রবিবার, ১১ মে, ২০১৪

ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা'র গল্প : বরফ

অনুবাদঃ কল্যাণী রমা

গত চার, পাঁচ বছর ধরে প্রতিটি নতুন বছরেই নোরা সাংকিচি নির্জনতায় ডুবে, একা একা কাটাচ্ছে - টোকিওর এক বহুতলা হোটেলে নতুন বছরের সন্ধ্যা থেকে শুরু করে তিন দিন পর সেই ভোর না হওয়া পর্যন্ত। যদিও হোটেলটার একটা জমকালো নাম আছে, সাংকিচির কাছে তার নাম শুধুই ‘স্বপ্নবাড়ি’।

“বাবা ‘স্বপ্নবাড়ি’-তে গেছেন,” নতুন বছরে যারাই দেখা করতে আসত, সকলকে এই একই কথা বলত সাংকিচির ছেলে মেয়েরা। অতিথিরা এই কথাকে ঠাট্টা হিসাবেই নিত। মনে করত সাংকিচি ঠিক কোনখানে কোথায় আছে, তা সবাইকে জানাতে চায় না ওরা।

“বাহ্‌, খুব ভালো জায়গা তো। নিশ্চয়ই নতুন বছর চমৎকার কাটছে ওখানে,” উওরে কেউ কেউ তখন এমনও বলত।

অথচ, কেউ এটা জানত না যে সাংকিচি সত্যি সত্যি ওই ‘স্বপ্নবাড়ি’-তে স্বপ্ন দেখত। সাংকিচির বাড়ির লোকজনও না।

হোটেলের ঘরটা প্রতি বছর সেই একই হ’ত। ‘বরফ-ঘর’। অবশ্য একমাত্র সাংকিচিই জানত যে প্রতি বছর যেই ঘরই পাক না কেন, তাকে ‘বরফ-ঘর’ বলেই ডাকত সাংকিচি।

হোটেলে পৌঁছেই ঘরের সব পর্দা টেনে দিত ও। তারপর আর এক মুহুর্ত দেরি না করে সাথে সাথেই বিছানায় ঢুকে চোখ বন্ধ করত সাংকিচি। দুই কি তিন ঘন্টা সে ওখানে চুপচাপ শুয়ে থাকত। এ কথা সত্য যে সাংকিচি এক ব্যস্ত, অস্থির বত্‌সরের বিরক্তি আর ক্লান্তি থেকে একটু বিশ্রাম খুঁজতেই ওখানে যেত, কিন্তু যখন সব ছটফটানি আর অস্থিরতা দূর হয়ে যেত, ঠিক তখন এক আরও গভীরতর ক্লান্তি ফুলেফেঁপে উঠে সাংকিচির দেহ-মনের ভিতর ছড়িয়ে পড়ত। এটা বুঝতে পারবার পর থেকেই সাংকিচি অপেক্ষা করতে থাকত, কখন ওর ক্লান্তি সম্পূর্ণ পরিপূর্ণতা পাবে। যখন ওর শরীর ক্লান্তির একদম শেষ তলানিতে গিয়ে ঠেকত, ওর মাথা প্রায় অবশ অসাড় হয়ে যেত, তখন ঠিক তখন সেই স্বপ্নটা ধীরে ধীরে ডুবুরির মত উপরে ভেসে উঠত।

চোখের পাতার পিছনে, অন্ধকারে ছোট ছোট শস্যদানার মত আলোর বিন্দু নাচতে নাচতে ভাসতে থাকত। ছোট শস্যদানাগুলোর রঙ বিবর্ণ, সোণালি, স্বচ্ছ। আর যখন তাদের সেই সোণালি রঙ ঠান্ডা হ’য়ে এক আবছা শাদা রঙে বদলে যেত, তা শাদা শাদা পেঁজা পেঁজা তুষারকণা হ’য়ে যেত। তারপর সব একই দিকে, একই ভাবে আস্তে আস্তে ভেসে যেত। দূরে বহুদূরে ঝরে পড়ত - গুঁড়া গুঁড়া তুষারকণা।

“এই নতুন বছরেও তুষার ঝরছে।”

এই ভাবনার সাথে সাথেই ওই বরফ আর ওই তুষার সব সাংকিচির নিজের হয়ে যেত। আর তারপর সাংকিচির হৃত্‌পিন্ডের ভিতরও তুষার ঝরে পড়ত।

এখন ওর বন্ধ চোখের অন্ধকারের ভিতর বরফ আর তুষার এগিয়ে আসছে। খুব বেশি, খুব দ্রুত আর খুব কাছে তুষার ঝরছে। শাদা পিওনি ফুলের মত তুষারকণা। বড় বড় ফুলের পাপড়ির মত তুষারকণা। গুঁড়া গুঁড়া তুষারকণার চেয়ে এই তুষারকণা অনেক বেশি ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। সাংকিচি ওই নৈঃশব্দের ভিতর, ওই শান্তির তুষার ঝড়ের ভিতর ডুবে যেতে থাকল।

চোখ খুললে আর কোন ক্ষতি নেই এখন।

সাংকিচি চোখ খুলল, ওই ঘরের দেয়ালে তুষারের ছবি আঁকা হয়ে গেছে। এতক্ষণ নিজের চোখের পাতার ভিতরে কেবল তুষার ঝরে পড়তে দেখছিল সাংকিচি। কিন্তু দেয়ালের দিকে তাকিয়ে মনে হ’ল ওখানে যেন অনেকক্ষণ ধরেই তুষার ঝরছে।

এক বিশাল মাঠের মাঝে মাত্র চার পাঁচটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে - শূন্য ডাল। কিন্তু ঠিক সেখানেও পিওনি ফুলের পাপড়ির মতই তুষার। বরফ ভেসে ভেসে, সরে সরে যত উপরে উঠে যাচ্ছে, তত ঘাস বা মাটি কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে কোন বাড়িঘর নেই, কোন মানুষজনের চিহ্ন নেই। খুব একাকী এই দৃশ্য, তবু সাংকিচি হোটেলের কৃত্রিম গরম বিছানায় শুয়ে বরফ ঢাকা মাঠের ঠান্ডাটুকু কিছুতেই আর অনুভব করতে পারছে না। অথচ চারপাশে যা পড়ে আছে, তা কেবলই এক বরফে ঢাকা প্রকৃতি। শুধু সাংকিচি নিজে সেখানে নেই।

“কোথায় যাব?কাকে ডাকব?” যদিও এই চিন্তা ওর মনের ভিতর ঘোরাফেরা করতে থাকল, তবু ওই ভাবনাটা যেন ঠিক ওর নিজের না। তা যেন এক বরফ ছাওয়া পৃথিবীর গলার স্বর।

বরফ ঢাকা প্রান্তর - সেখানে পড়ন্ত বরফ ছাড়া এখন আর অন্য কোন নড়াচড়া নেই। প্রান্তরটি যেন নিজে নিজে সরে যাচ্ছে এক পাহাড়ি ঢালের দৃশ্যপটের দিকে। দূরে, বহুদূরে দেখা যাচ্ছে সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের পা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চলে গেছে এক নদী। দেখে যদিও মনে হচ্ছে যে ছোট নদীটা বুঝি বরফে বুজে আসছে, আসলে কিন্তু নদীটা কোন ঢেউ না তুলেই বয়ে যাচ্ছে। বরফের একটা চাঁই তীর থেকে নদীতে পড়ে জলের উপর ভাসছে। তারপর স্রোতের মুখে একটা বড় পাথরখন্ডে ধাক্কা খেয়ে সেই বরফের চাঁই জলে গলে গলে পড়ছে।

ওই বড় পাথরখন্ডটা ছিল এক কেলাসিত সবুজ পান্না। সেই নীলকান্তমণির কোয়ার্টজে ভরা পাথরের উপরে সাংকিচির বাবা এসে দাঁড়ালেন। কোলে তিন কি চার বছর বয়সের সাংকিচি।

“বাবা, এমন সুচালো, অমসৃণ, খাঁজ-কাটা পাথরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বড় বিপজ্জনক, খুব বেশি বিপজ্জনক। তোমার পায়ের পাতায় নিশ্চয়ই ব্যথা করছে।” বিছানায় শুয়ে শুয়ে পঞ্চাশ বছরের সাংকিচি ওই বরফে ঢাকা পৃথিবীতে নিজের বাবার সাথে কথা বলল।

পাথরের চাঁই-এর উপরটা ধারাল কোয়ার্টজ ক্রিষ্টালে ভরা। দেখে মনে হচ্ছে সাংকিচির বাবার পা বুঝি এই এখনই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। সাংকিচির কথায় বাবা শরীরের ভার বদল করে দাঁড়াতে গেলেন। আর ঠিক তখন পাথরের চাঁই-এর উপর থেকে বরফ ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে নদীর ভিতর পড়ল। কি জানি হয়ত তাতেই ভয় পেয়ে সাংকিচির বাবা সাংকিচিকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন।

“কি আশ্চর্য! এই সরু, ছোট নদীটা এত বরফে ডুবেও বুজে যাচ্ছে না,” বাবা বললেন।

বাবার মাথায়, কাঁধে, হাতে সব জায়গায় বরফ। আর সেই বরফ ভর্তি হাতেই ধরে রেখেছেন সাংকিচিকে।

দেয়ালের গায়ে বরফের ছবি সরে সরে যাচ্ছে। কেমন যেন উপরের দিকে ভেসে ভেসে যাচ্ছে সব। একটা হ্রদ চোখে পড়ল। পাহাড়ের অনেক নীচে এই ছোট হ্রদ। কিন্তু ওই নদীটার উত্‌স ওই হ্রদে বলেই হয়ত হ্রদটাকে অনেক বেশি বড় মনে হচ্ছে। শাদা শাদা পিওনি ফুলের পাপড়ি। পাপড়িগুলো যত বেশি দূরে তত যেন তাদের গায়ে হালকা ছাই রঙের আভাস। দূরে ভেসে বেড়াচ্ছে একরাশ মেঘ। বহুদূরের তীরে পাহাড়গুলোকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

তুষার ঝরছে অবিরাম। সাংকিচি কিছুক্ষণ সেই পিওনি ফুলের পাপড়ির মত ঝরে পড়া তুষারকণার দিকে তাকিয়ে থাকল। হ্রদের উপর ঝরে পড়ে সেই তুষারকণার পাপড়ি গলে গলে যাচ্ছে। দূরের তীরে পাহাড়ের বুকে কিছু একটা যেন নড়ছে। ধূসর আকাশের মাঝ দিয়ে ক্রমশঃ তা কাছে এগিয়ে আসছে। এক ঝাঁক পাখি। শাদা বরফের রঙের ডানা ওদের। কিংবা যেন বরফ নিজেই ওদের পাখা। অথচ যখন ওরা সাংকিচির চোখের সীমানা পেরিয়ে গেল, তখনও ওদের ডানা্য কোন শব্দ হ’ল না। কি জানি ওদের পাখাগুলোও কি ধীরে ধীরে শান্ত, নীরব ঢেউ-এর মত প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে? ঝরে পড়া বরফই কি পাখিগুলোকে বয়ে নিয়ে আসছে?

যখন সাংকিচি পাখিগুলোকে গুনতে গেল, দেখল সাতটা পাখি, এগারটা পাখি...একসময় আর হিসাব রাখতে পারল না সাংকিচি। কিন্ত এই ধাঁধায় হতবিহবল না হয়ে এক গভীর প্রশান্তিতে ভরে গেল ওর মন।

“কি পাখি? কার পাখা?”

“আমরা পাখি না। দেখতে পাচ্ছ না ডানায় ভর দিয়ে কারা এগিয়ে আসছে?” ওই বরফ পাখিদের মাঝ থেকে একটা স্বর ভেসে এল।

“আহা, তাই তো,” সাংকিচি বলে উঠল।

সব, সব নারী যারা সাংকিচিকে ভালোবেসেছিল, তারা সবাই আজ পাখির ডানায় ভর করে সাংকিচির কাছে নেমে এসেছে। ওদের মাঝে কে প্রথম কথা বলল?

স্বপ্নের ভিতর সাংকিচি বহু বহুদিন আগে যে মেয়েরা ওকে ভালোবেসেছিল, তাদের খুব সহজেই কাছে ডেকে নিতে পারল।

নতুন বছরের সন্ধ্যা থেকে শুরু করে তিন দিন পরের এক ভোরবেলা পর্যন্ত ওই ‘স্বপ্নবাড়ি’-তে ‘বরফ-ঘর’-এর ভিতর সব পর্দা টেনে দিয়ে, হোটেলের খাবার সব নিজ ঘরেই নিয়ে এসে, একবারও বিছানা ছেড়ে না উঠে গিয়ে তারপর সাংকিচি সেইসব নারীদের আত্মার সাথে কথা বলল।



(লেন ডানলপের ইংরেজী অনুবাদ থেকে)

অনুবাদক পরিচিতি
কল্যাণী রমা

গল্পকার, অনুবাদক ও প্রবন্ধকার
জন্ম ঢাকায়। ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

বি টেক করেছেন ভারতের খড়গপুর আই আই টি থেকে ।
ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং-এ।

বর্তমানে আমেরিকার উইস্কনসিনে থাকেন।

1 টি মন্তব্য: