বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৩

পাগলী ও বুড়ো বটগাছ

বীরেন মুখার্জী

ভোর হতে না হতেই লোকজন আসতে শুরু করেছে উপজেলা শহরটাতে। পূবের আকাশ রাঙা করে সূর্য উঠলেও জেলা শহরে যাওয়া লোকাল বাসের দেখা মেলেনি এখনো। তবুও বাস যেখানে থামে সেখানে লোকজনের ভিড় চোখে পড়ার মতো। আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পেশাজীবী মানুষ তাদের ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে এখানে। তালতলি গ্রামের কায়েস প্রতিদিনের মতো ভ্যানভর্তি যাত্রী নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই কান ঝাঁঝালো হর্ণ বাজিয়ে লোকাল বাসের প্রথম ট্রিপ হিস হিস শব্দে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে। ততক্ষণে সূর্যটা চারিদিক আলোকিত করে বেশ খানিক ওপরে উঠে এসেছে।


বাস থামার পরপরই কয়েকজন দোকান মালিক ও কর্মচারীরা বাস থেকে নামে। এরা দূর-দূরান্ত থেকে এ বাজারে এসে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য করে থাকে। এরপর বাস স্টপেজে সমবেত জেলা শহরমুখি যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে বাসের ভেতর ঢোকার জন্য। কায়েস জানালা দিয়ে কয়েকটি ব্যাগ ঢুকিয়ে তার ভ্যানে আসা যাত্রীদের জন্য সিট ধরে। কায়েস এটাকে নিজের দায়িত্ব মনে করলেও এ কাজের জন্য সে বকশিশ পেয়ে থাকে। শহরমুখি যাত্রীরা বাসের ভেতর উঠে যাওয়ার পর বাসের হেলপার বাস চাপড়ে যান..যান.. বলে বাস চালানোর সংকেত দিলে বাসটি ধীর গতিতে চলতে শুরু করে। ততক্ষণে বাসের কন্ডাক্টর স্থানীয় স্টার্টারদের হাতে পূর্ব নির্ধারিত রেট মাফিক টাকা গুঁজে দিয়ে দৌড়ে এসে উঠে পড়ে। কায়েস অপলক তাকিয়ে এসব প্রক্রিয়া দেখে। বাসটি সকালের বিশুদ্ধ বাতাসে ধোঁয়ার কু-লী পাকিয়ে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হলে কায়েস বাস স্টপেজের ডান পাশে ছোট একটি মেহগনি গাছে তার উপার্জনের বাহন ভ্যানটি ঠেস দিয়ে রেখে ভ্যানের ওপর বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। রোদেলা সকাল থেকেই আজ গরমের তীব্রতা অনুভব করে কায়েস। নিজের নিঃশ্বাস আরো বেশি উষ্ণ মনে হয় তার কাছে। গরমে ঘামতে শুরু করায় সে কাঁধের গামছা টেনে সারা দেহের ঘাম মোছে কয়েকবার।

হঠাৎ কায়েসের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে বাস স্টপেজের পশ্চিমে এ বাজারের সবচেয়ে পুরোন বটগাছটির দিকে। আগে অবশ্য এ উপজেলা শহরে অনেকগুলো বটগাছ ছিল। সরকারের নির্দেশে থানা থেকে উপজেলা হয়েছে। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য এ বাজারের অনেক গাছ নিধনও করা হয়েছে। এই সুবাদে অনেক সরকারি গাছও কেটে নিয়েছে স্থানীয় সুবিধাভোগী প্রভাবশালীরা। সরকারি এ গাছটি বিক্রির জন্য গোপন টেন্ডারও হয়েছিল বলে কায়েস শুনেছে। বিষয়টি আগেই জানাজানি হওয়ায় সচেতন জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের কারণে সুবিধাবাদীদের সব আয়োজন প- হয়ে গেছে বলেও কায়েস জানতে পেরেছিল। পরিবেশ সন্ত্রাসীদের অশুভ চক্রান্তের থাবা থেকে বেঁচে যাওয়া বুড়ো গাছটির দিকে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সে।

কায়েস ছোটবেলায় তার দাদা রহিজ উদ্দিন এবং প্রতিবেশিদের কাছে এ গাছের অনেক অজানা কাহিনী শুনেছে। তার দাদাও নাকি শৈশবকাল থেকে বটগাছটিকে এমনই দেখে আসছে। কায়েসের দাদা প্রায় দশ বছর আগে মারা গেছে। কায়েসের স্পষ্ট মনে নেই তার দাদা ও প্রতিবেশি বৃদ্ধদের কাছে শোনা বুড়ো এই বটগাছের অতীত ইতিহাস। ভ্যানের ওপর বসে স্বল্প শিক্ষিত কায়েস নিজের অজান্তেই শিশুকালে শোনা বটগাছের কাহিনী মনে করার চেষ্টা করে। স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে আরো ঘেমে ওঠে সে। আট-দশ বছর বয়সে শোনা গল্পের উলে¬খযোগ্য অংশ একসময় তার চোখের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে। তার দাদা রহিজউদ্দিন বটগাছ সম্পর্কে কায়েসকে বলেছিলো--

--চৈতমাসের কাঠফাটা রোদ্দুরি সব গাছের পাতার নড়াচড়া বন্ধ হলিউ বটগাছের পাতা ঠিকই নড়তো। তাই গরমের দিন বাজারের অনেক মানুষই এই গাছতলায় দেহ জুড়োতি আসতো। কিন্তু এই গাছের পাতা যদি কোনদিন নড়াচড়া বন্ধ করে দেয় তখনই এট্টা না এট্টা বিপদ ঘটে। একবার এই গাছের পাতা নড়া একসপ্তা বন্ধ ছিলো। সিবার গিরামের পর গিরাম বসন্ত রোগ ছড়ায়ে হাজার হাজার মানুষ মরে যায়।

কথাগুলো শুনে কায়েসের কিশোর মনে এক ধরনের ভীতি জেগেছিলো। হা করে দাদার বলা কথাগুলো গিলে যাচ্ছিল সে। গ্রামের পর গ্রামের মানুষ মারা যাওয়ার কথায় কায়েসের মনটিও আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। চোখেও জল এসেছিল তার। কায়েস তার দাদার কাছ থেকে শুনেই জেনেছে তখন এ এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা বেশি ছিল। ওই ঘটনায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা গাছটিকে দেবতা জ্ঞানে ভজনা করতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস এই প্রকা- বটগাছে ‘কালী মায়ের’ বাস। কালী মাকে পূজো দিলেই বসন্ত রোগ দূরে চলে যাবে! বিভিন্ন গ্রাম থেকে হিন্দু রমণীরা এসে এখানে পূজো দিতে শুরু করে। তারা বট গাছের মাটি ছুঁই ছুঁই শাখায় ইট, কাঠ ইত্যাদির টুকরা দিয়ে ‘ভার’ বেঁধে মানত করে।

মুসলমানেরাও এ ঘটনায় পিছিয়ে থাকে না। তারাও এ গাছের নীচে সমবেত হয়ে নামাজ আদায় করতে থাকে। মিলাদ, সিন্নি দিতে থাকে। এদেরও অন্তরে একই বিশ্বাস বয়সী এ গাছে ‘জ্বিন’ বাস করছে। তারা যদি এই জ্বিনকে সন্তুষ্ট করতে পারে তা হলে মহামারীর হাত থেকে লোকজন রক্ষা পাবে! সকলের উদ্দেশ্য এক হলেও এক শ্রেণীর লোকেরা এ ঘটনাকে পুঁজি করে সরকারি এ গাছটির দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্য ঘোষণা দেয় যে, পীর সাহেবের নির্দেশেই তারা এখানে এসেছে। এ গাছে জ্বিন বাস করে বলে এ গাছে শুধুমাত্র মুসলমানদেরই হক আছে।
কায়েস তার দাদার কাছে জেনেছিল, তখনকার এ ঘটনায় হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ভেঙ্গে এলাকার হিন্দু-মুসলমানরা মারমুখি অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। অবশ্য বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যাবার আগেই বটতলায় এক দরবেশের হঠাৎ উপস্থিতি এলাকার লোকজনকে আশ্বস্ত ও ভীত করে তোলে। ওই দরবেশ সাহেব এলাকার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মাথা তোলা লোকদের ডেকে গাছ তলায় জড়ো করে তাদের নানান উপদেশ দিতে শুরু করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এ গাছে সকলেরই হক আছে। তোমরা এ গাছকে ঘিরে যার যার ধর্ম পালন করতে পারো’। তিনি হুশিয়ারীও উচ্চারণ করেছিলেন এই বলে যে, ‘এ নিয়ে যারা বিবাদে লিপ্ত হবে তাদেরই ক্ষতি হবে।’ অবশেষে সমূহ ক্ষতির আশংকায় কেউ আর এ গাছটিকে নিজেদের বলে দাবি না করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পৃথক ভাবে অর্চনা করতে শুরু করেন।

কায়েসের দাদা রহিজ উদ্দিন আরো বলেছিলেন যে, এ গাছের পাতা প্রায় দিন দশেক নড়াচড়া বন্ধ রেখেছিলো। তখনই আমাদের দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। শেষমেষ কপালে রক্তের তিলক পরে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।
এসব কথা শুনে কায়েস ভাবতো বুড়ো এই বটগাছটি কী সবজান্তা! তখন কায়েস মনে মনে ভেবেছিল বড় হলে এই গাছের কাছে গিয়ে সে তার ভবিষ্যৎ জানবে। দরকার হলে গাছের নুয়ে পড়া শাখায় ‘ভার’ও বাঁধবে। কিন্তু কায়েসের সে সাধ পূরণ হয়নি। বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানা নেওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে তার। ছোটবেলায় দাদা ও প্রতিবেশিদের কাছে শোনা এসব কথা কায়েসের বিশ্বাস হলেও এখন অতটা মনে হয়না। কারণ যুবক কায়েসকে প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তবের সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছে।

কায়েসের লেখাপড়ার প্রতি প্রচ- আগ্রহ ছিল। কিন্তু দরিদ্র সংসারে জন্ম নেওয়ায় তার সে আশা অংকুরেই বিনষ্ট হয়েছে। গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলো সে। পিতা অসুস্থ হওয়ার পর সংসারের দানব চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে দিন মজুরির কাজে নামতে হয়েছিলো তাকে। লেখাপড়ার চেয়ে সংসারের জন্য উপার্জনই তখন ছিল বেশি জরুরি। ছয় সদস্যের সংসারের ঘানি টানতে টানতে তার বাবা আফিল উদ্দিন আজ শীর্ণ-রোগা। এরপর সংসারের হাল ধরে কায়েস বুঝতে পেরেছে যে, বাস্তব বড় নির্মম... কঠিন। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ে কায়েস। তার দু’চোখের কোণে উষ্ণ জল জমা হয়। গামছা দিয়ে চোখ মোছে কায়েস।

--এই ভ্যান তালতলি যাবে? মিহিন নারী কণ্ঠের ডাকে স্থিরতা ফিরে পায় কায়েস। তাড়াতাড়ি ভ্যান থেকে নেমে যথাসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে জানতে চায়-
--কনে যাবেন আপা?
--তালতলি মুনশী বাড়ি চেনো?
--জ্বি আপা। ওঠেন। উঠে বসেন।
--ভাড়া কতো সেটা তো বললে না?
--জনপ্রতি দশ টাকা। তবে বাচ্চা একজন হলি আর ভাড়া দিয়া লাগে না। আপা আপনার তো দুইডা বাচ্চা। ঠিক আছে আমি আপনার কাছে ভাড়া চাবো না। আমার বাড়িও ওই গিরামে। আপনার যা মনে হয় দিবেন।
কায়েসের ব্যবহারে মুগ্ধ যাত্রীরা কায়েসের ভ্যানে উঠে বসলে সে অনতিদূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। কণ্ঠ যথাসম্ভব ছোট করে গাইতে শুরু করে লালনের বিখ্যাত গান ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর সেথায় এক পড়শি বসত করে তুমি একদিন ও না দেখিলে তারে....’

দুই.
কায়েস প্রায়ই ভাবে সে ওই দীর্ঘকায় বটগাছের কাছে গিয়ে তার একান্ত প্রার্থনা জানাবে। ভবিষ্যৎ জানতে চাইবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনা। বাড়িতে অসুস্থ স্বজনদের অনাহারি মুখের ছায়াচিত্র তার চোখে ভেসে উঠলে কোনো দিকে মন সরে না কায়েসের। তার একান্ত ভাবনাগুলো সংসার নামক জলন্ত অগ্নিকু-লীর ভেতর চাপা পড়ে যায়।

প্রতিদিনের মতো যাত্রী নিয়ে কায়েস একদিন সকালে বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখতে পায় বটগাছের নিচে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে কি যেন দেখছে। ভিড় দেখে কৌতুহলী হয় সে। তারপর যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়ার টাকা নিয়ে তা ঘামে ভেজা জামার পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে জনতার কাতারে এসে দাঁড়ায়। কায়েস দেখতে পায় বটগাছের শেকড় পাকিয়ে খুপড়ির মতো জায়গাটায় বসে একজন পাগলী আপন মনে ধূলোবালি নিয়ে খেলায় মেতে আছে। আর পাগলীর ওই কা- দেখতেই এত ভিড়। পাগলীর উসখো-খুসকো চেহারা। মাথার চুলে ময়লা জমতে জমতে জট পাকিয়ে গেছে। কত আর বয়স হবে? কায়েসের মনে হয় ২০-২২। কায়েস পাগলীর বয়স অনুমান করার চেষ্টা করে আর মনে মনে ভাবে কেন মানুষ পাগল হয়। এর আগেও এই উপজেলা সদরের বাজারে অনেক পাগল-পাগলীকে দেখেছে কায়েস। তাদের বয়স বেশি, চেহারাও বিদঘুটে। দেখলে ভয় জাগে মনে। কিন্ত আজকের এই পাগলীকে দেখে কায়েসের কি যেন হয়। এত ভালো চেহারার অল্প বয়সী একটি মেয়ে কি কারণে পাগল হতে পারে কায়েস ভেবে পায় না। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ার পর তারও মাথার মধ্যে কেমন যেন হতো। মাঝে মাঝে সে চিন্তা করতে পারতো না। মাথার মধ্যে ফাঁকা মনে হতো। আচ্ছা পাগল হলে কি মাথার মধ্যে ফাঁকা ফাঁকা লাগে? নিজেকেই প্রশ্ন করে কায়েস।

তিন.
এরপর থেকে কায়েস উপজেলায় এলেই পাগলীকে দেখতে যায়। এটা ওটা কিনে দেয়। শুধু কায়েসই নয় পাগলীকে দেখতে আসা অনেকেই পাগলীকে খাবার কিনে দেয়। পাগলীটি সারাবেলা বাজারের বিভিন্ন খাবারের দোকান ঘুরে বেড়ায়। তবে কারো সঙ্গে কথা বলে না। কেউ কিছু দিলে নেয় কিন্তু কারো কাছে কিছু চায় না। বাজার ঘুরে যা পায় তাই নিয়ে সন্ধ্যার আগেই বটগাছের নিচে তার আশ্রয়ে ফিরে আসে। ওখানে রাখা একটি মাটির হাড়িতে সব কিছু ঢেলে দিয়ে মিথ্যে মিথ্যে রান্নার কাজ সেরে তাই দিয়ে খেয়ে নেয়। মেয়েটির মনে হয় রান্না করার খুব শখ! কায়েস ভাবে। বটগাছ নিয়ে কিংবদন্তি এলাকার সকলেই জানে যে কারণে ওই পাগলীটিকে কেউ কিছু বলতে সাহসী হয় না। তবে পাগলীর ছেঁড়া পোশাকের ভেতর দিয়ে দেহের বিভিন্ন অনাবৃত অংশ দেখা যাওয়ায় স্কুলের ছেলেরা তাকে দেখতে গিয়ে অনেক সময় খারাপ খারাপ কথা বলে। ঢিলও ছোঁড়ে। তবু তাদের কিছু বলেনা ওই পাগলীটি। এক সময় ছেলেদের অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় এদের হাত থেকে পাগলীকে বাঁচানোর জন্য বাজারের কর্তাব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন। কায়েস মাঝে মধ্যে পাগলীর যায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতি অনুমান করার চেষ্টা করে। পাগলদের কষ্ট কেমন হয় কায়েস তা জানে না। কেন মানুষ পাগল হয় সেটাও জানে না সে। সে নিজেও কেন এমনটি করে তাও বুঝে ওঠে না।

চার.
পাগলী বাজারে আসার সাত-আট মাস পর কায়েস প্রচ- জ্বরে পড়ে। সংসার চালাতে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ে। স্থানীয় ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েও কিছুতেই কিছু হয় না। অবশেষে গ্রামবাসির কথামতো কায়েসের জ্বর নিবারণের জন্য অলৌকিক ওই বটগাছের কাছে মানত করা হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে কায়েস। এভাবে মাস খানিক অতিবাহিত হওয়ার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে কায়েস।
কায়েস সুস্থ হয়ে ওঠার পর মানতের দিনেই ঘটনাটি টের পায় এলাকাবাসি। কায়েসসহ অন্যান্যরা মানত শোধ করতে বটগাছটির কাছে গিয়ে দেখতে পায় গাছের পাতা বিবর্ণ রং ধারণ করেছে। গাছের অতীত কথা ভেবে অজানা আশংকায় আতংকিত হয়ে ওঠে আগতদের মন। আগতরা গাছটির কাছে গিয়ে দেখতে পায় গাছের গোড়ায় শত শত লোক পাগলীটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে কী যেন দেখছে। কায়েস মানত দেবার কথা ভুলে যায়। তারপর ভিড় ঠেলে আরো সামনে এগিয়ে যায়। পাগলীর দিকে তাকিয়ে কায়েসের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। পাগলী একটি সদ্য প্রসূত বাচ্চা কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে গভীর মমতায়। আর এই দৃশ্য দেখতেই মানুষ জড়ো হয়েছে। তাকে ঘিরে যে হাজারো মানুষের জটলা সেদিকে তার একটুও খেয়াল নেই। অনেকে মজাদার কথা বলছে। সদ্য প্রসূত ওই শিশুটির পিতা কে তা নিয়েও চলছে নানা কিসিমের গল্প, হাসি-তামাশা। ভাবছে কায়েসও। কায়েসের ভাবনার কোনও কূল নেই। কায়েস ভাবে মানুষ এমনও হয়! এই কি মানুষের রুচি? কায়েস অসুস্থ অবস্থায় পাগলীর দেহের পরিবর্তনের কথা জেনেছিলো তাকে দেখতে আসা অন্য ভ্যান চালকদের কাছে। আজ সে নিজ চোখে দেখছে এই সমাজের মানুষের বিকৃত রুচিবোধের প্রমাণ। এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে সময় গড়িয়ে যায়। কায়েস এক সময় তার অসুস্থতার সময় মানত করা দ্রব্যাদি গাছের নদীটির পাশে একটি নুয়ে পড়া শাখার পাশে রেখে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে বাড়ি ফিরে আসে।

পাঁচ.
পরদিন সকালে অন্যদিনের মতো যাত্রী নিয়ে কায়েস বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখতে পায় আজও গাছের শেকড়ের ঘরে আশ্রয় নেয়া পাগলীকে ঘিরে জনতার ভিড়। কায়েসও এগিয়ে গিয়ে দেখে পুরনো কাপড়ের ভেতর থেকে বাচ্চাটির নিথর দেহ বের করে তাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে পাগলীটি। অযতœ-অবহেলার কারণে সদ্য ভূমিষ্ট শিশুটি যে মারা গেছে তা উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারে। শিশুটি মারা যাওয়ায় উপস্থিত দর্শনার্থীদের হৃদয়ে বেদনা সঞ্চার হয়। অনেকে অনেক কথা বলতে থাকে। মানুষের কোনো সহানুভূতি পাগলীটির মনে রেখাপাত করে কিনা কায়েস জানার চেষ্টা করে না। হঠাৎ পাগলীটি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। যন্ত্রণাবিদ্ধ রক্তাক্ত শরীর নিয়ে সে কোনো রকম উঠে দাঁড়ায়। তারপর ময়লা কাপড়ের ভেতর থেকে ফুটফুটে নিথর দেহের বাচ্চাটিকে টেনে বের করে। রক্তমাখা কাপড়-চোপড় এদিক-ওদিক ছুঁড়ে ফেলে। উপস্থিত লোকেরা পাগলীটির আচরণে ভয় পেয়ে খানিক পিছিয়ে আসে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাগলীটি তার দাঁত দিয়ে বাচ্চাটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে তা ছিটিয়ে দিতে শুরু করলে লোকজন ভয়ে পালাতে শুরু করে।
কায়েসও অন্যান্যদের মতো দূরে সরে আসে। কায়েস দূর থেকেই দেখতে পায় এই সমাজের মানুষের প্রতি প্রচ- এক ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে মারা যাওয়া শিশুটির ক্ষতবিক্ষত দেহ নিয়ে পাগলীটি উল্ল¬াসে মেতে উঠেছে। এভাবে কিছুক্ষণ মাতনের পর গলা ছেড়ে কাঁদতে থাকে পাগলীটি। এক সময় শান্ত হয়ে যায় সবকিছু। তবে এ ঘটনার পরদিন থেকে পাগলীটিকে এলাকার কোথায়ও আর দেখা যায়নি।


লেখক পরিচিতি
বীরেন মুখার্জী 

কর্মস্থল: সম্পাদকীয় বিভাগ, দৈনিক যায়যায়দিন, ঢাকা।
জন্ম: ৪ মার্চ ১৯৬৯ দরিশলই, শালিখা, মাগুরা।
প্রকাশিত বই: কবিতা প্রণয়ের চিহ্নপর্ব (২০০৯) প্লানচেট ভোর কিংবা মাতাল বাতাস (২০১০) নৈঃশব্দ্যের ঘ্রাণ (২০১২) পালকের ঐশ্বর্য (২০১৩) জলের কারুকাজ (২০১৩)
প্রবন্ধ কবির অন্তর্লোক ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১২) কবিতার গহনকথা (প্রকাশিতব্য)
গল্পগ্রন্থ মস্তকহীন ঘোরসওয়ার (প্রকাশিতব্য)
সম্পাদনা দৃষ্টি (ছোটকাগজ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন