ্ছুত, প্রান্তিক, বহিষ্কৃত। এরা অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসী, প্রচলিতভাবে যাদের অ্যাবরিজিনিস বলে ডাকা হয়। অস্ট্রেলিয়া নামক দ্বীপমহাদেশটির গড়ে ওঠার ইতিহাস মূলত:আদি অধিবাসীদের ধ্বংসসাধনের ইতিহাস। একদিকে এই দ্বীপমহাদেশটিতে গড়ে উঠেছে একের পর এক নগর, গড়ে উঠেছে সভ্যতা, একই সঙ্গে আদি আধিবাসীরা মুছে গেছে ভূখন্ড থেকে -- ডারউইনের দৃষ্টি থেকে এই জিনিসটি নজর এড়ায়নি।

আদিবাসীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে ডারউইন লিখেছেন, যে, তারা আমোদপ্রিয় এবং শান্ত ( good-humoured and pleasant ), তাদেরকে যেমন অত্যন্ত নিচু ভাবে দেখানো হয়, আদতে তা তারা নয়। আদিবাসীদের একটি দলের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়। তারা, লিখেছেন ডারউইন, পরিচিত ভঙ্গীতেই, নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র এবং তীরের বান্ডিল বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা আংশিক পোশাকাচ্ছাদিত ছিল, অনেকেই অল্পবিস্তর ইংরিজি বলতে পারত। দলনেতাকে এক শিলিং দেওয়ায় তারা অনেকক্ষণ থেমে থাকে এবং মজার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন খেলা দেখায়। সব মিলিয়ে, তারা হিংস্র নয়, বরং সভ্যতার মাঝখানে একদল "হার্মলেস স্যাভেজ'।

ডারউইনের কাছে অত্যন্ত রহস্যজনক লেগেছে, যে, এই আদি অধিবাসীদের সংখ্যা ক্রমশ: দ্রুতগতিতে কমে আসছে। এই মাত্র যে আদিবাসীদের দলটির কথা বলা হল, সেটি ছাড়া আর একটি মাত্র দলকে দেখেছিলেন ডারউইন, তাঁর সমগ্র যাত্রাপথে। ডারউইন সিদ্ধান্ত করেছেন, যে, সংখ্যা কমে আসার কয়েকটি কারণ আছে, যা আংশিকভাবে ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করে। একটি হল, ইউরোপীয়রা আদিবাসীদের মধ্যে মদের প্রচলন ঘটিয়েছে। দ্বিতীয়ত: ইউরোপিয়ান ব্যধির সংক্রমণ। এমনকি, ডারউইন বলেছেন, হামের মতো সামান্য অসুখও আদিবাসীদের কাছে মারাত্মক। তৃতীয়ত: বন্য জন্তুদের ব্যাপক ধ্বংসসাধন। কিন্তু এগুলো সবই আংশিক ব্যাখ্যা। এর পরও ডারউইনের কাছে বিষয়টা রহস্যজনকই থেকে যায়। তিনি বিস্মিত হয়ে পর্যবেক্ষণ করেন, যে, শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়,পৃথিবীর একটা বড়ো অংশে, যেখানেই ইউরোপিয়ানদের পদার্পণ ঘটেছে, সেখানেই আদি অধিবাসীদের কেমন যেন ঘিরে ফেলেছে মৃত্যুর ছায়া। আমেরিকা, পলিনেশিয়া, তাহিতি, উত্তমাশা অন্তরীপ, নিউজিল্যান্ড, সর্বত্রই, সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি। সাদা মানুষরা পা রেখেছে উপনিবেশে, এবং বাদামী/কালো স্থানীয় মানুষরা কেমন যেন মিলিয়ে গেছে মহাশুন্যে। একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করেছেন ডারউইন, কিন্তু তার পরেও বিষয়টা তাঁর কাছে রহস্যজনকই থেকে গেছে। (২৯)

এই ডারউইন কথিত রহস্যের সমাধান একরকম করে আমরা এখন জানি। আদিবাসীরা মূলত: দুই ভাবে ধ্বংস হয়। এক, ফিজিকাল ডেস্ট্রাকশন, গুলি-বন্দুক-আগুন দিয়ে আদিবাসীশরীরের ধ্বংসসাধন। দুই, এক্সক্লুশন, সভ্যতা থেকে বহিষ্কার। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে, এবং সম্ভবত: ডারউইন বর্ণিত অন্যান্য জায়গাগুলিতেও, এই দুটি পদ্ধতি একই সাথে প্রযুক্ত হয়। পাশাপাশি, এবং একে অপরের পরিপূরক হিসাবে। জিনিসটা বোঝার জন্য উনবিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক পর্যন্ত (অর্থাৎ, যে সময়ে ডারউইন অস্ট্রেলিয়া এসেছিলেন) আদিবাসীদের ধ্বংসসাধনের ক্যালেন্ডারটি একটু ছোট্টো করে দেখে নেওয়া যাক।

১৭৮৯। ইউরোপিয়ানদের পদার্পণের প্রায় সাথে সাথেই স্মলপক্স এপিডেমিক দেখা দেয় সিডনি এলাকার আদিবাসীদের মধ্যে। এলাকার প্রায় অর্ধেক আদিবাসী তাতে মারা যায়।

১৭৯০। এই সময় থেকেই অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের একটি অংশ গেরিলা স্টাইলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে "যুদ্ধ' চালাতে থাকে। আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে বারুদহীন আদিবাসীদের এই তথাকথিত যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন আদিবাসী নেতা পেমুলুয়ু এবং তাঁর পুত্র টেডবারি।

১৮০২।ঘোষণা করা হয়, যে, নেটিভদের উপর কোনো অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচার করা চলবেনা। কিন্তু অভিবাসীদেরও নিজেদের সম্পত্তি ভোগ করার এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার আছে। তাই প্রত্যাঘাত ন্যায্য, কিন্তু তা যেন যথাসম্ভব মানবিক হয়। এই ঘোষণার অব্যবহিত পরেই আদিবাসী গেরিলা নেতা পেমুলুয়ু অভিবাসীদের হাতে গুলি খেয়ে মারা যান। ছেলে প্রতিরোধ চালিয়ে চলে। বলাবাহুল্য তারা ক্রমশ: হারতে থাকে।

১৮১৬। আদিবাসীদের অবাধ বিচরণের উপর গভর্নর ম্যাকারি বিধিনিষেধ জারি করেন। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কোনো আদিবাসীর অভিবাসী-জনপদের এক মাইলের মধ্যে আসা নিষিদ্ধ হয়। ছজনের বেশি আদিবাসীর একত্রে কোনো ফার্মের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি নিষিদ্ধ হয়। আদিবাসীদের থাকার জন্য সিডনির কাছে কয়েকটি "এগ্রিকালচারাল রিজার্ভ' তৈরি করা হয়। বস্তুত: তার বাইরের এলাকায় আদিবাসীদের অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়।

১৮২২। অস্ট্রেলিয়ান উল শিল্পকে সাহায্য করার জন্য ব্রিটিশ সরকার অস্ট্রেলিয়ান উলের উপর ডিউটি কমিয়ে দেয়। তৈরি হয় বড়ো বড়ো কোম্পানি এবং তাদের বিপুল, ধারণাতীত পরিমানে জমি দেওয়া হতে থাকে,দেওয়া হতে থাকে সেইসব জমি, যা একদা ছিল আদিবাসীদের অবাধ বিচরণভূমি। হান্টার ভ্যালিতে একটি কোম্পানিকেই (অস্ট্রেলিয়ান এগ্রিকালচারাল কোম্পানি) দেওয়া হয় দশ লক্ষ একর জমি। জমি নিয়ে হরির লুট চালু হয়, যার পরিণতি হিসাবে আসে আদিবাসীদের সর্বাঙ্গীণ এবং বিপুল উচ্ছেদ।

১৮২৪। তাসমানিয়ায় আদিবাসীদের গুলি করে মারার অধিকার দেওয়া হয় অভিবাসীদের। নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি অংশে মার্শাল ল জারি করা হয়।

১৮৩০। তাসমানিয়া থেকে আদিবাসীদের জোর করে ফ্লিন্ডার আইল্যান্ডে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আদিবাসীদের বেঁচে থাকার পক্ষে সেখানকার পরিবেশ ছিল অযোগ্য, বহু মৃতু ঘটে।

তো, এই হল ১৮৩০ পর্যন্ত টাইমটেবল। এখানে যুদ্ধ এবং গুলি করে মারার ঘটনাগুলি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই, এলাকা দখলের যুদ্ধে, সভ্যতা প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে, গণহত্যা হয়েই থাকে। যেটা লক্ষ্যণীয়, সেটা হল, স্মলপক্স বা হামের মতো সামান্য ব্যধিগুলির মোকাবিলার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যাপারটা চমৎকার, যে, এর কয়েকশতাব্দী পূর্বেই যে ইউরোপ প্লেগের মতো মহামারীর মোকাবিলা করার জন্য কঠোরতম শৃঙ্খলার মেকানিজম আবিষ্কার করেছিল, সে, স্মলপক্সের মতো একটি রোগের সামনে দাঁড়িয়ে স্রেফ বিস্ময় প্রকাশ করছে। ইউরোপ নয়, এখানে অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার কথা হচ্ছে, কিন্তু ইউরোপিয়ান সেই টেকনিক অতি অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার কলোনিপ্রভুদের অজানা ছিলনা। ফলে এখানে একটা জিনিস বোঝা যায়, যে, নতুন যে সভ্যতা গড়ে উঠছিল, তার বৃত্ত থেকে অ্যাবরিজিনিসরা গোড়া থেকেই বহিষ্কৃত ছিল -- মূল গল্প এটাই।

এই গল্পটি আরও ভালো করে দেখা যায় তাসমানিয়ার উদাহরণ নিলে। তাসমানিয়ায়, আগের পরিচ্ছেদেই দেখেছি, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এবং সবচেয়ে খারাপ ধরণের অপরাধীদের পাঠানো হত। এবং তাসমানিয়া, শুরু থেকেই প্রবলভাবে অপরাধপ্রবণ ছিল। তার পরে, উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় ঐ দ্বীপটিতে, এবং তা পরিণত হয় একটি অবাধ শান্তির এলাকায়, অপরাধহীন সভ্যতার কেন্দ্রে। আমরা দেখেছি, এই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি ছিল ওয়েলফেয়ার এবং সার্ভিলিয়ান্স। কিন্তু শুধু এই দুটিই নয়, আরও একটি বিষয় ছিল এর মধ্যে, যা আগের পরিচ্ছেদে আমরা এড়িয়ে গেছি। যে, এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঠিক আগে কী ঘটেছিল তাসমানিয়ায়। সেটা ছোটো করে এবার দেখা যাক।

১৮২৩ সালে জর্জ আর্থার তাসমানিয়ার গভর্নর হয়ে আসেন। আগের টাইমটেবলেই দেখেছি ১৮২৪ সালে তিনি আদিবাসীদের গুলি করে মারার অধিকার দেন শ্বেতাঙ্গদের। আদিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধ ঘোষণা করে কলোনি প্রভুরা। এই যুদ্ধ ১৮৩০ পর্যন্ত চলে, কিন্তু তাতেও আদিবাসীদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায়না। আর্থার তখন একটি নতুন পরিকল্পনা নেন। ১৮৩০ সালে, তাসমানিয়ার সমস্ত সমর্থ পুরুষ, অপরাধী - প্রাক্তন অপরাধী - ফ্রি সেটলার নির্বিশেষে সমস্ত পুরুষের কাছে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য একটি আবেদন করা হয়। সমস্ত ভেদাভেদ মুছে ফেলে সকল পুরুষ অভিবাসীকে নিয়ে একটি হিউম্যান চেন, একটি মানবশৃঙ্খল বানানোর পরিকল্পনা করা হয়, যে মানবশৃঙ্খল গোটা দ্বীপ পরিক্রমা করবে হাতে হাত মিলিয়ে এবং ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে যাবতীয় আদিবাসী জঞ্জাল। এই অভূতপূর্ব পরিকল্পনাটির নাম দেওয়া হয় ব্ল্যাক লাইন।

ভাবার কোনো কারণ নেই, যে, পরিকল্পনাটি শুধু খাতায় কলমে ছিল। এটিকে এক্সিকিউট করা হয়েছিল। ১৮৩০ সালে, গভর্নর আর্থারের ডাকে সাড়া দিয়ে ২০০০ এর বেশি কলোনিবাসী সত্যি সত্যিই হাতে হাত মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, তৈরি করে এক অভূতপূর্ব মানবশৃঙ্খল। এই কালো রেখাটি দ্বীপের পুরো দৈর্ঘটিই পরিক্রমা করে। কতজন আদিবাসী এই কালো জালে ধরা পড়েছিল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু এই সশস্ত্র ক্যাম্পেনের পরই তাসমানিয়া থেকে ফ্লিন্ডার আইল্যান্ডে আদিবাসীদের সরিয়ে দেবার প্ল্যানটি সাফল্যমন্ডিত হয়। বিত্ত-অর্থ-ভেদাভেদকে দূরে সরিয়ে রেখে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অন্তিম জয়লাভ করে অস্ট্রেলিয় কলোনিবাসীর ঐক্য।

তো, আমাদের দেখার কথা যেটা, যে বিষয়টা আমাদের কাছে কৌতুহলোদ্দীপক, সেটা হল, এখানেও আমরা অস্ট্রেলীয় ঐক্যের একটি নতুন মডেল পাচ্ছি। অস্ট্রেলীয় ঐক্যের যে মডেলটি "মেটশিপ' নামক ক্যাটিগরিটি দিয়ে আমরা নির্মান করেছিলাম, তার মৌল উপাদান ছিল এক নিম্নবর্গীয় ঐক্য -- মেটশিপ ছিল এক নিম্নবর্গীয় একতার গল্প, যে একতা ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়ার কঠিন যাত্রাপথে তৈরি হত, কঠোরতম পরিস্থিতি যাকে পোক্ত করে তুলত, এবং কলোনিতে অপরাধীদের একটি বন্ধনে বেঁধে রেখে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করত। আর এই নতুন ঐক্যের মডেলে এই নিম্নবর্গীয়তায় যোগ হচ্ছে সুপিরিয়ারিটি। অতএব মেটশিপ, গৌরব, আত্মবিশ্বাস, এগুলিকে এখন বুঝতে হবে আদিবাসীদের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেও। যেকোনো গৌরবের অভিব্যক্তিতেই সুপিরিয়ারিটি একটি আবশ্যক বস্তু, জাতির গৌরবের অভিব্যক্তি যেমন কেবলমাত্র বোঝা যায় বিজাতীয়দের ইনফিরিয়ারিটির বিপরীতে, একই ভাবে অস্ট্রেলিয় ঐক্য, মেটশিপকেও বুঝতে হবে হায়ারার্কিকালি ইনফিরিয়ার আদিবাসীদের অবস্থানের বিপরীতে। ফলে সব মিলিয়ে তৈরি হবে এক জটিল সিঁড়িভাঙা অঙ্ক। একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুকরণ, ইনফিরিয়ারিটি, অন্যদিকে ইউরোপকে উপেক্ষা করে বিকল্প একটি অবস্থান, এবং সবশেষে একটি তৃতীয় মাত্রা -- আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুপিরিয়ারিটি -- এইরকম জটিল একটি নির্মান হল অস্ট্রেলীয় ঐক্য, তার গৌরবের ধারণা।

অতএব, আমাদের পুরোনো বর্গ, মেটশিপ, কেবলমাত্র হায়ারার্কির সিঁড়িতে নিচের দিকে নয়, অর্থাৎ, কেবলমাত্র অপরাধীদের ঐক্যে নয়, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনে নয়, নিম্নবর্গীয় জোট হিসাবে নয়, সিঁড়ির উপর দিকেও মেটশিপকে দেখা যায়, যা প্রভুত্বের প্রতীক, যা সুপিরিয়ার, যা অন্যদের এক্সক্লুড করে। অস্ট্রেলীয় নারীবাদীরা দেখিয়েছেন, মেটশিপ ছিল শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের একটি ঐক্যের প্রকল্প, যা, নারীদের এক্সক্লুড করত। এক পার্লামেন্ট সদস্যা ১৯৯৫ সালে যখন বলেন, ""পরের জন্মে আমি অবশ্যই একজন মেটকে বিয়ে করব, আমার ভাই হবে একজন মেট'', তখন লক্ষ্যণীয়, যে তিনি নিজে মেট হবেন বলে দাবী করেননা, তাঁকে হতে হয় কোনো মেটের স্ত্রী, এবং কোনো মেটের ভাই। একই ভাবে অশ্বেতাঙ্গ আদিবাসীরা মেটশিপ নামক প্রকল্পের একেবারে বাইরে। বস্তুত: তাদের ধ্বংসের উপরেই, তাদের মৃতদেহের স্তূপের উপরেই গড়ে উঠেছে, অস্ট্রেলিয় গৌরবের আখ্যান, ঐক্যের আখ্যান, মেটদের ঐক্যের বর্গ মেটশিপ। ""নারীকে এক্সক্লুড করতে, চাইনিজ শ্রমিকরা যারা তাদের মজুরির দামের পক্ষে বিপদ ছিল তাদের কালিমালিপ্ত করতে, আদি who grafted to share their own land, তাদের ধ্বংস করতে মেটদের ঐক্য যেভাবে মবিলাইজড হয়েছিল, আজ অনেক প্রগতিশীলরাই সে কারণে লজ্জিত হন। এই সবই আমাদের অতীতের জটিল এক বুননের অংশ যার উপরে দাঁড়িয়েই আমরা ক্রমশ: সান্ত্বনা পাব এবং গড়ে তুলব, মনে হয়না এর প্রতি মুখ ফিরিয়ে থাকা এর প্রতি একটি ভালো (প্রেফারেবল) স্বীকৃতি।'' (৩০)

তো, এইভাবে আমাদের গল্প আরও একটি নাটকীয় মোড় পায়। পশ্চিম এবং উদ্বৃত্ত পশ্চিমের যে অতিনিয়ন্ত্রণের কাঠামো, তার একটি মার্জিন আমরা আবিষ্কার করি। যার একদিকে সভ্যতা, ইতিহাস, গৌরব, আর অন্যদিকে এক্সক্লুশনের আখ্যানহীনতা, মৃত্যুর বিস্মৃতি। দ্বীপভূমির নিয়নখচিত রাজপথ, সুউচ্চ অট্টালিকার সারির আড়ালে ডকের নির্জন রাস্তায় পোড়ো গোডাউনের পাশে শুধু আদিবাসীদের সারিসারি বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে।


৪।

এইভাবে, আমরা এসে পড়ি কলোনির সৃষ্টিরহস্যে। বস্তুত: এই লেখাটা শুরু করার অনেক অনেক দিন আগে থেকে দুটো জিনিস এই ব্যক্তিলেখককে নিশিডাকের মতো টেনেছে। এক। ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লব ঠিক কি এবং কিভাবে হয়েছে? তার পূর্বশর্তগুলি ঠিক কি ছিল? তার কি পুনরাবৃত্তি সম্ভব? দুই। পৃথিবীতে দুই ধরণের প্রাক্তন কলোনি দেখি আমরা, সংক্ষেপে যাদের তৃতীয় বিশ্ব ও প্রথম বিশ্ব বলা হয়। ঠিক কি তফাত ছিল এই দুই ধরণের কলোনির প্রাথমিক সংগঠনে, যাতে করে অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা পরিণত হল উন্নত দুনিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশে আর ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ পারলনা? কি ছিল সেই সৃষ্টি রহস্য?

এই দুটো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য এই ব্যক্তিলেখক এক লম্বা জার্নি পাড়ি দিয়েছে, যার একটা সামান্য অংশই এই গাব্দা এবং বোরিং লেখাটিতে এসেছে। এবং লেখার শেষে দেখা যাচ্ছে, যে প্রশ্নদুটি আসলে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুরো জিনিসটা, যে পুরো জার্নিটা আমরা পাড়ি দিলাম, তাকে ছোটো করে সংক্ষেপিত করলে এরকম দাঁড়ায়, যে, ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের আসলে কয়েকটি পূর্বশর্ত ছিল। একটির কথা মার্কস বলেছেন : পুঁজির প্রাথমিক জড়ো হওয়া। দ্বিতীয়টির কথা বলেছেন ফুকো : স্রেফ পুঁজি এক জায়গায় জড়ো হলেই শিল্পবিপ্লব হয়না, শিল্পবিপ্লবের জন্য আরেকটি পূর্বশর্ত হল ডিসিপ্লিন, সেগ্রিগেশন এবং ট্রেনিং এর মধ্যে দিয়ে মানবশরীরকে গড়ে পিটে নেওয়া। আর এর পরেও আরও একটি তৃতীয় পূর্বশর্ত ছিল, যার কথা কেউই বলেননি। সেটি হল উপনিবেশ। উপনিবেশের প্রয়োজন ছিল বাজারের জন্য, লুন্ঠনের জন্য, এগুলো সবাই জানেন, কিন্তু শিল্পবিপ্লবের উদ্বৃত্ত মানবশরীরগুলিকে, মানবজঞ্জালকে রিসাইকল করার জন্য একটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডের প্রয়োজন ছিল, উপনিবেশ যে ডাম্পিং গ্রাউন্ড যোগাড় করে দেয়, এই কথাটি প্রতিবেদন থেকে হাওয়া হয়ে যায়। এই তৃতীয় পূর্বশর্তটি ক্ষমতার সমস্ত পশ্চিমী ডিসকোর্স থেকে বাদ গেছে। কর্পূরের মতো উবে গেছে। মার্কসীয় সরলরৈখিক উন্নয়নের আখ্যানে, বাদ গেছে ডারউইনের প্রতিবেদন, বাদ গেছে উপনিবেশ। ফুকোর উত্তরাধুনিক শাস্তি ও শৃঙ্খলার আখ্যান থেকে বাদ গেছে দ্বীপান্তর। সেন্সার করা হয়েছে বেন্থামকে। খুব সোজা কথাটা সকলেই চেপে গেছেন, যে, ইউরোপের শিল্পবিপ্লব সকলকে ডিসিপ্লিনড করতে পারেনি, চায়নি, কারণ তা ছিল অদক্ষ। অদক্ষ, কারণ সকলকে কাজ দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। আর যাদের কাজ দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের শৃঙ্খলার শিক্ষা দেওয়া স্রেফ রিসোর্সের অপচয়।

অতএব, এই পরিত্যক্ত, মানবশরীরগুলিকে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন উপনিবেশে, যাদেরকে আমরা উদ্বৃত্ত পশ্চিম বলে ডাকছি। এবং সেখানে এই শরীরগুলির রিসাক্লিং হয়, পুনরুজ্জীবন হয়। এই প্রক্রিয়ার শুরুতে, আমেরিকায় অপরাধী এবং চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে একই ব্যবহার করা হত। পরে পদ্ধতিটি পাল্টে ফেলা হয়। অপরাধীদের দিয়ে তৈরি করা হয় একটি কলোনি, যে কাঠামোয় পরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বাকি অভিবাসী শরীরগুলিকে। এটি দক্ষতর ব্যবস্থা ছিল।

এবার, এই কলোনিতে পরীক্ষার এই সুতিকাগারে, উদ্বৃত্ত পশ্চিমে, এই ভেঙে পড়া জনগোষ্ঠীর পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি ঐক্য, গৌরবের বোধের প্রয়োজন ছিল, যা তার নিজস্ব। সেই গৌরবের বোধটিও নির্মিত হয়, যার একটি অংশ ছিল নিম্নবর্গীয় একতার বোধ, এবং অন্যটি শ্বেতাঙ্গ সুপিরিয়ারিটি। এই শ্বেতাঙ্গ সুপিরিয়ারিটি তৈরির প্রোজেক্টে আদিবাসীদের এক্সক্লুশন একটি অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার ছিল। আদিবাসীরা অসভ্য, বর্বর, অনুন্নত, এই বোধের বিপরীতেই তৈরি হয় এক সুপিরিয়র সাবজেক্টের বোধ -- আমরা উন্নত, আমরা সভ্য। অতএব সভ্যতার, বেঁচে থাকার, পুনরুজ্জীবনের কৃতকৌশলগুলি থেকে আদিবাসীদের বহিষ্কার করা হয়, এবং সেই বহিষ্কারের উপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয় শ্বেতাঙ্গ সুপিরিয়ারিটি, উদ্বৃত্ত পশ্চিমের ভিত্তিভূমি। যদিও আলোচনার অংশ নয়, কিন্তু একটা কথা না বলে পারা যাচ্ছেনা, ভারতীয় কলোনিতে ঘটনপরম্পরা ঠিক এরকম ছিলনা। "নিজস্ব' কোনো ক্যাটিগরি তৈরি হয়নি, যা গৌরবের, তার পূর্বশর্ত হিসাবে ইনফিরিয়ার কাউকেও সামনে পায়নি ভারতীয় বীক্ষা। ইনফিরিয়ার না থাকলে সুপিরিয়ার তৈরি হয়না, ভারতে হয়নি, আর ইনফিরিয়ার আদিবাসীদের বলিদানের বিনিময়ে শক্তিশালী হয়েছে উদ্বৃত্ত পশ্চিমের গৌরবের বোধ।

এই জটিল বুননের একটি অংশ হিসাবে আমাদের কাহিনীর প্রথম নায়িকা মেরি ওয়েডকেও খুঁজে পাব যথাস্থানে। মেরি ওয়েডকে, দশ বছরের সেই মেয়েটিকে, যাকে বহিষ্কার করা হল দেশ থেকে, সেও আসলে এই বিরাট প্রক্রিয়ার চাকার অংশই। যদিও তাড়িয়ে দেওয়া হল তার দেশ থেকে, গলায় পাথর বেঁধে জলে ফেলে দেওয়া হলনা কিন্তু, রবিনসন ক্রুশোর মতো এক অজানা দ্বীপে গিয়ে পড়লে সে মুছে যেত। কিন্তু তাকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্য থাকলে তো ইংল্যান্ডের ফাঁসিকাঠেই চড়ানো হত, তাই মুছে ফেলা নয়, একটি বিশেষ মেকানিজমের মধ্যে নিয়ে ফেলা হল তাকে। যা তাকে আরও দক্ষ করে তুলবে, কিন্তু পুরোনো সমাজে ফিরিয়ে নেবেনা। তার এক্সক্লুশন চিরস্থায়ী। তার দক্ষতাকে এবার কাজে লাগানো হবে, নতুন এক দুনিয়া গড়ে তোলার কাজে। পুরোনো দুনিয়ায় তার আর কোনো ঠাঁই নেই, অতএব এই কাজে অংশগ্রহণ করতে সে বাধ্য, নতুন দুনিয়াকে সে নিজের গরজেই গড়ে তুলবে।

এই মেকানিজম তাকে এক নতুন নৈতিকতার ধারণা দেয়। মেরি ওয়েডের লন্ডনের অতীত তাকে শুষ্ক কঠিন অনড় এক নৈতিক জীবনের ছবি চিনিয়েছিল। যেখানে চুরির শাস্তি মৃত্যু। যৌনকর্মীদের পাঠানো হয় দ্বীপান্তরে। লেডি জুলিয়ানা তাকে এক নতুন নৈতিকতার সন্ধান দেয়। যেখানে কোনো কিছুই অনড় নয়। যেখানে শরীর বেচে আদায় করা যায় সুবিধা এবং সম্মান। যেখানে ব্যবসার সাফল্যই সম্মানের মাপকাঠি। আবার একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, লেডি জুলিয়ানাকে পাঠানো হয়েছিল মূলত: পারিবারিক বন্ধন প্রোমোট করার জন্য। অতএব, তাকে শিখতে হয়, বুঝতে হয়, যে, পরিবারই একটি স্থিতিশীল জনগোষ্ঠীর মূল উপাদান। অতএব পারিবারিক মূল্যবোধ গুলি সম্মানীয়। ব্যক্তির সাফল্যের সঙ্গে আসে পারিবারিক/সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই ফ্লেক্সিবল নৈতিকতার ধারণা, যা পরবর্তীতে ফুলে ফলে পল্লবিত হয়ে উঠবে, তা মূলত: এই ধরণের উপনিবেশগুলিরই দান।

এই একই মেকানিজম তাকে আত্মচেতনাও দেয়। নতুন দুনিয়া তাকে একটি নতুন সুযোগ দেয়। নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ। অতীতকে ফেলে আসার সুযোগ তার নেই, কারণ, সে তখনও পুরোনো ব্যবস্থার প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যেই। অতীত কীর্তির কারণেই সে এই জায়গায়, অতএব অতীতকে ভোলার কোনো সুযোগ তার নেই। নতুন দুনিয়া তাই তাকে শুরু করতে বলে অতীতকে স্বীকার করেই। ফলে এই দুনিয়া তাকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যে, নতুন ভাবে জীবন শুরু করা বলতে ঠিক কী বোঝায়। এবং সেটা ঠিক কীভাবে করা উচিত। অতীতের ভুলগুলি ঠিক কী ছিল, এবং সেটা কীভাবে সংশোধন করা যায়। এই প্রশ্নের উত্তরগুলি কিন্তু সে আর তার পুরোনো ক্যাটেগরিগুলি ব্যবহার করে দেয় না, কারণ পাল্টে গেছে কনটেক্সট, পাল্টে গেছে ক্যাটেগরিগুলি। পাল্টে যাওয়া ক্যাটিগরিগুলি দিয়ে পাল্টে যাওয়া কনটেক্সটে নিজেকে বর্ণনা করা মূলত: আত্মজিজ্ঞাসার একটা ফর্ম, প্রতিটি অভিবাসীকে যার মধ্যে দিয়ে আসতে হয়, হয়েছে। ডাক্তারের চেয়ারের সামনে বসে যেমন রোগি সম্পূর্ণ এক অন্য ভাষায় কথা বলে ও শোনে, সম্পূর্ণ অন্য এক ডিসকোর্সের মধ্যে আবিষ্কার করে অন্য এক নিজেকে, পদ্ধতিটি অবিকল তাই। বস্তুত: এটি এক ধরণের কনফেশন। যেখানে কোনো শ্রোতা না থাকলেও নিজের কাছে নিজেকেই বর্ণনা করতে হয়। আমি আসলে এই ছিলাম। এই করেছি। এবং তার পরে আসবে আমি আসলে এই হতে চাই। "আমি আসলে এই হতে চাই', যেহেতু এটা ভাষায় প্রকাশ করা দরকার, অতএব "আমি এই ছিলাম' টাও ডিসকার্সিভ, অর্থাৎ ভাষায় প্রকাশযোগ্য।এই ডিসকার্সিভ "নিজেকে জানা' একটি অত্যন্ত কার্যকরী ডিসিপ্লিনারি পদ্ধতি, ফুকো দেখিয়েছেন। এই "নিজেকে জানা'র এবং দক্ষ করে তোলার যে হাতুড়ে পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে আসতে হয় অভিবাসীকে, সেই সুযোগ মূল ভুখন্ডের মানুষ পাবে অনেক পরে। সাইকোঅ্যানালিসিস জাতীয় সফিস্টিকেটেড টেকনিকের মধ্যে দিয়ে।

এই নতুন নৈতিকতা এবং আত্মচেতনা,এর সঙ্গে আবশ্যিক ভাবে প্রয়োজন হয় আরও একটি উপাদানের, যার নাম আত্মবিশ্বাস, যা না থাকলে কিছুতেই গড়ে উঠবেনা নতুন পৃথিবী। ফলে তার জন্য নির্মিত হয় ঐক্যের বোধ, সুপিরিয়ারিটির বোধ, যা গড়ে ওঠে আদি অধিবাসীদের এক্সক্লুশনের মধ্যে দিয়ে, এবং যা অভিবাসীকে আত্মবিশ্বাস যোগান দেয়। তৈরি হয় নগর, নিয়ন আলোর বন্যা, সভ্যতা, তৈরি হয় উদ্বৃত্ত এক পশ্‌চিমের আখ্যান, কলোনি হয়ে ক্রমশ: হয়ে ওঠে কল্লোলিনী তিলোত্তমা। উদ্বৃত্ত সেই পশ্চিমের আখ্যান থেকে বাদ যায় ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের, এনলাইটেনমেন্টের রিসাইকল বিন হিসাবে ব্যবহৃত হবার কলোনীয় গল্পকথা। নিয়ন আলোয় আলোকিত কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে, জার্নালে জার্নালে পল্লবিত হতে থাকে ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারের জয়গাথার রূপকথা। আর বন্দরের পাশেই কোনো এক খাঁড়িতে বসে থাকে যে বৃদ্ধ অ্যাবরিজিনি, তার নাম হয়ত পেমুলুয়ু, প্রাণ থাকুক বা না থাকুক, সে আসলে এক মৃত শরীর, সভ্যতার এই অশ্বমেধ যজ্ঞে তার বলিদান হয়ে গেছে। বহু বহু বছর ধরে তার শেষ উচ্চারণ গুঞ্জরিত হবে এই দ্বীপ, খাঁড়ি আর বন্দরের আনাচে কানাচে, এই দ্বীপভূমির খাঁড়িতে নেমে খুঁজতে খুঁজতে সাদা মানুষরা একদিন পেয়ে যাবে চকচকে অভ্র ও তামা, কিন্তু বন্দরের সেই সান্ধ্যভাষার কোনো মানে আর আমরা কখনও বুঝবনা। কখনও না।


সূত্র:

1. The Proceedings of the Old Bailey, London 1674 to 1834 (Online archive http://www.oldbaileyonline.org).

2. Conditions of the Working-Class in England -- Frederick Engels.

3. The Proceedings of the Old Bailey, London 1674 to 1834 (Online archive http://www.oldbaileyonline.org)

4. I

5. The Life and Adventures of John Nicol, Mariner -- John Nicol, Tim Flannery.

6.http://www.pbs.org/wnet/secrets/case_courtesans/clues.html

7. Madness and Civilization -- Michel Foucault .

8.The Transatlantic Market for British Convict Labor -- Farley Grubb, The Journal of Economic History, Vol. 60, No. 1. (Mar.2000) (এই লাইন পর্যন্ত এই পরিচ্ছেদের সমস্ত তথ্য এখান থেকেই নেওয়া। )

৯. ঐ

10. Perish or Prosper: The Law and Convict Transportation in the British Empire, 1700–1850 -- Bruce Kercher.

11. Discipline and Punish: The Birth of the Prison -- Michel Foucault (Main Source), Power/Knowledge -- Michel Foucault.

12. Body/Power (Power/Knowledge) -- Michel Foucault.

13. The Rationale of Punishment -- Jeremy Bentham .

14. Perish or Prosper: The Law and Convict Transportation in the British Empire, 1700–1850 -- Bruce Kercher.

15. The Voyage of Governor Phillip to Botany Bay -- Arthur Phillip.

16. Decisions of the Superior Courts of New South Wales, 1788-1899 -- Published by the Division of Law Macquarie University (http://www.law.mq.edu.au).

17.Perish or Prosper: The Law and Convict Transportation in the British Empire, 1700–1850 -- Bruce Kercher .

18. CRIME IN A CONVICT REPUBLIC -- John Braithwaite (Paper presented at the History of Crime, Policing and Punishment Conference convened by the Australian Institute of Criminology in conjunction with Charles Sturt University and held in Canberra, 9-10 December 1999).

19. http://www.cultureandrecreation.gov.au/articles/mateship .

২০. ঐ

21. CRIME IN A CONVICT REPUBLIC -- John Braithwaite.

২২. ঐ

২৩. ঐ

২৪. ঐ

২৫. ঐ

২৬. ঐ

২৭. অজিত চৌধুরি, দীপঙ্কর দাশ এবং অঞ্জন চক্রবর্তী রচিত "margin of margin:Profile of an Unrepentant Postcolonial Collaborator" বইটিতে অতিনিয়ন্ত্রণের একটি মার্জিনের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই পরিচ্ছেদে যে মার্জিনের কথা বলা হয়েছে, তা ঠিক ঐ জিনিসটি নয়, যদিও সম্পর্কিত। এখানে কলোনিবাসীর ধ্বংসসাধনের কথাই শুধু বলা হয়েছে। আর উল্লিখিত বইয়ের প্রক্রিয়াটি আরও ব্যাপক, জ্যান্ত কলোনিবাসী ও জ্যান্ত কলোনিপ্রভুর ডিসকোর্সের পরিসরটিই সেখানে বিবেচ্য। এই প্রবন্ধে সেই পরিসরটিতে ঢোকাই হয়নি।

28. The Voyage of the Beagle -- Charles Darwin.

২৯. ঐ

30. CRIME IN A CONVICT REPUBLIC -- John Braithwaite.



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন