শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মাসুদ পারভেজ এর গল্প - মাটির ভেতরে ঘর

বন্ধুরা সব কই চলে গেছে আর সে এখনো পড়ে আছে মেঝেতে। মাথার দু’হাত উপরে টাঙানো মশারি আর গলার দু’ধারে চিটচিটে ঘামের ফোঁটা ফোঁটা উপস্থিতিতে সে উঠে বসে। তারপর মাথাটা পেছন দিকে কাৎ করলে চোখে ভাসে ঝুলে মোড়ানো মরিচা ধরা ফ্যানের পাখা নির্বিকার হয়ে আছে তার মত। ফ্যানটা অনেকদিন ঘোরেনা নাকি ইলেকট্রিসিটি গেছে বোঝার কোন উপায় নাই। সে তখন ভাবেÑ এই জীবন চেয়েছিল নাকি! যদিও এটা তার প্রতিদিনকার শুরুর একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে। কোন জীবন সে চেয়েছিল তা আর মনে করতে চায়নি যখন সে মনে করেছিল: জীবন তো একটাই কী লাভ এত ভাবনায়!

বাড়ির সবাই যে যার মত কাজে বেরিয়ে যাবার পর তার সকাল হয়। ঘুণে ধরা প্রতিটা দিন একইরকম কাটাতে কাটাতে তাকে আর কেউ মানুষ মনে করে না কিংবা তার অস্তিত্ব সবাই ভুলে গেছে এটা মনে করে সে আবার মাথাটা কাৎ করে। রান্নাঘরের দরজা ঠেলে নেওয়া খাবারের নোনা স্বাদ আর মিউয়ে আসা রোদের ঝাপটা তার কাছে কোনো দেয়াল গড়ে না। এমনভাবে জীবন কাটাতে তার ভালো লাগে-না খারাপ লাগে এটা বলার মত মানুষ সে কাউকে পায়নি। তখন পুরান বন্ধুদের স্মৃতি হালকা ঝাপটা মারে। অতীতে ঘাঁই দিয়ে সে নিজেকে কিছুটা স্থির করতে চায়। তখন কয়েকদিন আগের ঘটনাও তার মনে নড়চড় করে। তার ভাবী সেদিন বাপের বাড়ি গিয়েছিল আর তার ভাইকে সকালে গোসলে যাওয়ার আগে সে আবিষ্কার করেছিল রান্নাঘরে কাজের মহিলার সাথে। সেদিন তার ঘুম ভাঙে পেশাবের চাপে। পরে যখন সে ভাত খেতে বসে তখন টেংরা মাছ মুখে দেওয়ার সাথে সাথে তার গা গুলিয়ে ওঠে। কাঁচামাছের গন্ধ তার সারা শরীরে পাক খায়। তখন বমির দমক উঠলে চারপাশে একধরনের শূন্যতা ঘিরে ধরে। ঘিরে ধরা শূন্যতাকে পাশ কাটিয়ে যখন বুঝতে পারে সে থেকেও নেই তখন বিষয়টা জটিল হয়ে ওঠে।


অস্তিত্বের খোঁজে তাকে অনেক পেছনে মাথা ঘোরাতে হয়। তখন তার হাতে কিছু কাগজ ঠেকে। কোন সময়ে কী লিখেছিল তা মনে করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠতে হয়। ব্যস্ততার মাঝে সে কিছু গল্প পায়, কিছু কবিতা পায়। তার লেখা গল্প দু’য়েকটা ছাপাও হয়েছিল, ধরে থাকলে হয়ত আরো কিছু হত। ইয়ার-দোস্তরা যে অনেক দূর চলে গেছে।


সে তখন খাদিজার মৃত্যুর কারণ খোঁজে। এটা নিয়ে কার সাথে যেন ভার্সিটিতে নাকি আজিজ সুপার মার্কেটে নাকি শাহবাগ মোড়ে বাহাস হয়েছিল তা মনে পড়ে না। খাদিজার মৃত্যুর কারণ পরিষ্কার নয়, রহস্য হয়ে আছে। আতœহত্যা নাকি পুকুরে ডুবে মরণ কোনওটাই পরিষ্কার নয়। গ্রামের একটা মেয়ে সাঁতার জানে না, কেমন জানি খোটকা লাগে, তাও আবার নদী এলাকা। হিসেব মেলাতে গেলে তালগোল পাকিয়ে যায়। আর মেয়েটাওতো চুপচাপ স্বভাবের ছিল। বুঝার উপায় নাই সে মোহাম্মদ মোস্তফাকে মনে মনে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিল কিনা। তবে মোহাম্মদ মোস্তফার আতœহত্যা সব রহস্য আরো ঘোলাটে করে। বিচারক হয়ে সে তার বিচার নিজেই করেছিল। এটা তো আর কারো বুঝার ক্ষমতা নাই, পুরোটাই তার মনের ব্যাপার। মরণ কার কখন হয় এটা কি আর দিনক্ষণ হিসেব করে বলা যায়! এসব ভাবতে ভাবতে ঝুলে মোড়ানো ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মোহাম্মদ মোস্তফাকে ঝুলতে দেখেও মনে আশা জাগে।


আশা তার অনেক আগেই ফুরিয়েছে। তখন সে আবার ভাবে জীবন তো একটাই। হিসেব করলেও তা মরণের দিকে হাঁটে হিসেব না করলেও মরণের দিকে হাঁটে। তখন হয়তবা মরণের খোঁজে আর না হয় জীবনের টানে সে কাঁচা মাছের গন্ধ আর বমির দমক নিয়ে বের হয়ে যায়।


২.


ইস্টিশনে অনেক মানুষের সাথে সে জীবনের খোঁজ করে আর না হয় মরণের খোঁজ করে। ধীরে চলছে ট্রেন। পোড় খাওয়া বগিগুলোর ভেতর রসুনের যোয়ার মতন বেঁকেচুরে থেকেও মানুষগুলো কেমন নির্বিকার। অবশ্য বিকার করলে বা কি আসে যায়! সবাই কি আর সমান ভাগ্য নিয়ে জন্মায়; না সমান ভাগ্য নিয়ে মরে! এই তো হরহামেশা শোনা যায় বেওয়ারিশ লাশ হওয়ার ঘটনা। তখন বলতে হয় আহারে! এই মরণ ছিল কপালে, একফোঁটা পানিও জুটল না মুখে। তখন ইস্টিশনের পত্রিকার স্টলে লোকাল প্রিন্টের দেবদাস তার চোখে পড়ে। দেবদাসটা কি কম হতভাগা! পারু পারু করতে করতে মরে কিনা পারুর বাড়ির দরজায় তাও পারুর দেখা মিলে না। একেই বলে নিয়তির লীলা। তার নিয়তিটা কেমন, এই যে লোকাল ট্রেনের বগির ভেতর বসে বসে এসব ভাবছে তা কি ভাবার কথা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর কি হবে! চাকরিটা তো তার পাওনা ছিল। যোগ্যতার বিচারে। নিয়তির কোন প্যাঁচে পড়ে তার চাকরিটা হয়নি এটা সে আবিষ্কার করে আরও কিছুদিন পরে। ততদিনে চাকরির সাথে সাথে তার প্রেমিক ভাগ্যও গেলো। আর কতদিন বা মিছে আশা নিয়ে বসে থাকে জীবন! কারও কারও তো গতি দরকার পড়ে। গতি আসলো তার প্রেমিকার জীবনে। সেই থেকে তার কেমন যেন গলে যাওয়া শুরু হয়।


পাড়া থেকে দূরে যে রাস্তাটা তার প্রেমিকার বাড়ির দিকে গেছে হঠাৎ কি-বা মনে করে সে একদিন বসেছিল সেই পুরান মহাবয়স্ক বটের শানবাঁধানো গোড়ায়। সেদিন সে দেখেছিল অনেকদিনের পর তার বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রেমিকাকে। মুখোমুখি হওয়ার বদলে সে কেন বটবৃক্ষের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিল তা বুঝতে পারেনি। অবশ্য বুঝার সামর্থ্য কিংবা ক্ষমতা সে অনেক আগেই হারিয়েছিল। এর অনেকদিন বাদে সে যখন ভাতের সাথে কাঁচা টেংরামাছ কামড় দেয় তখন সে বুঝতে পারে যে, তার অস্তিত্ব অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।










৩.


অস্তিত্বের খোঁজে এই লোকাল ট্রেনে সে আবার ছুটেছে। কিন্তু গতিহীন লোকাল ট্রেনে ঠেসে থাকা মানুষগুলোকে তার কেমন যেন আপন লাগে। কালো কিষ্টি গতরের বাউলা মানুষটার ভেতর থেকে কি মিহি সুর ঝরে_


একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর


ও মন আমার কেন বান্ধিস দালান ঘর...


ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা বাতাসের সুড়সুড়িতে তার চোখের পাতা ভারি হয়। ভারি চোখের পাতা নিয়ে সে দূরের আকাশ; কানি বক; জলভূমি; শ্যাওলা; মানুষ; মাছরাঙা; পাথার; কিষাণি; বৃক্ষ; পাথর দেখে। এসবের ভারে তার ঘুম পায়। ঘুমঘুম চোখ নিয়ে সে_ রূপকথা-রাজ্য-রাজকন্যা; নানা-নানি-কেচ্ছা-কাহিনি; অপু-দুর্গা-কাশবন; রেললাইন-রেলেকাটা লাশ; চড়াদুপুরে ঘুঘুর ডাক, পানাপুকুরে ডুবসাঁতার; মক্তবের একচোখকানা মৌলবি; প্রাইমারির মাঠ খোঁজে। তখন কার যেন হাত তার বুক পকেটে আলগোছে ছোঁয়া দিলে তার খোঁজে ভাটা পড়ে। খোলাচোখে তখনও সে দেখে বাউলা মানুষটা গান ধরে আছে_ এমন মানব জনম আর কি হবে...


স্বপ্ন ও ঘুম কিংবা ঘুম ও স্বপ্নের কারিকুরিতে সে থিৎ পায় না কোন ইস্টিশনে এসে ট্রেন থেমেছে। ভাঙা হাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষের বিচরণে সেও মিশে যায়। মানুষের সাথে মিশে যেতে তার ভালো লাগে। তখন বাউলা মানুষটা তাকে গামছায় বাঁধা চিড়া আর গুড় খেতে দেয়। সে তখন মানুষটার দিকে তাকিয়ে ভাবে_ মানুষ কি শুধু জীবনের খারাপ স্মৃতিগুলোই মনে রাখে!










লেখক পরিচিতি

















নাম: মাসুদ পারভেজ


জন্মসাল : ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫


জন্মস্থান: দিনাজপুর


শিক্ষালাভ: বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


বর্তমান আবাসস্থল: সিলেট


পেশা: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট


লেখার শাখা: কথাসাহিত্য, প্রবন্


প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: ঘটন অঘটনের গল্প, বটতলা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, ঢাকা








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন