শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

নীলাঞ্জন সৈয়দের গল্প : একটি কাল্পনিক কাহিনী


আমার মা হিন্দু ব্রাহ্মণ কন্যা ছিলেন।বাবা মুসলমান।ওঁদের আলাপ হয়েছিল একটি পার্টি অফিসে।বাবা পার্টির হোল টাইমার ছিলেন।পার্টি অফিসেই খেতেন, শুতেন ,ঘুমোতেন।কবীর বলে একটি ছেলে বাবার সঙ্গে মায়ের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন।মা সকাল বেলায় পার্টি অফিসে এসেছিলেন।বাবাতো চিনতেন না,মনে করেছিলেন কেউ সাহায্য চাইতে এসেছে।বাবা বললেন,'এখন তো মাত্র আট টা বাজে।দশটায় আসুন সবাই কে পাবেন।আমি ছাড়া কেউ নেইতো এখানে। 'মা হেসে বলেছিলেন ,'আমি তো আপনার কাছেই এসেছি।'মা শালোয়ার কামিজ পরেছিলেন ।



বাবা পরে আমায় বলেছিলেন,'তোর মা ধপধপে ফর্সা ছিল,আর সাজুগজু করে এসেছিল।আমি কি করে বুঝব ও একজন পার্টির মেম্বার।কবীর সেই সময় এসে পড়েছিল ,পুরো ব্যাপার টা মিটে গেছিল।'কবীর কাকু ওঁর বাড়িতেআমায় নিভৃতে বলেছিলেন,'তোর মা অসামান্যা মহিলা ছিল।দাদার সঙ্গে থাকত।বাড়িতে অভাব চলছে ,পড়াশুনো চালানোর জন্য অন্য বাড়িতে কাজ করতে হত।'এই পর্যন্ত বলে কবীর কাকু আমার দিকে তাকালেন,আমার কোন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা দেখতে।না আমার মনে কোনে রেখাপাত হয়নি।বাবা তো প্রথম থেকেই আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন কোন কাজই ছোট নয়।কবীর কাকু তারপর বললেন ,'দুঃখ কষ্টকে ঢাকার জন্যই তোর মা একটু সেজে গুজে থাকত।'মায়ের জন্য এবার আমার মন খারাপ করছে।

মা আমাকে সব কিছু দিয়ে আমায় আগলে রাখতেন।অভাব আমাদের নিত্য সঙ্গী ছিল।তবুও সব সময় মা হাসি মুখে থাকতেন।সকাল বেলায় উঠিয়ে আমাকে পড়াতেন ,'ছোট খোকা বলে অ আ ,শেখেনি সে কথা কওয়া ।আমার আধো আধো গলায় সবটা বেরোত না।মা শুনে হেসে কুটিপাট হতেন।আমার বাবা মাকে বিয়ে করে গ্রামের বাড়িতে চলে এলেন।সেখানে প্রাইভেট টিউশুনি পড়াতে শুরু করলেন।মা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হলেন।পার্টি মাথায় উঠল।মা বাবাকে বলে নিজের জন্য ছোট্ট একটি ঘর তৈরি করিয়েছিলেন।সেটা ছিল ঠাকুর ঘর।সেখানে তিনি পুজো করতেন।আমি জানতাম এখানে তিনি দারুণ মানসিক শান্তি পেতেন।পার্টির কঠোর নির্দেশ ছিল কোন ধর্মাচরণ করা যাবেনা।কিন্তু গ্রামে এসে সব কিছু ওলট পালট হয়ে গেল।বাবাকেও দেখেছি ঈদে নামাজ পড়তে।বাবা বলতেন মানুষের সাথে সংযোগ জরুরী।ঈদ হচ্ছে এমন একটা উৎসব সেখানে উঁচু নীচু সকলের সাথে আন্তরিক যোগাযোগ হয়।কবীর কাকু আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন ,'তোর বাবা যা বলছেন তা পুরোপুরি ঠিক নয়।কোন ধর্মীয় উৎসবই সমস্ত মানুষ কে কাছে টেনে নেয়না।আমরা যখন আফিম জাতীয় নেশার কবলে পড়ি তখন আত্মসমর্থনের জন্য যুক্তি খুঁজি।'

কবীর কাকুর কথায় ঠিক।বাবা মা সবাই ধর্ম কে আঁকড়ে ধরতে চাইলেন।কিন্তু কোন বিরোধ ছিলনা।বাবা মা পরস্পরকে প্রচণ্ড ভালবাসতেন।আমিও উভয় ধর্মের মধ্যে বড়ো হচ্ছিলাম।আমি সব কিছুতে মায়ের প্রতি নির্ভরশীল ছিলাম।যাকে বলে মাদার্স চাইল্ড।অল্প বয়সে আমার রামায়ণ মহাভারত মুখস্ত হয়েগেছিল।আমার মাথায় সব সময় ঘুরত শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন ।স্বপ্ন দেখতাম ইন্দ্রপ্রস্থ ,নন্দন কাননের।আমি কে বৃষ্টির দেবতা।পবন বায়ুর দেবতা সেটাও জানতাম।বাবা আমাকে আরব্য রজনীর গল্প শোনাতেন।মাঝ রাতে বাবা আমাকে'এক দিনের জন্য রাজা 'গল্প শুনিয়ে ছিলেন।এই ভাবে আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান সংস্কৃতি জারিত হয়ে চলেছিল।

কিন্তু কোথাও কোন গণ্ডোগোল হয়েছিল ।রকিব কাকা আমার বাবা মার বিয়ে সমর্থন করেননি।তিনি বাবার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখেন নি।উনি হলেন আমার বাবার আপন ভাই।আবার আমার সঙ্গে ওঁর দারুণ হৃদ্যতা ছিল ।আমায় খুব ভাল বাসতেন।মায়ের দাদার নাম সমীর রায়।মা এক মুসলমান কে বিয়ে করেছেন বলে বোনের সঙ্গে কোন সংস্রব রাখেন নি।আমাকে তিনি অসম্ভব ভালবাসতেন।ভাগ্নে অন্ত প্রাণ ছিলেন ।আমি বহুবার সমীর মামার বাড়ি গেছি ।তিনি ক খনও আমাদের বাড়ি আসেন নি।সম্পর্ক এক জটিল জায়গায় পৌঁছেছিল।

এবং এলাকায় আমাদের সম্পর্ক নিয়ে উত্তাপ ছিল।আমরা টার্গেট হয়ে গেলাম।আমাদের কে মারা ষড়যন্ত্র হয়ে গেল।লোকজন ধেয়ে আসছে।এরকম একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমাদের বাড়ি অদ্ভুত শান্ত।মা শুয়ে আছে ।বাবা নিঃশব্দ।আমরা ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে ছিলাম।বোমার শব্দ ,হৈ চৈ এর শব্দ ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে।শুনতে পাচ্ছি 'শেষ করে দে ওদের ,বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দে।পুড়িয়ে দে ।'মা আমাকে আঁকড়ে ধরলেন।সেই সময় হঠাৎ একটা কন্ঠস্বর শোনা গেল,'তোরা কোথায়।'সমীর মামার কন্ঠস্বর।হাঁফাচ্ছেন,চীৎকার করে বলছেন,'তোরা কি পাগোল হয়েছিস?এখানে পড়ে রয়েছিস।'মামা মায়ের কাছে এসে গেছেন।বিস্ময়ের পর বিস্ময়।রকিব কাকার কন্ঠস্বর শোনা গেল,'ভয় নেই সমীর দাদা।পুলিশ এসে গেছে।অবস্থা নিয়ন্ত্রণে।'বাবা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কবীর কাকু ঠিকই বলতেন,'দুর্যোগের সময় সব ভেদাভেদ মুছে যায়।কেবল ভালবাসা টিকে থাকে।মা মামাকে প্রণাম করছেন।বাবা রকিব কাকার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকছেন ।সকালের সূর্য হেসে উঠেছে...




লেখক পরিচিতি
নীলাঞ্জন সৈয়দ
জন্মঃ খোশবাসপুর,  মুর্শিদাবাদ।
জন্ম সালঃ১৪ই জুলাই ১৯৬৭
বর্তমান আবাস স্থলঃ খোশবাসপুর

পেশাঃনেই ইমেলঃneelanjan.sayed@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন