বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নাহার মনিকা'র গল্প : সবুজ নির্বিষ সাপের মত

অনেকদিন পর আজকে পিন্টু আর আমি ঘুম থেকে উঠে আমাদের ঝগড়া ভেঙ্গে কথা বললাম। ফলাফল, এই প্রবল তুষারপাতের মধ্যে ও আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছে। গাড়ির ভেতরে আমরা একসঙ্গে বসে থাকি, আবার থাকি না। পিন্টু সক্রিয় ড্রাইভার আর আমি নেভিগেটরের সীটে, নিস্পৃহ। রূপালি রঙ পোন্টিয়াক একটা মানুষ গেলা সাপের মত পার্কিং এরিয়া চষে বেড়ায়, এক আইল থেকে আরেক আইলে। দেশে কম টাকায় জমি কেনার মত কৌশল আর ক্ষিপ্রতা নিয়ে পিন্টু একটা বড় সড় জীপের পেছনে ঘাপ্টি মেরে থাকে। ডানদিকের ইন্ডিকেটর যেন শিকারির চোখ, জ্বলতে থাকে। কিন্তু আমাদেরকে হতাশ করে জীপটা পার্কিং এরিয়া ছাড়ে না, ভেতরে বসে চালক কি যে করে কে জানে।

ডিসেম্বর মাসের হলিডে সিজনে মানুষজন অন্তহীন কেনাকাটায় পাগলা হয়ে ওঠে, তার ওপরে এটি ব্যস্ত শপিংমল। হেন ব্র্যান্ড নেইমের দোকান পাট নাই যা এখানে অনুপস্থিত। অতি সম্প্রতি এই কম্পাউণ্ডে আমার গায়োনকলজিষ্টের ক্লিনিক শিফট করেছে। এখানকার পার্কিং সমস্যা সর্বজনবিদিত, অপেক্ষার পালা আট দশ মিনিটও ছাড়িয়ে যায় কখনো কখনো। পিন্টু নিয়ে আসাতে যে পাব্লিক বাস ঠ্যাঙ্গাতে হলো না, আরামে গাড়ির ভেতর বসে আছি তা আমার মাথায় আসে না। পার্কিং খোঁজার ভ্যাজালে ওর ওপরে আবার ক্ষেপে উঠছি মনে মনে। ঝগড়াটা না ভাঙ্গলেই ভালো হতো।

-‘ ডাক্তার তোমাকে যতক্ষণ খুশী বসায়া রাখতে পারে, কিন্তু তুমি দশমিনিট দেরী হইলে বেগড়বাই করবে, ইয়ার্কি’! পিন্টুর বকবক করা বিশ্রী লাগে, আমার ঠোঁট জ্বাল দেয়া আঠা দিয়ে আটকে রাখি।

-‘দেরী হইলে কি হবে তা তোর বলতে হবে-ভাদাইম্যা ব্যাটা? গাড়ির পার্কিং খুইজা বাইর করতে পারোস না’- মনে মনে গজরাই, ফুঁসতে ফুঁসতে ভেতরের বাতাস ফুরিয়ে ফেলি। বরফকুচি লাগা ওর পাতলা হয়ে আসা চুল নেতিয়ে এলোমেলো,অনেকক্ষণ গাড়ির বরফ সাফ করতে হয়েছে, আমি জানি। ফ্যাকাশে চামড়া, চোখের নীচে কালির ছাপ, পিন্টুর পুরু ঠোঁটের জেদ সব আমার চেনা। এখন আর তাকিয়ে দেখতে হয় না।

আটতলা বিশাল বিল্ডিংটার সামনে আমরা ঘুরপাক খাই, পাশ দিয়ে স্লো মোশানে গাড়ি যায়, ছোট- বড়, টু সিটার, চার দরজা।

-‘এই টু ডোর ফিয়াটরেও আমার সাইড দেয়া লাগবো? কেমন লাগে কও’তো? আর কৈত্থেকা আইসা জুটছে সুবারু ষ্টেশনওয়াগন’,- ঘোরতর বিষাদের সময়েও পিন্টু গাড়ি বিষয়ক গল্প পছন্দ করে।

আমি মনে মনে খিঁচতে থাকি- ‘পোন্টিয়াক মানে হইলো- পুওর ওল্ড নিগার থিংস ইটস আ ক্যাডিলাক,- এখন নিজে চালাও, মানে বুঝছো, উপরে ছ্যাপ ছিটাইলে নিজে মুখে পড়ে, গাধা কোথাকার’।

এত্তও পড়তে পার বরফ! উইন্ডো নামিয়ে কিছুক্ষণ হাত পেতে ধরি, তালুতে থোকা থোকা জমে সঙ্গে মৃত মাছের শীতলতা। ভালো লাগে না, আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। সকালে ঘুম থেকে উঠতে, কসমেটিক ফ্যাক্টরীর কাজে গিয়ে গায়ানিজ সুপারভাইজারের মুখে মধু অন্তরে বিষমাখা চেহারা দেখতে অসহ্য লাগে। সারাদিন একনাগাড়ে লিপষ্টিকের মুখে ছিপি পরিয়ে লাগিয়ে বাসায় ফিরে পিন্টুর ছায়াও অসহ্য লাগে, অথচ প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ওর সাহায্য নিতে হয়, দিবসরাত্রি চেহারা দেখতে হয়।

পিন্টু’র স্মার্ট ফোন ড্যাশবোর্ডের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে ওর আড়চোখ চাউনিও দেখি, পাত্তা দেই না। লগ ইন করে অনলাইন হই। লোকজনের ষ্ট্যাটাস চোখে পড়ে। টেক্সাস থেকে বীথি- রাইটিং ফ্রম এয়ারপোর্ট, হোম সুইট হোম। দেশে যাওয়ার খবর গত কয়েকদিন থেকে আপলোড করে যাচ্ছে, ঢং এর তোলা আশি টাকা! হিংসার চিকন বাইন মাছ ত্বকের ভেতর ঢুকে মুখ তোতলা করে তুলতে চায়। দেখিস একদিন আমিও...। তারপর ঘোর বৃষ্টির দিনে দাদাবাড়ির পুস্কুনির পানিতে মাথা ডুবিয়ে থাকবো ঝাড়া মিনিটখানেক। হ্যা, আমি নাক মুখ চেপে ঘড়িতে টাইমার লাগিয়ে দেখেছি, বাথটাব পানিভর্তি করে ডুব দিয়ে দেখেছি, পারি দমবন্ধ রাখতে। দাদাবাড়ির আকাশ কী গাঢ় নীল! কাটা ধানক্ষেতের আল ধরে ছুটতে থাকতাম, চাচাতো বোন রুবিনার কোলে সবসময় একটা বেড়ালের বাচ্চা, ওর বছর বিয়ানী পোষা বেড়াল কখনো পেট খালি রাখতো না।

মন্থর গতির মধ্যে চলতে ফিরতে পার্কিং খুজতে পিন্টুকে ক্লান্ত দেখায়। আচ্ছা, ওকি আসলে ক্লান্ত! কতদিন

‘আমাদের সেই গ্রামের নামটি খঞ্জনা’ ওকে শোনাই না! এই একটা কবিতা শুনতে ভালোবাসে সে। আমরা তখন একটা বেইজমেন্ট এর ঘরে থাকতাম। আমার উইন্টার বুটের তলা খুলে গিয়েছিল টের পাইনি, সাবওয়ে থেকে সব মিলিয়ে দশ মিনিট হাটা পথে বাসায় ফিরতে গিয়ে ফ্রষ্ট বাইটে পায়ের আঙ্গুল কালো হয়ে গেলো। পিন্টু হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকে বুট সারতে সারতে হাসছিলো- ‘শালা, মুচিও হইলাম এইখানে আইসা’। তখন তখন আরেক জোড়া শৈত্যবান্ধব জুতা কেনার পয়সা ছিল না আমাদের।

এক গামলা লবণ গরম পানিতে পা ডুবিয়ে জমে থাকা পায়ের গোড়ালি আর আঙ্গুল মেরামত করতে করতে আমিও ঝড়ের পরে পাখির মত কেঁপেছি, হেসেছি আর ‘আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা’ আবৃত্তি করেছি। পরে সস্তা ক্যাম্পবেল স্যুপ এর ক্যান খুলে গরম করে খেতে খেতে আমরা গরম ভাতে ঘি আর ডিমভাজা মিস করছিলাম। পিন্টুর কাধে মাথা রেখে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা সোনি ১৭ ইঞ্চি টিভিতে সোপ অপেরা দেখতে দেখতে আমার পৃথিবী ঘরের দেয়ালবন্দী হয়ে উঠলে খুশীতে ডগমগ করেছি।

আমার কোন নাটক পিন্টু দেখেনি। ওর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হলো আর আমারও সাপের খেলা, কাঁখ জুড়ে ছাপা শাড়ি পেচিয়ে বেদেনী সেজে মঞ্চে অভিনয়ের দিন ফুরালো। ডিরেক্টর অতীশ’দা সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন আমাদের বিয়ের দিন চারেক আগে। শ্যামলা, খাড়া নাক তীক্ষ্ণ চোখ অতীশদার মাথা আর ধর আলাদা হয়ে গিয়েছিল। গ্রুপের ছেলে মেয়েরা মুখ চুন করে বিয়ের অনুষ্ঠানে এলো। আরো শুকনো শুভেচ্ছা জানিয়ে তারপর নিঃশব্দে চলে গেল। গ্রুপের প্রাণবন্ত ছেলেমেয়েদের চেহারা পিন্টু দেখেনি বলে বিশেষ ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। ওর আগ্রহের বিষয় এখানকার আইস হকি, আর কালে ভদ্রে টিভি সিরিয়াল, আর আমাদের ভূবন সংকুচিত করে তোলা গাড়ি সংক্রান্ত খবরাখবর।


পিন্টু ধৈর্য ধরে একটা পার্কিং খুঁজে যাচ্ছে, এখন একটু বেপরোয়া। কিছু বলতেও আমার ঠোঁট খুলতে ইচ্ছা করে না। চশমা রাখার খোপে মোবাইল আটকে ইউ টিউবে সিলেক্টেড গানের এ্যালবাম বাজে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডিজিটাল ডুয়েট। ওপারে মূখর হলো কেকা ঐ... আকাশের প্রাণ করে হু হু হায়, শুনে আমার ঠোঁটের ছিপি একটু আলগা হতে চায়। প্রাণ হু হু করা কাকে বলে পিন্টু কি জানে! সত্যি জানে?

ঘ্যান ঘ্যান করা তুষারপাত, এখানকার বৃষ্টিও আমার একই রকম লাগে। পিন্টু দু চারবার ছুটির সকালে ঘুম ভেঙ্গে দু’হাত তুলে চেচিয়ে উঠলেও আমার শাদা স্নো ফল কোনদিন ভালো লাগেনি, আমাকে কেবল বিষণ্ণ আর ঝিমুনীপ্রবণ করেছে।

মিনিট দশেক মত হয়ে গেলে হঠাৎ হুশ করে পার্কিং লট এর ধীর গতির অপেক্ষা থেকে বেরিয়ে আসে পিন্টু।

- ‘সময় আছে, চলো কোন ড্রিংকস নিয়া আসি’।
টিম হর্টনে কফি কিনবে, এখানে এসে অব্ধি খুব দ্রুত এই পুজিবাদী পানীয়তে আসক্তি অর্জন করেছে ও। কফিতে আমার হার্ট বার্ণ হয়, সেজন্য পিন্টুকে খোঁচাই, মজাই আলাদা।
আমাকে সামান্য অবাক করে দিয়ে টেইক এওয়ের স্পিকারে ফ্রুট স্মুদি অর্ডার করে ও। পিংক রঙ্গে প্লাস্টিকের গেলাশ ভরে আসে। যদিও কেন জানি আমার মন তিতকুটে কফির ঘ্রাণ প্রত্যাশা করছিল।

- ‘ডাক্তাররে বইলো কবে নাগাদ কি করতে হবে? ওই কি পারবে নাকি অন্য কাউরে রেফার করবে’।

সেই পুরান একঘেয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর। পিন্টুকে কখনো গায়নোকোলজিষ্ট এর কাছে নিয়ে যাই না। ও হয় পার্কিং লটে, না হলে ওয়েটিং রুমে শব্দহীন টিভির সামনে বসে থাকে। কেন জানি ডাক্তারের জন্য ব্রা প্যান্টি খুলে এপ্রণ পরে বসে থাকার সময় অন্য কেউ থাকলে লজ্জা লাগে। অথচ ওর চোরা চাউনিতে পাত্তা না দিয়ে কত বার নগ্ন, আদুল এলেবেলে গায়ে বসার ঘর, বাথরুম, শোবার ঘর করেছি! ডাক্তারখানা বোধহয় আয়নার মত এক জায়গা, শুধুই নিজের সামনা সামনি হওয়া যায়।

জানালার কাঁচ একটু নামাই। কন কনে ঠান্ডার ঝাপ্টা একটু কম, পরক্ষণেই ছুরির মত ধেয়ে এসে হাতের রোমকূপগুলো আরো বড় করে কোপায়। ঝট করে গাড়ির কাঁচ উঠিয়ে ফেলি। পরাক্রমশালী এই ঠান্ডার সঙ্গে খালি হাতে যুঝতে যাওয়া কেবলই বোকামী। পিন্টু প্রায়ই বলে যে আমি মানুষ হিসেবে বোকা। কিন্তু আমি জানি দিক নিশানা বুঝতে একটু বাড়তি সময় লাগলেও আমি তা না।

***

ডক্টর ডূসেত এর তিন তলার অফিস ঝকঝকে নতুন। কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের গোমড়ামুখো দিন। ওয়েটিং রুম ভর্তি মা হওয়া সম্ভব এমন বয়সী নারী আর দু’চারজনের সঙ্গে তাদের সঙ্গী পুরুষ। একজনকে মনে হচ্ছে এখুনি কন্ট্রাকশন শুরু হয়ে যাবে। আচ্ছা, মেনোপ্যজ হওয়া মহিলারা কি গায়োনকলজিষ্টের কাছে আসে না?

পিন্টু শব্দবিহীন টিভির প্রোগ্রাম দেখে খিটখিটিয়ে হাসে। এই সিনেমাটা আমরা টিভিতে দেখেছি, পুরনো ছবি, ‘ফুলস রাশ ইন’, বেখেয়ালে মা হয়ে যাওয়া সালমা হায়েক, বাচ্চাটা নষ্ট করতে চাইছে না। পিন্টুর হাসি বিরক্তি ধরায়। এখানে কি শুধু আমরা দুজন!

ওর ধারণা আমাদের বাচ্চাটা হয়ে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা পরস্পর পরস্পরের দিকে ঝুঁকে থাকবো একশ আশি ডিগ্রী এঙ্গেলে। এই জায়গাটায় ওর বুদ্ধি নিয়ে সন্দেহ জাগে আমার। আমাদের লেনদেনের সম্পর্কটা যে নেহাৎই শারিরীক এটা বহুরকমে ও আমাকে বুঝিয়েছে! আমারই তো বরং বুঝতে দীর্ঘ দিবস রজনী লাগলো।

বিশালদেহী নার্স আমাকে পিন্টু’র পাশ থেকে আলাদা করে নিয়ে গেল। ভাইটাল সাইন পরীক্ষা করবে। পিন্টু ফিস ফিস করে বলে দেয়- ‘সব বইলো কিন্তু’।

বোতাম ছাড়া নীল গাউন পরে ডাক্তারের এক্সাম টেবিলের ওপরে খালি পা দুলিয়ে বসে থাকি। জানালার তাকে একটা হলদেটে গাছ। আমার গোড়ালির ওপরে একটা তেরছা কাটা দাগ। পড়ে গিয়েছিলাম দাদাবাড়িতে খড় কাটা কাস্তের ওপরে। ক্লাস সিক্সে পড়ি কি তখন? মনে নেই। ডাক্তারের টেবিলে কিছু ম্যাগাজিনের সঙ্গে সেই কাস্তেটা আমার সামনে শুয়ে থাকে। একটা ম্যাগাজিন টেনে নেই, হাউ টু ডিল উইথ মিসক্যারেজ- প্রবন্ধ। বিরক্ত লাগে, খামোখা পাতা উলটে যাই, কিছু পড়া হয় না। আমি কিছুই প্রায় পড়ি না আজকাল। বই খুলে দু’পাতা পড়লেই মাথায় উড়ে পালাবার চিন্তা ভর করে। আজানুলম্বিত হাই তুলে বই ঠেলে দেই। পিন্টুকে ছেড়ে যেতে চাই, অথচ সারাক্ষণ ওর কথাই ভাবি। বসে থেকে ক্লান্ত লাগে।

এই ডাক্তার একসঙ্গে তিনজন পেশেণ্ট দেখে। একেক ঘরে একেক জন, একজনের পরে আরেকজন। কেন জানি ঝক্কর ঝক্কর মমিনশিং, ঢাকা যাইতে কতদিন’ এই মিনিংলেস রাইম মনে পড়ে, সঙ্গে একটা ধীরগতির রেলগাড়ির শব্দ।

আগামীকাল এপার্টমেন্টের চাবি দেবে কেয়ার টেকার। ছোট্ট একবেড রুম ষ্টুডিও ফ্ল্যাট, কিচেনে আগের ভাড়াটের হাড়ি কুড়িও আছে। ভাড়া আমার আয়ত্বের মধ্যে।

কাপড় চোপড় ছাড়া তো নেয়ার কিছু নেই। পিন্টুকে একটা রাইড দিতে বলবো? নাহ থাক।

-‘আমি এটা বায়োপ্সি করার জন্য ল্যাবে পাঠাবো,’ হাতের গ্লাভস খুলে ছোট্ট প্লাষ্টিক কন্টেইনার জিপ্লক ব্যাগের মধ্যে পুরতে পুরতে ডক্টর ডূসেত বলে। তার চুলে ফাঁপানো সাপের ফণার মত ঢেউ। ব্রাউন রঙ্গা মিনি স্কার্টের ওপর কালো ব্লাউজ, ডাক্তারী এপ্রণ পরে না। নাকের ডগায় চশমা রেখে চর্চিত পেশাদার হাসি দিয়ে অভয় দেয়, -‘ভয় পেয়োনা, তেমন সিরিয়াস কিছু না, সামান্য ক্লটেড ব্লাড দেখতে পেলাম, এটা নরমাল, তবু জাষ্ট রুটিন একটা বায়োপ্সি’।

-‘তুমি কন্ট্রাসেপ্টিভের কথা ভাবছো, তোমার স্বামী...

-‘নাহ, এবার আর ওকে ঘাটাব না, নিজেই দায়িত্ব নিতে চাই, ঐ যে বলে না, দেহ আমার সিদ্ধান্ত আমার।

ডক্টর ডূসেত হাসে- ‘অসুবিধা নেই, একটা ওভারঅল ধারণা পেতে এই ওয়েবসাইট কনসাল্ট করতে পারো। আর আমি দুটো পদ্ধতি’র জন্য প্রেস্ক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, ছয় মাস পরে আরেকটা এপয়েন্টমেন্ট নাও’, ঘসঘস কলম লিখে চলে ছোট্ট প্রেস্ক্রিপশন প্যাড।

-‘বাই দ্য ওয়ে, সেক্রেটারীর কাছ থেকে আমার কলিগের নাম আর কন্টাক্ট নিয়ে নাও। আমি একবছরের ম্যাটারনিটি লিভ এ যাচ্ছি, মিনহোয়াইল ও আমার ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল করবে...’

-‘ তুমি ম্যাটারনিটি লিভ এ যাচ্ছো!’

-‘হ্যা’, ডক্টর ডুসেত আলগা হয়ে বসে, ‘তোমাকে বলেই ফেলি, আমার মা হতে শারিরীক সমস্যা আছে। তাই আমি আর আমার স্বামী একজন সাররোগেট মাদার পেয়েছি যে আমাদের হয় এই কাজ করছে। আমরা এখন থার্টি টু’ উইকস প্রেগ্ন্যান্ট। বুঝতেই পারছো, কত কি প্রিপেয়ার করার আছে। তার ওপর আমাদের টুইন বেবী হচ্ছে- একটা ছেলে আর একটা মেয়ে’।

এতদিন আমার মনে হতো এই ডাক্তারের বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। শুনলাম বেয়াল্লিশ।

আমাকে ফিরতে দেখে পিণ্টু চোখে প্রশ্ন নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ডাক্তারের লেখা প্রেস্ক্রিপশন আমি ব্যাগের ভেতরে রেখে দিয়েছি বেরুবার আগেই।

-‘চল একটা ওয়াইন কিইনা বাসায় যাই, আজকে আর কোন কাজ নাই’

আজকে আমাদের যৌথজীবনের শেষদিন, সেলিব্রেট করার কথা গোপন রাখি। ওর মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়ার উপায় আমি ভালোই জানি।

-হ, এই ওয়েদারে ভদকা’র জুড়ি নাই’, খুশী হয়ে ওঠে পিন্টু... ‘ দাঁড়াও তাইলে স্যামকে একটা ফোন দিয়া কই যে আজকে আর আসতেছি না’।

রেষ্টুরেন্টে আজকে পিন্টুর বিকেলের শিফট ছিল।

***

পিন্টুকে ছাড়া কাকে বিয়ে করতে পারতাম আমি!-দ্বিতীয় গ্লাস পোর্তো রেড ওয়াইনে এ চুমুক দিয়ে আমি বিস্ময় মানি। আগামীকাল ভোর পর্যন্ত এটা আমার নিজের বাসা, তবু কেমন অতিথীভাব বোধ করছি! নাহ! পা তুলে সোফায় জাঁকিয়ে বসি।

পিন্টু পিজ্জা অর্ডার করছে ফোনে, হাতে লাইটার সিগারেট। বারান্দায় গিয়ে ধুমপান করবে। জ্যাকেট, বুট সব চড়াতে হবে আবার। তিন চার মিনিটের ধুমপানের আনন্দ বেশী না কি এই ধরা চুড়া চাপানোর ধকল, কে জানে। আচ্ছা, পিন্টুকে ছাড়া আর কাকে বিয়ে করতে পারতাম, বা কার সঙ্গে জীবন কাটাতে পারতাম!

আব্বা এই বিয়ে ঠিক করার আগে আমি আমাদের থিয়েটার গ্রুপের দুটো নাটকে মেইন ক্যারেকটার। মঞ্চ আমার দ্বিতীয় ঘরবাড়ি হয়ে উঠি উঠি করছে। আব্বার বরাবর উৎসাহ। অভিনয় নিয়ে সংবেদনশীলতা নাই এমন কারো সঙ্গে আমাকে বিয়ে দেবে না এই ভরসা ছিল। তবে ঠাট্টা করতো -‘তোরে আমি আমার ভাদাইম্মা বন্ধু মাবুদ শেখের সৌদি ফেরত ভাইগ্না রতনের সঙ্গে বিয়া দিমু, তাইলে ঘরজামাই থাকবো’।

আমি কখনো সখনো রতনকে কল্পনায় দেখতে চেয়ে শব্দ করে হেসেছি। ছোটখাটো, চালু চেহারা। শাদা প্যান্ট পরে হড়বড় করে কথা বলা ছেলে আমার একদম পছন্দ না। আব্বাকে বলতাম- ‘দিয়া দেও, রিহার্সেল শেষ হইলে বাসায় ফিরার সময় সঙ্গে থাকবো’।

তো, সৌদি ফেরত রতনকে নিয়ে মনে মনে আমি ঘোরাফেরা করতাম। রিহার্সাল শেষে কখনো একা ফিরতে হলে রিকশায় পাশে বসিয়ে নিতাম। এই রতন চেহারা সুরতে চালু হলেও নির্বিকার বসে থাকে, আমার সিদ্ধান্তে বাগড়া দেয় না।

বাসায় ফিরে আব্বার সঙ্গে ইয়ার্কি মারি- ‘রতনের সঙ্গে ফিরলাম’।

রতনের সঙ্গে পিন্টুর চেহারায় কোথায় যেন মিল আছে। ও যখন আমাকে স্পনসর করে টরন্টো নিয়ে এলো, তখন আমার পাশে ছায়ার মত বসে থাকা রতনের কান্নাকাটি টের পেয়েছিলাম। আর আমি রতনকে তখন থেকে মিস করতে শুরু করলাম যখন পিন্টু’র খবরদারি আর সিদ্ধান্তমাফিক আমাকে চলতে শুরু করতে হলো।

সিগারেট পিন্টু ধীরে সুস্থে খায়। আমি এই ফাঁকে দু একটা জিনিস গুছিয়ে রাখতে পারি, কিন্তু ইচ্ছা করছে না। বরং পোর্তো ভালো লাগছে। আজকে মনে হচ্ছে রতন আবার কাঁদছে। আমি মনে মনে রতনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।

আচ্ছা, পিন্টুকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি কেন আমি? ওর সঙ্গে সাত বছর হয়ে গেছে, আমাদের সন্তানাদি হয়নি তাই? অথচ পিন্টু সময় সময় ঘোর সংসারী। বাজারঘাট করে, ঘর সাফ করে। পিন্টু সব শিখেছে বিদেশে এসে। আর্মিরা ট্রেনিং এ যেমন করে শেখে। আমার এমনও মনে হয়েছে- ও বিছানায় কি করতে হবে এজন্যও কোথাও ট্রেনিং নিয়েছে। সব কিছুতে এত পারঙ্গম হয় কি করে! নিজের ভেতর এমন বাতিক ওঠার কারণ আমি অনুসন্ধান করিনি।

পিন্টু এখনো টের পায়নি যে আমি কাল এ বাড়ি থেকে পাকাপাকিভাবে চলে যাচ্ছি, অদ্ভুত না? আমি যে রোজ কাজ শেষ করে উইমেন শেল্টারের কাউন্সিলর এর কাছে যাই, বাড়ি ফিরতে দেরী হয় সেসব ওর জানার কথা না, ও তো তখন থাকে না। কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে কিছু আছে না? কোন ব্যত্যয় ওকে আক্রান্ত করে না দেখে আমার মন খারাপ হয়।

ওকে আগে থেকে কিছু বলবো না, ফ্ল্যাটে উঠে সব জিনিস গুছিয়ে এককাপ চা সামনে নিয়ে একটা ফোন করবো। বলবো আমি সংসার করার জন্য তৈরী হইনি।

ও আমার কথা বুঝবে বলে মনে হয় না। তবে ওর তেমন কিছু আসবে যাবে না। হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই ‘তথাস্ত’ বলে আমার না থাকা সেলিব্রেট করতে জনি ওয়াকারের বোতলের ছিপি খুলবে। কিংবা পুলিশে খবর দেবে!

পিজ্জা আসতে দেরী হবে। পিন্টু আবারো ওর গ্লাস ভরে নিয়েছে। চোখ একটু লালচে, এত খায় তবু দ্রুতই টাল হয়।

-‘বুঝলা তোমার ডাক্তারের কথা ভাবতেছিলাম,’ ডুসেতের সারোগেট মাদার নিয়ে বাচ্চার কথা ওকে বলছিলাম আসার পথে, ‘মানুষে এইভাবে বাচ্চাকাচ্চা নেয় আর আমরা নিজেরা...চলো আজকে রাত্রেই একটা বাচ্চা নিয়া নেই, তারপর তুমি আমি বাবা মা’।

পিন্টুর কথা আমার কানে যায় না। আমি ভাবতে থাকি আর কাকে বিয়ে করতে পারতাম আমি? থিয়েটারের গ্রুপের কাউকে? সজীব, নাকি বাবলু ভাইকে? ওরা দুজন এনজিওতে চাকরী করতো, আর এল্লিজিবল ব্যচেলর। নাকি ঘোরগ্রস্থের মত জীবনানন্দ আবৃত্তি করা আমাদের গ্রুপের ডিরেক্টর অতীশ’দাকে? ওনার বৌ, আট বছরের মেয়েকে ছাপিয়েও অতীশ’দার ঘেমো হাত, রাগী চোখ আমাকে আকর্ষণ করতো। অপঘাতে মরে যাওয়া অতীশদার মুখ দেখতে আব্বা যেতে দিলো না। সামনে বিয়ে।

আমার রোজ মঞ্চে উঠতে ইচ্ছে করে এখন, বিভিন্ন নাটক নিয়ে কোথায় কোথায় যে যেতে ইচ্ছে করে! এক্সপ্রেশন, ইম্প্রোভাইজেশনের অভিনয় সংক্রান্ত পাঠ ক্রমাগত বিস্মৃত হচ্ছি। আমার মঞ্চ চাই, চাই একের অধিক নাটক। কিন্তু পিণ্টুর সঙ্গে এই মঞ্চে রান্নাঘর আর বেডরুমের একটাই সেট। একটি মাত্র ভূমিকা।

পিন্টু ড্রইং রুমের আলো কমিয়ে দিয়েছে। রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় মৃদুমন্দ তুষারপাত দেখি। প্যান্টের পকেট থেকে নতুন এ্যপার্টমেণ্টের চাবিটা নিয়ে পার্সের মধ্যে রেখে দিই।

পিন্টু সিগারেট শেষ করে রান্নাঘরে কিছু করছে, ওর তেছরা মুখাবয়ব দেখা যায়। আমি স্বর তুলে আবৃত্তি করি – ‘তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখি, তাহার গানে আমার নাচে বুক’। পিন্টুর ছোট করে ছাটা চুলের নিচে কাঁধ দৃশ্যমান হয়, মসৃণ, নরম, ওখানটায় স্পর্শ করতে আমার ভালো লাগে।

কাপড় চোপড় না বদলেই ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা, শোবার ঘর এত দূরে কেন এ বাসায়। কালকে থেকে আমার একটাই ঘর। শোবার, বসার, এককোনে রান্না করার সব একসঙ্গে।

বাইরে তুষারপাত থেমে গেছে। পিন্টু একগ্লাস পানি নিয়ে আসে। আর আমি জানি ও এসে আমার কোমর আঁকড়ে ধরলে আমি এখন কিছুই বলবো না।



লেখক পরিচিতি
নাহার মনিকা

জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে। পড়াশুনা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন।
বর্তমান নিবাস : কানাডা।
গল্পগ্রন্থ : পৃষ্ঠাগুলি নিজের।
কাব্যগ্রন্থ : চাঁদপুরে আমাদের বরষা ছিল।
                 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন