মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০১৪

বিনোদ ঘোষালের গল্প খেলনা বাটি

গতকাল রাত্রে অফিস থেকে ফেরার সময় মোবাইলটাকে কিনেছিল অতনু। সেটা নিয়ে আজ সকাল সাড়ে আটটার সময় ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে মহানন্দে খেলছে ভুট্টি। অতনুর আড়াই বছরের মেয়ে। ভাল নাম বিতনুকা চক্রবর্তি। মাস কয়েক আগে লোকাল একটা ইংলিশ মিডিয়ম স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। প্লে গ্রুপ। এই স্কুলটায় এক বছর পড়াতে পারলে নাকি এর পরে ভাল স্কুলে টপ করে চান্স হয়ে যাবে। এই খবরটা এনেছিল কথা, অতনুর বিয়ে করা বউ। পয়ত্রিশ বছর বয়েস। অতনুর থেকে পাঁচ বছর দুই মাসের ছোট। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি হাইট, ফর্সা, মোটামুটি সন্দরী বলা যায়।
ইংলিশে অনার্স গ্র্যাজুয়েট। মাসটার্স করতে করতে বিয়ে হয়ে গেছিল। ভেবেছিল বিয়ের পর এম এ টা কমপ্লিট করবে, হয়নি। ইচ্ছেটাই মরে গেছিল। আসলে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে সম্মন্ধ করে বিয়ে হলে কী হবে, বউ ভাতের পর দিন থেকেই অতনু এত কেয়ার নিত, এত ভালবাসত কথাকে যে একমাত্র ভালবাসা পাওয়া ছাড়া আর কোনও ইচ্ছেই কাজ করত না তখন। অতনু চক্রবর্তি একজন হ্যান্ডসাম লুকিং এমবি এ হাজব্যাণ্ড। বিয়ের সময় যে কোম্পানিতে চাকরি করত সেখানে স্যালারি খুব একটা মোটা ছিল না ঠিকই তবে অতনু যেমন হার্ড ওয়ার্কিং আর সিনসিয়র তাতে একদিন যে ও সাইন করবেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল কথা। তাই ইনকমপ্লিট এম এ-র দুঃখ ভুলে বিয়ের আনন্দটাকেই কমপ্লিট সংসারি করে তোলার জন্য কোমর বেঁধে ফিল্ডে নেমেছিল কথা। অতনু হেসে বলত তুমি শুধু হোম মিনিস্ট্রিটা সামলাও বাকি সব আমি সামলে নেব। কথা খিল খিল করে হেসে উঠে অতনুর চওড়া বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলত, পাগল একটা।

এই ভাবে হেসে ভেসে ডানলপের ভাড়া বাড়িতে বছর দেড়েক। ঠিকঠাক সেটল না হয়ে ইস্যু নেওয়ার কোনও মানেই হয় না। অতনু রোজ সকাল মধ্যে অফিস বেরিয়ে যেত, সেই সেক্টর ফাইভ। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত্তির দশটা-এগারোটা। সারাদিন কথা বাড়িতে একা। একটানা টিভি দেখতে কাঁহাতক ভাল লাগে? সবসময় বই-ম্যাগাজিন পড়তেও মন বসে না। দু’জনের সংসারে কাজ বলতেও তেমন কিছু নেই। ঘর মোছা বাসন মাজার মেয়েটা কাচাকুচিও করে দিয়ে যায়। একটা রান্নার লোকও রেখে দিয়েছিল অতনু। সুতরাং একা একা অলস দুপুর, অলস বিকেল, অলস সন্ধ্যে....এর মধ্যে আচমকা কখনও অতনুর ফোন আসত, -কী করছ?

কিছুই না। শুয়েছিলাম।

কী ভাবে?

এই আবার অসভ্যতা হচ্ছে!

ও দিক থেকে অতনুর হো হো হাসি। তার পরেই হয়তো বলে উঠত , এই এখন রাখছি। বস ডাকছেন। একটু পরে আবার ফোন করছি তোমাকে।

সত্যি সত্যিই পরের ফোনটার জন্য অপেক্ষা করত কথা। কিন্তু সেই ফোনটা আর আসত না। প্রথম দিকে মন খারাপ করত, অভিমান জেগে উঠত মনে। কিন্তু শেষে সবই অভ্যাস হয়ে যাওয়া। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে কোনওমতে ডিনার সেরেই আবার নিজের ল্যাপি নিয়ে বসে যেত অতনু। এম আই এস রিপোর্ট, বাজেট আরও কী সব কঠিন কঠিন অফিসের কাজ, ভারি ভারি কথা। বিছানায় শুয়ে থাকত কথা। তার পাশেই বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে অতনু। ওর কোলে সেই ল্যাপটপের অদ্ভুত নীলচে আলোয় ভরে থাকত গোটা চুপ-ঘরটা। গভীর মনযোগ দিয়ে কত রাত পর্যন্ত কাজ করেই যেত ও।

এবার শুয়ে পড় প্লিজ। আর রাত জেগো না।

আর একটু খানি, প্লিজ।

একেকসময় ভীষন বিরক্ত হয়ে কি বোর্ডে ঝপাং ঝপাং আঙুল চালিয়ে সব এলোমেলো করে দিত কথা। অতনু সামান্য রেগে উঠত। আবার কখনও অনুরোধ করে প্লিজ আর হাফ এন্ড আওয়ার প্রমিস বলেই কথাকে চুমু খেত। সেই চুমুতে শুধুই লালা থাকত, ভালোবাসা থাকত না। ঠোঁট মুছে অন্য দিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ত কথা। ঘুমিয়েও পড়ত একসময়।

আমার আর ভালো লাগছে না অতনু, প্লিজ ..বড্ড লোনলি ফিল করি। হাতের মুঠোয় দামি ব্ল্যাকবেরি মোবাইল সেটটা চেপে ধরে একদিন বলে ফেলেছিল কথা। মোবাইলটাকে গত মাসেই কথার জন্মদিনে কিনে দিয়েছিল অতনু। অজস্র ফিচার। শিখতে বেশ কিছুদিন সময় নিয়েছিল। সারাদিন খুটখাট, ভুলে থাকা। যেই জানা হয়ে গেল অমনি পুরনো হতে শুরু করল জিনিসটা। বই পড়ার ধৈর্য নষ্ট হয়ে গেছিল আগেই। তারপর সিডি প্লেয়ার, আইপড, মোবাইলের নিত্যনতুন সেট, জিপিয়ার এস, এই স্কিম, ওই পাওয়ার রিচার্জ.....একটা সময়ের পর সব ব্যাস্ততা হঠাৎ একা হয়ে যায়।

অতনু কোথাও একটু আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

খেপেছ নাকি! এই ইয়ার এন্ডিং এর সময় মরবার টাইম নেই আমার।

আমার কিন্তু মরার টাইম আছে। কথাটা ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল কথা।

কী যা তা বলছ! আচ্ছা বেশ এই কোয়ার্তারটা একটু সামলে নিই, এবার বরং পূজোর সময়...

আমার কিন্তু এখন বেড়াতে ইচ্ছে করছে অতনু।

তাহলে ইচ্ছেটাকে একটু বোঝাও প্লিজ। ঠিক বুঝবে। আচ্ছা নেযট মানথে যদি টার্গেট এচিভ করতে পারি তবে তোমাকে একটা দারুন গিফট দেব।

কথা চুপ।

কী গিফট এক্সপেক্ট করো বলো তো।

পারলে একটু সময় দিও।


পরের মাসের মাঝামাঝি একতা পিংক কালারের ল্যাপটপ গিফট করেছিল অতনু। ওর প্রমোশন হয়েছিল। স্যালারি হাইক। আই শ্যাল গো টু দ্য টপ, দ্য টপ, দ্য টপ। আরও ব্যাস্ততা। শুধু মানসিক নয়, দু'জনের শারীরিক যোগাযোগটাও কমে যাচ্ছিল দিনে দিনে। কথাকে জোর করে ল্যাপটপ কী করে অপারেট করতে হয় শিখিয়ে দিয়েছিল অতনু। কথা বুঝতে পারত এই সব গ্যাজেট দিয়ে আসলে অতনু নিজে রেহাই পেতে চায়। বেশ তাই হোক। ফেসবুক, স্কাইপি, দেশ বিদেশের হাজার খানেক বন্ধু কিছুদিনের মধ্যেই কথার প্রোফাইলে। কেউ শাহরুখ, কেউ টম ক্রুজ, কারোও প্রোফাইলে আবার শুধুই দুট চোখ কিংবা ঠোঁট। বিচিত্র এক জগৎ! এরা কি সবাই কথার মতই একা? রাত্রে একেকদিন এমনও হত কথা আর অতনু একই খাটের দুপ্রান্তে মুখোমুখি বসে যে যার ল্যাপটপে। অতনু কঠিন কোনও প্রোজেক্টের কাজে আর কথা চ্যাটিং এ। নিঃশব্দ ঘরটায় শুধু কিবোর্ডের খুটখাট শব্দ। আঙ্গুলে আঙ্গুলে কথা হচ্ছে বহু দূরের কোনও বন্ধুর সঙ্গে আর সব থেকে কাছের মানুষটা বিছানার ওপ্রান্তে।

আচ্ছা অতনু আমরা কেমন হয়ে গেলাম তাই না?

কেমন হয়ে গেলাম? স্ক্রিনে চোখ রেখেই পালটা প্রশ্ন ছিল অতনুর।

তুমি নিজে কিছু ফিল কর না? আমরা কত দিন হয়ে গেল কেউ কারোর সঙ্গে থাকি না। শুধু এই..এইগুলোই রয়েছে আমাদের লাইফে। বলতে বলতে নিজের ল্যাপিটা দু'হাতে তুলে ধরে বিছানার ওপরেই আছড়ে ফেলেছিল কথা। একটু চমকে উঠেছিল অতনু। হোয়াট হ্যাপেন্ড? এত একসাইটেড হয়ে পড়ছ কেন?

আমাকে সত্যি সত্যি আর একটুও ভালবাস না তুমি, আমি জানি। এত তাড়াতাড়ি পুরনো হয়ে গেলাম এই গ্যাজেটগুলোর মতো! গলা বুজে এসেছিল কথার।

অতনু কয়েক মুহূর্ত থমকে শুনেছিল। তারপর মুচকি হেসে বলেছিল, বুঝছি। বলে নিজের ল্যাপটপটা অফ করে সাইডে রেখে দিয়ে এগিয়ে এসেছিল কথার কাছে। অনেক অ-নে-ক দিন পর নিজের শরীরে টেনে নিয়েছিল কথার শরীর। মিশিয়ে দিয়েছিল নিজেকে কোনও প্রিকশন ছাড়াই। অবাক হয়েছিল কথা। তীব্র আশ্লেষে অতনুকে প্রাণপন হাতরাতে হাতরাতেও বারবার মনে আসছিল অতনু কি সত্যিই আনন্দ পাচ্ছে? না কি স্রেফ কথার জন্যই...?

তুমি কিন্তু প্রোটেকশন ..

জানি। আজ থাক। চিবুক বেয়ে ঘামের ফোঁটা চুইয়ে পড়ছিল কথার ঠোঁটের ওপর।

কেন..ও? ডুবে যেতে যেতে বলেছিল কথা। বারবার কেঁপে উঠছিল দেহভূমি দীর্ঘ খরার পর আকস্মিক বর্ষনে।

এমনই...তোমার আসলে এবার একটা জ্যান্ত খেলনা দরকার। একদম জ্যান্ত।

শুনে আবার কেঁপে উঠেছিল কথা। অন্যরকম, একেবারে অন্যরকম ভাবে।


ন মাস তেরো দিনের মাথায় সিজার করে ভুট্টি এল। অতনু ততদিনে নতুন অফিসে জয়েন করেছে। মোটা স্যালারি, কোম্পানির দেওয়া স্যান্ট্রো।

তুমি এবার খুশি, কথা?

হুঁ, তুমি?

হ্যাঁ। তুমি কতটা খুশি?

অনে-ক।

অতনু নিশ্চিন্ত।

এবার প্লিজ যদি পার একটু....

কী?

নাহ কিছু না। কথা চুপ করে যায়।

এক বছর – দু বছর- আড়াই বছর…একই কক্ষপথে ঘুরে যায় পৃথিবী। কখনও তার ইচ্ছে করে না নিজের বৃত্তটুকু ছেড়ে মহাকাশের অন্য কোথাও কয়েক আলোকবর্ষ দূরে গিয়ে কিছু দিন একটু অন্যরকম কাটিয়ে আসতে। কথা, অতনুও একই বৃত্তে। শুধু ওজন স্তরে ফুটো হওয়ার মতোই, বনভূমি ধংস হওয়ার মতোই, জলের স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ার মতোই ওদের জীবনেও অনেক চেঞ্জ অনেক পরিবর্তন। অতনু চক্রবর্তি এমএনসি-র প্রোজেক্ট ম্যানেজার। চোখের তলায় পাতলা কোলবালিশ। এ্যালকোহলিক ভুঁড়ি। কলকাতায় থাকা হয় খুব কম। বেশিরভাগ সময়ই দিল্লি, পুনা, মাদ্রাজ, মুম্বাই ব্যাংকক। রাজারহাটের নতুন কেনা ফ্ল্যাটটা তিন হাজার স্কোয়ারফুট। ইলেভেন্থ ফ্লোর। ব্যালকনি থেকে নিচের দিকে তাকালে সব পিঁপড়ের মতো মনে হয়। একটা আরাম লাগে মনে। অতনুর অফিস ট্যুর-এর প্রত্যেকটায় সেক্রেটারি শিরিন থাকে। ভারি ভাল এই বছর তিরিশের মেয়েটি। সেপারেটেড। কোনও কিছুতেই 'না' নেই। অতনুর তিনটে মোবাইল, দুটো ল্যাপটপ, একটা স্কোডা, ছটা রিস্টওয়াচ, তার মধ্যে একটা রোলেক্স একটা র‌্যাডো। ফ্ল্যাটে দেওয়াল জোড়া প্লাজমা, সেনট্রালাইজড এসি, ডবল ডোর ফ্রিজ..সওব আছে। বাড়িতে থাকলে কথার সঙ্গে দেখা হয়। কথাও হয় টুকটাক প্রয়োজন মতো। কোনও ঝগড়া নেই, অভিমান নেই। একেবারে কনকনে ঠান্ডা ফ্যামিলি। এখন কথারও ব্যাস্ততা বেড়েছে অনেক। সপ্তাহে দু-তিনদিন কিটি পার্টি, বিউটি পার্লার, দুটো মোবাইল। টুজি-থ্রিজি। বাড়িতে থাকলে ল্যাপটপে ইনটারনেটে গোটা দুনিয়া। সহস্র ছায়া-বন্ধু। মাঝেমধ্যেই শরীরে জেগে ওঠা আগুনকে সঙ্গ দিতে "নিঃসঙ্গ জীবনে বন্ধু চাই'-এ একবার অন লাইন রেজিস্ট্রেশনও করেছিল কথা। ভীষন ভীষন ইচ্ছে করেছিল নষ্ট মেয়ে হয়ে যেতে। কিন্তু নষ্ট হতে গেলেও সেই জ্যান্ত পুরুষ মানুষেরই দয়া-সাহায্য লাগবে মনে হতে তারপর আর এগোয়নি। ভুট্টিরও খেলনা বেড়েছে অনেক। টয় ট্রেন থেকে জেট প্লেন, টেডি বিয়র, বার্বি-অনেক অনেক কিছু। তবু আড়াই বছরের অপদার্থ মেয়েটা এত খেলনা পেয়েও সারাদিনএকা ভুলে থাকতে পারে না। খেলতে খেলতে হঠাৎ হঠাৎ মাম্মাহ..বাব্বাহ বলে কাঁদতে শুরু করে দেয়। ঘুমের মধ্যেও ফুঁপিয়ে ওঠে একেক রাত্রে।

চ্যাটের থেকেও স্কাইপি বেশি প্রিয় কথার। অন লাইন হলেই কখনও পুনা থেকে আয়ান ভার্গব বলে ওঠেন- হ্যাল্লো সুইট হার্ট, আয়াম ডাইং।

কেন? স্লিভলেস নাইটি পড়ে ল্যাপের সামনে ঝুঁকে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে কথা।

তোমার জন্য। সাতচল্লিশ বছরের ভার্গব উত্তর দেয় ওদিক থেকে।

ওহ রিয়্যলি?

ইয়েস। প্লিজ আমাকে একবার কিস কর।

ইউ নটি।

প্লিজ একবারের জন্য কাছে এস।

ওক্কে। কথা মুখ বাড়িয়ে আনে ল্যাপির স্ক্রিনের সামনে। ওদিক থেকেও ভার্গবের মুখ এগিয়ে আসে। লেন্সের সামনে আসতেই মুখটার প্রপোরশন ভেঙে গিয়ে বিকৃত হয়ে ওঠে। ঠিক যেন একটা কার্টুন। মোটা গোঁফ, ড্যালা ড্যালা চোখ, বিকট পুরু কালচে ঠোঁট দুটোয় চুমু খাওয়ার ভঙ্গি। কথার হেডফোনে মু..আআহ করে শব্দ হল। চুমু খেল ভার্গব। তারপরেই ওকে ছেড়ে দিল কথা। হায়দ্রাবাদের বিকাশ চৌধুরীর কলটা রিসিভ করল।

হাই কথা।

হ্যালো বিকাশ। আফটার লং টাইম। কী খবর?

পরে বলছি। আগে তুমি কেমন আছ বল?

ফাইন। এবার বল তুমি কেমন?

ভালো না।

হোয়াই?

কতদিন তোমাকে আদর করি না।

হি হি হি।

আচ্ছা তুমি একটা কথা বলবে?

কী কথা?

তুমি যে বলো ইয়োর হাবি ইজ অলটাইম বিজি ম্যান। দেন হাঊ ডু ইউ ম্যানেজ?

মিন?

মিন ইউ লিভ এ টোটালি ভেজ লাইফ।

ধ্যেৎ কে বলল ভেজ লাইফ কাটাই?

দেন ইউ ট্রাই আনাদার গাইজ। অ্যাম আই রাইট?

নো স্যার। আই হেট অল দ্য জ্যান্ত পুরুষ মানুষ। দে অল আর সেম।

দেন? স্ক্রিনে বিকাশের মুখটাও ভ্যাবলা হয়ে যায়।

আই গট আ বেটার অলটারনেটিভ। হি হি হি। নাউ নো মোর কোশ্চেন প্লি…জ।

ওকে। এবার তোমাকে একবার দেখতে চাই।

দেখছ তো।

এভাবে নয়, ওই ভাবে।

বুঝলাম না।

ওহ প্লিজ ডোণ্ট প্রিটেন্ড। তুমি ভালোই জানো আমি কী ভাবে দেখতে চাই। কাম অন ইটস এ গেম।

আই নো বিকাশ ইটস এ গেম। এন্ড দ্য গেম বিগিনস বলে হাসির ফোয়ারা তুলে নাইটির প্রথম বোতামে হাত দেয় কথা। তখনই মাম্মাহ আমা গালি কই? ভুট্টি এসে দাঁড়িয়েছে। নীল ফ্রক, মাথায় ঝুঁটি। ওর খেলনা গাড়িটা খুঁজে পাচ্ছে না।

দুটো বেডরুম। একটায় অতনু একা শোয়। পাশেরটায় ভুট্টিকে নিয়ে কথা। দু'জনের ঘরে আলাদা ওয়ারড্রোব। এক জন আরেকজনের ঘরে যাওয়ার খুব একটা দরকার পরে না। অতনু নেক্সট মান্থে স্টেটসে যাবে কোম্পনাইর ডেলিগেট হয়ে। তারই পড়োজ়েক্ট ওয়ার্ক চলছে এখন। প্রচুর চাপ। সকালে ড্রয়িংরুমে বসে ল্যাপিতে ওয়ার্কিং করছিল ও। ভুট্টি কথার বেডরুমের খাটের ওপর বসে নিজের যাবতীয় খেলনা সাজিয়ে খেলায় ব্যাস্ত। গতকাল এনে দেওয়া মোবাইলটা খুব পছন্দ হয়েছে ভুট্টির। সুইচ টিপলেই লাল আলো জ্বলে ওঠে আর সেই সঙ্গে হ্যালো হু আর ইউ হ্যালো হু আর ইউ। শুনেই প্রতিবার খিল খিল করে হেসে উঠছে ভুট্টি। কথা একটু আগেই ভুট্টির সঙ্গে খেলছিল। তারপর হঠাৎ একটা ফোন আসতেই মোবাইলটা কানে ধরে খুব দ্রুত ব্যালকনিতে চলে গেল। ব্যালকনির দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। কার ফোন? প্রশ্নটা ক্ষীনভাবে একবার অতনুর মাথায় এসে পরক্ষনেই মিলিয়ে গেল। কাজ করতে করতে অতনুর হঠাৎ খেয়াল হল সিগারেটের প্যাকেটটা বেডরুমে রয়েছে। ল্যাপিটা টি টেবিলে নামিয়ে রেখে উঠল অতনু। নিজের বেডরুমে ঢুকতে গিয়ে আলগোছে একবার কথার ঘরের দিকে তাকাতেই দেখল ভুট্টি খাটের ওপর নেই। কোথায় গেল? কথার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ও। ভুট্টি কখন যেন বিছানা ছেড়ে মাটিতে নেমে এসেছে। মেঝেতে থেবড়ে বসে কথার বেখেয়ালে খুলে রেখে যাওয়া ওয়ারড্রোব থেকে শাড়ি সালোয়ার সব টান দিয়ে নামিয়েছে। আর ওর হাতে…ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো শিউরে উঠল অতনু। ভুট্টির হাতে মায়ের ওয়ারড্রোব ঘেঁটে বার করা একটা নকল রবারের পুরুষাঙ্গ, সেক্সটয় শপে যাকে ডিল্ডো বলে। জিনিসটাকে দু'হাতে চেপে ধরে ছোট ছোট দাঁতগুলো দিয়ে প্রাণপনে কামড়াচ্ছে ভুট্টি। লালায় মাখামাখি। বাবাকে দেখতে পেয়ে হি হি করে হেসে উঠল। ছিটকে ঘরে ঢুকে মেয়ের দিকে হাত বাড়াতে যেতেই নিজের হাতের ওপর ছায়া পড়ল অতনুর। দরজার সামনে কথা এসে দাঁড়িয়েছে। বুঝতে পারল, কিন্তু পিছন ফিরে তাকাতে পারল না।



লেখক পরিচিতি
বিনোদ ঘোষাল

জন্ম- ১৯৭৬ সাল, কোন্নগরের হুগলি জেলায়
প্রথম প্রকাশিত গল্প- ২০০৩ সাল দেশ পত্রিকায়
পেশা- সাংবাদিকতা

প্রকাশিত বই- ডানাওলা মানুষ(গল্পগ্রন্থ)- পরশপাথর
মাঝরাস্তায় কয়েকজন(উপন্যাস)- পত্রভারতী
যেদিন ভেসে গেছে(উপন্যাস)-দীপ প্রক|শন
বৃষ্টি পড়ার আগে(উপন্যাস)- আনন্দ
নতুন গল্প ২৫(গল্পগ্রন্থ)- অভিযান পাবলিশার্স

পুরস্কার- সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার ২০১১
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার-২০১৪
অসম প্রকাশন পরিষদ বিশেষ সম্মান-২০১৩
শখ- ছবি দেখা, নাটক ও সিনেমা দেখা, বেড়াতে যাওয়া।

1 টি মন্তব্য:

  1. "শুধু ওজন স্তরে ফুটো হওয়ার মতোই, বনভূমি ধ্বংস হওয়ার মতোই..." বেশ লেখা। একাকিত্ব এক গভীর অসুখের নাম। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যার আক্রমন...

    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন