বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প : ধরা দিয়েছি গো..

(১)

ওদের দেখা হত প্রায়ই । ঠিক যেমন আর পাঁচটা ঊনিশ কুড়ির ছেলে মেয়ে বাড়িতে বলে কলেজ যাচ্ছি কিম্বা টিউশানে যাচ্ছি ওদেরো তেমনি করে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা হত । ধরাবাঁধা কোনো সময় ছিলনা । ছিলনা মোবাইল ফোন , এসেমেস । তবুও দেখা করার ইচ্ছেটাই যেন পেয়ে বসত । একেই বলে টিন-এজ প্রেম । একেই বলে প্রথম যৌবনের প্রেমে পড়া । কেমন যেন এক ভালোলাগার স্রোতে সর্বক্ষণ অবগাহন । মাথায় আর কিছুই ঢোকেনা তখন । পড়াশুনো, গতানুগতিক কলেজ যাওয়া, সবকিছুই চলছে । কিন্তু মুখ্য সেই ছেলেটা । তার চোখজোড়া, তার এম শেপের উন্নত ললাট, মরচে পড়া গায়ের রঙের সুঠাম পুরুষ শরীর, তার সিগারেট খাওয়া কালো ঠোঁটজোড়া ! সারা বুক পিঠ জুড়ে কালো লোম । যেন মহাভারতের অর্জুন ! আর তার কৃষ্ণা হল দূর্বা ।


বেশ ভালই মাছটি বঁড়শীতে গেঁথেছে অনীশ । দূর্বা সুন্দরী নয় তবে সব মিলিয়ে সুন্দর বলতে যা বোঝায় । প্রস্ফূটিত যৌবনে কুক্কুরীও সুন্দরী । দূর্বাও তাদের দলে । মিষ্টি স্বভাব । দুষ্টু হাসি তার টোল খাওয়া গালে উপচে পড়ছে । আর বাঁদিকের গজদাঁতে একটা অদ্ভূত ভালোলাগা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সবসময় । অর্গ্যান বাজিয়ে গান গায় সে । সারাপাড়া যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শুরু হয় দূর্বার সঙ্গীতসাধনা । অনীশ আর দূর্বার প্রেমের অনুঘটকটি হল এই গান ।

দূর্বার নিজের দিদি তমালীর বিয়ের যখন কথাবার্তা হয় সেই তখন থেকেই অনীশের এই বাড়িতে আনাগোনা । দূর্বা তখন ক্লাস সেভেনে । তমালীকে দেখতে আসার দিন থেকেই দূর্বা আর অনীশের দৃষ্টি বিনিময় শুরু হয়েছে । দূর্বা তখন ভালোবাসা, প্রেম এসবের কিচ্ছু বোঝেনা । কিন্তু অনীশ বোঝে । সে তখন ফার্স্ট ইয়ার । সিটি কলেজের ইকো অনার্স । বাড়ির আর্থিক চাপ ও যথেষ্ট । নাইট কলেজে পড়ার পাশাপাশি সাতসকালে প্রাইমারী স্কুলের ফুলটাইম টিচার অনীশ । সকাল ছ'টা থেকে বেলা দশটা অবধি স্কুল পড়িয়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ি গিয়ে " মা ভাত বাড়ো " বলেই গামছা কাঁধে গঙ্গায় গিয়ে গোটা দশেক ডুব দিয়েই বাড়ি এসে নাকে মুখে মাছের ঝোল-ভাত গুঁজে আবার সাইকেল নিয়ে স্টেশন পর্যন্ত । সেখানে সাইকেল রেখে ট্রেনে করে কোলকাতায় এসে সিটি কলেজে নাইটে অনার্সের ক্লাস করা ।

মফঃস্বলে এমনটিই হয় । বাড়ির কাছেই নদীকে ছোঁয়া যায় । হাত বাড়িয়ে গাছের আমটি, বাতাবীলেবুটি পাওয়া যায় । পাড়ায় সকলে সকলের খোঁজ নেয় । সামনাসামনি দুই বাড়ির মধ্যে উঠোনের গাছের কাগজিলেবু, কাঁচালঙ্কার আদানপ্রদান হয় । মায়েদের দুপুরবেলা বারান্দায় চুল শুকোতে শুকোতে খবরের কাগজের দুর্ঘটনা, বায়োস্কোপ,মটরডালের চাপড় ঘন্ট সবকিছুই চলতে থাকে । এমনই এক মফঃস্বলে মানুষ হয়েছে অনীশ । ভীষণ চাপ অনীশের । বাড়িতে আইবুড়ো বোন । বাবার সামান্য চাকরী। ছোট ভাই পড়ছে আর বড় দাদা অনুপ, সরকারি চাকরী পেয়ে মেদিনীপুরে পোস্টেড । অনীশের এই দাদাটির জন্য দূর্বার দিদি তমালীকে দেখতে যাওয়া আর সেই থেকে তমালী-অনুপের বিয়ে আর দূর্বা তখন থেকে দিদি তেরা দেওর দিওয়ানা ।

দূর্বাদের অবস্থা অনীশদের থেকে অনেক ভালো । শুধু অনুপ ভালো পড়াশুনো করে সরকারী চাকরী করে আর পালটি ঘর বলে নামকরা নারাণ ঘটকের আনা সম্বন্ধে রাজী হয়েছিলেন তমালীর বাবা । তমালীর বিয়ের বাসরে দূর্বার গানে সম্মোহিত হল অনীশ ।

"ও পলাশ, ও শিমূল ..."

বন্ধুদের আবদারে অনীশ ধরল " তীরভাঙা ঢেউ আর নীড়ভাঙা ঝড় " ।

আর বন্ধুরা দূর্বা আর অনীশকে নিয়ে সেই দিনটি থেকে শুরু করল ক্ষ্যাপানো ।

তারা সম্মিলিত ভাবে শুরু করল " মাঝে নদী বয় রে, এপারে তুমি শ্যাম্, ওপারে আমি "

এই ভাবেই প্রেমের স্ফুলিঙ্গে, দাহ্যবস্তু আহুতি পর্ব চলতে লাগল । লজ্জায় ভয়ে রাঙা হয়ে যাওয়া আর গোপন চুপকথার চিলেকোঠায় ভালোবাসার কথায় হ্যালুশিনেসন ওদের প্রেমের হাইওয়েতে । অনীশের কলেজের ছুটির ফাঁকে আর দূর্বার স্কুলের পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে । হাতীবাগান, চৌরঙ্গী, গড়ের মাঠ, মেট্রো সিনেমা সাক্ষী হয়ে র‌ইল ওদের নিষ্পাপ প্রেমের ।এরপর অনীশ চাকরী পেয়েছে একটি এমএনসিতে । খুব বড় চাকরি না হলেও কলকাতার মধ্যবিত্তের বাজারে সেই অনেক আর অনীশদের বাড়ির যা অবস্থা তাতে ইকো অনার্স নিয়ে পাশ করার পর আর পড়াশুনো চালানোও ছিল দুষ্কর । তখন অনীশের বছর বাইশ আর দূর্বার ষোলো । মাধ্যমিক প্রস্তুতির সাথে সাথে বেঁচে র‌য়ে গেল তাদের প্রেমপর্ব আর যথারীতি লুকিয়ে চুরিয়ে দেখাশুনো । অনীশকে কাজের জন্য খুব ট্যুরে যেতে হত । তখন থেকে শুরু হল গোছা গোছা চিঠি লেখা । দূর্বার উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডী পেরিয়ে কলকাতার কলেজে ভর্তি হওয়া আর অনীশের বড় প্রোমোশান । বেশ চলছিল । ছোটবোনটির বিয়েও দিল অনীশ । বোনের বিয়েতে দূর্বাও তমালীর বোন হিসেবে উপস্থিত । আবার একটু অজানা গোপন প্রেম, একটুকু ছোঁয়ালাগা গান, বন্ধুদের ঠাট্টা-মশকরা, বাসর , অন্ত্যাক্ষরী বেঁচে র‌ইল যৌবনের অনুষঙ্গ রূপে ।


দূর্বা যখন কলেজে ফাইনাল ইয়ারে, অনীশ দূর্বাদের বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল । কিন্তু খুব আপত্তি উঠেছিল । দূর্বার মায়ের অনীশকে পছন্দ হলেও ওর বাবা এক বাড়িতে দুই মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বেশ অনিচ্ছুক হয়েই প্রায় নাকচ করে দিলেন সেই প্রস্তাব । কিন্তু অনীশও নাছড়বান্দা । প্রতিষ্ঠিত এলিজিবল ব্যাচেলর ।

"কিন্তু মেসোমশাই, এটা তো কোনো ফ্যাকটর নয় । আমি আর দূর্বা একে অপরকে কত ছোট থেকে চিনি, আপনারা তো জানেন তাহলে বাধা কোথায়" অনীশ বলল ।

দূর্বার বাবা রেগে গিয়ে বললেন " কাজ করো তো প্রাইভেট ফার্মে , ওসব চাকরীর কোনো নিরাপত্তা আছে? আর এক বাড়িতে দুই কুটুম.. এ চলেনা"

ইতিমধ্যে পাশের ঘর থেকে দূর্বা সব শুনে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে । অপমানে বিদ্ধস্ত অনীশ একটা খচখচানি নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল ।

রাতে দূর্বাকে ফোন করল । সকলে ঘুমিয়ে পড়ার পর দূর্বাই কেবল দৌড়ে এসে বসার ঘরে ফোনটা ধরে এ সময় ।

"কাল কলেজ ফেরত শ্যামবাজার ট্রামডিপোর কাছে এসো পাঁচটার সময় "

দূর্বা বলল " সে পথ বন্ধ , কাল থেকে আমার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাবা । বলেছে, তোমার সাথে লুকিয়ে দেখা করে যদি আমি বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি করে ফেলি"

"কিন্তু এভাবে কি করে হবে দূর্বা?"

"তুমি বরং চাকরীতে বদলী নিয়ে অন্য শহরে চলে যাও আর আমাকে ভুলে যাও অনীশ" বলে ফোন রেখে দিল দূর্বা ।

অধরা থেকে গেল অনীশ-দূর্বার প্রেমের রূপকথা। জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে । না চাইতে যেমন অনেক কিছু মেলে আবার চেয়েও অনেক কিছু মেলেনা । মনকে প্রবোধ দিল দুজনে । ধীরে ধীরে থিতিয়ে পড়ে গেল চুপকথার অধঃক্ষেপ । অনীশের জন্য দূর্বার বড্ড কষ্ট হল । অনীশেরও তাই । কত কথা যেন বলা হয়েও হল না ।

(২)

দূর্বা প্রাইভেটে বিএ পাশ করে একটা কম্পিউটার কোর্স করে ভাল চাকরী করছে এখন । তমালীর শ্বশুরবাড়িতেও যায় নি আর । অনীশ চাকরি করতে করতে এমবিএ করেছে । বিদেশে পাঠিয়েছে সেই এমএনসি তাকে । উঁচু পোষ্ট তার । বৌদির হাত দিয়ে দু একটা চিঠি লিখেওছিল প্রথম প্রথম দূর্বাকে । তারপর যা হয় । দূর্বাও ব্যস্ত নিজের কেরিয়ার নিয়ে আর অনীশও । কোনো এক সময়ে হয়ত দেখা হয়ে যাবে তাদের এই ভাবনা বুকে নিয়ে চাকরী আর কর্তব্যকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে দুজনেই ।

বেঁচেও রয়ে গেল মনের ইচ্ছেগুলো মনের মধ্যেই । শুধু ডানা মেলে উড়তে বড় কষ্ট হল ।

বাবার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দূর্বা কেটে ছেঁটে ফেলে দিল অনীশের চিন্তা । এ যেন সেই রামায়নের আদর্শবাদের গল্প । ভালো মেয়ে হয়ে জীবন কাটানোর স্বপ্ন । মনের দুঃখকে মনের মধ্যে পুষে রেখে দুঃখ নিয়ে অহেতুক বিলাসিতার ইচ্ছে । এ যুগে অনেকে পালিয়ে বিয়ে করে নেয় । বাড়ির অমতে অন্যত্র গিয়ে সংসার পাতে । কিন্তু অনীশ আর দূর্বার এই ব্যতিক্রমী আচরণে বাড়ির আর পাঁচজন চিন্তাভাবনা করলেও তাদের বিন্দুমাত্র হেলদোল লক্ষ্য করা গেলনা । কানাঘুষো শোনা গেল বাবার মৃত্যু পর্যন্ত দূর্বা সেই বালুচরী গল্পের নাযিকা হয়েই থেকে যাবে । দূর্বা চাকরীতে ঢোকার ঠিক পরে পরেই মারা গেলেন বাবা । নতুন অফিসে জয়েন করে দূর্বা আবার প্রেমে পড়ে গেল নতুন কাজের । কাজ আর কাজ তাকে পেয়ে বসল । অনীশ- চিন্তা মাথায় মাঝেমধ্যে উঁকি দিলেও চোখে তার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন তখন । অনীশ তার বৌদির কাছ থেকে দূর্বার মোবাইল নাম্বার নিয়ে ফোন ও করেছে কয়েকবার । দূর্বাও সাথে সাথে অনীশের নাম্বার সেভ করে রেখেছে ।

অনীশ আবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেছে " এবার তো আমরা বিয়েটা সেরে নিতেই পারি দূর্বা '

কিন্তু কথা বললেই কি আর হল ? অনীশ তখন কোলকাতায় আর দূর্বা আহমেদাবাদে ।

"আর যা হয় এখনকার মেয়েরা একবার চাকরীর স্বাদ পেয়ে গেলে সংসার করার ইচ্ছেটাই তাদের মাথা থেকে চলে যায়' প্রায়ই এমনটি বলেন দূর্বার মা ।

কোলকাতায় থাকলে মা খাবার টেবিলে বসে বলেন " বাপের ওপর অভিমান আর কদ্দিন পুষে রাখবি রে? উনি তো আর দেখতে আসবেন না'

দূর্বা টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে । কোনো উত্তর দেয়না মায়ের প্রশ্নের ।

অনেকদিন কেটে গেছে এরপর ।পৃথুলা দূর্বার মেনোপজ আগতপ্রায় । বেশিক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে কাজ করলে মাথা ঝিমঝিম করে । বিকেলের দিকে এসির মধ্যেও কানের দুপাশটা দিয়ে আগুণের হলকা ছোটে । রাতে ঘুমের ওষুধ খেতে হয় । তা ছাড়া ক্যালসিয়াম আর মাঝেমধ্যে পেন কিলারো খেতে হয় আজকাল । খুব অসহায় লাগে এক এক সময় । হঠাত একদিন দুপুরবেলা অফিসে বসে মনে হল অনীশের মোবাইল নাম্বারটা ডায়াল করতে । অনীশ তো অকূলে কূল পেয়েছে দূর্বার ফোন পেয়ে । 'একটা গান করো না প্লিজ ' বলে ওঠে সে ।

একথা সেকথার পর ঠিক হল ওরা ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে দার্জিলিং বেড়াতে যাবে চারদিনের জন্য ।

দূর্বা আমেদাবাদ থেকে কোলকাতায় এসে বাগডোগরার ফ্লাইট ধরবে । আর অনীশ তো দমদম থেকেই উঠবে একসাথে । প্লেনের টিকিট মেল করেছে অনীশ দূর্বাকে । গুছিয়ে অনীশ সব ব্যবস্থা করে রেখেছে আমেদাবাদ থেকে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছে ঘন্টা তিনেক পর ধীরে সুস্থে বাগডোগরার ফ্লাইট ওদের । মধ্যিখানে ওরা লাঞ্চ খেয়ে নেবে এয়ারপোর্ট হোটেলেই । একটু মাগ্যিগন্ডার সব খাবারদাবার । তবুও একটাদিন আর দূর্বার সঙ্গে এতদিন বাদে দেখা হতেই একটু বসতে হবে গুছিয়ে । সেখানে খাওয়াটা আর তার দামটা সেকেন্ডারি । দূর্বা এখনো প্রাইমারী তার অনীশের কাছে ।

দুজনের বুকের মধ্যে তোলপাড়। স্বপ্নের ঢেউগুলো এতদিন বাদে আছড়ে পড়ছে মনের মধ্যে । অনীশ ভাবছে দূর্বার কথা । হয়ত চুল গুলো কেটে ফেলেছে আমার প্রথম প্রেম । হয়ত চোখে তার চালশের চশমা । দূর্বা কি বুড়িয়েছে ? সেই যেমন করে প্রথম সিনেমায় ওর হাতদুটো শক্ত করে ধরে রেখেছিল বুকের মধ্যে, তেমন ছটফটে আছে তো তার দূর্বা ?

ভাড়ার গাড়ি করে অফিস থেকে আমেদাবাদ এয়ারপোর্ট চলেছে দূর্বা । গাড়ির জানলা দিয়ে চোখদুটো তাকে বাইরে টেনে রাখতে পারছেনা । মনের মধ্যে শুধু অনীশের চশমা পরা মুখটা । আবার দেখা হলেই বলবে সে "চশমা খোলো, তোমাকে চশমা পরলে বুড়োটে লাগে কিম্বা তুমি এত গম্ভীর হয়ে যাও কেন বলত ' অথবা 'অনীশ তুমি ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখোনা'

ওকে দেখে আবার অনীশ তার লোমশ হাতদুটো দিয়ে ওর গালদুটো ঢেকে দেবে তো আদর দিয়ে ?

দূর্! এই মধ্য জীবনে এসে এই সব ন্যাকামি কি মানায় আর ! এখন আলোচনা হবে অফিস নিয়ে, কাজ নিয়ে ।

একটা এসেমেস পাঠালো গাড়িতে বসে 'অন দ্য ওয়ে টু এয়ারপোর্ট'

ওদিক থেকে অনীশ লিখল 'উইল ক্যাচ ইউ সুন'

আবার দূর্বা টাইপ করল ' আবার সেদিনগুলোর কথা মনে পড়ছে ..'

মেসেজটা সেন্ড করতে না করতেই হাত থেকে মোবাইলটা ছিটকে গেছে ততক্ষণে ।

মূহুর্ত্তের মধ্যে উল্টো দিক থেকে প্রকান্ড একটা এইটিন হুইলার ট্রাক এসে গাড়ির সাথে হেড অন কলিশান আর সব শেষ । আজকাল রাস্তাঘাটে তো এমন আকচার হয় । কাগজ খুললেই এক্সিডেন্ট । কেউ হয়ত বেঁচে ফিরে আসে। কেউ আবার মরতে মরতেও বেঁচে যায় । ঠিক তেমন করেই দূর্বার জীবনটাও পড়ে র‌ইল হাইওয়ের ধারে । খোঁজ খবরও হল একসময় । খবরের কাগজের লোকজন, টিভির ক্যামেরা সবাই ঘুমন্ত, রক্তাক্ত দূর্বার ছবি নিল । মোবাইলটা ভীড়ের মধ্যে কোথায় জানি হারিয়ে গেছিল । কারোকে ঠিক সেই মূহুর্ত্তে খবর দেওয়া যাচ্ছিলনা । পার্সের মধ্যে ছোট্ট একটা চিরকূটে ওর বাড়ির নাম্বার পাওয়া গেছিল । খবরও গেছিল পরদিন ।

তমালী তখন ওর মায়ের কাছে । অনীশের ঘোরটা তখনো কাটেনি । দূর্বা-তমালীর মা কেবলি বলছিলেন 'ছেলেটা বেঘোরে গেল রে'

কেউ জানতনা ওদের দার্জিলিং-প্ল্যানের কথা । আবার চুপিচুপি গোপন প্রেমের বৃষ্টি এসেছিল ওদের মাঝ-জীবনের বর্ষায় ।

সেদিন সকালে অফিসে যাচ্ছিল অনীশ খুব তাড়াহুড়োয় । সল্টলেক অফিসে একটিবার ঢুঁ মেরেই দমদম আর তারপরই দূর্বা । যেন সব পেয়েছির দেশ পাড়ি দেবে । দূর্বার পছন্দের বেজ রঙের টিশার্টে অনীশ । দূর্বার শেষ মেসেজটারও রিপ্লাই করেছিল ।

অফিস থেকে এয়ারপোর্ট যেতে একটা ঝাঁ চকচকে বাসে উঠতে গিয়ে স্লিপ করে গেল অনীশের পা । হয়ত কিছুটা আনন্দের আতিশয্যে কিছুটা অন্যমনস্কতায় । পিছন থেকে আর একটা বাসের চাকা চলে গেছিল তার মাথার ওপর দিয়ে ।

দার্জিলিংয়ের হিমালয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল ওদের মন দুটো । মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুরে ধুয়ে গেল সব না পাওয়ার গল্প । হয়ত বা দুজন দুজনকে আরো কাছাকাছি পেয়ে গেল সারাটা জীবনের মত ।উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা টাইগার হিলের সূর্যোদয়ে সোনার হাসি ছড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের গম্ভীর বরফের মুখে । ভোরে তখন ভৈরবীর মূর্ছণা । পুবের আলো ফুটিফুটি করে সবেমাত্র আলস্য কাটিয়ে উঠছে কুয়াশার চাদর সরিয়ে । ছোট ছোট নাক-চেপটা বাচ্চাগুলো খিলখিল করে হাসতে হাসতে পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পথ বেয়ে ব্যাগ কাঁধে করে স্কুলের পথে চলল । রডোডেন্ড্রন হাসতে লাগল পাহাড়ের গায়ে প্রাণভরা খুশিতে । খলখল করে পাহাড়ের ঝোরা গান গেয়ে উঠল । কলকল শব্দে, নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে অবিরত প্রগাঢ় চুম্বন পরব চলছে তখন । শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া আর হিমালয়ের কঠিন শাসনে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই তাদের । দূর্বা যেন ঝরণা হয়ে রয়ে গেল অনীশকে আঁকড়ে ধরে ।



লেখক পরিচিতি
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

জন্ম সাল ১৯৬৫।
জন্মস্থান আড়িয়াদহ।
বর্তমান আবাসস্থল : দক্ষিণ কলকাতা।

ছোটগল্পপ্রবন্ধভ্রমণ কাহিনীকবিতাঅণুগল্প লেখেন।
প্রকাশিত  কবিতার ব‌ই : মোর ভাবনারে"। 
রান্নার ব‌ই :  English)  89 Recipes.
ভ্রমণকাহিনী : চরৈবেতি। 
ছোটগল্প সংকলন : দ্বাদশী 
প্রাপ্ত পুরস্কার : দ্বাদশ বেহালা ব‌ইমেলায়(২০০৯) কবিতার ব‌ই শ্রেষ্ঠ পুরষ্কারে সম্মানিত ।
রোমানিয়ান পত্রিকায় কবিতার অনুবাদের জন্য রোমানিয়ান ব্লগের প্রেসকার্ড ।
সাধারণ ব্লগ : www.sonartoree.com 
ভ্রমণ-ব্লগ: www.charaibety.blogspot.in 
কবিতার ব্লগ: www.chhinnopata.blogspot.in 
সম্পাদিত ই-পত্রিকা: papyrus.sonartoree.com
ইমেইল-ঠিকানা : indira@sonartoree.com










1 টি মন্তব্য:

  1. গল্পটার মোড়ে মোড়ে এতো চমকপ্রদ মোচড় যে অবাক হলাম। পড়তে ভালো লাগে,কিন্তু পরিণতিতে মন্ টা উদাস হয়ে গেলো। এ কেমন ধরা ? বিরহেই মিলন ? আরও চাই গল্প।

    উত্তরমুছুন