রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৪

নবারুণ ভট্টাচার্যের গল্প : ফ্যাতাড়ু

ব্ল্যাকে মাল খেলে কখনো হলুদ হ্যালোজেনের জোনে যেও না

সে এরফানই হোক বা মণ্ডলই হোক, ব্ল্যাকের ঠেক যারই হোক না কেন, ক্বচিৎ কখনো এমন হয়ে যায় যে কোনো কন্ট্রোল থাকে না। প্লেন ড্রেসে এক মাতাল পুলিশ হয়তো লিঃ লিঃ বলে চেঁচিয়ে উঠল। অমনি যেখানে যত মাতাল আছে তারাও ওই অসভ্য চিৎকার শুরু করবে। যে লোকটা এক কোণে খুটির গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোছিল সে আচমকা চোখ খুলে চোখের সামনে যে পানপরাগ দিয়ে চাট করছিল তাকে দুম করে ঝেড়ে দিল। ব্যস, শুরু হয়ে গেল কিচায়েন।
তাই বেস্ট পলিসি হল ডি এস বা ডিরেক্টর স্পেশালের। ওর অ্যাটাচি কেসের দুপাশে দুই খোপে ওই দুই নামপদবির আদ্যক্ষর শোভা পাচ্ছো ডি এস। কালো। কুৎকুতে কোলা ব্যাঙ। টেরেলিনের শার্ট পরা। দুই বোতামের ফাঁক দিয়ে মহাপ্রভুর ছবি বসানো লকেটটি বেরিয়ে। অ্যাটাচি কেসের মধ্যে অনেক শেয়ারের ফর্ম। বিলিতি মালের নাম লেখা ডট পেন। নোংরা চিরুনি যাতে অনেক লোকের মাথার ময়লা গোড়ায় ফসিল হায়ে আছ। এক বৃদ্ধার ফটো। কামপোজ ট্যাবলেট। মেট্রো রেলের টিকিট। একটি কেনা ডায়রি। এই বছরেরই। রাতটা ছিল বেশ ঘেমো। আর সরগরম। ডি এস—এর পলিসি হল দুম্ দুম্ করে একটা পাঁইট চার্জ করে বেরিয়ে পড়া। কিন্তু সেদিন ডি এস যে লোকটার খপপরে পড়ে গেল সে ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরা, ফরশা, রোগা, কলপ করা কালো কুচকুচে ঘাড় ঢাকা চুল, টিকোলো নাক, কিন্তু একটাও দাঁত নেই।

লোকটার নাম মদন। সে মাড়ি মেলে হাসল। তারপর ডি এস—এর পেটে সরু আঙুল দিয়ে খোচা মেরে বলল,

—এই যে এত মাতাল দেকচেন না, সব জানবেন গিদ্ধড়। বাড়ি গেলেই বউয়ের লাতি খাবে। একে কী বলে জানেন তো—সঙ্গদোষে বঙ্গদোষ। আমি এই জন্যে বাঙালিদের হেট করি। সব শালা হল বউয়ের এঁটুলি। বউগুলোও চান্স পেলেই পালাবে। ডি এস ঘাবড়ে গেল। তার কারণ ডি এস—এর বউ পালিয়েছে। পিয়ারলেসের এক সাকসেসফুল এজেন্টের সঙ্গে। বারুইপুরের মেয়। ডি এস মদনকে বলল,

—আপনি কি ডিটেকটিভ?

—কী মনে হচ্ছে? আরে আসল কথা হল—ওপারে যেও না ভাই ফটিং টিংয়ের ভয়। তা, বাঙালি শুনল না। ওপারে গেল। এরপরই তো তন্দুর, কুমির ডি এস আজ নয় কাল তোমাকেও ওই কেসে জড়াতে হবে। এই বলে মদন পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে দুপাটি দাঁত বের করল। হাতের পাঁটের বোতলটা কাত করে—অল্প মালে ধুয়ে নিয়ে খপ্ খপ্ করে পরে নিল। হেসে বলল,

—ও নিয়ে ভেব না। বউ পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমারও বেড়েছিল। এতক্ষণ তোমাকে যা বললাম সবটাই ঢপ। স্রেফ তোমার কোলে ঝোল টেনে তোমার মন কাড়ার জন্যে ধান্দা একটা পাঁইট খাব। পকেটে পয়সা নেই কিনবে?

ডি এস কিনল। মদনই বেশিটা খেল।

—টাকা টাকা করেই মরলে। এই যে শালা মণ্ডল, সাত বছর জেলের ঘানি টেনে এখন এই ব্ল্যাকের ঠেক খুলেছে ব্যাটার কি টাকা কম? মেয়েকে কনভেন্টে পড়াচ্ছ। কিন্তু খুঁজে পেতে দেখ, সব সময় মন ভার।

—কেন ?
—সন্দেহ। বউকে নিয়ে ঘোর সন্দেহ। ওকে আবার বলতে যেও না যেন।
—না না।

—শনিবার টিভি-তে ইংরিজি সিনেমাটা দেখেছিলে?
—না তো।

—তা ভালো জিনিশ দেখতে যাবে কেন? বইটা ছিল হেভি ভয়ের। এক পাল উডুক্কু মাছ। উড়ে উড়ে লোক ধরছে আর গলা কামড়ে মেরে ফেলছ।

—ভ্যামপায়ার।

—না, না ভ্যামপায়ার তো হল গিয়ে বাদুড়। এ হল মাছ। একটা ডোবা জাহাজের খোলের মধ্যে থাকে। মাঝে মাঝে দল বেঁধে লোক মারতে বেরোয়।

—উড়ুক্কু মাছ!

—হবে হাঙর বা কামটের জাতের। যাই হোক বইটা খুব ভয়ের। চল বেরিয়ে পড়ি এরপর হাওয়া লাগাতে হয়। আমার নাম মদন, জান তো?

—জানি।

—কী করে?

—মণ্ডল ডাকছিল, শুনলাম।

ডি এস আর মদন ঠেকের সামনে উঁচুনিচু অন্ধকার জমিটা টপকায়। পাশে গ্যারেজ। একটাতে গাড়ির খোপের মধো মোমবাতি জ্বেলে তাস খেলা হচ্ছো হাতে বোতলভরা থলি ঝুলিয়ে সাইকেলে করে একটা ন্যাড়া লোক এল। একটা স্কুটার দাঁড়িয়েছিল।

ডি এস হোঁচট খেল। মদন বলল,

—সামলে। সামনের বছর ভোট হচ্ছ। ভোটে কংগ্রেস ভোগে যাবে। সেন্টারে ঝালমুড়ি গভরমেন্ট হবে। তখন তোমার পোয়াবারো।

—মানে?

—কথা বলতে বলতে তোমার ফোরহেডটা স্টাডি করছিলাম। তখন দেখবে ধুন ধামাকার বাজার সাটাসাট চড়বে।

—কী?

শেয়ারের দাম। এই সময় কিছু হামাগুড়ি শেয়ার ধরে রেখ। জনক টারবো, রিলায়েন্স পেট্রল, বৃন্দাবন একোয়া—দেখবে কী হয়।

লাস্ট ধরেছিলাম ডি সি এম টয়োটার একশোটা।

—সত্তর, বাহাত্তর চলছ। তবে উঠবে। এখন ছেড় না।

—তুমি তো দেখছি শেয়ার ভালো বোঝ। কেন নাকি?

—ধুস, পয়সা কোথায় যে কিনব। আর পয়সার আমার দরকারও নেই, যে কটা দিন আছি ফ্যাতাড়ু হয়েই থাকব।

—কী হয়ে থাকবে?
—ফ্যাতাড়ু।
—সে আবার কী?

—সে খুব মজারা এই যে আমি তোমার ফোরহেডটা স্টাডি করলাম, তুমি কিন্তু আমারটা চেষ্টা করলেও পারবে না। —জানলেও পারব না? ধরো যদি কিরো-র বই পড়ে ফেলি।

—তাহলেও পারবে না। ফ্যাতাড়ুদের ওপরে কোনো প্লানেটের কোনো ইনফ্লুয়েন্স থাকে না।

—ফ্যাতাড়ুরা তাহলে কী?

—ঠিক কী তা বলতে পারব না। তবে ফ্যাতাড়ুরা হল খুব স্পেশাল। বুঝলে? ইতিহাসে দেখবে কত মহাপুরুষ মানুষকে নতুন করে বানাবার জন্যে কত ফন্দি বাতলেছে। আমার তো মনে হয় অনেক ঘেঁটে ঘুঁটে শেষমেষ এই ফ্যাতাড়ু তৈরি হয়েছ।

ডি এস ও মদন টলতে টলতে মোড়ের দিকে এগোয়। মোড় হলদে হ্যালোজেনের আলোয় ফট-ফট করছ। চারদিক শুনশান, সান্নাটা। রাস্তার ওপারে একের পর এক অন্ধকার বাস ঘুমোচ্ছে। একটা লজ্ঝড়ে পুলিশ ভ্যান চলে গেল। একে তো ব্ল্যাকে মাল খাওয়া। তার ওপরে জগৎজোড়া হলুদ হ্যালোজোনের জোন। ডি এস ফুরফুর হাওয়ায় শান্ত হয়ে অ্যাটাচি কেসটা দুপায়ের ফাঁকে ধরে হলুদ হ্যালোজেনের আলোর ধাতব স্তম্ভের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। আধ মিনিটও কাট্টনি। হবি তো হ...


ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই

ডি এস শুনতে পেল কানে কানে কেউ তাকে বলছে—ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই, ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই, ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ। চোখ খুলতেই ডি এস দেখল হলদে হ্যালোজেনের আলোগুলো চিড়িক চিড়িক করে ঘুরপাক খাচ্ছে, পাশে মদন নেই, সারা শরীরে পোকার পাখা গজাবার অবিমৃশ্য আনন্দ, রোমকূপে রোমকূপে পালানো বউয়ের আর্তচুম্বন, অন্যদিকে মহাকাশ থেকে গ্যাগারিনের বালকসুলভ মুখের নিষ্পাপ হাসি, অমনি ওপরের দিকে তাকিয়ে ডি এস দেখল…

চৌকোটে হলদে হ্যালোজেন আলোর পাশে উড়ন্ত মদন আকাশে থেমে আছ। আস্তে আস্তে হাত নাড়ছে আকাশে এক জায়গায় স্থিতু থাকার জন্যে। দুপাটি নকল দাঁতের ওপরে হলুদ হ্যালোজেন সোনালি আভা তৈরি করছ।

—মদন।
—তোমাকে বলেছিলাম না যে ফ্যাতাড়ুদের বেলায় কোনো হিশেব চলে না। এসো। উঠে এসো
—কী করে?

ডি এস ডান হাতে অ্যাটাচি নিয়ে ঝটপট করে উড়তে চেষ্টা করে। ঘেমে যায়।

—ও রকম করে নয়। ওপর নীচে হাত নামাও ওঠাও।
এই রকম?
—হাঁ আর বল…
কী বলব?
—ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই… ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই

মদনের ফিনফিনে পাঞ্জাবি ইস্তিরি করা বলে ঠেকছ। ডি এস বলতে থাকে।

—ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই… ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ… প্রথমে ডি এস বুঝতেই পারেনি যে সে উড়তে শুরু করেছে। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল যে ফুটপাথ থেকে হাত খানেক ওপরে সে ভাসছ। অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ডি এস। ফলে একবার ধপ্ করে পড়েও গেল। ওপর থেকে মদন ধাঁতানি দেয়,

—যেই ড্যাঙা থেকে ঠ্যাংদুটো উঠল অমনি মন্তর বলা ছেড়ে দিল। তেঢ্যামনা কোথাকার। আরো ওপর থেকে পড়লে ভালো হত। বল্, মন্তর বল্।

ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই… ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই… এবারে ডি এস স্বচ্ছন্দে উঠে আসে। মদনের পাশে এসে ফড়ফড় করে উড়তে থাকে। একটা রোঁয়াওঠা ঘেয়ো বাদুড় ওদের দুপাক মেরে দেখে যায়। হলদে হ্যালোজেনের থেকে দূরে বসে থাকা প্যাঁচারা ডেকে ওঠে।

—প্র্যাকটিস হয়ে গেলে আর বলতে হবে না। তখন যেই দেখবে তলার দিকে টানছে তখন মনে মনে গুনগুন করলেই চলবে।

—সে তো বুঝলাম কিন্তু নামব কী করে?

—ন্যাকামি হচ্ছ। নামব কী করে? ফ্যাতাড়ুদের খাতায় নাম একবার যখন পাকাপাকি উঠেছে তখন ওঠানামা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। নামার দরকার হলে আপসে লাশ নেমে আসবে।

—লাশ? —ওই হল। বডি, বডি। চল তো, গঙ্গার হাওয়া ছেড়েছে। নতুন পুলটা মেরে আসি।

ডি এস আর মদন আরো ওপরে উঠে যায়। হঠাৎ মেঘ ফুঁড়ে চাঁদমুখ বেরোল।

ওই যে নতুন পুলের আলো। যে সে আলো নয়, ফিলিপস কোস্পানি জ্বালিয়েছে। চল… চল… তলায় বাড়ি, রাস্তা পরপর সরতে থাকে। মাঝেমধ্যে তলায় খোপ খোপ অন্ধকার—মাঠ, গাছ। ডি এস ওড়ার মজা পেয়ে গেছে।

—ভাগ্যে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ফ্যাতাড়ু হতে পারলুম। —তা পারলে। এবারে ওই যে তেতলা বাড়িটা দেখছ না, ওর ছাদে আমরা ল্যান্ড করব।

—কেন?
—বিড়ি খাব। ছাদে ওই যে বাটি অ্যান্টেনা বসিয়েছে ওর তারগুলো ছিড়ব। মেরে মেরে ভাঙব?

—অ্যান্টেনা কী দোষ করল?
—তোম্যর এত এটা কি, ওটা কেন—এত আম্বা কিসের হে? যা করতে বলছি কর।

ওই তল্লাটে যারা কেবল্ টিভি দেখছিল কোনো অজানা কারণে তাদের হঠাৎ পরদা থেকে ছবি চলে গেল। স্থানীয় কেবল অপারেটরের বাড়ি ফোন গেল। তারা তেতলা বাড়ির ছাদে উঠে টর্চ মেরে দেখল তার ছেঁড়া, থান ইঢ দিয়ে ঠুকে ঠুকে অ্যান্টেনা ড্যামেজ করা হয়েছে, অ্যান্টেনার মধ্যে পোড়া বিড়ি এবং সর্বত্র বাংলা মাল মেশানো পেচ্ছাপের বিকট গন্ধ। ওরা বুঝতে পারল যে রেন ওয়াটার পাইপ বেয়ে চোর উঠেছিল। মালটা এত ভারী আর শক্ত করে সিমেন্ট গেঁথে বসানো যে খুলতে পারেনি।

—তোমাকে দিয়ে হাতেখড়ি দেওয়ালাম। মাথায় ঢুকেছে?
—ঢুকেছে।
—কী ঢুকেছে?

—ফ্যাতাড়ুদের হাতেখড়ি মানে ওই ভাঙচুর, ছেঁড়াছেঁড়ি, হিসু করা।
—বাঃ এই তো বুদ্ধি খুলেছে। ভালো রাতে ফ্যাতাড়ু হলে, একথা আমি বলব।
—কেন?

—চল না। দেখতে পাবে। ফ্যাতাড়ুদের আজ বড় প্রোগ্রাম আছে।
—মানে? তুমি আমি ছাড়াও ফ্যাতাড়ু আছে নাকি?

—আছে মানে কি? পালে পালে আছে। রোজ রাতে ফ্যাতাড়ুদের একটা না একটা প্রোগ্রাম থাকে। যেমন আজকের প্রোগ্রাম হল ফ্লোটেল।

—ফ্লোটেল?

—হ্যাঁ, গঙ্গাবক্ষে চালু হয়েছে না ফ্লোটেল—ওপরে মেমমাগী নাচে, বড়লোকরা ফুর্তি করে, গানবাজনা, খানাপিনা হয়, জানো না?

—জানি না আবার? শুনেছিলুম তো শেয়ার ছাড়বে এন আর আই মালিক।
—আবার সেই শেয়ার? আজ হল অপারেশন ফ্লোটেল অর্থাৎ ভাসমান হোটেলে হানা।

—সেই ভ্যামপায়ার মাছেদের মতো?
—না, না, খুনজখম নয়। ভয় দেখানো। নোংরা করা। ভণ্ডুল করে দেওয়া। এতেই তো মজা।

—আচ্ছা, ডায়মন্ডহারবার রোডের ওপর ওই যে প্লেজার রেসর্টগুলো হয়েছে তার ওপরে ইঁটপাটকেল নিয়ে ভুতুড়ে অ্যাটাক হয়েছিল বলে কাগজে বেরিয়েছিল সেটাও কি…

—হ্যাঁ, ওটাও ফ্যাতাড়ুদের কাজ। তুমি ভালো ফ্যাতাড়ু হয়েছ। তোমায় দিয়ে হবে। ঘপাঘপ সব বুঝে ফেলছ।
—কী করে হলাম সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

—প্রপার কোয়ালিফিকেশন থাকার দরকার। বড় বড় অফিসে গেলে, দেখা করছে না, বসিয়ে রাখাছে, তুমিও থেমে থাকার পাত্র নয়—মনে মনে খিস্তি করছ, নাক খুটে চেয়ারের হাতলে লাগাচ্ছ, নখ দিয়ে চিমটে চিমটে গদি ছিঁড়ছ, বল এমনটি করনি?

—হ্যাঁ। করেছি।

—ড্যামেজ। পারলেই ড্যামেজ করো। এইটা মাথায় থাকাতে হবে। এরকম যারা করে তাদের আমরা রিক্রুট করি। একবারে যেগুলা হোপালস্ কেস, আধমরা, লাতখোর ছেলে—এই সবের থেকে—বেছে বেছে…

—আমি না অনেক অফিসের ল্যাভেটরিতে ঢুকে আয়না ভেঙেছি, বেসিন ফাটিয়েছি, নোংরা কথা লিখেছি…

—সে কি আর আমরা জানি না?

—অথচ ছোটবেলায় কী ভালোই না ছিলুম। ২৩ জানুয়ারি পাড়ার তেলেভাজার দোকানে মিনিমাগনা দুটো করে ফুলুরি দিত। খেতাম। তারপর অনেকে মিলে চেঁচাতাম—নেতাজি ফিরে এস।

—জানি।

—বাপ র‌্যান্ডাম প্যাঁদাত। বড় হলাম। ধান্দা করতে শিখলাম। বিয়ে থা হল। তারপর তো যা হবার, যাকে ভাবলুম বন্ধু তারই সঙ্গে বউ ভাগলবা…

— কারেক্ট, কারেক্ট
কিছুই হল না লাইফে।
ডি এস ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

—ছিঃ ডি এস। ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করলে তোমারও মন খারাপ হবে, আমারও। আজ চান্স নেই তা না হলে তোমাকে একটু মজা দেখাতাম।
—কীসের মজা
—বেডরুম সিনস্ উঁকি ঝুকি! পিপিং টম!

—বল কী ভায়া!
—জব্বর সব খেল! হাইরাইজের ওপরে! কখনো কখনো ছাদে। ছাদে সুইমিং পুল!
—আর বলো না! গরমে যাচ্ছি!

—এতেই?
—যাব না? কতদিন হয়নি!

—যাই হোক এবার মন থেকে ওসব অসভ্য চিন্তা বাদ দিয়ে সামনের নীচে তাকাও। কী তাজ্জব আলোর হার অন্ধকারের গলায় ঝুলছে। ডি এস অবাক হয়ে যায়।

—আমরা ঠিক পুলের মাঝখানে ল্যান্ড করব, বুঝলে?
—শুনেছিলুম দাঁড়াতে দেয় না।
—ওসব আইন ফ্যাতাড়ুরা কেয়ার করে না।

মদন আর ডি এস হাঁপাতে হাঁপাতে পুলের ওপরে নামল। আকাশে ঝিনুক ঝিনুক মেঘে চাঁদ আবার আড়াল হয়েছে। এক ঘোলাটে আভা দেখা যায়। দেদারে হাওয়া। হাওয়ায় সব চৌপাট করে দিচ্ছে।

—ভাই মদন, এই যে ফ্যাতাড়ু হলাম, এরপরে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব? যেমন ধরো ভোট দেওয়া, বাজার করা, ভাইফোঁটা নিতে যাওয়া।

—কেন পারবে না, সবই পারবে। তবে সব সময় মনে হবে যে তুমি ফ্যাতাড়ু। কে জানতে যাচ্ছে তুমি ফ্যাতাড়ু কিনা।
—আচ্ছা, ফ্যাতাড়ুদের মধ্যেও কি কংগ্রেস-সি পি এম হয়?

—হয় বইকী! আকছার হয়। তবে ফ্যাতাড়ুদের প্রোগ্রামে সব সময় জয়েন্ট অ্যাকশন।
—ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
—আমারও।

—কিছুক্ষণ মটকা মেরে পড়ে থাক, ঘুম চলে যাবে।



পুলিশের সঙ্গে বাওয়াল

ওদের চটকা ভাঙল মোটর সাইকেলের শব্দে। বিরাট চেহারার এক সার্জেন্ট। ব্যাটা রাত্তিরে গগলস্ পরে আছে বলে আরো কিম্ভূত দেখাচ্ছে। লোকটা মোটরসাইকেল গর্গর্ করে চালু রেখে বলল।

—এই, এই, আপনাদের গাড়ি কোথায় রেখেছেন। জানেন না এখানে দাঁড়ানো বারণ। আর শুয়ে থাকা তো আউঢ অব্ কোশ্চেন। চলুন, এক মিনিটও নয়…

—আমরা তো গাড়ি করে আসিনি।
—মানে? হেঁটে ব্রিজে ওঠা তো বারণ।

—আমরা হেঁটে উঠিনি। উড়ে এসেছি।

—মানে? চ্যাংড়ামি হচ্ছে! কী আছে আপনার ওই ব্রিফকেসে? খুলুন তো! স্ট্রেঞ্জ।

—এই ডি এস! খুলবে না।
—খুলবে না মানে, বাপ খুলবে! আমি আপনাদের অ্যারেস্ট করব!

সার্জেন্টের হাতটা কোমরের রিভলভারের দিকে এগোয়। কিন্তু আর কিছুকরা সম্ভব হয় না কারণ মদন ও ডি এস হাত নেড়ে জমি ছাড়ে এবং উঠতে থাকে। সব রোয়াবটোয়াব উবে গেছে। গগলস্ টান মেরে খুল সার্জেন্ট ঠাকুরের নাম করতে থাকে। ওপরে দেখা যায় দ্বিতীয় হাওড়া ব্রিজের প্রথম চূড়ার কাছে আলোকমালার মধ্যে মদন ও ডি এস হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে উড়ছে। এইভাবেই দুঃসাহসী স্কাই ডাইভাররা ওড়ে।

—চলো, ব্যাটাকে যা ঘাবড়ে দিয়েছি না!
—এবারে কোথায়?
—সেকী? ফ্লোটেল!


ঝাঁকের কই হও

অন্ধকার হাওড়ার দিক থেকে ‘ওলে, ওলে’ শোনা গেল।

—ওই এসে পড়েছে!
—কারা!

—হাওড়ার সব মাল। এঁদো গলি ঘুঁজিতে গেঁড়িগুগলির মাতো থাকে। ফাঁকা জায়গা পেলে খুব খোলতাই—ওদের আওয়াজই আলাদা।

অন্ধকারে আরো ঝটপট হাওয়া কাটা শব্দের মধ্যে ‘লায়লা, ও লায়লা’ রণধ্বনি শোনা যায়।
—খিদিরপুর, একবালপুর, কাঁটাপুকুর—সব আসছে। ওদের আওয়াজ শুনলেই বুঝবে—বিটক্যাওড়া।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই শব্দে আকাশ ভরে যায়।

—ওই যে গ্যাংটা দেখছ না, হাতে আংটি, ধুতি শার্ট পরা, ওরা হল সব চিটিংবাজ। নর্থ ক্যালকাটার। অবশ্য চার পাঁচটা দোকানদারও রয়েছে।

ডি এসের পাশ দিয়ে ঝাঁটা, তোলা উনুন ভাঙা, ভাঁড়ের মধ্যে পচা আলুরদম, পাঁঠার মাথার ঘুগনি নিয়ে একটি নাইলন শাড়ি পরা মেয়েদের ঝাঁক খলবল করতে করতে উড়ে গেল। কয়েকটা মোটা বুড়ীও রয়েছে। একটি উডুক্কু মেয়ে উড়ন্ত ডি এসকে বগলে কুডুকুড়ি দেয় ও খিলখিল করে হাসে। ঝাঁকটা এগিয়ে যাওয়ার পরে মদন ডি এস-এর কানে কানে বলে।

—এ হল সব সোনাগাছি গরানহাটা ভাল্লুকপাড়ার মাগের পাল। একদম ঘাঁটাবে না। আর ওই যে ডানদিক ঘেঁষে ঝাঁকটাকে দেখছ, ঢোল বাজিয়ে গান করছে, ওরা হল হিজড়ে ফ্যাতাড়ু। যত দেখবে তত তাজ্জব হয়ে যাবে। ওই, ওই লোকটাকে দেখ,—ওপরের পাটিতে তিনটে দাঁত, ধুকপুক ধুকপুক করছে আর পাখসাট মারছে—উনি হলেন একজন লেখক—পদ্যগদ্য আলফাল লেখে। আসলে মাল মুহুরি —এরকম ফ্যাতাড়ুও পাবে।

—এ তো দেখছি ভায়া বলতে গেলে একটা এয়ার ফোর্স।
—ডি এস ডাইভ মারার জন্যে তৈরি হও!
—মানে!
—সামনে ফ্লোটেল।

আলোকোজ্জ্বল ভাসমান হোটেল বা ফ্লোটেল বড়ই নয়নাভিরাম। তলায় তলায় হংকং আয়না, সিঙ্গাপুরি বাজনা, হাওয়াই দ্বীপের ঢিমে গিটার আবার র‌্যাপ, জীবনমুখী গান প্লাস তুমি রবে নীরবে এবং সে রাতে ছিল স্পেশাল তন্দুরি নাইট। শহরের বিশিষ্ট এন আর আই সাহেবসুবো, নর্তকী, স্মাগলার, হাওলাদার, ফ্যাশন ডিজাইনার, মডেল, পলিটিশিয়ান, বিউটিশিয়ান, মালকিন, মাফিয়া, ডি সি ডি ডি, পি এ টু পিম্প, পিম্প অব্ এম ও ইউ এম পি এম এল এ কোচ, জিগোলো, সম্পাদক, কোর্টপোয়েট, কিং, কুইন সকলেই স্ব স্ব প্লেটে তন্দুরি মোজা পরা পা, তন্দুরি ব্রেস্ট, তন্দুরি রাং, তন্দুরি লিভার, তন্দুরি সিনা, তন্দুরি টেংরি, ফ্রায়েড তন্দুরি নোস, তন্দুরি আঁখি, তন্দুরি চুল উইথ রাইস নুডলস্, তন্দুরি ব্লিডিং হার্ট, তন্দুরি নাড়ি, তন্দুরি লিপস্, তন্দুরি আর্মপিট খাচ্ছিলেন। এমন সময় লাইক আ বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু কিছু বিষ্ঠা, ছনছন করে পড়া মূত, একটি আস্ত অ্যাটাচি কেস (দুই খোপে ডি ও এস লেখা), ভাঙা উনুন, মুড়ো ঝাঁটা, পাঁক, পচা আলুর দম ও পাঁঠার মাথার উৎকট ঘুগনি, বাতিল টুথব্রাশ, পরীক্ষার খাতা, সেলুন থেকে কুড়োনো কাটা চুল, বেড প্যান ইত্যাদি পড়তে থাকল।

—কী রকম বুঝছ ডি এস?
—লা জবাব।

—ভালো লাগল তো?
—ওফ মদন, আজ যেন জীবনে, মানে যাক বলে ফুলফিলমেন্ট হল।

—সব জায়গায় ইংরিজি চলে না। বল, সিদ্ধিলাভ হল।
—হ্যাঁ, ঠিক তাই ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই!



নটে গাছ এখনো মুড়োয়নি

দশটি আই-উইটনেস একাউণ্টস অব্ লেভিটেশনে মদন বা ডি এস অথবা বিপুল ফ্যাতাড়ু বাহিনীর কথা মেনে নেওয়া হয়নি।

কলকাতা পুলিশ ফ্লোটেল অ্যাটাক তদন্ত করে এবং ডি এস-এর নাম ঠিকানা খুঁটিনাটি-সহ ব্রিফ কেসটি পায়।

এক বিশিষ্ট বাহিনী, র‌্যাফ সমেত, ঘুমন্ত ডি এসকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। ডি এস হাঁউমাঁউ করে কান্নাকাটি করে। লাভ হয়নি। তাকে লকআপে পাঠানো হয়। সেখানে ডি এস যখন আধোঘুমে আচ্ছন্ন তখন ঝন্ঝন্ শব্দে লোহার দরজার পাল্লা ফাঁক করে যাকে ঢোকানো হয়েছিল সে দু-পাটি দাঁত খুলে পাঞ্জাবির পকেটে ঢোকায় এবং মাড়িবিহীন ফিসফিস শব্দে ডি এসকে জানায়।

—সামান্য একটু হেনস্থা হল আর ভুলে গেলে তুমি ফ্যাতাড়ু।
—মদন, তুমি।

—মন্তর, মনে আছে?
—হ্যাঁ, ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই

লক-আপের ঘরে একটা জানলা ছিল।

১৯৯৫

চিত্র : শুভেন্দু দাশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন