বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

অস্থির সময়: দুটো গল্প ও খানিকটা রাজনীতি

“বোধ হয় কুকুর। তাড়া দেওয়ার জন্যে লোকটা ডাস্টবিনটাকে ঠেলে দিল একটু। খানিকক্ষণ চুপচাপ। আবার নড়ে উঠল ডাস্টবিনটা, ভয়ের সঙ্গে এবার একটু কৌতুহল। আস্তে আস্তে মাথা তুলল...ওপাশ থেকেও উঠে এল ঠিক তেমনি একটি মানুষ। ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী নিস্পন্দ নিশ্চল। হৃদয়ের স্পন্দন তালহারা—ধীর...। স্থির চারটে চোখের দৃষ্টি ভয়ে সন্দেহে উত্তেজনায় তীব্র হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। উভয়ে উভয়কে ভাবছে খুনী। চোখে চোখ রেখে উভয়েই একটা আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে থাকে, কিন্তু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোন পক্ষ থেকেই আক্রমণ এল না। এবার দুজনের মনেই একটা প্রশ্ন জাগল—হিন্দু না মুসলমান? এ প্রশ্নের উত্তর পেলেই হয় তো মারাত্মক পরিণতিটা দেখা দেবে। তাই সাহস করছে না কেউ কাউকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে। প্রাণভীত দুটি প্রাণী পালাতেও পারছে না—ছুরি হাতে আততায়ীর ঝাঁপিয়ে পড়ার ভয়ে।


অনেকক্ষণ এই সন্দিহান ও অস্বস্তিকর অবস্থায় দুজনেই অধৈর্য হয়ে পড়ে। একজন শেষ অবধি প্রশ্ন করে ফেলে--হিন্দু না মুসলমান?

--আগে তুমি কও। অপর লোকটি জবাব দেয়।

পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়েই নারাজ। সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে।”

আসলে তারা দু’জনেই মানুষ। মানুষই তো। হাত-পা, চোখ নাক-মুখ, গলার নলি, বুকের হৃদপিণ্ড। কেটে দিলে দু’জনেরই রক্ত ঝরবে। কিন্তু এই মুহূর্তে মানুষ নয় তাদের একজনও। তার এখন একজন মুসলমান, একজন হিন্দু।

এই গল্প অনেকদিন আগে লেখা। লিখছেন সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত সমরেশ। সমরেশ বসু। আসল নাম সুরথ বসু। রাইস কলে কাজ করা শ্রমিক লেখক। কমিউনিস্ট পার্টি করেন। তিনি লিখছেন স্বাধীনতার প্রাক্কালের এক দাঙ্গার কথা। সেই সময় যখন লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান ধ্বনিতে কাঁপছে গোটা উপমহাদেশ। সেই সময় প্রতিবেশীর ধর্ম তাকে দুশমন বানাতে শেখাচ্ছে। এমন এক শিক্ষা যা এর পরের ৬০-৭০ বছরে এই উপমহাদেশের মূল রাজনৈতিক-ধর্মনৈতিক ভাবনা হয়ে উঠবে।

রক্ত ঝরবে বার বার। লাল হবে। তবে লাল এখন কমিউনিস্ট রঙ। তারা অনেকদিন আগে নিভে গিয়েছে। তাই লাল নিয়ে কেউ আর ভাবিত নয়। এখন সব্বাই ভাবিত ভারতবর্ষের পতাকার উপরের আর নিচের দু’টো রঙ নিয়ে। একটা গেরুয়া আর একটা সবুজ। মাঝের সাদা অস্তমিত। তার কথা বলার লোক কমে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে।

সে যাই হোক, ডাস্টবিনে দেখা হল দু’জনার – একজন নারায়ণগণজের সুতোকলের শ্রমিক আরেকজন বুড়িগঙ্গার অন্যপারের মাঝি। “ডাস্টবিনে” যেখানে লুকিয়ে আছে তারা দু’জন। কারণ তার বাইরে পরিচ্ছন্ন শহরে দাঙ্গা লেগেছে। হিন্দু মুসলমানে। ডাস্টবিনে লুকিয়ে আছে তারা ভয়ে। কারণ তারা কাউকে মারতে যায়নি। বরং মার খাওয়ার ভয়ে লুকিয়ে আছে। আর এইখানে এসে দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে আছে ভীষণ ভয়ে। হিন্দু না মুসলমান। কে প্রথম কাকে মারবে?

সমরেশ অবশ্য কারুর হাতে কাউকে মারেননি। তিনি কমিউনিস্ট। তাঁর এই দুই চরিত্রইমেহনতি মানুষ। তাই তারা নিজেদের মিল খুঁজে নিয়েছে। মানুষের সামান্য চাহিদা, দুঃখ-কষ্ট। মৃত্যু উল্লাসের নয় তাদের কাছে ভয়ের, বিষাদের। তাই দু’জনেই পালাতে চেয়েছে এক সাথে এই মৃত্যর উৎসবের বাইরে। ঘরে ফিরতে চেয়েছে তারা। পারেনি। ঈদের আগের দিন পোলাপানের কাছে উপহার নিয়ে ফিরতে চাওয়া মানুষটা মরেছে রাস্তায়। তাকে মেরেছে ইংরেজের পুলিশ। “ডাকু ভাগতা হ্যায়”। দাঙ্গাবাজ ডাকু নয়। ডাকু ভাগতে চাওয়া অসহায় মানুষ। যে কাউকে মারতে চায়নি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রাকাল্লে যেভাবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝে বসবাস করা শান্ত সেকুলারদের মুছে দিতে চেয়েছিল ইংরেজরা। যেভাবে তার পরের এই ৬০-৭০ বছরেও আসলে সেকুলারদেই মুছতে চেয়েছে হিন্দু-মুসলমান মৌলবাদীরা।

একটা সাধারণ গল্প। নাম “আদাব”। এমন একটা শব্দ যা আসলে লক্ষ্ণৌ এর তেহজিবের বাইরে খুব ব্যবহার হয় না। সমরেশ বসু এমন সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন যার উত্তর নেই আজও।

আরেকটা গল্প বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের। নাম “গায়ে হলুদ”। গল্পের শুরু -

“শ্রাবণ মাসের দিন, বর্ষার বিরাম নেই, এই বৃষ্টি আসছে, এই আকাশ পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। ক্ষেতে আউশ ধানের গোছা কালো হয়ে উঠেছে, ধানের শীষ দেখা দিয়েছে অধিকাংশ ক্ষেতে।” অর্থাৎ দেশে দুর্ভিক্ষের কোন সম্ভাবনা নেই। ফসল আসছে। গ্রামের চাষির দুর্ভাবনার কোন সম্ভাবনা নেই।

এমন সময় পুঁটির বিয়ে ঠিক হচ্ছে। পুঁটির বয়স বারো। বাবা সম্পন্ন কৃষক। পাত্র গ্রামে নতুন আসা ব্রাহ্মণ পরিবারের সদ্য ম্যাট্রিক দেওয়া ছেলে। যাকে পুটির বিয়ে ঠিক হওয়ার আগে ঘোড়ামুখো মনে হত। ইদানিং অবশ্য দেখতে শুনতে বেশ ভালোই মনে হচ্ছে তার।

বিয়ের গায়ে হলুদের দিন গ্রামের এক প্রতিবেশী মহিলার আক্রমণে জানা গেল পাত্র ম্যাট্রিকে ফেল করেছে। এইটুকুই গল্প। কিন্তু আসলে এই মূল বয়ানের পাশাপাশি আরেকটা গল্প লুকিয়ে থাকে। সুপ্ত থাকে।

সেই গল্পটা একটা দুর্ভিক্ষ তৈরীর বয়ান। “কলকাতায় চাকরি করে এ পাড়ার হরিকাকা, তিনি মাঝে মাঝে গাঁয়ে এসে পুঁটির বাবাকে বলেন—আর কি রায় মশায়, এ বাজারে তো আপনিই রাজা। গোলা ভর্তি ধান রেখেছেন ঘরে, আপনার মহড়া নেয় কে? কলকাতায় ‘কিউতে দাঁড়িয়ে এক সের চাল নিতে হচ্ছে—আর আপনি”।

এদিকে ধানের গোলা ভর্তি – সেই গোলার ধান বেচে মেয়ের বিয়ের সংস্থান করছেন সম্পন্ন কৃষক। আর রাজধানী কলকাতায় চাল কিনতে লম্বা লাইন। অর্থাৎ খাদ্যের বন্টন ব্যবস্থায় সমস্যা আছে। অথবা সেই সমস্যা তৈরী করা হচ্ছে।

এরপর এই ঘটনার আরেক উদাহরণ দেখা যায় বিয়ের মাছ কিনতে চাওয়ার সময় যখন সাধন জেলে জানায় – “মাছের যে বড্ড গোলমাল যাচ্ছে। গাঙে কি মাছ আছে? ডুমোর বাঁওড়ের মাছ সব যাচ্ছে কলকাতায়। বিরাশি টাকা দর। এমন দর বাপের জম্মে কোনো কালে শুনি নি রায় মশায়। এক সের পোনা ইস্তক পড়তে পাচ্ছে না। মরগাঙে বাঁধল দিয়েলাম—একদিন কেবল এক সাড়ে এগার সের গজাড় মাছ—

পুঁটির বাবা বিস্ময়ের সুরে বললে—সাড়ে এগার সের গজাড়! এমন কথা তো কখনও শুনি নি—

--অরিবত গজাড় রায় মশায়। মাছের এমন দর, গজাড় মাছই বিক্রি হলো দশ আনা সের।

পুঁটি আর দাঁড়াল না। মাকে এমন আজগুবি খবরটা দিতে ছুটল বাড়ির মধ্যে।”

এটা একটা “আজগুবি” বিষয়। অর্থাৎ আগে এমন কিছু দেখা যায়নি। একটা কিছু হতে চলেছে গল্পের মধ্যে সেই ঘটনার প্রাকলক্ষণ পরিস্কার।

“--আজ্ঞে পালকি কোথায় মিলবে? ষোলডুবুরির কাহারপাড়া নির্বংশ। পালকি বইবার মানুষ নেই এ দিগের।

--তবে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এসো বনগাঁ থেকে।

--এ কাদা-জলে দশ টাকা দিলেও আসবে না। আসবার রাস্তা কই?

--ওরা বিদেশী লোক। বর আসবার ব্যবস্থা আমাদেরই করে দিতে হবে। বুঝলে না? আমরাই পারছি নে, ওরা কোথায় কি পাবে? হিম হয়ে বসে থেকো না। যা হয় হিললে লাগিয়ে দ্যাও একটা।

--আচ্ছা বাবু, বলদের গাড়িতে বর আনলি কেমন হয়?

--আরে না না। --সে বড় দেখতে খারাপ হবে। সে কি—না না। শুনছি ওরা ইংরিজি বাজনা আনছে। বলদের গাড়ির পেছনে ইংরিজি বাজিয়ে বর আসবে, তাতে লোক হাসবে।

--কেন বাবু তাতে কি? বলদের গাড়িতে কি বর যায় না? একেবারে আপনাদের বাড়ির পেছনে এসে থামবে—সেই তো ভালো।”

আরো পরে সুপ্ত না থেকে লেখক উল্লেখ করছেন বিষয়টার – “শুন্য ধানের গোলা সামনের ভাদ্র মাসে আউস ধানে অন্তত অর্ধেকটা পুরে যায়। বাবা বলেন, গোলার ধান খালি হয়ে যেত না। মধ্যে কি একটা গভর্নমেন্টের হাঙ্গামা এলো—কেউ গোলায় ধান জমিয়ে রাখতে পারবে না, তাতেই অনেক ধান কর্জ দিতে হলো গ্রামের লোকজনকে।”

তখনো দেশভাগের প্রসঙ্গ আসেনি। কিন্তু তলায় তলায় একটা প্রস্তুতি চলছে সমস্যা সৃষ্টির। বঙ্গভঙ্গ না করতে পারা বিদেশী শাসকরা ১৯৪৩ এর এই মন্বন্তরের সময় বাংলায় খাদ্যের আমদানী বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল এই ঘটনার মূল কারণ হল বাংলায় খাবার জমিয়া রাখা। বাংলার দশ শতাংশ সম্পন্ন কৃষক নাকি তাদের ঘরে খাবার জমিয়ে রেখে তাদের প্রতিবেশীদের অনাহার নিশ্চিত করেছিলেন। (‘And at the Third Food Conference in Delhi on the 5 to 8 July, … the suggestion that “the only reason why people are starving in Bengal is that there is hoarding” was greeted at the Conference by the other Provinces with applause.’ ব্রাউন্ড। ১৯৪৪)

পরবর্তীতে দেখা যায় যে এই সময়ের হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব আসলে এই মন্বন্তরের একটা প্রধান কারণ। যেমন কারণ – দুর্নীতি এবং ব্রিটিশ রাজের খাদ্য সরবরাহ নীতির ভ্রান্তি।

এখন প্রশ্ন জাগে যে নীতি কি ইচ্ছাকৃত? সম্পন্ন কৃষকদের বেশীরভাগই ছিলেন হিন্দু। এই খাদ্য-সংকট কি আসলে বিরাট সংখ্যক মুসলমান জনসংখ্যাকে তাদের বিরুদ্ধে করার একটা প্রক্রিয়া? একই ভাবে আসলে কোমর ভেঙে দেওয়া বাংলার জনসাধারণের একটা বড় অংশকে যাঁরা এর আগে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন করেছিলেন।

এই সব প্রশ্ন নেই এই গল্পে। থাকার কথা ছিল না। বিভূতিভূষণ ঐ সময় নিয়ে আরেক উপন্যাস লিখেছিলেন ‘অশনী সংকেত’। তবে প্রশ্নগুলো সঙ্গত কারণ এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে এই ঘটনাগুলোর প্রভাব বিরাট।



লেখক পরিচিতি
শমীক ঘোষ

গল্পকার। 
প্রবন্ধকার। অনুবাদক।
পড়াশুনা : কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
কর্মসূত্রে বম্বে ছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে সব ছেড়ে এখন কোলকাতায় থাকেন। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন