মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০১৪

শ্রাবণী দাশগুপ্তর গল্প নিবের্দ

পাশেই তেলেভাজা না লুচি-তরকারির তেলমাখা খবরের কাগজের পৃষ্ঠাগুলো ফড়্‌ফড়্‌ করে উড়ছে। কেউ খেয়ে ওই বেঞ্চিতেই ফেলে গেছে। মানুষটার ডান চোখের নীচে একটা বড় সাইজের ভোঁভোঁ মাছি ঘুরছে অনেকক্ষণ থেকে। তাঁর খেয়াল হয়না। এগারোটা সতেরোর লোক্যালটা থেকে নেমে মানু দৌড়ে উঠে আসে ফুটব্রিজের গোড়ায়। প্ল্যাটফর্মের শেষমাথায় ফুটব্রিজ। কানাভাঙা বেঞ্চিটাতে অনেকদিন পর আজ নিশানাথ চৌধুরী। সিঁটিয়ে বসে থাকলেও আজ যেন খানিকটা বুদ্ধদেবের ভঙ্গি। মন্দের ভালো। মানু লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে। ভাবাবিষ্ট রামকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য, গান্ধী, যিশু এমনকি ট্র্যাফিক পুলিশের অবস্থানে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখেছে সে... ঘন্টার পর ঘন্টা। আপাতত কাছে গিয়ে হাতদুটো আরামদায়ক অবস্থায় এনে দেয়। খুব আস্তে বলে, জ্যাঠাবাবু, হাত ব্যথা করেনা?


এটা কোনো জংশন নয়, ছোট সাবস্টেশন। গুটিকয়েক লোক্যাল থামে। প্ল্যাটফর্ম পার হয়ে স্টেশনচত্বর ছাড়িয়ে মোড় নিলেই একদিকে বাজার। অন্য রাস্তাটা সামান্য ঘুরে গিয়ে মনোকেন্দ্রের পেছনদিকের জমিতে। গাছপালা, আনাজের বাগান। মালী আছে যদিও, তেমন যত্ন নেই। যারা খানিকটা সেরে উঠেছে, তাদের কাজ দেওয়া হয়। অক্যুপেশন-থেরাপি। ভুলিয়ে রাখা? অচেনা কেউ এলে ছুটে আসে দেখতে। মস্তিষ্ক হাতড়ে হারিয়ে যাওয়া কাছের মানুষ খোঁজে। উত্তেজিত হয়ে পড়ে হয়তো। পায়ে হেঁটে সরু পথটার শেষ। দু’মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল, খিড়কির দরজার মত ছোট দরজা। ওটা খোলা থাকে। মানু শুরুর দিকে এখানে কাজ করত। এলেবেলে সব কাজ। বাগানে জলসেচ, বাজার এনে দেওয়া। তখন সে ছোট না হলেও কিশোর। এখন আস্ত জোয়ানমদ্দ, শক্তপোক্ত মানিক্য দাস। ট্রেনে করে কোলকাতায় যায়। একটা বড় আবাসনে সিক্যুরিটি গার্ডের চাকরি করে। মোটামুটি মাইনে। শিফট ন’টা থেকে ন’টা। মনোকেন্দ্রেও এমন কাজ পেতে পারত, ছুটোছুটি করতে হতনা। কতৃর্পক্ষ ওকে চেয়েছিল। মানু কাজটা নেয়নি। ওরকম পাহারাদারিতে মন সায় দেয়নি। অনেকদিন ওদের সাথে, কাছ থেকে দেখেছে বলেই হয়তো। নিশানাথের মাথা সাদাকালো কদমফুল। হাসপাতালের ঢলঢলে কামিজের বাইরে শ্বেতীছোপঅলা কাঠ শরীর। আঙুলগুলো গাছের শুকিয়ে যাওয়া শেকড়ের হিজিবিজি। স্থির ঘোলা চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। কিন্তু কৃতজ্ঞতা, অভিনয়, বিদ্রূপ, জ্বালা, কোনো ছায়া নেই। মানু কাছে বসে বলে, “আজ কে বসিয়ে দিয়ে গেছে এখানে? বাড়ির লোক এসেছে নাকি? ওদেরকে ইচ্ছে করে না দেখতে?” তোবড়ান মুখে শুকনো মামড়ি ওঠা সাদা ঠোঁট বিড়বিড় করে অভিব্যক্তিশূন্যতায় বলতে থাকে, “ইচ্ছে করেনা দেখতে... ইচ্ছে করেনা দেখতে...।” বলেই যায়। মানু মন দিয়ে অনুভব খোঁজার চেষ্টা করে। পায়না। হাসপাতালের ভেতরের ঘরবারান্দায় উঁচু সিলিঙের বাইরে, আমপাতা নারকেলপাতারা দুলে দুলে স্কাইলাইটে ছায়া ফেলে। যখন ওখানে কাজ করেছে, দেখত। বাড়িটায় মোটা সাদা দেওয়াল, ভারী দরজা। খুব মজবুত করে বানিয়েছিলেন মালিক। ছোট ছোট ভাগ করা কেবিন রোগীদের।


নিশানাথের তোবড়ান মুখে দাড়ি খোঁচাখোঁচা। অবশ্য চিটচিটে চামসে গন্ধটা একটু কম। জামাটা মোটামুটি পরিষ্কার। হয়ত জোর জবরদস্তি করে স্নান করানো হয়েছে। প্রথমদিকটায় অস্বাভাবিক অস্থির থাকতেন। মানু দূর থেকে দেখত, ভয় পেলেও, দুঃখও হত। মানুষটিকে বন্ধ করে রেখে চিকিৎসা হত। ইদানিং ঠিক পাথরের স্কাল্‌প্‌চার। মানুর আবছা মনে হয় মানুষটা পবিত্র শুদ্ধসত্তা... ঋষি ঋষি। কেন তার এমন মনে হয়, নিজেও বোঝেনা ঠিক। কেন্দ্রের কোনো কর্মী নিশানাথকে বেঞ্চে বসিয়ে যায় মাঝে মাঝে। নিঃশব্দ একভঙ্গিতে বসে থাকেন। চোখের সামনে দিয়ে ট্রেণের ঝম্‌ঝমে কামরাগুলো বেড়িয়ে যায়। চেনা অচেনা কত, পাইকারেরা ওঠে নামে। এক দৃশ্য রোজ, তবু গাঢ় ছায়া পড়েনা, ছবি আঁকা হয় না। স্টেশনচত্বরে আরো দু’তিনজন ঘোরে ফেরে। চেনা পথটাই বেভুল হয়ে গেছে। হয়ত জটিলতা বিভেদ সব মুছে গেছে তাতে। ঘুম পেলে কুকুরের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। মানুর গভীর করে ভাবতে হয়না। ছুঁতে পারে। ওদের মধ্যে মানুর চেনাও একজন, কিছুদিন মনোকেন্দ্রের আবাসিক ছিল। বাড়ি থেকে টাকাপত্তর পাঠানো বোধহয় বন্ধ। মনোকেন্দ্র আর কতদিন বইবে? প্রতিষ্ঠাতা মালিক ডাক্তারবাবু অনেককাল নিজেই অসুস্থ। আসতে পারেন না। থাকেন ছেলেদের কাছে। কোলকাতায় বিরাট নার্সিংহোম। খরচা অনেক কম হলেও মনোকেন্দ্র পুরোপুরি দাতব্য নয়। রোগী ভর্তি কমে গেছে অনেকদিন। শহর থেকে পাটর্টাইম ডাক্তারেরা আসেন মাসে বারদু’তিন। ওইটুকুই, বাকিটা কর্মীরা সামলায়। নিশানাথের ইতিহাস হাসপাতালের রেকর্ডবুকে লেখা। মানু অল্পস্বল্প শুনেছে। কোন্‌ কলেজের হেড্‌ ছিলেন। পরিবার থেকে নিয়ম করে আসে ব্যাঙ্কড্রাফ্‌ট। কারা টাকা পাঠায় সে তাদের দেখেনি কোনোদিন। অসুখের নামটা কারো থেকে শুনেছিল, ক্যা-টা-টো-নি-য়া। দাঁত দিয়ে ভেঙে ভেঙে আউড়েছিল মানু। সে দশক্লাস পাশ থার্ড ডিভিশন, বাঙ্‌লা মিডিয়াম। সময় থাকলে কতদিন নিশানাথকে পৌঁছে দিয়ে আসে। বড্ড মায়া। পাড়ার ছেলেরা খ্যাপায়, “মানুদা’র ধম্মবাপ”। মানু হাসে।


প্ল্যাটফর্মের শেষমাথায় খোয়া-ঘাসে মেশা জায়গাটাতে মেয়েটা এসে থাকছে একমাসের বেশি হল। হেগে-মুতে যাচ্ছেতাই করে রাখে। পেট হয়েছে, একটু নজর করলেই বোঝা যায়। বেশির ভাগ সময়ে ঘুমিয়ে থাকে। বগলের ভাঁজে, কখনো মাথার নিচে, নোংরা পুঁটলি। ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো পেলেই পুঁটলিতে গোঁজে। বকবক করে, হাসে, থুতু ছেটায়। মুখের চামড়া দেখলে মনে হয় কালো পেইন্ট করা। ঘ্যাস্‌ঘ্যাস্‌ মাথা-গা চুলকোয়। পরনের চিটে শাড়িব্লাউজ বোধহয় প্রথমদিন যেটা পরেছিল, ওটাই। জঘন্য আঁশটে গন্ধ। আজ জেগে আছে মেয়েটা। আপনমনে খুব হাসছে। কিসের খুশি কে জানে? মানু কাছে গিয়েছিল একদিন। স্টেশন থেকে লুচি তরকারি কিনে ঠোঙাটা দিয়েছিল। গব্‌গব্‌ খেল যতক্ষণ খিদে, তারপর মানুর গালে হঠাৎ চড়। বেশ জোর আছে গায়ে। ব্যথা লেগেছিল। হীহী হাসছিল, যেন “কেমন?” বাকি খাবার ছুঁড়ে কুকুরকে দিয়েছিল। পরক্ষণে ঢিল ছুঁড়তেই কুকুরটা দৌড়। স্টেশনে মানুর কত চেনাশোনা। অনেকেই বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তোর ব্যাপার কিরে? ওর দিকে যাস্‌ কেন? দেখিস্‌ না, চোখে লাইট জ্বলে। পেত্‌নি!” সেও লক্ষ্য করে দেখেছে। চোখ জ্বলে মেয়েটার। দাঁত কিড়্‌মিড়্‌। তার ভয় করেনা। কেমন ভেজা বাতাস বয়ে যায়।


মেয়েটা আসার হপ্তাতিন আগে কোন্‌ একদিন এগারোটা ছত্রিশের ট্রেণ থেকে নেমেছিল মানু। জ্যৈষ্ঠের তাপে ফাটছিল আশপাশ। ফুটব্রিজের ভাঙা সিঁড়ি ধরে নামছিল তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি। ওই সময়ে লোকজন এমনিতেও থাকেনা বেশি। ব্যাপারীরা চলে গেছে বাজার তুলে। উল্টোদিক থেকে একজন গিন্নীগোছের মহিলা উঠে আসছিল। কালো ছাতার নিচে ঘামভেজা কাল্‌চে মুখ। পাতি ফ্রেমের চশমা। কাঁধে ছোট ঝোলা। এদিক ওদিকে তাকাতে গিয়ে জোরে ধাক্কা লেগেছিল। মানু সরে গিয়েছিল, “আঃ সাবধানে মাসি।” মহিলা কাতর চোখে তাকিয়েছিল, “আসলে দেকতে পাইনি বাবু। ঈস্‌, টেরেনটাও বেড়িয়ে গেল! আবার কখন আসে জানো?” মানু তখন ভালো করে দেখেছিল। বুড়ি না, মাঝবয়সী। রঙজ্বলা অপরিষ্কার সুতির কাপড়ে নিম্নবিত্ত ঘরগেরস্থী। তাদেরই মতন। মাঠ কপালে মোটা সিঁথি, বাসী সিঁদুর। মানু অবশ্য ফিট্‌ফাট্‌, বৌ রুবিকেও তেমন রাখে। বলেছিল, “কাউকে কি খুঁজছেন এখেনে?” থর্‌থর্‌ চোখ, নিশ্বাসটুকু ফেলেনি মহিলা। কথার টানে আকুতি, “হ্যাঁ বাবু। আমার মেয়ে। পাগলী মেয়েটা। কোতায় যে চলে গেছে... দেখচ এদিকে? বোধায় মাসেক হল খুঁজে খুঁজে... আমি। এখেনে পাগলদের হাঁসপাতাল আছে শুনে... দামোদর বলল... ঘরে দুটো ছোট ছেলেমেয়ে রেখে এসেচি। বড় ছেলে ত কবেই ভিন্ন।” এত কথা এত বিন্যাস তাকে অচেনা জেনেও! কোথায় নিবাস সেটুকু পর্‍যন্ত মানু জানতে চায়নি। হয়ত মনোকেন্দ্রের খোঁজ দিয়েছে উড়ো কেউ। “এখানে আজকাল রুগি খুব কম আসেগো,” সে বলে ফেলেছিল। মহিলা চুপ করেছিল। মানু বলেছিল, “পরের ফিরার ট্রেণ তো? অনেক দেরি আছে। এখানে বসো না মাসি।”

মহিলা বেঞ্চে বসে ঘাম মুছছিল, কান্নাও। কুন্‌কুন্‌ আওয়াজ। মানু ঠোঙা ভরে লুচি তরকারি এনেছিল। হিন্ডালিয়ামের গ্লাস থেকে ঢক্‌ঢক্‌ জল খেল মহিলা। মাথা নামিয়ে লুচি গিলেছিল গোগ্রাসে। মানু মায়া করে বলেছিল, “আস্তে আস্তে খাও মাসি।“ খোঁপা পেরিয়ে দুঃখী ঘাড়। বাসি ঘাম ও জবজবে তেলে ভেজা গন্ধ। ভরদুপুরে গরম হল্কা লী লী। প্ল্যাটফর্মের মাথায় এসবেস্টস গরম টেনে নামাচ্ছে। মানু চুপ করে বসেছিল পাশে। “জান বাবু, আমার মেয়াটারে ক্ষতি করে দিইছে...” চোখের জল উপচে পড়ছিল মহিলার, “আমার খুড়াতো দেওর...। তার বৌ আছে। বুক ফুলায়ে ঘুরে বেড়ায়। বলে আমি বানায়ে বলেচি। তাদের পয়সা আছে। বলে আমার মেয়ার নাকি আশনাই ছিল... ভাবেন! পনের বছরের ডাগর মেয়াটা আমার... বোধশোধ নাই তেমন, মাসিক হলেও বুঝেনা। আগের তিনমাস ধরে হয়না, হয়না। কারে শুধাব? তার তো বোধভাষ্যি নাই, আমি ভয়ে কাঁটা...।” দু’একজন পথচলতি চেনা দাঁড়িয়ে পড়েছিল, “কেরে? চিনিস্‌ নাকি মানু?” গলাবোঁজা শব্দ মহিলার, “জানো বাবু, খুঁচ্‌চে খুঁচ্‌চে শুধালাম... তবে জেনেচি... শেষে কয় নইয়নকা’... নয়ন আমার দেওর। তাতেই বুজলাম। শেষরাত্তিরে পোয়াতি মেয়াটা আমার পাইখানায় গেছ্‌ল... কোতায় খুঁজব আমি?” মহিলা হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে উঠেছিল, “যাই। যদি টেরেনটা পাই... চারদিন থেকে আমি বাড়ির বাইর... সোয়ামিরও মাথা খারাপ... সেই আমাদের বিয়ে ইস্তক। বড্ড আগলে রাকতে হয় কিনা! তারেও তো নয়নের ভরসাতেই...।” ঘট্‌ঘট্‌ এসে উল্টোদিকের ট্রেন দাঁড়াল। প্রায় ফাঁকা। মহিলা ছুটে চলে যাচ্ছিল। সঠিক ট্রেণ আসতে আড়াইঘণ্টা, মানু জানিয়েছিল। চোখের তারায় ফুটকিফুটকি অবিশ্বাস। রোদ মাথায় দ্রুত দৌড়ে ফুটব্রিজে উঠছিল মহিলা। সে তাকিয়ে দেখেছিল। তার গলায় যেন গভীর ক্ষত, বিশ্রী কষাটে স্বাদ। কিছুই করার ছিলনা মানুর। ‘কোথায় পাবো তারে... আমি কোথায় পাবো তারে...’ তালে তালে ট্রেনের চাকার আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছিল।

কামড়াকামড়ি করছে দুটো কুকুর। একটা আরেকটার সাথে নির্লজ্জ রমণে ব্যস্ত। অদূরে আর একটা ঝোলা পেট, ভারী বাঁট... উদাস। অসম্ভব শক্ত করে মানুর বাঁহাত ধরে রেখেছেন নিশানাথ। নখর আঙুল। নখগুলোকে কেটে দেওয়া দরকার। ফুটে ব্যথা লাগছে। মানুর অন্য হাতে সাইকেলটা। সাইকেল সে স্টেশনে জমা রেখে যায়। কেরিয়ারে বাজারের ঝোলা। কোলকাতা থেকে আনা। নিশানাথকে সাইকেলে বসানো সম্ভব নয়। ওটুকু হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়াও খুব পরিশ্রম। মানু আস্তে, খুব আস্তে পা ফেলে ফেলে... এইটুকুই তো শুধু। ধৈর্‍য্য লাগে। বুকের মধ্যে বৃষ্টি নেমে নরম কচি ঘাস গজায়। ইদানিং ক্লান্ত মেয়েটা দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে শান্ত হয়ে বুকে থুতনি গুঁজে নিজের উথলে ওঠা বুক-পেটের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কীযে বুঝেছে! হয়তো এর মধ্যে যে কোনোদিনই ওর...। ভরাট শরীর। ব্লাউজের খোলা অংশ সতেজ সুপুষ্ট আসন্ন মাতৃত্ব। ছবিটা মানুর মাথায় বসে থাকে আজকাল। ধুলোমাটির প্রলেপে সরু হাতপা। বয়স বুঝতে পারেনা মানু, তবু আন্দাজে বোঝে কিশোরী মেয়ের কাঁচা শরীর এতটা ভরে ওঠেনা। উপ্‌চায় না। ওর বাড়িতে ওর খুড়তুতো বোন বুলবুলি ক্লাস টেনে পড়ে। নিজের বড়দি’র মেয়ে ঝুম্পা এইটে। রোগাপাতলা প্রাণবন্ত কিশোরী। মানুর ভাবনার অর্ধেকটায় জমাট দ্বিধা, বাকি নিশ্চিন্দি। রুবির সাতমাসের সাধ দেওয়া হয়ে গেছে। ফুলে ফেঁপে গোলগাল জয়ঢাক। ফর্সা টানটান চামড়ায় লাল আভা, আনন্দ। মানুর লজ্জা করে মা-কাকিমা দিদিদের সামনে। তবু এটা ওটা কোলকাতা থেকে কিনে আনে। রুবির শুধু খিদে পায় আজকাল। উল্‌টে বলে, “তোমার মত হ্যাংলা একটা জন্মাবে, দেখো!” তার মা, দিদিরা সবসময়ে “ছেলে ছেলে” নাচ্‌ছে। মেয়ে হলে বা কি হয়? মানু হিসেব কষে, বিয়ের সময়ে রুবির বাইশ... তিনবছর আগে। কিশোরী তো নয়। আন্‌মনা হয়ে যায় সে। হিসেব করেই যায়, সমাধান পায়না।

আচমকা ঝট্‌কা লাগে। নিশানাথ খুঁটি গেড়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। সামনে স্টেশনচত্বর পেরিয়েই নিচু ঝোপ। সর্‌সর্‌ করে পালায় একটা গিরগিটি, সাপ না মেঠোব্যাঙ। দূরে নজর করলে মনোকেন্দ্রের পেছনদিকের ছোটো গেট। উঁউঁউঁউঁ... আওয়াজ আসছে তাদের পেছন থেকে একটানা। তাকিয়ে বোঝে, তাকাতেই হত। গেটের সামনেই রিক্সা, আজকাল সঙ্গে অটোরিক্সাও কয়েকটা। কোণের থামে ঠেসান উর্ধ্বমুখী মেয়েটি পা ছড়িয়ে। ঊরু অবধি উঠে আছে কাপড়, বুক খোলা। সে এখানে এসে বসেছে কখন? অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখছে দূর থেকে। যদিও সবাই জানে। দৃশ্যটাতে অভ্যস্ত। ধারে কাছেও যায়না। মানু থামে। কে জানে কেন মনে হয় মেয়েটার খিদে পাচ্ছে! কিছু যদি কিনে দিয়ে আসা যেত... ভয় করে, অস্বস্তিও। সপাট চড় খাওয়ার পর থেকে। কে কীভাবে যে নেবে! তবু টলটল কাঁপন বুকের ভেতরটায়। তার হাত খাম্‌চে ধরে আছেন নিশানাথ। হাসপাতালের লোকেরা তাদের সময় হলে আসবে। গাফিলতিও আছে। কেউ আসেনি এখনো। বারোটা থেকে মনোকেন্দ্রের দুপুরের খাওয়া। তার শস্তার হাতঘড়িতে বারোটা আঠের বেজেছে। বড় অস্থিরতা! সে কানের কাছে প্রায় ফিসফিস, “জ্যেঠু, আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন? একা চলে যেতে পারবেন? পারবেন আস্তে করে? ওই যে শোনেন, ও কেমন কাঁদছে।” নিবার্ক কাঠমানুষ। জবাব আসেনা। অথচ মানু অনুভব করে। নিজের মনের ভেতরে হাসে, “আচ্ছা আগে চলুন তাহলে।” হঠাৎ তার ভয়ভয় লাগে, পায়ের শক্ত লোমগুলো খাড়া হয়ে ওঠে। মেয়েটার কি ব্যথা উঠছে নাকি? এখনই? সেই ব্যথা, যার মধ্যে দিয়ে তার মা পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছে তাদের চার ভাইবোনকে...? যে ব্যথা আর মাসদুই পরে তার বৌ রুবিরও? সে স্তব্ধ হয়ে অবাধ আকাশের দিকে মুখ তোলে। বড় গুমোট গেছে গত কয়েকটা দিন। এখন মস্ত একটানা কালো মেঘ ছেয়ে যাচ্ছে খুব শ্লথভাবে। ভারভরন্ত গজগামিনী, অবশ্যম্ভাবী গম্ভীর অথচ ব্যস্ততাহীন। আজ বিকেলের আগেই অঝোরে ঢেলে দেবার সম্ভাবনা নিয়ে। আশমান জমি এক হয়ে মিশে থাকবে কিছুক্ষণ হলেও। আষাঢ়ের মাঝামাঝি চলছে। বৃষ্টিরই সময়, অথচ ছিটেফোঁটা ছাড়া তেমন এর মধ্যে ঝরেনি এর মধ্যে। মেয়েছেলেটা গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে, উঁউঁউঁউঁ। তীব্রতা বাড়ছে ক্রমশঃ। ওঃ! অসহ্য একটানা, প্রতিরোধহীন। মানু নিজেকে অপরাধী ভাবে শুধুশুধু। “না মানু, তোমার কি দায়?” মনে মনে বলে। তাড়াতাড়ি সে পা ফেলতে চাইছে সামনে। একহাতে নিশানাথ, একহাতে সাইকেল। ছোট একটা বিদ্যুৎ চমক। কর্‌র্‌র্‌ - বাজ পড়ল কোথাও!



লেখক পরিচিতি
শ্রাবণী দাশগুপ্ত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।
এখন রাঁচিতে থাকেন।

গল্পকার।


১৩টি মন্তব্য:

  1. ভালো লাগলো শ্রাবণী। স্মার্ট গল্প। শুভেচ্ছা জানাই। ভালো থেকো।

    কাজলদা

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. অজানা না হলেও প্রায় অপরিচিত জগতের ছবি--পাঠ শেষে মুগ্ধতা, বিহ্বলতা মিলে মিশে যায়। উল্লেখ্য এটাও শ্রাবণীর সংবেদনশীল কলম আমাকে যেন 'মানকুন্ডু'-র মানসিক হাসপাতালের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো.........ওর নতুনতর পথ-পরিক্রমার অপেক্ষায় থাকলাম। শুভেচ্ছা।

    উত্তরমুছুন
  4. 'নির্বেদ' না 'নিবের্দ' ? পড়লুম গল্পটা, সত্যি খুব ভাল লেগেছে, খুবই ।

    উত্তরমুছুন
  5. নির্বেদ। 'রেফ'টা ভুল জায়গায় পড়েছে।
    শ্রাবণী দাশগুপ্তা।

    উত্তরমুছুন
  6. Khub Bhalo galpo likhechhen Srabani..... very smart...jakjake... apni onek dur jaben...sudhu likhe jan...wish u all the best....... Ujjal

    উত্তরমুছুন