রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

দেশভাগ সাক্ষাৎকাগুচ্ছ: কল্লোল লাহিড়ীর সঙ্গে আলাপ

কল্লোল লাহিড়ি গল্প লেখেন। টিভিতে সিরিয়ালের কাহিনী লেখেন। গান নিয়ে নিজে গবেষণাধর্মী সিরিয়াল পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ান কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি টিভি কোম্পানীর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।
ব্যস্ত মানুষ কল্লোল। তবুও তিনি দেশাভাগ-সাক্ষাৎকার সিরিজে কুলদা রায়ের সঙ্গে আলাপে সাড়া দেন। কল্লোল লাহিড়ির সঙ্গে ফেসবুকের চ্যাটবক্সে লিখিত আলাপ শুরু হয় ২০১৪ সালের ১৫ মার্চ। শেষ হয় ২২ এপ্রিল। প্রায়ই কোলকাতার রাতে আলাপ হয়েছে। মাঝখানে লম্বা বিরতি নিয়েছেন। 
দেশভাগ যখন হয় সেই ১৯৪৭ সালে কল্লোল লাহিড়ির ঠাকুরদা জীবিত। খুলনার এক গ্রামে থাকতেন। তার বাবা আগে থেকেই কোল্কাতায় পড়াশুনা করতেন। দেশভাগের পরে তার পরিবার পূর্ব বঙ্গ ছেড়ে পশ্চিম বঙ্গে চলে আসেন।
তবে কল্লোল যেমন সহজ করে লেখেন--তার আলাপও করেছেন সহজ করে। ফলে এই আলাপের মধ্যে দিয়ে গল্পকার কল্লোল লাহিড়িকেই খুঁজে পাওয়া যায়। 


কুলদা রায় : দেশভাগ শব্দটি আপনি কখন, কিভাবে, কোন প্রসঙ্গে প্রথম শুনতে পেয়েছিলেন?

কল্লোল লাহিড়ি : দেশভাগ শব্দটা অনেক ছোট্ট থেকে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াতো। ঠিক কখন থেকে আজ আর মনে পড়ে না। মনে না পড়ার কারণ হতে পারে আমি যাদের মধ্যে বড় হয়েছি। যে মানুষগুলোর গায়ের স্পর্শ গন্ধ...গল্প...আমার ছোটবেলাকে সাজিয়ে দিয়েছিল তারা প্রায় সবাই ওপার বাংলার স্মৃতি নিয়ে জড়িয়ে ছিলেন।

আমার বাবা খুব ছোট্ট থেকে এপার বাংলায় কাকুর কাছে মানুষ। বাবার তাই দেশ নিয়ে অন্যান্যদের থেকে স্মৃতি কাতরতা কম ছিল। আমার ঠাকুমা ছিলেন নবদ্বীপের মেয়ে। কাজেই খুব ছোট্ট বয়সে যখন তিনি খুলনার এক অখ্যাত গ্রামে বউ হিসেবে গিয়েছিলেন তখন তাঁর চোখ ফেটে জল এসেছিল। কারণ নবদ্বীপ তখন ছিল বেশ জমকালো মফস্বল শহর। শুধু ছেলে ডাক্তার। এইটুকু দেখেই আমার দাদুর সাথে ঠাকুমার বিয়ে হয়ে যায়।

দাদু তার পিতৃস্বত্ত্ব পালন করার জন্য থেকে যান খুলনায়। যদিও নজরুলের অগ্নিবিনার অফিসের নীচেই তাঁর নাকি একটা ছোট্ট ডিসপেনসারি ছিল। সেই প্রথম যুগে। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁকে চলে যেতে হয়। দাদুর তিন ভাই বরাবরের জন্য থেকে যান এই বঙ্গে। আমার বাবা সবার ছোট। কিন্তু দেখা যায় ষাটের দশকের শেষের দিকে দাদু মারা যাবার পর আমার বড়মা, ঠাকুমা, মণি এদের আর এই দেশে থাকার মতো অবস্থা ছিল না।

গ্রামের খুব বিশ্বস্ত এক মুসলিম পরিবারের সহায়তায় তাদের উদ্যোগে এক গভীর রাতের আঁধারে তিন মহিলা একা একা পেরিয়ে আসেন সীমানা। আমার ঠাকুমার দুঃখ ছিল একটাই। তিনি তাঁর স্বামীর কথা রাখতে পারেননি। কারণ তাঁর ভিটে তিনি আগলে রাখতে পারেননি। সেই দুঃখ আমৃত্যু বহন করেছিলেন। আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক। বাড়ির ছোট ছেলের ওপর সব দায়িত্ত্ব এসে পরেছিল। আমার বাবা তা খুব যত্নের সাথে পালন করেছিলেন। দুই ছেলেকে বড় করতে করতে। আমার আর আমার দাদার ছোটবেলাটা কেটেছে এইসব মানুষগুলোর সাথে। যারা একটা দেশে জন্মালো আর একটা দেশে মারা গেল। যাদের কাছে দেশভাগ শব্দটা বড় কষ্টের। বড় আর্তির। কারণ আমার ঠাকুমা মনে করতো একদিন তিনি ঠিক ফিরে যেতে পারবেন। ঠাকুমাকে কেউ বোঝাতে পারেনি...আসলে যেখানে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছো সেখানে আর ফিরে যাওয়া যায় না।

কাজেই বাড়িতে আমটা এলে, জামরুল টা এলে। ঠাকুমার কোনো কিছুতেই পছন্দ হতো না। খুলনার কোলাপোতার কোন এক অখ্যাত গ্রামের কথা চলে আসতোই। যে গ্রাম আমি দেখিনি। দাদা দেখেনি। কিন্তু কোথাও আমাদের মানসপটে এটা আঁকা থাকতো। শুধু এই টুকু বুঝতাম।

হ্যাঁ...সেই অভাবের সংসারে...কষ্টের সংসারে...এই মানুষগুলো গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে আছে বটে কিন্তু এরা সুখী নয়। দেশভাগটা তাই আমার কাছে খুব অসুখী মানুষের এক ধারাভাষ্য। যে ধারাভাষ্যের মধ্যে আমি বড় হয়ে উঠেছি।

কুলদা রায় : ষাটের দশকের শেষের দিকে দাদু মারা যাবার পর আমার বড়মা, ঠাকুমা, মণি এদের আর এই দেশে থাকার মতো অবস্থা ছিল না।--কী এমন অবস্থা ছিল তাদের পূর্ব বঙ্গ ছেড়ে পষচিম বঙ্গে চলে আসতে হয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ি : পূর্ববঙ্গ থেকে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে চলে আসার মূল কারণ ছিল বাড়ির ছেলেরা সবাই ছিল পশ্চিমবঙ্গে। আমার জেঠু দূর্গাপুরে পুলিশের চাকরী করতেন। আমার বাবার কথা আগেই বলেছি। ছোট থেকে তিনি কাকার বাড়ি থেকে মানুষ। আমার বড়মা তখন নতুন বউ। আমার সবচেয়ে ছোটকাকা, যিনি দেশের বাড়ির চাষবাস দেখাশুনো করতেন তিনি খুব একটা সুস্থ ছিলেন না। তাঁর গ্যাসটিকের অসুখ ছিল। আমাদের তো আর দালান কোঠা ছিল না। গল্প শুনে যা মনে হয় একটা মাটির ঘরের ওপর টালির চাল। একটা পুকুর। কিছুটা ধানি জমি। কিছুদিন আগে, বাবাকে লেখা দাদুর প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি চিঠি উদ্ধার করেছি। আমার বাবা খুব যত্নে রাখতেন সব কিছু। সেখানে দেখতে পাচ্ছি বাবা যখন কলেজে পড়ছেন তখন দাদুকে টাকা পাঠাচ্ছেন। গ্রামের মানুষের চিকিৎসা করে দাদু তেমন কোনো টাকা পেতেন না। এদিকে তিনি মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করতে পেরেছিলেন, নাকি পড়ার মাঝে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল সেই গল্পটাও খুব ভাষা ভাষা। তবে চিঠিতে আছে গরুর গাড়ি করে রোগী দেখতে যাওয়ার কথা। ঠাকুমা আমার খুব ছোট বেলায় মারা গেছেন। তাঁর মুখ থেকে চলে আসার কারণ কোনোদিন শুনতে পাইনি। আমার কাকু যাকে হাঁদা বলতাম তিনিও কোনো ছেড়ে আসার অভিমান নিয়ে কোনোদিন কিছু বলেননি। বড়মা বলেছিল, গ্রামের চারিদিকে হিন্দু পরিবার গুলোর কাছে থ্রেট আসতে থাকে। বাইরের কিছু মানুষ যারা চাইছিল না এই গ্রামে অন্য কেউ থাকে। আমাদের বাড়িতে দাদুর দীর্ঘদিনের সহযোগী ছিলেন। আশে পাশের গ্রামের অনেক শুভানুধ্যায়ীরা ছিলেন। তাঁরা দাদু মারা যাবার পরেও ঠাম্মাদের আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু একটা সময়ের পরে তাঁদের মধ্যে একজন বাবাকে চিঠি লিখে। পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। পোড়ানো হচ্ছে বাড়ি-ঘর। বাবাও তখন কাকার বাড়িতে। বাড়ি ঠিক করে নিয়ে আসার মতো অবস্থার আগেই ঠাম্মারা তখনকার চব্বিশপরগণা জেলার শিবহাটিতে আমার এক পিসির বাড়িতে এসে ওঠেন। কাদের জন্য তাঁদের উঠে আসতে হয়েছিল। কারা তাঁদের বাধ্য করলো সেই গল্প আমার কাছে, দাদার কাছে, কোনো দিন কেউ করেনি। একটা হতে পারে তখন আমরা খুব ছোট। আর একটা কারণ হতে পারে আমার ঠাম্মা, মণি, হাঁদা ফেলে আসা সময় নিয়েই থাকতে হয়তো ভালোবাসতেন। কারোর ওপর তাঁদের রাগ ছিল না। শুধু যে মানুষটি ঠাম্মাদের সীমান্ত পার করেদিয়েছিলেন তার কথা তিনি মারা যাবার আগে পর্যন্ত মনে রেখেছিলেন কৃতজ্ঞ চিত্তে। তার কথা আমার লেখায় মাঝে মাঝেই চলে আসে।

কুলদা রায় : দেশ ছেড়ে আসার পরে তাদের অবস্থা বলুন।

কল্লোল লাহিড়ি : দেশ ছেড়ে আসার পর তাদের অবস্থা ছিল স্বপ্ন আর বাস্তবের মিশেল।

আমার বাবা যেহেতু এই দিকেই ছোট থেকে মানুষ হয়েছিলেন অনেক কষ্ট করে তিনি তাঁর মা, ভাই, বিধবা বোন, আর নিজের সংসারের জন্য দুই কামরার এক বাসা বাড়ি ঠিক করেছিলেন।স সেখানে প্রায় দশ জনের এক নিরবিচ্ছিন্ন গা ঘেঁষা ঘেঁষি সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় ছিল। আমার বাবার স্কুল শিক্ষকের জীবনের স্বল্প মাইনে আর টিউশানিতে চলতো সংসার।

আমার আর দাদার ছোটবেলা কেটেছে সেই মানুষ গুলোর সাথে যারা মনে করতো তাদের একটা তুলসী তলা ছিল। তাদের অষ্টম ফহরের মঞ্চ ছিল। তাদের পুকুর পাড়ে কাঁচা মিঠের আম গাছ ছিল। তাদের ফলসা গাছে ফল ধরে মেঘ ঘনিয়ে আসতো। আমার দাদা...তাদের স্বপ্ন গুলো খুব সুন্দর করে প্যাস্টেল কালার দিয়ে আঁকতো। আমার মণি বলতো...বিশ্বাস করতো...দাদা ওই জায়গাটায় না গিয়েই কী করে আঁকে?

বলতে পারা যায়...একদল মানুষ...তাদের একটা জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গাতে এসে ভালো ছিল না। তারা কষ্টে ছিল। কিন্তু সেই কষ্ট আমাদের সেই বড় সংসারকে কোনোদিন গিলে ফেলতে চায়নি। সবাই সহ্য করে নিয়েছিল। একটা শান্ত...সব সয়ে নেওয়ার চুড়ান্ত প্রতি মূর্তি ছিলেন আমার বাবা। তিনি না থাকলে আমরা সবাই কোথায় যে ভেসে যেতাম...কে জানে।

কুলদা রায় : আপনাদের পরিচিতি কেউ কি ভেসে গিয়েছিল?

কল্লোল লাহিড়ি : নাহ...সেটা জানি না। কারণ অনেকের দেশের বাড়িতে অনেক পরিচিত লোক ছিল। অনেক বন্ধুরা তাদের দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল বড় হয়ে। কিন্তু আমাদের ঠাকুমাদের গ্রামের কারো কথা তেমন বলতে শুনিনি। সেটা অভিমান ছিল কিনা জানি না।

কাজেই কারো কথা আমার বা আমার দাদার জানা ছিল না।

ভেসে যাওয়ার কথা উঠলো এই কারণে...যে দারিদ্র্যর মধ্যে দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম...যে কষ্টটা বাবা...কাকা...ঠা,ম্মা...মণি মারা যারবারা সময় পেয়েছেন...সেটা যেন আর কাউকে কোনোদিন না পেতে হয়।

কুলদা রায় : এই দারিদ্র কি দেশত্যাগের কারণে হয়েছিল

কল্লোল লাহিড়ি : অনেকটা তো বটেই। কারণ...একটা দেশে যারা স্থির ছিলেন...। মূল যাদের প্রথিত ছিল। তাদের রাতারাতি যদি ঘর...জমি সাজানো সংসার ছাড়তে হয়...তাদের যদি একদিনে উদ্বাস্তু করে দেওয়া হয়...তাহলে কী হবে তার পরিণতি?

এখন যখন ঘন ঘন কাজের সূত্রে বাংলাদেশে যেতে হয়...তখন অনেকেই বলেন যাবেন নাকি খুলনা? তখন খুব ঠাম্মার কথা মনে পড়ে...মণির কথা মনে পড়ে...

আর তখনি মনে হয়...গ্রামটাই তো খুঁজে পাইনি... আর যদি থেকেও থাকে তাহলে যদি যাইও... পুকুর পাড়ে গিয়ে যদি দেখি পুকুরটাই নেই...

ফলসা গাছটা নেই... কাচা মিঠে আম গাছ নেই... কিম্বা কোনো কালে হয়তো ছিল না... কিম্বা ছিল... কিম্বা মানুষ গুলোর একটা ইলিউশান ছিল...

স্বপ্ন ছিল...

তখন কষ্ট হবে... তাই যাই না...

যেতে চাই না...

কুলদা রায় : এই দেশভাগে জন্য কাদেরকে দায়ী মনে করতেন আপনার ঠাকুমা-বাবা

কল্লোল লাহিড়ি : বাবা কাউকে দায়ী করতেন না। স্বাধীনতার পরে বাবার জন্ম। ঠাকুমাও তেমন যে দায়ী করতেন তেমন না। তবে আমার ঠাকুমার কাছে স্বাধীনতা মানে ছল দেশভাগ...। এই টুকু জেনেছিলাম...কেমন ভাবে জেনে ছিলাম সেটা ঠিক মনে নেই...বলতে পারেন সেটা স্বপ্ন আর বাস্তবে মিশেল হয়ে গেছে...।

কুলদা রায় : এই দেশভাগের কারণে শিকড়চ্যুতি, কপর্দকশূন্য হয়ে যাওয়া, কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়া--এটার জন্য কেউ না কেউ দায়ী। আপনি কি মনে করেন?

কল্লোল লাহিড়ি : সেই সময়ের আমাদের অবিভক্ত ভারতের তথাকথিত রাজনীতিবিদরা...। তাঁরা বুঝতেও পারলেন না...কিভাবে আমাদের ধর্মের নামে...জাতির নামে...স্বাধিনতার নামে ভাগ করে দেওয়া হল। তাঁরা হয়তো বুঝলেন...আর অনেকেই স্বার্থ দেখলেন।

আমরা নিজেদের কপাল নিজেরা পোড়ালাম। একটা কাগজে কলমের স্বাধীনতা সব কিছু পালটে দিল।

কুলদা রায় : অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতা এই দেশভাগের রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। আপনারা ঠাকুমা-বাবা যারা দেশভাগের কারণে কষ্ট পেলেন--তারা কী অপর ধর্মের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন মানসিকভাবে?

কল্লোল লাহিড়ি : কোনোদিন না। কোনো ভাবেই না। চরম দারিদ্যের মধ্যেও...কষ্টের মধ্যেও...ঠাকুমা আমৃত্য স্মরণ করে গেছেন সেই মুসলিম মানুষটার নাম যিনি ঠাম্মা...মণি...আর বড়মাকে সীমানা পার করে দিয়েছিলেন।

আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড এক উদার মনের মানুষ। কোনো ধর্ম...কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের কোনো রাগ বা দ্বেষ ছিল না। থাকতে পারে না। আমরাও সেই রকম পরিবেশে মানুষ হয়ে উঠেছি...। তার জন্য আমাদের অগ্রজদের কাছে কৃতজ্ঞ।

কুলদা রায় : হিন্দু-মুসলমানদের যে ভেদ আছে কী আচার-আচরণে সেগুলো কিভাবে দেখতেন? ই ছোঁয়াছুঁয়ি?

কল্লোল লাহিড়ি : পেশায় বাবা শিক্ষক ছিলেন। অনেকে আসতেন তাঁর কাছে। তাঁর অনেক প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ছিলেন। আমার দাদু ডাক্তার ছিলেন। শুনেছি...আপনাকেও বলেছি...।

আমাদের বাড়ি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণের বাড়ি। যাদের গোঁড়া হিসেবে ধরা হয়। আমাকে আর দাদাকে খুব ছোট বেলা পৈতে দেওয়া হয়েছিল পারিবারিক রীতি মেনে। কিন্তু কোথাও কোনো জাত পাত...ছোঁওয়া ছুঁয়ির বাধা নিষেধ বাড়িতে দেখিনি। কোনোদিন না।

কুলদা রায় : ইন্ডিয়াতে দেশত্যাগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কতদিন লেগেছিল আপনাদের পরিবারের?

কল্লোল লাহিড়ি : দেশভাগের পরপর আমার ঠাকুমারা আসেননি কেউ। দাদু শুনেছি বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মনে হতো কোথাও আবার জোড়া লাগবে দেশটা। তিনি আসেননি। তাঁর মারা যাবার পরে। ঠাকুমাদের চলে আসতে হয়। সেটা ষাটের দশকের শেষের দিক। কাজেই আমার দাদার চাকরী না হওয়া পর্যন্ত গোছানো হয়ে ওঠে না কিছুই। বাবাও গোছানো কিছু দেখে যেতে পারেননি।

কুলদা রায় : দাদা কোন সালে চাকরি পেলেন?

কল্লোল লাহিড়ি : আর আমি আর দাদাও সত্যিই তেমন ভাবে এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি। বলতে পারেন...সেই ঝড় এখোনো চলছে। দাদা চাকরী পেলো পড়তে পড়তেই। সেটা ১৯৯৬ সাল। তখন সে শিক্ষানবীশ।
বাবা মারা গেলেন ১৯৯৯। তিন বছর অবসর নিয়ে ছিলেন। কিন্তু তখনও হাতে এক পয়সাও পেনশন আসেনি। মানুষটা জেনে যেতে পারেননি তিনি পেনশনের টাকাটা আদৌ পেলেন কিনা। পরবর্তীকালে মা পেয়েছেন।

কুলদা রায় : আপনার বাবা বাংলাদেশের বিষয়ে কেমন বোধ করতেন শেষদিন পর্যন্ত?

কল্লোল লাহিড়ি : বাবার শেষ্কালে টিবি হয়েছিল। বাবা...কোনো কথা কোনোদিন শেয়ার করেননি।

কুলদা রায় : আপনারা পূর্ব বঙ্গের বাঙাল। আপনাদের ভাষা ও আচার-প্রকার একটু ভিন্ন স্থানীয়দের চেয়ে। এটা নিয়ে কখণ কি স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়েছে?

কল্লোল লাহিড়ি : কিছুদিন আগে আমি বাবাকে লেখা দাদুর প্রায় পঞ্চাশখানা চিঠি পেয়েছি। পারিবারিক। তার থেকে বুঝতে পারতাম...বাবা এখান থেকে অনেক কিছু কিনে নিয়ে যেত পুজোর ছুটিতে...গরমের ছুটিতে... টিউশানির পয়সায়। গাঁয়ের ডাক্তারীর রোজগার ছিল সামান্য।

কুলদা রায় : আপনার টা শেষ করে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন।

কল্লোল লাহিড়ি : অনেক ছোট থেকে বাবাকে তাই পরিশ্রম করতে হয়েছে। না। এটা একটা মজার ব্যাপার। আমাদের বাবাদের দিক...মানে ছেলেদের দিক ছিল বরাবরের পূর্ব বঙ্গের আর মায়েদের দিক। এই দিকের। আমার ঠাকুমা ছিলেন নবদ্বীপের মেয়ে। কাজেই আমাদের বাড়ির পুজো আচ্ছা...সব কিছু দুই বঙ্গের মিশেল। আমাদের বাড়ির কারো কথায় কোনো টান ছিল না।

এমনিতেই পরবর্তী কালে বন্ধুদের সাথে মিশতে গিয়ে যাদের বাড়ি বিক্রম্পুর বা বরিশাল বা চট্টগ্রাম তাদের কেউই আমাদের মতো খুলনার লোকদের বাঙাল বলেই মানতে চাইতো না। সবাই মজা করে বলতো তোরা আবার বাঙাল কবে থেকে?

কুলদা রায় : দেশভাগ নিয়ে কী কী ধরনের বইপত্র পড়েছেন?

কল্লোল লাহিড়ি : খুব একটা পড়াশোনোর মনোযোগী ছাত্র আমি ছিলাম না। তবে আমাদের স্কুলে এক অসাধারণ অসম্ভব জ্ঞানী এক ইতিহাস স্যার ছিলেন। তাঁর কাছে সম্রাট অশোক থেকে দেশভাগ গল্পের মতোন শুনতে ভালো লাগতো। আর বাড়িতে একটা আবহ ছিলোই। বাবা অনেক ছোট থেকে আমাদের কবিতার বই কিনে দিতেন। সেখানে প্রথম শুনি শামসুর রহমানের নাম। অন্নদা শঙ্করের একটা ছড়া আমাদের সময় খুব জনপ্রিয় ছিল।

এখোনো আছে--

তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো...

তোমরা যেসব ধেড়ে খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো তার বেলা?

জানেন...এই যখন বাংলাদেশ যাই...এখন তো কিছু কিছু ভালো বন্ধু হয়েছে। তাদের সাথে যখন শাহবাগের পাশে যাই। কিম্বা ছবিরা হাটে। ঠিক উলটো দিকে একজন শুয়ে আছেন খুব শান্তিতে। তার সমাধি ফলকটার দিকে তাকালেই আবার অন্নদাশঙ্করকে মনে পড়ে..."ভুল হয়ে গেছে বিলকুল...সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে ভাগ হয়নিকো নজরুল...

যাইহোক...সুনীল পড়ে...আরো অনেক পরে নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে পড়ে...কিম্বা ঋত্বিক ঘটক...মৃণাল সেন এদের ছবি দেখে...আরো অনেক ছোট থেকে দেশভাগ নাড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যা;লয়ে ঢুকে পড়লাম...আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

পড়লাম এই সেদিন...তাও বছর দুয়েক আগে সেলিনা হোসেন...। আমি মুগ্ধ।

কুলদা রায় : হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি। মাহমুদুল হকের কালো বরফ?

কল্লোল লাহিড়ি : না। পড়া হয়নি। তবে আগুন পাখি কিনেছি। আশা করি খুব শীঘ্রই পড়ে ফেলবো।

কুলদা রায় : আপনি কি মনে করেন দেশভাগ যে রকম একটা বড় ব্যাপার সে রকমভাবে সাহিত্যে এসেছে?

কল্লোল লাহিড়ি : দেখুন...আমি বাংলা সাহিত্যের কিছু পড়েছি। অনেক কিছুই এখোনো পড়া হয়নি। ইংরাজী সাহিত্য বলতে পারবো না। তবে আমাকে ছোটোবেলায় সাহিত্য থেকে বেশি টেনেছিল সিনেমা।

আমার মনে হয় সিনেমায় দেশভাগ নানা ভাবে নানা বর্নে ধরা পড়েছে। শুধু বাংলা নয়। ভারতীয় সিনেমার প্রেক্ষিতে বলতে পারি।

কুলদা রায় : ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে দেশভাগ প্রধান বিষয়।

কল্লোল লাহিড়ি : হ্যাঁ। পটভূমি জুড়ে থাকে...আলোতে থাকে...আবছায়াতে থাকে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজে আমি ঋত্বিক ঘটকের ছবি টেক্ট হিসেবে পড়াই।

কুলদা রায় : ঋত্বিকের মধ্যে যে টেম্পটা ছিল দেশভাগ নিয়ে সেটা কিন্তু আর কোনো চলচ্চিত্রকারের মধ্যে দেখা যায় না।

কল্লোল লাহিড়ি : ঠিক অমনটা হয়তো দেখা যায়না। ওই উতল হাওয়া...ওই প্যাশন ভারতে একটা লোকের মধ্যেই ছিল।

কিন্তু যেটা ভালোর দিক ছিল...সেটা উনি ওনার ছাত্রদের মধ্যে তরান্বিত করে দিতে পেরেছিলেন। জিইয়ে রাখা যাকে বলে। না হলে বলুন না...এখোনো ক্লাসে মেঘে ঢাকা তারা দেখালে কেনো এই প্রজন্মের তরুণরা একাত্ম বোধ করে? কবেকার সেই শাদাকালো ছবি! কেনো এখোনো নিতার কান্নায় কান্না পায়।

একটা মজার বিষয় আমি পরীক্ষা করি। তারেক মাসুদের মুক্তির গান আমি প্রতি বছর ক্লাসে দেখাই। নিয়ম করে। অনেকেই জানে না একুশে ফেব্রুয়ারীর গুরুত্ত্ব...কেউ কেউ জানে। কিন্তু মুক্তির গান দেখে...ওরা খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। ওরা আরও জানতে চায়।

এইবার ক্লাসে দেখানোর পর এক ছাত্র এসে বললো স্যার...এতোদিন মায়ের কাছে শুধু গল্প শুনেছি। আমি জানতে চাইলাম কিসের গল্প?
সেই তরুণ বললো তার মা দেখেছেন লাশ পরে থাকে...সামনে মারার ঘটনা।
সে অভিভূত...সে কয়েকদিনের মধ্যে জোগাড় করেছে বাড়িতে রাখার জন্য মুক্তির গান। আসলে আমার মনে হয় কাউকে...কোনোভাবে...ভোলানো যাবে না দেশভাগ্‌,সেটা প্রত্যক্ষ ভাবেই হোক...বা অপ্রত্যক্ষভাবেই হোক।ওই ঋত্বিকের কথায়...কে উদ্বাস্তু নয় মশাই?

কুলদা রায় : ধন্যবাদ। আমি পুরোটা একটা ফাইলে করে আপনাকে পাঠিয়ে দেব। আপনি এডিট করে দেবেন।

কল্লোল লাহিড়ি : ধন্যবাদ আপনাকে। এতো ধৈর্য্য ধরে আপনি শুনলেন।
কুলদা রায় : ভালো থাকুন।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন