শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

এলভিস ও অমলাসুন্দরী

শমীক ঘোষ

          
দু’জনেই বুড়ো হয়ে গিয়েছে। জরা গ্রাস করেছে দু’জনকেই । বাড়ীটার পলেস্তারা খসে গেছে জায়গায় জায়গায়। অনেক আগেই ধুয়ে গিয়েছে রঙ। সামান্য যেটুকু আছে তাতেও ভাগ বসিয়েছে আগাছার শিকড়। দোতলার বারান্দা খসে গেছে, খসে গেছে কার্নিশ। তবু দাঁড়িয়ে আছে। বহু প্রাচীন ইতিহাসের মত। রোদ বৃষ্টির দাগ শরীরে নিয়ে।
          অমনই অমলাসুন্দরী। ঘন জ্যোৎস্নার মত সামান্য লাল চুল এখন জ্যৈষ্ঠের ফ্যাটফ্যাটে আকাশের মত ফিকে। পরিপাটি ত্বকে অনেক বসন্তের পর এখন শীতের বলিরেখা। রঙ পুড়েছে।

          তবু দু’জনেই যেন আঁকড়ে আছে পরস্পরকে। ইটের মধ্যে নারীর পাঁজর। একদিন একসাথে খসে যাবে বলেই বোধহয়।
          বাড়ীতে দু’টি মাত্র প্রাণী। তিনি আর ঝি সুভামা। আর আছে নুটু, বাড়ীর একমাত্র পুরুষ, হুলো বেড়াল। তবে তার বাড়িতে থাকা শুধু খাবার সময়।

          প্রতিদিন সকাল হলেই দালানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজে তদারকি করেন ।
          ওমা ওখানে ঝাঁট দিলি না যে?
          দিলাম তো এই মাত্র। তুমি দেখবে না আমার দোষ!
          ফের বাজে কথা? বুড়োধাড়ি মিথ্যে বলিস কি করে? ওই দেখ ধুলো কত।
          ধুলোর আর দোষ কি? বাড়ি তো তোমার দিন দিন সেজে উঠছে।

          তিনি চুপ করে যান। একসময় এই বাড়ী গমগম করত লোকে। ঝি চাকর ঠাটবাট। মেয়েরা দালানে আসত কদাচিৎ।  ইংরেজ আমলে নাকি এই বাড়ীতে প্রায়শই পায়ের ধুলো দিতেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর শাশুড়ির কাছে শোনা। তারপর সবই গিয়েছে। গত হয়েছেন সৌরিন্দ্রমোহন। তাঁর আমলেই ঠাটবাট সব গিয়েছিল। ছেলেপুলে হয়নি। সৌরিন্দ্রমোহন শেষ বয়সে যেন আরও বেশী করেই ওড়াতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, “খাবে কে ? খাবে তো পঞ্চভূত। তার চাইতে এখনই যাক না।”
          তার পর থেকেই তিনিই সামলাচ্ছেন সব কিছু। অপেক্ষা করে রয়েছেন কবে শেষ শীত নামে তাঁর একলা উঠোনে। তবু বাড়ীটাকে ছাড়তে পারেন না তিনি। যেটুকু আছে, ঝকঝকে তকতকে করে রাখা তাঁর স্বভাব। সৌরিন্দ্রমোহনের টেবিল আজও সাজানো হয় সাদা সাটিনে। পেতলের ফুলদানিতে ফুল থাকে না অবশ্য।
          চৈত্র মাসের সকালবেলা। দালান জুড়ে কুয়াশার মত ঝাঁটার ধুলো। এমন সময় ওরা এলো। সামনে ওপাড়ার রবি। পিছনে একটা মেয়ে।
          “দিদা, এই ইনি আপনাদের বাড়ী খুঁজছিলেন” রবি মুগ্ধ চোখে তাকায় মেয়েটির দিকে। কিন্তু বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে মেয়েটি বলে, “আর উ অমলা... আই মিন... মানে আমি কি অমলাসুন্দরী দেবীর সাথে দেখা করতে পারি?”
          মেয়েটার পিঠে ঢাউস একটা ব্যাগ, স্কুল ব্যাগের মত, একটু বড়। ছেলেদের মত গেঞ্জি পরা, জিনসের প্যান্ট। লালচে চুলগুলো আলগোছে খোঁপা করে রাখা। এক কান থেকে সাদা তার বেরিয়ে রয়েছে। অন্য তারটা আরেক হাতে।
          অমলাসুন্দরী অবাক হলেন। এমন মেয়ে এখানে বড় একটা দেখা যায় না!
          তাঁর উত্তর দেবার আগেই বলে উঠল সুভামা, “ওমা ! তোমাকে খুঁজছে গো!”
          “আপনিই অমলাসুন্দরী, মানে দিদা... আমি নীপা, আমার বাবার নাম টুকু... মানে ... রমলাসুন্দরী আমার ঠাকুমা।”
          মেয়েটা এগিয়ে এলো। অমলাসুন্দরী ভাবলেন হয়ত প্রণাম করবে। করল না। প্রায় জড়িয়ে ধরল । মুখে মুখ ঘষে দিল। মুখটা বড় চেনা। রমলাসুন্দরী তাঁর ছোট বোন। এতদিন পর তার নাতনি এলো !


          “দিদি, কতদিন পর! তোর একটা ফোনও নেই যে খবর নেব!”
          অমলাসুন্দরী চুপ করে থাকেন। কেমন আছিস জিজ্ঞাসা করতে বাধে তাঁর। নিজের ছোট বোন। একসাথে বড় হওয়া। তারপর সব কেমন দূরে সরে গিয়েছে। আজকের এই সামান্য খসখসে গলার বৃদ্ধা, তাঁর ছোটবোন, নিজের চুল বাঁধার আগে যার বিনুনি করতেন তিনি।
          “হ্যালো,” রমলা আবার বলেন।
          এক চোখ জিজ্ঞাসা নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে নীপা, “দিদা শুনতে পাচ্ছ না?”
          নীপাই ধরে দিয়েছে ফোনটা। “কিরে কোন তো খবর দিস না। শুনলাম তোর নাকি হাঁটুতে ব্যথা। হাঁটতে কষ্ট হয়?” অমলা বলে ওঠেন।
          “আর আমার কথা। তুই কি করিস সারাদিন একা একা। অতবড় বাড়ীতে?”
          “আমার আর কি! চলে যাচ্ছে। যে কটা দিন আছে। তোর দাদাবাবু যাবার পর সবই ফাঁকা।”
          “সত্যি কি প্রাণবন্ত ছিলেন মানুষটা! সারাদিন যেন মাতিয়ে রাখতেন সব্বাইকে। দাদাবাবুও চলে গেলেন, টুকুর বাবাতো অনেক আগেই গিয়েছিল।”
          “হ্যাঁ অনেকদিন হয়ে গেল সব। ছাড়, তোরা কেমন আছিস ?”
          “হ্যাঁ আমাদের কাটছে। ওই মেয়েকে নিয়ে নাজেহাল। পড়াশুনো করল, চাকরি করল, এখন বিয়ে করতে চায় না। বিদেশ থেকে এসে দুম করে চাকরি ছেড়ে দিল। বৌমা, টুকু সবাই নাজেহাল।”
          “তবু তো এলো কেউ। তোরা সব্বাই আসতে পারতি।”
          “টুকুর সময় কই। সারাদিন চাকরি, শেয়ার বাজার নিয়েই আছে। আর আমি নড়তেই পারি না। ওই মেয়েই নাছোড়বান্দা – কতদিন ধরে বলছে যাবে। ও নাকি গ্রাম দেশের পুরনো বাড়ী দেখবে। ছবি তুলবে। বিদেশে নাকি এমন বাড়ীতে মিউজিয়াম হয়।”
          “টুকু, বৌমা কেমন আছে?”
          “ভালোই। টুকুর ব্লাড প্রেশার। ওরা গেছে বেড়াতে। নীপা নেই বলে। ওই মেয়ে নিয়ে যা হল কয়দিন,” বলেই ত্রস্ত স্বরে বলেন রমলা, “ওকে কিছু বলিস না যেন।”
          “কি হয়েছে?” অমলা দেখেন নীপা বাইরের বারান্দায় ঝুঁকে কি যেন দেখছে।
          “কি আবার হবে। অত ভালো চাকরি দুম করে ছেড়ে দিল। বলে কি করবে পরে ঠিক করবে। টুকুর তো ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেল। বৌমা বাপের বাড়ির লোককে কি বলবে ভেবে নাজেহাল। রোজ ঝগড়া। আর ওই মেয়েরও অমন গোঁ। শেষে আমি বললাম যা ঘুরে আয়। তোর কথা বললাম।”
          “ও। টুকুর শ্বশুর-শাশুড়ির কি খবর?” অমলাসুন্দরী কথা ঘুরিয়ে দিলেন, নীপা ঘরে এসে ঢুকেছে।

           মাছ কাটছে সুভামা। মাটিতে বঁটি রেখে। এই বাড়িতে প্রথমবার মাছ দেখছে নুটু। আনন্দে গড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে মুখ ঘষছে এর ওর পায়ে। নীপা এসে নুটুকে ধরে কোলে তুলে নিল।
          জানো দিদা, আমি যখন ফ্রাঙ্কফুর্টে থাকতাম তখন আমার সামনের অ্যাপার্টমেন্টে একটা ইন্দোনেশিয়ান কাপল থাকত। তাদের এমন একটা বিড়াল ছিল। আরও মোটা। লাভ ক্যাটস।
          অমলাসুন্দরী সরু চোখে দেখছিলেন। হাফ প্যান্টের থেকে একটু ঢোলা পোশাকটা। হাঁটুর অনেক উপরে। তাঁর সামান্য অস্বস্তি হচ্ছিল।
          ফ্যাঙ্কফুট কোথায় গো? সুভামা জিজ্ঞাসা করে।
          জার্মানি।
          তুমি জার্মান গেছো!
          হ্যাঁ জার্মানি, তার আগে কিছুদিন নিউইয়র্কে। তারপর একটা চাকরী নিয়েছিলাম। আর ভালো লাগল না। ভাবলাম একটা ব্রেক নেব।
          বাবা !
          ভাবছিলাম কি করা যায়। ঠাকুমার সাথে কথা বলতে বলতে তোমার কথা এলো। ভাবলাম একবার আসি। ওয়েস্ট বেঙ্গলের গ্রাম। রাস্টিক ভিলেজ লাইফ। সো আই কেম।
          ভাল করেছিস, অমলাসুন্দরী হাসলেন। তবু তো কেউ এলো।
          হা হা। এই ভাবে না মুম্বাইতে কেউ মাছ কাটে না। সো নাইস। আমরা ছুরি দিয়ে কাটি।  বেশীর ভাগই কাটা মাছ। এটা কি মাছ?
          এটাকে পাবদা বলে। তোর ঠাকুমা রাঁধে না?
          ঠাকুমা, তুমি তো শুনলে নড়াচড়াই করে না। তবে আই গেস খেয়েছি। মা করে। আই অ্যাম নট ইউজড টু ইন সিয়িং র ফিস।
          এতক্ষণ নুটু চোখ বুজে বসেছিল নীপার কোলে। এইবারে সুযোগ বুঝে ঝাঁপ দিল মাটিতে। দৌড়ল, পিছন পিছন নীপা ।
          মেয়েটা কেমন গো এত বড় মেয়ে কোন হায়া কায়া নেই।
          তোর কি ? বিদেশে গেলে লোকে এমন হয়।
          সুভামা চুপ করে গেল। মূহুর্তে তার মুখে খেলা করে গেল চোরা হাসি। বুড়ির নাতনিকে ভাল লেগে গিয়েছে।
          দুপুর হলেই সামান্য রোদ প্রবেশ করে এখান সেখান দিয়ে। ছায়া আঁকে, ছবি আঁকে মেঝেতে, বাড়িটার শরীরে শরীরে। বসন্তকাল, রোদ যেন আরও একটু বেশি সময় ধরে ছুঁয়ে থাকে পৃথিবীকে। জড়িয়ে থাকে, সোহাগ করে। নীপা ঘোরে বাড়ির ভিতর, উঠোন দালানে। ছবি তোলে, কখনো বা এ ঘর ও ঘর ঘুরে ঘুরে দেখে পুরনো আসবাব, ছবি।
          সময় যেন আটকে আছে ঘর গুলোয়। মোটা থামে প্লাস্টার খসা লাল ইটের মত উঁকি মারে অন্য একটা কাল। এমন কোথাও সে আসতে চেয়েছিল। শহর, ফেসবুক, রোজকার ব্যস্ততা থেকে দূরে। যেখানে নিয়ত মোবাইলের তাড়াহুড়ো নেই, নেই অ্যাসাইনমেন্টের অনন্ত চাপ।
          এমন করেও মানুষ থাকে তাহলে। বয়ে যাওয়া সময় নিয়ে, স্মৃতিতে ডুবে, প্রতিদিন পালটে যাওয়া বাইরের পৃথিবীকে ভুলে থেকে।
          হই! উঠিস না ওখানে। কদিন আগেও একটা চাপড় খসে পড়েছে।
          নীপা চমকে পিছনে তাকায়।
          ওমা তুমি ঘুমোও নি। আমি দেখলাম তুমি শুয়ে আছ।
          ঘুম হয়না। এমনি শুয়ে থাকি।
          ওই দিকের ঘরটায় তালা কেন?
          ওই ঘরে তোর দাদুর জিনিসপত্র আছে কিছু। বেশীর ভাগই পুরানো রেকর্ড, খোলা হয়না।
          রেকর্ড? রেকর্ড মানে?
          আগেকার দিনে ছিল গান শোনার। দেখিস নি?
          এল পি! লঙ প্লেয়িং ! দেখাও, দেখাও প্লিজ।
          অমলাসুন্দরী ম্লান হাসেন। অদ্ভুত মেয়েটা। কত সহজে বায়না করতে পারে একজন প্রায় অচেনা মানুষের কাছে। আঁচলের খুট থেকে চাবির গোছা বার করেন। “নে খোল।”
          এই ঘরটা যেন বুকে আগলে রাখেন তিনি। সৌরিন্দ্রমোহনের স্মৃতি। স্মৃতি আরও কত কিছুর। একত্র যাপনের, খুনসুটি মান অভিমানের। জমা স্মৃতির এই ঘরে ধুলো জমার আগেই তা মোছা হয়ে যায়। ঝকঝকে পিন ভাঙা গ্রামোফোন, না বাজা লঙ প্লেয়িং স্টিরিও যেন এখুনি বেজে উঠবে। মূর্ছনা ফুটবে সুরের। এই বাড়িও যেন গমকে গমকে কেঁপে উঠবে চলে যাওয়া মানুষের কোলাহলে।
          ওয়াও ! এত লঙ প্লেয়িং ! বাজে এখনো ? গ্রামোফোনটা বাজে?
          নাহ, অনেকদিন খারাপ হয়ে পড়ে আছে।
          সারাও না কেন ?
          কে আর সারাবে, তোর ঠাকুরদা গিয়েছে। তার সখ রয়ে গিয়েছে শুধু।
          ন্যাট কিংকোল !
          তুমি ন্যাট কিংকোল শুনেছ ?
          হ্যাঁ ন্যাট কিংকোল, প্যাট বুন, তোর ঠাকুরদা শুনত।
          ঠাকুর’দা এই সব শুনত ? এইখানে !
অমলাসুন্দরী হাসেন। তুই গান শুনিস না?
          হ্যাঁ শুনি তো। ওই যে আইপডটা লাগাই কানে। আমার আইপডে প্রায় হাজার খানেক গান আছে।
          হাজার খানেক ! ওইটুকু যন্ত্রে !
          হ্যাঁ। ল্যাপটপে আছে প্রায় ছয় জি বি।
          ছয় জি বি ? মানে?
          ওহ! হ্যাড অরবিন্দ বিন হিয়ার হি উড হ্যাভ বিন অ্যামেজড! উইশ আই কুড টেক দিস হোল স্পেস উইথ মি। ও মাই গড দিস ইস অ’সাম। 
          অরবিন্দ কে ?
          অরোবিন্দো না অরবিন্দ। আমার বয় ফ্রেন্ড। শিট! বলেই জিভ কাটল নীপা। চোখ কপালে তুলে তাকাল অমলাসুন্দরীর দিকে।
          অমলাসুন্দরী অবাক হলেন না। এই মেয়েটা তাঁকে অবাক করে না আর। তাঁর শুধু মনে পড়ে গেল প্রায় পনেরো বছর বয়সে তিনি যেদিন এই বাড়িতে প্রথম ঢুকেছিলেন সেই দিনটার কথা। কি রোগা ছিলেন সৌরিন্দ্রমোহন। টোপর পরা। সদ্য বিয়ে করা কনের দিকেও তাকাতে যেন লজ্জা পাচ্ছিলেন। অনেক লোক। মেয়েদের চাপা হাসির শব্দ, উলুর আওয়াজ। তিনি পায়ের দিকে তাকিয়েছিলেন। আলতা পরা পাগুলো। লাল আলতায় ডুবিয়ে পা ফেলছেন বাইরের দালানে। সৌরিন্দ্রমোহনের কপালে চন্দন ছিল। যেমন চন্দন তিনি নিজে হাতে এঁকেছিলেন তাঁর কপালে, চলে যাওয়ার দিন। প্রথম সেইদিন, মধ্যরাত্রে সৌরিন্দ্রমোহন লজ্জা পাচ্ছিলেন কাছে আসতে। আর তিনি যেন স্থবির হয়েছিলেন। স্তব্ধ হয়েছিলেন, লজ্জায়, ভয়ে, আনন্দে।
          দিদা তুমি রাগ করলে নাতো। অরবিন্দ আর আমি একসাথে চাকরি করতাম। আমাদের বাড়িতে সবাই জানে।
          অমলাসুন্দরী কি বলবেন। নীপার দিকে তাকিয়ে তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন নিজেকে। আরও অনেকদিন পর। কলকাতা থেকে কালো গাউন কিনে এনেছেন সৌরিন্দ্রমোহন। লেসের কাজ করা, ঘটি হাতা, অমলাসুন্দরীকে পরাবেন। সেদিন এই ঘরে গান বাজছিল । ন্যাট কিংকোলের গান। “হোয়েন আই ফল ইন লাভ/ ইট উইল বি ফর এভার/ অর আই ইউল নেভার ফল ইন লাভ।” পুবের জানলা দিয়ে হালকা হাওয়ার সাথে ভেসে আসছিল চাঁদের আলো।  বাইরের স্তব্ধতা আর চাঁদ চোয়ানো ঘরে গ্রামোফোনের আওয়াজ। তখনো পলেস্তারা খসেনি। এই বাড়িও তখনো যুবক।
          দিদা তুমি রাগ করলে ? অমলাসুন্দরীর ঘোর কেটে যায়।
          আরে না না। তোদের সময় অন্য। তোরা নিজেদের মত বেছে নিতে শিখেছিস। এই ভালো।
          তোমরা চা খাবে না? চা চাপাই? সুভামা এসে দাঁড়ায়।
          রাত হয়। খাওয়ার পর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নীপা। রাতের নরম আলোর আশ্চর্য উদ্ভাস নীপার শরীরে। হালকা হাওয়ায় তার চুলের গোছ কাঁপছে ধীরে ধীরে। অমলাসুন্দরী মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন। আর নীপা দেখছিল বাইরের পৃথিবীটাকে। দূরে পাঁচিল ঘেঁষে কচুবনের সারি। একটা কেঁদো কুকুর কি যেন খাচ্ছে মুখ তুলে। খাওয়ার পর শরীর ঝাড়ল। আরও দূরে নারকেল গাছেদের সারি বেয়ে সামান্য পুকুরের উদ্ভাস।
          হ্যাঁরে,  অরবিন্দর সাথে তোর কতদিনের আলাপ?
          তা অনেকদিন বছর তিন চার হবে।
          তিন চার বছরও অনেকদিন ! ভাবেন অমলাসুন্দরী। আশ্চর্য! জিজ্ঞাসা করলেন , “তোর সাথে আলাপ কি ভাবে?”
          অরবিন্দ ছিল আমার টিমে। আমার সিনিয়র। কথা বলত খুব। খুব মজার ছেলে। কথায় কথায় হাসত। আর ক্লায়েন্ট মিটিং-এর আগে সবাই যখন খুব টেন্সড তখন অরবিন্দ হেঁড়ে গলায় গান গাইত। এত ফানি !
           তারপর?
          হেসে ফেলল নীপা। ফর্সা গাল বুঝিবা রক্তিমও হল কয়েক মুহূর্তের জন্য। রাতের আবছা নীলাভ রঙে সেই লাল বুদবুদের মত ফুটে উঠেই যেন মিলিয়ে গেল।
          একদিন একটা মেইল করল জানো। একটা মেইল তাতে কিচ্ছু লেখা নেই। শুধু বড় করে ইংলিশে লেখা “সো ট্রু।” আর মেইলের সাথে অ্যাটাচমেন্ট এলভিস প্রেসলির গান । কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ উ।
          বাব্বা ! তুই কি করলি?
          আমি কি করব! আমিতো অবাক। আমি সোজা ওর টেবিলে গিয়ে বললাম “এটার মানে কি। হোয়াট ওয়াজ দ্যাট?” বজ্জাত ছেলেটা কোথায় ভয় পাবে, তা না বলে কিনা যা সত্যি তাই তো বললাম। আর আমি হেসে ফেললাম। সেই শুরু।
          অমলাসুন্দরী মুচকি হাসলেন । সৌরিন্দ্রমোহনও ওইরকম ছিলেন, বেপরোয়া । নইলে সেই আমলে কেউ রাতবিরেতে বউকে গাউন পরিয়ে, ইংরাজি গান বাজিয়ে, বল নাচতে চায় !
          অরবিন্দের ছবি নেই তোর কাছে?
          আছে দেখবে? দাঁড়াও, ল্যাপটপটা অন করি।
          ল্যাপটপ অন করে নীপা। ছবি বার করে। ফর্সা সুঠাম দেহের যুবক। উজ্জ্বল চোখ। ঝকঝকে স্যুট পরা।
          বাহ! ভারী সুন্দর দেখতে তো।
          নীপা ল্যাপটপটা ঘাঁটে, কি যেন খুঁজছে। বলে, দিদা গানটা শুনবে?
          কোন গান?
          বাহ ঐ যে এলভিসের গান। যেটা অরবিন্দ পাঠিয়েছিল। তুমি এলভিসের গান শুনেছ?
          নারে। আমার যা শোনা সব তোর দাদুর কেনা।
          গান চালায় নীপা। শুধু গান নয় ভিডিও। এক আশ্চর্য সুন্দর কন্দর্পকান্তি যুবকের চেহারা ভাসে পর্দায়। কটা চোখ। লম্বা ঝুলপি। অত্যাশ্চর্য ভঙ্গিমা। জ্যাকেট পরে গান গাইছে। আর গানের টানে দুলছে যেন গোটা দুনিয়া। দুলে ওঠেন যেন অমলাসুন্দরীও।
          “ওয়াইজ ম্যান সে অনলি ফুলস রাশ ইন
          বাট আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ”
গানের ভাষা বোঝেন না অমলাসুন্দরী। বোঝেন না অদ্ভুত উচ্চারণ। শুধু সেই আশ্চর্য কণ্ঠস্বর যেন হালকা আমেজে ঢেকে দেয় গোটা বাড়ীটাকে। কম্প্র সেই কণ্ঠ যেন চাঁদের আলোর মত, ভারী বর্ষার পর মেঘের ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়ানো চোরা চাঁদের মত, ঘন শীতের ভোরে ঘাসে লেগে থাকা কুয়াশার মত ।
          “টেক মাই হ্যান্ড, টেক মাই ফুল লাইফ টু
          ফর আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ”
অমলাসুন্দরীর মনে হয় গানটা যেন তাঁকে মুড়ে দেয় কুহক আবরণে। মেঝেতে পড়ে থাকা পলেস্তারা যেন নিজে থেকেই শূন্যে উঠে আবার লেগে যায় দেওয়ালের গায়ে। ভেঙে পড়া কার্নিশ হঠাৎ ঋজু সুঠাম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় পুরনো জায়গায়। খসে পড়া রঙ ঠিকরে বেরোয় অনেক ধুলোর আস্তরণ ভেদ করে। আর পুরনো স্মৃতিতে নিভে যাওয়া বাড়ীটা যেন পাড়ি দেয় আকাশে, মেঘের গায়ে গা ঘষটে ঘষটে যেন স্পর্শ করতে চায় আকাশের চাঁদ। সৌরিন্দ্রমোহনের কথা মনে পড়ে তাঁর। মনে পড়ে পুরনো সব স্মৃতি। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন মিলিয়ে গিয়েছে তাঁর চামড়ার ভাঁজ। যেন পনেরো বছরের অমলা, শিশুর মত সরল, আবার নতুন বউয়ের মত লাজুক, অপার বিস্ময়ে, নির্জন দুপুরে চরে বেড়াচ্ছে এই বিশাল বাড়ীটায়।
          “লাইক আ রিভার ফ্লোজ সিওরলি টু দ্য সি
          ডার্লিং সো ইট গোজ
          সাম থিংস আর সিওরলি মেন্ট টু বি”
গান শেষ হয়। শুধু পুরনো ঘড়ি এগারোবার ঘণ্টা বাজিয়ে জানান দেয় সময় ফেরে না। ফিরতে পারে না। অমলাসুন্দরী চুপ। নীপাই কথা বলে যায় একনাগাড়ে।
          এই গানটা আমার আই পডেও আছে দিদা। এতবার শুনেছি।
          দিদা তুমি ল্যাপটপ চালাতে শিখবে? এই দেখ এই বোতামটা টিপলে অন হয়। এইভাবে, ধীরে ধীরে বুট হচ্ছে, মানে খুলছে।
          অমলা তাকিয়ে থাকেন।

          অন্ধকার। সিড়ির ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে স্মিত আলো। অমলাসুন্দরী, একা হেঁটে উঠে যাচ্ছেন সিঁড়ি দিয়ে। মৃদু সুর চলকে নামছে জ্যোৎস্নার মত। অমলা যেন সুরের টানে অন্ধ এগিয়ে যাচ্ছেন। উপরের ঘরটা, কালো গাউন পরা অমলা। গ্রামোফোনে একা ঘুরছে রেকর্ড। আর সামনে চুনোট ধুতি পরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। উপরে মুগার পাঞ্জাবী। ধুতির খুঁট লুটোচ্ছে মেঝেয়। তিনি মগ্ন। আতরের গন্ধে ভরে আছে ঘরটায়। আর সামান্য আলো কোথা থেকে যেন গড়িয়ে নেমেছে। অমলার পায়ের নূপুর শরীরে বাজছে, অথচ গানের শব্দে ঢেকে যাচ্ছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলেন সেই পুরুষের কাঁধে। হালকা হাত রাখা। স্পর্শের উত্তাপে ভারি। মানুষটা পেছনে ফিরে তাকাল। চোখ রাখল চোখে। কটা চোখ। লম্বা ঝুলপি। অ্যালবার্ট কাটা চুলের নিচে দীর্ঘ কপাল। সেই কপালে হালকা চন্দনের ফোঁটা। অমলা শুধু স্মিত হাসলেন।

          ভোর রাতে ঘুম ভেঙে যায় নীপার। চৈত্রমাসের রাত, শীত যেন চলে যাওয়ার পরেও অবকাশটুকু রেখে গিয়েছে। স্মৃতি যেন শীতের। নীপা কুণ্ডলী পাকিয়ে চাদরটা টেনে নেয়। দরজার ফাঁক দিয়ে হালকা নীল আলো। চাপা কণ্ঠে একটা গুনগুন ভেসে আসছে। নীপা উঠে বসে, আলতো করে গায়ে জড়িয়ে নেয় চাদর। দরজার ফাঁক দিয়ে চোখ রাখে বাইরে।
          দিদা !
          অমলাসুন্দরী চমকে ওঠেন। খুব সন্তর্পণে ল্যাপটপটা নিয়ে এসেছেন তিনি। কোনমতে বোতাম টিপেছেন অন করার। তারপর বসে রয়েছেন স্থাণুবৎ। এরপর কি করতে হয় তিনি জানেন না। বসে বসে তিনি গানের সুরটা গাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। নিস্তরঙ্গ পুকুরের জলে, ঢিলের টোকায় সামান্য আলোড়ন যেমন, বৃদ্ধা বুকের নিঃশ্বাসে ততটুকুই সুর।
          আমি। আমি, মানে, গানটা..। অমলা চোখ সরিয়ে নেন। তাঁর ফর্সা গাল ল্যাপটপের নীল আলোয় মায়াময়। চোখের কোনে অল্প অশ্রুর উদ্ভাস।
          নীপা তাকিয়েই থাকে। খোলা জানলার বাইরে, নারকেল গাছের ফাঁকে ঘষা ঘষা মেঘ লেগে আছে। নরম, বড় নরম।




লেখক পরিচিতি
শমীক ঘোষ


গল্পকার। 
প্রবন্ধকার। 
পড়াশুনা ঃ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
বোম্বে থাকেন

1 টি মন্তব্য: