শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

এলিস মুনরোর গল্প : চোখ

অনুবাদ : অনন্ত মাহফুজ

আমার বয়স যখন পাঁচ তখন হঠাৎ আমার মা-বাবা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিল। আমার মায়ের মতে আমিই নাকি তাকে সবসময় চেয়ে আসছিলাম। আমি জানি না মা এই ধারণা কোথা থেকে পেয়েছে। মা বিষয়টি বেশ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলত। তার এইসব কথার বিপরীতে আমার বলার মতো কিছু থাকত না।

তারপর এক বছর পর আরেকটা মেয়ে। আবার মায়ের একইরকম গল্প, তবে আগের তুলনায় অতটা জোরালো নয়।

আমার মনে হয় আমার পরের ভাই জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমার মা তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম-প্রসঙ্গে যা বলেছে তা থেকে আামর ভাবনাও আলাদা ছিল না। এবং ভাইয়ের আগমনের ঠিক আগ পর্যন্ত আমাদের বাড়িজুড়ে ভরে থাকত মা, মায়ের পায়ের শব্দ ও গলার স্বর এবং তার পাউডার মাখানো অলুক্ষণে গন্ধ তার অনুপস্থিতিতেও সারা বাড়িতে বিরাজমান থাকত।

কেন অলুক্ষণে বললাম? আমি কিন্তু ভয় পেতাম না। এমনও নয় যে, বিভিন্ন বিষয়ে আমি কী ভাবব তা মা ঠিক করে দিত। সব বিষয়ে মা-ই প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব। এই কর্তৃত্ব ছোটোভাইয়ের জন্মের বিষয়েই নয়, 'রেড রিভার' সিরিয়াল আমার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং এই খাবারটি আমার পছন্দ করা উচিত_ এসব বিষয়েওর মা'র কর্তৃত্ব। আমার বিছানার পিছনে ঝুলতে থাকার ছবিটির ব্যাখ্যায়ও তার কর্তৃত্ব। ছবিতে যিশু একটি ছোটো শিশুকে তার দিকে আসার জন্য নির্যাতন করছেন। নির্যাতন বলতে সেই যুগে অন্য কিছু বোঝাত কিন্তু বিষয়টি এখন আমাদের মনোযোগের বিষয় নয়। ছবিতে এক কোনায় অর্ধ লোকায়িত একটি ছোট্ট মেয়েকে দেখিয়ে মা বলত মেয়েটি যিশুর কাছে আসতে চায় কিন্তু খুব লাজুক বলে আসতে পারে না। মা বলত আমিই ঐ মেয়ে। তবে আমার মনে হয়, যদিও মা বলে না দিলে ছবির মেয়েটিকে আমি খুঁজে বের করতে পারতাম না, মা যা বলেছে তা ঠিক নয়।

যে বিষয়টি আমার কাছে সত্যিই বেদনাদায়ক মনে হতো তা হলো এলিস ইন ওন্ডারল্যান্ডের এলিসের খরগোশের গুহায় আটকে পড়া। কিন্তু মা এতে খুব মজা পেত বলে আমার হাসি পেত।

ভাইয়ের জন্ম আমার জন্য কীরকম আশীর্বাদ এবং কতটা উদারভাবে আমি তাকে গ্রহণ করতে পারব_ এই বিষয়ে আমার ভাবনা থেকে মায়ের ভাবনার মধ্যে কতটা পার্থক্য হতে পারে তাই নিয়ে ভাবছিলাম। আমার মনে হয় এই সমস্ত বিষয় আমাকে শ্যাডির জন্য প্রস্তুত করছিল। শ্যাডি আমাদের জন্য কাজ করতে এসেছিল। মা তার সন্তানদের নিয়ে তৈরি হওয়া জগতের মধ্যে গুটিয়ে থাকত। তার কাছে থেকেও আমি কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বুঝতে পারতাম না। আমি যথেষ্ট বুঝতাম এসব নিয়ে কারও সাথে কথা বলা যাবে না।

শ্যাডির ব্যাপারে সবচেয়ে অস্বাভাবিক হলো সে সেলিব্রেটি। অবশ্য তার খ্যাতিমান হওয়া আমাদের বাড়িতে প্রভাব ফেলেনি। আমাদের শহরে একটি রেডিও স্টেশন আছে। এই রেডিও স্টেশনে সে গিটার বাজায় এবং সূচনা-সঙ্গীত গায়। সূচনা-সঙ্গীতটি তার নিজের সুর করা।

হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, কেমন আছেন সবাই...

এবং আধা ঘণ্টা পর এরকমভাবে শেষ হতো, সবাইকে বিদায়, বিদায়, বিদায়...। শুরু এবং শেষের মাঝখানে সে শ্রোতাদের অনুরোধের এবং নিজের বাছাই করা গান পরিবেশন করত। শহরের অধিকতর পরিশীলিত লোকেরা তার গান নিয়ে হাসাহাসি করত। শুধু গান নয়, কানাডার সবচেয়ে ছোটো এই রেডিও স্টেশন নিয়েও হাসি-তামাশা করত। তারা টরোন্টোর রেডিও স্টেশন শুনত। স্টেশনটি ঐ সময়ের পরিচিত জনপ্রিয় গান পরিবেশন করত_ থ্রি লিটল এন্ড আ মোম্মা ফিসি টু_ এবং জিম হান্টার উত্তেজনাপূর্ণ কণ্ঠে যুদ্ধের সংবাদ পাঠ করতেন। কিন্তু খামারের মানুষগুলো স্থানীয় এই স্টেশন এবং শ্যাডি যে ধরনের গান গায় সেই ধরেনর গান পছন্দ করত। তার কণ্ঠ সাবলীল এবং বেদনাভারাক্রান্ত। সে একাকিত্ব এবং বেদনার গান গাইত।

বিশাল খোঁয়াড়ের উঁচু দেয়ালে হেলান দিয়ে

নিঃশেষিত গোধূলির পথে চেয়ে থাকে আমার হারিয়ে যাওয়া_

দেশের আমাদের এই অংশে অধিকাংশ খামার প্রায় দেড় শত বছর আগে স্থাপিত এবং এক খামার থেকে আরেক খামারের দূরত্ব মাত্র কয়েকটি মাঠ। কৃষকেরা যেসব গান পছন্দ করত তা মূলত নিঃসঙ্গ রাখাল, দূর কোনো ভূমির মায়া আর হতাশা এবং তিক্ত অপরাধ যা অপরাধীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং তখন অপরাধীর মুখে ছিল তার মা অথবা ঈশ্বরের নাম।

এই গানই শ্যাডি বেদনার্ত পুরুষালি কণ্ঠে গাইত। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সে ছিল পুরো উদ্যমী ও আত্মবিশ্বাসী। সে কথা বলতে খুব বেশি পছন্দ করত, বিশেষ করে নিজের সম্পর্কে। আমাকে ছাড়া সাধারণত তার সাথে কথা বলার কেউ ছিল না। তার এবং মা'র কাজ দু'জনকে প্রায় সারাক্ষণই আলাদা করে রাখত এবং আমার মনে হতো তারা দুজনে কথা বলা উপভোগ করত না। আগেই বলেছি আমার মা খুব রাশভারি ধরনের। আমাকে শিখানোর আগে সে স্কুলে পড়াত। মা সম্ভবত শ্যাডিকে পছন্দ করত যদি সে মাকে সাহায্য করতে পারত, যে তুমি তো জান ধরনের কথা বলে তাকে শিক্ষা দিতে আসবে না। কিন্তু শ্যাডির মধ্যে সেরকম কিছু দেখানোর প্রবণতা ছিল না।

ডিনারের পর, যা আসলে ছিল দুপুরের খাবার, আমি আর শ্যাডি রান্না ঘরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তাম। মা ঈষৎ নিদ্রার জন্য সময় নিত। ভাগ্য ভালো হলে তার ছেলে-মেয়েরাও ঘুমিয়ে যেত। ঘুম থেকে ওঠার পর মা ভিন্ন আরেকটা জামা পরত যেন সে অবসর বিকেল পার করবে। তার আশা সাধারণত পূরণ হতো না কারণ তাকে বাচ্চাদের ডায়াপার পরিবর্তন করতে হয়। বাচ্চারা গবগব করে বুকের দুধ খাবার সময় আরও কিছু কাজ তাকে করতে হতো_ যা আমি দেখেও না দেখার ভান করতাম।

গোলাঘরে যাবার আগে বাবাও রোয়াকের ওপর পনেরো মিনিটের মতো ঘুমিয়ে নিত। তার মুখের ওপর পড়ে থাকত স্যাটারডি ইভিনিং পোস্ট। শ্যাডি স্টোভে পানি গরম করে এবং আমার সঙ্গে থালা-বাটি পরিষ্কার করে। কাজ শেষ হলে সে ঘর মোছে আর আমি শুকাই। এই কাজটি করা হয় আমার আবিষ্কার করা পদ্ধতিতে, ঘর মোছার ন্যাকড়ার ওপর স্কেটিং-এর মতো করে ঘুরে বেড়ানো। তারপর আমরা মাছি ধরার চটচটে হলুদ রঙের কয়েল পরিবর্তন করি। সকালে নাস্তার সময় টানানো কয়েলটা ইতোমধ্যে কালো কালো মাছিতে ভারি হয়ে যায় এবং নতুন টানানো কয়েল রাতের খাবারের সময়ের আগেই মৃত কালো মাছিতে ভরে যাবে। এইসব কাজ করতে করতে শ্যাডি তার জীবনের কথা বলত। তখন কার বয়স কেমন হবে তা সহজে বুঝতে পারতাম না। তখন আমার মনে হতো মানুষগুলো হয় শিশু না হয় বয়স্ক। শ্যাডিকে আমার বয়স্ক মনে হতো। হতে পারে তার বয়স ষোলো, আঠোরো বা বিশ। বয়স যা-ই হোক না কেন, সে বহুবার বলেছে বিয়ে করার তাড়া নেই তার। প্রতি সপ্তাহান্তে সে নাচে যেত এবং যেত একাই। সে বলত যে সে একা যায় এবং নিজের জন্য যায়।

নাচঘর সম্পর্কেও সে আমাকে বলেছে। শহরের প্রধান রাস্তায় একমাত্র নাচঘর যেখানে শীতকালে বরফের প্যাঁচানো পাটাতন বানানো হয়। দশ সেন্ট দিয়ে ভিতরে ঢুকে যার সঙ্গে ইচ্ছামতো নাচা যায়। শ্যাডি নিজেরটা নিজেই পরিশোধ করতে পছন্দ করত। অন্য কেউ তার অর্থ পরিশোধ করে এটা তার পছন্দ ছিল না। তারপরও একটি ছেলে অনেক সময় তার অর্থ পরিশোধ করে দিত। ছেলেটি তাকে বলত, তুমি আমার সঙ্গে নাচবে? শ্যাডি সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করত, তুমি নাচতে পার? তারপর ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলত, পারি। না পারলে কেন আসি এখানে? অধিকাংশ সময় দেখা যেত ছেলেটির কাছে নাচ মানে ঘর্মাক্ত মাংসল দুই হাতে শ্যাডির কোমর চেপে ধরে শুধু পায়ে পা মেলানো। কখনো কখনো শ্যাডির ধৈর্যচ্যুতি ঘটত এবং তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে একাই নাচত। আসলে একা নাচাই তার পছন্দ ছিল। যে নাচের জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে, সেইটুকু নাচার পর শ্যাডি যখন শেষ করত তখন অনেক সময় টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তি তাকে দুইজনের নাচের টাকা দিতে বলত। শ্যাডি তখন বলত যে ছেলেটি তার সঙ্গে যতটুকু নেচেছে তার জন্য যথেষ্ট পরিশোধ করা হয়েছে। একা একা নাচার জন্য লোকগুলো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করত।

আরেকটা নাচঘর শহরের বাইরে, হাইওয়ের পাশে। গেটে টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়। এখানে একটা নাচ বলে কিছু নেই। নাচ চলে সারারাত। জায়গাটার নাম রয়াল-টি। সেখানেও শ্যাডি তার মতো করে টাকা পরিশাধ করে। ওখানে অপেক্ষাকৃত ভালো নাচিয়ে পাওয়া যায়। ওখানে শহরের লোকজন বেশি যায়, অন্যদিকে শহরের নাচের ঘরে আসে গ্রামের লোকজন। শহরের লোকগুলো নাচে ভালো কিন্তু সবসময় ঠিক মনের মতো হয় না। শ্যাডি তাদের বোঝাতে চায় সে এখানে আসে নিজে পয়সা দিয়ে নাচার জন্য। কখনো কখনো তারা ভালো নাচে এবং শ্যাডি তাদের সাথে নাচ উপভোগ করে। তাদের শেষ নাচ নাচা হলে শ্যাডি বাড়ির দিকে দৌড় দেয়।

শ্যাডি বলে সে অন্য মেয়েদের মতো নয়। সে আসলে যা বোঝাতে চায় তা হলো ধরা খাওয়া। ধরা। শ্যাডি যখন এসব বলে তখন আমার মনে হয় তার ভিতর থেকে জালের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে খারাপ কোনো প্রাণী বের হয়ে আসছে যার নিকট থেকে তার মুক্তি নেই। শ্যাডি আমার ভিতর সেরকম কোনো উপলব্ধি দেখেছিল বলে সে আমাকে উপদেশ দিত ভয় না পেতে।

পৃথিবীতে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই, শুধু নিজের দিকে তাকাও।

***

তুমি আর শ্যাডি খুব বেশি কথা বল, মা বলত।

আমি জানতাম কিছু একটা আসছে যার দিকে আমার দৃষ্টি রাখা উচিত কিন্তু আমি জানতাম না সেটি আসলে কী। তুমি তাকে পছন্দ কর, তাই না? আমি বলতাম হ্যাঁ। অবশ্যই করবে। আমিও তাকে পছন্দ করি। বাচ্চাদের কারণে এখন আর তোমার সঙ্গে আমার বেশি সময় কাটানো হয় না। কিন্তু আমরা তো তাদের ভালোবাসি, বাসি না? আমি দ্রুত উত্তর দেই, ভালোবাসি। মা জানতে চায়, সত্যিই? আমি সত্যি বলার আগ পর্যন্ত মা আমাকে থামায় না। সুতরাং আমাকে বলতে হয়।

***

মা কিছু একটা প্রচ-ভাবে আশা করেছিল। ভালো বন্ধু? সেইসব মহিলা যারা ব্রিজ খেলতে পারে? নিশ্চিত করে বলা যায় না। সে কি আমি? তার জন্য আমার সময় করা হয়ে উঠত না। আমার মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার মতো কিছু একটা বেড়ে উঠছিল। আমি অথবা কেউই জানতাম না কেন। শহরের সানডে স্কুলে আমার কোনো বন্ধু হয়ে উঠেনি। পরিবর্তে আমি শ্যাডির বন্দনা করতাম। আমি বাবার কাছে মাকে বলতে শুনেছি, মেয়েটা শ্যাডির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

বাবা বলত শ্যাডি তাদের জন্য দৈববর। এ দিয়ে কী বোঝায়? এ কথা বলার সময় বাবাকে উৎফুল্ল দেখাত। হতে পারে বাবা আসলে কারও পক্ষ নিতে চাচ্ছে না। মা বলেছিল, আমার মনে হয় মেয়ের জন্য আমাদের একটা ফুটপাতের মতো জায়গা তৈরি করা দরকার। সেখানে সে রোলার স্কেটিং করতে পারবে এবং এতে তার বন্ধু তৈরি হবে। রোলার স্কেটিং করার ইচ্ছা আমার ছিল। আমি জানি না কেন সেই সময় আমি তা স্বীকার করতাম না।

তারপর স্কুল শুরু হলে মা আরও ভালো কিছুর কথা বলল। এমন কিছু যা আমার জন্য ভালো এবং শ্যাডির জন্যও। আমার শোনার ইচ্ছা হয়নি।

শ্যাডি তার কিছু গান আমাকে শিখাচ্ছিল। আমি জানতাম গান আমি ভালো পারি না। তবু আমি গান বন্ধ করতে চাইনি।

বাবার তেমন কিছু বলার ছিল না। শাস্তির অংশটুকু ছাড়া আমি ছিলাম সম্পূর্ণ মায়ের বিষয়। বাবা ছেলের বড়ো হওয়ার অপেক্ষায় ছিল এবং ছেলে হবে তার দেখাশোনার বিষয়। ছেলেরা বড় হয়ে এতটা জটিল হয় না। আমিও নিশ্চিত আমার ভাই বড় হয়ে আমার মতো হবে না। সে হবে এক কথায় খুব ভালো।

***

স্কুল শুরু হয়ে গেছে। স্কুল শুরু হলো একটু আগেভাগেই, পাতাগুলো লাল এবং হলুদ হবার আগে। আমি স্কুল কোট পরি না। মা চার্চে যাবার জন্য কোট এবং মাথা প্রায় পুরোটা ঢেকে টারবান পরে।

আমরা যেখানে যেতে চাচ্ছি মা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে। মা খুব একটা গাড়ি চালায় না। মা গাড়ি চালায় সোজা এবং বাবার চেয়ে বেশি অনিশ্চিতভাবে।

অবশেষে আমরা পৌঁছালাম, মার কণ্ঠে স্বস্তি। সে আমার হাত স্পর্শ করল কিন্তু আমি এমন ভাব করলাম যেন আমি কিছু দেখিনি। মা হাত সরিয়ে নিল।

বাড়িটাতে গাড়ি রাখার কোনো স্থান নেই। এমনকি বাড়তি কোনো জায়গাও নেই। মা দরজায় টোকা দেবার আগে দরজা খুলে গেল। মা আমাকে উৎসাজব্যঞ্জক কিছু একটা বলার চেষ্টা করল_ তুমি যতটা ভাবছ তারচেয়ে অনেক কম সময় লাগবে_ এই জাতীয় কিছু_ কিন্তু শেষ করল না।

দরজা খুলে গেল কারও বের হয়ে আসার জন্য, আমাদের ভিতরে যাবার জন্য নয়। মহিলাদের মধ্যে একজন ঘাড় ঘুরিয়ে কর্কষ গলায় বলল, সে ঐ মহিলা এবং ঐ ছোটো মেয়েটার জন্য কাজ করেছিল।

তারপর একজন কেতাদুরস্ত মহিলা বের হয়ে আসল এব মাকে তার কোট খুলতে সাহায্য করল। মা আমার কোট খুলে দিল এবং জানাল যে আমি শ্যাডির খুব ভক্ত হয়ে পড়েছি। মা আশা করছে আমাকে এখানে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়েছে।

ওহ ছোট্ট সোনামনি, মহিলা বলল এবং মা আমাকে হালকা খোঁচা দিল যাতে আমি তাকে হ্যালো বলি।

মহিলা বলল, শ্যাডি শিশুদের খুব ভালোবাসত। সত্যি খুব ভালোবাসত।

আমি লক্ষ্য করলাম সেখানে আরও দুটো শিশু আছে, ছেলে শিশু। আমি তাদের স্কুল থেকে চিনি। একজন আমার সঙ্গে প্রথম গ্রেডে এবং অন্যজন একটু বড়। তারা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিচ্ছে। ছোটটা পুরো একটা কুকি মুখে দিয়ে জোকারের মতো দাঁড়িয়ে এবং বড়োটা মুখ ভেংচে আছে। তারা অবশ্যই আমাকে অপছন্দ করে। ছেলেরা স্কুলের বাইরে কোথাও সহপাঠী মেয়েদের দেখলে উপেক্ষা করবে অথবা এখন যেরকম মুখ ভেংচাচ্ছে ঠিক সেই কাজটিই করে। এখন আমিই যদি এদের কারও কাছে যাই আমার নিজের মধ্যে জড়তা কাজ করবে এবং বুঝতে পারব না আমার কী করা উচিত। আশেপাশে বড়োরা থাকলে অবশ্যই অন্যরকম হতো। ছেলে দুটো মোটামুটি নীরবেই দাঁড়িয়ে আছে বরং আমারই কিছুটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেউ তাদের দুজনকে টান দিয়ে রান্নাঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। এরপর আমার মায়ের অধিকতর মোলায়েম এবং মহিলাসুলভ ডাকে আমার সম্বিৎ ফিরে এল। স্কুলে মা যখন আমাকে ডাকে তখন অনেকেই তার কণ্ঠ নকল করে।

মা যে মহিলার সঙ্গে কথা বলছে, সম্ভবত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সে আমাদের একটি কক্ষের একটি অংশে আমাদের নিয়ে গেল। সেখানে আগে থেকে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা বসে ছিল। তারা এমনভাবে বসে আছে যেন জানেই না কেন বসে আছে। মা তাদের দিকে ঝুঁকে অত্যন্ত ভদ্র ও নরম গলায় আমাকে দেখিয়ে বলল, শ্যাডিকে খুব পছন্দ করে। আমি জানি যে আমাকে কিছু বলতে বলা হবে কিন্তু আমি কিছু বলার আগে ওখানে বসে থাকা মহিলা লম্বা করে হাই তুলল। সে আমাদের কারও দিকে তাকাল না। তার হাই তোলার শব্দকে মনে হলো কামড় দেওয়ার জন্য তেড়ে আসা কোনো প্রাণীর শব্দ। পাশের বয়স্ক লোকটি তাকে থামতে বললেন।

যে মহিলা আমাদের নিয়ে গেল সে বলল, এর মা বিষয়টিকে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছেন। মেয়েটি জানে না সে কী করেছে। সে কণ্ঠ নিচু করে বলল, এখন, এখন। এই ছোটো মেয়েকে ভয় দেখাতে হবে আপনার।

এই ছোটো মেয়েকে ভয় দেখাতে হবে, বয়স্ক লোকটি বিড়বিড় করে বলল।

আমাদেরকে নিয়ে আসা মহিলা আমাকে বলল, তুমি ভয় পেয়ো না।

শ্যাডি আশেপাশে কোথাও আছে। আমি তাকে দেখতে চাই না। মা আমাকে আসলে বলেনি যে আমি তাকে দেখতে পারব কিন্তু সে আমাকে এও বলেনি যে আমি তাকে দেখতে পারব না।

রয়াল-টি নাচঘর থেকে হেঁটে ফেরার সময় শ্যাডি খুন হয়। নাচঘরের পার্কিং-এর কাছে একটি গাড়ি তাকে আঘাত করে। সাধারণত প্রতিবার যেভাবে ফিরে সেভাবে ঐ পথে তাড়তাড়ি ফিরছিল সে। সে ভাবেইনি যে গাড়িগুলো তাকে দেখতে পাবে না অথবা সে ভেবেছিল ওদের যে অধিকার আছে সে অধিকার তারও আছে অথবা গাড়িটি হঠাৎ গতি পরিবর্তন করেছিল কিংবা এটাও হতে পারে যে সে আসলে যে জায়গা দিয়ে হাঁটার কথা সে জায়গা দিয়ে হাঁটেনি। গাড়িটি তাকে পিছন থেকে ধাক্কা দেয়। নাচের ঘরে কিছুটা মদ্যপান হয়ে থাকতে পারে, যদিও সেখানে মদ কেনার অনুমতি নেই। নাচ শেষে সবসমই চারদিকে একটা হৈহুল্লোড় এবং চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। শ্যাডি এমন তাড়াহুড়ো করে বের হচ্ছিল যেন সবার দায়িত্ব ছিল তাকে জায়গা করে দেওয়া।

ছেলেবন্ধু ছাড়া একা একটি মেয়ে হেঁটে নাচে যেত,... আমাদেরকে এই ঘরে নিয়ে আসা মহিলাটি মা'র দিকে তাকিয়ে বলল। তাকে এখনো বন্ধুসুলভ মনে হচ্ছে। মা বিড়বিড় করে সহানুভূতিসূচক কিছু একটা বলল।

বন্ধুসুলভ মহিলা বলল এ নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। বাড়িতে এই বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। মা বলেছিল শ্যাডি এবং তাকে আঘাত করা গাড়ির বিষয়ে আমাদের কিছু করা দরকার। বাবা বলেছে এই নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। শহরের কোনো বিষয়ে আমাদের নাক গলানো উচিৎ না। আমি শ্যাডিকে নিয়ে কিছুই ভাবছি না, তার মৃত্যু তো দূরের কথা। আমি যখন বুঝতে পারলাম আমরা শ্যাডিদের বাড়িতে যাচ্ছি আমি আসতে চাইনি। কিন্তু পারিনি কারণ শ্যাডির প্রতি যথেষ্ট অবমাননা প্রদর্শন করা ছাড়া এখানে না আসার মতো কারণ আমার ছিল না।

বৃদ্ধ মহিলাটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে আমার মনে হলো আমাদের এখন বাড়ি ফেরা উচিৎ। আমার কখনো স্বীকার করা হবে না যে আমি মৃতদেহ দেখে অতিরিক্তরকমের ভয় পাই। কিন্তু মা মহিলার সঙ্গে শ্যাডিকে দেখার বিষয়ে কথা বলছে।

মা বলল যে আমাদের অবশ্যই শ্যাডিকে দেখা উচিত।

মৃত শ্যাডি।

এবার মা আমার হাত ধরে অন্যদিকে নিয়ে যেতে শুরু করল।

ঘরে একটি কফিন রাখা। আমি ভেবেছিলাম অন্য কিছু। কারণ অভিজ্ঞতা না থাকায় কফিন কেমন দেখায় সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। আমরা যে বস্তুটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি সেটিকে ফুল রাখার শেলফ বা বন্ধ পিয়ানোর মতো দেখাচ্ছে।

সম্ভবত কফিন ঘিরে রাখা মানুষগুলো কফিনের সত্যিকার আকার, গড়ন আর উদ্দেশ্য আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু এই মানুষগুলোই এখন ধীরে আমাদের জন্য জায়গা করে দিল এবং মা অন্যরকম নরম গলায় আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এখন আসো। তার ভদ্রতাকে আমার কাছে কপটতা মনে হলো।

মা আমার মুখের দিকে তাকাল। আমি নিশ্চিত জানি মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে এইমাত্র ঘটে যাওয়া কাজটি বন্ধ করার জন্য_ আমি যেন কুঁচকে চোখ বন্ধ করে না রাখি। তারপর মা আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল অন্যদিকে কিন্তু শক্ত করে হাত ধরে রাখল। মা আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলে আমি চোখের পাতা নিচের দিকে নামালাম তবে একেবারে বন্ধ করলাম না যাতে আমাকে কেউ ধাক্কা বা ঠেলে সরিয়ে দিতে না পারে। ফুলের গোছা আর কাঠের ঔজ্জ্বল্য আবছা দেখতে পেলাম।

এরপর শোনা গেল মা নাকিকান্না শুরু করে দিয়েছে। মা আমাকে ছেড়ে দিয়ে পার্স খুলল। আমি মা'র হাত থেকে মুক্ত বোধ করলাম। মা কাঁদছে। তার চোখের জল এবং নাকের শব্দ আমাকে আলগা করে দিতে সাহায্য করেছে।

আমি সোজা কফিনের দিকে তাকালাম এবং শ্যাডিকে দেখতে পেলাম।

দুর্ঘটনা থেকে তার গলা এবং মুখ রক্ষা পেয়েছে কিন্তু একসঙ্গে সবটুকু দেখতে পেলাম না। আমার মনে হলো যতটা খারাপ অবস্থার কথা ভেবে আমি ভয় পেয়েছিলাম সেরকম অবস্থা দেখা গেল না। আমি দ্রুত চোখ বন্ধ করলাম কিন্তু আবার না তাকিয়ে পারলাম না। প্রথমে আমার চোখ গেল তার গলার নিচে রাখা হলুদ রঙের কোশনের দিকে। কোশনটি তার গলা আর গাল ঢেকে রেখেছে। তার এক পাশের গাল সহজে দেখা যাচ্ছে। আমি একটু একটু দেখার চেষ্টা করলাম যাতে ভয় না পাই। তারপর এক পাশ থেকে যতটা দেখা সম্ভব আমি দেখলাম। আমার সামনে শুয়ে আছে শ্যাডি। কিছু একটা নড়ে উঠল। আমি দেখলাম আমার পাশের দিকের তার চোখের পাতা নড়ে উঠল। চোখের পাতা খোলা না, আধা খোলাও না। খুব সামান্য পরিমাণে তোলা; আপনি যদি শ্যাডি হন অথবা আপনি যদি শ্যাডির ভিতরে থাকতে পারতেন তাহলে অবশ্যই ঐটুকু পলক ফেলার মধ্য দিয়ে দেখতে পেতেন। হতে পারে কেবলমাত্র আলো এবং অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্যটুকু বোঝার জন্য।

আমি অবাক বা আতঙ্কিত হলাম না। আমি এই দৃশ্য দেখার জন্য কাউকে ডাকলাম না কারণ এটা তাদের জন্য নয়, শুধু আমার জন্য।

মা আবার আমার হাত ধরল এবং জানাল যে আমরা যাবার জন্য প্রস্তুত। আমার আর শ্যাডির মাঝে আরও কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময় হলো এবং আমার মনে হলো মুহূর্ত পার হবার আগেই আমরা নিজেদেরকে ঘরের বাইরে আবিষ্কার করলাম।

মা বলল, তোমার জন্য ভালো হয়েছে। তারপর হাত চেপে ধরে আবার বলল, তাহলে এখন ঐ অধ্যায় শেষ হলো। মা থামল এবং শ্যাডিদের বাড়ির দিকে আসতে থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলল। তারপর আমরা গাড়িতে উঠলাম এবং গাড়ি বাড়ির দিকে চলতে শুরু করল। আমার মনে হলো মা আমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছে অথবা চাচ্ছে আমি যেন তাকে কিছু বলি। কিন্তু আমি কথা বললাম না।

এরকম আর কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি আমার জীবনে ঘটল না এবং শ্যাডি অনেকটা দ্রুত আমার মন থেকে মুছে গেল। সত্যি বলতে কি, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যখন সে বলেছিল এখন থেকে তাকে বাড়িতে বাবা-মাকে দেখাশোনা করার জন্য থাকতে হবে এবং আমাদের বাড়িতে আর কাজ করতে পারবে না তখনই তার গুরুত্ব আমার কাছে অনেক কমে গিয়েছিল।

তারপর মা একদিন দেখেছিল সে একটি পনির তৈরির কারখানায় কাজ করছে। ঐ দিন আমি যা দেখেছিলাম তা অনেক দিন পর্যন্ত আমার কাছে প্রশ্নাতীত ছিল। অনেক অনেক দিন পর, আমি যখন কোনো অস্বাভাবিক জিনিসে বিশ্বাস করি না, তখনো আমার মনে হয়েছিল ঐরকম ঘটনা ঘটতে পারে। আমি খুব সহজে বিশ্বাস করেছিলাম যেমন আমি বিশ্বাস করি একদা আমার এক পাটি দাঁত ছিল এখন আর নাই। সেই দিনের আগ পর্যন্ত, আমার সেই কিশোরী বয়সের একদিন আমি বিশ্বাস করতাম আমার ভিতর অনুজ্জ্বলরকমের একটি গর্ত আছে যা এখন আর আমি বিশ্বাস করি না।

সৌজন্য :  দৈনিক সংবাদ

1 টি মন্তব্য:

  1. এলিস মুনরো কে নিয়ে সবে পড়া শুরু করেছি। ভাল লাগলো।

    উত্তরমুছুন