শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

তেলাপাকা

শওকত সাদী

সূচনা পর্ব
তখন আমি ময়মনসিংহে থাকি। পড়ি আনন্দমোহন কলেজে। ম্যানেজমেন্টে অনার্স। সবে এইচ এস-সি পাস করে ভর্তি হয়েছি। বাবার সরকারি চাকুরি সূত্রে যাযাবর জীবন এবং সেই কারণে ময়মনসিংহে পড়া। বাবার পোস্টিং শহরতলী থেকে বারো মাইল দূরে ফুলবাড়ীয়া উপজেলায়। যদিও শহর থেকে বারো মাইল দূরে, তবুও ময়মনসিংহ আসতে মুড়ির টিন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই আমার থাকার সিন্ধান্ত হলো কলেজ হোস্টেলে। ডিগ্রি হোস্টেল। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ -- কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারি না। তার মধ্যে হোস্টেলের অধিকাংশ ছাত্রই বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামের। তাদের সাথে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব আপনা আপনিই সৃষ্টি হলো। ভাষাগত সমস্যাও হলো।
এখানে সবাই টেনে টেনে কথা বলে। ডাইনিংয়ে খাবারের অবস্থা আরো খারাপ। চোখের পানি, নাকে পানি একাকার। একদিন ডাইনিংয়ে খেতে বসেছি। কিছু খেয়ে আর খেতে পারিছি না। ডাইনিংয়ের বাবুর্চি রশিদ মিয়া বলল :
জ্বী, ও সাব, ভাত কি খাইবার পারতাছুন না ?
না।
মরিচ দিবাম ?
সাবের খুব অসুবিধা হইছে।

আমি কিছু না বলে রুশে চলে এলাম। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। মা’র হাতের খাবার এবং বাসার কথা মনে পড়ল। পেটে ক্ষুধা থাকলে কোন কিছুই ভালো লাগে না। আমার রুমের সামনে একটা ইউক্যালিপটাস গাছ ছিলো। একাকী। নিঃসঙ্গ। আমার নিজেকে ঠিক নিঃসঙ্গ ইউক্যালিপটাসের মতো মনে হলো। ক্যাসেটে রবীন্দ্র সঙ্গীত ছেড়ে বিছানায় শুয়ে আছি। আমার প্রিয় গান ‘এসো নীপ বনে’। একটু পরে দেখি রশিদ মিয়া হাজির। হাতে একটা টিফিন ক্য্যারিয়ার। আমি বিরক্তি দৃষ্টি নিয়ে বললাম :
কি রশিদ মিয়া, মিলের টাকা নিতে এসেছ ?
না, জ্বী না সাব। আপনের লিগা একটু সালুন আনছি। আমার পরিবারের হাতের পাক। একটু খাইয়্যা দেহুন। তখন দেখলাম, আপনে ডাইনিংয়ে কিছু খাইবার পারতাছুন না।
আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। রশিদ মিয়ার তরকারি দিয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম। তরকারি যদিও একটু ঝাল। তবুও রশিদ মিয়াকে বুঝতে দিলাম না। রশিদ মিয়ার এই ধরনের ব্যবহারের আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মানুষ নিজের অজান্তেই অন্য মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে।


প্রেম পর্ব 

কলেজে পরিচিতির গণ্ডি আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠলাম। সময় খুব দ্রুত কেটে যেতে লাগলো, যেন ছুটন্ত ট্রেন। আমি অসহায় যাত্রী। সেই সময় আমার কবিতাপ্রীতি ছিলো। কবিতা লিখতাম। কবিতা পড়তাম। কলেজে দু’একটা অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেছি। একদিন ডিপার্টমেন্টের এক অনুষ্ঠানে থেকে কবিতা আবৃত্তি করে বেরুচ্ছি, এমন সময় আমার ক্লাসমেট ফজলু পরিচয় করিয়ে দিল তার ভাগ্নীকে। বলল Ñ সঞ্জু, আমার ভাগ্নী রাত্রি। ফার্স্ট ইয়ার ইকনোমিক্সে পড়ে।

রাত্রি আগ্রহী কণ্ঠে বলল :
কনগ্র্যাচুলেশন। আপনার আবৃত্তি আমার ভালো লাগে।
আমি বিনীতভাবে বললাম, দেখুন, আমি আসলে ভালো পারি না। চেষ্টা করি। রাত্রি চুলে হাত চালাতে চালাতে বলল, আসবেন বাসায়। কথা বলব। ও নিচু হয়ে ঠিকানা লিখে দিল।

একদিন বিকেলে হাজির হয়ে গেলাম রাত্রির বাসায়। টুকরো কথা ছোঁড়াছুঁড়ির পর রাত্রি অ্যালবাম নিয়ে এলো। দেখালো। তার সব বান্ধবীর একটা গ্র“প ছবি নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল :
এটা নীপা, এটা শীলু, এটা সূচী ...।
তার মধ্যে একটা মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হলো। যার নাম শীলু। আমি শীলু সম্পর্কে রাত্রির কাছ থেকে বিস্তারিত জানলাম। আমার আগ্রহ দেখে রাত্রি বলল, কি ব্যাপার মামা, পছন্দ হয় নাকি ?
হ্যাঁ কোথাও ‘এনগেজড’ নাকি ?
হ'তে পারে। এই বয়সের সব সুন্দর মেয়েরাই এন্গেজড’ থাকে।
তুমি এন্গেজড নাকি ?
আমি সুন্দর হলাম কোথা থেকে ? সুন্দর হচ্ছে শীলু। আপনি দেখেই পছন্দ করে ফেললেন।
আমার সাথে শীলুর পরিচয় করিয়ে দেবে ?
দেবো। আগামীকাল কলেজে।
রাত্রি এই কথাগুলো বলল খুব মন খারাপ করে। তখন অবশ্য বুঝতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম রাত্রি আমাকে পছন্দ করে।
শীলুর সাথে রাত্রি পরিচয় করিয়ে দিল। ও খুব স্মার্ট মেয়ে। বিচিত্রায় ফ্যাশন মডেলিং করেছে। কলেজে আসতো জিন্স ট্রাউজার্স টি-শার্ট পরে। কিন্তু আধুনিকতায় কোন উগ্রাতা ছিলো না। বরং এক ধরনের মাদকতা ছিলো শীলুর চোখে। ভেজা ভেজা কবিতার মতো চোখ। ইংরেজিতে যাকে ‘লিকুইড আইজ’ বলে। সবচেয়ে ভালো লাগতো ওর কথায় কোনো ভনিতা ছিলো না। ‘হিপোক্রেসি’ ও একদম পছন্দ করতো না। শীলুর সাথে কলেজে আমার খুচরো কথাবার্তা হতো। এই কেমন আছি, লেখাপড়া কেমন হচ্ছে ইত্যাদি। শীলু সব সময় আমাকে পাত্তা না দেওয়ার ভান করতো। ওর এই ধরনের আচরণ আমার মোটেও ভালো লাগতো না। একদিন অডিটরিয়ামে বারান্দায় একা পেয়ে শীলুকে জিজ্ঞেস করলাম :
আমাকে দেখলে তুমি এরকম গম্ভীর হয়ে যাও কেন ?
শীলু স্বাভাবিক গলায় বলল, সঞ্জু ভাই, আপনি আমাকে পছন্দ করেন জানতাম। এখন আমিও আপনাকে করি। সে কথা বলতে পারতাম না বলেই গম্ভীর হয়ে থাকতাম। আর জানেন তো, মেয়েরা বিপরীতমুখী আচরণ করতে পছন্দ করে।

কেন বলতে পারতে না ?
রাত্রি। রাত্রি আপনাকে ভালোবাসে।
আমি তো বাসি না।
এখন জানলাম, আর জানেন তো জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার মুহূর্তে বেশিরভাগ মানুষ নিজের কথা ভাবে। তাই আজ থেকে আপনাকে জানিয়ে দিলাম, আমি আপনাকে ভালোবাসি।
সেদিন থেকে শীলুর সাথে আমার প্রেম হয়ে গেল। আমরা আইসক্রীমের কাঠি মাটিতে গেড়ে প্রেমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলাম।

চাইনিজ রেস্টুরেন্ট পর্ব

কলেজের দীর্ঘ বন্ধের ছুটিতে ঢাকায় বোনের বাসায় বেড়াতে এলাম। টেলিভিশন সেন্টারে বেড়াতে গিয়ে সুযোগ এলো টিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করার। সেই থেকে অফার এলো টিভি এড ফিল্মে মডেলিং করার। দ্রুত উন্নতি। এড ফিল্মে কাজ করার সুবাদে পেলাম বেশ কয়েক হাজার কড়কড়ে নোট। নতুন টাকার গন্ধ শুঁকতে খুব ভালো লাগে। সেই সময় সিদ্ধান্ত নিলাম ময়মনসিংহ গিয়ে শীলুকে নিয়ে চাইনিজ খাবো।
ইতিমধ্যে আমার বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয়েছে টিভিতে। টিভি খুব স্পর্শকাতর মাধ্যম। তার মধ্যে মফস্বল এলাকা। আমাকে প্রায় সবাই চেনে। অনেকে প্রডাক্টের নামধরে ডাকাডাকি করে। কলেজের করিডোরে শীলুর বান্ধবী নীপার সাাথে দেখা, সঞ্জু ভাই, কেমন আছেন ?
ভালো।
আপনার বিজ্ঞাপন দেখলাম, আমাদের কিন্তু চাইনিজ খাওয়াতে হবে।
ঠিক আছে, খাওয়াবো। কিন্তু মনে মনে বললাম, আগে শীলুকে খাওয়াই তারপর তোমাদের। শীলু কোথায় ?
প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে।
ঠিক আছে, Thank you or your informatin.
নিচে প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে এসে দেখি শীলু গম্ভীরভাবে প্র্যাক্টিক্যাল করছে। আমি ইশারায় শীলুকে ডেকে বললাম, আগামীকাল সকালে চাইনিজ খাবো।
হঠাৎ তোমার চাইনিজ প্রীতির কারণ কি ?
পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে আমি ম্যাজিশিয়ানদের মতো বললাম, বিজ্ঞাপনের মডেলিংয়ের টাকা। চিন্তার কারণ নেই।
প্রথমে নিমরাজি থেকে পরে শীলু রাজি হয়ে গেল।
আমি বিকেলে বিভিন্ন ছুতোয় শহরের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ঘুরে ‘সুযোগ-সুবিধা’ পরখ করে নিলাম। একটা রেস্টুরেন্ট আমার পছন্দ হলো। ইয়াং কিং। সেই রাতে রুমে ফিরে আমার ভালো ঘুম হলো না। শীলুর সাথে কি কথা বলবো, চাইনিজে কি অর্ডার দেবো ইত্যাদি চিন্তা করতে করতে রুমের বাইরে এসে দাড়ালাম। বেশ রাত হয়েছে। রুমমেটরা প্রায় সবাই ঘুমে। শুধু পাশের রুমের পড়–য়া ছাত্র রাজু কোরআন পড়ার সুরে পড়েছে , বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি চারদিকে চমৎকার দুধের জ্যোৎস্না। ঝকমক করছে চারদিক। এরকম অপূর্ব জ্যোৎস্নায় মন খারাপ হয়ে যায়। আমার শীলুর কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে লাগলো। আমি সেই রাতে একটা কবিতা লিখলাম। কবিতাটা এরকম :

সোডিয়াম বাল্বের জন্ডিস আলোগুলো ক্রমশ ম্রিয়মাণ।
নগরীর কোলাহল থেমে আছে। নিস্তব্ধ।
বিষণ্নতার নীলাভ ছোঁয়া লেগে আছে
আমার আঙিনা জুড়ে।
শুধু জেগে আছে তোমার
আলোকতি চোখ।
দূর সমুদ্রাভিসারী চোখ।

সাড়ে দশটায় খুব ‘মাঞ্জা’ মেয়ে রুম থেকে বেরুলাম। পাশের রুমের রাজু বলল, কি ব্যাপার সঞ্জু, এত সাজগোজের কারণ কি ? শীলুর সাথে ইয়ে--টিয়ে আছে নাকি ?
না,একটু বেরুচ্ছি। ক্লাসে যাব।
চাইনিজের কথা চেপে গেলাম। না হলে অবার রাজুকে সাথে নিতে হবে।
সকাল এগারোটায় আমরা ইয়াং কিং--এর দরজায়।
আমি আর শীলু।
শীলু আর আমি।


দু’ জনের সামনে কিছু স্বর্ণালি সময়। শীলু আজ বেশ সেজে এসেছে। বেগুনি কালারে একটা টি নট জামা। সাথে জিন্স ট্রাউজার্স। এ সময় চাইনিজে খুব একটা ভিড় থাকে না। আগের দিন আমার দেখা একটা ‘সুবিধা’ সন্বলিত ছোট কেবিনে ঢুকে পড়লাম। কেবিন আবছা অন্ধকার। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। শুধু ক্যাসেটে বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের করুণ একটা সুর ভেসে আসছে। বেয়ারা অর্ডার নিয়ে চলে গেলো। আমি শীলুকে বললাম, গতকাল রাতে একটা কবিতা লিখেছি।
পড়।
সাথে আনিনি। ভালো মতো মনে নেই।
যতোটুকু মনে আছে বলো।
আমি শীলুর হাত ছুঁয়ে বললাম, শুধু একটা লাইন মনে আছে, বলবো ?
বলো।
‘শুধু জেগে থাকে তোমার চোখ’
শীলুর চোখ দু’টি একটু কাঁপল।
আমি বেয়ারার গতিবিধি খেয়াল রেখে শীলু বোঝর আগেই খুব সংক্ষিপ্ত একটা চুমু খেলাম। শীলুর চোখে। আমার ভালোবাসার প্রথম চুম্বন।
শীলু কাঁধ বাঁকিয়ে বলল, ইস্ ! শুধু অসভ্যতা।
আমি হাতে হাত রেখে, পায়ে পা ঠেকিয়ে বললাম, এই অসভ্যতা থেকেই কিন্তু সভ্যতার যাত্রা শুরু।
আমার কথা শুনে শীলু খুব জোরে, কাচের চুড়ি ভাঙার শব্দের মতোন হাসল। ওর হাসি দেখে আমার মনে হতে লাগল সুখ অজানা কোনো অলীক বস্তু নয়। বেয়ারা খাবার দিয়ে গেল। আমি চিকেন ফ্রায়েডের এক টুকরো কাটা চামচে তুলে বললাম, অমি কিন্তু হাত দিয়ে খাব। তুমি আমাকে যা মনে করো। হাত দিয়ে না খেলে তৃপ্তি পাই না।
শীলু বলল, আমিও।
খাবার মাঝখানে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন কথা হলো। ভবিষ্যৎ। বর্তমান অতীত। হঠাৎ একটা তেলাপোকা উড়ে এসে বসলো শীলুর হাতের উপর। শীলুর খুব তেলাপোকায় ভয়। দেখলে ও নাকি বাথরমে পালায়। তেলাপোকা ছাড়াতে গিয়ে ‘ওমা’ বলে শীলু সুপের বাটি, ফ্রায়েড শ্রিম্প রাসি ফেলে দিল আমার প্যান্টের উপর। মেঝেতে, টেবিলে, সুপ--রাইস একাকার। শীলু হতবিহ্বল অপরাধীর চোখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। ও কান্না লুকাতে চায়। তবুও আমি দেখলাম শীলুর গাল বেয়ে জল ঝরছে। আমাদের সমস্ত রোমান্টিসিজম ভেঙে একটি তেলাপোকা সুপের বাটির উপর ভাসছে।

পুনশ্চ
শেষ পর্যন্ত শীলুর সাথে আমার বিয়ে হয়নি। ময়মনসিংহের পড়া শেষ করে আমি ঢাকা চলে আসার কিছুদিন পরে শীলু বিয়ে করে বিদেশ চলে যায়। বেকার একটা ছেলেকে বিয়ে করা কি হাস্যকর তা হয়তো সবারই জানা। শীলুর এক আত্মীয়ের কাছে জেনেছি, শীলু ঢাকায় এসেছে। শীলু, তুমি কি এখনও তেলাপোকা দেখলে ভয় পাও ? ডিজিটাল আর এনালগের ছোঁয়াছুয়িতে ঢাকাতেইতো থাক। খুব ছোট্ট একটা শহর। একটা ফোন করলে কি হয় !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন