বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত র গল্প : সীমান্তে সীমন্তিনী

ওরা তন্ময় হয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরস্পরের চোখে চোখ রেখেছিলো। এই প্রথম স্কাইপে নয়, হিমালয়ের কোলে খোলা আকাশের নীচে। শান্তনু আর দীপা। ফেসবুকে চ্যাট করে বন্ধুত্ব। দুজনেই ভ্রমণরসিক। বেড়ানোর আনন্দ ভাগ করে নিতে নিতে কবে যে প্রেমে পড়ে গেলো দুজনেই জানতো না। শান্তনু ভূতাত্ত্বিক । পেশার জন্যই সারা ভারত ঘুরতে হয় । বিভিন্ন রকম মাটি আর শিলার বৈশিষ্ট্য খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে অজান্তে হৃদয় দিয়ে ফেলে সবুজ মখমলি ঘাসকে, দীর্ঘাঙ্গী পর্ণমোচী গাছকে । তার উপরেও চোখ চলে যায় ওর। সেই নীলাকাশ ; নভোনীল । যেখানেই যাও না কেন এই একটুকরো নীলিমা যেন নেশার মতো বিভোর করে রাখে ।
আচ্ছন্নের মতো বিড়বিড় করে শান্তনু । কলকাতার ক্রিকেট আর আড্ডার জন্য মন আনচান করে । বলতে গেলে স্কুল থেকেই ক্রিকেট হলো ওর প্রথম প্রেম ।রাজ্য ক্রীড়াদপ্তরের আন্ডার সিক্সটিন টিমে ও একমাত্র উইকেটকিপার হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলো । এখনো প্রত্যন্ত গ্রামে কাজের ফাঁকে ক্রিকেট খেলে ও বাচ্চাদের সাথে।মাঝে মাঝে গুগল সার্চ করে পুরনো ভালো ভালো ক্রিকেট ম্যাচ দেখে। ওদের লেকটাউন মাঠের ক্রিকেট গুলতানিটা প্রচণ্ড মিস করে ও।

আজ ফেসবুক লগ অন করেই চোখ আটকে গেলো । একটা অচেনা মেয়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট । প্রোফাইলে একটা পত্রিকার ছবি। নাম 'অতল হাসি। অবশ্য শান্তনুর অ্যাকাউন্টেও নিজের ছবি নেই । বদলে সদ্য ফিল্ড করে আসা কেরলের নীলগিরি পর্বতের ছবি । ঝর্না, নয়নহরা চা বাগান, এলাচঝাড় আর নারকেলবীথির রূপই যেন শান্তনুর মুখমণ্ডল। 

ফ্রেন্ডরিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করার পরে অতল হাসির সম্পাদক দীপা, তার ইচ্ছেটি জানালো । সে তার পত্রিকায় শান্তনুর তোলা কয়েকটা ফোটো ব্যবহার করতে চায়।শান্তনু জানে, প্রকৃতির এইসব বিরল কিছু ছবি সাধারণ পর্যটকদের ক্যামেরায় ধরা পড়া সম্ভব নয়।ফিল্ডের জন্য গ্রাম, শহর, জনপদ থেকে অনেক দূরে যেসব জায়গায় ভূতাত্ত্বিককে যেতে হয়,সেখানে সে আর প্রকৃতি একলা। তাই, এক অজানিত সখ্য গড়ে ওঠে ক্যামেরার বন্ধনে । একের পর এক ছবি পাঠাতে থাকে শান্তনু।একদিন হঠাৎ বিকেলে অতল হাসির বার্তা । ভোরুখা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রাস্টের সঙ্গে সে চলেছে পর্বতাভিযানে। স্কুলে থাকতেই ভোরুখার সদস্য হিসাবে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড় এবং মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারি ট্রেক করে এসেছিলো দীপা। এবার চলেছে নিখাদ ভ্রামণিক হয়ে পত্রিকার জন্য কিছু সম্পদ জোগাড় করতে । আর কে না জানে ভ্রমণ হল ক্ষুধার্ত মনের সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার । সুতরাং দীপা চললো ।

দিন যায় । রাত যায় ।তারাভরা আকাশের নীচে বসে ল্যাপটপ খোলে শান্তনু। কানের কাছে ঝিঁঝিঁর ডাক ,বাতাসের ঝাপট। অদূরে ঝর্ণার কলস্রোত । দক্ষিণ সিকিমের পাণ্ডিম অবধি ট্রেক করে গেছিলো দীপারা ।সেখানকার দুর্দান্ত সব ছবি পাঠিয়েছে।বরফে ঢাকা পাণ্ডিম চূড়া যেন তীক্ষ্ণ ইস্পাতের ফলা ।এরকম একটা ঝকঝকে নীলাকাশের জন্য শান্তনু সব দিয়ে দিতে পারে। ওর হঠাৎ মনে হয়,ও নিজেই যেন ওই নীল আকাশটা, যার বুকে ঘাড় বেঁকিয়ে থাকা রূপোলী পাণ্ডিম হল দীপা। এক লহমায় ই মেল করে আকাশ সন্ধিপ্রস্তাব পাঠায় । পর্বত তো নতজানু হয়েই রয়েছে; কিন্তু ট্রেকবিভল তরুণীর প্রবল শর্ত , মধুচন্দ্রিমা হবে তুষাররাজ্যে । দুই বাড়ি থেকে উৎসুক অভিভাবকরা প্রজাপতি ধরতে বেরোলেন।শান্তনুর বাবা মা বহুদিন ধরেই চাইছিলেন যে তাদের মাটিমুখো ছেলে শিলা প্রস্তর ছেড়ে যেন কোন মর্ত্যবাসিনী নারীর দিকে দৃষ্টি দেয় । ওদিকে অতল হাসির গুরুজনেরাও খুব চিন্তিত । একে তো কন্যা ব্যক্তিত্বময়ী, তায় বেজায় গুণবতী।

রম্যরচনার উপর একমাত্র লিটল ম্যাগাজিন সেই বার করে । গান গায় যেন পাখি । কথা বলে যেন নাটকের সংলাপ ।এ মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজা বড্ডো ঝকমারি । ইতিমধ্যে তার রূপগুণমুগ্ধ জনা পঞ্চাশেক পাত্রকে সে হঠিয়েছে।এমতাবস্থায় অভিভাবকরা যেন হাতে চাঁদ পেলেন। শুরু হলো দুপক্ষের দুবাড়িতে যাতায়াত,কিন্তু হবু বর কনে পরস্পরের মুখোমুখি বসবার সময় ও সুযোগ পেলো না। শান্তনু ভারত সরকারের নতুন চাকুরে।ট্রেনিং পিরিয়ড চলছে।ছুটি নৈব নৈব চ ।এদিকে দীপা ব্যস্ত তার সাড়ে চার সংখ্যা হাসির পত্রিকা নিয়ে।বইমেলায় হৈ হৈ করে বিকোচ্ছে।পাঠককুল তো হো হো করে হেসে আকুল ।

দু'বাড়ি থেকেই তাড়াহুড়ো করে বিয়ের দিন, তারিখ,লগ্ন ধার্য করা হলো। শান্তনু গোঁ ধরেছিলো যে প্রথাগতভাবে বিয়ে করবে না, কোভালাম এর সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে ভোরবেলা বরণ করবে ওর জীবনসঙ্গিনীকে ।যখন সূর্য উঠবে তখন ও ধরবে দীপার হাত। উলু,শাঁখ বাজবে না,থাকবে শুধু অত্যন্ত প্রিয়জনেরা। সে আবার হয় নাকি ,ভেবেছিলো শান্তনুর মা, কমলা। একটমাত্র সন্তান। ছেলে জন্মানোর পর তার আজন্মলালিত বাসনা হলো পুত্রকে প্রতিষ্ঠিত করে ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করা । ওদিকে দীপান্বিতাও বাবা মায়ের কনিষ্ঠ কন্যা। বড়ো মেয়ে রূপান্বিতার বিয়ে হয়েছে প্রায় দশ বছর হোলো। এতদিন বাদে বাড়িতে একটা বিয়ে অথচ ধুমধাম নহবত সানাই বাদ দিয়ে কোন এক দ্রাবিড়সভ্যতার নির্জন সৈকতের ছবিটা ওদের মোটেই মনে ধরলো না । দুপক্ষই যুযুধান ঝাঁপিয়ে পড়লো ; অশ্বারোহী সেনার মত বেনারসী কুঠিতে ঢুঁ মারলো। কিংবদন্তী নামক পাঞ্জাবীর দোকানটিকে রে রে করে দখলে নিল দীপার পরিবার।


পুরুত,কেটারার,ডেকরেটার-দু বাড়ির আগ্রাসন থেকে কেউই বাদ গেলো না। সব ই হলো,কিন্তু মধুচন্দ্রিমার কথা বেমালুম ভুলে গেলো সবাই।এমনকী শান্তনু নিজেও। সে তখন বিয়ের ছুটির দরখাস্ত নিয়ে তদ্বিরে ব্যস্ত। দীপার দিদি রূপা একবার আবছা করে ব্যাপারটা তুলেছিলো বটে কিন্তু আত্মীয়স্বজনদের হৈ হুল্লোড়ে সে সব চাপা পড়ে গেলো। তারপরে তো কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে ধুমধাম করে চার হাত এক হলো।কোভালাম এর বদলে কংক্রিটের ছাদনাতলায় সাতপাকে বাঁধা পড়লো দুজন। বিয়ের পর বন্ধুবান্ধব আত্মীয়কুটুম্বকে নিয়ে দুসপ্তাহ কেটে গেলো পলকের মত। পনের দিনের মাথায় শান্তনু লক্ষ্য করলো অতল হাসি ভয়ানক গম্ভীর। কারণ খুঁজতে গিয়ে অতর্কিত বজ্রাঘাতের মতো দীপার শর্তের কথাটা মনে পড়লো। ওর। সর্বনাশ,হনিমুনের কী হবে? কোনো আয়োজনই তো হয় নি।ছুটিও তো ফুরোবার মুখে ;এরপর আবার চার মাস বাদে দীপার সাথে পাকাপাকি সংসার । ততদিনে মধুচন্দ্রিমার চাঁদ ফিকে হয়ে যাবে না তো !

এতো তাড়াতাড়ি ,আগাম বুকিং ছাড়া, হোটেল,রেল বা বিমানের টিকিট কিছুই পাওয়া যে সম্ভব নয়,ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে জল্পনা করে বুঝতে পারলো শান্তনু। মধ্য চৈত্রের এই গরমে নৈনিতাল , কুলু, মানালি, কাশ্মীর,সমস্ত পাহাড়ি জায়গাগুলো টুরিস্টদের ভিড়ে থৈ থৈ ।তার চেয়ে বরং সমুদ্রই ভাল।শান্তনুর মানসচক্ষে ভেসে উঠলো কোভালাম। সে কথা অতল হাসিকে বলতে যেতেই হাসির বদলে রাশি রাশি চোখের জল বেরিয়ে এলো। তার একটিমাত্র প্যাশন যখন তার নববিবাহিত বর উড়িয়েই দিচ্ছে, অতএব এ জীবন এভাবে রাখার কি মানে ইত্যাদি ইত্যাদি।

পুরো রাত্রিটা উসখুস করে কাটালো শান্তনু; ঘুমোলো না। পাশেই দীপা; নাকের জলে চোখের জলে কাজলে মিলে মিশে একাকার। শান্তনু আবার আর এক চিন্তায় মশগুল! দিন চারেক বাদে ভারত শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটফাইনাল হতে চলেছে।বহুদিন বাদে ভারত পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে। অষ্টমঙ্গলা করতে গিয়ে ও যখন শ্বশুরবাড়িতে থেকেছিলো, দীপার বান্ধবীদের চ্যাটাং চ্যাটাং রসিকতায় নাজেহাল হবার যোগাড়। খেলা দেখা তো দূর অস্ত। নেহাত ভায়রাভাই সিদ্ধার্থ ক্রিকেটপাগল; মাঝে মাঝেই কানে কানে শান্তনুকে স্কোর এবং ম্যাচ ডিটেলস বলে চলে যাচ্ছিলো ।সবাই ভাবছিলো সিদ্ধার্থ বুঝি শালিকাকে নিয়ে চটুল রসিকতা করছে! আগামী দোসরা এপ্রিল ,লেকটাউনের ক্রিকেটক্লাবের বন্ধুরা ,মেজো সেজো জেঠুর ছেলেরা,সব্বাই আসছে শান্তনুর বাড়িতে রসিয়ে ম্যাচ দেখবে বলে।দীপা নিজের দেশকে ভালবাসলেও ক্রিকেটটীমের জন্য কি আর মধুচন্দ্রিমা বিসর্জন দেবে? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শান্তনু সোফার উপরে ঘুমিয়ে পড়লো । ঘুম ভাঙ্গলো বুকের উপরে চুড়ির টুং টাং শব্দে আর মৃদু জুঁইফুলের সুবাসে। ধ্যাবড়ানো কাজলমাখা চোখে কিঞ্চিৎ হেঁড়ে গলায় আচমকা দীপা বলে উঠল, আমি বাবা মা'র কাছে চললাম। আঁতকে উঠলো শান্তনু। সর্বনাশ! পাখি ডাল থেকে উড়ে গেলেই কেলেংকারী। তড়িঘড়ি দীপাকে পাশে বসিয়ে ইন্টারনেট খুলে ফেলে ও। প্রত্যেকটা রাজ্যের ট্যুরিজম অফিসে ফোন করতে থাকে। অবশেষে অরুণাচল প্রদেশের বমডিলা তে হোটেল এবং আনুষঙ্গিক সমস্ত বেড়ানোর সুবিধা পেয়ে গেলো ওরা । অরুণাচলের সেলা পাস নামে একটা তুষারাবৃত জায়গার ছবি দেখে অতল হাসির চোখের কোণে একটা বিদ্যুৎরেখা ঝিলিক দিয়ে উঠলো । শান্তনুরও পেট থেকে একটা খুশির বুদবুদ ঢেঁকুর হয়ে ক্রমাগত উপরে উঠতে থাকলো ।

গৌহাটি থেকে ভালুকপং । সেখান থেকে বমডিলা। পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলো। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা ব্যাট করে রানের পাহাড় গড়েছে । জয়বর্ধনে সেঞ্চুরি করে ভারতকে রীতিমত চাপে রেখেছে। শান্তনু রাস্তায় ছিল তাই পুরোটাই মিস ; দুরুদুরু বুকে ভাবছে কখন ভারতের ব্যাটিং দেখবে! ওদিকে দীপা আবার রাগ না করে। আড়চোখে বউকে দেখলো শান্তনু। গোধূলির কনেদেখা আলোয় দীপাকে দেখে সে মুগ্ধ ,চমৎকৃত আর, বমডিলাকে দেখে মোহিত দীপা । কী সুন্দর ছোট্ট শৈলশহর ! এখানেই যদি প্রথম সংসার পাতা যেত! গোটা রাস্তায় প্রচুর তরুন তরুণী। পাহাড়ের ঢালে আলোর মালা! ভারতীয় পতাকার ছোটো ছোটো রেপ্লিকা উড়ছে । হোটেলের বয়টা মুচকী হেসে বললো , আপ বহুত বড়ীয়া তাইমমে আ গয়া সাব আজ তো পাওয়ার কাত নেহি হোগা। ইধার তো হামেশাই লোডশেডিং,পানি ভি নেহি মিলতা হ্যায়।মগর আজ সব ঠিকঠাক রহেগা। ইন্ডিয়া জিতেগা। ক্যা সাব? শান্তনু উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো হুররে! বয়টা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো ।

ওদিকে দীপা অধৈর্য হয়ে পড়েছে । চলো না ,একটু হেঁটে আসি।মনাস্ট্রিটা অবধি যাই। শান্তনু টিভির চ্যানেলগুলো ঘেঁটেঘুঁটে সবেমাত্র খেলার মাঠটা আবিষ্কার করেছে,এমন সময় একি বিপদ।শান্তনু প্রমাদ গুণলো । এই,তুমি বাড়ীতে ফোন করলে না? দীপা ব্যস্ত হয়ে মোবাইল কানে ঘরময় ছোটাছুটি করলো। উদ্যত হাসি চেপে শান্তনু ভাবলো -যাক, কিছুক্ষণ বাঁচোয়া । এখন ম্যাচের চা বিরতি চলছে । তারও ।. দীর্ঘ ফোনালাপের পর দীপা আবার যখন বায়না ধরবে তখন সন্ধ্যা নেমে যাবে।পাহাড়ী রাস্তা অন্ধকারে নিরাপদ নয় সেটা দীপাও জানে । অগত্যা, ক্রিকেট জিন্দাবাদ ! ভারতকে, দু'শো চুয়াত্তর রানের বেশি তুলতে হবে পঞ্চাশ ওভারে । কোল বালিশটা পাকড়ে সবে যখন বিশেষজ্ঞদের মতামতে কান দিয়েছে শান্তনু,অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো দীপা।এক লহমায় টিভির রিমোট কেড়ে নিলো । এই তোমার হনিমুন? তাহলে তো কলকাতাতেই থাকতে পারতে! ওহ অনলাইনের কাউকে কখনও বিশ্বাস করতে নেই।দীপার বড় বড় চোখ জলে ভরে উঠলো । লিসন মাই সুইটহার্ট ,কলকাতায় কি এই হটসিটটা পেতাম? আমি এখন ক্রোড়পতি বুঝলে? দীপার নরম পশমি স্কার্টে নিজের মাথাখানা সমর্পণ করলো শান্তনু । কিন্তু,চিঁড়ে ভিজবার নয়। শান্তনুকে ঠেলে,বালিস কেড়ে, কাতুকুতু দিয়ে, চিমটি কেটে শেষে হুংকার দিলো দীপা। কি হলও ওঠো ! কখন থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি, নেটওয়ার্ক নেই, মা বাবা দিদি তোমার বাড়ি সব্বাই নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে । চলো বাইরে ! এস টি ডি বুথ থেকে ফোন করে আসি। শান্তনু অপারগ হয়ে বাইরে এলো। ও জানে, নেটওয়ার্ক সমস্যা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে প্রচন্ড ভাবে বিদ্যমান । ভূতত্ত্বের ফিল্ড করতে মাঝে মাঝে ওকে এমন এমন জায়গায় যেতে হয় যেখানে মোবাইল তো দূরস্থান , দেশটাকেই ওর কিরকম অচেনা লাগে । প্রান্তিক অরুণাচল আজও বহু পরিষেবা থেকে দূরে , হোটেল বয়ের কথাতেই তা স্পষ্ট । এদিকে তিব্বত,ওদিকে চীন, এই দুই রাজনৈতিক সাঁড়াশী চাপে ঐশ্বর্যময়ী হয়েও অরুণাচল ভিখারিণী । একটা ক্রিকেট ম্যাচের জন্য একটু আমোদ করার সু্যোগ পেয়েছে।খারাপ লাগে শান্তনুর । একটি মাত্র বুথ খোলা ছিল । শেষপর্যন্ত সেখান থেকে কলকাতার সাথে যোগাযোগ করতে পারলো ওরা।

ফোন সেরে একপ্রকার দৌড়ে হোটেলে ঢুকলো শান্তনু। ভারতের ব্যাটিং শুরু হয়ে গেছে। বীরেন্দ্র সহবাগ এবং শচীন তেন্ডুলকর ব্যাটিং ওপেন করেছে। আহা , মারকুটে বীরু-জিও গুরু! শান্তনু চেঁচিয়ে উঠলো। দীপা খুশি খুশি চোখে বরের দিকে তাকালো। কি দেখছো ? শান্তনুর প্রশ্ন। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, রিনরিনে মিষ্টি গলায় দীপা বলে অ্যাই, শোনো না! বিয়ের ঝামেলার জন্য কত দিন ভালো করে খাইনি গো-একটু অর্ডার করো তো, চিকেন পকোড়া। বেশ মুচমুচে আর ইয়ে । দীপার কথা শেষ হবার আগেই শান্তনু চীৎকার করে উঠলো -না আ আ আ। দীপা হতভম্ব । বলে কি ছেলেটা! ইচ্ছামতো খেতেও দেবে না নাকি? শান্তনু জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো এখন একদম ননভেজ এর নাম নেবে না। স্ট্রিক্টলি নিরামিষ। আগে জিতি । তারপর চুটিয়ে চিকেন মাটন সব হবে বুঝলে? দীপা দমে গেলো। রাতে ডিনারে কি খাবে তাহলে ,শান্তনু কি ডিম ও ছোঁবে না? এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ দ্যাখে সর্বনাশ! সহবাগ আউট।এল বি ডব্লিউ।মাত্র দ্বিতীয় বলে। মালিঙ্গা হো হো করে হাসছে। বুকে হাত দিয়ে শান্তনু চুপসে গেলো । দীপা নিজেকে সান্ত্বনা দিলো । আহা , তেন্ডুলকর তো আছে। হতাশ বীরেন্দ্র মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলো এবং তিনে ব্যাট করার জন্য নামলো গৌতম গম্ভীর । গম্ভীর হাসতে হাসতে শচীনের সঙ্গে কি যেন পরামর্শ করলো । শচীন কি বলছে ? শান্তনুর জানতে ইচ্ছে করে। গেমপ্ল্যানটা কী পাল্টালেন নাকি কোচ গ্যারি কারস্টেন ? শচীন চিরাচরিত রাজার ঢঙ্গে ব্যাটিং করতে থাকলে কী হবে হঠাৎ ইন্দ্রপতন ! মাত্র আঠেরো রানেই শচীন আউট । গোটা বমডিলার তুমুল তর্জন গর্জন নিমেষে চুপ । কি হবে এখন ভারতের? বিরাট কোহলি নামে একজন তরুণ ক্রিকেটার প্যাড ঠিক করতে করতে নামছে।বিরাটের নাম শুনলেও দীপা আগে কোনদিন ওর খেলা দেখেনি।এই বাচ্ছা ছেলেটা কি পারবে এই বিরাট দায়িত্ব নিতে? চতুর্দিকে ফিসফাস, কানাকানি। ইন্ডিয়া ডুবলো রে! কিন্তু সবাইকে অবাক করে বিরাট আর গম্ভীর খেলাটার হাল ধরলো ।

গম্ভীর ছয়ে ছয়লাপ করে দিলো । বমডিলার আনা্চে কানাচে পাহাড়ে টিলাতে বম পড়ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ওরা যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত হলো। কুয়াশায় ঘেরা অরুনাচল যেন কলকাতার শীতের সন্ধ্যা। ছোটো ছোটো টুনি লাইটে সেজে উঠেছে বমডিলা। দেশটা কতো ব্যাপ্ত-না ঘুরলে বোঝা যায় না। পত্রিকার জন্য একজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দীপা শুনেছিলো যে, অরুনাচলের শিক্ষিতসমাজ খুব উৎকন্ঠিত এই কারনে যে চীন ছলে বলে কৌশলে নানাভাবে অরুণাচল দখল করতে চায়। বাষট্টির চীন ভারত যুদ্ধ তো আজ ইতিহাস। প্রথম থেকেই চীনের দাবি যে অরুণাচল তাদের অঙ্গ। সাতাত্তরে উনি যখন তাওয়াং গেছিলেন তখন চতুর্দিকে বড়ো বড়ো পোস্টার দেখেছিলেন যা ভারতের অন্য কোন শহরে নেই। যেমন-তুমি ভারতে আছো, বা জয় হিন্দ। অর্থাৎ তুমি চিনে নেই। এমনকি ,চীনারা পাসপোর্ট ছাড়াই বরাবর আজও অরুণাচলের অধিবাসীদের চীনে ঢুকতে দেয়। আগ্রাসনের কি কূটনৈতিক চাল! দীপা ভাবে,আচ্ছা ভারত সরকার কী এসব জানে না? তবে এর প্রতিবাদ নেই কেন? অতল হাসির 'দেশ কাল' বিভাগে এ ব্যাপারে একটা প্রবন্ধ লিখবে বলে ও মনে মনে ঠিক করলো। চকলেট বোমের শব্দে চমক ভাঙ্গলো দীপার। বিরাট আর গম্ভীর রানের পাহাড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু হায়,বিরাটের পতন! ধোনি এসেছে। শান্তনু আশ্বস্ত হলো । ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ভারতের একমাত্র উইকেটকীপার কাপ্তান ধোনি। ঠাণ্ডা মাথা। শান্তনু উঠে গিয়ে দীপাকে ইজিচেয়ারে বসিয়ে দিলো ।উঁহু, একদম নড়বে না। স্ট্যাচু থাকো। ছিয়া নব্বুই,সাতানব্বুই। আর মাত্র তিন রান বাকি। নড়লেই গম্ভীরের সেঞ্চুরি মিস! টয়লেট যাবার জন্য দীপা সবেমাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে -একটা দমকা বাতাসের মত নিঃশব্দের অনুভূতি;অচানক পেরিরার বলে সাতানব্বুইতে গম্ভীর বোল্ড! দীপা হতচকিত। শান্তনু কটমট করে তাকালো কতবার বললাম ডোণ্ট মুভ। দীপা আরও থতমত । তুমি এত সুপারস্টিশাস? আমার জন্য গম্ভীর আউট হলো ?ইয়েস,ম্যাডাম।সব কিছুর একটা কার্যকারণ থাকে। রুল অফ পসিবিলিটিস। বুঝলে? দীপা রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়ালো । গম্ভীর আউট হতেই বমডিলা নিথর। আওয়াজ নেই,কোলাহল নেই । ঘরের মধ্যে থেকে শান্তনু চেঁচামেচি করলো এই দীপা, কি হচ্ছে ভিতরে এসো ।উত্তরে দীপা ওর চুলের ভারী ক্লিপটা খুলে নিয়ে শান্তনুর গায়ে ছুঁড়লো । দীপা জানে শান্তনু এইসব ছোড়াছুড়ি পছন্দ করে না । তবু ও বিরক্ত হল না - আসলে ওর ভ্রূক্ষেপই নেই। দরোজার একচুল ফাঁক দিয়ে দীপা দেখতে পেলো যুবরাজ মাঠে নেমেছে ।শান্তনু এজন্যই ধ্যানমগ্ন । দীপা উদাস হয়ে গেলো । এ কেমন মধুচন্দ্রিমা! বর ,বমডিলা সব্বাই ক্রিকেটোৎসবে মত্ত । কোনও দোকান খোলা নেই। পেপসির তেষ্টা চাগাড় দিলেও পাবার উপায় নেই। একতলার রিসেপশন ফাঁকা।হোটেলের বয়গুলো খেলা দেখার জন্য কোথায় সেঁধিয়ে আছে কে জানে ! অভিমানে দীপা হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো । উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটতে হাঁটতে পাকদণ্ডী বেয়ে নীচে নামতে থাকলো । এক জায়গায় টিভির শোরুমের সামনে বেশ জটলা ।দীপা সেখানে দাঁড়ালো । উত্তেজনার পরিস্থিতি । আর এগারো বল বাকি। জেতার জন্য চার রান দরকার । দীপা আগে দেখেছে, এরকম বহু জেতার সুযোগ হেলায় হারিয়েছে ভারত। সে চোখ বন্ধ করে ভগবানকে ডাকলো । চারপাশের লোকজনের চোখেমুখে টেনশন । চোখ খুললো দীপা । ধোনি এমন ব্যাট চালালো যে বলটা যেন উড়ে গেলো মাথার উপর দিয়ে। ছয়! চোখের ভুল নয় তো? মুহূর্তের অপেক্ষা । বমডিলার জনতা ফেটে পড়লো খুশিতে । চকোলেট বোমের শব্দ পাহাড়ের ঢালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো । দীপার হাতে একটা বুড়ি এসে একটা লাড্ডু গুঁজে দিলো । উদ্দাম ফিল্মি গান চালিয়ে রাস্তায় নাচানাচি শুরু রলো বমডিলা। দীপাও হেসে কুটিপাটি । আঠাশ বছর বাদে বিশ্বজয় । তার জন্মের আগে ভারত ক্রিকেট বিশ্ব জয় করেছিলো কপিলদেবের নেতৃত্বে । বাবার কাছে শোনা । আর একটা জিনিস, দীপা নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে এই অরুণাচল ভারতের । কেউ তাকে কাড়তে পারবে না। কিন্তু, অতল হাসির তলায় জমে আছে তীব্র অভিমান।শান্তনু অনেকক্ষণ ধরে মোবাইলে বার বার কল করলেও সে ধরেনি ।

শেষপর্যন্ত অবশ্য হোটেলে ফিরলো দীপা ।সারাটা রাস্তা শান্তনু গজগজ করেছে ,তোমার টেনশনে শেষ ওভারটা রসিয়ে দেখতে পেলাম না। আশ্চর্য মেয়ে, জানা নেই,শোনা নেই ,অচেনা এমন একটা জায়গায় কেউ হুটহাট বেরিয়ে যায়? দীপা চুপচাপ সুটকেশ গোছাতে শুরু করলো । মনের মধ্যে তাই না না করে খুশির বাজনা বাজছে। একে তো ভারত জিতেছে,তার উপর,আগামীকাল সেলা পাস যাওয়া হবে। খুশিতে ভরপুর দীপা সামনের আয়নায় তার প্রতিবিম্বকে বললো - আর কি চাস? আয়নার দীপা তবু গুমরে রইলো ।

পরদিন সকালে প্রাতরাশ সেরেই ওরা বমডিলা থেকে সেলার পথে যাত্রা শুরু করলো । সেলা বেশ উঁচুতে । প্রায় তেরহাজার সাতশো ফিট উচ্চতায় । গরমজামা কাপড়ে নিজেদের মুড়ে নিলো ওরা । গতরাতের আমেজে অরুণাচল এখনো বিভোর । ধোনি গৌতম যুবরাজ শচীন এদের সারি সারি ছবি টাঙিয়ে মালা পরানো, এমনকি ধোনিকে নকুলদানা খেতে দেওয়া হয়েছে ছোট্ট ষ্টীলের থালায় । আস্তে আস্তে ওরা সেলার কাছে এসে পৌঁছোলো এবং অরুণাচলের বন্য সৌন্দর্যে স্তম্ভিত হয়ে গেলো । চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ । আর প্রচণ্ড কনকনে হিমেল হাওয়া । গ্লাভস পরা হাতের তালুও জমে যাচ্ছে । দীপা ক্যামেরা বার করেও ফের ঢুকিয়ে ফেললো। উইন্ডচিটারের পকেটে । ওদিকে শান্তনু গাড়ি থেকে নেমে বরফের চ্যাঁই নিয়ে লোফালুফি শুরু করলো । এই তোমাকে ছুঁড়ছি কিন্তু , শান্তনুর উল্লসিত গলা । শান্তনুকে পাত্তা না দিয়ে কি এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে গাড়ির পিছন দিকে সটান হাঁটতে আরম্ভ করলো দীপা । যেখানে ও থামলো - সেখান থেকে শুরু হয়েছে সেলা হ্রদ । পুরোপুরি বরফে ঢাকা নয়,কাস্তের ফালির মত একফালি বরফগলা কালো জলে ঘেরা । সরোবরের পিছনে ধপধপে শাদা বরফঢাকা পাহাড় । হ্রদের জলে মেঘমুক্ত নীলাকাশ । ঝুঁকে নিজের ছায়া দেখতে গেলো দীপা । কিন্তু, অবিশ্বাস্য ব্যাপার ! একী, এতো এক মনপা উপজাতির তরুণীর চেহারা । হলুদ রঙের লাচ্চা পরা, রংবেরং এর ভারী পুঁতির গয়না ।দীপা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে । ভালো করে দেখবার জন্য আরো ঝুঁকেছে ,ক্যামেরাটা পকেট গলে হ্রদের জলে ঝপাৎ করে পড়লো । আরে আরে , নতুন ডিজিটাল ক্যামেরা ! দিকশূন্যজ্ঞান হয়ে দীপাও ঝাঁপ দিলো । ম্যাডাম, মত যাইয়ে । উহা খতরা হ্যায়। আর্মির জওয়ানরা ছুটে এলো সেখানে ।

আর একটু হলেই সেলার হিমশীতল জলে ডুবে সমাধি হতো দীপার । ওকে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে - মাউথ টু মাউথ রেসপিরেশন, অক্সিজেন দিয়ে সুস্থ করা হল । সেনাবাহিনীর মেজর ডাক্তারবাবু বললেন যে এত উচ্চতায় এবং কম ঘনত্বের অক্সিজেন থাকার ফলে অনেকেই অ্যাক্লামাটাইজড হতে পারে না। জ্ঞান ফিরলে দীপা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো । সেলার জলে কে ও? ওই তরুণী খুব চেনা চেনা। অথচ আকাশ পাতাল ভেবেও দীপা তাকে চিনতে পারলো না ।এ এক অথৈ রহস্যের ঘূর্ণিপাকে পড়েছে সে। মনে হচ্ছে সে যেন ছুটে চলেছে কালো মহাকাশের বুক ফুঁড়ে । তার পাশে বিপুল বেগে ছুটে চলেছে ধুমকেতু,উল্কা, গ্রহানুপুঞ্জ ।

ওদিকে ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে শান্তনু হতভম্ব । সে ঠিক করে ফেললো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অসুস্থ দীপাকে নিয়ে কলকাতা ফিরবে । তড়িঘড়ি সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে তাওয়াং হেলিপ্যাডে যাওয়া ঠিক করে ফেললো সে । হেলিকপ্টারে করে সোজা গৌহাটি ,সেখান থেকে ফ্লাইটে কলকাতা । সেলা থেকে তাওয়াং যাবার পথে নুরনাং জলপ্রপাতটা পড়ে । আর আছে যশবন্তগড় ; মহাবীরচক্রপ্রাপক শহীদ যশবন্তের স্মৃতিসৌধ । ড্রাইভার সাধাসাধি করলেও শান্তনু গাড়ি থেকে নামলো না। তার এখন একমাত্র লক্ষ্য কত দ্রুত দীপাকে নিয়ে বাড়ী ফিরবে। কিন্তু, যশবন্তগড় আসার আগেই ওদের গাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেলো। ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ। সামনে প্রচুর গাড়ির লাইন । পাহাড়ী রাস্তায় প্রায়ই এমন হয়।প্রায় আধঘণ্টা চুপচাপ বসে থাকার পর শান্তনু গাড়ি থেকে নামলো । সীটে হেলান দিয়ে আধশোয়া দীপা। বেচারি, সেলার ঠাণ্ডার ধকল সহ্য করতে পারেনি । আহা রে, শান্তনুর মনটা কেমন করে উঠলো । দীপার জন্য ক্যাডবেরি ,পটেটো চিপস প্রভৃতি খুচরো আনন্দের সন্ধানে আতিপাতি দোকান খুঁজতে এগোয় শান্তনু।

ওদিকে বর্ডার রোড অর্গানাইজেশন আর ভারতীয় সেনার যৌথ তৎপরতায় ধ্বস মেরামত করে রাস্তা চালু হয়ে গেলো। গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে । শান্তনু আসছে না । দীপা উৎকণ্ঠিত হলো । ড্রাইভার লোকজন জড়ো করে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে । দীপা তার শরীরের দুর্বলতা ভুলে গিয়ে গাড়ি থেকে নামলো । কি হলো ? কোথায় গেলো ? প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে যে! দীপা যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না ।তার উদ্বেগাকুল মন সেলা হ্রদের মনপা যুবতীর ছায়ার সাথে শান্তনুর অন্তর্ধানের এক অলৌকিক ক্ষীণ যোগসূত্র রচনা করে ফেলেছে ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো । শান্তনু এখনো ফেরে নি। দীপা হাউমাউ করে কেঁদেকেটে অস্থির । ইতিমধ্যে কলকাতায় খবর পৌঁছে গেছে। শান্তনুর বাবা ও দীপার জামাইবাবু যত তাড়াতাড়ি হয় ফ্লাইটে করে চলে আসছেন । যশবন্তগড়ের সেনা অফিসাররা এসে দীপাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ওয়ার মেমোরিয়াল এর ভিতরে নিয়ে গেলো । ম্যাডাম,আপ ইঁয়াহা আরামসে বৈঠিয়ে । হাম দেখতে হ্যায় কি আপকা হাসব্যান্ড কাঁহা হ্যায়? দীপার বুক ধড়াস করে উঠলো । যা সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চলছে সারা দেশ জুড়ে , শান্তনু কোনোভাবে ........আর ভাবতে পারলো না সে, চোখের পাতা ভিজে গেলো । মিউজিয়মটার যুদ্ধের শহীদদের নামের তালিকা, তখনকার অস্ত্রশস্ত্র , যশবন্তের ছবি ,চিন ভারতের কতখানি অধিগ্রহন করেছিলো ইত্যাদি দেখতে লাগলো সে অন্য ট্যুরিস্টদের সাথে। দীপার সামনে একটা শোকেসে কয়েকটা ছিন্নবিছিন্ন সামরিক উর্দির খণ্ড রাখা। যশবন্তের। টুকরো টুকরো করে মেরেছিল ওঁকে চীনারা । লড়াকু যশবন্ত মরে বাঁচিয়ে যায় অনেককে । মাথাটা হঠাৎ ঘুরে উঠলো দীপার । এক ঝটকায় দরজা খুলে উদভ্রান্তের মত দৌড়ে বেরিয়ে গেলো ।

ও জানে, শান্তনুকে কোথায় পাবে । ওদের একটা নির্দিষ্ট জায়গা ছিলো- প্রতিরাতে যশবন্ত সেখানে আসতো । মনপা যুবতী সেলা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ও খাবার দাবার নিয়ে সেখানে যেত। যশবন্তকে অরুনাচলের ভৌগোলিক সীমানার খুঁটিনাটি জানাত যাতে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও চীনারা ভারতীয় সেনা বাহিনীর হদিশ না পায় । পূর্বভারতের সীমান্ত রক্ষায় মনপা, আপাতানি, তাগিনস, নিশিস এসব উপজাতিদের যে কতটা অবদান আছে,ইতিহাস তা লিখে রাখেনি ।

হাঁফাতে হাঁফাতে অনেকটা দৌড়ে গেলো দীপা । চীনা সৈন্যবাহিনী যশবন্তকে ধরবার জন্য গ্রামে গ্রামে টিকটিকি লাগিয়েছিলো । মনপারা বিশ্বাসঘাতক নয়,কেউ যশবন্তের হদিশ দেয়নি । শেষে উপায় না পেয়ে সেলার পিছনে তাড়া করে চীনারা ।পঞ্চাশ বছর আগে এক ফুটফুটে পূর্ণিমা রাত্রি ,চাঁদ যখন ভাসছিলো ব্যাংগ্যাংজাঙ্ক নামক সরোবরে -তাড়া খেয়েও ভীত সন্ত্রস্ত তরুণী সেলা হার মানেনি । যশবন্তের কাছে রাজপুত মেয়েদের গল্প শুনেছে সেলা । জহরব্রত। আগে মান পরে প্রাণ। যশবন্তের হদিশ সে কিছুতেই দেবে না । এই মরদ তার । এই মাটি তাদের বহুদিনের, জন্ম জন্মান্তরের। চীনা সৈন্যদের তাড়া খেয়ে শেষে পাহাড়চূড়া থেকে সেলা ঝাঁপ দিয়েছিলো সরোবরে । লোকমুখে সেই দীঘি আজ, সেলা লেক ।

দৌড়চ্ছে দীপা । হ্যাঁ , সেই ঢিবিটার কাছে চলে এসেছে । ঐ তো যশবন্ত । সেলার দিকে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে কেটে গেছে পঞ্চাশটা বছর । একশো কোটি বছরের হিমালয় সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ।

অতল হাসি কি করবে ভেবে কূল পেলো না !




লেখক পরিচিতি
দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত 

কোলকাতার অধিবাসী। পেশায় চিকিৎসক।
চিকিৎসা বিষয়ে নানা নিবন্ধ লিখে থাকেন পত্র-পত্রিকায়।
লেখালেখিও তাঁর অন্যতম কাজ।

৩৩টি মন্তব্য:

  1. আমার এই গল্পটা আমার সদ্যহারানো বন্ধু প্লাস্টিক সার্জেন ডক্টর দেবব্রত রায়কে নিবেদন করলাম। সৃষ্টির থেকে আর ভালো কি দিতে পারি বন্ধুকে ?

    উত্তরমুছুন
  2. একটা অদ্ভুত পরিনতির দিকে কিভাবে যে নিয়ে গেলেন, বুঝতেই পারলাম না। মাঝখানে সীমান্ত মানুষের কথা, তাদের অভিমুখ, মনপা উপজাতির লোকগাথা, মিলিয়ে মিশিয়ে টেনে রাখলেন, এমনকি ক্রিকেট এর একটা উত্তেজনাও অনায়াসে মেশালেন,দারুন। ভালো থাকুন। লেখা চলতে থাকুক। ওঃ আর একটা কথা বাদ যাচ্ছিল, এই ফটোটা যিনি তুলেছেন তাঁর দৃষ্টির তারিফ না ক'রে পারা যায় না।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. উত্তর দিতে দেরি হল ,আশা করি উন্নাসিক ভাবেন নি আমাকে। খুব উৎসাহিত হলাম আপনার মন্তব্যে। ভাবছিলাম এই ধরনের নতুন এক্সপেরিমেন্ট চলবে কি না বাংলা সাহিত্যে। আমার কোনও জ্ঞানগম্যি নেই। অত্যন্ত সাধারনের বাচিক ব্যাপারস্যাপারকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। পাঠকের অনুভুতি ই আমার কাছে চরম পুরষ্কার । ফটোটা তুলেছেন আমার অত্যন্ত প্রিয়জন। আর এই প্রোফাইলে তা বাছাই করে যোগ করার দায়িত্ব নিয়েছেন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে -গল্পপাঠের সম্পাদক। বস্তুত , সম্পাদক না খুঁজে নিলে হয়তো এই লেখা অন্ধকারেই পড়ে থাকতো । সাথে থাকুন।

      মুছুন
  3. এক কথায় অপূর্ব। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লাম। কাহিনীর গতিতে এত চমক, এত বিভিন্ন ভাবাবেগ আচ্ছন্ন করে রাখবে যে কোনও পাঠককে। সেলা আর যশবন্তের সঙ্গে দেখা হবে না কোনও দিন; শান্তনু আর দীপাকে যদি একবার দেখতে পেতাম, দূর থেকে!

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনার মতো পাঠক পেলে যে কোনও লেখক বর্তে যাবেন । যথাসময়ে শান্তনু আর দীপাকে চিনিয়ে দেবো । আমি খুব খুশি যে এই গল্পটা পড়ে একজন ফিল্মমেকার যোগাযোগ করেছেন ,গল্পটা নেবেব তাই। এসবের কারন আপনাদের ভালো লাগার বহিঃপ্রকাশ । পাঠকই শেষ কথা।

      মুছুন
  4. এক কথায় অপূর্ব। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লাম। কাহিনীর গতিতে এত চমক, এত বিভিন্ন ভাবাবেগ আচ্ছন্ন করে রাখবে যে কোনও পাঠককে। সেলা আর যশবন্তের সঙ্গে দেখা হবে না কোনও দিন; শান্তনু আর দীপাকে যদি একবার দেখতে পেতাম, দূর থেকে!

    উত্তরমুছুন
  5. উত্তরগুলি
    1. ইন্দ্রনীলদা, একজন ভালো লেখক যখন একজন নতুনের প্রশংসা করেন তখন সাহস আরও বেড়ে যায় । প্রনাম।

      মুছুন
  6. অসম্ভব সুন্দর। ভালোলাগা ভাষায় ব্যাক্ত করার মত শব্দের সংগ্রহ আমার কাছে নেই।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক ধন্যবাদ জানাই। আপনার ভালোলাগাটুকু আমার মূলধন ।

      মুছুন
  7. অসম্ভব সুন্দর। ভালোলাগা ভাষায় ব্যাক্ত করার মত শব্দের সংগ্রহ আমার কাছে নেই।

    উত্তরমুছুন
  8. khub bhalo likhhechhish. darun concept, meye lekhikar durdanta cricket commentry kalpana kora jaina. Overwhelmed. Chalie ja. Anek subhechha roilo

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মাথা পেতে নিলাম। এরপরে আমার অন্যান্য লেখাগুলোর উপর ও নজর রাখা চাই।

      মুছুন
  9. ami tor senior,R G Kar er blogger account ta r nam change kora ache!

    উত্তরমুছুন
  10. Dolon, aro lekho, likhe jao. ki likhcho , keno likhcho vebo na--- sudhu lekhar srote nijeke vasiye de. duniya toke kurnish korbe.

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আপনার কথা মেনে নিচ্ছি।লিখছি। কিন্তু প্রচারের আশা করি না, কারন সেখানে অনেক গোলমেলে রসায়ন। লিখছি মনের তাগিদে। ভুলভাল হবেই।সমালচনাও হোক । কিন্তু লেখা ছাড়বো না। এই জেদটাও আপনার থেকে নেওয়া উত্তরাধিকার । হাতটা আমার মাথায় রাখুন।

      মুছুন
  11. লেখালেখির অভ্যেস নেই, পাঠক ও মধ্যম মানের। মন্তব্য করার সাহস ও নেই কিন্তু এমন গতি আর ব্যতিক্রমী লেখা যে মনের ভাব তা গোপন করতে পারলাম না। এটা যদি একতা সিনেমা হয় তা হলে পাত্র পাত্রী সবাইকে দেখতে পাব। আপনাকে ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. পাঠকের মান মধ্যম কি উচ্চ কি নীচ তা বিচার করবে কে? এটা কোনও বিষয় নয়। আপনার ভালো লেগেছে তাই তৃপ্ত ।সিনেমার কথা অনেকেই বলছযায়। দেখি কি করা যায়
      ।ধন্যবাদ ।

      মুছুন
  12. GOLPOTA EKTU KANCA, TAI SWAD KOSAY- TOK , AASHA KORI PAKBE O SUMISTO HOBE ,

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মিষ্টি করতে চাই কিন্তু তার আগে জানতে হবে টক কেন। কোন কোন অংশ কাঁচা এবং কেন আপনার ভালো লাগেনি বললে খুব খুশি হবো । আমাকেও তো লেখক হিসেবে পাকতে হবে।সাথে থাকুন,ধন্যবাদ।

      মুছুন
  13. I have haired about the story of Arunachal Pradesh and the story of Jasbant Singh "The Super Hero of Indian Army". Now Memorized Once again. Hope that the story will be continue for next...

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অনেক ধন্যবাদ গল্পটা পড়ার জন্য। গল্প তো শেষ ।কিন্তু হ্যাঁ রেশ একটা রয়ে গেলো বটে ।

      মুছুন
  14. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  15. দোলন, পড়লামরে ! অসাধারণ ব্যাপ্তি, তবে আমার মনে হল তোর অন্য লেখার মত আরেকটু সাবলীল হলে আরো সুন্দর হ'ত। লিখে যাও। আমার পড়া হয়না, তাতে কী? ভাল থাকিস সবাই।

    উত্তরমুছুন
  16. তবু আমার সৌভাগ্য যে এটা পড়েছো । চরিত্রগুলোকে কেমন লাগলো ?

    উত্তরমুছুন
  17. Seemanter bornona, romanticism, fantasy miliye besh obhinobo bhabna... songe cricket-er nimki.

    Srabani Dasgupta,

    উত্তরমুছুন
  18. ধন্যবাদ । আপনার ভালো লাগায় আমার তৃপ্তি ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. Amar-o gota dui galpo ekhane achhe. Porhle khushi hobo.
      srabani Dasgupta.

      মুছুন
    2. কোন সংখ্যায় ? পড়ে জানাচ্ছি।

      মুছুন
    3. Keno? Ei sonkhyatei toh! Ager sonkhyateo achhe... porho... :D

      Srabani Dasgupta

      মুছুন
  19. khub sundor laglo golper uposthapona.... egiye cholo.... lekhar style besh tene ney ...

    উত্তরমুছুন
  20. recently ghure esechhi Guwahati theke Bhalukpong...Dirang...Tawang..Bomdila...ar sela pass diye jete jete ei golper kathaguloi mone porchhilo.....

    উত্তরমুছুন