রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প : তৃতীয় মৃত্যু


এল-এসপেকতাদরের সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতা ফিন-দে-সেমানায় তৃতীয় মৃত্যু
আবারও সেই শব্দ। বিদীর্ণ করা, ঠান্ডা হিম ধরানো এক শব্দ-শব্দটা তার এত চেনা-কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই চেনা শব্দটা আরও সুতীব্র, আরও ধারালো এক ব্যথার উপসর্গ হয়ে ধেয়ে আসছে, যেন রাতারাতি অচেনা, অনভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কিছু।


খালি শূন্য হয়ে যাওয়া মাথার ভেতরে সমানে চক্কর কাটছে ওটা। একঘেয়ে আর হুল ফোটানোর মতো। করোটির চার দেয়ালজুড়ে যেন একটা মৌচাক ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। প্রতিটি সর্পিল ঘূর্ণি শেষে ওটা কেবল বড়ই হচ্ছে, আরও বড়, সেইসঙ্গে মাথার ভেতরে সমানে আঘাত করে যাচ্ছে। প্রতিটি আঘাতের অনিয়মিত কম্পনে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে তার মেরুদন্ড নিচের দিকটা। তারপর ঢেউয়ের মতো কাঁপনটা ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো শরীরে। কিছু একটা আর তার এই স্থুল শরীরটার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না, 'অন্য সময়ে' এই কিছু একটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই কাজ করেছে, কিন্তু এখন যেন সেটা মাথার ভেতরে বসেই সমানে বাড়ি মেরে চলেছে, হাতুড়ি চালানোর মতো। শুকনো, ওই হাড়সর্বস্ব মাংসহীন হাতের প্রতিটি বাড়ি তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার সমস্ত জীবনের তিক্ত অযাচিত সব ইন্দিয়ানুভূতি।

নাছোড়, অসহনীয় ব্যথায় নীল হয়ে ফুলে-ওঠা কপালের দু'পাশের ধমনীগুলোকে দু'হাতে সজোরে খামচে ধরার তীব্র জান্তব একটা প্রণোদনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তার হাতের তালুর মতো অতি সংবেদী অংশ দিয়ে ঢুকে-পড়া ধারালো হীরকখন্ডের মতো সূচাগ্র, শব্দটাকে ইচ্ছে করছে প্রবল থাবায় আটকে ফেলতে হাতের মুঠোয়। তার জরাক্ত, যন্ত্রণাকাতর উষ্ণ মাথার ভেতরে বাড়ির বিড়ালটার মতো একটা অবয়ব এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত সর্বত্র সমানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, কল্পনা করতেই পেশিগুলো সঙ্কুচিত হয়ে উঠছে শরীরের। ওটাকে তার ধরে ফেলা উচিত। কিন্তু শব্দের ওই লোমশ পিচ্ছিল শরীরটা একেবারেই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারপরও সুচারুভাবে রপ্ত করা কৌশলে ওটাকে ধরার জন্য তৈরি সে, সমস্ত শক্তি দিয়ে দৃঢ় বজ্র অাঁটুনিতে আটকে ফেলবে সে ওটাকে। কিছুতেই সে ওটাকে কান দিয়ে, মুখগহ্বর দিয়ে, কোন লোমকূপ দিয়ে কিংবা অক্ষিগোলক দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। তার ওল্টানো চোখের মণি যখন তার দৃষ্টিশক্তিকে পুরো অন্ধকার করে দেয়-গভীর, নিকষ কালো অন্ধকারে যখন ওটার অবাধ বিচরণ দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না- সেই অসহায় অবস্থায় কিছুতেই সে আর ফেরত যাবে না। খুলির ভেতর-দেয়ালে, নরম মগজে ফুল তোলা স্ফটিকের বরফকুচি আর কিছুতেই ভেঙে ছড়িয়ে পড়তে দেবে না সে। ওই শব্দ অন্তহীন, যেন কোনো শিশু ক্লান্তিহীনভাবে মাথা ঠুকে যাচ্ছে কোনো পাথুরে দেয়ালে। সজোর, প্রবল সেসব আঘাত প্রকৃতির যা কিছু শক্ত নিরেট তার বিরুদ্ধেই যেন। সে যদি ওটাকে কোনো একটা গন্ডির মধ্যে আটকে ফেলতে পারে, বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে, তাহলে ওটা আর তাকে কোনো যন্ত্রণা দিতে পারবে না। যাও, ভেঙে খন্ড বিখন্ড করে দাও ওর সব অবয়ব, সব ছায়া। ভেতর থেকে তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে_ জাপটে ধরো। গুঁড়িয়ে দাও, ওকে হ্যাঁ, একেবারে, চিরতরে ধ্বংস করে দাও। নিষ্ঠুরভাবে আছড়ে ফেল ফুটপাথে, সমস্ত শক্তি দিয়ে মাড়িয়ে দাও, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি দমফাটা গলায় বলতে পারছ যে, যন্ত্রণাদায়ক ওই শব্দটাকে তুমি হত্যা করতে পেরেছ, তোমাকে প্রায় উন্মাদ করে তোলা ওই জিনসি এখন নিস্পন্দ হয়ে নিঃসাড়ে পড়ে আছে মাটিতে, মৃত এক জড়বস্তুর মতো।

কপালের দু'পাশটা চেপে ধরা তার জন্য একেবারেই অসম্ভব। তার বাহু দুটো আরও খর্বতর এখন_ অনেকটা বামন-মানুষের হাতের মতো, খর্বাকৃতি, থলথলে নাদুশ-নুদুশ মেদবহুল এক জোড়া বাহু। মাথাটা নাড়ার চেষ্টা করল সে। নাড়ল এ-পাশ ও-পাশ। এবার শব্দটা খুলির ভেতর যেন আরও তীব্রতা নিয়ে ধেয়ে এলো, আরও শক্তিশালী হয়ে, আরও বিস্তৃতি নিয়ে_ আগের চেয়ে যেন আরও অনেক বেশি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ঝাঁপিয়ে আসছে ওটা। আরও শক্ত, ভারি। এতটাই ভারি আর শক্ত যে, ওটাকে একবার ধরতে পারলে, দুমড়ে-মুচড়ে ধ্বংস করে দিতে পারলে_ তার ধারণা, সেই সময়ও তার মনে হবে_ যেন সিসার তৈরি কোনো ফুলের পাপড়ি দল সে ধ্বংস করছে।

এরকমই নির্বন্ধ, নাছোড় শব্দটা আগেও শুনেছে সে সেই 'অন্য সময়ে'। যেমন, যেদিন তার প্রথমবারের মতো মৃত্যু হলো, ঠিক সেদিনও সে শুনেছে এই আওয়াজ। সেই সময়_ সেটাই ছিল তার প্রথম কোনো মৃতদেহ দর্শন_ এবং বুঝেছিল এক লহমায় ওটা তারই লাশ। লাশটা নজর করে দেখার পর সে স্পর্শ করেও দেখেছে। নিজেকে তখন তার মনে হয়েছে সে একেবারেই স্পর্শের ঊধর্ে্ব, ব্যাপ্তিহীন, অস্তিত্বহীন কিছু। সত্যিকার অর্থেই সে ছিল একটা লাশ, সে তার তরুণ, অসুস্থ শরীরের ভেতর ঠিকই অনুভব করেছে মৃত্যুর অতিক্রমণ। পুরো বাড়িজুড়ে তখন নেমে এসেছে এক ভয়াবহ কঠিন আবহ, যেন কোনো কংক্রিটে তৈরি, আর ঠিক তার মাঝে_স্বচ্ছ কংক্রিটির মতো ঝুলে থাকা সেই কঠিন আবহে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে এক কফিনে। সেদিনও 'ওই আওয়াজ' সে শুনেছে তার মাথার ভেতর। সেদিন কফিনের অন্য প্রান্তে ভীষণ ঠা-ায় হিম হয়ে আসা তার পদযুগল মনে হচ্ছিল যেন অনেক দূরের, শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রত্যঙ্গ। পায়ের কাছে একটা বালিশ দেয়া হয়েছিল, যাতে সর্বশেষ বরাদ্দ-নতুন বস্ত্র দিয়ে ঢাকা তার শরীরটা ঠিকঠাক মতো কফিনে এঁটে যায়, কিন্তু তারপরও কফিন-বাঙ্টা শরীরের তুলনায় বেশ বড়ই থেকে গেছে।

অপাঙ্গ সাদা কাপড়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে তাকে, একটা রুমালে চোয়াল বাঁধা_ মারাত্মক রকম সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে! কফিনে শুয়ে আছে সে, গোর দেয়ার জন্য তৈরি, কিন্তু তারপরও সে জানে তার মৃত্যু হয়নি। সে চাইলে অনায়াসেই কফিনে উঠে বসতে পারে, অন্তত 'আধ্যাত্মিকভাবে'। কিন্তু কোনো ঝামেলা করতে ইচ্ছে হয়নি তার। হোক, মৃত্যু হোক তার এখুনি, একেবারেই মৃত্যু হয়ে যাক চিরতরে 'মৃত্যু' নামের ওই ব্যাধি থেকে। সেই কবে ডাক্তার তার মাকে শুকনো গলায় বলেছিল_ 'গুরুতর রোগে ভুগছে তোমার ছেলে, ম্যাডাম। ওকে এখন একরকম মৃতই বলা যায়,' বলে গেছে সে, 'তারপরও ওই অবস্থায় ওকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব, আমরা সেই চেষ্টাই করছি। জটিল অটোনিউট্রেশন পদ্ধতিতে ওর দেহের সব কার্যক্রম সচল রাখা যাবে বলে আমরা আশা করছি। তবে ও আর কোনোদিন নড়াচড়া করতে পারবে না। ওর স্বতঃস্ফূর্ত দেহ সঞ্চালন আর সম্ভব নয়। কেবলমাত্র ওর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধির মধ্যেই ওর প্রাণের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে। কী বলব, এটাকে বলা যায়, এক ধরনের জীবিত-মৃত অবস্থা। বেঁচে আছে আবার একই সঙ্গে একে, সত্যিকারের যথার্থ মৃত্যুও হয়েছে বলা যায় না।'

কথাগুলো তার মনে আছে, কিন্তু খানিকটা বিশৃঙ্খল, অসংলগ্নভাবে। এমনও হতে পারে, সে আসলে কিছুই শোনেনি, টাইফয়েড জ্বরের উচ্চ তাপমাত্রায়, ঘোরের মধ্যে হয়তো পুরোটাই তার মস্তিষ্কের কল্পনা।

কিন্তু সে যখন তলিয়ে যাচ্ছিল প্রবল জ্বর বিকারের অতল গহিনে, যখন সে পড়ছিল ফারাও মমিদের গল্প_ জ্বর যত বেড়েছে নিজেকে তার ঠিক মনে হয়েছে একজন প্রটাগনিস্ট, কাহিনীর একজন মুখ্য চরিত্র। আর সেই থেকেই তার জীবনে এক ধরনের শূন্যতার শুরু। তখন থেকেই ভেদাভেদ করার সব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সে, কোনটা তার জীবনের সত্যি ঘটনা আর কোনটা তার জ্বরের ঘোরের প্রলাপ। আর সে কারণেই এখন তার সন্দেহ হচ্ছে_ ডাক্তার হয়তো ওই অদ্ভুত 'জীবিত-মৃত' কথাটা উল্লেখ করেনি। কারণ এটা আসলেই তো অযৌক্তিক, অবাস্তব, পুরোদস্তুর পরস্পরবিরোধী। এখন তার যে সন্দেহ হচ্ছে তা হলো, আসলেই তার মৃত্যু হয়েছে। আঠার বছর ধরেই সে একজন মৃত মানুষ।

সেই সময়, তার যখন মৃত্যু হয় তার বয়স ছিল সাত_সবুজ কাঠ দিয়ে তার মা তার জন্য ছোট্ট একটা কফিন-বাঙ্ বানাল, ছোট শিশু-উপযোগী এক কফিন। কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ ছিল আরও বড়সড় বাঙ্ বানানোর, একজন স্বাভাবিক প্রাপ্তবয়স্কের মাপে। কারণ, ওটার ভেতরেই এক ক্ষয়িষ্ণু বিকলাঙ্গ অস্বাভাবিক জীবিতের শারীরিক বৃদ্ধি ঘটবে। বাঙ্ ছোট হলে সেই বৃদ্দি বাধাগ্রস্ত হবে_ ডাক্তারের এই সতর্ক বাণীর কারণেই তার মা তার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্কের উপযোগী করে বিশালকৃতির এক কফিন তৈরি করাল। আর তার পায়ের দিকটায়, কফিনের ফাঁকটুকু পূরণ করার জন্য সেখানে গুঁজে দেয়া হলো তিনটা বালিশ।

শিগগিরই তার শরীর বাঙ্রে মধ্যে এমনভাবে বাড়তে লাগল যে, প্রতি বছরই একটা বালিশ থেকে কিছু কিছু করে উল সরিয়ে ফেলতে হলো, যাতে তার শীরর বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত খালি জায়গা থাকে। (এখন তার বয়স পঁচিশ)। তার শরীরও এখন পেঁৗছে গেছে বৃদ্ধির শেষ সীমায়, একজন পূর্ণ বয়স্কের স্বাভাবিক, চূড়ান্ত উচ্চতায়। ছুতার ও ডাক্তারের মাপের ভুলের কারণে কফিনটা এখনও বড়, তারা ধারণা করেছিল, সে তার অর্ধ-আদিম দৈত্যাকৃতি বাবার দৈহিক গড়ন পাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। উত্তরাধিকার হিসেবে তার বাবার কাছ থেকে পাওয়ার মধ্যে সে পেয়েছে শুধু মুখভরা ঘন দাড়ি।

কফিনের মধ্যে তাকে আরেকটু ভদ্রস্থ দেখানোর জন্য তার ওই ঘন নীলচে দাড়ির পরিচর্যা করা তার মায়ের নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু গরমের দিনে ওই দাড়ি তাকে যথেষ্ট যন্ত্রণা দেয়।

তবে 'ওই আওয়াজে'র চেয়ে আরেকটা ব্যাপার তাকে এখন বেশ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। সেটা হলো ধাড়ি ইঁদুরের দল। সেই ছেলেবেলাতেও দুনিয়ার অন্য কোনো কিছুই তাকে এতটা আতঙ্কিত করেনি, যতটা আতঙ্কিত করত ওই ইঁদুর। আর এই ইঁদুর হলো নির্দিষ্টভাবে সেই ইতর জাতীয় প্রাণী যারা দারুণভাবে আকৃষ্ট হয় পোড়া মোমের গন্ধে, বিশেষভাবে তার পায়ের কাছে জ্বলাপোড়া মোমের গন্ধে। এরই মধ্যে ওরা তার কাপড় কাটতে শুরু করেছে এবং সে নিশ্চিত শিগগিরই ওরা তাকে কামড়াতে শুরু করবে, কুটিকুটি করে খেতে শুরু করবে তার শরীর। একদিন সে পরিষ্কার দেখেছে ওদের_ চকচকে, পিচ্ছিল পাঁচটা ইঁদুর টেবিলের পায়া বেয়ে দ্রুত উঠে আসছে তার বাঙ্।ে তারপরই হামলে পড়ল ওরা, যেন তখুনি গোগ্রাসে গিলে খাবে তাকে। সত্যি সত্যি যদি এমন হয় একদিন, এবং তার মা যখন দেখবে ততক্ষণে হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। কুটিকুটি করে কাটা কিছু ছাল-চামড়া আর ঠা-া-কঠিন হাড়ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে যা প্রবলভাবে আতঙ্কিত করে তুলছে তা আসলে তাকে ইঁদুরে খেয়ে ফেলার আতঙ্ক নয়, সে জানে তারপরও সে ওই কঙ্কাল নিয়ে বেঁচে থাকবে, যা তাকে আসলে একেবারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে তা হলো ওই ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণীগুলোর প্রতি সহজাত এক আতঙ্ক। ভাবতেই তার চুল খাড়া হয়ে যাচ্ছে যে, তার শরীরের ওপর দিয়ে দেদার ছুটে বেড়াচ্ছে ওই নরম, মসৃণ প্রাণীগুলো, তার চামড়ার ভাঁজে ঢুকে যাচ্ছে, তার ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে ওদের ঠা-া-শীতল থাবাগুলো। ওদের একটা তর তর করে উঠে এলো তার চোখের পাতায়, চোখের মণি কামড়ে দেয়ার জন্য উদ্যত। দেখল সে, চারপেয়ে, বিশাল এক দৈত্যাকৃতি প্রাণান্ত চেষ্টায় কামড়ে ধরতে চাইছে তার অক্ষিপট। তার মনে হলো, এটা নতুন আরেক ধরনের মৃত্যু। অসম্ভব মাথা ঝিম করে দেয়া ভীতিকর এক শীতল মৃত্যু।

পূর্ণ সাবালকত্বে সে পেঁৗছে গেছে, সে জানে। পঁচিশ বছর হয়ে গেছে, আর তার মানেই হচ্ছে তার আর শারীরিক বৃদ্ধি ঘটবে না। তার মুখম-লে এখন স্পষ্ট পুরুষের রুক্ষতা, কাঠিন্য। শৈশবের কথা সে মনে করতে পারে না। আসলে তার কোনো শৈশব নেই। এক মৃতের শরীরে বেড়ে উঠেছে সে। তবে তার শৈশব আর বয়ঃসন্ধির দিনগুলোতে কঠোর পরিশ্রম করেছে তার মা। তার কফিনের, তার ঘরের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও সব সময় সে অতিরিক্ত সচেতন ছিল। নিয়মিত ফুলদানির বাসি ফুল বদলেছে সে, প্রতিদিন ঘরের জানালাগুলো খুলে দিয়েছে, যাতে ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকে। সেই দিনগুলোয়, তার মা যখন ফিতে নিয়ে তাকে মাপত, সে দেখেছে, তার শরীরের কয়েক সেন্টিমিটার বৃদ্ধিতেই তার মায়ের চোখেমুখে সে কী আনন্দ! সে বেঁচে আছে এতেই তার সব সুখ। এখনও বাড়িতে অচেনা-অজানা আগন্তুকের কৌতূহল থেকে সে তাকে আগলে রাখে। শত হলেও বাড়ির অন্দরমহলে বছরের পর বছর কোনো লাশের অস্তিত্ব কেউ মেনে নেবে না, রহস্যজনকও। তার কাছে তার মা একজন মহৎ আত্ম্যোৎসর্গকারী মহিলা। কিন্তু সে জানে, শিগগিরই তার মায়ের প্রত্যাশায় ভাটা পড়বে। গত কয়েক মাসে তার শারীরিক বৃদ্ধি একদমই থেমে গেছে, এক মিলিমিটারও বাড়েনি। তার মা এখন বুঝে গেছে তার পক্ষে আর তার ওই আদরের লাশে প্রাণের উপস্থিতি টের পাওয়া সম্ভব নয়। আতঙ্ক পেয়ে বসেছে তাকে, একদিন সকালে এসে হয়তো সে দেখবে 'সত্যি' মৃত্যু হয়েছে তার ছেলের, আর সেই সন্দেহেই, সেদিন চুপিসারে তার বাঙ্রে কাছে এসে তার শরীর শুঁকে বোঝার চেষ্টা করেছে তা মা_ আশা-নিরাশার এক প্রবল দোলাচালে পড়ে গেছে বেচারি। ইদানীং তার কাজে মনসংযোগ ঠিক থাকছে না, মাপের ফিতেটা প্রায় সঙ্গে আনতে ভুলে যাচ্ছে সে। সে জেনে গেছে যে, তার ছেলের শরীর আর বাড়বে না।

সে জেনে গেছে, এখন সে 'সত্যি' মৃত। কারণ শান্ত-ধীর-স্থির এক প্রশান্তি, তার ক্রিয়াশীল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। অসঙ্গতভাবে বদলে যাচ্ছে সবকিছু। ধমনীর ইন্দিয়াতীত সব স্পন্দন, যা কেবল একমাত্র তার পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব, তা-ও এখন আর স্পন্দিত হচ্ছে না, উধাও হয়ে গেছে নাড়ি থেকে। ভেতরটা কেমন ভারি হয়ে আসছে তার, প্রবল এক ফিরতি টান তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে আদিম মৃত্তিকার কাছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির তীব্র টান মনে হচ্ছে ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। সে বরাবরই ভারি, স্বাভাবিক যে কোনো মৃতদেহের মতোই, কিন্তু সেই অবস্থাও অনেক প্রশান্তিদায়ক ছিল তার জন্য। মৃতের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য শ্বাসটা পর্যন্ত টানতে হতো না তাকে।

কল্পনায়, নিজেকে স্পর্শ না করে, একে একে পুরো শরীরটাই ঘুরে এলো সে। শক্ত বালিশে রাখা মাথাটা সামান্য বাঁয়ে ঘোরাল। তার মনে হলো, মুখটা খানিকটা হাঁ হয়ে আছে, আর ভেতর থেকে সর্দির চিকন একটা ধারা গলার কাছে এসে কণ্ঠনালিটা প্রায় বুজিয়ে দিয়েছে। তেইশ বছরের পুরনো, কাটা গাছের মতো শরীরটা নিয়ে কেমন সটান পড়ে আছে সে। নিথর। হাঁ হয়ে থাকা মুখটা একবার বন্ধ করার চেষ্টা করে দেখতে পারে ভাবল সে। চোয়ালে বাঁধা রুমালের গিঁটটা রোধকরি ঢিলে হয়ে গেছে। নিজেকে ঠিকঠাক করে রাখতে পুরো অক্ষম সে, একটু যে গুছিয়ে থাকবে, লাশ হলেও দেখতে যাতে একটু ভদ্রস্থ লাগে তাও সম্ভব না। তার পেশি, অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনোটাই আর আগের মতো সাড়া দিচ্ছে না, মানছে না স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মাবর্তিতাও। আঠারো বছর আগের সে আর নেই। নেই সেই স্বাভাবিক শিশুটি যে খুশি মতো নড়াচড়া করতে পারে। দেহের দু'পাশে পড়ে থাকা হাত দুটোর কথা ভাবল_ চিরতরে নিঃসাড় হয়ে গেছে ও দুটোও। কফিনের গায়ের সঙ্গে নরম কুসনে লেপ্টে পড়ে আছে। পেটের অংশটা ঠিক ওয়ালনাট গাছের বাকলের মতো। নিচের দিকে পা_ তার দেহতন্ত্রকে একজন প্রাপ্তবয়স্কের নিখুঁত পূর্ণতা দেয়া এই শেষ অঙ্গটিও এখন নির্জীব।

শরীরটা তার কেমন ভারি হয়ে গেছে, জড়ভরতের মতো একদম নিঃসাড়। কোথাও কোনো ঝামেলা নেই, কোথাও কোনোরকম অস্বস্তি নেই। যেন হঠাৎ পৃথিবীটা থমকে গেছে কোথাও। সময় স্থির। সব নীরব, কেউ কোনো শব্দ করছে না, যেন দুনিয়ার সমস্ত ফুসফুসের শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়াও একযোগে থেমে গেছে, বাতাসের নরম ফিসফিসানি পর্যন্ত নেই। নিজেকে তার নরম ঘাসের ওপর শুয়ে চিৎ হয়ে আকাশ দেখা এক সুস্থ, আনন্দিত বালকের মতোই লাগছে, উপরে বিকেলের আকাশে ভারি মেঘের দল ভেসে যাচ্ছে_ নিজেকে তার বেশ সুখীই মনে হলো, যদিও সে জানে সে একজন মৃত মানুষ, তাকে আরেকটু পরেই চিরতরে শুইয়ে দেয়া হবে কৃত্রিম সিল্কের তৈরি কফিন-বাঙ্,ে কবরের চিরঅন্ধকারে। সবকিছুই এখন তার কাছে অনেক বেশি পরিষ্কার, স্বচ্ছ। আগে এমনটা ছিল না। বিশেষ করে তার প্রথম মৃত্যুর পর, তখন তার কাছে সব মনে হয়েছে কেমন নিষ্প্রভ, হতোদ্যম আর বোধবুদ্ধিহীন। মাথা ও পায়ের দিকে_চারকোনায় যে চারটা মোমবাতি জ্বলে, প্রতি তিন মাস অন্তর যা বদলে দেয়া হয়, সেগুলোও যেন সময়ের ঠিক অপরিহার্যতা বুঝে নিভে যেতে শুরু করেছে। সকালে তার মায়ের আনা ভায়োলেট ফুলের তরতাজা, ভেজা সুগন্ধটা মনে হচ্ছে খুব কাছে, যেন একেবারে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। পদ্ম আর গোলাপের বেলায়ও ঠিক এমনটা হয় তার।

চারদিকের এই কঠিন, ক্রূর বাস্তবতা কখনোই তাকে বিচলিত করতে পারেনি। বরং ঠিক উল্টোটা হয়েছে, বলা যায় তার এই একাকী, সীমাহীন নৈঃশব্দ্যের মধ্যে সে সুখীই ছিল। কিন্তু এরপর কি তার ভয় করবে?

কে বলতে পারে তা? কবরে নামানোর আগে কফিনের সবুজ কাঠে যখন হাতুড়ির বাড়িতে পেরেক ঠোকা হবে, বাড়িতে পিষ্ট পেরেক আর বিদীর্ণ হওয়া কফিনের কাঠ আরও একবার গাছ হয়ে পুনর্জন্মের প্রত্যাশায় যখন নীরবে ককিয়ে উঠবে_ সেই মুহূর্তের কথা বোধকরি কারও পক্ষেই বলা সম্ভব না। মাটি তীব্রভাবে টানছে তার শরীরকে, মনে হচ্ছে নরম কাদামাটির মতো কোমল ভারি এক শূন্যতায় শুয়ে সে_ চার গজ উপরে, গোরখোদকদের কোদালের শেষ আওয়াজটাও অপসৃত প্রায়_ না। ওই নরম-কোমল মাটির কবরেও ভয় পাবে না সে। ওটা তো তার মৃত্যুরই আরেক প্রলম্বিত বিস্তার, তার আরেক অনিবার্য নতুন রূপান্তর।

আর কোনো উত্তাপ অবশিষ্ট থাকবে না তার শরীরে। এরপর সবকিছুতে, অস্থিমজ্জায় ঢুকে যাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বরফকুচির শীতলতা। রূপান্তরিত মৃত মানুষ হিসেবে সে ওই নতুন জীবনের সঙ্গে কতখানি মানিয়ে নিতে পারবে! একদিন সে ঠিক অনুভব করবে, দেহ আচ্ছাদন তার খসে পড়ছে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে আলগা হয়ে যাচ্ছে আলগোছে সবকিছু, সে যখন তার একদার সেই দেহের বিভিন্ন অংশের নাম মনে করার চেষ্টা করবে, অনুভব করার চেষ্টা করবে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে_ তখন কাউকেই আর খুঁজে পাবে না সে। দেখবে তার আর আসলে কোনো আকৃতি নেই, চরম হতাশায় সে অনুভব করবে তার পঁচিশ বছরের খুঁতহীন পরিচিতি দেহযন্ত্রটি পরিণত হয়েছে আকৃতিহীন একমুঠো ধুলোয়, যার কোনো জ্যামিতিক সংজ্ঞাও নেই।

বাইবেল বর্ণিত সেই মৃত্যুর ধুলো। সে হয়তো তখন খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়বে, স্মৃতিতাড়িত হবে এখনকার এই বিমূর্ত, কাল্পনিক শরীরের পরিবর্তে আগের সেই যথাযথ মানব দেহটির জন্য। সে জানে, আপেল গাছের কৈশিক নালি দিয়ে তার তখন পুনরুত্থান ঘটবে, আবার জেগে উঠবে সে কোনো এক বসন্তদিনের শিশুর তীব্র ক্ষুধা নিয়ে, সে এটাও জানে_ তার আর কোনো যৌগিক রূপ নেই, সে নিজেকে কি তখন একজন সাধারণ মৃত মানুষ বলবে? না শুধুই এক মামুলি মৃতদেহ, জানা নেই তার। এটা তাকে নিঃসন্দেহে দুঃখিত করবে।

গত রাতটা ছিল তার নিজের দেহের সঙ্গে কিংবা তার লাশের সঙ্গে শেষ রজনী। নতুন দিনে সূচনায়, খোলা জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সকালের কুসুম রোদে তার মনে হলো, চামড়া তার ক্রমশ ঢিলে হয়ে আসছে। ব্যাপারটা সে শক্ত হয়ে খানিক বোঝার চেষ্টা করল। নীরবে। শরীরের ওপর দিয়ে নির্বিচারে বাতাস খেলা করতে দিল খানিক। আর তখুনি আর কোনো সন্দেহ রইল না তার, গন্ধটা আছে। তার মানে তার লাশের পচন শুরু হয়ে গেছে, আর সেটা বোধকরি শুরু হয়েছে গত রাত থেকেই। হ্যাঁ, এবার একজন স্বাভাবিক মানুষের সত্যিকারের লাশের মতোই তার দেহেরও পচন শুরু হয়ে গেছে। অপ্রতিরোধ্য এই পচন। দুর্গন্ধটা নিঃসন্দেহে একেবারে নির্ভুলভাবে বলা যায়, পচা মাংসের গন্ধ, তীব্র বোটকা গন্ধ। বাতাসে থেকে থেকে আসছে। আসলে গতরাতের গরমেই তার দেহের পচন শুরু হয়েছে, হ্যাঁ এটাই সত্যি, পচে যাচ্ছে সে। আর ঘণ্টাখানেক বাদেই তার মা বাসি ফুল পাল্টে দিতে আসবে, পচা মাংসের গন্ধটা চতুর্দিক থেকে তখন ঝাঁপিয়ে পড়বে তার নাকে। আর তারপর তারা তাকে, তার দ্বিতীয় মৃত্যু থেকে নিয়ে যাবে অন্য আর সব মৃতদের কাছে।

কিন্তু আচমকা পিঠে ছুরি মারার মতো তীব্র এক ভয় খামচে ধরল তাকে। ভয়। ছোট্ট কিন্তু কী গভীর তার মর্ম। এখন সে সত্যিই ভয় পাচ্ছে, সত্যিকারের এক শারীরিক আতঙ্ক। কারণ কি? তার শরীরে এক ধরনের শির শিরে অনুভূতি স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। তার মানে? তার মানে এখনও বোধহয় সে মরেনি। তাকে শুইয়ে রাখা কফিনের তুলতুলে কুশনের তীব্র আরাম_ আর ওই অলীক আতঙ্ক সহসা তার সামনে যেন এক অতি রূঢ় এক বাস্তবতার জানালা খুলে দিল_ ওরা আসলে তাকে জীবিত কবর দিতে চলেছে!

এখনও তার মৃত্যু হয়নি, সবকিছুই স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে_ তার চাপাশে ঘূর্ণি তোলা জীবন, ধমনীর স্পন্দন_সব_ঘ্রাণ পাচ্ছে খোলা জানালা দিয়ে আসা নীল রঙা হোলিট্রোপের, সঙ্গে আরও কিছু ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধও ঝাঁপটা দিচ্ছে নাকে। কাছেপিঠে কোনো শৌচাগারে পানির ফোঁটার শব্দ, সাড়া পাচ্ছে ঘরের কোণে আস্তানা গাড়া ঝি ঝি পোকাটারও, সকাল হতে বাকি আছে ভেবে এখনও যে ডেকে চলেছে।

সবকিছুই তার মৃত্যুকে অস্বীকার করছে। সবকিছু। একমাত্র পচা গন্ধটা ছাড়া। কিন্তু সে কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে যে ওটা তারই গন্ধ? আগের দিন তার মা হয়তো ফুলদানির পানি বদলাতে ভুলে গেছে, ফুলের ডাঁটা পচে হয়তো গন্ধ ছড়াচ্ছে। অথবা বাইরে থেকে তার ঘরে কোনো মরা ইঁদুর এনে লুকিয়ে রেখেছে বিড়াল, গরমে সেটাই পচতে শুরু করেছে। ওই 'দুর্গন্ধ' কিছুতেই তার শরীর থেকে আসছে না।

খানিক আগেও সে তার মৃত্যু নিয়ে খুশিই ছিল, কারণ সে ধরেই নিয়েছিল যে তার মৃত্যু হয়েছে। প্রতিকারের ঊধর্ে্ব চলে যাওয়া নিশ্চিত সেই অবস্থা নিয়ে একজন মানুষ খুশি হতেই পারে। কিন্তু একজন জীবিত মানুষ তার জীবন্ত সমাহিত হওয়াকে কীভাবে মেনে নেয়। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না, তার এ অবস্থা প্রকাশ করার কোনো উপায়ও তার জানা নেই। তার জীবন মৃত্যুর সবচেয়ে সঙ্কটময় অবস্থার মধ্যে পড়েছে সে। ওরা তাকে জীবিত কবর দেবে। সে তার সবই দেখবে, বুঝবে। প্রত্যেকটি মুহূর্ত সে সচেতন থাকবে_ তার কফিনের পেরেক ঠুকে বন্ধ করে দেয়া হলো। তারপর কফিনটা উঠে গেল বন্ধুদের কাঁধে। কফিনের ভেতরে, শবযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে তার জীবন্ত সমাহিত হওয়ার আতঙ্ক তখন তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হচ্ছে।

নিষ্ফল চেষ্টায় তার ফুরিয়ে আসা সমস্ত শক্তি দিয়ে হয়তো সে প্রাণপণে উঠে বসার চেষ্টা করবে। অন্ধকার কফিনের অপরিসরে হাত-পা ছুড়ে হয়তো সে শেষবারের মতো জানান দেয়ার চেষ্টা করবে যে, এখনও সে বেঁচে আছে, তারা আসলে তাকে জীবিত কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যর্থ চেষ্টা হবে তা-ও : স্নায়ুতন্ত্রের সর্বশেষ এই অতি জরুরি ডাকেও সাড়া দেবে না চিরতরে নেতিয়ে পড়া তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো।

পাশের ঘরে কারও শব্দ পেল সে। তাহলে সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? একজন মৃত মানুষের জীবন কি পুরোটাই দুঃস্বপ্নের? পাশের ঘরে হাঁড়ি-পাতিল নাড়াচাড়ার শব্দ এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না, থেমে গেছে। মন খারাপ হয়ে গেল তার। খানিকটা বিরক্তও হলো। এই মুহূর্তে তার কাছে এর চেয়ে আরাধ্য আর কিছু হতে পারত না : দুনিয়ার সমস্ত হাঁড়ি-পাতিল যদি একযোগে তার সামনে সশব্দে ভেঙে গড়িয়ে পড়ত, চুরমার করে দিত সবকিছু_ বহিরাগত সেই শব্দ যদি আমূল জাগিয়ে দিত তাকে, তার নিজের ইচ্ছাশক্তি যেখানে আর কোনো কাজ করছে না_ সেখানে এর চেয়ে স্বস্তিকর আর সুখকর কিছু হতো না।

কিন্তু না। এটা কোনো স্বপ্ন না। সে নিশ্চিত এটা স্বপ্ন হলে প্রাণপণে তার এই বাস্তবতায় ফিরে আসার চেষ্টা কিছুতেই ব্যর্থ হতো না। সে আর জেগে উঠত না। কফিনের নরম কোমল অনুভূতিটা আবার যেন ফিরে এলো, গন্ধটাও। আরও তীব্র আরও অসহনীয় হয়ে গন্ধের এই তীব্রতা তাকে আরও সন্দিগ্ধ করে তুলল, আসলেই কি গন্ধটা তার শরীর থেকেই আসছে! সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগে সব আত্মীয়স্বজনকে একবার দেখার তীব্র ইচ্ছে হচ্ছে, তবে তার এই পচা-গলা দেহটা দেখে হয়তো অসম্ভব, তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে ওদের। আতঙ্কিত প্রতিবেশীরা হয়তো মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ছুটে পালাবে তার লাশের কাছ থেকে। অসহনীয় গন্ধে থুতু ফেলবে। না, এরকম না। তার চেয়ে ওরা বরং তাকে জীবন্তই পুঁতে ফেলুক, সেই ভালো। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্তি ঘটে তার ততই ভালো। অন্তত তার এই লাশটার কথা ভেবে হলেও এখন সে হাল ছেড়ে দিতে চাইছে। সে এখন জেনে গেছে, আসলে তার সত্যিই মৃত্যু হয়েছে, কিংবা সে শুধু অনুভূতিতেই বেঁচে আছে। কিন্তু কি এমন তফাৎ এতে? বেঁচে থাকলেও এই গন্ধটা তো সত্যি শেষ পর্যন্ত।

শেষ প্রার্থনা, শেষ লাতিন মন্ত্রোচ্চারণ_ সে শুনবে তার নিরুপায় আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই, সবরকম প্রতিক্রিয়া জানানোর শক্তি তার নিঃশেষিত। গোরস্থানের ধুলো আর অন্যদের হাড়ের ঠা-া অনায়াসেই ঢুকে পড়বে তার হাড়ে-মাংসে_ এতে হয়তো পচা গন্ধটা খানিক দূর হবে। হ্যাঁ, হয়তো_ কে বলতে পারে তা_ সমাগত সেই মুহূর্ত হয়তো তাকে এক ঝটকায় জাগিয়ে দেবে এই নিদ্রালু তন্দ্রা থেকে। তার মনে হচ্ছে, সে তার নিজের ঘামের মধ্যেই সাঁতার কাটছে, ঘন, দূষিত তরল ঘাম, যেন সে তার মায়ের গর্ভে জন্মের আগের সেই সময়ে ফিরে গেছে। অন্তত সে-ই সময়টায় যখন সে বেঁচে ছিল।

কিন্তু এখন সে হাল ছেড়ে দিয়েছে, মৃত্যুর কাছে পুরোপুরি সপে দিয়েছে সে নিজেকে। এখন এমনিতে না হলেও হয়তো এই চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের কারণে যতি পড়বে তার জীবনের।



অনুবাদ : আলীম আজিজ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন