বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৪

আলোচনা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প-রেইনকোট

মোমিনুল আজম

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার সমগ্র সাহিত্যিক জীবনে গল্প লিখেছেন তেইশটি। তার লেখা শেষ গল্প রেইনকোট। ১৯৯৫ সালে । এরপর তিনি আর গল্প লিখেন নি। খোয়াবনামা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার গল্পের ভাষা শুকনো, খটখটে। ষাটের দশকে এ ব্যাতিক্রমি ভাষা দিয়েই তিনি কথা সাহিত্যের জগতে স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। মাকর্েজের মতো যাদু বাস্তবতায় হয়তো পাঠককে তিনি আবিষ্ট করতে পারেন নি কিন্তু তার গল্পে যে বাস্তবতার যাদু আছে তার রস আস্বাদন করতে হলে পাঠককে কিছুটা ধৈর্য ধরে গল্পের ভিতরে প্রবেশ করতে হয় ।


ইলিয়াস তাঁর গল্প বলার সময় আস্থাশীল ছিলেন ডিটেইলের প্রতি, গল্পের সাথে সম্পৃক্ত অনেক ছোটখাট বিষয়ও তিনি বর্ণনা করেছেন গুরুত্ব দিয়ে।  ভাষার ব্যবহার ও গঠনশৈলীতে যোগ করেছেন সূক্ষ হিউমার। তিনি কোন গতানুগতিক পথে তার গল্পকে উপস্থাপন করেন নি বরং উপস্থাপনকৌশলে বেছে নিয়েছেন অপ্রচলিত ধ্যান ধারণা। তার এই ষ্টোরিটেলিং কায়দাই তাকে বিশিষ্টতা দান করেছে, তিনি তার সমসাময়িককালের গন্ডি পেরিয়ে হয়েছেন উভয় বাংলার শ্রেষ্ট গল্পকার।

রেইনকোট গল্পটির বিষয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের মারদাঙ্গা বর্ণনা এতে নেই তবে আছে বর্ণনার ঘনঘটা। সে বর্ণনা পরিবেশ পরিস্থিতিকে জীবন্ত করে তুলেছে। ধারাবাহিকতা রক্ষা করে গল্পটি এগিয়ে গেছে। গল্পটি শুরু হয়েছে নিস্পৃহ ভঙ্গির বর্ণনার মাধ্যমে-

'ভোররাত থেকে বৃষ্টি। আহা! বৃষ্টির ঝমঝম বোল। এই বৃষ্টির মেয়াদ আল্লা দিলে পুরো তিন দিন। কারন শনিতে সাত মঙ্গলে তিন, আর সব দিন দিন।' যা পড়ে বোঝার উপায় নেই এর মাধ্যমে যুদ্ধের একটা পটভূমি তৈরি হচ্ছে।

'দেশালাইয়ের কাঠির মতো রোগা পটকা শরীরের উপর ফিট করা ভিজে বারুদের মতো ছোট্ট মাথা ঝাঁকিয়ে ইসহাক আরো তিনবার সম্মতি দেয় জরুর! জরুর! জরুর।'- দরজায় দাড়িয়ে পিওন ইসহাকের এরুপ শারীরিক বর্ণনা আর তার পাকিস্তান প্রীতির কথা বলতে বলতেই তিনি গল্প নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে প্রবেশ করেছেন।

রেইনকোট গল্প কাহিনী আহামরি  কিছু নয়। গল্পের বর্ণনায় যেটুকু বোঝা যায় - নুরুল হুদা ঢাকা কলেজের রসায়নের প্রভাষক।  তার শ্যালক মিন্টু জুন মাসের ২৩ তারিখে বাড়ি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে গেছেন। এটি জানাজানি হলে তার আর রক্ষা থাকবে না ভেবে বারবার বাসা পরিবর্তন করেছেন, সর্বশেষ তিনি মগবাজার থেকে উঠেছেন মিরপুরের বাসায়।

এক বৃষ্টিমূখর দিনে নুরুল হুদা যখন পুরু বেড কভারের নীচে শুয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন কলেজের পিয়ন ইসহাক মিয়া বাসায় এসে হাজির। গতকাল রাতে প্রিনসিপ্যালের বাসার দেয়ালে মিসক্রিয়েন্টরা বোমা মেরেছে। পাশেই মিলিটারি ক্যাম্প। পরিস্থিতি ভয়াবহ, তাই প্রিনসিপ্যাল সকল শিক্ষককে জরুরি তলব করেছে।

মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে, ঘরে কোন ছাতা নেই। তাই মিন্টুর রেখে যাওয়া রেইনকোট নিয়ে সে বাসে রওনা হয়। যেতে যেতে নুরুল হুদার বাসে এক মিলিটারি ওঠে। সে নুরুল হুদার রেইনকোটের দিকে তাকিয়ে থাকে। নুরুল হুদাও সাহস করে মিলিটারির চোখের দিকে একদৃষ্টে  তাকিয়ে থাকল, মিলিটারি ভয় পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়।

প্রিনসিপ্যালের কামরায় প্রিনসিপ্যালের সিংহমাকর্া চেয়ারে বসে আছেন জাঁদরেল টাইপের এক মিলিটারি পান্ডা। ড. আফাজ আহমদ তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই তাকে চোখ বেঁধে তোলা হয় জিপে। মিলিটারিকে নিয়ে ছড়া লিখে মজা করার জন্য প্রিন্সিপালকে সে শাসিয়ে যায়। অধ্যাপক আকবর সাজিদের কথা বলেও পিন্সিপাল আফাজ আহমদ পার পায় না। নূরুল হুদার সাথে গাড়িতে তোলা হয় আবদুস সাত্তার মৃধাকে।

নুরুল হুদা আর আব্দুস সাত্তার মৃধাকে নিয়ে জীপ এঁকে বেঁকে চলে। চোখ বাধা থাকায় তারা বুঝতে পরে না তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখ খোলার পর নুরুল হুদা নিজেকে আবিস্কার করে একটা বড় রুমে কিন্তু সে আব্দুস সাত্তার মৃধাকে দেখতে পায় না। নুরুল হুদাকে মিলিটারিরা জের করে। এক পর্যায়ে মিলিটার বলে- সকুলের আলমারি সরবরাহ করার জন্য যে কুলিরা আসে তারা ছিল ছদ্মবেশে মিসক্রিয়েন্ট। তারাই এ ঘটনা ঘটায়। তারা ধরা পড়েছে এবং তাদের সাথে যে নুরুল হুদার যোগাযোগ আছে তা তারা স্বীকার করেছে।

নুরুল হুদা যখন জানতে পারে মিসক্রিয়েন্টরা তার কথা বলেছে, সে তখন আনন্দিত হয় এবং বলে তাদের ঠিকানা সে জানে। কিন্তু সে আসলে তা জানে না বা মিলিটারির কাছে তা বলতে পারে না। এই না বলতে পারার কারনে মিলিটারিরা নুরুল হুদকে ছাদের সাথে ঝুলিয়ে অত্যাচার করে। অত্যাচারের মাত্রা এতো বেশি ছিল যে এক সময় তার কাছে তা উৎপাত বলে মনে হয়।

এই সাধারণ একটি গল্পকে আবর্তিত করে ছোটখাট নানা বিষয় বা অনুষঙ্গ তাঁর গল্পে নির্মোহ বাস্তবতা নিয়ে উঠে  এসেছে।, এ কারণে তার প্রতিটি গল্পের মতো রেইনকোট গল্পে নুতন মাত্রা যোগ হয়েছে, এর মধ্যেই গল্পের চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার রচনায় সবসময় যে ডিটেইল আসে এখানেও তার ব্যত্যয় হয় নি। এই রেইনকোট নিয়ে তিনি অনেক কথা বলেছেন, সেই বলার মধ্যেই সুক্ষ্মভাবে ধরা পড়েছে নুরুল হুদার পারিবারিক জীবন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি আর তার উপর মিলিটারির অত্যাচারের নিষ্ঠুরতা।  রেইন কোর্ট গায়ে চরিয়ে সে যখন তুমুল বৃষ্টি থেকে রক্ষা পায় তখন তার শ্যালকের প্রতি যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় তার মাঝেও আছে  যুদ্ধের কথা-

'মিন্টুটা এই রেইনকোর্ট রেখে গিয়ে কী ভালোই যে করেছে। এটা নিতে ছোড়াটা যে কবে ফেরে! - আহা, এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ছেলেটা কোথায় কোন নদীর তীরে ওৎ পেতে বসে রয়েছে। হয়তো পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর এক প্লাটুন গ্রাম জ্বালিয়ে শ-দুয়েক মানুষ মেরে লাশগুলোকে ফেলে জিপে করে নিয়ে যাচ্ছে জ্যান্ত জোয়ান মেয়েদের, মিন্টুর ষ্টেনগান নিশ্চয় তাক করে রয়েছে ঐ মিলিটারি গুলোর দিকে।'

ইলিয়াস গল্প বলার সময় হঠাৎ করেই গল্পে আরোহণ করেন নি কিংবা গল্প বলার সময় কোন তাড়হুড়োর ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় নি। ধীরে ধীরে পরিবেশ পরিস্থতির বর্ণনার মাধ্যমে একটি প্লট তৈরি করে গল্পকে চুড়ান্ত পর্বে নিয়ে গিয়েছেন। গল্পের তিন চতুর্থাংশ পড়ার পরও বুঝতে পারা যায় না গল্পটি আসলে কোনদিকে যাচ্ছে। কিন্তু গল্পে যখন বলা হলো-'তাদের দুজনের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, জীপ চলছিল এঁকেবেঁকে। মস্ত উঁচু একটা ঘরে তাদের এনে ফেলা হলো। চোখ খুলে দিলে সে আবদুস সাত্তার মৃধাকে দেখতে পায় না। জায়গাটাও একএবারে অচেনা।' তখন আর বুঝতে বাকী থাকেনা তাদের কাছ থেকে স্বীকারুক্তি আদায়ের লক্ষে নির্যাতন চালানো হবে।

সারা গল্প নূরুল হুদা মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে কাজ করেছে তার কোন প্রমান পাওয়া যায় না,বরং তাকে একজন ভীতু, নীরিহ গোবেচারা কলেজ শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গল্প যেমনটি ডিজাভর্ করে ঠিক তেমনভাবেই নুরুল হদার চরিত্র চিত্রণ করা হয়েছে, অনাবশ্যকভাবে সে চরিত্রে রং লেপন করা হয় নি। কিন্তু মিলিটারি জিঞ্জাসাবাদের সময় যখন বলে-

মিসক্রিয়েন্টরা কলেজে ঢুকেছিল কুলির বেশে। এটা তার চেয়ে আর ভালো জানে কে? তারা আজ ধরা পড়ে নুরুল হদার নাম বলেছে। তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়মিত, সে গ্যাঙের একজন নিয়মিত সদস্য।
তখন নুরুল হুদা আনন্দে উত্তেজিত হয়ে বল
' আমার নাম? সত্যি বলেছে? আমার নাম বলেছে?
নুরুল হুদার হঠাৎ চিৎকারে  মিলিটারি বিরক্ত হয় না, বরং উৎসাহ পায়। উৎসাহিত মিলিটারি ফের বলে, কুলিরা ছিল ছদ্মবেশী মিসক্রিয়েন্ট। তারা কলেজের টিচারদের মধ্যে নুরুল হদার নামই বলেছে।

এ পর্যায়ে এসে বোঝা যায় নুরুল হুদা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছে। তার সমস্ত স্বত্তা জুড়ে আছে মুত্তিযুদ্ধ।

এ গল্পে অধ্যাপক আকবর সাজিদের আচরণ রহস্যময় হয়ে উঠলেও মিলিটারিকে ব্যঙ্গ করে লেখা তার ছড়া এবং কটু বাক্যবাণে রাজাকার প্রিন্সিপালকে নাস্তানাবুদ করার মধ্যেই প্রমাণিত হয়, উর্দু বিষয়ের অধ্যাপক হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি।

গল্পের শেষে নুরুল হুদার উপর যে শারীরিক অত্যাচার চালানো হয় তার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে রুপকের মাধ্যমে। তার পড়নের রেইনকোট হয়ে উঠেছে তখন মুল বিষয়-

' তার বেঁটেখাটো শরীরটাকে ঝুলিয় দেওয়া হলো ছাদে-লাগনো একটা আংটার সঙ্গে। তার পাছায় চাবুকের বাড়ি পড়ে সপাৎ সপাৎ করে। তবে চাবুকের নির্যাতন বিরতিহীন পড়তে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলো নুরুল হুদার কাছে মনে হয় স্রেফ উৎপাত বলে। মনে  হচ্ছে যেন বৃষ্টি পড়ছে মিন্টুর রেইনকোটের ওপর। রেইনকোটটা এরা খুলে ফেলেছে, কোথায় রাখল কে জানে। কিন্তু তার ওম তার শরীরে এখনো লেগেই রয়েছে। বৃষ্টির মতো চাবুকের বাড়ি পড়ে তার রেইনকোটের মতো চামড়ায় আর সে অবিরাম বলেই চলে, মিসক্রিয়েন্টদের ঠিকানা তার জানা আছে। শুধু তার শালার নয়, তার ঠিকানা জানার মধ্যে কোন বাহাদূরী নাই, সে ছদ্মবেশী কুলিদের আস্তানাও চেনে। তারাও তাকে চেনে এবং তার উপর তাদের আস্তাও কম নয়। তাদের সঙ্গে তার আঁতাতের অভিযোগ ও তাদের সঙ্গে তার আঁতাত রাখার উত্তেজনায় নুরুল হুদার ঝুলন্ত শরীর এতটাই কাঁপে যে চাবুকের বাড়ির দিকে তার আর মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।’

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প এতো সরল গরল নয় যে তা আপনাকে গরগর করে টেনে নিয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। তার সৃষ্টির রস আস্বাদন করতে হলে কিছুটা সময় কষ্ট করে ভিতরে প্রবেশ করতে হবে। তারপর আপনি পাবেন তার বাস্তবতার যাদু, যার সন্মোহনী ক্ষমতা আপনাকে দীর্ঘসময় বুদ করে রাখবে।  রেইনকোট গল্পে ডিটেইল বর্ণনার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যে রুপ ধরা পড়েছে তাই আসলে আমাদের সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধ রুপ। এ রুপ, রস, গন্ধের আস্বাদ পেতে হলে ইলিয়াসের রেইনকোট গল্পটি আপনাকে পড়তেই হবে।

লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম

জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়
পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন