সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৩

লাল জুতো

কমলকুমার মজুমদার


গৌরীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার দরুন কিছু ভালো লাগছিল না। মনটা বড্ড খারাপ—নীতীশ ভাবতেই পারছে না, দোষটা সত্যিই কার। অহরহ মনে হচ্ছে—আমার কি দোষ? জীবনে অমন মেয়ের সঙ্গে সে কখনোই কথা বলবে না।

দক্ষিণ দিককার বারান্দা দিয়ে যতবার যায় ততবারই দেখে, গৌরী পর্দা সরিয়ে এদিক পানে চেয়ে আছে, ওকে দেখলেই পলকে পর্র্দা ফেলে দেয়। এ চিন্তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে মনটা সদা চঞ্চল হয়ে রয়েছে; কী করে, কোথায় বা যায়? কোনো কাজেই মন টিকছে না! অবশেষে বিকেল বেলা মনে পড়ল—জুতোজোড়া নেহাত অসম্মানজনক হয়ে পড়ছে, অনেক অনুনয়-বিনয় করে ঠাকুমার কাছে ব্যাপারটা বলতে—টাকা পাওয়া গেল।

নিজের জিনিস নিজে কেনার মতো স্বাধীনতা বোধহয় আর কিছুতেই নেই, অথচ মুশকিলও আছে যথেষ্ট। যদিও সরকার মশায়ের গ্রাম্য পছন্দের আওতায় নিজের একটা স্বাধীন পছন্দ গড়ে উঠেছিল, কিন্তু তাকে বিশ্বাস নেই—কি জানি যদি ভুল হয়? যদি দিদিরা বলে, ‘ওমা এই তোর পছন্দ?’ সিদ্ধান্ত যদি হয়—’তা মন্দ কী বাপু বেশ হয়েছে, ঘষে-মেজে অনেক দিন পায় দিতে পারবে ‘খন!’ এর চাইতে গুরু শ্লেষ আর কী হতে পারে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নীতীশ রাস্তা দিয়ে চলেছে। ছোট দোকানে যে তার পছন্দসই জুতো পাওয়া যেতে পারে না, এ ধারণা তার বদ্ধমূল, তাই বেছে বেছে একটা বড় দোকানে গিয়ে উঠল।

জুতোওয়ালা এমন করে কথা বলে, যে তার ওপর কথা বলা চলে না, মনে হয় যেন ওকথাগুলো নীতীশের। যে জুতোজোড়া পছন্দ হলো, সেটা সোয়েড আর পেটেন্ট লেদারের কম্বিনেশন। ক্লাসের ছেলেরা হিংসে করে মাড়িয়ে দিতে পারে, গৌরীর মনে হতে পারে, কেন ছেলে হয়ে জন্মালুম না?

দাম ছ-টাকা; ঠিক পাঁচ টাকাই তার কাছে আছে। দরকষাকষি করতে লজ্জা হয়, পছন্দ হয়নি বলে যে অন্য দোকানে যাবে তারও জো নেই, কারণ শুধু তার জন্যে অতগুলো বাঙ্ নামিয়ে দেখিয়েছে। আজকাল তো সব কিছুই সস্তা, কিছু কম বললে দেয় না? ইচ্ছে আছে, কিছু পয়সা যদি সম্ভব হয় তো বাঁচিয়ে একখানা মোটা খাতা কিনবে, গৌরীর হাতের লেখা ভালো, ভাব হলে, তার ওপর সে মুক্তোর মতো অক্ষরে বসিয়ে দেবে—নীতীশ ঘোষ—সেকেন্ড ক্লাস... অ্যাকাডেমি।

লজ্জা কাটিয়ে বলে ফেললে, সাড়ে চারে হয় না?

জুতোওয়ালা বললে, আপনার পায়ে চমৎকার মানিয়েছে, একবার আয়নায় দেখুন না, দরাদরি আমরা করি না।

নীতীশ পিছন ফিরে আয়নার দিকে যেতে গিয়ে দেখে, নিকটে এক ভদ্রলোক বসে আছেন, যার বয়েস সে আন্দাজ ঠিক করতে পারে না, তবে তার দাদার মতো হবে; যাকে আমরা বলব আটাশ হতে তিরিশের মধ্যে; তাঁর হাতে ছোট্ট ছোট্ট দুটি জুতো, কোমল লাল চামড়ার। দেখে ভারি ভালো লাগল—জুতোজোড়া সেই নরম কোমল পায়ের, যে পা দুখানি আদর করে স্নেহভরে বুকে নেওয়া যায়, সে চরণ পবিত্র, সুকোমল, নিষ্কলুষ।

সহসা যেমন দুর্বার দখিন হাওয়া আসে, তেমনি এর অজানা মধুর আনন্দ, ওই কিশোর নীতীশের বুকের মধ্যে। ছোট লাল জুতো দেখলে ওর যে বিপুল আনন্দ হতে পারে, এ কথা ওর জানা ছিল না—জানতে পেরে আরও খুশি হলো, খুশিতে প্রাণ ছেয়ে গেল। ইচ্ছে হলো, জুতোজোড়া হাতে করতে, ইচ্ছে হলো হাত বুলোতে। কোনো রকমে সে লজ্জা ভেঙে বললে, মশাই দেখি, ওই রকম জুতো।

ক-মাসের ছেলের জন্যে চান?

ভীষণ সমস্যা, ক-মাসের ছেলের জন্যে চাইবে? বললে, ছ-সাত, না না আট-দশ মাসের আন্দাজ।

একটি ছোট্ট বাঙ্, তার মধ্যে ঘুমন্ত দুটি জুতো, কি মধুর। নীতীশের চোখের সামনে সুন্দর দুটি মঙ্গল চরণ ভেসে উঠল। মনে হলো, ও পা দুটি তার অনেক দিনের চেনা, অনেক স্বপ্নমাখা আনন্দ দিয়ে গড়া। হাসি চাপতে পারলে না, হাসি যেন ছুটে আসছে, না হেসে থাকতে পারল না।

মনে করতে লাগল, কার পায়ের মতো? কার পা? কিছুতেই মনে আসছে না, টুটুল? না—টুটুল তো বেশ বড়। ইচ্ছে হলো জুতোজোড়া কিনে ফেলে। জিগগেস করল, ওর দাম?

এক টাকা।

নিজের টাকা দিয়ে কিনতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু সাহস হলো না। কিন্তু উদ্বৃত্ত টাকাও যে তার কাছে এখন নেই, হয়তো কিছু সস্তায় হতে পারে। কি করা যায়, ‘কি হবে কিনে?’ বলে বিদায় দেওয়া যায় না? যাক টাকা পেলে কেনা যাবে। নিজের জুতো কেনাও হলো না, দরে পোষাল না বলে। যখন সে উঠতে যাচ্ছে, তখন তার মনে হলো, পিছন থেকে জুতোজোড়া তাকে টানছে, বিপুল তার টান! যেন ডাকছে, কি মোহিনী শক্তি! একবার মনে হলো কিনে ফেলে, কি আর বলবে, বড়জোর বকবে, তবুও সাহস হলো না।

চিরকাল সে ছোট ছেলে দেখতে পারে না, ছোট ছেলে তার দু-চক্ষের বিষ, ভেবেই পেত না টুটুলকে কি করে বাড়ির লোকে সহ্য করে... কি করে লোকে ছোট ছেলেকে কোলে নেয়? নিজের ওই স্বভাবের কথা ভেবে লজ্জা হলো, তবু—তবু ভালো লাগছিল, যতবার ভুলবার চেষ্টা করে ততবার ভেসে আসে সেই লাল জুতো—মধুর কল্পনা পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে সেই লাল জুতোর পানে দেখে সে আস্তে আস্তে দোকান থেকে বার হয়ে এলো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কত অসম্ভব কল্পনাই না তার মনে জাগছিল। তার মনে তখন, পিতা হবার দুর্বার বাসনা। গৌরীর সঙ্গে যদি বিয়ে হয়, তাহলে? বেশি ছেলে মেয়ে সে পছন্দ করে না, একটি মেয়ে সুন্দর ফুটফুটে দেখতে, কচি-কচি হাত পা, মনের মধ্যে অনুভব করল, যেন একটা কচি-কচি গন্ধও পেল।

গৌরী সন্ধেবেলায়, প্রায় অন্ধকার বারান্দায় বসে, রুপোর ঝিনুকে করে তাকে দুধ খাওয়াবে : ঝিনুকটা রুপোর বাটিতে বাজিয়ে বাজিয়ে বলবে, আয় চাঁদ আয় চাঁদ—কী মধুর! আকাশে তখন দেখা দেবে একটি তারা।... আমায় বাবা বলে ডাকবে, শুনতে পেল—ছোট দুটি বাহু মেলে আধো-আধো গদ্গদভাবে ডাকছে, বাবা—হাতে দুটি সোনার বালা। দেখতে যেন পেল, গৌরী তাঁকে পিছন থেকে ধরে দাঁড় করিয়েছে, মাঝে মাঝে শিশু টাল সামলাতে পারছে না, উল্লাসে হাতে হাত ঠেকছে, হাসি-উচ্ছল মুখ। আমি হাত দুটো ধরে বলব, ‘চলি-চলি পা-পা টলি-টলি যায়, গরবিনী আড়ে আড়ে হেসে হেসে চায়’...

কি নাম হবে? গৌরী নামটা পৃথিবীর মধ্যে নীতীশের কাছে মিষ্টি কিন্তু ও নামটা রাখবার উপায় নেই, লক্ষ লক্ষ নাম মনে করতে করতে সহসা নিজের লজ্জা করতে লাগল, ছি-ছি সে কি যা-তা ভাবছে! কিন্তু আবার সেই বাহু মেলে কে যেন ডাকল—’বাবা’।
না, ছেলেমেয়ে বিশ্রী, ‘বিশ্রী’ শুধু এই ওজর দিয়ে প্রমাণ করতে হলো যে—যদি টুটুলের মতো মধ্যরাতে চিৎকার করে কেঁদে উঠে—উঃ কি জ্বালাতন!

যে জুতো দেখে ওর মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, ইচ্ছে হচ্ছিল সেই লাল জুতো-জোড়ার কথা সকলকে বলে, কিন্তু সংকোচও আছে যথেষ্ট, পাছে গৌরীকে নিয়ে যা কল্পনা করেছে তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। যদিও প্রকাশ হবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, তবুও মনে হচ্ছিল, হয়তো প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। একেই তো গৌরী এলে, ঠাকুমা থেকে আরম্ভ করে বাড়ির সকলে ঠাট্টা করে। ঠাট্টা করার কারণও আছে; একদা স্নানের পর তাড়াতাড়ি করে নীতীশ ভাত খেতে গেছে, ঠাকুমা বললেন—নীতীশ তোর পিঠময় যে জল, ভালো করে গাটাও মুছিস নি? পাশেই গৌরী দাঁড়িয়েছিল, সে অমনি আঁচল দিয়ে গাটা মুছিয়ে দিলে পরম স্নেহে—অবশ্য নীতীশ তখন ভীষণ চটেছিল। এই রকম আরো অনেক ব্যাপার ঘটেছিল, যাতে করে বাড়ির মেয়েদের ধারণা, নীতীশের পাশে গৌরীকে বেশ মানায়—বিয়ে হলে ওরা সুখী হবে এবং তাই নিয়ে ওঁরা ঠাট্টাও করেন।

কি করে, আর কাউকে না পেয়ে নীতীশ তার বড় বউদিকে বললে, জানো বড় বউদি, আজ যা একজোড়া জুতো দেখে এলুম, ছোট্ট জুতো টুটুলের পায়ে বোধহয় হবে—কী নরম, তোমায় কী বলব! দাম মাত্র এক টাকা! অবশ্য নীতীশের ভীষণ আপত্তি ছিল টুটুলের নাম করে অমন সুমধুর ভাবনাটাকে মুক্তি দেওয়ায়, কিন্তু বাধ্য হয়ে দিতে হলো।

বউদি বললেন, বেশ, কাল আমি টাকা দেব’খন—তুমি এনে দিও।

মনটা ভয়ানক ক্ষুণ্ন হলো, কী জানি সত্যি যদি আনতে হয়—শেষে কি না টুটুলের পায় ওই জুতোজোড়া দেখতে হবে! তবে আশা ছিল এইটুকু যে, বউদি বলার পরই সব কথা ভুলে যান।

নীতীশ পড়ার ঘরে গিয়ে বসল। পড়ায় আজ তার কিছুতেই মন বসছিল না, সর্বর্দা ওই চিন্তা। তার কল্পনা অনুযায়ী একটি শিশুর মুখ দেখতে ভয়ানক ইচ্ছে হলো—এ-বই সে-বই ঘাঁটে, কোথাও পায় না, যে শিশুকে সে ভেবেছে তার ছবি নেই—কোথায়? কোথায়?
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে গৌরীর গলা পাওয়া গেল, অস্বাভাবিক কণ্ঠে সে কথা বলছে। প্রতিবার ঝগড়ার পর নীতীশ এ ব্যাপারটাকে লক্ষ করেছে, গৌরীকে সে বুঝতে পারে না। হয়তো গৌরী আসতে পারে, এই ভেবে সে বইয়ের দিকে চেয়ে বসে রইল।

উদ্দাম দুর্বার বাতাসে ত্রাসে কেঁপে ওঠে যেমন দরজা জানলা, গৌরী প্রবেশ করতেই পড়ার ঘরখানা তেমনি কেঁপে উঠল। হাসতে হাসতে ওর কাঁধের ওপর হাত দিয়ে বললে, লক্ষ্মীটি আমার ওপর রাগ করেছ?...

কথাটা কানে পৌঁছতেই রাগ কোথায় চলে গেল।

রাগের কারণ আছে। গৌরী ফোর্থ ক্লাসে উঠে ভেবেছে যে সে একটা মস্ত কিছু হয়ে পড়েছে—অঙ্ক কি মানুষের ভুল হয় না? হলেই বা তাতে কী? প্রথমবার নয় পারেনি, দ্বিতীয়বার সে তো রাইট করেছে। না পারার দরুন গৌরী এমনভাবে হাসতে লাগল এবং এমন মন্ত্র উচ্চারণ করলে যে অতি বড় শান্ত ভদ্রলোকেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, নীতীশের কথা তো বাদই দেওয়া যাক।

নীতীশের রাগ পড়েছিল, কিন্তু সে মুখ তুলে চাইতে পারছিল না; সেই কল্পনা তার মনের মধ্যে ঘুরছিল।
রাগ করেছ? আচ্ছা আর বলব না, কক্ষনো বলব না—বাবা বলিহারি রাগ তোমার! কই আমি তো তোমার ওপর রাগ করিনি?
মানে? আমি কি তোমায় কিছু বলেছি যে রাগ করবে?
গৌরীর এইসব কথা শুনলে ভারি রাগ ধরে, কিছু বলাও যায় না।
চুপ করে আছ যে? এই অঙ্কটা বুঝিয়ে দাও না ভাই...
অঙ্ক-টঙ্ক হবে না—
লক্ষ্মীটি তোমার দুটি পায়ে পড়ি।

এতক্ষণ বাদে ওর দিকে নীতীশ চাইল। ওকে দেখে বিস্ময়ের অবধি রইল না, সেই শিশুর মুখ; যাকে সে দেখেছিল নিজের ভিতরে, অবিকল গৌরীর মতোই ফর্সা—ওই রকম সুন্দর চঞ্চল, কাল চোখ।
কী দেখছ?
লজ্জা পেয়ে ওর অঙ্কটা করে দিলে। তারপর নানান গল্পের পর, লাল জুতোজোড়ার কথা ওকে বলে বললে, কী চমৎকার! মনে হবে তোমার সত্যি যেন ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা।
ছোট্ট দুটি চরণ কল্পনা করে গৌরীর বুকও অজানা আনন্দে দুলে উঠল—যে আনন্দ দেখা দিয়েছিল নীতীশের মনে। গৌরী বললে, আচ্ছা কাল তোমায় আমি পয়সা দেব, আমার টিফিনের পয়সা জমানো আছে—কেমন?
নীতীশ ভদ্রতার খাতিরে বললে, তোমার পয়সা আমি নেব কেন?
কথাটা গৌরীর প্রাণে বাজল, সে অঙ্কের খাতাটা নিয়ে বিলম্বিত গতিতে চলে গেল। নীতীশ অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল।
দিনদুয়েক গেল পয়সা সংগ্রহে। এই দুদিনের মধ্যে গৌরী এ বাড়ি আর আসেনি। ঠাকুমা জিগগেস করলেন, নীতীশ, গৌরী আসে না কেন রে?

আমি কী জানি?
কথাটা ঘরে থেকে শুনেই গৌরী তৎক্ষণাৎ গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়াল।
ঠাকুমা বললেন, আসো না কেন?
জ্বর।
জ্বর কথাটা নীতীশকে মোটেই বিচলিত করল না, ও জানে, ওটা একটা ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয়।
টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জুতোজোড়া আনতে, রাস্তা থেকে টাকাটা ভাঙিয়ে নিলে, কারণ হারিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, প্রতি মোড়ে মোড়ে গুনে দেখতে লাগল পয়সা ঠিক আছে কি না।
জুতোর দোকানে ঢুকেই বললে, দিন তো মশাই সেই লাল জুতো; সেই যে সেদিন দেখে গিয়েছিলুম?
দোকানদার একজোড়া দেখালে। ও বললে, না—না, এটা নয়, দেখুন তো ওই শেলফে?
পাওয়া গেল সেই স্বপ্নময় জুতো! কী জানি কেন আরো ভালো লাগল—ওর মধ্যে কী যেন লুকিয়ে আছে। চিত্তের মধ্যে একটি হিংস্র আনন্দ দেখা দিল—দর নিয়ে গোল বাধল না, একটি টাকা দিয়ে জুতোজোড়া নিলে। জুতোওয়ালা বললে, আবার আসবেন। মনে হলো বোধহয় ঠকিয়েছে।

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে অনেকবার ইচ্ছে হলো বাঙ্টা খুলে দেখে—কিন্তু পারল না।

একবার মনে হলো, এ দিয়ে কী হবে? কার জন্যেই বা কিনল? সে কি পাগল! মিথ্যে মিথ্যে টাকা তো নষ্ট হলো?
ভিতর হতে কে যেন উত্তর দিল, ‘কেন, টুটুলের পায় যদি হয়?’ টুটুলের কথা মনে হতেই একটু ভয় হলো, যদি তার পায় সত্যই হয়, তাহলেই তো হয়েছে।

আবার প্রশ্ন কিন্তু কার জন্যে সে কিনেছে? বেশ ভালো লাগল বলে কিনেছি! ভালো লাগে বলে তো মানুষ অনেক কিছু করে, বাজি পোড়ায়, গঙ্গায় গয়না ফেলে—এ তবু, একজোড়া জুতো পাওয়া গেল তো। বাজে খরচ হয়নি, বেশ করেছে, একশো বার কিনবে।

সহসা জিহ্বায় দাঁতের চাপ লাগতেই মনে পড়ল, কেউ যদি মনে করে তাহলে জিব কাটে, কে মনে করতে পারে? গৌরী? আজ গৌরীকে ডেকে দেখতে হবে। বাড়িতে পৌঁছে, সকলকে মূল্যবান জিনিসটা দেখাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সাহস হলো না, যদি ঠাট্টা করে? প্রথমত সে নিজেই ঠিক করতে পারছে না,—কার জন্যে কিনল, কেন কিনল?

টুটুল বারান্দায় তখন খেলা করছিল, তার পায়ের মাপটা নিয়ে জুতোটা মেপে দেখল, টুটুলের পা কিঞ্চিৎ বড়—কিন্তু ওর মনে হলো অসম্ভব বড়! শঙ্কিত চিত্তে ঠাকুমার কাছে গিয়ে বললে, তোমাদের সেই লাল জুতোর কথা বলেছিলুম, এই দেখো।

ভাঁড়ার ঘর হাসি উচ্ছলিত। ঠাকুমা বললেন, ওমা—কোথা যাব, ছেলে না হতেই জুতো! হৈ হৈ পড়ে গেল। নীতীশের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, বললে আমি টুটুলের জন্যে এনেছিলুম...

কে শোনে তার কথা! বুঝতে না পেরে, পড়ার ঘরে গিয়ে আলোটা জ্বেলে বসল, সামনে জুতোজোড়া প্রাণভরে দেখতে লাগল। এ দেখা যেন নিজেকে দেখা। ভাবলে, গৌরীকে কি করে ডাকা যায়?

গৌরী গোলমাল শুনে, জানলায় এসে দাঁড়িয়ে দেখছিল—ব্যাপারটা কি সে বুঝতে পারে নি। মনে হচ্ছিল, নীতীশ একবার ডাকে না?
সহসা চিরপরিচিত ইশারায়—না থাকতে পেরে নেমে এলো, আসতেই নীতীশ বললে, তোমায় একটা জিনিস দেখাব, দাঁড়াও।

গৌরী উদ্গ্রীব হয়ে ওর দিকে চাইল। নীতীশের শার্ট বোতামহীন দেখে বললে, তোমার গলায় বোতাম নেই, দেব?
দাও।
গৌরীর চুড়িতে সেফটিপিন ছিল না, শুধু একটি ছিল ব্লাউজে, বোতামের পরিবর্তে—না ভেবেই সেটা দিয়ে বুঝল ব্লাউজ খোলা, বললে—দাও ওটা, তোমায় একটা এনে দিচ্ছি।

থাক।
থাক কেন, এনে দিই না? কাতর কণ্ঠে বললে।
থাক, বলে হাসিমুখে সে জুতোর বাঙ্টা খুলে গৌরীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে, তার মুখ আনন্দে উৎফুল্ল।

সুনিবিড় প্রেমে কালো চোখ দুটো স্বপ্নময় হয়ে এলো। গৌরী জুতোজোড়া দেখে, কেঁপে উঠল! তার দেহে বসন্ত মধুর শিহরণ খেলে গেল। মনে হলো, এ যেন তারই শিশুর জুতো! অস্পষ্টভাবে বললে, আঃ...! তার দেহ আনন্দে শিথিল হয়ে আসছিল। যেন কোনো রমণীয় সুখ অনুভব করে, আবার বললে, আঃ।... সব কিছু যেন আজ পূর্ণ হলো। নিজেদের কল্পনায় যে সুন্দর ছিল, যেন তাকেই রূপ দেবার জন্যে আজ দুজনে আবদ্ধ হলো।

নীতীশ বিস্ময় ভরে দেখে ভাবছিল একি! পাশের বাড়িতে তখন সেতারে চলছিল তিলক-কমোদের জোড়—তারই ঘন ঝঙ্কার ভেসে আসছিল। ওই সংগীত এবং এই জীবনের মহাসংগীত তাদের দুজনকে আড়াল করে রাখলে, হিংস্র বাস্তবের রাজ্য থেকে। যে কথা অগোচরে অন্তরের মধ্যে ছিল, সে আজ দুলে-দুলে উথলে উঠল। বহু জনমের সঞ্চিত মাতৃস্নেহ-মাতৃত্ব।

দেখতে পেল, সুন্দর অনাগত শিশু, যে ছিল তার কল্পনায়; অঙ্গটি তার মাতৃস্নেহের মাধুর্য দিয়ে গড়া, যাকে দেখতে অবিকল নীতীশের মতো; তার আত্মা যেন শিশুর তনুতে তনু নিল। ইচ্ছে করল বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে—বুকে জড়িয়ে ধরে বেদনা-মাখা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়তে। জুতো দুটোয় আস্তে আস্তে হাত বুলোতে বুলোতে সহসা গভীরভাবে চেপে ধরল, তারপর বুকের মধ্যে নিয়ে যত জোরে পারে তত জোরে চেপে, সুগভীর নিশ্বাস নিলে, মনে হলো যেন তার সাধ মিটেছে। ভগ্নস্বরে কণ্ঠ হতে বেরিয়ে এলো, আঃ...

আনন্দে বিস্ফারিত আঁখিযুগল। নিজেকে যেন অনুভব করলে। আজ শান্ত হলো তার লক্ষ বাসনা লক্ষ বেদনা—লক্ষ স্বপ্ন মূর্তি পেল।
বিশ্বগত অপূর্ণতা তা তারা এই তরুণ বয়সেই উপলব্ধি করলে; পূর্ণতার সম্ভাবনায় দুজনেই মহা-আনন্দে-মদে মত্ত হয়ে উঠল।

গৌরীর হৃদয়ের ভিতর দিয়ে, ওই লাল জুতো পরে, নীতীশ টলমল করে চলল, আর—গৌরী চলতে শুরু করলে, নীতীশের হৃদয়ের মধ্যে দিয়ে পথ করে। আচম্বিতে সশব্দে জুতোজোড়াকে চুম্বন করলে। তারপর নীতীশের দিকে চেয়ে, ঈষৎ লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠে জিগগেস করলে, কার জন্যে গো?

মৃদু হেসে বললে, তোমার জন্যে!
বারে তুমি যেন কী! অতটুকু জুতো, আমার পায় কখনো হয়? কার লক্ষ্মীটি বলো না? তোমার বুঝি?
ধেৎ! আমার হতে যাবে কেন?
ভুরু কুঁচকে বললে, তবে কার? চোখের তারা নেচে উঠল।
তোমার পুতুলের?
ওমা—তা হতে যাবে কেন? তুমি এনেছ, নিশ্চয় তোমার ছেলের?



আচ্ছা, বেশ দুজনের—
হ্যাঁ—অসভ্য, বলে গ্রীবাটাকে পাশের দিকে ফিরিয়ে নিজের মধুর লজ্জাটা অনুভব করলে। লাল জুতোজোড়া তখনো তার কোলে, যেন মাতৃমূর্তি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন