বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

রমানাথ রায়ের গল্প : অমুকচন্দ্র অমুক

আমি কোনও দিন বাবাকে দেখিনি। না দেখলেও বাবা বলে একজন আছে। আছে আমার বার্থ সার্টিফিকেটে, আছে রেশন কার্ডে। আছে স্কুলে-কলেজে-অফিসে-ব্যাঙ্কে। আছে ভোটারের পরিচয়পত্রে। এ ছাড়া আরও নানা জায়গায় বাবার নাম লেখা আছে। কেন আছে তা জানি না। এ সব জায়গায় বাবার নাম না থাকলে কী হত? আর, অমুকচন্দ্র অমুক যে আমার প্রকৃত বাবা তা কী করে জানব? মা ছাড়া কেউ তা বলতে পারবে না। এতকাল মার কথা সত্যি না মিথ্যে তা জানার উপায় ছিল না। এখন জানা যাবে। এখন ডি এন এ পরীক্ষায় সব ধরা পড়বে। আমি অবশ্য মাকে সন্দেহ করি না।
বিশ্বাস করি অমুকচন্দ্র অমুক আমার বাবা। লোকজনকেও ওই নামটাই বলি। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ওই নামটাই জানে। তবে তারা নামটা জেনে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। তাদের কৌতূহল অচেনা লোকদের থেকে একটু বেশি। তারা আমাকে নানা প্রশ্ন করে। আমিও তাদের বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দিই। সেই সব প্রশ্ন ও উত্তরগুলো মোটামুটি এই রকম:
— তোর বাবা এখন কোথায়?

— দিল্লিতে।

— তার আগে দুবাইতে ছিলেন না?

— হ্যাঁ।

— আমেরিকায় তো কয়েক বছর ছিলেন?

— হ্যাঁ। তার আগে জার্মানিতেও কয়েক বছর ছিল।

— জার্মানিতে তোর কাকা আছে তো?

—হ্যাঁ।

— কাকার সঙ্গে তোদের সম্পর্ক কেমন?

— ভাল।

— তোদের কাছে তোর বাবা শেষ কবে এসেছিলেন?

— দু’ মাস আগেই তো এসেছিল।

— তোরা দিল্লিতে যাবি না?

— যাবার কথা আছে। বাবা প্রায়ই ফোন করে। আমাদের দিল্লি আসতে বলছে। কিন্তু সময় পাচ্ছি না।

— তোদের নিয়মিত ফোন করেন?

— হ্যাঁ।

— তোর বাবাকে কোনও দিন দেখিনি। খুব দেখতে ইচ্ছে করে। এবার উনি এলে বলিস। বলবি তো?

— অবশ্যই।

আমি সকলকে এইভাবে শান্ত করি। তাদের কৌতূহল মেটাই। তবে ভিতরে ভিতরে এই লোকগুলোর ওপর আমি রেগে যাই। বুঝে পাই না আমার বাবাকে নিয়ে এদের এত কৌতূহল কেন? আমি তো এদের বাবাদের নিয়ে কোনও কৌতূহল দেখাই না। কোনও বেয়ারা প্রশ্ন করি না। আমি তো ইচ্ছে করলে কাউকে প্রশ্ন করতে পারি। অমুকচন্দ্র অমুক যে তোমার প্রকৃত বাবা তা কী করে জানলে? ডি এন এ পরীক্ষা কি হয়েছে?



আমার কাকা দশ বছর ধরে জার্মানিতে আছেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভাল। তিনি কলকাতায় এলে আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর কাছে আমাদের ফোন নাম্বার আছে। তিনি জার্মানি থেকে মাঝে মাঝে আমাদের ফোন করেন। আমাদের খোঁজখবর নেন। কিন্তু বাবা আমাদের কোনও খোঁজ খবর নেয় না। ফলে আমার বাবা অমুকচন্দ্র অমুক এখন কোথায় আছে তা জানি না। এমনকী বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। কাকাকে ফোন করেও কিছু জানতে পারি না। কাকাকেও বাবা কিছু বলে না। আসল কথা, বাবা আমাদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চায় না। আমরাও চাই না। না চাইলেও ঘরের দেওয়ালে মার সঙ্গে বাবার তোলা একটা ছবি টাঙানো আছে। আজ থেকে সাতাশ বছর আগে এই ছবি তোলা হয়েছিল। এত বছর পরে বাবার মুখ নিশ্চয়ই আর ওই রকম নেই। অনেক বদলে গেছে। এখন দেখলে চিনতে পারব না। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। না আসলেও অমুকচন্দ্র অমুককে আমার এখন দরকার। দরকার পিয়ালির জন্যে।

আমি পিয়ালিকে ভালবাসি, পিয়ালিও আমাকে। আমাদের এবার বিয়ে করা দরকার। কথাটা সবার আগে মাকে বলেছি। মার কোনও আপত্তি নেই। এবার কথাটা পিয়ালিকে বলা দরকার। একদিন কথাটা পিয়ালিকে বললাম।

পিয়ালি বলল, বাবার মতটা নেওয়া দরকার।

জিজ্ঞেস করলাম, কে নেবে?

পিয়ালি বলল, কে আবার! তুমি নেবে।

আমি পরদিন পিয়ালির বাবার সঙ্গে দেখা করলাম। পিয়ালিকে বিয়ে করার ইচ্ছে জানালাম।

পিয়ালির বাবা খুশি হয়ে বললেন, আমার আপত্তি নেই। তবে তোমার বাবার সঙ্গে আমি একবার কথা বলতে চাই।

আমি সমস্যায় পড়ে গেলাম। বললাম, মার সঙ্গে কথা বললে হবে না?

পিয়ালির বাবা হেসে বললেন, হবে না কেন? তবে তোমার বাবা বাড়ির কর্তা। তাঁর সঙ্গে কথা না বলে কিছু করা উচিত নয়। — বলে একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা এখন কোথায়?

কিছু চিন্তা না করেই বললাম, মুম্বইতে।

— কিছু দিন আগে দিল্লিতে ছিলেন না?

নির্বিকার মুখে বললাম, হ্যাঁ।

— কদিন হল মুম্বইতে গিয়েছেন?

— কিছু দিন হল।

পিয়ালির বাবা এবার একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা এখানে কবে আসবেন?

— এ মাসেই আসার কথা আছে।

— এলে আমাকে বোলো। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব।

— আচ্ছা। — বলে একটু চুপ করে রইলাম। তার পর বললাম, তবে তার আগে মার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারতেন।

— তার দরকার নেই। তোমার বাবা আসুক। তাঁর সঙ্গেই সব কথা হবে।

— কিন্তু বাবা যদি এ মাসে না আসেন?

পিয়ালির বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আসবেন না কেন?

— বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ। অনেক সময় কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেন না। তাই...

পিয়ালির বাবা হঠাৎ জেদি হয়ে পড়লেন। বললেন, তোমার কোনও কথা শুনব না। বিয়ে থা ছেলেখেলা নয়। তোমার বাবার সঙ্গে কথা না বলে আমি কোনও কাজ করব না। তুমি তোমার বাবাকে খবর দাও। এখানে আসতে বলো। সেটা পারবে তো?

মিথ্যে কথা সব সময় জোর দিয়ে বলতে হয়। নইলে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। তাই বেশ জোরের সঙ্গে বললাম, তা পারব না কেন?

পিয়ালির বাবা বললেন, তা হলে তাই করো। আজই তোমার বাবাকে ফোন করে দাও। অন্তত একদিনের জন্যে আসতে বলো।

— আচ্ছা।

— আর, উনি কবে আসছেন সেটা জানিয়ে দিও। দেরি কোরো না।



আমার এখন বাবা চাই। বাবা ছাড়া বিয়ের কথা হবে না। আমি এখন বাবা কোথায় পাই? ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। বাবার ওপর ভীষণ রাগ হতে লাগল। বাবা থেকেও বাবা নেই। এ রকম বাবা থাকার চেয়ে না থাকা ভাল। একবার ভাবলাম, পিয়ালির বাবাকে সত্যি কথাটা বলে ফেলি। তাতে যা হয় হোক। তার পর ভাবলাম, সত্যি কথা বলাটা বোধহয় উচিত হবে না। বললে পিয়ালির বাবা আমার সঙ্গে পিয়ালির আর বিয়ে দেবেন না। কারণ এক. জন্মের আগেই আমি পিতা কর্তৃক পরিত্যক্ত। এটা পিয়ালির বাবা ভাল চোখে দেখবেন না। কারণ দুই. আমি মিথ্যেবাদী বলে প্রমাণিত হব। এ রকম একজন মিথ্যেবাদীকে পিয়ালির বাবা জামাতা হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে মনে হয় না। অতএব চুপ করে থাকাই ভাল। অথচ চুপ করে থাকলেও তো সমস্যা মিটছে না। যেভাবেই হোক আমার বাবা অমুকচন্দ্র অমুককে এখন চাই। তাকে না পেলে এখন চলবে না। ফলে কী করা যায় তা ভাবতে লাগলাম।

একদিন মা আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোর কী হয়েছে বল তো?

এর উত্তরে আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?

— কদিন ধরে দেখছি তোর মুখ শুকনো। সব সময় কী একটা যেন চিন্তা করছিস। কী হয়েছে?

একটু থেমে বললাম, পিয়ালির সঙ্গে আমার বোধহয় বিয়ে হবে না।

মা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, হবে না কেন? ঝগড়া হয়েছে?

— না, কোনও ঝগড়া হয়নি।

— তা হলে? পিয়ালির বাবার কি এ বিয়েতে মত নেই?

— মত আছে। তবে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।

— কীসের সমস্যা?

— পিয়ালির বাবা আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চান, কথা বলতে চান। আমি এখন বাবাকে কোথায় পাব?

মা একটু থেমে বলল, আমার সঙ্গে কথা বললে হবে না?

— না।

— তোর বাবাকেই চাই?

—হ্যাঁ।

কথাটা শুনে মা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, তা হলে কী হবে?

— কী আর হবে! পিয়ালির সঙ্গে বিয়ে হবে না।

মা এ কথায় হেসে ফেলল। বলল, হবে, ঠিক হবে।

— কীভাবে?

— ভেবে চিন্তে একটা উপায় বের কর। তা হলেই হবে।

আমি ভাবতে লাগলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়।



একদিন পিয়ালির বাবা ফোন করে জানতে চাইলেন, তোমার সঙ্গে তোমার বাবার ফোনে কথা হল?

উত্তরে মিথ্যে কথা বলতে হল, না, এখনও হয়নি। কয়েকবার চেষ্টা করেছি। ফোনে পাচ্ছি না। পেলেই আপনাকে জানাব।

— দেরি কোরো না।

— ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।

কিন্তু আমার চিন্তা গেল না। সব সময় ভাবতে লাগলাম, এই সমস্যার হাত থেকে কীভাবে উদ্ধার পাওয়া যায়। ভাবতে ভাবতে শেষে একটা উপায় মাথায় এল। ঠিক করলাম, একদিন ফোন করে বলব, বাবা হঠাৎ আজ হার্ট ফেল করে মারা গেছে। এটা বললে মুহূর্তের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বাবার কথা আর কোনও দিন উঠবে না। বাবার গুরুত্ব চিরদিনের মতো আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে। তবে যদি কোনও দিন বাবা আচমকা সশরীরে হাজির হয়, তা হলে কী করব? কী বলব সবাইকে? তখন খুব সমস্যায় পড়ে যাব। সে সমস্যা আজকের সমস্যা থেকে অনেক বেশি জটিল হয়ে দাঁড়াবে।

একদিন মা জিজ্ঞেস করল, কিছু ভেবেছিস?

আমতা আমতা করে বললাম, ভেবেছি একটা।

— কী?

— ভেবেছি পিয়ালির বাবাকে একদিন ফোন করে বলব, বাবা হঠাৎ আজ হার্ট ফেল করে মারা গেছে। তবে এটা বলা কি ঠিক হবে? প্রথম কথা, তোমার এটা শুনতে বা ভাবতে খারাপ লাগবে। দ্বিতীয় কথা, বাবা যদি কোনও দিন সশরীরে ফিরে আসে? তখন কী হবে?

মা তখন একটু চিন্তা করে বলল, তা হলে এক কাজ কর।

— বলো কী করব?

— তুই পিয়ালির বাবাকে ফোন করে বলে দে, বাবা অফিসের কাজে জার্মানিতে গেছে। কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। আপনি বরং মার সঙ্গে কথা বলুন।

আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম, ঠিক বলেছ। — বলেই, পিয়ালির বাবাকে ফোন করলাম। বললাম, একটা সমস্যা দেখা
দিয়েছে।

— কীসের সমস্যা?

— বাবা অফিসের কাজে জার্মানিতে গেছে। কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। আপনি অপেক্ষা না করে বরং মার সঙ্গে কথা বলুন।

— সে হয় না। আমি তোমার বাবার সঙ্গেই কথা বলব। তিনি তো জার্মানিতে চিরদিনের মতো যাননি। একদিন না একদিন ফিরে আসবেন। আমি তখন তাঁর সঙ্গে কথা বলব।

— তাঁর ফিরে আসতে যদি দু- চার বছর লেগে যায়?

— তাতে কিছু যায় আসে না। আমি তাঁর জন্যে দু-চার বছর অপেক্ষা করব।

— আর বাবা যদি কোনও দিন না ফেরেন?

— তা হলে তখন দেখা যাবে। এখন ও নিয়ে ভাবার কোনও মানে হয় না — বলে পিয়ালির বাবা ফোন নামিয়ে রাখলেন। বুঝলাম, আমার কথায় রেগে গেছেন।

মাকে সব কথা খুলে বললাম। বলে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী করব?

মা বলল, আমার আর কিছু বলার নেই। তুই যা ভাল বুঝিস কর।

— বাবাকে মেরে ফেলব? এ ছাড়া তো কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছি না।

মা উত্তরে চুপ করে রইল।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, বাবাকে মেরে ফেলব?

মা এবারেও কিছু বলল না। বলতে পারল না।



কার দোষ? বাবার না মার? কী কারণে বাবা মাকে ছেড়ে গেল? শুধু কি বাবার দোষ? মার দোষ কি ছিল না? ছিল, নিশ্চয়ই ছিল। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কোনও এক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছিল, যা আর কোনও দিন জোড়া লাগেনি। লাগা সম্ভব হয়নি। মাকে এ নিয়ে বহুবার প্রশ্ন করেছি, মা কোনও উত্তর দেয়নি। মা ভীষণ চাপা স্বভাবের। মা হয়তো ভাবে, এ সব জানা আমার উচিত নয়। যা গোপন আছে, তা গোপনই থাক। কিন্তু আমাকে বলতে অসুবিধে কোথায় তা জানি না।

ঠিক এই সময় একদিন পিয়ালি বাড়িতে এল। আমার সামনেই মাকে জিজ্ঞেস করল, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

মা জানতে চাইল, কী?

— মেসোমশাই কি এখন জার্মানিতে?

— তাই তো জানি।

— উনি এখানে কবে আসবেন?

— জানি না মা।

— আপনারা কিছু একটা করুন।

— কী করব? তোমার বাবা যে অদ্ভুত জেদ ধরে বসে আছেন। — বলে একটু থেমে বলল, পুরুষ মানুষদের এই এক দোষ। তারা মুখে মেয়েদের সম্মান দেয়। অথচ কাজের বেলায় কোনও গুরুত্ব দেয় না। ফলে আমার কিছু করার নেই।

এর পর পিয়ালি কী বলবে তা বুঝে পেল না। না পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার পর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

জানতে চাইলাম, এখানে বলবে? নাকি অন্য কোথাও যেতে হবে?

— অন্য কোথাও গেলে ভাল হয়।

আমি তখন পিয়ালিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ির কাছেই একটা পার্ক। সেই পার্কে ঢুকে একটা খালি বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসলাম। বসে জিজ্ঞেস করলাম, বলো, কী বলতে চাইছিলে?

পিয়ালি বলল, আমি একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছি।

কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম, কী?

— তোমার সঙ্গে আমার সাত-আট বছরের পরিচয় — তাই না?

— হ্যাঁ, তা হবে।

— তোমাদের বাড়িতেও বহুবার এসেছি।

— তা এসেছ।

— অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, আমি আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যেও তোমার বাবাকে দেখিনি। এটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। কী ব্যাপার তা জানি না। আমার এতকাল কিছু মনে হয়নি। আজ মনে হচ্ছে, তোমরা কী একটা লুকোচ্ছ। সত্যি কথাটা আজ আমাকে বলো। তোমার সঙ্গে কি তোমার বাবার কোনও সম্পর্ক নেই?

প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠলাম। তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, কী বলছ তুমি! বাবার সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক। আসলে কথাটা কি জানো?

— কী?

— বাবা যখন আসে, তখন তুমি আসো না। আর, বাবা যখন থাকে না, তখন তুমি আসো।

— হতে পারে। কিন্তু সাত-আট বছর ধরে যখন এটাই হতে থাকে, তখন একটা সন্দেহ দেখা দেয়, আমার বাবা সেই সন্দেহটাই করছে।

এবার রেগে গিয়ে বললাম, তুমি কী বলতে চাইছ?

— বলতে চাইছি, বাবার ধারণা তুমি সত্যি কথা বলছ না।

— তা হলে সত্যি কথাটা কী?

— শুনবে?

— শুনব।

— তোমাদের সঙ্গে তোমার বাবার কোনও সম্পর্ক নেই। তোমরা সেটা গোপন করতে চাইছ।

এবার মিথ্যে কথাটা জোর দিয়ে বলতে হল, বাজে কথা। সম্পর্ক থাকবে না কেন!

— তার প্রমাণ এখনও পাইনি।

— তুমি কী ধরনের প্রমাণ চাও?

— আমি তাঁকে একবার দেখতে চাই।

— যদি না দেখাই?

— তা হলে বিয়ের ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেবে।

— তার মানে আমার ভালবাসার চেয়ে আমার বাবার দাম অনেক বেশি?

— হ্যাঁ।

— কিন্তু বাবা আজ যদি জার্মানিতে হঠাৎ হার্ট ফেল করে মারা যায়? তা হলে কী হবে? বাবাকে তখন কোত্থেকে ধরে আনব?

এ কথায় পিয়ালি রেগে গিয়ে বলল, নিজের বাবাকে নিয়ে এ ধরনের কথা বোলো না। বলা খুব খারাপ।

— কী করব! বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমাকে ভালবেসে আচ্ছা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম!

— তোমাকে ভালবেসে আমিও তো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি।

— বাবাদের এই দাপট আমার পছন্দ হয় না। তুমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসো।

— সম্ভব নয়। আমি বাবাকে দুঃখ দিতে পারব না। আমি বাবাকে ভীষণ ভালবাসি।

— তা হলে কী করব?

— তুমি এমন কিছু করো যাতে বাবা খুশি হয়।

— ঠিক আছে, তাই হবে।



মা জিজ্ঞেস করল, পিয়ালির সঙ্গে কী কথা হল?

সব কথা খুলে বললাম। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আজও কথায় কথায় বাবাদের এত কেন দরকার হয় তা আমার মাথায় ঢোকে না।

আমিও মাকে সমর্থন করে বললাম, সত্যি, বাবা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। কী করব, বুঝতে পারছি না।

— তুই যা ভাল বুঝিস তাই কর।

— ঠিক বলছ?

— হ্যাঁ।

— তা হলে তোমাকে আগে যা বলেছিলাম, আমি তাই করতে চাই। তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?

— তুই কী বলেছিলি?

— একদিন পিয়ালির বাবাকে ফোন করে বলব, বাবা হঠাৎ আজ হার্ট ফেল করে মারা গেছে।

— কিন্তু তার পর তোর বাবা যদি কোনও দিন সশরীরে ফিরে আসে? তখন কী বলবি?

একটু চিন্তা করে বললাম, তখন বলব, আমরা একটা ভুল খবর পেয়েছিলাম। মা তা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার পর বলল, তোর বাবা সাতাশ বছর হল আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেনি। তোর কাকার কাছ থেকেই মাঝে মাঝে তোর বাবার খবর পাই। সুতরাং আমার কাছে তোর বাবা এক রকম মৃত বললেই চলে। তবু জীবিত কাউকে এভাবে মারা গেছে বলতে বাধে।

— তী হলে কী করব?

— বুঝতে পারছি না। — বলে একটু থেমে মা বলল, আমার হাতে শাঁখা নেই, লোহার বালা নেই, মাছ মাংসও খাই না। মাঝে মাঝে মাথায় সিঁদুর দিই। কেন দিই তা জানি না। আমার জীবন বিধবার মতোই। তবু কোথায় যেন বাধছে। আমি মন স্থির করতে পারছি না।

— তা হলে তুমি দু’ দিন সময় নাও। তার পর তুমি যা বলবে, তাই করব। আমি তোমার অমতে কোনও দিন কোনও কাজ করিনি, আজও করব না।



মার উপাস্য দেবতা কৃষ্ণ। কৃষ্ণের সঙ্গে মার কী কথা হল জানি না। দু’ দিন পরে মা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, তুই যা চাইছিস তাই কর। আমার কোনও আপত্তি নেই।

কথাটা শুনে অবাক হলাম। মা এতখানি মনের জোর কোত্থেকে পেল? এতদিন তো এই জোর দেখিনি। মাকে আজ অন্য রকম মনে হল। তবু আমার মন থেকে সন্দেহ গেল না। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সত্যি বলছ?

মা জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ।

— তা হলে কথাটা পিয়ালির বাবাকে জানিয়ে দিই?

— হ্যাঁ, জানিয়ে দে।

— এখনই?

— হ্যাঁ, এখনই।

সঙ্গে সঙ্গে আমি পিয়ালির বাবাকে ফোন করলাম। বললাম, একটা দুঃসংবাদ আছে।

— কী?

— একটু আগে কাকা জার্মানি থেকে ফোন করেছিলেন।

— কেন?

— বাবা আজ হার্ট ফেল করে মারা গেছে।

— ইস! শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এখন তুমি একটা কাজ করো।

— কী?

— তোমার কাকাকে তোমার বাবার ডেথ সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দিতে বলো।

— আচ্ছা। — বলে ফোন নামিয়ে রাখলাম। বুঝতে পারলাম, বাবাকে এভাবে মেরে ফেলতে গিয়ে আমি একটা নতুন সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছি। বাবার ডেথ সার্টিফিকেট কীভাবে জোগাড় করব? জোগাড় করা অসম্ভব। এখন তা হলে আমি কী করব? আমার কপালে পিয়ালি নেই। এখন আস্তে আস্তে পিয়ালিকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

ঠিক এই সময় যা ঘটল তা এক কথায় অবিশ্বাস্য, অলৌকিক। জার্মানি থেকে হঠাৎ কাকার ফোন এল।

কাকা বললেন, তোর বাবা একটু আগে মারা গেছে।

— কোথায়?

— আমার বাড়িতে।

— কী হয়েছিল?

— হার্ট ফেল করেছে।

— সৎকার কি ওখানেই হবে?

— হ্যাঁ।

— আপনি তা হলে একটা উপকার করবেন?

— কী?

— বাবার ডেথ সার্টিফিকেটটা পাঠিয়ে দেবেন?

— অবশ্যই।

তার পর মনের আনন্দে ফোন নামিয়ে রাখতেই দেখি মা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, কার ফোন? তোর কাকার?

— হ্যাঁ।

— তোর বাবা মারা গেছে?

— হ্যাঁ।

— হার্ট ফেল করে?

— হ্যাঁ।

কথাটা শুনে মা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন