শুক্রবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৪

জেমস জয়েসের গল্প : অতিথিশালা

অনুবাদ : মোবারক হোসেন খান

মিসেস মুনি ছিল এক কসাইয়ের মেয়ে। সংসারের কাজকর্মে খুব দক্ষ। আর অত্যন্ত জেদি মহিলা। পিতার দোকানের ফোরম্যানকে বিয়ে করে স্প্রিং গার্ডেনের কাছে নিজেরাই একটা মাংস বিক্রয়ের দোকান খুলল। কিন্তু শ্বশুর মারা যাওয়ার কিছুদিন যেতে না যেতেই মি. মুনি লাগামহীন জীবনযাপনের দিকে ঝোঁকে পড়ল। আকণ্ঠ মদ গিলে ভাঁড় হয়ে থাকত। দোকানের টাকা চুরি করে অপব্যয় করতে লাগল। ঋণে মাথা পর্যন্ত নিমজ্জিত হলো। অনেক চেষ্টা চরিত করেও মিসেস মুনি স্বামীর স্বভাব বদলাতে পারল না। হয়ত দু'চারদিন ঠিক থাকে। তারপর আবার যে কি সেই। খদ্দেরের সামনেই স্ত্রীকে গালিগালাজ করত। দোকানে বিক্রির জন্য খারাপ মাংস কিনে আনত। ফলে, ব্যবসাটা একেবারে অধঃপাতে যেতে বসল। একদিন তো সে মাংস কাটার ছুরি নিয়ে স্ত্রীকে তাড়া করল। বেচারী স্ত্রীকে বাধ্য হয়ে সে রাতটা প্রতিবেশীর বাড়িতে কাটাতে হলো।


তারপরের দিন থেকে তারা আলাদা থাকতে লাগল। মিসেস মুনি ধর্মযাজকের কাছে গিয়ে তালাকের সব ঠিকঠাক করে এলো। সে সঙ্গে ছেলেমেয়েদের নিজের তত্ত্বাবধানে রাখার জন্য সব ব্যবস্থা করতেও ভুললো না। স্বামীকে সে কিছুই দিল না। না টাকা, না খাদ্য সামগ্রী, না আশ্রয়। স্বামী বেচারা তখন শেরীফের শরণাপন্ন হয়ে একটা চাকরির জন্য রোজ রোজ ধরনা দিতে লাগল। মিসেস মুনি মাংস বিক্রয়ের সঞ্চিত টাকা দিয়ে হার্ডউইক স্ট্রিটে একটি বোর্ডিং হাউস খুলল। তার বোর্ডিং হাউসে লিভারপুল আর আইন অব ম্যান থেকে পর্যটকরা ভিড় জমাত। তাছাড়া, কিছু শিল্পীও এখানে থাকত। বোর্ডিং হাউসের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিল শহরের করণিক। মিসেস মুনি বেশ চাতুর্য আর দৃঢ়তার সঙ্গে বোর্ডিং হাউস তত্ত্বাবধান করত। কখন বাকি দিতে হবে আর কখন শক্ত হতে হবে কিংবা কখন চুপ থাকতে হবে সব কিছুই বেশ আয়ত্ব করে ফেলেছিল। বোর্ডিং হাউসের তরুণ বাসিন্দারা তাকে 'মাদাম' বলে ডাকত।

মিসেস মুনির বোর্ডিং হাউসের তরুণ বাসিন্দাদের থাকা-খাওয়ার জন্য সপ্তাহে পনেরো শিলিং দিতে হতো। অবশ্য খাওয়ার সঙ্গে বিয়ার বা দামি ডিনার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অধিবাসীদের সবার রুচি আর পেশা একই ধরনের ছিল বলে তাদের পরস্পরের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে তাদের প্রিয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করত। মাদামের পুত্র জ্যাক মুনি ফ্রিট স্ট্রিটে এক কমিশন এজেন্টের ওখানে চাকরি করত। বেশ রুঢ় বলে তার বদনাম ছিল। তার স্বভাব-চরিতও ভালো ছিল না। গভীর রাতে বাড়ি ফিরত। প্রতি রোববার রাতে মিসেস মুনির ড্রয়িং রুমে হামেশাই সবাই আনন্দ হৈ-হুল্লোড় করার জন্য মিলিত হতো। সঙ্গীত শিল্পীরা গান গাইতো। বাদকরা গানের সঙ্গ বাদ্যযন্ত্রে ঝংকার তুলত। মাদামের কন্যা পলি মুনিও গান গাইতঃ

‘আমি এক... বদ ছোকড়ি
সব রকম ভানের খেতা পুড়ি!
ভাল করেই জানো তো আমায়।’

পলির বয়স উনিশ। হালকা-পাতলা গড়ন। মাথার চুলগুলো বেশ কোমল আর ছোট মুখটা বেশ ভরাটে। ধূসর চোখ দুটোর চারদিকে সবুজের ছায়া। কারো সঙ্গে কথা বলার সময় উপরের দিকে তাকানো তার স্বভাব। ফলে, তাকে বেপথু ম্যাডোনা বলে মনে হতো। মিসেস মুনি কন্যাকে প্রথমে কর্ন-ফ্যাক্টরের অফিসে টাইপিস্ট হওয়ার জন্য পাঠাল। কিন্তু শেরীফের অফিস থেকে এক বদমাস লোক একদিন অন্তর সেখানে এসে তার কন্যার সঙ্গে কথা বলতে চাইতো বলে মিসেস মুনি কন্যাকে বাড়িতে এসে ঘরকন্যার কাজে লাগিয়ে দিল। অবশ্য এর পেছনে মিসেস মুনির আরেকটা উদ্দেশ্যও ছিল। পলির বয়স কম বলে বেশ প্রাণচঞ্চল। বোর্ডিং হাউসের বাসিন্দারা স্বাভাবিকভাবেই এজন্য একটা বাড়তি আকর্ষণ বোধ করত। পলি অবশ্য শুধু তরুণীদের সঙ্গেই মেলামেশা করতে ভালোবাসত। মিসেস মুনি এতে বাধা দিত না। কারণ, যুবকের দল যে বেশি দিন একঘাটের জল খেতে পছন্দ করে না সে কথা তার জানা ছিল। এভাবে বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেল। মিসেস মুনি মেয়েকে আবার টাইপ-রাইটিংয়ের কাজে পাঠাবে বলে ঠিক করতে গিয়ে এক তরুণের সঙ্গে পলির মন দেয়ানেয়ার পালা চলছে বুঝতে পারল। মিসেস মুনি দু'জনের ওপর নজর রাখতে লাগল আর মনে মনে নিজের কর্তব্য স্থির করতে লাগল।

পলি অবশ্য বুঝতে পারল তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। মায়ের নীরবতার উদ্দেশ্য বুঝতে তার কষ্ট হলো না। মা ও মেয়ের মধ্যে যেমন খোলাখুলি বিরোধিতা ছিল না তেমনি দু'জনের মধ্যে কোনো অকপট বোঝাপাড়াও ছিল না। কিন্তু তাই বলে মানুষের মুখ তো আর চাপা দিয়ে রাখা যায় না। বোর্ডিং হাউসের বাসিন্দারা দু'জনের হৃদয়ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনামুখর হয়ে উঠল। তাসত্ত্বেও মিসেস মুনি বাধা দিল না। পলি মায়ের আচরণে বিস্ময় বোধ করতে লাগল। আর প্রেমিকপ্রবর মনের ভিতরে অশ্বস্তিতে ভোগতে লাগল। অবশেষে, মিসেস মুনি যখন বুঝল, হস্তক্ষেপ করার সময় উপস্থিত, তখন আর দেরি করল না।

সেদিনটা ছিল রোববার। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। তাপ থাকলেও হালকা বাতাসের দরুণ প্রখরতার তীব্রতা অসহ্য ছিল না। বোর্ডিং হাউসের সব জানালা খোলা। বাতাসে জানালার পর্দাগুলো দোলছিল। গির্জা থেকে মৃদ্যু ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছিল। বোর্ডিং হাউসের বাসিন্দাদের ব্রেকফাস্ট শেষ হয়ে গিয়েছিল, টেবিলের ওপর কাপ-প্লেটগুলো ইতঃস্তত ছাড়ল। প্লেটের গায়ে ডিমের হলুদ কুসুম আর শুকরের চর্বির উচ্ছিষ্ট লেগেছিল। মিসেস মুনির পরিচারিকা মেরী টেবিল থেকে পরিত্যক্ত কাপ-প্লেটগুলো পরিষ্কার করার কাজে ব্যস্ত। মিসেস মুনি একটা হাতাঅলা চেয়ারে বসে মেরীর কাজ দেখছিল। আর মাঝেমধ্যে এটা ওটা নির্দেশ দিচ্ছিল। মিসেস মুনির নির্দেশমতো মেরি পাউরুটির উচ্ছিষ্ট শক্ত কিনারগুলো পুডিং তৈরির জন্য এক জায়গায় জমা করে রেখ দিল। চিনি আর মাখনের ভা- মিটসিবে তুলে রেখে তালা মেরে রাখল। মিসেস মুনি গত রাতে পলির সঙ্গে কথাবার্তাগুলো নতুন করে রোমন্থন করতে লাগল। সে যা সন্দেহ করেছিল ঘটনা তা-ই ঘটেছে। সে যেমন পলিকে খোলাখুলি প্রশ্ন করেছে, পলিও তেমনি খোলাখুলি উত্তর দিয়েছে। অবশ্য দু'জনেই কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করেছি। মিসেস মুনি এভাবে মেয়ের কাছ থেকে কথা শুনবে। কোনোদিন যেমন ভাবেনি, পলিও মায়ের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেনি।

মিসেস মুনি হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। গির্জার ঘণ্টাধ্বনি থেমে যেতেই সে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িটার দিকে তাকালো। এগারোটা বেজে সতেরো মিনিট। ডোরানের সঙ্গে দুপুর বারোটার মধ্যেই একটা ফয়সালা করে ফেলতে পারবে বলে ভালো। আর সে যে জিতবে তাতে নিশ্চিত ছিল। কেননা, প্রথমত সামাজিক অভিমত তার পক্ষে এবং দ্বিতীয়ত সে একজন অপমাণিত জননী। সে ডোরানকে একজন ভদ্রলোক ভেবে তার বোর্ডিং হাউসে থাকতে দিয়েছে, আর সে কিনা মিসেস মুনি'র আতিথেয়তার সুযোগ নিয়ে তাকে অপমান করল। তার বয়স তো চৌত্রিশ কিংবা পঁয়ত্রিশ হবে। এ বয়সে নিশ্চয় তার কা-কারখানকে তারুণ্যের উচ্ছলতা বলে ক্ষমা করা যায় না। দুনিয়ার অনেক কিছুই সে দেখেছে। সুতরাং এটা তার অজ্ঞতার ওজরও হতে পারে না। না, না সে পলির তারুণ্য আর অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়েছে। মিসেস মুনির এতে আর কোনো সন্দেহ নেই। ডোরান এর ক্ষতিপূরণ কি দেবে সেটাই হলো কথা।

এ ধরনের ঘটনার ক্ষতিপূরণ নিশ্চয় থাকতে হবে। মজা লুটবার জন্য পুরুষরা যা খুশি তা করে চলে যাবে আর মেয়েরা তার ঝক্কিঝামেলা পোহাত। তা হতে পারে না। না, কিছুতেই নয়। কোনো কোনো মা হয়ত টাকা-পয়সার এ ধরনের ঘটনা ধামাচাপা দিয়েই সন্তুষ্ট হতো। মিসেস মুনি অনেক দেখেছে। কিন্তু সে কিছুতেই তেমন কাজ করবে না। মেয়ের মর্যাদাহানির উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ তার কাছে একটাই, সেটা হলো বিয়ে।

মিসেস মুনি মনে মনে আবার সব দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার বেশ্লেষণ করল। তারপর ডোরানকে খবর দেয়ার জন্য মেরীকে পাঠাল। ডোরানের সঙ্গে মিসেস মুনি ব্যাপারটার ফায়সালা করবে। আর সে যে জিতবে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। ডোরান খুবই সিরিয়াস মানুষ। অন্যদের মতো লম্পট বা ধূর্ত নয়। শেরিডন বা সিড়ে কিংবা বানটাম হলে মিসেস মুনির পক্ষে কাজটা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত। ডোরান নিশ্চয়ই ব্যাপারটা নিয়ে হইচই হোক তা চাইবে না। বোর্ডিং হাউসের সবাই ঘটনা জেনে ফেলেছে, কেউ কেউ বেশ মুখরোচক কাহিনীও উদ্ভাবন করে ফেলেছে। গত তেরো বছর ধরে ডোরান ক্যাথলিক ওয়াইন-মার্চেন্টের ওখানে চাকরি করছে। এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে তাকে চাকরিটা খোয়াতে হবে অথচ মিসেস মুনির প্রস্তাব মেনে নিলে সবকিছুরই একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হয়ে যাবে।

আধঘণ্টা প্রায় হয়ে গেল। মিসেস মুনি চেয়ার ছেড়ে উঠে আয়নার নিজের চেহারাটা পরীক্ষা করে দেখে নিল। চেহারায় দৃঢ়তার ছাপ দেখে মনে মনে সন্তুষ্ট হলো। অন্য যাদের কথা মনে হলো, নিশ্চয় তারা মিসেস মুনির' মতো ঘটনার নিষ্পত্তি করত না। বরং মেয়ের এ ঘটনা পুঁজি করে বেশ কিছু কামাই করে নিত।

ডোরানকে রোববার সকালে খুবই উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছিল। দু'দুবার চেষ্টা করেও দাড়ি কামাতে পারল না। দু'তিনদিনের না কামানো দাড়ি গালে বারবার খোঁচা দিল। দু'তিন মিনিট পর পর চোখের চশমার কাচগুলোর ঘামে ঝাপসা হয়ে উঠছিল বলে পকেট থেকে রুমাল বের করে বারবার মুছতে হচ্ছিল। গত পরশু রাতের স্বীকারোক্তির কথাগুলো মনে হতেই কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। বুকের ভিতরে একটা দারুণ ব্যথা অনুভব করছিল। ধর্মযাজক ঘটনার প্রতিটি বর্ণনা খুটিয়ে খুটিয়ে বিচার করে পাপের পরিণতি এত বড় করে তার সামনে তুলে ধরছিলেন যে শেষপর্যন্ত এ ব্যাপারে ক্ষতিপূরণের একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তার মনে শান্তি ফিরে এসেছিল। বিয়ে করা অথবা পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি করতে পারে সে? না, সে নির্লজ্জ হতে পারবে না। ঘটনা লুকিয়ে থাকবে না। মানুষ এ নিয়ে কথা বলবেই আর সে কথা একান্ত সেখান হয়ে তার মনিবের কানে নিশ্চিত পেঁৗছবে। ডাবলিন খুবই ছোট শহর। এখানে সবাই সবাইকে চেনে, জানে। মনিবের গলার স্বর যেন কল্পনায় সে শুনতে পেল। মনিব তাকে ডেকে আনার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন_ ‘যাওতো, ডোরিনকে এখানে আসতে বলো।' সে টের পেল তার হৃৎপিন্ড কণ্ঠার কাছে ধুকধুক করছে।

তার এত বছরের খাটাখাটনি সব বৃথা গেল। বয়সের দোষে একটু ফুর্তিফার্তা করতে গিয়ে গোল্লায় গেল তার এতদিনের সমস্ত পরিশ্রম আর অধ্যবসায়! তারুণ্যের দিনগুলোতে সে বীজ বপন করেছিল, তার মুক্ত চিন্তার জন্য সে গর্ব করত। সব কিছু আজ বিনষ্ট হওয়ার পথে। সে ধর্মের অনুশাসনগুলো ঠিকঠাকমতো পালন করে চলেছে, ধরতে গেলে বছরের পুরো সময়ে সে নিয়মিত জীবনযাপন করে আসছে। তার যে টাকা সঞ্চিত আছে তা দিয়ে সে সুন্দরভাবে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু কথা সেটা না। কিন্ত মেয়েটির বাড়ির লোক তো মেয়েটিকে ঘেন্না করবে। প্রথমেই তো আছে তার কুখ্যাত বাবা; এমনিতেই তার বাপেরও সুনাম নেই, ওদিকে মায়ের বোর্ডিং হাউসের যা সুনাম হচ্ছিল তাও ভেস্তে যাবে। তার মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। গেল সব তাহলে! কল্পনায় সে দেখতে পেল তার দিকে তাকিয়ে সবাই উপহাস করছে; তার আর পলির ব্যাপার নিয়ে ফিসফিস করার চিত্র তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মেয়েটা অবশ্য কিছুটা অশিষ্ট। হয়তো বলবে, ইস, যদি জানতাম এমন ঘটবে তাহলে কি আর ওপথ মাড়াই। কিন্তু ঘটনা তো ঘটে গেছে, তাহলে মেয়েটিকে ভালোবাসতে তার দোষ কোথায়? পলি যা করেছে তার জন্য সে পলিকে ভালোবাসবে, না ঘৃণা করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। অবশ্য সেও সমানভাবেই দোষী। কারণ, সেও একই কাজে রত হয়েছিল! তার মন বলছিল এড়িয়ে যাও, বিয়ে করো না। বিয়ে একবার করেছ তো জীবনের বারোটা বেজে গেল।

সে খাটের ওপর বসে ভাবছিল। গায়ে জামা আর পরনে পাজামা। পলি দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকল। পলি তার কাছে সব কথা খুলে বলায় পলি তার মায়ের কাছে তাদের দু'জনের ঘনিষ্ঠতার কথা খোলাখুলিভাবে বলেছে। পলির মা ডোরানের সঙ্গে সকালে কথা বলবে। কথা বলতে বলতে পলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে ডোরানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ও, বব! বব! আমি কি করব? উহ, আমি কি যে করব!

না, তার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই, পলি জানাল।
ডোরান পলিকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার সে সান্ত্বনায় তত জোর ছিল না। পলিকে সে কাঁদতে বারণ করল। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাবনার কিছু নেই। ডোরান তার জামার ওপর দিয়ে পলির আবেগজড়িত কণ্ঠ উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করছিল।

যা ঘটে গেছে সবটাই অবশ্য ডোরানের দোষ নয়। তাদের প্রথম পরিচয়ের দিনগুলোতে এই ডোরান মেয়েটিকে এক ঝটকায় বিছানায় নিয়ে যাবার চিন্তা কল্পনায় উত্তপ্ত ইমেজ তৈরি করার বাসনা দমিয়ে রাখত কিন্ত তারপরও একটি অবিবাহিত তরুণীর আঙুলের ছোঁয়া, তার শ্বাসপ্রশ্বাস, তার পোশাকের সযত্ন সোহাগ ডোরানকে কেমন আনমনা করে তুলছিল মনে পড়ে গেল। তারপর একদিন সে যখন ঘুমাতে যাওয়ার জন্য পোশাক বদলাছছিল তখন তার দরজায় পলির ভীরু আঙ্গুলের টোকা শুনতে পেল। পলির মোমবাতিটি বাতাসে নিভে গিয়েছিল বলে সে ডোরানের মোমবাতি থেকে আগুন ধরাতে এসেছিল। সেটা ছিল পলির স্নানের রাত। তার পরনে ছিল বুক খোলা ঢিলা পোশাক। সস্নিপারের ফাঁকে তার গায়ের মাংসল গোছা দেখা যাচ্ছিল। পায়ের রক্তিম গোছা থেকে যেন একটা সুগন্ধ ভেসে আসছিল। যে হাতে সে মোমবাতিটা ধরাচ্ছিল সে হাতের কব্জি থেকেও যেন একটা মৃদু সুগন্ধ ভেসে আসছিল।

যেদিন রাতে ডোরান দেরিতে ফিরত সেদিন পলি তাকে ডিনার গরম করে পরিবেশন করত। নিদ্রামগ্ন বাড়িতে গভীর রাতে একাকী পলি তার পাশে বসে থাকত। ডোরান কি না কি খাচ্ছে বুঝতেও পারত না। পলির সেবাযত্নের যেন কোনো তুলনা হয় না। রাতটা যেদিন হিমশীতল বা ঝড়ো থাকতো সেদিন অবশ্যই বাড়তি খাবার হিসেবে তার ভাগ্যে জুটত। হয়ত বিয়ে হলে দু'জনে সুখেই থাকবে...।

তারা দু'জনে পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠত। দু'জনের হাতে থাকত দুটো মোমবাতি। বিদায় নেয়ার আগে পরস্পর পরস্পরকে চুমু খেত। পলির চোখের চাহনি, তার হাতের ছোঁয়া আর তার নিজের প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তগুলো এখনো যেন জ্বল জ্বল করে তার চোখের ওপর ভাসছে...।

তবে উত্তেজনারও প্রশমন ঘটে। পলির কথাগুলোই যেন তার নিজের মনেও একই প্রতিধ্বনি তোলে_ আমি কি করব? তার তারুণ্য তাকে পিছে সরে দাঁড়াতে বলে। কিন্তু পাপ, যে পাপ সে করে বসে আছে তার কি হবে। তার শ্রদ্ধাশীল মন বলে_ পাপের ক্ষতিপূরণ তাকে করতেই হবে।

পলিকে পাশে নিয়ে বসে যে যখন চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল তখন মেরী ঘরে ঢুকে ডোরানকে নিচের ঘরে মিসেস মুনির সঙ্গে দেখা করতে খবর দিল। ডোরান উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে কোটটা তুলে গায়ে দিল। ভীষণ অসহায় বোধ করছিল সে। পলিকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে গেল। সব ঠিক হয়ে যাবে, কোনো ভয় নেই। ডোরান পলিকে রেখে চলে গেল। পলি বিছানায় আছড়ে পড়ে কান্নার আবেগে বলে উঠল, উহ্, ইশ্বর!

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় চশমার কাচ আবার ঝাপসা হয়ে গেল। ডোরান চোখ থেকে খুলে রুমাল দিয়ে মুছে নিলো। তার মনে হচ্ছিল, ধরনী দ্বিধা হও, আমি তোমার ভিতরে আশ্রয় নিই।
কিন্তু, ধরনী দ্বিধা হলো না। অগত্যা মন্থর পদে সে নিচে নামতে লাগল। তার মনিবের নির্দয় চাহনি আর তার পরাজিত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা বোর্ডিং হাউসের মাদামের চেহারাটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সিঁড়ির নিচের সোপানে পলির ভাই জ্যাক মুনি তার পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। তার হাতে দু'বোতল মদ। দু'জনে পরস্পরকে অভিবাদন জানাল। কিন্তু দু'জনের কণ্ঠস্বরই কেমন যেন শীতল। সিঁড়ির নিচের সোপান থেকে ডোরান উপরের দিকে তাকালো, দেখল উপরের সিঁড়ি থেকে জ্যাক তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে।

হঠাৎ একদিন রাতের কথা ডোরানের মনে পড়ে গেল। একজন সঙ্গীত শিল্পী, সোনালি চুলের এক খুদে লন্ডনবাসী, পলির দিকে বেশ খোলাখুলি একটা ইঙ্গিত করেছিল। কিন্তু তাদের সে অন্তরঙ্গতা শেষ পর্যন্ত জ্যাকের গুন্ডামিতে ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন রাতে জ্যাক জন্তুর মতো আচরণ করেছিল। সবাই তাকে ঠা-ন্ডা করতে চেষ্টা করতে লাগল। সেই সঙ্গীতশিল্পী, একটু ফ্যাকাসে তখন, মুখে অপ্রস্তুতের একটা হাসি টেনে বারবার বলেছিল, তার মনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু জ্যাক বরাবরের মতো চিৎকার করে তার বোনের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে চেষ্টা করলে সঙ্গীতশিল্পীর দাঁতের পাটি ভেঙে পেটের ভিতরে ঢুকিয়ে দেবে বলে শাসাতে লাগল। তাই করবে সে।

পলি কিছুক্ষণ ধরে খাটের এক প্রান্তে বসে রইল। তার চোখে অশ্রু। একটু পর চোখের অশ্রু মুছে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটা তোয়ালে নিয়ে জগের ভিতর কোণাটা ডুবিয়ে ঠান্ডা জল দিয়ে চোখ দুটো মুছে সতেজ করে নিলো। এক পাশ ফিরে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো। কানের ঠিক উপরে একটা চুলের কাঁটা ঠিক করল। তারপর আবার ফিরে গিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ল। সে অনেকক্ষণ ধরে বালিশগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সেগুলো দেখে তার মনের ভিতর একটা গোপন সুখ-স্মৃতি জেগে উঠল। মাথাটা খাটের রেলিং এলিয়ে দিয়ে এক সুখের স্বপ্ন বিভোর হয়ে পড়ল পলি। তার চেহারায় উদ্বেগের আর কোনো লেশ রইল না।

সে প্রফুল্লচিত্তে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগল। তার হৃদয়ে ভয়ের কোনো আশঙ্কা নেই। তার মনের পটে আশা আর ভবিষ্যৎ জীবনের একটা স্বপ্নময় ছবি ধীরে ধীরে রূপ নিয়ে ভেসে উঠল। তার আশা আর মনের স্বপ্নটা আস্তে আস্তে এমন জটিল হয়ে উঠতে লাগল যে তার চোখের সামনে থেকে সাদা বালিশগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। আর সে কিসের জন্য অপেক্ষা করছে সেকথাও বেমালুম ভুলে গেল।

অনেকক্ষণ কেটে গেল। এমন সময় পলি মায়ের ডাক শুনতে পেল। সে খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর এক ছুটে সিঁড়ির রেলিংয়ের কাছে ছুটে গেল।
পলি! পলি!
আমাকে ডাকছো, মা?
এদিকে এসো তো মা। ডোরান তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
আর ঠিক তক্ষণই পলির মনে পড়ে গেল এতক্ষণ ধরে কিসের জন্য সে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল।

(লেখক পরিচিতি : জেমস জয়স ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জেস্যুট স্কুলে লেখাপড়া করেন এবং ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। তার দু'বছর পর তিনি আয়ারল্যান্ড ছেড়ে চলে যান। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে স্বল্পকালের জন্য আরেকবার আসেন। তিনি ট্রিয়েস্টে শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং বার্লিজ স্কুলে ভাষা-শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে ব্রতী হন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তার কবিতা সঙ্কলন 'চেম্বার মিউজিক' প্রকাশিত হয়, ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ছোট গল্পের সঙ্কলন 'ডাবলিনার্স', ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস 'এ পোট্র্রেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ এ ইয়ং ম্যান' প্রকাশিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জয়েস জুরিখ চলে যান এবং ইউলিসিস রচনা শুরু করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে 'ইউলিসিস' প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয়। তার দু'বছর পর জয়েস গ্যারিস শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফিনেগানস ওয়েক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি জুরিখ ফিরে যান এবং সেখানেই এই বিরলপ্রজ সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর ইউলিসিস গত শতকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মর্যাদা পায়। অতিথিশালা তার লেখা 'বোর্ডিং-হাউস' গল্পের অনুবাদ)

[পাঠকের স্বীকারোক্তি: এই গল্পটার অন্য এক অনুবাদও আছে যাতে মূল লেখা অনুসরণ করা হয়েছে। বাক্যগুলো বেশ লম্বা লম্বা। তাতে মাঝে মাঝে নিরস লাগলেও মূলের একটা স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু এই অনুবাদটা সহজবোধ্য করতে গিয়ে মূলের লম্বা বাক্য ভেঙ্গে ভেঙ্গে ছোট ছোট বাক্যে পরিণত করা হয়েছে এবং এতে গল্পটা মূলের সুরটা অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দুএক লাইন করে বাদও দেওয়া হয়েছে। তবুও জয়েসের গল্প বলে কথা! তাঁর গল্পের একজাক্ট অনুবাদ বাংলায় সম্ভব না খুব সম্ভব।]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন