শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : মৎস্যকন্যা

(প্রথম পর্‍যায়)

অভিন্নহৃদয়া সাগরী,

জল যে তোমার প্রাণ ছিল, সেই একান্ত অনুভবের কথা এরকম করে আগে কোনওদিন বলনি তো! লিখতে বসে, আমি তোমাকে অতলের রাণী শিরোপা দিলাম। অনেক অনেকদিন আগে, যখন চলতে দেরী করছ, অথচ কোল থেকে নামিয়ে দিচ্ছে সবাই, সেসময় তুমি নীলরঙ বেশি ভালবাসতে জানি। নীলরঙই কেন, তার কোনও সংগত ব্যাখ্যাট্যাখ্যা সেভাবে দেওয়া যায়না জানি। কিন্তু আমার কেমন মনে হয়, তোমার জন্মের সময়ে আকাশের একটা অংশ মাথার ভিতরে পড়ে জমে গিয়েছিল। মেঘ থেকে জলের জন্ম, না জল জমে মেঘ হয়, তাত্বিক ব্যাখ্যার মাঝখানে পড়ে আকাশটাকে নষ্ট করতে চাইতেনা বলে, সকাল থেকে সন্ধ্যে পযর্ন্ত জানালার কোণটায় তোমার সাম্রাজ্য। তোমার বইখাতা পেন, গল্পের বই, পুঁচকে কালো ট্রাঞ্জিস্টার, তোমার তেঁতুলের আচার, টোপাকুলের বীচি, পুতুলের শাড়ি, দাঁত দিয়ে নখ, মাথার তেলচিটে বিনুনি, খুসকি উকুন, মা’র বকুনি, জমা করে রেখে দিতে রোজদিন। সবটাই আমি জানি। শতদল, কৃশানু, নিবেদিতা, অতসীরা কত কিছু খেলত।


--এই এই চলরে, আমরাই খেলি। ও খেলেনা, ও পারেনা।

তুমি জানতে যে তুমি পারনা, কিন্তু তুমি বলতেনা। তুমি কাঁদতেনা, যেতেও চাইতেনা ওদের সাথে। ওরা তরতরিয়ে গলির মুখে চলে গেলে, তুমি ডিঙি মেরে জানালার ওপরদিকে খোলা কপাটটা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওদের দেখার চেষ্টা করতে, পারতেনা। শুনতে পেতে কত হাসছে ওরা, কী জোরে চেঁচাচ্ছে। কেউ যদি এসে বলত,

--কান্‌ছিস কেন বোকা মেয়েটা? তুইও গেলেই পারিস ওদের সাথে। যা না, রোজই ডাকে ওরা। নাহয় বসেই থাকবি কারুর রোয়াকে, দেখবি সব কেমন খেলছে।

তুমি তাড়াতাড়ি বলতে,

--কোথায় কাঁদছি, কই? নাতো! ওসব খেলাটেলা আমার ভাল্লাগেনা, একটুওনা।

মোটাসোটা শিশুসাথী বা শুকতারার খোলা পাতার ওপরে ঝুঁকে থাকতে। ডুবে যাওয়ার ঠিক আগের সূর্‍যটা তোমার মাথায় হাত রাখত। দেখতাম অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে।


খানিকটা পরে তোমার মা শাঁখ বাজয়ে দিলেই একএক করে ঘরে এসে পড়ত সবক’টা। বাবা এসে বলতেন,

--আজ ব্যায়াম করেছ সাগরী?

তোমাদের বাড়িতে ডাকনাম রাখার চল ছিলনা। তোমার বাবা পছন্দ করতেন না। তোমার মা নালিশ করত,

--ব্যায়াম করবে কী! সারাদিন ঘাড় গুঁজে বই মুখে।

বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,

--ওকে বোকো না। কিন্তু সাগরী, তোমার চোখে পাওয়ার যে বেড়ে যাচ্ছে মা? মাঝে মাঝে রেস্ট দিও। তুমি বাবার পিঠের কাছে বসে গলা জড়িয়ে ধরে বলতে,

--দিইতো! মা মিথ্যে বলে।

এগার বছরের ধাড়ি মেয়ে মা’কে জিভ ভেঙিয়ে দিতে,

--নালিশ করে কটা বালিশ পেলেগো? হী হী!

মা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে থাকত তোমার দিকে। কী অসভ্যতা! এতবড় মেয়ে বাপের পিঠের ওপরে কেন? তুমি কি বুঝেও বুঝতে চাইতে না?


দশ পূর্ণ হওয়ার আগেই তোমার মাসিক শুরু হয়ে গিয়েছিল। মোটা কুঁজো হয়ে যাচ্ছিলে হয়ত সঙ্কোচে, বা সবসময়ে বসে থেকে থেকে। চোখের পাওয়ার তখন পাঁচের কাছাকাছি। আশ্চর্‍য, আজও সেটা প্রায় একই থাকে কি করে? রাত্রে পাশে শুত লহরী, তোমার তিন বছরের ছোটবোন। তোমাদের ছোটভাই মা-বাবার ঘরে ঘুমোত। তোমার মা নিশুত রাতে বিনবিন করে কিছু বলত তোমার বাবাকে। তোমার ঘুম আসতনা সহজে। তুমি আওয়াজ পেতে, আর কিছু বুঝতে পারতেনা। আমি জানতাম তোমার মা তোমার জন্যেই কাঁদছে। হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে ঝুলতে থাকা বেডসুইচ জ্বালিয়ে নিতে তুমি। বিছানার অর্ধেকটা জুড়ে তোমার বইগুলো। খাটের ওধারে লহরী হাতপা ছড়িয়ে অঘোরে ঘুমোত। ওর ফ্রক উঠে থাকত পেটের ওপরে। তুমি নিজের ফ্রক উঠিয়ে পা ছড়িয়ে রেখে, সাইড ল্যাম্পের নির্জীব আলোয় দুজোড়া পা মিলিয়ে দেখতে। নিজের পাদুটোকে বেশি স্বাভাবিক বলে মনে হত তোমার। ভাবতে - দূর, ডাক্তারগুলো শুধু মিথ্যে কথা বলে। ঠেলে পাশ ফিরিয়ে দিতে লহরীকে। পড়তে পড়তে কখন লাল সূর্‍য চড়ে বসত জানালার বাইরে রাধাচূড়া গাছের মাথাতে। তুমি ততক্ষণে চশমা খুলে, লাইট নিভিয়ে দিয়ে, মটকা মেরে রয়েছ। তোমার বুকের ওপরে খোলা পড়ে বই।

মা এসে ডাকত,

--সাগরী লহরী ওঠ। ইস্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছে।

একদঙ্গল ছেলেমেয়ে ইস্কুলে যেত তোমার বাড়ি থেকে, তোমাদের পাড়া থেকে। সবাই পায়ে হেঁটে, তুমি একলা রিক্সায় বসে। তোমার মা বসিয়ে দিয়ে, বারবার সাবধান করত তোমাকে। লহরীকে কিছু বলতনা। আমি ব্যাপারটা অল্পস্বল্প বুঝতে পারতাম, কেন তোমার মা দ্বিচারিতা করে। নিজের মতো ভেবে নিতাম, তোমার মা তোমার বাবাকে কী বলে, বলতে পারে।

--কেন? কার দোষে... আমাদের মেয়েটার? কই আর কারুর...!

এবং চাক্ষুষ না দেখতে পেলেও ভেবে নিতাম, বাবা তোমার মায়ের মাথায় নরম করে হাত রেখেছেন, ঠিক যেমন করে তোমাকেও শান্ত করে দেন। তোমার বাবার স্বর দুপুরবেলার ছায়াচ্ছন্ন শান্ত পুকুরের মত শোনাত,

--কারও দোষ নেই সুষমা। এটা অসুখ, তাছাড়া ওরটা একেবারে মাইল্ড। ডাক্তার বললেন না? কত ভাল দেখ লেখাপড়ায়! ডাক্তার বলছেন সাবধানে রাখতে, এইতো?

তুমি পড়াশোনায় প্রথম, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম। তোমার সহপাঠীরা তোমার আড়ালে বলত ‘হাঁস প্যাঁকপ্যাঁক’। প্রতিবার তোমার পুরস্কারের বই ব্যাগ ভরে বয়ে নিয়ে আসত তোমার মা। তোমার চেয়ে আট বছরের ছোটভাই ছুট্টে কোল ঘেঁষে বসতে এলে তোমার মা সরিয়ে নিয়ে যেতেন। বুঝিয়ে বলতেন,

--দিদিভাইকে অমনি করেনা প্রবাল।

সে খুব অবাক হয়ে, নিজের অপরাধের কারণ খুঁজে হয়রান হত। লহরী তাকে টেনে নিয়ে বলত,

--যাস্‌ নারে ভাই দি’ভাইয়ের কাছে। আয় এদিকে।

--চশমা খুলে দি’ভাইয়ের চোখের সাদাটা নীলনীল কেনগো ছো’দিভাই? আমাদের ওরকম না, না?

তুমি ভীষণ চাইতে ভাইবোন তোমার কাছ ঘেঁষে এসে বসুক, গল্প করুক, হাসুক। প্রবাল টু-তে উঠে একটা চমৎকার ইংরেজি বই প্রাইজ পেয়েছিল। খোলা বইটা নিয়ে ছুটে এসে বলেছিল,

--পড়ে শোনাবে দি’ভাই? একটুও ছটফট করবনা দেখ!

পড়ে তুমি থমথম করছিলে। গল্পটা আগে পড়নি। সে বলেছিল,

--জলকন্যা অনেকটা তোমার মত না দি’ভাই? কেন যে ও মানুষ হতে চাইল শুধু শুধু?

বুদ্ধি ছিল ছেলেটার, অনুভূতি ছিল, পযবের্ক্ষণ ছিল। তুমি ওকে কড়া বকুনি কেন দিলে সাগরী? বেচারির অন্ধকার কচি মুখটা আমার গলার ঠিক মধ্যেখানটায় একদলা ভেজা মাটি হয়ে আটকে রইল। বইটা তুমি প্রবালকে না বলে, রেখে নিলে লুকিয়ে! এখনও তোমার কাছেই বইটা!

তোমার ভালবাবা নিয়ম করে দু’এক বছর পরপর তোমাদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যেতেন। লহরী বায়না ধরত,

--এবারে কিন্তু পাহাড়ে বাবা, মুসৌরি কক্ষনও যাইনি।

তোমার বাবা হেসে বলতেন,

--আচ্ছা, এবারটা সারপ্রাইজ থাকুক।

লহরী উৎসাহে ফুটত। শেষ অবধি পুরী বা গোপালপুর বা দক্ষিণভারতের কোনো সৈকতাবাসে উঠতে তোমরা। আমি বুঝতাম দুস্তর মেঘ জমিয়ে রাখছে মেয়েটা, কিন্তু পাত্তা দিতামনা। সমুদ্রের ধারে তুমি বাবামায়ের পাশে বসে থাকতে, কখনো বাবার একহাত ধরে হাঁটতে, খুব পায়ে পায়ে। অন্য পাশে মা। ঢেউয়ের কাছ ঘেঁষে নাচানাচি করত প্রবাল, ঝিনুক কুড়িয়ে কোঁচড় বোঝাই করত লহরী। বাবা হাত নেড়ে উৎসাহ দিতেন, হাত ধরে সামালাতেন না। দূর থেকে লহরীর ছড়ান দু’হাত সিন্ধুসারসের ডানা, উড়ে যাবে বাতাস কেটে। ফ্রিল দেওয়া মিডিস্কার্ট উড়ে গিয়ে পদ্মডাঁটা ঊরু ঝলকাত। ভ্রমণার্থীরা মুগ্ধ হয়ে যেতেন। তোমার তখনই হাতের পাতা ভীষণ ঘামত, শরীর অস্থির লাগত। বাবা ব্যস্ত হয়ে বলতেন,

--লহরী, চল মা, আমরা এবার হোটেলে ফিরি।

লহরী প্রতিবাদ করতনা, থেমে যেত। ওর শ্যামশ্রী ত্বক সমুদ্রী বাতাসে আর রক্তিম স্বাস্থ্যে ঝলমল করত। সেইরকম একদিন চুপিচুপি তোমার কানের কাছে এসে প্রবাল বলেছিল,

--প্রতিবন্ধী মানে কি হয় তুমি জান দি’ভাই?

তোমার কান রাঙা হয়ে আগুণ ঝরেছিল কেন? কেন বালকের সরল প্রশ্ন বুলেট হয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করেছিল সাগরী?

অলোকনাথ সোম তোমার বাবার ব্র্যাঞ্চের নোতুন ক্লায়েন্ট। স্বাধীন ব্যবসা - লোন ইত্যাদির ব্যাপারে ব্যাঙ্কে আসত। তোমাদের পুরো মৈত্র পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল চাঁদিপুরে। তোমার বাবাকে ডাকল জলদদা’, মাকে ডাকল সুষমাবৌদি। চল্লিশ ছুঁইছুঁই সে অবিবাহিত শুনে, তোমার মা অবাক হয়ে গিয়েছিল। মাসদুই পরে তোমার বাবা নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন অলোককে। সে একসপ্তাহ সময় নিয়ে, সম্মতি দিয়েছিল। তোমার মাকে অনেকদিন পরে মাঝরাতে কাঁদতে শুনেছিলাম। সেসময়ে লহরী পাসকোর্সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ একটা নাচের ট্রুপে নিয়মিত প্রোগ্রাম করে বেড়াচ্ছে এখান ওখান। তোমাকে বলেছিল,

--তোমার মত আছে তো দি’ভাই? ভেবে বোল।

তুমি শিশুর মত করে কেঁদেছিলে। লহরী অনেক রাত পর্‍যন্ত জেগে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছিল তোমায়। তোমাদের ‘সহমর্মী’ আত্মীয়রা দু’ভাগে মত জানিয়েছিলেন।

--বাপমা এটা কী করল? এদিকে এত নাকি আদরের!

--ভালই তো গতি হল মেয়েটার। পাত্রের বাপমা থাকলে পারত নাকি?

শুধু হায়ার সেকেন্ডারি পাশ, শক্ত গঠন, প্রশস্ত কপাল, বিশেষত্বহীন গম্ভীর মুখ, এই অলোকনাথ। লহরী তোমাকে আশ্বস্ত করেছিল, ও আলাদা করে কথা বলবে পাত্রের সঙ্গে। লহরী কথা রেখেছিল।

--আমার দিদি জানতে চেয়েছে, কী দেখে ওকে পছন্দ করেছেন।

অলোক হাসেনি, ভাবী শ্যালিকার সঙ্গে সহজ ঠাট্টাও করে নি। বলেছিল,

--আমি যে এসব অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ আলোচনার দরকার বোধ করছিনা!

ফুলশয্যার রাত্রে তোমাকে অনেক কথা বলেছিল নৈব্যক্তির্ক অনুত্তেজিতভাবে, নিজের জীবনের ঘটনা আর দুঘর্টনার গল্প। তার বাবামায়ের বিচ্ছেদের, বাবার আত্মহত্যা ও মায়ের দ্বিতীয় বিবাহের দীর্ঘ কাহিনি। ছাতাপড়া কালো পর্দার মত ওর মুখ তুমি সহ্য করতে পারনি। আমার মতো তোমায় আর কে চেনেগো? তুমি আনন্দিত আকাঙ্ক্ষিত প্রথম সাফল্য তোমার মাবাপের। আর, লহরী? আবেগাবৃত স্বপ্নের সিঁড়িতে বসে থাকতে পারেনি বলে, তার প্রকল্পগুলো মাটিতে পা রেখে চলত। সে তোমাকে ভালবাসত, তার মধ্যে করুণা ছিল, প্রভুত্বও ছিল। তোমার অনুচ্চারিত দ্বিধা ও শঙ্কা সেই অধীনতামূলক ভালবাসায় আশ্রয় চেয়ে, ভরসা খুঁজত। এই দিয়েই অলোককে লহরী গভীর করে বুঝেছিল। একটা সহমর্মিতা, ঢেউয়ের চোরা স্রোত, হয়তো তাকেই ভালবাসা বলে। আর চাহিদা কি ছিলনা? আমি দেখেছি, তোমার চোখও এড়ায় নি। যতটুকু দেখেছ তুমি মেনে নিয়েছ, চোরাবালিতে ডুব দাওনি। অলোক বয়সের ব্যবধানের শীতসঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি মাস নিয়েছিল। সেদিনটা আমার মনেও ভীষণ স্পষ্ট সাগরী। তোমার সাতাশ অতিক্রান্ত অনাকর্ষণীয় অস্পৃষ্ট পূর্ণায়তন কুমারী দেহে অসুন্দর বিস্তৃত স্তন, অগভীর পৃথুল নাভির তটভূমি ছাড়িয়ে, ঊরু ও জঙ্ঘা। ফ্যাকাশে ত্রিকোণ মুখে ছোট কপাল, বিস্ফারিত করুণ ঘোলাটে চোখ। তুমি চোখ বন্ধ করেছিলে, অলোকের অভিব্যক্তি দেখতে চাওনি বলে। সংকোচে আশঙ্কায় কাঁপছিল তোমার আপাদমস্তক। তোমার কপালের লাল সূর্‍যের দিকে চেয়েছিল সে। তেরো বছরের বড় সেই পুরুষ জীবনে প্রথমবার সংযম চুরমার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তুমি ফিসফিস করেছিলে,

--বিশ্বামিত্রের ধ্যান ভাঙল?

হাজার বছরের প্রেমের কবিতা মনে পড়েছিল তোমার।

কলেজের পার্টটাইম চাকরি সহজেই পেলে। তোমার অধ্যয়ন ছিল, রেজাল্ট ছিল। আর যা, তার সুবিধাটুকু কুণ্ঠিত হয়েই নিলে। তোমায় ক্লাস নিতে হত খুবই কম, লাইব্রেরিতে থাকতে বেশিটা। ঘরে তোমাদের বিশ্বাস ঘন হয়ে, পারষ্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ছিল। তোমরা সুখী ও সন্তুষ্ট ছিলে সাগরী, তাইনা? অলোক বলত,

--জীবন একটা লংজার্নি ট্রেন। চলার ক্লান্তি, পরিশ্রম মাথায় জমিয়ে রাখলে আরও কষ্ট পাবে।

জান সাগরী, আমি অবাক হয়ে ভাবতাম নিরস স্বল্পবাক মানুষটা এইরকম কথা বলতে পারে? ওর গলার আওয়াজ খুব ভারী, মস্ত শুকনো ইঁদারায় মুখ ডুবিয়ে শব্দ করলে যেমন হয়। তোমার বাবা সমুদ্রসৈকতের ট্যুর বুক করে দিয়েছিলেন তোমাদের হনিমুনে। পরের দুবছর যাওয়া হয়নি কোথাও। সাগরী, তুমি বারবার স্বপ্ন দেখতে গভীর নীল অতলের; মাছ, সাপ, কচ্ছপ, জলজ গুল্ম আর এক ছায়ার মত অধরা অস্তিত্ব, ভাসছে, ডুবছে, অবলীলায় সাঁতার দিচ্ছে। তার ঊর্ধাঙ্গ নজরে আসত শুধু, বাকি অদৃশ্য। দমবন্ধ হয়ে ঘুম ভেঙে যেত তোমার, হাঁসফাঁস করতে। তোমার তখন পুরো মাস। ও তোমাকে তোমার মায়ের কাছে থাকতেই বলেছিল। তুমি যাওনি। তোমার মা মাঝে মাঝে এসে থাকতেন। ডাক্তার বলেছিলেন একমাত্রিক চিন্তা ও আশঙ্কা থেকে, এই ধরনের স্বপ্নের জন্ম। ডিপ্রেশন গভীর হলে শিশুর ক্ষতি। অসংখ্য জটিলতায় তোমার নড়াচড়া প্রায় বন্ধ। কলেজের কাউকে ফোন করে লুকিয়ে স্প্যাস্টিক বেবিদের ছবিওয়ালা ম্যাগাজিন, জানার্ল আনিয়ে রেখেছিলে। নির্ঘুম দুপুরে ওইসব নিয়ে নিবিষ্ট থাকতে। আমি কিছুতেই তোমাকে বারণ করতে পারতাম না।

তলপেটে শিশুর স্পন্দন অনুভব করতে করতে ডাক্তারকে প্রশ্ন করেছিলে। অলোক বলেছিল,

--উনি বলছেন তো যে জেনেটিক ডিজিজ সব সময় হেরেডিটারি না হতেও পারে।

অপারেশনের পরে দুটি পুরো দিন নির্জীব, মুখে বিশ্রী গন্ধ, ইন্ট্রাভেনাস চলছে, ঝনঝনে ব্যথা সমস্ত দেহে। তোমার জন্যে আমার অন্তর থেকে কষ্ট হচ্ছিল। কাপড়ে মোড়ান শিশু নিয়ে এসেছিল নার্স। ডাক্তার হাসিমুখে বলেছিলেন,

--ডোন্ট ওয়ারি মিসেস সোম।

তোমার অপরিচ্ছন্ন ধূসর অক্ষিপট থেকে নোনা জল চুঁয়ে নামছিল। তোমার কলেজের চাকরিটা অনেকদিন নাম-কে-ওয়াস্তে টিঁকে ছিল, এবার গেল। বাড়িতে আয়া, রাঁধুনি, পদ্মদিদি আর পরিচালনা করার দায়িত্বে তোমার মা। তোমার ওজন সীমায়িত করার জরুরি নির্দেশ ছিল ডাক্তারের। আমি জানি সাগরী, নিজেকে নিয়ে কী অসম্ভব বিব্রত থাকতে তুমি, কতখানি অস্বস্তিতে ভুগতে। তোমার শিশু বাড়তে লাগল, অর্থহীন কথা বলতে আর খিলখিল হাসতে লাগল। জানালা বেয়ে উঠতে শিখল, জল ঘেঁটে আছাড় খেতে শিখল, বাবা ফিরলে দৌড়ে গিয়ে কোলে চড়তে শিখল। অলোক বলল,

--ওর নাম নির্ঝরিণী।

তুমি বললে,

--ডাকনাম থাক নির্ঝর।

তোমার বুকের ভেতরে লুকিয়ে কাঁপতে থাকা অসহায় পাখির বাচ্চাটা কিচকিচ করে ডেকে উঠল




দ্বিতীয় পর্‍যায়-

এমন দীর্ঘ চিঠি আগে কখনও দেখেছি? তুমিই দেখেছ? আদতে এটা চিঠি হচ্ছে, না আর কিছু? চিঠির আবার প্রথম, দ্বিতীয় পর্‍যায় হয় নাকি? আগে অনেক কঠিন গম্ভীর বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ লিখতে, সেগুলো প্রকাশিত হত ম্যাগাজিনে, প্রশংসাও। চিঠি আর কাকে লিখবে? আভাস পেয়েছিলে সম্ভবত লহরী কাউকে পছন্দ করে, অথচ কথাটা বাড়িতে জানায়নি। সাগরী, তোমারই নিরুচ্চার দুঃখ আর অসহায়তার সূক্ষ্ম ধুলো ছেয়ে থাকত অন্দরে অলিন্দে, সব জায়গাতে। ঝেড়ে ফেলতে গেলে প্রবেশ করত আরো গভীরে। এখানেই চিঠিটা শেষ করে, ইতি টানতে পারলে ভালো হত। কিন্তু হল কই? তুমিও কি সব ব্যথাগুলো আমাকে না বলে, চেপে রাখতে পেরেছ কোনও দিন? তোমায় বেডরুমের কোণটায় চোখ যায় বারবার, আমার দৃষ্টি সরেনা। ওই উপহার কে দিয়েছিল, মনে আছে নিশ্চয়ই। জীবনভর অহেতুক ভেবে এসেছ, তোমায় বোঝেনা কেউ। কি জান, কষ্টটাকে ডালপালা সমেত বিস্তার করে দেখতে ভালবাস যে তুমি, তাই ওটা তোমার মনের মধ্যে সরাসরি চারিয়ে যায় সহজেই। মনে আছে, ডাক্তার ভদ্র রসিকতা করেছিলেন, তোমার মধ্যে মেলাঙ্কলির জার্মস্‌ আছে? আমি গোপনে হেসেছিলাম। তোমার এই অনেক কিছু না থেকেও, অনেক কিছু জিতে নেওয়ার রহস্যটা এভাবে না বুঝেই, তোমাকে খুশি রাখার অক্লান্ত চেষ্টা করেছে সকলে।

লহরীর কথা আজকাল খুব ভাব, তাইনা? এই বয়সেও নাচের ট্রুপ নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় যে জায়গাগুলোতে তুমি যাওনি, যেতেই পারবে না। আর ওর নিস্পন্দ কিম্বা দ্রুত স্পন্দিত একক মুক্ত জীবন? জিজ্ঞেস করনি, কেন ও থিতু হলনা? তুমি একান্তে ওকে করুণা করেছ সাগরী, এই নিষ্ঠুরতাটুকু আমার কাছে স্পষ্ট। ওর আনা বিদেশী উপহারগুলো অনাদৃত জমে থাকে, ব্যবহার করনা। কিন্তু মস্ত এই বাক্সখানা আমার বড্ড প্রিয়। প্রাণের সহজ প্রকাশটুকু মনে ধরে। পাখনা ছড়িয়ে দিয়ে ছটফটে কমলা রঙ একদল ব্যস্ত গোল্ড ফিশ, প্রায় নিশ্চল ধ্যানস্থ এঞ্জেলরা, দীর্ঘ চুম্বনরত গোরামি চারজন, কিম্বা সটান রাগী একগুঁয়ে যুবক শার্ক, তোমার একার নয় বুঝলে? ঐ চুলবুলে মটরদানার মত মলির ঝাঁক? নীচে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা বুড়ো ডুবুরি কেবলই বুদবুদ ছাড়ে। আমি জানি, একবার সুযোগ পেলেই ওকে প্রশ্নটা করে ফেলতে, কি খুঁজছো বুড়ো? তুমিও কি খুঁজে চলেছ সাগরী? এই বাক্সখানা পরিষ্কার করার দায়িত্ব মধুর। তোমাদের প্রশস্ত ফ্ল্যাটের পুবখোলা ছোট ঘরখানা নিজস্ব নিবার্চন তোমার।

কোনও বিবাহবার্ষিকীতে ফ্ল্যাটের চাবি অলোক তুলে দিয়েছিল তোমার হাতে। অবাক হয়েছিলে যতটা, তার চেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলে। কারন, ফ্ল্যাট কেনার খবরটা আগে জানতেনা। তার বিশ্বস্ত অনুচর মধু তোমার ঘর-লাগোয়া ছোট্ট ব্যালকনির গাছেদেরও দেখাশোনা করে। নিরালায় তুমি রোদের সেঁক নিতে নিতে মুগ্ধ হয়ে দেখতে পাও, অনায়াস কর্মপটু দু’হাত কী সহজেই জল পরিস্কার করে। মাছেদের সযত্নে তুলে রাখে আবার, ডুবুরিটাকেও স্থাপন করে, খাবার দেয় মাছেদের, মরাগুল্ম ছেঁটে ফেলে। বাক্সখানা তোমার বেডরুমে রাখা বলে, ওকে নিয়মিত সেখানেই ঢুকতে হয়। কাজ সেরে চলে গেলে আবার চোখ বুঁজে শুয়ে ভাবতে থাকো, ঘরের কোন কোণটায় ওষুধ আর আরক, দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ ও আরাধ্য, ওয়াকিং স্টিক, ক্রাচ কিম্বা ব্যায়ামের মেশিন। আড়ষ্ট, অগম্য, নিজেকে ক্রমাগত ভয় পেতে থাকো তুমি! তোমারই অভিপ্রায়ে তোমার স্বতন্ত্র একক কক্ষ।

অলোককে তোমার অতি মহানুভব মনে হয়, প্রায় করুণাসাগর, কারন তোমার বাবার যত্ন ও সাবধানতার একচুলও কম সে দেয়নি। সম্ভাব্য বড় দুঘর্টনার শঙ্কা নিয়ে, এতগুলো বছর প্রায় নিরাপদে পেরিয়ে এসেছিলে। সেটাও অবিশ্বাস্য, কি বল? তোমার নির্ঝর রোজ অন্তত দু’বার করে এসে পাশে বসত। মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে চুমু খেত। তুমি সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে প্রত্যহ। সাগরী আমি জানি, তুমি বুঝে নিতে ওর আলোর মতো ছেলেমানুষি ইচ্ছেগুলো। চাইত তোমার হাত ধরে বনবন করে ঘুরপাক খেতে, তোমার সঙ্গে পা মিলিয়ে নেচে উঠতে, যেমন তার বন্ধুরা তাদের মায়েদের সাথে...। ওর ত্বকের দীপ্তি, স্বাস্থ্যের ঔদ্ধত্য, তোমায় ছুঁয়ে থাকা কিশোরী বাড়ন্ত শরীরের বাস তোমায় বলে দিত, ওর মধ্যেকার অলক্ষ্য আবছায়াটুকু একমাত্র তুমিই দূর করতে পারতে! করনি। বরং সে তোমার অসহায়তার মেঘ ছিঁড়ে অকারণে খিলখিল হেসে উঠত। স্কুলের কোনো মজার গল্প শোনাতে চাইত, বেসুর গলায় দু’কলি গেয়ে, কয়েক পা নেচে উঠত। তুমি খুশি হওয়ার ভাণ করতে। আর তোমার সমস্ত সত্তা সন্দিগ্ধ আবিষ্কারটাকে সজোরে ঠেলে সরাতে চাইত, ওর ছন্দে, উচ্ছ্বাসে, চঞ্চলতায়, আর কারও ছায়া! ঈর্ষিত অনুভব করতে, নির্ঝর তার মাসীকে ভালবাসে, হয়তো তোমার চেয়েও বেশি!

অলোক ব্যবসায়িক সাফল্য সমৃদ্ধির সবখানি কৃতিত্ব দিয়েছিল স্ত্রী ও কন্যার ভাগ্যকে। এতবড় সুখ ক’জন পেয়েছে সাগরী! তবু বিস্বাদ, তবু বিষণ্ণতা? ক্রমশ গমনাগমনের পরিধি গন্ডীবদ্ধ করে দিয়েছিলে। দৈহিক অন্তরায়ে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল হওয়ার মতো মানসিক বৈকল্য অবশ্য তোমার ঘটেনি। তোমার হীনমন্যতা অথবা কষ্ট, সবকিছুর মধ্যে কতখানি সততা ছিল, আমার চেয়ে বেশি আর কেউ অনুভব করেনি। কিন্তু এও ভেবেছি, খানিক সহজভাবে বাঁচার চেষ্টা করলে, অন্যরা হয়ত কিছুটা আন্তরিক আরাম পেত। সাগরী, পিছনে ফিরে যখনই দেখতে চেয়েছ, অলোকের সেই সাধারন কথাটা তোমাকে নিরস্ত করেছে এতকাল। তবে আজ ব্যত্যয়? তোমার মেয়ে কলেজে ঢুকে বদলাচ্ছিল প্রত্যহ। আপাতদৃষ্টিতে কিছু না হলেও, ওর স্পর্শে, ঘ্রাণে, রক্তপ্রবাহে, গোপনীয়তার দ্রুত সঞ্চলন খুব অল্পদিনেই ধরে ফেলেছিলে। মা যে! জানতে চেয়েছিলে,

--হ্যাঁরে নির্ঝর, তুই কি কিছু বলবি আমাকে?

তার ফিঙে চোখজোড়া ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ত্বকে গোলাপ উঁকি মেরে গিয়েছিল। একদিন শেষ বিকেলে তোমার ঘরের ভেজানো দরজাটি ঠেলে সে বলেছিল,

--মা!! আসব?

কাঁপছিল তার মধুর মতো মিষ্টি কোমল স্বরটি। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটিকে বেশ লেগেছিল তোমার, উজ্জ্বল, ভদ্র, প্রত্যয়ী।

--ও অন্বয়, মা।

বলেছিল তোমার মেয়ে। অচেনা ভাললাগায় ছেয়ে যাচ্ছিলে। হয়ত কৃতজ্ঞতাও মিশে গিয়েছিল। তোমার স্বেচ্ছাবন্দী জীবনের দীর্ঘমেয়াদী অবসাদ কিসের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। বাৎসল্য আর উৎসবের মতো আলোকানুভূতিতে ডুব দিলে। আমি জানিগো সবটাই। সমস্ত দুবর্হ যন্ত্রনা, সন্দেহ সরিয়ে রেখে ওদের মঙ্গলকামনা করার মুহূর্তে ভেবেছিলে, নির্ঝরকে দেখতে ওর বাবার মতো। আত্মস্থ, সুঠাম, দৃঢ় সংগঠিত।

ওরা বেড়িয়ে গেলে, তুমি সামনের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিলে। দুবর্ল পতনশীল দাঁত, ভাঙাচোরা অকালবার্ধক্যে কুৎসিত মুখশ্রী। বিশ্রী লেগেছিল। এই ঘটনা ও সেই অনুভব প্রায় একদশক পুরোনো হয়ে এল। অথচ, একান্তে মনে পড়ে উষ্ণতা এনে দেয়, বল? সাগরী, তোমার ঘরের দেওয়ালে হালকা নীলচে ইমালশন, স্নানঘরের সমুদ্রসবুজ টাইলস, তোমাকে অন্তর্মুখি আত্মকেন্দ্রিকতার মতোই। রাতে বিছানায় শুয়ে চুপ করে জেগে জেগে, বেডল্যাম্পের সংক্ষিপ্ত আলোয় চুপিসারে বের করে নিতে ছোটবেলার চুরি করে রাখা বইটা। স্থির অল্প আলোয় জলের বাক্সের মধ্যে খেলে বেড়াত তোমার পোষ্যেরা। পাখনা ছড়ানো আর ঝাপটানোর শব্দ ভাসত। অলোক বাড়িতে থাকলে, সংলগ্ন কক্ষের খোলা দরজা পেরিয়ে তার সরব নিদ্রা তোমাকে বিরক্ত করত। অথচ, তার অনুপস্থিতিতে তিলমাত্র স্বস্তি পেতেনা। পুরুষের যৌনাকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘ বুভুক্ষা, অশান্ত, বিনিদ্র ছটফটানি শমিত করতে যা অপরিহার্‍য, তা থেকে তোমারই কারণে বঞ্চিত। কতসময়ে একা তুমিও জেগে থেকেছ। নিজেকে আঘাত করার ইচ্ছে হয়েছে, আত্মহননের প্রবৃত্তি জেগেছে। সাহসে কুলোয়নি অথবা শক্তি ছিলনা। কষ্টজ উষ্মায় ভুগে ভুগে জটিল হয়ে উঠেছিলে।

ধৈর্‍য্য, সফলতা, ও সুস্বাস্থ্য, অলোককে গতি দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতেও তোমার সঙ্গে যথেষ্ট সংযোগ রাখত। অথচ সন্দেহ থেকে তুমি উত্তীর্ণ হতে পারলেনা। অলীক, অমূলক হয়ত নয়! তুমি বুঝতে পারতে তার গতায়াত। আশ্চর্‍য, কোনওদিন কেন জিজ্ঞেস করলেনা তাকে? তোমার বিশ্বাস বলতো, জানতে চাইলে সত্যিটা তোমাকে জানাবে না। কিন্তু আমার কেবল মনে হত, তোমাকে সম্মান করে বলেই সে জানিয়ে দিত! আর সময় নেই! বেলা গেল... জলকে চল, বাক্যবন্ধটি কবে কোন অতীতে পড়েছিলে। ভোলনি তো! এঞ্জেলদের একটি মরে যাওয়ার পর থেকে বিষণ্ণতায় ভার তুমি। অলোক কয়েকদিনের বানিজ্যক সফরে অন্য রাজ্যে। জান, আমার খারাপ লেগেছিল সবাই মিলে পদ্মদিদিকে দুষেছিল বলে। প্রতিবাদ করার জোর ওর ছিলনা। পদ্মদিদি কতবছর যত্নে সেবায়, তিনকুলে পিছুটান নেই বলে আজীবন এখানেই থাকার অনুক্ত প্রতিশ্রুতিতে, নিষ্ঠায়, গাছের মতো তোমাকে ও তোমাদের সামলে রেখেছে। এতবছর পর নির্ঝরের প্রথম গভর্সঞ্চারের আনন্দসংবাদ দিতে ফোনটা তোমার হাতে এনে দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্য কোনও অভিসন্ধি খোঁজা কেন? প্রায় হাজার কিলোমিটার দূর থেকে তোমার মেয়েটার স্বরে ধ্বস নামার শব্দ তোমার ক্রমদুবর্ল শ্রবণেও ধরা পড়ছিল।

--হ্যাঁ মা ভাল..., খুউব সাবধানে থাকতে বলছে ডাক্তার... এখনও কিচ্ছু জানিনা...হ্যাঁ তিনমাস অবজারবেশন, তারপর স্ক্যান করে দেখে জানাবে... হ্যাঁ আমি সব জানিয়েছি, সব... তোমার কথা... যা আছে ভাগ্যে! আমি এক্‌খুনি তোমায় জানাতে চাইনি মা, বাবা তো ফেরেনি! এখনই এত ভেবনা মা প্লিজ, সব্বাই আছে তো এখানে, বড় বড় ডাক্তার... রাখছি মা, প্লিজ টেনশন কোরনা।”

তুমি ধন্দে পড়েছিলে, আসল খবরটা কি লুকোল নির্ঝর? উদ্বেগে অস্থির হয়ে উঠেছিলে। প্রেশার ঠিক রাখার ওষুধটিও কী বাদ পড়েছিল দু’একদিন? অদ্ভুত ভয়, সংগুপ্ত অপরাধবোধ নিমেষে তোমায় শিকার করল।

সাগরী, তুমি অন্তর থেকে চাওনি নির্ঝর পূর্ণ হোক! তাই এতদিন পর্‍যন্ত নিশ্চিন্ত ছিলে। তোমার আশঙ্কা নির্ঝরকেও কি ভীতিগ্রস্ততায় বিরত রেখেছিল এতবছর? জানার প্রয়াস পাওনি তুমি। তারপর কী ঘটে গেল, তোমার মনে নেই, আমারও মনে পড়ছে না সাগরী! এই বিলাসবহুল সেবাকেন্দ্রের বিশেষ কক্ষে সংরক্ষিত নীরবতা, গম্ভীর সংযত আলো, সাদা দেওয়াল, ওষুধের গন্ধে, কেমন লাগছে বল দেখি? কষ্ট হচ্ছে আমারও, অপরিমেয় যন্ত্রনা। পরিচ্ছন্ন চাদরের নিচে তোমার অনড় দেহ, পা, কোমর। কাল সকালে তোমার অস্ত্রোপচার হবে বলে ডাক্তারেরা জানিয়ে গেছেন। কাল ভোরের উড়ানে এসে পৌঁছাবে তোমার বর।

ভাবছ তো, অ্যাকুরিয়ামে ওইটুকু জলে যে মাছেরা প্রদক্ষিণ করে চলেছে, তাদের চলাচলও সীমিত! আগে ভেবেছিলে কখনো? তোমার টবের পাতাবাহারের দলও দোল খাচ্ছে নরম বাতাসে। কেন আজ চোখে জল আসে সাগরী? বিরক্তিকর ক্রাচ, ওয়াকিং স্টিক, হুইল চেয়ার, এদের কথাও বুঝি মনে পড়ছে? ভবিষ্যতে আর হয়তো কোনোদিন তুমি কষ্ট করেও...!

--ইটস আ গ্রেট ডিজাস্টার!!দুটো পা-ই এমনভাবে...কি করে?

ফোনে অলোকনাথকে বলছিলেন সহানুভূতিশীল ডাক্তার। তোমার শুনে ফেলার কোনও দরকার ছিল?

ছাড় ভবিষ্যৎ, ভবিতব্য বাদ। তোমার কেবিনে কেমন চমৎকার নরম আলোআঁধারি। কর্তব্যপরায়না সিস্টার পাশের এ্যান্টিচেম্বারে আধঘুমে। ডাক্তারের নির্দেশে শোওয়ার আগে হাল্কা সিডেটিভ দিয়ে গিয়েছে তোমার ব্যথা কমাতে। তাসত্বেও এই ঘুমভাঙা রাত, যদিও চোখ আঠায় জুড়ে আছে! কাল তোমাকে পোশাক পরিয়ে নিয়ে যাবে ওরা সেই ঘরে। মুখবাঁধা ডাক্তার, সিস্টার, তীব্র আলো, অ্যানাস্থেসিস্ট, শানানো ছুরি, কাঁচি। ছোটখাট পূবার্ভিজ্ঞতা আছেই তোমার। তারপর, ওষুধের প্রকান্ড ঘুম। সে ঘুমভাঙা আলোকিত না অন্ধকারময়, কে জানে! পালাবে সাগরী? পারবে? খুব ধীরে ধীরে তোমার শরীরের উপরিভাগ ভারী হয়ে উঠবে বুঝি! মস্ত মাথাটায় চঞ্চল দু’খানা গোলাকৃতি অপলক চোখ! চকচকে সোনালি ত্বক জুড়ে বড় বড় ঝলমলে আঁশ। পাতলা চাদরের মত মুক্ত পাখনা ভাসিয়ে দেবে। আর কে পায় তোমায়? অক্ষমতার যন্ত্রনা, সঙ্কোচ, জন্মাবধি চলাচলের, এমন কী পদক্ষেপের অসহনীয় যাপন রইবেনা সাগরী! তার জায়গায় বিশালাকৃতি মৎস্যপুচ্ছ। সুন্দর, সুগঠিত, হাল্কা, নরম, কমনীয় স্বচ্ছন্দ! চারপাশ ঘিরে ইহকালে দেখা যত সমুদ্রের ঢেউয়ের সাঙ্গীতিক দোলা ডাকবে তোমায়। ভাসবে, যেখানে ইচ্ছে, যত গভীরে পার অবলীলায় সাঁতার দেবে।

এমুহূর্তে যদি জানতে চাই, কাল ভোরে অপারেশন থিয়েটারে যাবার আগে ঠিক কোন তিনজনকে দেখতে চাইবে? বলব? আমি দু’জনকে জানি! তোমার আশি ছুঁইছুঁই ক্রন্দসী বিধবা মা, আর অলোকনাথ। বয়স হয়েছে সে লোকটার, অনেক বড় তোমার চেয়ে। আর তৃতীয়জন? নিজে জান সেটা, না আমকেই খুলে বলতে চাও? সে তোমার আত্মজা নয়! অধিকার ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছ? চাইছ, দীর্ঘ উপবাস গোপনীয়তা ভেঙে আইনগতভাবে তৃপ্ত হোক্‌? অত সহজ নয়গো, বুক ভেঙে যাচ্ছে তোমার! থাক্‌... আর না। রাত এবার ফুরিয়ে এল বুঝি। মৃদু টিকটিক করছে দেওয়াল ঘড়িটা। ভোর হতে কত দেরি? হায়রে, নার্স ভাবছেন তুমি ঘুমোচ্ছ। চিঠিটা শেষ হয়ে এল, নটে গাছটি মুড়োল। তুমি আমি ছাড়া, জনপ্রানী জানবেও না এই চিঠির কথা। সে তুমিও জান, আমিও। এজন্মের অকথিত টানাপোড়েনের নীরব লড়াইটাও হয়তো... জানিনে।

তোমারই ঐকান্তিক

অবিচ্ছিন্নসত্তা

সাগরী।






লেখক পরিচিতি
শ্রাবণী দাশগুপ্ত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।
এখন রাঁচিতে থাকেন।

৪টি মন্তব্য:

  1. " অনেক অনেকদিন আগে, যখন চলতে দেরী করছ, অথচ কোল থেকে নামিয়ে দিচ্ছে সবাই, সেসময় তুমি নীলরঙ বেশি ভালবাসতে জানি। " সমস্তটা ভেতরে নিলাম রে শ্রাবণী ... বহতা নদীর গতি ও ছন্দে তুই লিখেছিস ।

    উত্তরমুছুন
  2. অনেক ধন্যবাদ গো বর্ণালিদি... :)
    শ্রাবণী।

    উত্তরমুছুন
  3. ভালো লাগলো। এক জীবনে মনের অতলে ঘুমিয়ে থাকা অসহায়তা অভিমানের চোরা স্রোতে নিরন্তর বহমান থাকে। ক্ষণিক সুখ বা স্বীকৃতি সেই স্রোতে এক আধটা পাথর ফেললেও, সুখের ঢেউ সেই স্রোতের মুখ ঘোরাতে পারে না। ওপরে স্থির থাকলেও গভীরে তার উথাল পাথাল চলেই। আমরা সবাই কম বেশী এই অভিমান বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াই। রাতের গভীরে কখনও সে নোনা স্বাদের তৃষ্ণা মেটায়।

    উত্তরমুছুন
  4. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
    শ্রাবণী।

    উত্তরমুছুন