শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

খুরশীদ শাম্মী'র বড় গল্প : রুপালী আঁচল

ছুটির দিন। দুপুরের খাবার শেষে বাড়ির বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে মারুফ। কাজের মেয়ে আমেনা বাড়ির টেলিফোনটি মারুফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বল্লো, “ভাইয়া, আপনার ফোন।” মারুফ টেলিফোন ধরে হ্যালো বলার সাথে সাথে ওপার থেকে ভেসে আসে একটি অজানা মেয়েলি কন্ঠ, “আপনার স্ত্রী ঈশিতা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। প্লিজ যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব আসুন। তার রক্তের প্রয়োজন।” মারুফ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জানতে চাইলো তার স্ত্রী ঈশিতার কি হয়েছে? হাসপাতালে তাকে কেন নেয়া হয়েছে? কিন্তু উল্টো দিক থেকে ফোনটি কেটে যায়। মারুফ তাড়াহুড়ো করে ড্রাইভারকে নিয়ে হাসপাতে রওয়ানা হয়।
হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারুফ ঈশিতার সেলফোনে ফোন করে। ঈশিতার ফোন থেকে কোন সাড়া না পেয়ে মারুফ অস্থির হয়ে আবোল তাবোল ভাবতে শুরু করে, “তবে কি ঈশিতা গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে? নাহ! ওর তো এখন বোনের বাসায় থাকার কথা। ওর বড় বোন রুবিতা আমেরিকা থেকে এসেছে প্রায় আট বছর পরে। ছুটির দিন সব বোনেরা মিলে আজ বোনদিবস পালন করছে মেজো বোন ললিতার বাড়ি।” মারুফ এবার ফোন করে ললিতার বাসায়। বেশ কয়েকটি রিং হওয়ার পরে কাজের মেয়ে ফোন ধরলে মারুফ রেগে যায় ফোন ধরতে এতো সময় লাগে বলে। অস্থির কন্ঠে সে ঈশিতাকে চাইতেই; মেয়েটি উওর দেয়, “আপারা বাসায় নাই। সবাই মিলে সিনেমা দেখতে গেছে।” মারুফ ফোন করে ললিতার সেলফোনে, কিন্তু ললিতাও ফোন ধরছে না। মারুফ সত্যিই বুঝে উঠতে পারছেনা আসলে কি হচ্ছে ঈশিতার সাথে। এরই মধ্যে তারা পৌঁছে যায় তাদের গন্তব্যে, ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করে হাসপাতালের সামনে। মারুফ দৌড়ে ছুটে যায় জরুরি বিভাগের দিকে। জরুরি বিভাগে যত রোগি মারুফের নজরে আসে তাঁদের মধ্যে ঈশিতা নেই। দ্রুত নিঃশ্বাস নিতে নিতে মারুফ একজন নার্সকে ঈশিতার কথা জানতে চাইলে, সে তাকে নিয়ে যায় ভিতরের একটি রুমে। ক্ষত বিক্ষত দেহে স্যালাইন এবং অক্সিজেন এর সাহায্যে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে একজন মহিলা। মারুফ বিছানার পাশে দাঁড়াতেই মহিলাকে দেখে চমকে উঠে। চিনতে পারছেনা ঈশিতাকে। নার্সকে প্রশ্ন করেঃ



মারুফঃ আপনারা কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে সে ঈশিতা? আমার বাসার ফোন নাম্বার পেলেন কি করে?

নার্সঃ রোগির ব্যাগে ইমার্জেন্সি কন্টাক্ট ইনফরমেশনে আপনার নাম, ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার আছে। এবং তার সেলফোনেও লাষ্ট কলে আপনার বাসার নাম্বার আছে।

মারুফঃ কিন্তু সে তো ঈশিতা নয়।

নার্স একটু হতবাক হয়ে যায়। কি হচ্ছে ভেবে পাচ্ছেনা দু’জনের একজনও। মারুফ রোগির ব্যাগের কন্টাক্ট ইনফরমেশন দেখার জন্য অনুরোধ করলে নার্স রোগির ব্যাগ নিয়ে আসে। ব্যাগ দেখে মারুফ আরো বেশী আশ্চর্য হয়। একদম একই ব্যাগ, একই ফোন, এবং সত্যিই ঈশিতার হাতে লেখা কন্টাক্ট ইনফরমেশনে তার নাম।

মারুফঃ এতো সাদৃশ্য? এটা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় আমাদের পুলিশে খবর দেয়া দরকার।

নার্সঃ হ্যাঁ, তা হয়তো করতে হবে। তার আগে রোগির জন্য রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে।



ললিতার ফোনে মারুফ হাসপাতালের রুম থেকে বাইরে বারান্দায় বেড়িয়ে আসে এবং খুব অস্থিরভাবেই ফোনে রিস্পন্‌স করে-

মারুফঃ হ্যালো, তোমরা কোথায়? ঈশিতা ফোন ধরছে না কেন?

ললিতাঃ আগে বলো তুমি এতো অস্থির হয়ে আছো কেন?

মারুফঃ ঈশিতা কোথায়?

ললিতাঃ ঈশিতা আমার সাথেই, কিন্তু ওর মন খারাপ।

মারুফঃ কেন? কি হয়েছে ওর?

ললিতাঃ কথা বলো ঈশিতার সাথে।

ঈশিতাঃ হ্যালো

মারুফঃ তুমি ফোন ধরছো না কেন?

ঈশিতাঃ আমার ফোন এবং ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে।

মারুফঃ কখন? কিভাবে?

ঈশিতাঃ মেজো আপুর বাসা থেকে বসুন্ধরা সিটির দিকে যাবার সময় সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করছিলো আমাদের গাড়ি। আমার খেয়াল ছিলো না যে আমাদের গাড়ির জানালার গ্লাস নামানো। হঠাৎ একটি ছেলে আমার ব্যাগ নিয়ে দেয় দৌড়। ব্যাগের মধ্যে আমার সেলফোনও ছিলো।

মারুফঃ তুমি কি ছিনতাইকারীকে দেখেছো?

ঈশিতাঃ হ্যাঁ, একটি ছেলে। চেহারা দেখলে চিনবো।

মারুফঃ তোমার ফোন এবং ব্যাগ একজন মহিলার কাছে। সে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আমি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমার সাথে কথা বলছি।

ঈশিতাঃ তুমি কি বলছো এসব? তুমি হাসপাতালে কেন? তোমার কিছু হয়নি তো?

মারুফঃ আমি ঠিক আছি। একজন মহিলা তোমার ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার সময় এক্সিডেন্ট করে এবং এখন সে হাসপাতালে। তার হাতে তোমার ব্যাগ থাকাতে হাসপাতালের নার্স আমার নাম এবং ফোন নাম্বার পায়। বাসার ফোনে হাসপাতাল থেকে আমাকে ফোন করে। আমি তোমাদের যোগাযোগ করতে চেষ্টা করি কিন্তু তোমাদের না পেয়ে ভয় পাই এবং ছুঁটে আসি হাসপাতালে।

ঈশিতাঃ আমার ব্যাগতো মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে ছিনতাই হয়েছে এবং একটি ছেলে ছিনতাই করেছে। তবে ঐ মহিলার কাছে গেলো কিভাবে? পুলিশে খবর দিয়েছো?

মারুফঃ না। এখনও দেইনি। তবে মহিলা’র অবস্থা অনেক খারাপ। রক্ত দরকার। ও নেগেটিভ। খুবই রেয়ার রক্তের গ্রুপ। হাসপাতাল থেকে তেমন কিছুই করছে না। আমার খারাপ লাগছে, চিন্তা করছি ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেবো। কোনো সহৃদয় ব্যাক্তি থাকলে আসবে হয়তো।

ঈশিতাঃ ও নেগেটিভ তো আমাদের রুবিতা আপুর রক্তের গ্রুপ। আমি ওকে বরং জিঙ্গাসা করি।

মারুফঃ ফোনটা রুবিতাকে দ্যাও প্লিজ, আমিই কথা বলি।

রুবিতাঃ হ্যালো, মারুফ।

মারুফঃ দোস্ত, তোর রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ, তুই কি একজন নারীকে সাহায্য করবি?

রুবিতাঃ কে সে?

মারুফঃ আমিও চিনিনা, জানিনা। তবে জানি একজন মানুষ।

রুবিতাঃ কোথায় তুই?

মারুফঃ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সে অনেক বড় গল্প। ঈশিতার কাছে শুনে নিস। আর সম্ভব হলে চলে আয়।

রুবিতাঃ আসছি। তুই অপেক্ষা কর ওখানে।

মারুফ ফোন রেখে ভিতরে গিয়ে নার্সকে আশ্বস্ত করলো যে রক্ত পাওয়া গেছে। তবে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মারুফের কথায় নার্স একটু আশ্চর্য হলো এইভেবে যে কোথায় তার পুলিশ ডেকে হৈ চৈ করার কথা কিন্তু সে রোগির জন্য রক্ত সন্ধান করছে। নার্স একটু হেসে ডাক্তারকে জানালো করলো রক্তের কথা। মারুফ বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে করতে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নেয়। হাসপাতালে ধূমপান করা উচিত হবে না ভেবে আবার পকেটে রেখে দেয় সিগারেটের প্যাকেট। হাসপাতালে কে নিয়ে এসেছে এই অচেনা মহিলাকে? ভিতরে গিয়ে নার্সের কাছে জানতে চাইলে নার্স আবদুল নামের একজন রিক্সা চালকের কথা বলে। আব্দুল হাসপাতালে রোগিকে পৌঁছে দিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করার মতো কিছু না রেখেই চলে যায়। মহিলার পরিচয় নিয়ে এসব সাত পাঁচ করতে করতে রুবিতা, ললিতা এবং ঈশিতা চলে আসে।

রুবিতাঃ মারুফ, তুই জনদরদী জানতাম কিন্তু এতোটা যে তা জানতাম না। ঈশিতার ছিনতাই করা ব্যাগ নিয়ে হাসপাতালে আসা মহিলাকে আমাকে রক্ত দিতে অনুরোধ করছিস? রাস্তায় ঈশিতার কাছে সব শুনে আমার পিত্তি জ্বলছে।

মারুফঃ বন্ধ করনা এসব। আগে জীবন বাঁচা। পরে দেখবো কি করা যায়।

ঈশিতাঃ আপু, মারুফ যখন বলছে; প্লীজ---

রুবিতাঃ মারুফ তুই তো আমার বোনটার মাথাও নষ্ট করে ফেলেছিস।

ললিতাঃ একটুও নষ্ট করে নাই আপু। বরং আমি গর্ববোধ করি যে ঈশিতা মারুফের মতো বড় মনের মানুষে পরিণত হতে পেরেছে।

রুবিতাঃ ও মাই গড! এতো দেখছি ললিতাও গেছে। সাবাস মারুফ। তোর চামচাদের নিয়ে তুই ভালোই আছিস। চল! দেখি কি করা যায় এবং কত তাড়াতাড়ি ঝামেলা মুক্ত হওয়া যায়।



নার্স সকল প্রকার নিয়ম অনুসরণ করে রুবিতার দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে রোগির দেহে রক্ত দেয়ার ব্যবস্থা করলো। রোগির কোন প্রকার জরুরি প্রয়োজনে মারুফ তার সাথে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করে সবাইকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে পরে।



হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে ললিতা চলে যায় নিজের গাড়িতে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে আর রুবিতাকে নিয়ে ঈশিতা এবং মারুফ নিজেদের গাড়িতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। গাড়িতে মারুফ এবং রুবিতা তাদের কথোপকথনে নিয়ে আসে তাদের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মধুর স্মৃতিগুলো, যেগুলো সময়ের ভাঁজে অনেকটা আবছা হয়ে গেছে কিন্তু গল্প কথা হয়ে হৃদয়ে এখনো দোলা দেয় সময়-অসময়। রুবিতা জানতে চাইছে সব বন্ধুদের খবর। মারুফ একে একে সবার খবর বলে রুবিতাকে। খুব শীঘ্রই বন্ধুদের সাথে একদিন পিকনিকের প্লান করার কথা আলোচনা করে তারা। মারুফ এবং রুবিতার বন্ধুত্ব শুরু হয় সেই কলেজ জীবনের প্রথম দিন থেকে। অনেক স্বার্থপরদের টানা হেঁচড়ার মধ্যেও তারা নিজেদের মধ্যে বজায় রেখেছে তাদের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধ। তারা শুধু ভালো বন্ধুই নয়, দু’জনে দু’জনার ভালো এডভাইজারও। অনেকেরই ধারণা ছিলো তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক আছে। তারা কাউকেই তাদের ধারনা মিথ্যা বলে নিরাস করে নাই বরং খুব স্বচ্ছভাবে সকলকে তাদের ধারণাকে সঠিক বলে প্রমানিত করতে সাহায্য করেছে,“হ্যাঁ! তাদের মধ্যে ভালোবাসা আছে, প্রচন্ড একটি ভালোবাসার সম্পর্ক আছে, তবে তা শুধু খাঁটি বন্ধুত্বের ভালোবাসা। যে ভালোবাসায় কোন ভেজাল নেই।” ছোটবোন ঈশিতার সাথে বিয়ের কারণে পারিবারিকভাবে একটি ভিন্ন সম্পর্ক তৈরী হলেও তারা তাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কটি এখনও একইভাবে বজায় রেখেছে। গল্পে গল্পে তারা বাড়ি পৌঁছে যায়। বাড়ি ফিরে সবাই হাসপাতালের জীবানু এবং রাস্তার ধুলাবালি মুক্ত হয়ে খাবার টেবিলে খাবার খেতে খেতে আবার শুরু করে তাদের পুরোদিনের কাজের আলোচনা। হঠাৎ মারুফের ফোন বেজে উঠে। হ্যালো বলতেই ওপার থেকে নার্সের কন্ঠ শুনে একটু ঘাবড়ে যায় মারুফ। হাসপাতালে রোগির জ্ঞান ফিরেছে শুনে মুহূর্তেই আবার সব ঠিক হয়ে যায়। এবার মারুফ নার্সকে রোগির সমস্ত ইনফরমেশন নিয়ে আবার ফোন করার জন্য অনুরোধ করে।



খাবার শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও রুবিতা ঘুমায়নি। শুয়ে গল্পের বই পড়ছে আর স্বামী রুপম এবং ছেলে রায়হানের ফোনের জন্য অপেক্ষা করছে। ছেলে রায়হান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। অনেক ব্যস্ত সে নিজেকে নিয়ে, হয়তো দিন শেষে রাতে একবার ফোন দিবে মা’কে। কিন্তু স্বামী রুপম দিনে দু’বার কথা না বলে থাকতে পারে না। বিয়ের পরে এই প্রথম রুবিতা স্বামী সংসার রেখে বাংলাদেশে একা এতোদিনের জন্য এসেছে। আত্মীয় এবং বন্ধুদের সাথে বেশ ভালো সময় কাটলেও রুবিতা রুপম এবং রায়হানকে খুব মিস করছে। মাঝ রাতে রুপমের ফোন পেয়ে রুবিতার অপেক্ষার অবসান হয়। সে ক্লান্তিহীনভাবে পুরো দিনের সমস্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো গল্প করে রুপমকে শোনায়। এভাবে গল্পে গল্পে যখন প্রায় ভোর হয়ে যায় তখন রুবিতা ঘুমিয়ে পড়ে।



সকালের নাস্তা শেষে মারুফ অফিসে যাওয়ার পথে সে ফোন করে তার পুলিশ অফিসার বন্ধু রাশেদকে। রাশেদ তাকে আশ্বাস দেয় যে সে একবার হাসপাতালে যাবে এবং খবর নেবে। অফিসের কাজের ভিড়ে কিছুটা সময় সে ভুলে যায় হাসপাতালের কথা। রুবিতা দেশে আসাতে পুরানো বন্ধুদের ফোনের পরিমান যেমন বেড়েছে ঠিক তেমনি অপরিকল্পিত কাজের পরিমানও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। আজ কাজ শেষে সবাইকে নিয়ে চাইনিজ খেতে যাবার কথা। মারুফের মনে আনন্দ যে বাড়ির সবার সাথে কিছু বন্ধুও থাকবে সেখানে। পাশাপাশি সারাদিনে হাসপাতালের খবর না পেয়ে মারুফের একটু চিন্তাও হয়। তার মনের মধ্যে বারবার ভেসে আসে নানান ভাবনা, “যেখানে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো এক টাকার ঔষধ পর্যন্ত রোগিদের দিয়ে কেনাতে বাধ্য করে সেখানে সারাদিনে হাসপাতাল থেকে কোন ফোন নেই। তাছাড়া রোগির খবর নিয়ে নার্সের ফোন করার কথা, তাও সে করেনি। সবকিছু ঠিক আছে তো? বাসায় যাবার পথে একবার হাসপাতালে গিয়ে খবর নেয়া দরকার। কিছু দরকার হলে তো ফোনই করবে।” অনেক কিছু ভেবে চিন্তে পারিবারিক বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়ার প্রয়োজনিয়তা মনে করে মারুফ কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসে। সবাইকে নিয়ে নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে যায় তারা। আনন্দ, হৈচৈ করে খাবার পর্ব শেষ করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় মারুফ এবং নিজে ড্রাইভারকে নিয়ে হাসপাতালে যায় রোগির খবর নিতে। হাসপাতালে ঢোকার সাথে সাথে দেখা হয় সেই নার্সের সাথে।

নার্সঃ হাই

মারুফঃ হ্যালো। রোগির অবস্থা কি?

নার্সঃ একটু ভালো। তবে আরো তিন- চার দিন লেগে যাবে তার বাড়ি যেতে।

মারুফঃ রোগি সম্পর্কে আপনার যে খবর নেয়ার কথা ছিলো। নিতে পেরেছিলেন কি?

নার্সঃ হ্যাঁ, আমি কিছু ইনফরমেশন নিয়ে রেখেছি। পুলিশও এসেছিলো। তবে আপনাকে আর ফোন দিতে সময় করতে পারিনি। আমি গতকাল ডিউটি শেষ করে বাড়ি যাই। আজ মাত্র দুই ঘন্টা আগে আমার ডিউটি শুরু হয়েছে। সরি।

মারুফঃ ইটস ওকে। পুলিশ অফিসার কে? রাশেদ এসেছিলো?

নার্সঃ আমি ঠিক নাম বলতে পারবো না। তারা দুপুরে এসেছিলো। রোগির সাথে কথা বলেছে। তখন আমি ডিউটিতে ছিলাম না।

মারুফঃ সে পাওয়া যাবে। তবে আপনার সংগ্রহ ইনফরমেশন বলুন।

নার্সঃ রোগির নাম সেতারা বেগম। বাড়ি সাভার। স্বামী রিক্সা চালক কিন্তু অন্য আর একটা বিয়ে করেছে। সেতারা একটি গার্মেন্টসে কাজ করে। এক ছেলে রশিদ অভাবের কারণে মাস্তানদের দলে যোগ দিয়েছে। সেতারা সেটা পছন্দ করে না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই তর্ক বিতর্ক হয়। সেদিন রশিদ আপনার স্ত্রী ঈশিতার ব্যাগ ছিনতাই করে ব্যাগটি নিয়ে তাদের ঘরে যায়। ছুটির দিন থাকাতে মা সেতারা সেটা দেখে ফেলে এবং ছেলেকে অন্যায় কাজে বাঁধা দেয়। ছেলের সাথে অনেক কথা কাটাকাটি হয় এবং এক পর্যায়ে সেতারা ব্যাগ নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় যে সে ব্যাগটা থানায় ফেরত দেবে কিন্তু পথে এক্সিডেন্ট হয়। তারপরে সে আর কিছু জানে না।



মারুফঃ পুওর মাদার! ভালো মানুষ পৃথিবীতে এখনও আছে। চলুন সেতারাকে দেখে আসি।

নার্সঃ রাতের ঔষধ দেয়া হয়েছে তাকে। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে সে।

মারুফঃ হ্যাঁ, অনেক রাত হয়েছে, একদমই খেয়াল করিনি। সারাদিনের কাজের চাপে খবর নিতে পারিনি বলে এতো রাতে আসতে হয়েছে।

নার্সঃ এখন সব ঠিক আছে। তবে পেইন কিলার দেয়া হচ্ছে বলে শুধু ঘুমোচ্ছে।

মারুফঃ তার ঔষধ কি হাসপাতাল থেকেই দেয়া হচ্ছে? তার খবর নিতে আর কেউ কি এসেছিলো?

নার্সঃ অল্পকিছু প্রয়োজনীয় ঔষধ হাসপাতাল থেকে দেয়া হয়েছে আর বাকীগুলো আমি কিনে দিয়েছি। তবে অন্য কেউ তাকে খোঁজ করেনি এখনও।



একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মারুফ পকেট থেকে পাঁচশত টাকার দু’টো নোট বেড় করে নার্সের দিকে এগিয়ে দেয় আর অনুরোধ করে, “প্লিস এই টাকাটা আপততঃ আপনি রাখুন পরবর্তী খরছগুলোর জন্য। আপনি আগের খরচগুলো বহন করেছেন। বাকী খরচগুলো আমি বহন করবো। বাকী আর কি কি খরচ হতে পারে এমন একটি আনুমানিক আইডিয়া দিলে আমার জন্য একটু সহজ হবে।” আগামী কাল আমার স্ত্রী ঈশিতাকে নিয়ে আমি তাকে দেখে যাবো, এই বলে মারুফ সে রাতে বাড়ি ফিরে যায়।



পরের দিন সকালে রাশেদের অনুরোধে অফিসে যাবার পথে মারুফ থানায় যায়। চা এবং দুই বন্ধুর বন্ধুত্বের হাসিঠাট্টায় কেটে যায় কিছুক্ষণ।

মারুফঃ এবার কাজের কথায় আসি বন্ধু। আমার আবার আফিসে যেতে হবে একঘন্টা’র মধ্যে।

রাশেদঃ ওহ! একদমই ভুলে গিয়েছিলাম যে তোর অফিসে যেতে হবে। রশিদকে আমরা কাল রাতে গ্রেফতার করেছি।

মারুফঃ কিছু বলেছে?

রাশেদঃ হ্যাঁ। ঐ পর্ব শেষ করেই তোকে ফোন দিয়েছি।

মারুফঃ কি অবস্থা? কি বলে সে?

রাশেদঃ তার কথায় যা বুঝলাম, এই কাজে সে খুব একটা পাকা হয়ে উঠেনি এখনও।

মারুফঃ ওর মা’র খবর নেয়নি কেন?

রাশেদঃ ভয়ে। রশিদের ধারনা ওর মা’র এক্সিডেন্টে ওদের দলের কারো হাত আছে।

মারুফঃ সেটা কি করে? মা-ছেলের কথা কাটাকাটি’র পরেই তো মা বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যায় এবং এক্সিডেন্ট করে।

রাশেদঃ রশিদের কথায়, যখন মা-বেটা’র মধ্যে তর্ক হচ্ছিলো সেখানে ওদের দলের আরো একজন ছেলে ছিলো এবং সে সব শুনেছে। সেতারাকে থানার উদেশ্যে বেড়িয়ে যেতে দেখে সে ভয় পায় এবং সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দলের নেতাকে ফোন করে এবং তারপরই এই অবস্থা।

মারুফঃ হুম। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। এর মানে নিজেদের স্বার্থে মা’কেও মেরে ফেলা হয়।

রাশেদঃ হ্যাঁ। বন্ধু, এই দুনিয়াটা খুব খারাপ। প্রতিদিনই তো এদের নিয়ে আমার কাজ। মাঝে মাঝে আরো কত নিষ্ঠুর ব্যাপারের মুখোমুখি হতে হয়।

মারুফঃ মা কে মেরে ফেলার প্লান থেকে আর নিষ্ঠুর কি হতে পারে?

রাশেদঃ এটা তো রশিদ করেনি। এ কাজটা করেছে ওদের দলের লোকজন।

মারুফঃ রশিদের শাস্তি এখন কি? কি করবি ওকে?

রাশেদঃ সে ছিনতাই স্বীকার করেছে তাই তাকে কারাগারে পাঠাবো। শুনানী হবে, আদালত যা রায় দেবে সে অনুযায়ী তার বিচার হবে। তবে এ ক্ষেত্রে খুব বড় কোন কিছু হবে না। আমি চিন্তা করছি ওর দলের লোকদের ধরার পরে হয়তো বেড় করতে পারবো যে সেদিন সেতারাকে মারার জন্য এই এক্সিডেন্ট ঘটলো কিভাবে?

মারুফঃ ওকে জামিনে বেড় করা যাবে?

রাশেদঃ হ্যাঁ তা যাবে। তবে ওকে জামিনে সাহায্য করবে কে? ওর দলের লোকজন সব ভয়ে নিজেরাই পালিয়ে আছে।

মারুফঃ আমি চিন্তা করছি, আমি যদি সাহায্য করি।

রাশেদঃ কি বলিস এসব? তোর কি মাথা ঠিক আছে? তুই আমাকে ফোন করেছিস ওকে ধরে আনার জন্য আবার তুই ই আমাকে বলছিস যে তুই নিজে ওর জামিনের ব্যবস্থা করবি।

মারুফঃ আছে, আমার মাথা পুরোই ঠিক আছে। সেতারা বেগম, মানে রশিদের মা! তার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ। তাকে সেবা করার মতো তার আর কেউ নেই।

রাশেদঃ তা নিয়ে তোর এতো ভাবনা কেন? আর তুই কি মনে করিস যে এই ছেলে মায়ের সেবা করবে?

মারুফঃ একজন সৎ মহিলা সে। আমি সৎ মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চাই।

রাশেদঃ তবে তুই সেতারা বেগমের পাশে দাঁড়া। রশিদের পাশে নয়।

মারুফঃ আমি ওকে জামিনে বেড় হওয়ার ব্যবস্থা করে দেবো। সময়মতো সে হাজিরা দেবে দেখিস। ভালো কিছু করার সুযোগ পেলে মানুষ খারাপ কাজ থেকে বেড়িয়ে আসে। দেখবি রশিদও ভালো মানুষে পরিনত হবে।

রাশেদঃ তবে তুই কি আজই জামিনের ব্যবস্থা করতে পারবি? অন্যথায় আমরা তো কালই ওকে কারাগারে পাঠাবো।

মারুফঃ বিকেলে কাজের শেষে আমি উকিলের সাথে কথা বলবো। কাল হয়তো জামিনের ব্যবস্থা করতে পারবো।

রাশেদঃ কাল হলেও ঠিক আছে।

মারুফঃ তবে আজ উঠি।

রাশেদঃ ওকে। গুডলাক। কাল দেখা হবে।



থানা থেকে বেড় হয়ে মারুফ অফিসে যায়। ঈশিতাকে ফোন করে এবং কাজ শেষে তার সাথে হাসপাতাল এবং উইকিলের কাছে যাবার জন্য অনুরোধ করে। কর্মজীবি মহিলা ঈশিতা স্বামী মারুফের মহৎ কাজগুলোকে শ্রদ্ধা এবং সন্মান করে। তাই নিজের সকল পরিকল্পনা বাদ দিয়ে স্বামীর সাথে বিকেলে হাসপাতাল এবং উকিলের কাছে যাবার জন্য সম্মত হয়।



পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অফিস শেষে মারুফ এবং ঈশিতা সরাসরি চলে যায় হাসপাতালে। ঈশিতার হাতে একটি ফলের ব্যাগ। সেতারা বেগম এর কাছে যেতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সে আর ভাঙ্গা কন্ঠে বলে যায়, “আমি নার্স আপার কাছে সব শুনছি। আমাকে মাপ করে দেন”।

ঈশিতাঃ প্লীজ তুমি কান্না বন্ধ করো। এভাবে তোমার কান্না করা ঠিক না।

মারুফঃ তোমাকে ক্ষমা করার কিছু নেই। তুমিতো আর কিছু করো নাই। যা কিছু করেছে সব তোমার ছেলে করেছে।

সেতারাঃ আমি জানিনা, আমার ছেলে কেন নষ্ট হইয়া গ্যাছে? অনেক চেষ্টা করছিলাম পড়ালেখা শেখানোর জন্য। সব রাইখ্যা খারাপ লোকের সাথে খারাপ কাজ করতে তার ভালোলাগে। আমি চাই সে জেলে থাকুক। তার বিচার হোউক। পুলিশের মাইরে যদি আবার মানুষ হইয়া বাড়ি ফেরে।

মারুফঃ রশিদ এখন থানায় আছে। ওর বিচার হবে। তুমি কান্না বন্ধ করো।

ঈশিতাঃ তোমাকে হয়তো দু’একদিনের মধ্যে বাড়ি যেতে হবে। তখন তোমাকে দেখাশুনা করবে কে?

সেতারাঃ আমার আর কেউ নাই আপা।এই ছেলে আর এক ভাই আছে, ভাইটাও অসুস্থ। তার বউ বাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্টে আছে।

মারুফঃ তোমার ভাইয়ের কি হয়েছে?

সেতারাঃ পার‍্যালাইসিস। বাম পাশ নাড়াইতে পারে না।

নার্সঃ সেতারা আপনি হাসপাতাল থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যেই ছাড়া পাবেন। কিন্তু বাড়িতে গেলেও আপনাকে খুব সতর্কভাবে নিজেকে পরিচর্যা করতে হবে আরও প্রায় দুই তিন সপ্তাহ। আপনি বরং আপনার ভাই ভাবীকে খবর দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

সেতারাঃ কে খবর দেবে তাদের? রশিদও তো থানায়। বস্তিতে আমার পাশের ঘরের তাসলিমাকে খবর দিলে সে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।

মারুফঃ খবর দেয়া যাবে সময় মতো। তোমাকে কে নিয়ে যাবে, তা দেখা যাবে পরে। তোমার সুস্থতা খুব বেশী জরুরী এই মুহুর্তে।

ঈশিতাঃ সেতারা তুমি ঔষধ খেয়ে আগে সুস্থ হয়ে উঠো। আজ বরং আমরা চলি।



রুম থেকে বেড় হয়ে মারুফ, ঈশিতা এবং নার্স একত্রে বারান্দা ধরে হেঁটে সিঁড়িতে যাওয়ার পথে মারুফ সেতারার চিকিৎসার খরচের একটি বিল তার নিজের নামে করার জন্য নার্সকে অনুরোধ করে। সে আরো অনুরোধ করে যে সেতারাকে রিলিজ দেয়ার আগে যেন তাকে খবর দেয়া হয়। সেতারাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা সে করে দেবে।



হাসপাতাল থেকে বেড় হয়ে মারুফ এবং ঈশিতা বাড়ি যাওয়ার পথে দেখা করে উকিলের সাথে এবং সঠিক উপায়ে রশিদের জামিনের ব্যাপারে পরামর্শ করে তারা। জামিনের পরে সময়মতো রশিদের থানায় হাজিরা নিয়েও আলোচনা করে তারা। রশিদের মতো এমন ছিনতাইকারীদের বিচার হওয়া দরকার বলে উকিল একটু উদ্বিগ্নতা দেখালে, মারুফ খুব বিনয়ের সাথে একমত প্রকাশ করে। সে আরো বলে, “আমিও চাই রশিদ এবং তার পুরো দল তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি পাক। তবে আমি একজন মহৎ মা কে তার সন্তানকে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে একবার সাহায্য করে দেখতে চাই। একজন সত্যি মানুষ হিসেবে এটা আমার একপ্রকার চেষ্টা। এমন চেষ্টা আমি আগেও করেছি এবং সফল হয়েছি। এই সুযোগে রশিদ না ঠিক হলে আমি আবার তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবো।” মারুফ রশিদের জামিনের জন্য উকিলের চেম্বারে সকল প্রকার ফরমালিটিস শেষ করে। পরেরদিন রশিদের জামিনের পর তাকে মারুফের বাসায় পাঠিয়ে দেবে, উকিলের এমন আশ্বাসে মারুফ এবং ঈশিতা বাড়ি চলে যায়।



পরের দিন অফিসের কাজে ব্যস্ত মারুফ। সকাল থেকে রুবিতার ফোনের পর ফোন এবং রশিদ এবং রশিদের মা’কে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। একটুও বিরক্ত নয় মারুফ। রশিদ এবং সেতারাকে নিয়ে রুবিতার শত প্রশ্নে মারুফের ঘুরে ফিরে উত্তর একটাই, “অপেক্ষা কর আরো কয়েকদিন, উত্তর তুই নিজেই পেয়ে যাবি।” কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় পর্যন্ত উকিলের ফোন না পেয়ে মারুফ একটু চিন্তিত হয়। বাড়ির উদ্দেশ্যে গাড়িতে যাচ্ছে মারুফ, পথিমধ্যে উকিলের ফোন। গাড়ি ঘুরিয়ে থানা থেকে রশিদকে তুলে বাড়ি নিয়ে যায় সে। গাড়িতে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যায়নি মারুফ। বাড়িতে পৌঁছে প্রথমে ড্রাইভারকে তার রুমে রশিদকে থাকার ব্যবস্থা করতে বলে এবং কাজের মেয়ে আমেনাকে বলে রশিদকে খাবার দিতে। ঈশিতা মারুফের পুরনো কাপড় পাঠিয়ে দেয় রশিদের জন্য। রশিদের এই ছোট জীবনে এমন আপ্যায়ন কখনো ঘটেনি। এক ধরনের আনন্দ এবং ভয় দু’টোই কাজ করছে তার মনের মধ্যে। নিজেকে এক প্রকার অপরাধী ভাবতে শুরু করে সে। আবার একটু স্বস্তিও পাচ্ছে থানা থেকে বেড় হতে পেড়ে। সে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এমন সময় রাতের খাবার শেষে ঈশিতা এবং মারুফ লিভিং রুমে বসে রশিদকে ডেকে পাঠায়। রশিদ লিভিং রুমে এসে নিচে বসতে গেলে মারুফ সোফার পাশে একটা চেয়ার দেখিয়ে ওখানে বসতে বলে।

মারুফঃ পেট ভরে খেয়েছিস তো?

রশিদঃ খাইছি, স্যার।

মারুফঃ স্কুলে কোন ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছিস?

রশিদঃ ক্লাশ নাইন পর্যন্ত।

মারুফঃ পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছিস কেন?

রশিদঃ মায়ের সাথে ঢাকা আওয়েনের পর আর পড়তে পারি নাই।

মারুফঃ ঢাকার মানুষ কি পড়ে না। এখানেও তো পড়ার সুযোগ ছিলো। স্কুলে ভর্তি হয়েছিলি?

রশিদঃ না, স্যার। স্কুলে ভর্তি হইতে পারি নাই। মায়ের কাছে তখন স্কুলে ভর্তি করার টাকা আছিলো না।

মারুফঃ তুই আর তোর মা ঢাকা আসলি কেন?

রশিদঃ বাবা রিক্সা চালাইতো আর মা এক বাড়িতে কাজ করতো। আমরা ভালোই আছিলাম। হঠাৎ বাবা একদিন আর একটা বিয়া কইরা নতুন বউ নিয়া বাড়ি আসে। সেইদিন থেইক্যা বাড়িতে কেবল ঝগড়া হয়। মাঝে মাঝে বাবা মা’কে মাইড় দইড়ও করে। তখন আমার স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষা, সকালে মা ডিম ভাইজ্জা আমারে ভাত খাইতে দেয়। তখন আমার ছোট মা, আমার জন্যে মায়ের ডিম ভাজা নিয়া ঝগড়া শুরু করে। ঝগড়ার মধ্যেও মা আমারে পরীক্ষা দিতে পাঠায়। পরীক্ষা শেষে আমি বাড়ি ফিইরা দেখি মা’র কপাল থেকে রক্ত পড়ছে। হাতে কালা কালা মাইড়ের দাগ। ঐ দিন আমি মা’রে লইয়া মামু বাড়ি যাই। নানা নানি নাই। মামুও নড়তে চলতে পারে না। মামি আর মামাতো ভাই বোনেরই কষ্ট। এরমধ্যে আমাগো যাওয়া ঠিক হয় নাই ভাইব্বা। মা গার্মেন্টসে কাজ করতে চায়। একদিন মামু বাড়ির একজন লোকের সাথে আমি আর মা ঢাকা আই।

মারুফঃ ঢাকাতে তোরা কতদিন?

রশিদঃ তিন, সাড়ে তিন বছরতো হইবো।

ঈশিতাঃ তোর মা যে হাসপাতালে জানিস?

রশিদঃ জানি। সব জানি।

মারুফঃ সব আবার কি জানিস?

রশিদঃ আমি আপার ব্যাগ ছিনতাই করছি কিন্তু আপনারা আমার মা’কে বাঁচাইয়া রাখছেন আবার আমারেও থানা থেইক্যা ছাড়াইয়া আনছেন।

মারুফঃ কে বল্লো তোকে এসব?

রশিদঃ পুলিশ অফিসার।

মারুফঃ আর কি বলেছে?

রশিদঃ আর কিছু বলে নাই।

ঈশিতাঃ তুই এই কাজটি করছিস কেন?

রশিদঃ মা’য়ের কষ্ট কমানোর জন্য আমি কাজ করতে চাইলে। একদিন বস্তির এক বড় ভাই কাজের জন্য আমারে তার সাথে নিয়ে যায়। তার ওস্তাদের সাথে পরিচয় করাইয়া দেয়। প্রথম ছয় মাস ওস্তাদের চা পানি আনার কাজ করছি। তারপর ছয় মাস দূরে দূরে থাইক্কা পুলিশ অবজারভ করছি যাতে দলের সবাই শান্তিতে কাজ করতে পারে। গত ছয় মাস ধইরা আমি ছিনতাই এবং পকেট মাইরের কাজ শুরু করছি।

ঈশিতাঃ এই কাজ করতে তোর খারাপ লাগে না?

রশিদঃ লাগে আপা। কিন্তু কি করমু?

ঈশিতাঃ তোর মায়ের গার্মেন্টসেও তো কাজ করতে পারতি?

রশিদঃ মা চাইছিলো। কেন জানি মায়ের সাথে কাজ করতে মন চাইছিলো না।

মারুফঃ এখন যদি তোকে অন্য কোন ভালো কাজ দেয়া হয়। সেই কাজ কি করবি?

রশিদঃ ভালো কাজ পাইলে করমু।

মারুফঃ তোর দলের সবাইকে ছেড়ে আসতে পারবি?

রশিদঃ তারা খোঁজার চেষ্টা করবে। না পাইলে আমি বাইচ্চা গেলাম। আর পাইলে আমারে কচু কাটা করবে।

মারুফঃ তার মানে ঐ বস্তিতে যাওয়া তোর জন্য বিপদ?

রশিদঃ হ্‌, স্যার। পুলিশ মনে হয় তাগো খুঁইজ্জা পায় নাই। তারা পলাইছে। কয়দিন পর সবাই আবার একই কাজ করবে। আবার কেউ নতুন কইররা ধরা পড়লে পুলিশ আবার নতুন কইররা খোঁজবে।

মারুফঃ তোর মা হাসপাতাল থেকে দু-এক দিনের মধ্যে ছাড়া পাবে। তার অবস্থা খারাপ। তুই এখন কি করবি? তোর মায়ের দেখাশোনা করবে কে?

রশিদঃ বস্তিতে এহনই আমার যাওয়া ঠিক হইবে না। গেলে দলের সবাই আমারে জিগাইবে আমি কেমনে ছাড়া পাইলাম। আমাগো পাশের ঘরের তাসলিমা খালা মা’র বান্ধবী। সে অনেক ভালো মানুষ। আমি তারে খবর দিতে পারি।

মারুফঃ ঠিক আছে। এখন ঘুমাতে যা। কাল সকালে আমি ঢাকার বাইরে যাবো কিছু কাজে। তুইও আমার সাথে যাবি।

রশিদঃ ঠিক আছে স্যার।



রশিদ লিভিং রুম থেকে বেড় হয়ে চলে যায় ড্রাইভারের রুমে। মারুফ ঈশিতাকে বিনিতভাবে রশিদ এবং সেতারাকে তাদের বিশেষ প্রজেক্টে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবছে বলে জানায়। ঈশিতা নিজেও এমনটি চাইছে শুনে মারুফ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এদিকে রশিদের মনে মারুফ এবং ঈশিতার অমায়িক ব্যবহার নিয়ে দানা বাঁধে এক কোটি প্রশ্ন। ড্রাইভারের সাথে কথায় কথায় জেনে নিতে চায় মারুফ এবং ঈশিতা সম্পর্কে কিন্তু কোন কিছুতেই কাজ হয় না বরং রশিদের মধ্যে আরো নতুন নতুন প্রশ্ন জন্ম নিতে থাকে। এভাবে কেঁটে যায় তার না ঘুমানো সারারাত। পরের দিন সকালে মারুফ রশিদকে নিয়ে ঢাকার বাইরে যায় এবং রশিদকে সেখানে রেখে আসে। তারও চারদিন পরে রশিদের মা হাসপাতাল থেকে রিলিজ পায়। মারুফ তার ড্রাইভারকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে দেয় সেতারাকে তার ছেলে রশিদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য।



প্রায় তিন সপ্তাহ পরে রুবিতা এবং ঈশিতাকে নিয়ে একদিন মারুফ তার নিজের পৈত্রিক বাড়ি কুমিল্লা যাওয়ার প্লান করে। প্লান অনুযায়ী ঐ দিন খুব সকালেই রওয়ানা হয় তারা। দুপুরের আগেই গ্রামে পৌঁছে যায় তারা। ঈশিতা এবং এতদিন পরে রুবিতাকে দেখে বৃদ্ধ আলী চাচা খুশিতে কেঁদে ফেলে। ছেলে রায়হান কত বড় হয়েছে, রুপম কেমন আছে এমন অনেক প্রশ্নে আগলে রাখে রুবিতাকে। আলী চাচা জন্মথেকেই বংশানুক্রমে মারুফদের গ্রামের বাড়ির কেয়ার টেকার। মারুফের দাদার জীবনকালে জমিজমা দেখাশুনা এবং চাষাবাদ করতো আলি চাচার বাবা। মারুফের পিতা গ্রাম ছেড়ে ঢাকা থাকায় আলী চাচার বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি পরিচর্যা করার দায়িত্ব দেয় এবং সেই থেকেই আলী চাচা ঐ বাড়িতে বাস করছে এবং বর্তমানে মারুফদের গ্রামের বাড়ির সব দেখাশোনা, হিসাব নিকাশ সেই রাখে, যখন যা কিছু দরকার নিজের মতো করেই করে, সে নিয়ে মারুফ অথবা তার পরিবারের কারো অভিযোগ নেই। আজও মারুফ তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসবে জেনে সে আগে থেকেই খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছে। আলী চাচার আপ্যায়নে যতটা মুগ্ধ রুবিতা তার থেকেও বেশী মুগ্ধ হয়েছে বাড়ির চারিপাশ পরিস্কার পরিছন্ন দেখে। খাবার শেষে আলী চাচা সহ সবাই মারুফদের জমি এবং বিভিন্ন প্রজেক্ট দেখতে বেড় হয়। মাছের প্রজেক্ট, মুরগীর ফার্ম এবং বাজারের দোকানগুলো ঘুরে মারুফ সবাইকে একটি বিশেষ প্রজেক্ট দেখাবে বলে কিছুটা দুরের আর একটি গ্রামে নিয়ে যায়। গ্রামে প্রবেশ মাত্রই রুবিতা নতুন কিছু দেখার ইচ্ছায় এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে। যতই গ্রামের ভিতরে যায় রুবিতা’র চোখে পরে গাছগাছালীতে ঘেরা আর দশটা গ্রামের মতোই একটি গ্রামঃ দশ বারোটি টিনের ঘর, ঘাট বাঁধানো পুকুর, গরুর গোয়াল ঘর, মুরগীর খামার, বাচ্চাদের খেলার মাঠ ইত্যাদি বিষয়গুলো। গাড়ির জানালার গ্লাস নামানো থাকাতে সবাই সালাম দিচ্ছে, আলী চাচা এবং মারুফ খুব সুন্দরভাবে তাদের সালামের উত্তর দিচ্ছে এবং কুশলাদি আদান প্রদান করছে। রুবিতা এর মধ্যে কোন বিশেষত্ব না পেয়ে বন্ধুর সাথে ঠাট্টা করে প্রশ্ন করে, “কোথায় তোর বিশেষ প্রজেক্ট? এখানে বিশেষ বলে তো কিছু দেখছি না।” মারুফও ঠাট্টা করে রুবিতাকে বলে, “বিশেষ কোন কিছু ছাড়াই এটা আমার বিশেষ প্রেজেক্ট।” মারুফ গাড়ি পার্ক করে। সবাই গাড়ি থেকে নেমে পুকুর ঘাটে বসে। আলী চাচা আগেই সবাইকে খবর দিয়ে রেখেছিলো যে আজ মারুফ আসবে। প্রায় ১৫ -১৬ জন নারী এবং পুরুষ তাদের বাচ্চাদের সহ পুকুর ঘাটে জড়ো হয়। ঈশিতাও একে একে সবাইকে কুশলাদি জিঙ্গাসা করে, তাদের বাচ্চাদের খবর নেয়। দু’জন আবার হাতে করে দু’টো চেয়ার নিয়ে আসে এবং মারুফ এবং ঈশিতাকে বসার জন্য অনুরোধ করে। রুবিতাকে দেখে একজন দৌঁড়ে গিয়ে আরো একটা চেয়ার নিয়ে আসে। রুবিতা খুব আশ্চর্য হয় ঈশিতাকে এই প্রথম গ্রামের মানুষদের সাথে মিশে গিয়ে গল্প করতে দেখে, ভালোও লাগে তার ঈশিতার এই বিষয়; নতুন করে চিনে নেয় বোন ঈশিতাকে। কথোপকথন হচ্ছে একে অপরের সাথেঃ

মারুফঃ আলী চাচা, রশিদ এবং তার মা’কে দেখছিনা যে।

আলীঃ আসবে। রশিদের মা’র আজকে হাসপাতাল আছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে সকালে রশিদ আমার সাথে দেখা করে গেছে। পথে হয়তো দেরী হচ্ছে।

ঈশিতাঃ আপু, সৎ কিছু মানুষদের থাকার জন্য মারুফ এই গ্রামে কিছু ঘর তৈরী করে দিয়েছে।

আলীঃ শুধু ঘরই করে দেয় নাই মারুফ বাবা। সবার কাজের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে।

ঈশিতাঃ এই যে দেখছো রাহেলা’র পরিবার। আসার পথে মুরগীর খামার দেখেছো ওটা তার। দশ গ্রাম পরে অন্য আর একটি গ্রামে থাকতো ওরা। রাহেলা’র স্বামী অভাবের কারণে বিভিন্ন গ্রামে চুরি করতো। তাতে ছিলো রাহেলার প্রচন্ড আপত্তি। স্বামীর চুরির প্রতিবাদ জানাতে রাহেলা চুরি করা সামগ্রী বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছে, স্বামীর সংসার ফেলে বাবার বাড়ি গিয়েছে। সন্তানদের ভালো পরিবেশে বড় করার ইচ্ছায় সন্তানদের অন্য কোথাও নিয়ে পালিয়ে যাবে এমন ভয়ও দেখিয়েছে। কিন্তু ওর স্বামী চুরি থামায়নি। একদিন রাতে স্বামী চুরি করে বাড়ি ফিরলে চুরির সামগ্রী নিয়ে রাহেলা থানায় যায়। পুলিশের কাছে তার স্বামীর পূর্বের সব চুরির কথা বলে দেয়। পুলিশ এসে রাহেলার স্বামীকে গ্রেফতার করে। তার বিচার হয় এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড। তখন রাহেলা একা পরিবারের সকল দায়িত্ব নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলো। মানুষের বাড়ি কাজ করে যা পেতো তা দিয়ে তিন সন্তানের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতো না তার। তাই তার একমাত্র সম্ভল বাড়ি বন্ধক রাখে গ্রামের মেম্বারের কাছে। একদিন মেম্বার জমির মালিকানা নিয়ে বাড়ি থেকে বেড় করে দেয় রাহেলাকে। সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি থাকলেও ১০ বছরের ছেলেকে কাজে দেয়ার জন্য বাজারে আলী চাচার কাছে আসে। আলী চাচা এত ছোট ছেলেকে কাজে দেয়ার কারণ জানতে চাইলে রাহেলা সব খুলে বলে। ঐ দিন মারুফ গ্রামে ছিলো। মারুফ আলী চাচার কাছে সব শুনে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে সৎ মানুষদের জন্য কিছু করবে। প্রথম একটি ঘর তৈরী করে রাহেলাকে ঐ ঘরে থাকতে দেয় এবং একটি মুরগীর খামার করে দেয়। ওর ছেলে মেয়েরা আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করে। তারও প্রায় চার মাস পরে যখন রাহেলার স্বামী ছাড়া পায়। তখন মারুফ তাকে বাড়িতে আসার আগে লিখিত শর্ত দেয় যে সে আর চুরি করতে পারবে না। স্ত্রী রাহেলার মুরগীর খামারে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আলী চাচার কাজ করবে। এখন রাহেলার ছেলে পড়া শেষ করে একটা স্কুলে চাকরি করে।



আলীঃ এই যে দেখছো সখিনা। গাজীপুরের এক গ্রামে বড় হয়েছে সে। পাঁচ ছয় বছর আগের কথা। ওর তখন বিয়ে হয়নি। ছোটবেলা থেকে সে জানতো তার বাবা ঢাকা চাকরী করে এবং মাসে দুইবার গ্রামের বাড়ি আসে কিন্তু ভাইটা বন্ধুদের পাল্লায় মাস্তানী করে বেড়ায়। স্কুল শেষে সখিনা কলেজে ভর্তি হয়েছিলো; কিন্ত ভাইয়ের কৃতকর্মে সমাজে মুখ দেখাতে পারতো না সে। ছোট বোন হয়েও অনেক চেষ্টা করেছিলো ভাইকে বোঝাতে যে মানুষ মাস্তানী ঘৃণা করে। ভাইয়ের অন্যায় সহ্য করেই বড় হয়েছে সে। হঠাৎ একদিন তার ভাই এসে বল্লো যে সে ঢাকা চাকরী পেয়েছে। বোন সখিনা খুশী হয় এই ভেবে যে ভাই এবার ভালো হয়ে যাবে। কয়েক মাস পরে একদিন ভাইয়ের অনুরোধে নিজের বান্ধবীকে ঢাকায় কাজের ব্যবস্থা করে দেবে বলে ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। একদিন সকালে তার বান্ধবীকে ভাইয়ের সাথে বাসে করে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়। তারও বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে বাবা এবং ভাই বাড়ি বেড়াতে আসে একত্রে। বান্ধবী কেমন আছে জানতে চাইলে তারা সখিনাকে জানায় যে সে অনেক ভালো আছে এবং আরো মেয়েদের চাকরী দেয়ার সুযোগ আছে এবং আরো কিছু মেয়েকে চাকরী দিয়ে সাহায্য করতে চায় তারা। সখিনা নিজেই ভাইয়ের সাথে চাকরী করতে চাইলে ভাই তাকে বেশী করে পড়ার জন্য অনুরোধ করে। এক পর্যায়ে সখিনা তার আরো দুই বান্ধবীর সাথে ভাইয়ের যোগাযোগ করিয়ে দেয়। আরো দুই বান্ধবীকে যেদিন ভাইয়ের সাথে ঢাকার বাসে তুলে দেয় সেদিন সে একটা চিঠি একজন বান্ধবীর হাতে দিয়ে তার অন্য বান্ধবীকে দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে একদিন বেনামী একটা চিঠি আসে সখিনার কাছে। চিঠি পড়ে সখিনা মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। কঠিন সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে শিখেছে সখিনা তাই খুব শীতল মেজাজে সে বান্ধবীর লেখা চিঠির বর্ণনায় তার মা’কে তার ভাই এবং বাবার পতিতালয়ের দালালী কাজের বর্ণনা করে। সখিনা সেদিন যদিও খুব স্থীরভাবে কাজ শুরু করেছিলো কিন্তু আশ্চর্য্য হয় জেনে যে তার মা সবসময়ই জানতো তার স্বামী এবং ছেলের কাজ সম্পর্কে কিন্তু কিছুই বলতো না; নিজের সংসার ভেঙ্গে যাবে এই ভয়ে। সখিনা মনের মধ্যে একপ্রকার উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মতো জ্বলন্ত ঘৃণা নিয়ে পরের দিন সকালে থানায় যায় বান্ধবীর লেখা চিঠি নিয়ে এবং ভাই ও বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে। কিছুদিনের মধ্যে সখিনার বাবা ধরা পড়ে কিন্তু পলাতক ভাই বিভিন্নভাবে বোনকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য অনুরোধ করে। সখিনা মামলা তুলতে রাজী না হলে এসিড মারার হুমকি সহ অনেক ধরণের যন্ত্রনা শুরু করে। সখিনা আবার থানায় আসে এবং হুমকির জন্য ভাইয়ের বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা করে। যেদিন সখিনা দ্বিতীয়বার মামলা করতে থানায় যায় সেদিন মারুফ তার অফিসের কোন কাজে ঐ থানায় ডিজি’র জন্য অপেক্ষা করছিলো। মারুফ পাশের রুমে বসা খেয়াল না করেই সখিনা নিজের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কথা বলছিলো পুলিশ অফিসারের সাথে। সব শুনে মারুফ ডিজিকে সখিনা’র নিরাপত্তার কথা জিঙ্গাসা করে এবং নিজের প্রজেক্টের কথা বলে। সে ডিজিকে আরো বলে যে সে সখিনার মতো মানুষদের সাহায্য করতে চায়। সখিনার খুব বেশী প্রয়োজন হলে তাকে খবর দেয়ার জন্য অনুরোধ করে সেদিন মারুফ ফিরে আসে। মাস দু’য়েক পরে একদিন ঐ থানার ডিজি মারুফকে ফোন করে এবং সখিনার দিনে দিনে ঘনীভূত বিপদের কথা বলে। এক পর্যায়ে থানার ডিজির অনুমতিতে মারুফ সখিনাকে কয়েকদিনের নিরাপত্তার জন্য বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এবং আমাকে অনুরোধ করে তোমার চাচীর কাছে কিছুদিন রাখার জন্য। কয়েক মাস পরে মারুফ সখিনার সাথে পরামর্শ করে গ্রামে আলাদা ঘর তুলে দেয় তাকে, সাথে একটি সেলাই মেশিন এবং গ্রামের হাটে ছোট একটি দোকান। যেখানে এখন গ্রামের সকল মহিলারা তাদের কাপড় বানায়। এটাই বাজারে একমাত্র মহিলাদের দর্জির দোকান। মাত্র কয়েক মাস আগে আমাদের গ্রামের এক ছেলের সাথে বিয়ে হয় তার।


যুবায়েরঃ আমি যুবায়ের। বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমার জন্ম। ছোট বেলা থেকে ঢাকায় বড় হয়েছি। আমার বাবা খুব ধার্মীক ছিলো এবং জামাতকে অনুসরণ করতো। মাসে একবার মিলাদ হতো আমাদের বাসায়। আমাদের সবাইকে থাকতে হতো সেই মিলাদে। মিলাদ শেষে দেশের পলিটিক্স নিয়ে আলোচনা হোত। ভালো লাগতো না সেই সব আলোচনা। রাজিনীতিতে আগ্রহ না থাকায় দূরে সরে থাকতাম। মনে মনে চিন্তা করতাম পড়ালেখা কবে শেষ হবে এবং ছোট চাকরী নিয়ে হলেও বাড়ি থেকে কবে পালাবো? ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার যাবো। বাবাকে বলার সাথে সাথে বাবা খুব খুশী হয়। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী সে বিশ্বস্ত কাউকে খুঁজছিলো একটি ব্যাগ তার একজন বন্ধুকে দিতে হবে বলে। বাবার ব্যাগ বাবার বন্ধুকে দেবো এতে আমিও খুশি হই। যেদিন যাবো সেদিন সে একটি তালাবদ্ধ ব্যাগ এবং চট্রগ্রামের ঠিকানা লেখা একটি কাগজ হাতে ধরিয়ে দিলো। চিটাগাং পৌঁছে সব বন্ধুরা কক্সবাজারের হোটেলের উদ্দেশ্যে চলে গেলেও বাবার পরামর্শ অনুযায়ী প্রথমে আমি একা বাবার বন্ধুর বাসায় যাই। গিয়ে দেখি সেখানে পুলিশ সহ অনেক মানুষের ভিড়। আমি বরাবরই পুলিশ ভয় পাই, তাই বাড়িতে না ঢুকে ফিরে যাবো বলে পিছনে হাঁটতে শুরু করি। কিন্তু হঠাৎ মনে একটি সন্দেহ উঁকি দেয়, আর সেই সন্দেহের কারণে পাশের একটি দোকানে গিয়ে এক কাপ চা নিয়ে বসি। চা খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম ঐ দোকানের উপস্থিত সকল ক্রেতাদের একই উদ্দেশ্য যে ঐ বাড়িতে এত পুলিশের ভিড় হওয়ার কারণ জানা। এক পর্যায়ে আমিও তাদের সাথে মিশে গেলাম এবং আরাম করে সবার সাথে বসে ইনফরমেশন নিতে শুরু করলাম। একজন মাঝ বয়সী লোক গরম গরম খবর নিয়ে আসলো যে গতকাল শেষ রাতে বোমা বানানোর সময় ওদের হাতে বোমা বিস্ফোরণ হয়ে একজন গুরুতর আহত হয়। এই কথা শোনা মাত্রই আমার হাতের ব্যাগ নিয়ে আমার মনে নতুন করে আর এক সন্দেহ জন্ম নেয়, সাথে সাথে বেড়িয়ে পড়ি চায়ের দোকান থেকে। একটি রিক্সা নিয়ে বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর একা একা আরো বেশ কিছুটা পথ হাঁটলাম এবং অবশেষে একটি নীরব পাহাড়ি এলাকায় একটি গাছের নিচে বসলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে চারপাশে কেউ নেই দেখে ব্যাগের তালা ভেঙ্গে ফেলি। ব্যাগ খুলে আমি বেশ কিছু টাকা এবং বাবার লেখা একটি চিঠি পাই। যে চিঠিতে বাবা তার বন্ধুকে লিখেছিলো, “এটা পরবর্তী প্রজেক্টের মালামালের অগ্রিম। তোমার কথা অনুযায়ী আমার ছেলেকেই পাঠালাম। দেখো ওর যেন কিছু না হয়। ছেলে আমার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না। খুব সবধানে ওকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একবার এই কাজে জড়িয়ে গেলে আমার সম্পর্কে জানলে অসুবিধা নেই। ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ”। এই চার লাইনের একটি চিঠি আমার নিজের মনের সন্দেহকে সঠিক বলে প্রমানিত করে। আমি সেখান থেকে আর হোটেলে না গিয়ে সরাসরি ফিরে যাই ঢাকা। এতগুলো টাকা নিয়ে বাড়ি না গিয়ে হোটেলে উঠি। পেপার কিনে চাকরির বিঞ্জপ্তি খুঁজি। তখন স্কোয়ারের একটি নিয়োগ বিঞ্জপ্তি দেখে আবেদন করি। ইন্টারভিউ ডেট আসার আগেই অফিসে যাই। কেউ আমার সাথে চাকরির ব্যাপারে অগ্রিম কথা বলবেনা বলে যখন রিসেপশনিস্ট আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলো ঠিক তখন অফিসে আসেন মারুফ স্যার। তিনি রিসেপশনিস্টের কাছে জানতে চাইলেন, আমি কি চাই? আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে কেন?। রিসেপশনিস্ট সব বলায় আমাকে তার রুমে ১০ মিনিট পরে পাঠাতে বললেন। আমি ১০ মিনিট পরে স্যারেরে রুমে যাই এবং এক পর্যায়ে ইন্টারভিউ ডেইটের আগে চাকরীর জন্য অনুরোধে নিয়ে আসার কারণ খুলে বলি। আমার সব কথা শুনে স্যার আমাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন তবে একটি শর্তে। শর্তটি এমনই ছিলো যে আমাকে পুলিশের কাছে সব বলতে হবে এবং টাকাগুলো পুলিশের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। আমি তার শর্তে রাজি হলাম ঠিকই কিন্তু জীবনের নিরাপত্তা চাইলাম। তখন তিনি বললেন তবে ঢাকা নয় উন্নত গ্রামে ভালো কাজসহ নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দিবেন তিনি। আমি শান্তিতে থাকতে চাই তাই রাজি হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে একটি থাকার ঘর দিলেন, বাজারে একটি কাপড়ের দোকান করে দিলেন। এখন আমি বিয়ে করেছি। আমার এক ছেলে এক মেয়ে।



রুবিতাঃ মারুফ এবং ঈশিতা, এত দিন ধরে এতো কিছু! আমি জানিনা কিভাবে?

ঈশিতাঃ তোমার না জানার দুটো কারণ, প্রথমত তুমি অনেক বছর দেশে নেই, মাঝে যখন দু’বার আসলে দুলাভাইকে নিয়ে ব্যস্ততার কারণে আমাদের গ্রামে আসা হয়নি তোমার। তারপরে এখানের সবার নিরাপত্তার ব্যাপারটা চিন্তা করে আমরা কাউকে বলিনা। আর সর্বশেষ কারণ মারুফ মনে করে, “কাউকে তার প্রয়োজনে সাহায্য করে সেগুলো বলে বেড়ানোর কিছু নেই। বরং নীরবে থেকে লোকটির মঙ্গল কামনাই উত্তম।”

রুবিতাঃ হুম, বুঝলাম মারুফ বলতে চায় না। তুই তো আমাকে একবার বলতে পারতি। ললিতাও তো কখনো বলেনি।

ঈশিতাঃ মেঝ আপু এ বিষয়ে তেমন কিছু জানেনা। আর তুমি তো মারুফকে জানো।

রুবিতাঃ মারুফকে জানি, তবে আজ থেকে ওঁকে আমি স্যালুট করি।



এরই মধ্যে রশিদ এবং সেতারা বেগম সালাম দিয়ে প্রবেশ করে।সালাম বিনিময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেতারা বেগম মারুফকে উদ্দেশ্য করে ভেজা কন্ঠে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়ঃ

সেতারাঃ স্যার আপনে একজন দেবতা। আল্লাহ আপনার ভালো করুক।

মারুফঃ তুমি এখন কেমন আছো সেতারা বেগম? ডাক্তার কি বলেছে?

সেতারাঃ ভালো আছি। ডাক্তার বলেছে সব ঠিক আছে, আর হাসপাতালে যাওয়া লাগবেনা।

মারুফঃ তোমার কোন অসুবিধা হয় না তো এখানে?

সেতারাঃ না স্যার। আমি অনেক ভালো আছি। রশিদও অনেক খুশী।

মারুফঃ কি খবর রশিদ? কথা বলছিস না যে?

রশিদঃ স্যার, আমার জীবনে আপনার মতো এমন কেউ আমারে ভালোবাসে নাই। আপনে একজন ভালো মানুষ।

মারুফঃ আমার গুণ না গেয়ে, বল তোর কাজের কতদূর?

রশিদঃ থাকার ঘর উঠানো শেষ। দোকান পরিস্কারও শেষ। আলী চাচার সাথে গিয়া মালের অর্ডার দিয়া আইছি। আরো দুই দিন লাগবে সব মালামাল আসতে। পরের শুক্রবার থেইক্কা দোকান চালু করার ইচ্ছা।

মারুফঃ ভালো। চারিদিকে খেয়াল রাখিস। যে কোন প্রয়োজনে আলী চাচাতো আছেই।

রুবিতাঃ আলী চাচা এখানে মোট কতটা বাড়ি আছে?

আলীঃ এখানে নয়টা বাড়ি ছিলো এতদিন। এখন দশটা হোল।

মারুফঃ আজ এখানেই শেষ করি। চলো বাড়ি যাবো সেখানে আমার আবার আলী চাচার সাথে কিছু কাজ আছে। তারপরে ঢাকা যেতে হবে। রাস্তায় দেখলাম বিকেলে সমাবেশ আছে। আজ ঢাকা যেতে সময় লাগবে বেশ।

ঈশিতাঃ তার আগে আপুকে জাহানারাকে দেখাতে চাই।

মারুফঃ ঠিক আছে, চলো। আমিও অনেক দিন ওকে দেখিনা।



সবার থেকে বিদায় নিয়ে তারা ঐ গ্রামেরই একটি বাড়িতে যায়। বাড়িতে প্রবেশ মাত্রই রুবিতা লক্ষ্য করে একজন মধ্য বয়সী মহিলা যার দু’টো পা নেই, বাড়ির বারান্দায় পাটিতে বসে কাঁথা সেলাই করছে। দেখা মাত্র সে অস্পষ্ট কন্ঠে সালাম দেয় সবাইকে। ফুলি বলে ডাকতে থাকে দুই-তিন বার এবং চেয়ার দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু মারুফ সরাসরি সামনে গিয়ে তার পাশে পাটিতে বসে। তাতে সে খুব খুশী হয়। তবে সবার জন্য সে চেয়ার দিতে বলে আবার ফুলিকে। বাড়ির মধ্য থেকে ফুলের মতো সুন্দর একটি ছোট মেয়ে বেড়িয়ে আসে হাতে তার থেকে বড় চেয়ার নিয়ে। আলী চাচা মেয়েটিকে সাহায্য করে চেয়ার আনতে।

মারুফঃ তুমি কেমন আছো?

জাহানারাঃ আমি ভালো আছি। তোমারে আর ভাবীরে দেখলে আমি খুশীতে পাগল হইয়া যাই।

ঈশিতাঃ কালীদাস কই? আজ দেখলাম না যে?

জাহানারাঃ আইজ মাছ ধরছে। মাছ লইয়া বড় হাটে গ্যাছে। মনে হয় বেচা হয় নাই এহনও।

মারুফঃ জাহানারা, এই হচ্ছে ঈশিতার বড় বোন রুবিতা। আমেরিকা থেকে তোমাকে দেখতে এসেছে।

জাহানারাঃ তোমরা সবাই অনেক ভালো।

আলীঃ জাহানারা তোর মনে আছে? মারুফ বাবা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে বাড়ি আসতো। তখন কিন্তু রুবিতাও কয়েকবার এসেছিলো।

জাহানারাঃ এক্সিডেন্টে সব ভুইল্লা গেছি চাচা।

ঈশিতাঃ জাহানারা হচ্ছে আলী চাচার চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। স্কুলে যাবার সময় একদিন বাস এক্সিডেন্টে দু’টো পা হারায় এবং তখন থেকেই সে আর স্পর্ষ্ট করে কথা বলতে পারে না। গরীব বাবার পঙ্গু মেয়ে কেউ বিয়ে করে না। একদিন জাহানারা’র বাবা মারা যায়। মা একা অন্যান্য ছেলেদের সাথে বাড়িতে থাকে ভাইয়েরা মায়ের দায়িত্ব নিলেও বোনের বোঝা নিতে চায় না। আলী চাচা জাহানারাকে তার বাড়ি নিয়ে আসে। সব সময় আমাদের পুকুরে মাছ ধরতে আসতো হিন্দু ছেলে কালীদাস। কালীদাস একদিন আলী চাচাকে প্রস্তাব দেয় যে সে ঐ অসহায় মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। কালীদাস হিন্দু বলে আলী চাচা প্রথমে রাজি হয় না। কিন্তু কালীদাস ধর্ম বিষয়কে তুচ্ছ করে দেয় এবং একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়। মারুফের নজরে আসে এই বিষয় এবং আগ্রহ নিয়ে কথা বলে কালীদাসের সাথে। কালীদাসের বিষয় ভালো লাগে মারুফের। মারুফ নিজে কালীদাসের বাড়ি যায় এবং কথা বলে ওর পরিবারের সাথে। কেউ এই বিয়েতে রাজি হয় না। মারুফ পারিবারিক বিষয়গুলো ভেবে কালীদাসকে ফিরিয়ে দেয়। এরপরে কালীদাস সরাসরি জাহানারার সাথে কথা বলে, জাহানারাও প্রথমে ভয় পায় এবং তাকে ফিরিয়ে দেয়। কালীদাস একদিন ঢাকা যায়, বস্তিতে ঘর নেয়, বাজারে মাছের ব্যবসায়ীদের সাথে কিছুদিন কাজও করে। দুইমাস পরে সে আবার আলী চাচার কাছে আসে জাহানারাকে বিয়ে করে ঢাকা নিয়ে যাবে বলে জানায়। আলী চাচা তখন নিজেই মারুফের সাথে কথা বলে পরামর্শ চায় এই বিষয়ে। মারুফ তখন নিজে ওদের বিয়ে দেয় এবং একটি বাড়ি এবং একটি পুকুর দিয়ে গ্রামের ছেলে গ্রামেই থাকতে সাহায্য করে। কালীদাস আসলেই জাহানারাকে খুব ভালোবাসে।



রুবিতাঃ আমি এক একটা কাহিনী শুনছি আর আজ তোদের সাথে এখানে আসার সার্থকতা রেটিং করছি। আমি নিশ্চিত বাকী পাঁচটা ফ্যামিলিও অনেক মূল্যবান কাহিনী বহন করছে। চেয়ার দিয়ে কোথায় পালালো ফুলি মেয়েটা?

আলীঃ ভিতরেই আছে। ওর বাপ বাড়ি না থাকলে সে খেলতে যায় না।

রুবিতাঃ ওকে একটু ডাকুন তো।

আলীঃ ফুলি। ও ফুলি। বাইরে আয় নানা ভাই।

ফুলিঃ নানা, আমি বই পড়ছি।

জাহানারাঃ ফুলি একটু আয়রে সোনা।

রুবিতাঃ তুমি কোন ক্লাশে পড়ো?

ফুলিঃ ফোরে।

রুবিতাঃ তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?

ফুলিঃ আমি ডাক্তার হইতে চাই। মায়ের পায়ে প্লাস্টিকের পা লাগাইতে চাই।

রুবিতাঃ তোমার মায়ের পায়ে যে প্লাস্টিকের পা লাগানো যায় তা তুমি কিভাবে জানো ?

ফুলিঃ বাবায় কইছে, ডাক্তার কইছে প্লাস্টিকের পাও লাগাইলে মা আবার হাঁটতে পারবে। কিন্তু অনেক টাকা লাগবে।

রুবিতাঃ তোমার মায়ের প্লাস্টিকের পা লাগানো হবে। তোমার বাবা বাড়ি আসলে আমাদের সাথে দেখা করতে বলবে।



মায়ের পা ঠিক হবে শুনে ফুলি খুব খুশী হয়। ফুলির হাসি খুশী মুখ ভালো লাগলো রুবিতার। আরো কিছুক্ষণ বসে ফুলি এবং জাহানারার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা। বাড়িতে আলী চাচার স্ত্রী অনেক ধরনের মাছ এবং হাঁসের মাংস সহ অনেক প্রকার বাগানের তাজা সবজী রান্না করে রেখেছে। এত প্রকার ফ্রেশ খাবার দেখে রুবিতা খুব খুশী। খেতে খেতে আলী চাচা বলে, “এই মাছ সকালে কালীদাস তার পুকুর থেকে ধরে দিয়ে যায়। শুধু তাই না আরো বড় তিনটা বড় মাছ দিয়ে যায়, ভেজে বাটিতে করে ঢাকা দিয়ে দেয়া জন্য।” খুব তৃপ্তি সহকারে সবাই খেয়ে একটু বিশ্রাম নেয়। আলী চাচা এবং মারুফ তাদের নিজেদের কাজ সেরে রওয়ানা হবে ঠিক তখন কালীদাস আসে। মারুফ রুবিতার সাথে কালীদাসের পরিচয় করিয়ে দেয়। রুবিতা কথায় কথায় কালিদাসকে জানায় যে সে জাহানারার চিকিৎসার জন্য যা কিছু করা দরকার সব সে করবে। তার এক বন্ধু আছে পঙ্গু হাসপাতালের সার্জন, ঢাকা গিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে তাকে জানাবে কখন কি করতে হবে। এমন কথা শুনে কালীদাসের চেহারা খুশীতে পরিবর্তন হয়ে যায়। কালীদাসের মনে এক পসরা খুশীর বৃষ্টি দিয়ে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে সবাই বেশ ক্লান্ত। তারপরেও গাড়িতে চা খেতে খেতে চলছিলো নিজেদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, হাসি ঠাট্টা। কিন্তু রুবিতা’র মাথায় স্থীর হয়ে বসে আছে মারুফের প্রজেক্ট। তাই সকল বিষয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার সেই একই বিষয় নিয়ে শুরু হয় তাদের আলোচনাঃ



রুবিতাঃ মারুফ তোর এই বিশেষ প্রজেক্টের খরচ কিভাবে চালাস?

মারুফঃ তুই তো আমার এবং আমার পরিবার সম্পর্কে সবই জানিস। তারপরেও আবার বলছি, “আমি কাস্টম অফিসার বাবার এক ছেলে। দুই বোন আছে তারা কখনোই গ্রামে আসে না। মা তো আগেই মারা গেছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর আইন অনুযায়ী বাবার সম্পত্তি আমাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। বোনেরা গ্রামের জমির পরিবর্তে ঢাকার এপার্টমেন্ট এবং জমি দাবী করে। আমি তাদের খুশী করতে নিজে ঢাকায় শুধু একটি বিল্ডিং রেখে সব তাদের দিয়ে দেই। গ্রামে আমাদের অনেক জমি। আমাদের একমাত্র ছেলে অনিক লন্ডনে পড়াশোনা করছে। আমি এবং ঈশিতা যে কাজ করি তাতে আমাদের খুব ভালোভাবে চলে যায়। বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়ে অনিকের পড়াশোনার খরচও হয়ে যায়। গ্রামের ফসলাদি, মাছ এবং মুরগীর খামার দিয়ে যা আসে তাতে জমিজমার ট্যাক্স দিয়ে যা বাকী থাকে তা থেকে পঞ্চাশ ভাগ ব্যাংকে রেখে দেই অবসর জীবনের জন্য এবং বাকী পঞ্চাশ ভাগ এই সব সামাজিক সেবার জন্য খরচ করি।



রুবিতাঃ আমি তোকে সেই ছাত্রজীবন থেকেই লক্ষ্য করেছি যে তুই মানুষের বিপদে সাহায্য করতে পছন্দ করিস। কিন্তু এতো বড় এবং এমন সেবা মূলক কাজের পিছনে বিশেষ কোন কারণ আছে তোর?

মারুফঃ আছে তো নিশ্চয়ই বন্ধু। আমার মায়ের অনিচ্ছা সত্তেও বাবা অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জন করতেন। মা খুব ঘৃণা করতেন বাবার ঐসব কাজ। আমার বোনদের চাহিদা ছিলো আকাশের মতো বিশাল তাই মা সারাক্ষণ তাদের বোঝাতেন। কিন্তু বাবা আমার বোনদের স্পয়েল করে ফেলেন। তাই কখনো কখনো মা বাবার সাথে কথা বলতেন না, আমার সাথে অন্য রুমে থাকতেন আর আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতেন। রাতে ঘুমানোর সময়ে আমাকে সৎ হতে স্বপ্ন দেখাতেন। যেহেতু মা প্রয়োজনের অধিক একটি টাকাও খরচ করতেন না তাই বাবার অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়ে শুধু জমির পর জমি কিনেছেন। উত্তারাধিকারী হিসেবে সেই সব জমির কিছু আমার নামে এখন। এগুলোর সঠিক ব্যবহার এবং মায়ের আত্মাকে শান্তি দেয়ার জন্য প্রথমে আমি আলী চাচার ছেলেদের বাড়ি করে দিয়েছি এবং আমার মাথায় আরো বিভিন্ন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছিলাম। ঠিক তখনই রাহেলাকে বিপদে দেখে তাকে আমি প্রথম আশ্রয় দেই। এরপর থেকে একে একে দশটি সৎ মানুষকে আমি বাসস্থান এবং কর্মস্থান করে দেই। প্রতিটি মানুষকে প্রথমে কেবলমাত্র কাজগুলো তাদের নিজেদের নামে করে দিয়েছি কিন্তু বাড়ির ব্যাপারে আমি ট্রাইল বেসিস দুই বছর দেখেছি তারপরে দলিল করে দিয়েছি।



রুবিতাঃ গুড। তোর ট্রাইল বেসিস দুই বছর ব্যাপারটা আমার ভালো লেগেছে। এভাবে আর কয়টা ফ্যামিলিকে তুই আশ্রয় দিতে পারবি? কর্মস্থান করে দিতে পারবি?

মারুফঃ আমি হয়তো আরো দশটা ফ্যামিলিকে সাহায্য করতে পারবো।

রুবিতাঃ তুই কি মনে করিস তোর এই সাহায্য পেয়ে মানুষগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে?

মারুফঃ এখন পর্যন্ত আমার উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভালো ফলাফল পেয়েছি। আমি সৎ কিছু মানুষদের কেবলমাত্র নিজের অপ্রয়োজনীয় সম্পত্তি দিয়ে সৎ থাকতে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এখানে মানুষগুলোর নৈতিকভাবে পরিবর্তন হওয়ার কিছু নেই। আমি মনে করি আমাদের দেশের বেশীর ভাগ মানুষ এখনও বিশ্বে অন্যান্য দেশের মানুষদের তুলনায় সৎ। এখন দেশে যে ক্রাইম দেখছো তা শুধু অভাবের কারণে, আমরা সবাই জানি আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছে যাদের প্রয়োজনের অধিক সম্পত্তি আছে, তারা যদি প্রত্যেকে অন্তত একজন অভাবি মানুষকে সাহায্য করে তবে ক্রাইম রেইট অনেক কমে যাবে। দেশ উন্নত হবে।



রুবিতাঃ হুম, আমিও তাই মনে করি। আমিও ভাবছিলাম অভাবী মানুষদের জন্য কিছু একটা করার কথা।

মারুফঃ তুই জাহানারার ব্যাপারটা শেষ করে আরও কিছু গরীব মানুষদের চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারিস। আমাদের দেশের চিকিৎসা বেশ ব্যয় বহুল। বেশির ভাগ গরীব মানুষ হাসপালে যেতে চায় না খরচের ভয়ে। একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অনেকেই শেষ সম্ভল বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।

রুবিতাঃ চিকিৎসায় সাহায্য! তাও ভালো আইডিয়া।

মারুফঃ একটা ফান্ড করে কেবলমাত্র বিশেষ ক্যাটাগরীর লোক সেই ফান্ডের সেবা গ্রহন করতে পারবে বলে উল্লেখ থাকবে।

রুবিতাঃ আমরা আজ যখন তোর প্রজেক্টের গ্রামে যাচ্ছিলাম,তখন “রুপালী আচল” লেখা একটি পাথর চোখে পড়ে আমার, ওটা কি?

ঈশিতাঃ ওখানে যারা থাকে তারা মনে করে ওটা একটা আলাদা গ্রাম। তারা সবাই মিলে তাদের গ্রামের নাম দিয়েছে রুপালী আঁচল।

রুবিতাঃ খুব সুন্দর এবং অর্থবহুল নাম তো।

মারুফঃ হুম! গ্রামের নাম রুপালী আঁচল কিন্তু গ্রামের মানুষগুলো আমার কাছে সোনার মতো মূল্যবান।

রুবিতাঃ আর তুই তো ডায়মন্ড!

মারুফঃ আর তুই? রুবি! আর একটি মূল্যবান পাথর আমাদের সমাজের।

ঈশিতাঃ হীরা, রুবি, পান্না যে পাথরের নামই বলো না কেন? আমার কাছে মানুষের সততা অনেক বেশী মূল্যবান। আমি মারুফের সাথে জীবন শুরু করেছি বলেই আজ আমি সততার মূল্য অনুভব করতে পেরেছি। কিছু সৎ মানুষদের ঘিরে আজ সৃষ্টি হয়েছে একটি রুপালী আঁচল গ্রাম। আমার কামনা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এমনইভাবে সৃষ্টি হবে অন্তত একটি করে “রুপালী আঁচল” নামের নতুন গ্রাম।



লেখক পরিচিতি
খুরশীদ শাম্মী
টরন্টো, অন্টারিও

পিরোজপুর শহরে এক কলেজ শিক্ষকের পরিবারে তাঁর জন্ম। বরিশাল শহরেই কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন। স্কুল বার্ষিকী এবং দেয়াল পত্রিকায় কবিতা এবং ছোট গল্প লেখা থেকেই শুরু হয় তাঁর লেখালেখির হাতেখড়ি। একটু আধটু করে এক পর্যায়ে তা পরিণত হয় অভ্যেসে। বরিশালের আঞ্চলিক পত্রিকায় ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা ক্যান্সারের উপর এক বিশেষ আর্টিকেল। শিক্ষার্থী জীবন শেষ করার আগেই দেশ ছেড়ে বিদেশ ভুইয়ে জীবন যুদ্ধে কেটে যায় তাঁর বেশ কিছুটা সময়। ইচ্ছা থাকলেও লেখা থেকে দূরে ছিলো অনেক বছর। সামাজিক মূল্যবোধ থেকেই ২০০৯ সাল থেকে সে আবার শুরু করে লেখালেখি। টরন্টোর স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা বেঙ্গলীটাইমস, বাংলা মেইলে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর লেখা। এছাড়াও স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা আজকাল এবং অটোয়া থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা আশ্রমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা। তিনি গান এবং কবিতা শুনতে যতটা পছন্দ করেন ঠিক ততটাই ভালোবাসেন অবসর সময়ে সৌখিন ফটোগ্রাফি করতে। বর্তমানে তিনি টরন্টোতে বসবাস করছেন।














কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন