শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

আবুল হাসান এর গল্প : সমুদ্রের ফেনা


আমিনার অবয়ব এখন বিশ্বাসহীন আঁধারে গলে গলে একেবারে আধার হয়ে গেল, সীমাহীন ভয়াবহ আঁধার। কবরের খোলের মতো হালকা, বিপদগ্রস্থ আমিনা। তার ঘনবয়ব গোপনে, তার পরিপূর্ণ মুখে ঝুরঝুর করে অভিশাপ ঝরছে আর সাথে সাথে ঘূর্ণির মতো পাক খাচ্ছে তার ললিত বয়স, ব্যঞ্জনIময় স্বপ্ন। অনায়ত্ব আমিনা তার আঁধারের গলায় মুখ লুকিয়ে কাঁদলো-বালিশের আগুনে একটা একটা করে চুল, চুলের সুগন্ধ পড়ে যেতেই তার শেয়ে থাকা প্রোফাইল, গ্রীবার মৃণাল, ঠোট গলে যেতে জানালা গলিয়ে আকস্মাৎ মেঝেতে ছটফট করলো বুনো হাঁসের দুটি রজত পাখা।

তরল শাদায়, পাল ছেঁড়া, ভাঙ্গা, নাবিকবিহীন নিমজ্জিত নৌকার মতো অথৈ বিনাশে যেন ডুবে যাচ্ছে সে, এমন মনে হলো আমিনার। ও পাশে জ্যোৎস্নার ঠান্ডা হেহ ভিজিয়ে তার ভাই তার ছোট বোন; তারা জানছে না আমিনা এখন দুভাগ হয়ে যাচ্ছে-তাদের আমিনা আঁধার হয়ে যাচ্ছে, একটা ভবিষ্যত, বালিশের অবিশ্বাস্য আগুনের মতো হলুদ দাঁতে তার আপাদমস্তক চিবিয়ে অন্তঃসারহীন করে রেখে যাচ্ছে।

তার ভাইয়া ওপাশে তখন শাহনেওয়াজের পরোক্ষ গলায় হাত ডুবিয়ে দিচ্ছে, ঠান্ডা আঙ্গুলে তার হাত দুটো একত্র করে শাহনেওয়াজের সিমসাম পাপড়ি খুলছে। কাল ভাইয়া অধিক রাতে এক নিষিদ্ধ মেয়েমানুষের দুষিত শক্তিতে ইন্দ্রিয় রেখে আজ আবার শাহনেওয়াজকে নিয়ে তৎপর। আমিনা দেখছে, তার ভাইয়া তার কাছে কিছুই লুকোয় না। আমিনার কাছে ওর ভাইয়া সব বলে। নিষিদ্ধ শক্তির গন্ধ, প্রেমানুগ শাহনেওয়াজ, কবিতা, চাকুরি ভাল্লাগেনার সব কথা বলে আমিনার কাছে।। কিন্তু আমিনা কিছু বলতে পারে না বলেই ওর এমন ডুবে যাওয়া।পুড়ে যাওয়া। খুলে খুলে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া। কিন্তু না, বলবে একদিন সব ওর ভাইয়ার কাছে। তার আরেকটা জন্মের দরকার। না বললে, নিঃশেষ করে দিতে না পারলে, পুনর্জন্ম হবে না ওর।


ভোরে ঘুম কামড়ে থাকায় সারা দেহ থেকে শাড়িটা গুছিয়ে নিতেই ব্লাউজের তলাটা তার সুড়সুড় করে উঠলো।একটা অবর্তমান রোষ তাকে কামড়াচ্ছে বলে, তার মনে হলো, সে যদি বর্ষার দোলা ঢেউয়ের ওপর একজনের হাতে বাওয়া নৌকায় শুয়ে শুয়ে সারাটা রাত কাটাতে পারতো। ভোরবেলায় ঘুম জড়িয়ে থাকলে তার মনে হয়-এ বাড়ি থেকে পালিয়ে একটা পাহাড়ের উপর, যেখানে শালপাতার গান, নুড়ির চুমু খাওয়া সন্নিধান আর বুনো ঝরনার অনচ্ছ নাচ-আর পারিপাশ্বির্ক- একটা বাংলো শান্তিময়, দুটো পাশাপাশি পাখির মতো জানালা কাটা ছায়া যার ওপর উঠে বসে; ঠিক অমন একটা বাংলোয় সারা বিকেল ধরে, সারা দুপুর ধরে সে যদি ঘুমুতে পারতো। কিন্তু সে পারেনা বলেই তার যন্ত্রনা, সে ভাইয়ের মতো সবকিছু খুলে বলতে পারেন বলেই তার ডুবে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া।

ঘুমের মধ্যে তাই তার শয্যা, তার সিঁথি, তার বুক তার যৌবন-কোমল জায়গা, তার নিজেরও-ইচ্ছে-করেনা-দেখতের টলটলে লজ্জা কেমন ঘাস, প্রজাপতি, নদীর ঢেউ আর নদীতে বাধা ছোট ছোট নৌকা হয়ে যায়। আর এই বিভিন্ন সম্পদ নিয়ে সে অবিকল একটা সরোবর-যার উপর দিয়ে তার আনন্দের বাতাস, তার নিরানন্দের ঘূর্ণি চাঁদের দেহকে টুকরো টুকরো করে গলিয়ে দেয়।

একদিন জ্যোৎস্না রাতে তাই হয়েছিল। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারেনি আমিনা। ভাই বাড়িতে ছিলনা সেদিন। ছোটবোন পড়ার টেবিলে মাথাটা সোপর্দ করে দিয়ে ঘুমে মগ্ন যখন, তখন সে বাইরের রান্নাঘরের ওদিকে, যেখানে একটা নীলমনি লতা আর কামিনীর ঝোপ পরস্পর মেশা, তার পাশে একটা বড় ধরণের দেবদারুর গাছ- যেখানে দাড়িয়ে অবিকল সে যখন অতীতে নিমজ্জিত, তখন কেন যেন মনে হলো তার- তার সামনে-তার পশ্চাতে একটা রুপোলী সরোবর ঢলঢল জল নিয়ে থৈথৈ করছে আর নীলমনি লতা, কামিনী ঝোপ, দেবদারু গাছের পাতা শ্বেত হংসের মতো পাখা ঝাপ্টাচ্ছে স্বপ্নভিতরের দোকানঘরের সুগন্ধ মাখবে বলে। আমিনার দেহ থেকে কেমন একটা হালকা ব্যর্থতা ঐ রুপোলী সরোবরে চালিয়ে যাওয়ায় তার মনে হলো এখন ঘরে ফিরে যাওয়া দরকার। ঘরে ফিরে এসেই দ্যাখে, ভাই; ভাইয়ের বন্ধু। তাদের চোখের আঁধার েমন চিতা বাঘের মতো জ্বলছে।

সেদিন ভাই আর তার বন্ধু খুব বেশি মদ খেয়েছিল-খূব বেশি। ভাইয়ের ঘর বন্ধ কর, দুবন্ধু পরস্পর গেলাসের পর গ্লাস টেনে টেনে নিজেরা যখন অভ্যন্তরগামী, হৃদয়গ্রস্থ, তখন তারা শাহেদের শিল্প, ভাইয়ের কবিতা নিয়ে সমালোচনা করছিল পরস্পর।

: শাহেদের খুব প্যাশোনেট হাত ছিল। ওয়াটার কালারের যে আচর - আমার মনে হয় ও কনষ্টেবলের আঙ্গিক নিয়ে আঁকে। কিন্তু ও আর ছবি আকবে না, ও ছেড়ে দেবে। ওর কবিতা ও পুড়িয়ে দিয়েছে। কবিতা-ছবি-শিল্প, এতে নাকি কিচ্ছু হবে না। ও ফিরে যাবে বলেছে। গাঁয়ে ফিরে মাকে নিয়ে থাকবে। ও সবসময় বলে আজকাল, আমি শান্তি চাই, বুঝলে, আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই। না অর্থ, না যশ; ওগুলো জবাই করা পশুর রক্ত। ও রক্তে আমার পিপাসা মিটবে না।

: ও একটা মেয়েকে ভালবাসতো।
; কিন্তু ওকে কোনদিন ন্যুড করে একটা ছবি আকতে পারেনি বলে ওর দুঃখ।
মারিয়া ন্যুড হতে জানতো। মারিয়ার বাবা তাকে দিয়ে টাকা কামাতো। মেয়েটা শাহেদকে অনেক দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শাহেদ মারিয়াকে ভালবাসতে পারে নি। শাহেদ মারিয়াকে ছ্যুঁয়েও দ্যাখে নি। শাহেদ ওর একটা ছবি এঁকেছিল। ন্যুড। কেমন শ্যাওলা দিয়ে ঢাকা একটা ন্যুড। আর পাশে দুটো খরগোশ। মারিয়ার ন্যুড ব্রেষ্ট, ন্যুড থাই আঁকতে গিয়ে শাহেদ একটুও উষ্ণ হয় নি, বুঝলে! কিন্তু মারিয়া ওকে খুব ভালবাসতো। ওর জন্য করাচি থেকে একসেট সুন্দর পোষাকও নিয়ে এসেছিল মারিয়া। বলতে শুনেছি তাক, শাহেদ খুব বড়দরের শিল্পী বুঝলেন। ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। ও মদ খেয়ে ওর প্রতিভা নষ্ট করে দিচ্ছে। ও প্রেরণাহীন হয়ে যাচ্ছে।

: মারিয়া জানতো ও একটা মেয়েকে ভালোবাসে।
: আমি বলিনি মারিয়াকে, ও একটা ভার্সিটি মেয়েকে ভালোবাসে।
: একটা নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েকে ভালবাসে শাহেদ। আমি ওকে বলেছি; শাহেদ চলে যাবে। শাহেদ বাড়িতে গিয়ে ওর মাকে নিয়ে থাকবে। একটা পায়ে মাড়ানো ঘাস যেন, এমন মাথা ন্যুয়ে এসেছিল মারিয়ার। মেয়েটা ! একটা প্রতিভা বিকাশের জন্য যে আপাদমস্তক, আহৃদয় বুদ্ধি ছিন্ন করে খুলে দেখাতে পারে, তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হলো। মারিয়ার জন্য মায়া হয়। ও এখন কোথায় আছে জানিস?:
: লাহোরে
: হ্যাঁ, ওর বাবা একটা ব্রুট। ওর বাবা ওকে দিয়ে টাকা কামায়। ওর বাবা একটা পশু।
: শাহেদের কাছে যাওয়া দরকার। শাহেদ একটা লোরকা। শাহেদ একটা বিষন্ন আত্না। ও আর কবিতা লিখবে না।
: ও আর ছবি আঁকবে না
: ওর একটা ছবির জন্য আমি সারারাত ঘুমাই নি, জানিস সেই যেখানে সমুদ্রে জাহাজগুলো ছেড়ে যাচ্ছে আর একজন বৃদ্ধলোক, হাতে যার দুটো শ্বেতকপোত, ঝুঁকে পড়েছে, যেন মনে হচ্ছে জাহাজের ঠিক সময়ে বৃদ্ধটা আসতে পারে নি বলে ওর এমন ঝুঁকে পড়, সারা পোষাকে যেন একটা সিনসিয়ারিটি অব এ্যাঙ্গুইস। বৃদ্ধের চারপাশে আকাশের ওপর মেঘ-সামনে সমুদ্রের ভীষণ ঢেউ আর জাহাজটা তার ওপর দিয়ে দুলে দুলে চলে যাচ্ছে। বন্দরে কোন লোক নেই, সেই বৃদ্ধ শুধু এক, শুধু একা।

৩.

শাহনেয়াজের গান নিয়ে লেখা ভাইয়ার কবিতাটা আমিনাকে কতদিন শুনিয়েছে। তার ভাইয়া আর নাকি কবিতা লিখবে না। ভাইয়া আর কোনদিন ওর বন্ধুকে নিয়ে আসবে না। ভাইয়া আর কোনদিন কোন কথা তাকে খুলে বলবে না। মারিয়া একটা সুইট মেয়ে। সবজির গন্ধভরা মেয়ে মারিয়া। কী প্যাশোনেট ছিল মেয়েটা-শিল্পের ওপর, হৃদয়ের ওপর।

কিন্তু মারিয়া এখন খোব কষ্ট করছে লাহোরে। ওর বাবা একটা ব্রুট। মারিয়া তুমি ভালো থাকো। তোমার কল্যাণ হোক। মারিয়া কি কোনদিন সন্ধ্যায় একা একা শাহেদের জন্য কাঁদবে? বাবাকে মারিয়া কোনদিন কিছু বলে নি। তার বাবা। ধীরে ধীরে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া তার বাবা। মরে যাবে একদিন। বাবার জন্য মারিয়ার খুব কষ্ট। শাহেদের জন্য কষ্ট।-মারিয়ার মতো মেয়ে জীবনভর কষ্ট বয়ে বেড়ায়। ওর মতো প্যাশোনেট মেয়ে জীবনভর যা খোঁজে তা পায় না। এই সব ভাবতেই আমিনার মনে হলো, তার আবার পূনর্জন্ম হচ্ছে। তার আঁধার ফিরে যাচ্ছে। তার সরোবর তাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে না। তার যন্ত্রনা তাকে খুলে খুলে অনায়ত্ব কাঁটায় গাঁথছে না আর।

স্মরণশক্তি আর পশ্চাদজীবনের তন্ময়তা যখন প্রখর হয়ে ওঠে, আমিনার তখন ভীষন ইচ্ছে হয়, মারিয়ার মতো যদি সে কাউকে ভালোবাসতে পারতো-ভালোবেসে ভীষন যন্ত্রনা পেতো, আর জীবনকে উপলদ্ধি করতে পারতো।

ভাইয়া সে রাতে বলেছিল আমাদের এখানে ওসবের কদর নেই। শুধু কবিতায় জীবন চলে না। শুধু শিল্প নিয়ে জীবনের অর্থ হচ্ছে তলা ফুটো নৌকো। সুতরাং অন্য কাজ করা চাই। অর্থরোচক, স্বার্থসিদ্ধ কাজ।

সুজিতকে বলেছিল ভাইয়া, এখন তোর কাজে নামা উচিত। ঠকানোর কৌশল আয়ত্ব করা উচিত। দেখিসনা সব অপর্চুনিষ্টরা কেমন আঙ্গুল নাচিয়ে একের পর এক উঠে যাচ্ছে। দেখিস না সব হার্টলেস ব্রুটদের এখন কত কদর।

: আমি কালো ঘোড়ার পেছনে ছোটাটাকে আরো হার্টলেস মনে করি। আমি ছেড়ে দিয়েছি।
: কী?
: কবিতা লেখা।
: কেন?
: আমার আরো অনেককিছু করার আছে। আমি আরো অনেক কিছু করতে পারি। গাঁয়ে ফিরে চমৎকার একটা মাস্টারি তো জুটবে। ওখানে গিয়ে ছেলেদের ভেতর কবিতা চালিয়ে দেব। বলবো, ভালবাসতে না শিখলে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। শেখাবো, ফুলের চাষ না করলে ফলও বেশি করে ফলে না।

: একে একে তোরা সবাই চলে যাবি। শাহেদ, তুই। বেশ। বেশ। যা। চলে যা। তারপর ভাইয়া কেন ঠান্ডা বাতাসের মতো কমনীয় নিশ্বাস টেনে কিছুক্ষণ নৈঃশব্দের পর আবার বলেছিল, আমাদের দেশে শেষকালে  তাই-ই হয়। হতে হয়। আমরা বড়কিছু আশা করতে পারি না। আমরা প্রথমে সমুদ্রের মতো বিশাল, তারপর নদী, তারপর খাল, তারপর পুকুর, তারপর শেষাবধি কুয়োর জীবনকে বিছিয়ে দেই শামুকের মতো। আমাদের তাই কিছু হয় না। কিচ্ছু করতে পারিনা আমরা।

৪.

শাহেদের গ্রামে ফিরে যাওয়া হলো না আর। অরণ্যময় একটা তাড়না তাকে যেতে দিল না। শাহেদ আজকাল ছবি আঁকে না। কবিতা লেখে না। শাহেদ একেবারে ইনএ্যাকটিভ, ইনআর্ট হয়ে গেছে প্রেরণার ব্যাপারে। হাসানের সাথে একদিন লঞ্চ-ঘাটে দেখা। খুব রাত্রে। টারমিনালকে হাসানের কাছে ভার্সাইয়ের নদীতে ভাসা জাহাজের মতো মনে হয়েছিল। সদরঘাটের দোকানগুলো ছোটো বউদের মতো নমনীয়। নিষ্প্রভ আলোছায়য় নদীর ওপর আইডব্লুটি জাহাজ, মালভর্তি বড় বড় নৌকা, পাল খাটানো নাও দেখছিল শাহেদ টারমিনালের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে। ওর বাড়ি থেকে সাড়ে এগারোটায় লঞ্চে আত্মীয় আসবে। ওর বাড়ি থেকে ওর আত্মীয় মায়ের মুখের কথা নিয়ে আসবে। লঞ্চ এলেও আত্মীয়ের দেখা না পাওয়ায় শাহেদের হাতের মুঠোয় তখন টারমিনাল আইডব্লুটির জাহাজ, পাল খাটানো নাও অনায়াত্ত মেঘ হয়ে গেল—শাহেদ দেখছিল, টারমিনালের পাশ-ফেরা জলে তারাগুলো পাতিহাঁসের মতো কেমন ডুবে ডুবে সাঁতার কাটছে—আর মেঘগুলো জল ছিটানো বালকের মতো ব্যাকস্ট্রোকের ভঙ্গিতে ভেসে যাচ্ছে জলের ওপর দিলে।
সে রাতে ওরা সুজাতের বাড়িতে গিয়েছিল। যেতে যেতে মায়ের কথা মনে পড়ায় শাহেদের গলা সূর্যাস্তের মতো অভিভূতি পাকিস্থলীতে ডুবে যেতেই মনে পড়ে গেল, শিমু ফুফু একটা লোকের জন্য কোরআন শরীফ পড়ে কাঁদতো। সেই লোকটা শিমু ফুফুকে বিয়ে করে আর একটা বিয়ে করেছিল। লোকটা শিমু ফুফুকে আর কোনোদিন নিতে আসে নি।
সেভেন ক্লাসে পড়ে তারপর ফুফু বাড়ি বসে চিলে-বাচ্চা-নেয়া ডোমেস্টিক মুরগির মতো অস্থিরভাবে এ-ঘর ও-ঘর করতো। আর মাঝে-মধ্যে মায়ের রান্না-বান্নায় একটু-আধটু সাহায্য।
গোয়ালঘরের পাশের আমতলায় শুয়ে তখন সে খুব ছোটো, দেখতো, হাইস্কুলের ছেলেরা পুকুরের আশশেওড়া মাড়াতে মাড়াতে চলে যেতেই উতরোত্তোর ত্রস্ত হয়ে ফুফু তাকে বলতো , ‘যা না, পুকুরের হাঁসগুলো তাড়িয়ে দিয়ে আয়। দুপুর হলে ওদের জন্য আর গোসল হয়ে ওঠে না। জলগুলো একেবারে ঘোলা করে দিয়ে যায়।’
হরিদ্রাভ তরলতায় গাছপালাগুলো সোনালী আঁশ ঝাঁকে ঝাঁকে ছড়িয়ে দিয়েছে তখন তাদের পুকুরে। কিন্তু ও আর হাঁসগুলো তাড়াতে পারতো না। মনে হতো, ওরা ফুফুর মতো কষ্ট পাচ্ছে। তাড়িয়ে দিলে ওরা অন্য কোথাও যেতে পারতো না। দেখতো শাহেদ চোখ মেলে, মাঠের ওধারে কোনো কিছু দেখা না। সড়ক বেয়ে দু’একটা গরুর মন্থর গতি ছাড়া। চাদ্দিকটায় সপ্রতিভ রোদ। আর ওরা রুপালি পোষাকে মাথা গলিয়ে দিয়ে কালো ঘোড়ার মতো মেঘগুলো খুর দিয়ে যেন আকাশকে ভেঙে ফেলেছে, বুঝি এই-ই ভেঙে পড়বে, এমন ভাবতে ভাবতে ও তারপর চলে চলে যেতো ডাঙার দিকে। ধানের ওপর লম্বা হাত-পা মেলে দিয়েছে যেখানে হালকা গাঢ় বাতাস ঘুমিয়ে পড়েছে। আর এই সুযোগে বেল গাছতলায় কয়েকটা ছেলে গরুর ভাঙা চোয়াল, ঝিনুক, কড়ি, তেঁতুলের বিচি দিয়ে হাট বসিয়েছে। এসব মনে পড়তেই হাসানকে বললো শাহেদ, “ আমি যদি সাত বয়সে মরে যেতে পারতাম।”
: সাত বছর তো অনেক সময়।
পস্পর কথা বলতে বলতে পশারিনী অতীত সরিয়ে সরিয়ে তারা যখন সুজিতের ঘরে পৌঁছালো, দেখে ঘরে তালা  ঝুলছে। সুজিত চলে গেছে। সুজিত খুব ভালো কবিতা লিখতে পারতো। ওর একটা গল্পের সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল হাসানের, যেখানে সেই সমুদ্র ঝড় আর একটি যুবতী। দেখছে ঝড় এগিয়ে আসছে; কিন্তু তার কোনো খেয়াল নেই, অবিকল উর্বশীর মতো দেহ নিয়ে নির্বিকার সে, কিন্তু ঢেউয়ের ছোবল আসতে আসতে তার কাছে এসেই কী অদ্ভুতভাবে মিলিয়ে গেল। ঢেউ থেমে যাওয়ার বর্ণনাটা তার মনে পড়লেই চোখের সামনে, কানের ভেতর অবিকল যেন তেমন কিছু অনুভব করে হাসান।
সুজিতকে না পেয়ে অগত্যা ওরা গুলিস্তানের মোড় দিয়ে রেলওয়ে হাসপাতাল বাঁয়ে ফেলে শাহেদ তার ডেরায় ফিরে গেল। হাসান গাঁয়ের কবরগাহ দিয়ে হাঁটছে এমন অভিভূত পদে হাঁটতে হাঁটতে যখন বাড়ি ফিরলো, দেখলো, আমিনা—যার দেহ থেকে পা পর্যন্ত আলগা, জানালার ‘খোলা’ দিয়ে দেখা যাচ্ছে তাকে। একটা আমিষ বিচ্ছুরণ বেরুচ্ছে তার গা থেকে। ঘরে বাতি জ্বালানো বলে বুকের দু’ভাগের মধ্যখানটায় পাহাড়ের পাদদেশের আঙ্গুর বাগানের মতো একটা কালো তিল দেখা যাচ্ছে।
আমিনা অনেক বড় হয়ে গেছে। আমিনার বুকের মধ্যে অপর্যাপ্ত শ্যাওলা ও মাছ। জানালাটা ভেজিয়ে দিয়ে ‘ও বড় নিঃসঙ্গ’ ধরনের স্বগতোক্তি করে ঘরে ঢুকতেই দ্যাখে, সামনের চৌকাঠে একটা বিড়াল ঘুমানো, খাটো খাটো ছায়া ঝুলছে খিকড়ির পাশের জায়গাটায়। আর একটা অবিভক্ত মেঘ খুলে ফেলে চাঁদ আপেল-চুরি-করা বালকের মতো দৌঁড়ুচ্ছে ভীষণ।
হাসানের ঘুম হবে না আজ। হাসান অনেক দিন ঘুমায় না। কবিতা লেখে না।  ‘চাকরি ভাল্লাগে না’ বলে সংবাদপত্রের কাজ নিয়েছে। চাকরিতে তার মতো লোক শান্তি পায় না। বাংলাদেশের চাকরি মানে ইচ্ছের বিরুদ্ধে দৌঁড়ানো। শাহনেওয়াজের গানের ওপর লেখা সেই কবিতাটা, যা ভেবেছিল শাহনেওয়াজকে পাঠাবে, কিন্তু না, তার কোনো কিছু হবে না। সে ভুলে গেছে শাহনেওয়াজের গান, নিজের লেখা কবিতা। হাসাপাতালের মোড়ে এসে যেদিন সে কাফন দিয়ে ঢাকা একজন যুবতীকে দেখতে পেয়েছিল, সেদিনই বিস্মৃতি এসে তাকে এই কবিতা, গান, ভালোবাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। সে বুঝেছে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ঠিকই করেছে সুজিত, মানুষের জন্য করার হলে, এই ‘এখানে-থাকা-ভালো নয়’ গোছের শহর কেন? গাঁয়ে ফিরে যেতে পারে না? সুজিত নাকি জীবনের শাদা অংশের ভূভাগকে সবুজ ঘাস দিয়ে ঢাকার কৌশল শেখাচ্ছে ছেলেদের! সেই আমাদের কবি, গল্পকার সুজিত; এখন মাস্টার!

৫.
কাল চিঠি এসেছে মারিয়ার। তার বাবা মারা গেছে। বাবার ক্যান্সার হয়েছিল। ব্রেন ক্যান্সার।
এক বান্ধবীর আশ্রয়ে আছে আপাতত। তারপর চলে যাবে করাচি। ওখানে এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি হয়ে গেছে ওর।
লিখেছে, ‘ জানেন, বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেছি। শাহেদের কথা মনে পড়েলে খুব কষ্ট হয় আমার। বান্ধবী না থাকলে পাগল হয়ে যেতাম। বাবা শেষদিন পর্যন্ত আমাকে কতো নিষিদ্ধ চোয়ালে চুবিয়ে দিয়েছেন। আমার দুঃখ হয় নি তবুও। বাবা বুড়ো মানুষ! বাবাকে আমি ভালোবাসতুম। বাবা চলে গেছেন বলে এখন বাবাকে আর নিষ্ঠুর মনে করতে পারছি না। শাহেদ যেন ছবি আঁকে।’
চিঠি পড়ে আমিনার মনে হয়েছিল, মারিয়া একটা অসম্ভব ধরনের মেয়ে। অসাধারণ মেয়ে। ওর মতো সবাই হয় না। 
শাহনেওয়াজের গান বাজছে ওদিকে রেডিওতে। ভাইয়াকে বললো আমিনা, ‘শাহনেওয়াজের গান, ভাইয়া!’ হাসানকে তখন কে যেন একটা নদীর তীরে নিয়ে গেল। যেখানে সদ্যবিবাহিত বউরা কাপড় ভাসিয়ে হাঁসের মতো হাতকে মেলে দিতেই অদ্ভুত গঞ্জন উঠছে জলের, জল থেকে তাদের ভিজে বসনে।
হাসান চুপ থাকায় আবার বললো আমিনা, ‘শানেওয়াজের গান, শুনলে?’
: হ্যাঁ।
: খুব ভালো গান, না?
: খুব সুন্দর গান, না?
: নদীর মতো!
: শেষ রাত্রির ঢেউয়ের মতো।
: ঠিক ঢেউয়ের মতো।
: তুমি ওকে বলতে পারো না কিছু? আমি হলে বলতাম।
এইসব বলেই আমিনা মৎসাধারে রাখা মৎসের মতো পিচ্ছিলভাবে ছড়িয়ে গেল লজ্জান্তবর্তী শ্যাওলায়। হাসানের চোখ এড়ালো না কিছু। বললো সে, অনেক কিছু বলা হয় না; যেমন তুই। তুই যেমন কিছুই বলতে পারিস না, ঠিক তেমন। মানুষ অনেক কিছু খুলে দিলেও বলতে পারে না। তারপর মনে মনে বললো হাসান, ‘আমার ঘুমের দরকার। আমি ভালোবাসতে চাই না। কিছু হবে না আমাকে দিয়ে। কন্টাক্টরি করছি শুধু তোদের জন্য। তুই কতো বড় হয়েছিস। মিনু এখন কতো ছোটো। সব আমাকে ভাবতে হয়।’
মারিয়ার জীবনই ভালো। মারিয়া জীবনকে কেমন নিঃশব্দে ক্ষয় করে দিচ্ছে। ও করাচিতে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি নেবে। ওর জীবনে অনেক কষ্ট। সবাই কষ্ট পাচ্ছে। জীবনে কেউ সুখ পায় না। সেদিন একটা লোক দালানের উঁচু থেকে পড়ে মরে গেছে। ওর মৃত্যু, ওর স্ত্রী ছেলেমেয়ের মৃত্যু! কী হবে জীবনে? কী হয়? কি হল ওর? মারিয়া একা। মারিয়ার কেউ নেই। ওদেরও কেউ নেই। আমার টাকাগুলো সেদিন ওদের দিয়ে দিয়েছি। আমি মেয়েমানুষ, মদ, রেস্তঁরা সব ছেড়ে দিয়েছি। আমি কবিতা লিখতে পারি না আর।
‘তুই, মিনু--তোদের নিয়ে আমার দ্বায়িত্ব অনেক। আমার ভালোবাসায় তোদের ক্ষতি হবে। তোর-মিনুর জন্য আমার অনেক কিছু করা দরকার।’
ভাইয়ের নীরবতায় আমিনার মনে হলো, যেন, তার গা থেকে পরাগ ঝরার মতো সব অতীত খসে যাচ্ছে। জানে আমিনা, তার ভাই, তাদের নিয়ে খুব কষ্ট করছে। জানে সে, ভাই না থাকলে তারা অন্য কোথাও ঠাঁই পেতো না। বাড়িতে তাদের কেউ নেই। একমাত্র বাবার হাতের চিহ্ন সেই চৌকা দেওয়াল করা ঘর আর বর্গা দেয়া ক’বিঘা জমি ছাড়া।
তার ছোটোবেলায় সে যখন ছোটো, অনেক স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না। হতে পারে না। মারিয়ার মতো মেয়ে শিল্পীদের মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। আনন্দের চাইতে ভারি সুন্দর-ন্যুড হয়ে শাহেদের তুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়ে এখন ডিপার্ট্মেন্টাল স্টোরের সেলস ওম্যান!
৬.
রাত্রে আঁধারকে জখম করা জ্যোৎস্নার শাদা বল্লম যখন চাঁদের হাতে তীর্যকভাবে ধরা, তখন হাসান ঘরে এলো। ভাবলো সে, আজ রাতে একটা কবিতা লিখবে, যেখানে উপমা হবে একটা অরণ্য যার ভেতর দিয়ে একদল শিকারি, শিকারের সন্ধানে ঢুকতেই যারা বাঘের থাবায় প্রাণ হারালো। ঠিক এমন বক্তব্য থাকবে কবিতায়।
ঘরে ঢুকেই দেখে সে, টেবিলে ঝিয়ের রাখা টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত। শীতের আঙুলের দাগ তাতে। মিনু যেহেতু হাসানের কাছে শোয়, দেখলো সে, মিনুর গতর থেকে লেপটা বাতাসে উলটে গিয়ে তার মুখে কেউ ঠান্ডা চাবুক মারছে। আস্তে লেপ্টা ছুঁড়ে দিলো সে মিনুর উপর। ভাবলো, একজন গানের মাস্টার রেখে দেবে মিনুর জন্য।
আমিনার ঘরে ঢুকে অবশেষে তার কবিতা ভুলতে গিয়ে দেখলো; লম্বা তণুর অবশিষ্ট বাহুতে একটা শ্বেত হংস পাখা ঝাপটাচ্ছে। তার মাথা থেকে ঢেউ খেলানো বুকের হৃদয়-রোচক হরণ করে আমিনার ঊরু অবদি একটা তরল লণ্ঠন ওপাশের আমগাছ থেকে নেমে, কেমন নমনীয় একটা অনাদৃত ভঙ্গিতে ‘ ওর একজন সঙ্গী দরকার’ লিখে টেবিলের খোলা ড্রয়ারে নিঃসঙ্গ শ্বেত পেন্সিলটা রেখে তারপর আমিনার চুল বিছানো চেয়ারে বসে পড়েছে। যেন কিছুটা নির্বিকার!

লেখক পরিচিতিঃ

আবুল হাসান ( জন্ম: ১৯৪৭, ৪ আগস্ট-মৃত্যুঃ ১৯৭৫, ২৬ নভেম্বর ) বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি ও সাংবাদিক। তিনি ষাট দশকের জনপ্রিয় কবিদের একজন এবং সত্তুর দশকেও জনপ্রিয় ছিলেন।

কবি আবুল হাসান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা আলতাফ হোসেন মিয়া ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার।
আবুল হাসান অল্প বয়সেই একজন সৃজনশীল কবি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। মাত্র এক দশকের কাব্যসাধনায় তিনি আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। আত্মত্যাগ, দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবুল হাসানের কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হলোঃ
কবিতাঃ রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪), পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫), গল্পঃ আবুল হাসান গল্প- সংগ্রহ (১৯৯০), কাব্যনাট্যঃ ওরা কয়েকজন (১৯৮৮)
পুরস্কারঃ বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৫), একুশে পদক (১৯৮২)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন