বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

নন্দিতা ভট্টাচার্যের গল্প : ইছামতির চুপকথা

দুটো সাইকেল ভ্যানে আমরা ৮ জন শিক্ষিকা বর্ডার থেকে ফিরছিলাম । বর্ডার যাওয়া কোন কাজে নয় । নিছক ই বাপ- ঠাকুর্দার ‘ঐপারে সাতক্ষিরে ‘ – আমাদের ও কেমন যেন বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে --কত কথা ছোটবেলা থেকে শোনা ---কেবলই সুখের ছবি আঁকা –স্মৃতির ফুলঝুরি –কথায় কথায় ঠাকুমা –বাবা –মা দের-- আমরা ঐ বাগানে যেতাম –সেই বাগানে কুল কুড়োতাম -ওখানে পেয়ারা বাগান –জাম বাগান –আম বাগান -কাঠাল তলা । উত্তরের পুকুর – দক্ষিনের পুকুর – বড় পুকুর – ছোট পুকুর । পুকুরের পার দিয়ে যেতাম , ঝি ডাক দিত আমরা গ্রামের মেয়েরা এক সঙ্গে দলবেধে স্কুলে যেতাম । ওপারে সবটাই যেন মোরাম বিছানো । আর এপারে সবটাই যেন কাঁটা ।


‘হুই দূরে দ্যাশ ‘ আমাদের – সেই দ্যাশের ছ্যায়া দেখার জন্যে হুটপাটি করে রওয়ানা হওয়া ।

স্কুলের মেয়েদের নিয়ে এসেছি টাকিতে ---ইছামতির পারে । ‘ শিক্ষা সফর’ –এক’শ জন ছাত্রীর দল । বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । টাকি পৌরসভার অতিথিশালায় দুখানা ঘর নেয়া হয়েছে । বিশ্রাম করার জন্যে । কেউ কেউ একটু গড়িয়ে নিতে চাইছেন , অনেক সকালে বেরনো হয়েছে । মেয়েরা ইতিমধ্যেই দোলনার দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে । বল নিয়ে হুড়োহুড়ি করছে মাঠে । বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে মজার উৎস । এই দিনটির জন্যে মুখিয়ে থাকে ওরা । একটুখানি স্বাধীন হওয়া আর কি । বাবা মায়ের গার্জিয়ান-ই থেকে মুক্তি কিছুক্ষনের জন্যে , আবার দিদিমনিরাও সেদিন বেশ ফুরফুরে , বকা ঝকার বালাই নেই । বাসের মধ্যে ক্ষুদে দিদিমনিদের সঙ্গে নাচতে নাচতে আসা । তারস্বরে হিন্দিগান আর তার সঙ্গে উদ্দাম নাচ । মজাই মজা । ইতিমধ্যেই ইতিমধ্যেই রোমিও দের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে । বয়স্ক দিদিমনিরা সতর্ক হয়ে উঠলেন । চল , চল , চল ঐ দেখ পার্কে মেয়েরা দোল খাচ্ছে আর ছুঁচোর দল হাজির । স্কুলে ছুটির পর রোজই সেই এক কাণ্ড । কাল চশমা পরে মোটর সাইকেল বাগিয়ে হিরোরা ঘোরাফেরা করছেন । দিদিমনি ও মা বাবাদের বুকে ছ্যাঁত । তারপর গরু তাড়ানো । বিশ্রাম চুলোয় গেল , বয়স্ক দিদিমনিরা পড়িমরি করে ছুটলেন বাইরে গরু তাড়াতে ।

রান্না বান্না শুরু হয়ে গেছে । বাসে সকালের জলখাবার দেয়া হয়েছে এক প্রস্থ । এখানে এসে চা -কফির ব্যবস্থা হয়েছে । যত খুশি ইচ্ছে খাও । হঠাৎ দেখি মেয়েরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে , উপছে পড়ছে । বাঁশি শুনে বুঝলাম সাপ খেলা । আমরাও চার –পাচজন গুটি গুটি এগোলাম । সকালের হুটোপাটির পর এখন অবস্থা বেশ স্থিতিশীল । সবাই যে যার কাজে লেগে পড়েছে । মেয়রাও বেশ গুছিয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে যার যার মত পছন্দসই মজায় মেতেছে । এমন সময় দুজন ভ্যান ওয়ালা এসে হাজির । আমরা চার পাচ জনের একটি দল ছিলাম বলল দিদি বর্ডারে যাবেন ? .হঠাৎ কানখাড়া করে সুমিত্রা বলল কি বলছে রে , ভ্যান ওয়ালা ? ওরে বর্ডারে যাওয়ার কথা বলছে রে, যাবি চ’ ! সুমিত্রা আমাদের নাচুনি বুড়ি। সব নাচনের ধুনুচি হচ্ছে ও ! আমরা তো ধোঁয়া দিয়েই আছি । উঠলো বাই তো কটক যাই । পড়ে রইল মেয়েরা , মেয়েদের পাহারা দেয়া !

বড়দি কিছু বলবে না’তো রে । ঐ হল জয়া ! ভয়েই মরল মেয়েটা । মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলো সুমিত্রা ।

----আরে রাখ তোর বড়দি । তেল লাগিয়ে কুল পাচ্ছে না । করিস তো সরকারি চাকরি । এত ভয় কিসের রে ? ভাল মেয়ে সাজছেন । আর একটা কথা না বলে ভ্যানে ওঠ । তাড়াতাড়ি কেটে পড়ব । ফিরে আসতে হবে তড়িঘড়ি। চারটেতে ফেরার বাস ছাড়বে ।

চেপে বসলাম দুটো ভ্যানে । কারোকে কিছু না বলেই রওয়ানা হয়ে গেলাম । মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও কিশোরী বেলায় ফিরে গেছি যেন! নদীর ধার দিয়ে বাঁধের উঁচু রাস্তা । ডান পাশে দোকানে –কোক-পেপসি , মাজা , হরেক রকম সফট ড্রিঙ্কস , চিপস , কৌটোয় বিভিন্ন রকম বিস্কিট , পানপরাগ ইত্যাদি যা যা সব টুরিস্ট স্পটে থাকে সব রয়েছে । এসব দোকানের সঙ্গে শহরের দোকান গুলোর খুব তফাত নেই । প্রত্যন্ত গ্রামেও ভাত না থাকুক পেপসি-কোলার বোতল পাবে । মার্কেটিং কাকে বলে ! বাঁশ – দরমার তৈরি দোকান। কোনটা আবার তীরের দিকে এগোনো –মাচার মত । তার ওপর কম বয়েসি স্কুল-কলেজ পালিয়ে প্রেম করতে আসা ছেলেমেয়েরা , পাকা খেলুড়েরাও আছেন । এই ভর দুপুরে বিয়ার চলছে জমিয়ে । বা দিকে জমিদার রায় চৌধুরীদের আস্ত ভাঙ্গা মিলিয়ে অনেকগুলো বাড়ি পর পর । সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে এখনও । এর মাঝখানেই তৈরি হয়েছে বিরাট বি এস এফ ক্যাম্প । গাছে গাছে লেটারবক্সের মত আটকান বাক্স , তাতে রাখা বুলাদি । ঘ্যাচাং করলেই বেরিয়ে আসে । বর্ডার এলাকা তাই বি এস এফের রমরমা । আর বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা । জামাই আদর আর কাকে বলে ! আমাদের দেখাশোনা করছেন কি না ! তাই শরীর টা তো রাখতে হবে ! গুমটিতে ইতস্তত বসে আছেন তেনারা । সোজা বাঁধের রাস্তা আরও এগিয়ে গিয়ে বা দিকে গ্রামে ঢুকে পড়লাম । বেশ উন্নত । বর্ধিষ্ণু গ্রাম । মাঝে মাঝে বাগান বাড়ি , সরকারি অফিস , এন জি ও দের ঠেক । কুমোর পাড়া – কামার পাড়া । পাকা বাড়ি থেকে আস্তে আস্তে ছোট ছোট বাঁশের বাড়ি ঘর চোখে পড়ল । উঠোনের মাঝখানে বিরাট বিরাট উনুন । রিকশাওালা কে জিজ্ঞেস করায় সে বলল , ওগুলো খেজুর গুড় বানানোর জন্যর রাখা আছে। শুনেই ঠিক করে ফেললাম ফেরার সময় নিয়ে যেতে হবে । নিশ্চয়ই খাঁটি হবে । পেস্টিসাইড , ক্যামিকাল সার দেয়া সবজি ইত্যাদি খেতে খেতে ভেজাল খাওয়া আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে । খাঁটি কোন কিছু পাওয়ার জন্যে সব সময়ই লোভ হয় । মাঝখানে একবার বি এস এফের কাছে তও্ব - তল্লাস হয়ে গেছে । কজন যাচ্ছে । কারা কারা আছে ইত্যাদি । মাথা গুনে নিল । সত্যি তো যদি পাচার হয়ে যায় । হাসি পেল । বি এস বি এস এফ গুমটি পেরিয়ে আর কিছুটা গ্রামের ভেতরে ঢুকে গেলাম আমরা । হোগলার বন চোখে পড়ল । লোকালয় ছাড়িয়ে চলে এসেছি । ভ্যানওয়ালা বলল , দিদি আসুন আমরা এসে গেছি । কিছুটা আপনাদের হেঁটে যেতে হবে । আমরা এখানে অপেক্ষা করছি ।

সবার ই মনে মনে কিন্তু ভয় করতে লাগল । জায়গাটা বেশ নির্জন । জন মানব নেই। আমরা ক’জনা শুধু । মনে ধুকপুক নিয়েই হেঁটে রওয়ানা হলাম । পিচের রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তায় উঠলাম । বর্ডার এলাকায় সরকার রাস্তা গুলো কিন্তু খুব ভাল তৈরি করেছে । তাই পুরো রাস্তা ই বাঁধানো ,ভাল পাকা রাস্তা । বা দিকে নদী । হোগলার বনের মাঝখান দিয়ে এগোতে এগোতে নদীর কাদা মাখা তীরে এসে দাঁড়ালাম । জোয়ারের জল নেমে গেছে । কালো মাটি , ভিজে থকথকে । দাঁড়াবার কোন জায়গা প্রায় নেই । ওপারে কিছুই দেখতে পেলাম না । নদীর বিস্তৃতি ছাড়া । খুব আশাহত হলাম । এ হরি এই দেখতে এত দূর ছুটে আসা । সুর্য মাথার ওপর । এপারে ওপারে কিছুই তফাত বুঝতে পারলাম না । কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে ফিরে এসে ভ্যানে উঠলাম । ভ্যান মানে ভ্যান রিক্সা । মারুতি ভ্যান নয় । আবার সেই গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাত্রা । মাথায় বসে গেছে দিদি খাঁটি খেজুরের গুড় পাবেন । ভ্যানে উঠেই বললাম, চলতো ভাই কোথায় তোমার খাঁটি খেজুরের গুড় । দেখি রাস্তা দিয়ে একটা লোক চারখানা হাড়ি নিয়ে আসছে –ঝোলা গুড় । তাকে আমরা ঘিরে ধরলাম । সে বলল , না দিদি আমার কাছে কিছু নেই । বিক্রিবাট্টা সেরে ফিরছি । আপনারা ওই বাড়িগুলোতে খোঁজ করুন ।

কাছেই দেখলাম একটি টালির বাড়ি । সেখানে বড় বড় উনুন রয়েছে । তাতে আঁচ নেই যদিও । ছুটলাম আমরা খাঁটির খোঁজে । প্রায় ৩টে ট বেজে গেছে । নিঝুম দুপুর । এলাকা ঝিম ধরে আছে । উঠোনে উনুনগুলো একা একা বার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে । আমরা বাইরে কারোকে দেখতে না পেয়ে সোজা বারান্দায় উঠে হাঁক পাড়লাম । বাড়ির বৌটি বেরিয়ে এল সঙ্গে লেজুড় হয়ে ঝুলছে ছানা কোমরে । পেছন পেছন বাড়ির কত্তা ও বেরিয়ে এলেন । দুটি ছেলে উঠোনেই খেলছিল । দুজনেরই বেশ ভদ্রস্থ কাপড়চোপড় পরা । আমরা খাঁটি খেজুরের গুড়ের সন্ধান করছি জেনে হয়ত মনে মনে হাসল । ঝোলা ও এমনি গুড় দুটোই আনল । দাম এবং চেখে যা দেখলাম আমাদের খাটি পাওয়ার ইচ্ছে উবে গেল । বলল দিদি সে দিন আর নেই সব ভাল জিনিষই বিদেশ চলে যায় । আমরা গুচ্ছ টাকায় তার তলানি কিনি । যদিও বিদেশে পাঠানোয় সুফল এদের ঘরে পৌঁছোয় বলে মনে হয় না ।

মাথা গোনাল । ছোট বাঁশের মাচার ওপরে দু জন সিপাই বসা । এত গোনা গাথা অথচ মেয়ে পাঁচারের খবর তো রোজ পত্রিকার পাতায় । কত যে বাঁচাল নিয়ম কানুন ! কালভার্ট পেরোলে আবার আস্তে আস্তে ঘরবাড়ি চোখে পড়তে লাগল । আমরা আবার রওয়ানা হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি । কিন্তু হঠাৎ পা দুটো মাটিতে আটকে গেল ! থমকে গেলাম আমি ! শুনছি একটি বিড়বিড় কথা । কান পাতলাম । অবাক কাণ্ড ! এ কোন ভাষা শুনছি ! কে কে বলছে ? আমার শিরাগুলো টানটান। এখানে? হতেই পারে না । আমার কানের ভুল ! সবাইকে বললাম একটু দাঁড়া । আবার কান পাতলাম , মুর চুলিটূ টানি পেলাই দিলে । কান কে বিশ্বাস করতে পারলাম না !! আশ্চর্য ! এখানে ? অসম্ভব । কিন্তু অসম্ভব বললে তো হবে না । কোন বাতাস থেকে উত্তর-পুব ভারতের এলোমেলো অবোধ কথা বার্তা ভেসে আসছে । জন্মের সুবাদে ভাষা টি আমার খুব পরিচিত । তারপর হিজবিজ বোঝা না বোঝার দীর্ঘ এক মনোলগ । একক বাক্যালাপের সন্ধান করতে গিয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখি –বি এস এফের মাচায় ওদের সঙ্গে গায়ে গা ঠেকিয়ে একটি মেয়ে ঠ্যাং দোলাচ্ছে । সালোয়ার কামিজ পরা । থ হয়ে গেলাম ওর চেহারা দেখে । বেশ লম্বা ছিপছিপে । কোঁকড়া জট পাকান চুল । রঙ যে এককালে বেশ ফর্সা ছিল বোঝা যায় । এখন তামাটে । কয়েক গুছি চুল কপালের ওপরে হেলায় পড়ে আছে । পাতলা ঠোঁট । আমার তো সব ওলটপালট হয়ে গেল। উপে গেল সব উচ্ছাস নাচানাচি । মনের ভেতর যে কি একটা আকুলি বিকুলি হচ্ছিল বোঝাতে পারব না । মনে হচ্ছিল এ কে ? কোথা থেকে এল ? সব খবর আমার এক্ষুনি জানতে হবে, এক্ষুনি । বন্ধুরা বুঝতে পারছে না কি হল ? অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাঁকিয়ে আছে । কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে আমি ঠিক করলাম, জিজ্ঞেস করেই ফেলব যা আছে কপালে । দূরে কত গুলো ছেলে বিভিন্ন বয়েসের দাড়িয়ে ছিল । গ্রামে ঢুকলে বাইরে থেকে কে এল গেল এসব খবর রাখার জন্যে কিছু লোক থাকে । তারমধ্যে রাজনৈতিক দাদাদের চেলারাও থাকে । বাইরের লোক এলে এদের পুঙ্খানুপুঙ্খও খবর পৌঁছে দিতে হয় ! ওদের দিকে একবার তাকিয়ে বি এস এফের সেপাইকে সটান জিজ্ঞেস করলাম, এই যে মেয়েটি আপনাদের সঙ্গে বসে আছে ও কি আপনাদের লোক ? কিছুক্ষন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার অন্য দিকে তাকিয়ে রইল । যেন কোন প্রশ্নই ওকে করা হয় নি ।

বিষণ্ণ মন নিয়ে ভ্যানে উঠলাম । মনটা খচখচ করতে লাগল। যে উচ্ছাস নিয়ে গিয়েছিলাম ফেরার সময় যেন পুরো উলটে গেল । উন্মনা হয়ে রইলাম পুরো রাস্তাই । ফিরে এলাম , গুম হয়ে রইলাম । কিছুতেই আর আগের মনটা পাচ্ছি না । স্কুলে যেতে থাকলাম যথারীতি । প্রচুর ছবি তোলা হয়েছে । আজকাল তো আবার ক্যামেরার সীমা সংখ্যা নেই । স্কুলে বসেই সেগুলো কম্পিউটারে দেখা হচ্ছে । ততই আমার মনটা পাগল পাগল লাগছে । ভীষণ সুন্দর ইছামতী । ছবিতে পুরানিো জমিদার বড়ির ধ্বংসাবশেষ । বিশাল নদী । মনে হয় যেন দু/ তিন দিন থেকে আসি । সব কিছু বার বার ফিরে ফিরে আসছিল । সঙ্গে আজানা খচখচ । অন্য এক ব্যাকুলতা । ভাষার মধ্যে এমন বেদনা বোধ ! বিচ্ছিন্নতা ! একাকীত্ব ! কয়েকটা শব্দ আমাকে চুম্বকের মত টানছে কেন ? আমার এন জি ও বন্ধু নিবিড় ও বনানীকে বললাম, যাবি একবার জায়গাটা ভারি সুন্দর ! মনের মধ্যে অন্য ফন্দি । কিছুতেই আর সুযোগ হচ্ছে না ।আবার বনানীকে খোঁচাই চল না রে একবার ।

হঠাৎ দিন চারেকের ছুটি পাওয়া গেল । কিসের তাড়া ? মনে হচ্ছে যেন একদিন দেরি হলে সব হারিয়ে যাবে । তর সইছে না । দিন ঠিক হল । হাসনাবাদ লোকালে যাওয়া হবে । সকালে ট্রেন । পৌঁছলাম । ইছামতির পারে হোটেল গেস্ট হাউস আছে । ইছামতীর পারে জমিদার বাড়ির কিছু অংশ নিয়ে তৈরি গেস্ট হাউস । ছড়িয়ে ছিটিয়ে খন্ডহর জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ । অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো । বনানী আমি ও নিবিড় দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে গ্রামের পথে রওয়ানা হলাম । নিবিড়ের কাজের সুবাদে এখানে কিছু লোকজন চেনা আছে । এটাসেটা জিজ্ঞেস করে আমরা একটু ভাব জমাতে চাইলাম । হুট করে তো এসব কথা বলা যায় না । কিন্তু কেউ ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে বলে মনে হল না । আমরা একটা ভ্যান নিয়ে আগে যে পথে গিয়েছিলাম সেই পথ ধরে বাঁধের সোজা ইছামতিকে ডান দিকে রেখে এগোতে লাগলাম । পেরোলাম বি এস এফ ক্যাম্প । ইছামতীকে ডান দিকে রেখে এগোতে লাগলাম । এলাম বিএস এফের সেই ঝুপড়ির কাছে যেখানে মেয়েটিকে দেখেছিলাম ।ওটা চেক পোষ্ট । ওখান থেকেই রাস্তা এঁকেবেঁকে গ্রামের মধ্যে দিয়ে একেবারে বর্ডার পর্যন্ত চলে গেছে । না আজ আর ওকে দেখতে পেলাম না । কিছুটা নিরাশ হলাম । কি ভেবে ছিলাম ? গিয়েই দেখা পাব , আমার জন্যে ফুল চন্দন সাজিয়ে বসে থাকবে ? নিবিড় জিজ্ঞেস করল - কি রে দেখতে পাচ্ছিস ? আমি মাথা নাড়লাম । অনেক ক্ষন থেকেই আমাদের মুখেকথা নেই । একটা টেনশন কাজ করছে । আমাদের ইতি উতি তাকাতে দেখে কয়েকটি ছেলে এগিয়ে এল । জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল । আজকাল এত সহজে গ্রামে যে কেউ ঢুকে চলে যেতে পারে না । বাইরে থেকে কে এল না এল তার পুরো খবর কোথাও পৌঁছে দিতে হয় । এবার নিবিড় এগিয়ে গিয়ে বি এস এফের জওয়ানদের জিজ্ঞেস করতে শুরু করল । তারা কেউ মুখ খুলল না ।আজকাল আবার সহজে কেউ মুখ খুলতে চায় না । ভাবে মিডিয়া । সেই ছেলেগুলো বসে বসে আমাদের লক্ষ্য করছিল । কথাবার্তা মনযোগ দিয়ে শুনছিল । তারা বেশ হুমকির সুরে বলল, এখানে ওরকম কেউ নেই দাদা , আপনারা চলে যান । দেখবেন আবার না কোন হুজ্জতি হয়ে যায় । বাইরের লোক হুট হাট করে চলে আসেন !

নতুন জায়গা একটু সমঝে চলতে হয় । বেগতিক দেখে আমরা সেদিনের মত পাততাড়ি গুটোলাম । বনানি বলল , না এভাবে অত সহজে হবে না । খবর বার করতেই হবে । মনে হচ্ছে আমার জেদ ও ইচ্ছে সকলের মধ্যে সংক্রামিত হচ্ছে । জেদ চেপে গেল আমাদের ।

গেস্ট হাউসে ফিরে সবাই চুপচাপ ব্যালকনিতে বসে রইলাম । সামনে ইছামতী । বয়ে যাচ্ছে । আমাদের মনে তুলকালাম । আকাশে চাঁদ নেই । জলে কালো ছায়া । জলের মাথায় আবছা আলোর তিরতিরানি ।ফিরে এলাম আমরা পরের দিন । বুঝলাম আরও আটঘাট বেঁধে যেতে হবে । ব্যাপারটা এত সহজ হবে না ।নিবিড়ের মানবাধিকার কাজের সুবাদে অনেক জানা চেনা । -- স্বভাবটি ওর ভাল ও সৎ বলে প্রত্যেকে ওকে ওজন দেয় । ও দেখা করল ওর এক এন জি ও বন্ধু শুভ্রর সঙ্গে । শুভ্রর টাকিতে কিছু জানা চেনা আছে । ও খোঁজ খবর নিতে শুরু করল গোপনে গোপনে । পরের বার আমরা আর গেলাম না । --মেয়েরা সঙ্গে গেলে আবার সব কিছুর বেশি খবর হয় । যাক নিবিড়ের জেদ চেপে গেছে দেখে অনেকটা হাল্কা বোধ করলাম । খবর এল ! মেয়েটি টাকির রাস্তায় বাঁধের আশপাশে ইছামতির পারে ঘুরে বেড়ায় । ক্যাম্পের কাছেই থাকে । যেখানে যখন যেমন খাবার জোটে তাই খায় । সারাক্ষণ বক বক করে । মাথায় জট । যেমন হয় আর কি ! বাঁধের কাছের ছোট ছোট খাবার হোটেল গুলো থেকেও খাবার দেয় । শুভ্র খবর সংগ্রহ করার জন্যে উঠে পড়ে লাগলো , জানালো , খুব কঠিন ব্যাপার রে কেউ কিছু বলতে চাইছে না । ফিস ফিস গোছের গোপন । মেয়েটিকে বি এস এফ ক্যাম্পের ভেতরেও ঘোরা ঘুরি করতে দেখেছে অনেকে । শুভ্র গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের ওখানে যেতে বলল । বুঝলাম কাজ এগিয়েছে । নিবিড়কে বললাম , নিশ্চয়ই কিছু সুরাহা হয়েছে । নাহলে শুভ্র যেতে বলত না । আমরা তিনজন আবার একদিন সকালে রওয়ানা হলাম । সরাসরি ঠিক করে রাখা গোপন জায়গায় গিয়ে উঠলাম । আমরা চাইনি কাক পক্ষীতে ব্যাপারটা জানুক । শুভ্রর জানাশোনা লোকজনের সঙ্গে দেখা হল । আমরা ওদের আমাদের উদ্দেশ্য , ইচ্ছে জানালাম । বেয়ারিস মেয়ে , তার ওপর আবার পাগল । গ্রামের লোকেরা আমাদেরই বা কতটা জানে । নেহাত কথা বলছে শুভ্রর ভরসায় । ওদের চোখে সন্দেহের ছায়া । অলিখিত দায়িত্ব তো ওদেরও আছে । আমরা কতটা খাঁটি তা তো ওরা জানে না ! আমরা পাচারকারী কি না তারই বা কি ভরসা । আজকাল সাজগোজ দেখে তো কারোকে চেনা যায় না ! অনেক করে ওদের বোঝালাম । আমাদের বিস্তারিত ঠিকানা তথ্যাদি দিলাম । ওরা আমাদের আশ্বস্ত করে গ্রামে ফিরে গেল ।পরদিন ভোর ৪-টে তে শেয়ালদার ট্রেন । দেখলাম ওরা টিকিট কাউন্টারের থেকে একটু দূরে আবছা জায়গায় দাড়িঁয়ে আছে । সামনে গিয়ে মা জননীকে দেখে আমার বুকের ভেতর টা হু হু করে উঠল । কত কাছের মানুষ মনে হয় ! বোঝা গেল যাদের সঙ্গে এসেছে তাদের কে ও বেশ ভাল ভাবে চেনে । চুপ করে দাড়িয়ে আছে । অবাক হয়ে গেলাম ওর ভাব সাব দেখে । আতঙ্কিত ছিলাম । সবটাই তো জলে ঝাপ দেয়া । আমাদের দেখে কেমন নরম চোখে চেয়ে রইল । কোন কথা বা আলুথালু আচরণ নয় । স্থির । কি বুঝেছে কে জানে!

নিঃসাড়ে ওকে নিয়ে ট্রেনে উঠলাম ।



লেখক পরিচিতি
নন্দিতা ভট্টাচার্য

– জন্ম ও বেড়ে ওঠা অসমের গৌহাটি শহরে- নীল পাহাড় আর মায়াময় প্রাকৃতিক পরিবেশে । শিক্ষা গৌহাটি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখন কলকাতার কাছে মফঃস্বলে এক নামি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন । লেখালেখির সঙ্গে সখ্যতা অনেক দিনের - আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে । অসমীয়া ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদে পারদর্শী । অনুবাদক সুখ্যাতি অর্জন করেছেন । ‘অর্ধেক আকাশ’ নামে অসমীয়া গল্পের একটি অনুবাদ সংকলন, আসামের বিখ্যাত ৪ জন মহিলা লেখকের গল্প নিয়ে, প্রকাশিত হয়েছে ২০০৮এ । ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে আসাম , বাংলাদেশ ও কলকাতা থেকে । শিলং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মুখপত্রে নিয়মিত কলাম লেখেন । নন্দিতা বিশ্বাস করেন ‘কবিতা কখনও কখনও দিন যাপনের সামগ্রিক পরিভাষা’, আর সেই বিশ্বাসেই কবিতায় বাসা বাঁধা তাঁর । তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগন্থ ‘দূরের নক্ষত্র’ বেশ সমাদৃত হয়েছে পাঠক মহলে।













1 টি মন্তব্য: