শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

শামীম রুনা'র গল্প : ভিটার গন্ধ

তারেক ছাই রঙের রোদ-চশমার আড়ালে চোখ জোড়া ঢেকে গাড়ির গ্লাসের ভেতর দিয়ে রাস্তার দু’ধারে ছুটন্ত শস্যক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আছে। উইন্ডশিল্ড দিয়ে নাক বরাবর সোজা রাস্তায় চোখ রেখে অপু আড়চোখে দেখতে পায় তারেকের ক্লিন শেভ করা ফর্সা গালে নীলের ছোপ। লাল টি শার্টের ওপর ঝকঝকে মেদহীন তাগড়া গলা তারেকের আত্মবিশ্বাস ও স্বচ্ছলতা জানান দিচ্ছে। বিদুৎ চমকের মত পেছনের এক স্মৃতি অপুর মনে উঁকি দিয়ে যায়, সেসব দিনগুলোতে তারেকের গলা এরকম তাগড়া ছিল না। লিকলিকে গলাটা কিছুতে কাঁধের ওপর দাড়িয়ে থাকতে চাইতো না, ঝাঁকড়া চুলের বোঝা নিয়ে মাথাটা সব সময় সামনের দিকে নুয়ে থাকতো।
সেসব দিন আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপু ড্রাইভারের মাথার ওপর দিয়ে রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রাখে; ওদের পেছনের সিটে বসা মিরা আর সায়রাকে দেখা যায় । সায়রা সাদা শার্টের বোতাম বুক পর্যন্ত খুলে আধ-বছরের জয়তু’র মুখটি চেপে ধরে ব্রেস্ট ফিডিং করাচ্ছে। ছেলের মুখ আর মায়ের হাতের ফাঁক দিয়ে স্তনের গোলাপি অংশে অপুর চোখ স্থির হয় মুহুর্তের জন্য। দৃষ্টি সরিয়ে ও এবার মিরার দিকে তাকায়, মিরা ওদের পাঁচ বছরের মেয়ে রূপকথার চুলের ঝুঁটি করাতে ব্যস্ত। অপু আবার তারেকের দিকে ফেরে- গ্রামে কেন যাচ্ছিস তুই? ওখানে কি এখন আর কেউ আছে তোদের?

আছে। আমার মা-বাবা দু’জন ওখানে ঘুমিয়ে আছে। নীচু স্বরে তারেক বলে, যেন নিজেকে শোনানো। অপু কয়েক মুহুর্ত বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপাটির গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করে, সরি। আমি তাঁদের কথা ভুলে গিয়েছিলাম।

মা-বাবার কবর জিয়ারত করবো বলে আমার দেশে আসা। সেই সাথে জয়তুকে নিজেদের ভিটার মাটি একটু ছুঁইয়ে আনতে চাই। বড় হলে কি আর ও আসবে কখনো? অপু তারেকের আবেগ বুঝতে পেরে মাথা নাড়ে ।

ওদের গন্তব্য চট্টগ্রামের মিরেরস্বরাই উপজেলা। মিরেরস্বরাই-এর পদুয়া নামক এক নিভৃত গাঁয়ে তারেকের মা-বাবার কবর। তাঁরা যখন বেঁচে ছিলেন তখন তারেক মা-বাবাকে সে গাঁয়ে রেখে আমেরিকা চলে গিয়েছিল স্বচ্ছলতার খোঁজে। মা বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও সে দেশে আসতে পারেনি ভিসা জটিলতার কারণে। তারপর বিদেশের মাটিতে ভাল কাজ জোটানো, বাড়ি-গাড়ি,পছন্দের নারীর সঙ্গে ঘর বাঁধা এসব শেষ ক’রে যখন সেটেলড হলো তখন কি যেন মনের গহীনে ওকে পোড়াতে লাগলো রাতদিন। কর্মব্যস্ত দিন পার করে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর যখন ঘুমে ঢ’লে পড়বার কথা তার পরিবর্তে রাতগুলো ওর ক্রমশই বিনিদ্র হয়ে ওঠতে লাগলো। আমেরিকার কাঁচের জানালায় তাকিয়ে তারেক বরফ পড়া দেখতে দেখতে শুনতে পেত টিনের চালে আষাঢ়ের বৃষ্টি পড়ার শব্দ । ওর চোখে ধান কাটা শেষে শূন্য ফসলের মাঠে জ্যোৎস্নার আলো প্রতিফলিত হতো । মায়ের ঘোমটা ঘেরা শ্যামল-মুখ সকল মমতা নিয়ে মনের আয়নায় বার বার উঁকি দিত ওর প্রবাস-জীবনে । বাবার গাম্ভীর্য্যের ভেতর যে স্নেহ লুকিয়ে ছিল তা বাবা চলে যাবার পর দূর দেশে এসে তারেক বুঝতে পারে । এসব আবেগে তারেক ক্রমশ এতটা ডুবতে লাগল, দেশে না এসে ও আর যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না । ওর বুকের সব অক্সিজেন উড়ে গিয়েছিল, সব অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়েছিল, এক বুক অক্সিজেন নিয়ে বাঁচার জন্য ওর ভেতরটা হাহাকার করতে লাগল ।

মিরা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে রূপকথার চুল বাঁধা শেষ করে মেয়েকে নিজের গা থেকে সরিয়ে বসায় । ওর বিরক্তির কারণ সায়রার যখন-তখন যেখানে-সেখানে বুক উদাম করে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোতে । আরে, আমরা কি বাচ্চাকে বুকের দুধ দেইনি ! তাহলে এতটা খোলামেলা কেনো ? তারেক আর সায়রা দম্পতি আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছে তিনদিন হলো, আসার পর থেকে দেখে আসছে মিরা সায়রাকে কোনো জড়তা ছাড়া সবার সামনে হয় জামার বোতাম খুলে নতুবা জামার গলা টেনে নামিয়ে কী উঁচিয়ে বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড করিয়ে নিচ্ছে । প্রথম প্রথম দৃশ্যটি দেখে মিরাই তারেক আর অপুর সামনে লজ্জায় অস্বস্তিতে পরেছে। একই দৃশ্যের বারবার পুনরাবৃতির পর মিরা বুঝতে পারলো তারেকও এতে কিছু মনে করে না। এই যে এখন গাড়িতে বসে সায়রা সাদা শার্টের বোতাম খুলে বাচ্চাকে দুধ দিচ্ছে, মিরা লক্ষ্য করেছে রিয়ার ভিউ মিররে সে দৃশ্য বারবার দেখে নিচ্ছে মাইক্রোর ড্রাইভার। একবার তো অপুও ড্রাইভারের মাথার ওপর দিয়ে মিররে সায়রাকে এই অবস্থায় দেখেছে। আমেরিকায় বেড়ে উঠেছে বলে কি এত খোলামেলা হতে হবে ! মিরার ভ্রু কুঁচকে ওঠে, এসব এমন সেনসেটিভ ব্যাপার অপুকে কিছু বলাও যাবে না, তাহলে স্বামী ওকে মিন ভাববে। পাশে বসা রূপকথা মা’র হাত ধরে টান দেয়, মিরা তাকালে মেয়ে বলে, পানি খাব। মিরা পানি বোতলের মুখ খুলতে খুলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।

জয়তুকে দুধ খাওয়ানো হ’লে সায়রা ওকে কাঁধে ফেলে আস্তে আস্তে পিঠে চাপড় দিতে দিতে জানালার গ্লাসের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকায়। বাইরে মগজ-ভাজা রোদ, এসি গাড়ির ভেতর বসে থেকেও ও রোদের তেজ শরীরে অনুভব করে। গাড়ি ছুটে চলছে সামনের দিকে, রাস্তার দু’পাশের শস্যক্ষেত কিংবা জলা-ডোবা কোনো কিছুই সায়রার কাছে আকর্ষণীয় লাগছে না। রাস্তায় চলমান বাস-ট্রাক বা মানুষ সব কিছুতে দারিদ্র্য প্রকট ভাবে দৃশ্যমান। গাদাগাদি মানুষ ভর্তি বাসগুলো ডিমওয়ালা কাছিমের মত মন্থর গতিতে হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে চলছে, দেখে মনে হয় যে কোনো সময় একদিকে কাত হয়ে পড়ে ভব লীলা সাঙ্গ করবে। অবশ্য ওদের মত মাইক্রো, প্রাইভেট কার বা লাক্সারী কোচের সংখ্যাও রাস্তায় খুব কম না। এক রাস্তায় সব রকম পরিবহন চলছে ,এমন কি ভ্যান বা সাইকেলও। সায়রা দেখে ওদের সামনের সিটে বসা তারেক আর অপু মগ্ন হয়ে কথা বলছে ।

তারেক। সায়রার মৃদু কন্ঠের ডাকে তারেক পিছনে ফিরে তাকায় ।

বেবি, বেবিকে কিছু সময় রাখ। আমি টায়ার্ড হয়ে গেলাম যে।

শিওর। তারেক বাঁকা হয়ে জয়তুকে নিতে গেলে মিরা সায়রার কোল থেকে ছোঁ দিয়ে জয়তুকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে বলে, তোমার টায়ার্ড লাগছে আমাকে বলবে না, আমি দেখছি বেবিকে।

থ্যাংকস। সৌজন্যমূলক হেসে সায়রা বলে। বাংলাদেশে সে আসার পর থেকে মিরাকে দেখছে, কিন্তু ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। কখনো মনে হয় সে বুঝি খুবই আন্তরিক তাদের প্রতি, আবার কখনো মনে হয় সে তাদের পছন্দ করছে না। যেমন কিছু সময় আগেও মিরার চোখে বিরক্তি দেখেছে, কেনো তা ও জানে না, তবে ওর কাছে ব্যাপারটি ভাল লাগেনি। মিরার এই বিরক্তি ভাব তখনই হয় যখন সে বেবিকে ব্রেস্ট ফিড করায়। সায়রা বুঝে ওঠে না, একজন মা সন্তানকে স্তন পান করানোতে মিরার আপত্তি কোথায়; বিষয়টি নিয়ে পরে তারেকের সাথে কথা বলা যাবে, ভাবে সায়রা। সায়রা শার্টের বোতাম ঠিক করে চোখে সানগ্লাস প’রে নিয়ে জানতে চায়, আমাদের পৌঁছাতে আর কত সময় লাগবে ?

জার্নি তোমার কেমন লাগছে সায়রা ? তারেক জানতে চায় ।

ভালই। ঠোঁট উল্টে সায়রা বলে ।

তুমি কি এই প্রথম বাংলাদেশে এলে সায়রা ? অপু পিছনে না ফিরে গলার স্বর উঁচু করে জানতে চায় ।

না, ছোটবেলা, আমার বয়স যখন দশ-এগারো তখন একবার মা-বাবার সাথে এসেছিলাম। সে ট্যুরে আমরা বাংলাদেশে বিশ দিন ছিলাম,ঐ আমার দেশের স্মৃতি। ব্যাগ থেকে হেয়ার ব্রাশ বের করে চুল আঁচড়ানোয় মনোযোগী হয়ে ওঠে সায়রা ।

দেখ হানি, আমাদের দেশটি কত সুন্দর! জানালার বাইরে চোখ রেখে তারেক স্বপ্নাতুর কন্ঠে বলে। সায়রা তারেকের দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে তাকায়, উচ্ছসিত হবার মতো সে কিছুই দেখে না; সে কাঁধ ঝাকিয়ে আবার চুল আঁচড়ানোতে মনোযোগ দেয় ।

অপু ঘাড় ঘুরিয়ে একবার মিরা আর রূপকথাকে দেখে নেয়, মিরা জয়তুকে কোলে শুইয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে, বাচ্চাটি বেশ চঞ্চল, কিছুতেই মিরা ওকে নিজের বশে আনতে পারছে না। সায়রার এখন মিরা বা বাচ্চা কারো প্রতি মনোযোগ নেই, সে চুলের ব্রাশ ব্যাগে রেখে ছোট আয়নায় নিজের মেকাপ ঠিক করে নিচ্ছে। অপুর ঠোঁটে হাল্কা হাসি খেলে যায়, তারেক দীর্ঘ দিন বিদেশে কাটিয়ে দেশে এসে দেশের জন্য যেমন ভালবাসা অনুভব করছে সায়রা তেমনটা করছে না সম্ভবত সে দেশকে তেমনভাবে দেখেনি ব’লে কিংবা এই দেশে সে জন্মগ্রহণ করেণি ব’লে! আর দেশের প্রতি তারেকের এত মমতা অপুর কাছে কেমন আরোপিতও লাগে, কই যে সময় ওরা দু’জন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এক সঙ্গে কাটিয়েছে তখন তো তারেকের মাঝে দেশ নিয়ে সামান্য মাতামাতিও দেখেনি! নব্বইয়ের গণআন্দোলনে সকল ছাত্র-জনতা যখন উত্তপ্ত, তখন তারেককে দেখেছে পাঠ্য বইয়ে মুখ গুঁজে কলেজে আসা-যাওয়া করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনেও তারেক তেমনি, রাজনৈতিক দল দূরে থাকুক কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও ওর সম্পৃকক্ততা ছিল না। “দেশের প্রতি ভালবাসা” এ রকম কোনো আবেগঘন বক্তৃতাও তারেকের মুখে শুনেছে বলে অপু মনে করতে পারে না। হতে পারে প্রবাস-জীবনে তারেক দেশকে উপলব্ধি করতে পেরেছে । দেশের প্রতি ওর এই মমতা, টান দীর্ঘ দিন দেশকে না দেখে মনের গহীনে তৈরী হয়েছে। অপু ওর একটি হাত তারেকের কাঁধে রাখে, তারেক মুখ ঘুরিয়ে বন্ধুর দিকে তাকায়; অপু কিছু বলে না, সামনে পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবে, বহুকাল বাদে আবার বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো ।

স্যার , গাড়ি একটু সাইট করি? ড্রাইভার অপুর অনুমতি চায় ।

কেনো ? ভাবনার তল থেকে ওঠে অপু জানতে চায় ।

সামনের গাড়ির ড্রাইভার হাত নেড়ে থামতে বলছে ।

কেনো ? কে ও ?

আমাদের রেন্টেকারের গাড়ি ওটা, পরিচিত ড্রাইবার। হয়ত কোনো সমস্যায় পড়েছে। গাড়ির গতি শ্লথ ক’রে ড্রাইভার বলে ।

দেখো কি চায়। অপু অনুমতি দিলে ড্রাইভার সামনের গাড়িকে ইশারায় থামতে ব’লে নিজের গাড়িটাকে ওটার পেছনে রাস্তার পাশে একটি চায়ের টঙ দোকানের সামনে দাড় করায়। ড্রাইভার নেমে সামনের গাড়ির কাছে চলে গেলে তারেক গাড়ি থেকে নেমে সানগ্লাস খুলে হাত-পা ঝাড়া দিয়ে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালে অপুও নেমে আসে। অপুকে নামতে দেখে রূপকথা হাত বাড়িয়ে দেয় বাবার সঙ্গী হবার জন্য।

আমরা বাবা হয়ে গেছি তাই না অপু ? কোনও একসময় ভাবেছিলাম কি আমরা বাবা হবো! অপু আর রূপকথার জড়াজড়ি ক’রে আদর করা দেখে তারেক বলে। অপু তারেকের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে।

এ্যাই তারেক, আমি নামতে চাচ্ছি। কোন সমস্যা নেই তো ? সায়রা জানালায় মুখ বাড়িয়ে ব’লে।

কোনো সমস্যা নেই। নেমে এসো, চা খাবো। অপু সায়রাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করে ।

মিরা তুমি নামবে না ? সায়রা নেমে গেলে অপু জানতে চায় ।

না থাক , নামবো না। বাচ্চাটা আমার কোলে ঘুমাচ্ছে। আবার না ওর ঘুম ভেঙে যায়। অপু বাচ্চা কোলে মিরাকে দেখে হাসে, রূপকথা বড় হয়ে যাচ্ছে, এবার সেকেণ্ড বেবি নিয়ে নিলে কেমন হয় ? মিরা অপুর দিকে কপট ভ্রুকুটি করে তাকায়, তখন অপুর পেছনে এসে দাঁড়ায় ওদের গাড়ির ড্রাইভার ও অন্য একজন লোক। মিরার চোখের ভাব বুঝে অপু ঘুরে দাঁড়ায় ।

স্যার,ও ওই গাড়ির ড্রাইভার, অপুদের ড্রাইভার বলে, ওই গাড়ির পেসেঞ্জারদের একটা হেল্প লাগবে স্যার।

অপু তারেক দু’জন চোখে প্রশ্ন নিয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকায়, মিরা সন্দিহান দৃষ্টিতে ড্রাইভার দু’জনের মনোভাব আন্দাজ ক’রে নিতে চায়; দিনকাল যা খারাপ হয়েছে, মানুষ নিত্য নতুন ট্র্যাপে ফেঁসে যাচ্ছে, তেমনি কোনো ট্র্যাপ নয় তো ? সায়রার এদিকে কোনো নজর নেই, সে চা দোকানির চা বানানো দেখছে নিবিষ্টমনে, আর আশপাশের এলাকার লোকজন,যারা দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে গুলতানি মারছিল; তারা রক্তচোষার মত চোখ গোল গোল ক’রে বিদেশী পোশাকের দেশী চেহারার দেশী মেম সায়রার আপাদ-মস্তক গিলে নিচ্ছিল।

কী হেল্প ? অপু জানতে চায় ।

স্যার, আমার গাড়ির পেসেঞ্জাররা আসছে লন্ডন থেইকে, গ্রামের বাড়ি যাবে বলে। সামনের গাড়ির ড্রাইভার কথা শুরু করে, আমি সকালে তাগোরে নিয়ে রওনা হবার আগ পর্যন্ত জানতাম না যে, তেনারা এই দেশে একেবারে নতুন এয়েচে। এই আধেক রাস্তা পার হয়ে আসপার পর তেনারা বলে, তাগোর গ্রামের বাড়ির পথ তেনারা চেনে না। আমারে ঠিকানা দিয়া কয়, এই ঠিকানায় নিয়া চ’লো। ঠিকানাটা যদি কোন শহরের হতো তাও না হয় খুঁজে বার করা যেতো, এটা হলো গিয়ে একেবারে গাঁও-গ্রামের ঠিকানা। আমি হলাম উত্তরের লোক, খেপ যা মারি ওদিকেরই, এইবারই প্রথম এদিকে এয়েচি, এয়েই ভালো ঝামেলায় পড়া গেলো আর কী, এই দিকটা তেমন ভাল চিনি না ব’লে। আমার প্যাসেঞ্জারের ধারণা, ওরা এই দেশে নতুন এয়েচে জানতে পারলে সবাই তাগোর ক্ষতি করবার চাপে। তাই কারোর কাছে জানতে দিতেও চায় না, ওরা এই শহরে নবাগত। মফিজ ভাইরে দেখে বললাম, আমার পরিচিত লোক উনাদেরে জিগাস করি না, বহুত ভাবনা চিন্তা ক’রে অনুমতি দিল। তো এখন মফিজ ভাইও বলতে পারলো না, স্যার আপনারা কি বলতে পারবেন এই গ্রামটা কোথায় ? সে একটি কাগজের টুকরো এগিয়ে দিলে তারেক হাত বাড়িয়ে সেটি নেয় ।

বলছেন নতুন, আবার বলছেন গ্রামের বাড়ি যাবে , বুঝতে পারলাম না। অপু বলে ।

তেনারা নাকি ছোটবেলায় দেশ ছাড়ছে, তারপর আর আসে নাই দেশে। এখন এয়েচে ভিটা দেখপার।

ভিটা দেখতে ! তারেক অস্ফুট উচ্চারণ করে ।

বলছে সে ভিটা এখন আর তেনাদের নাই, তবু এক নজর দেখতে চায় নিজেদের ভিটা-মাটি। এখন গ্রামই যদি খুঁইজে না পায় তো ভিটা দেখপে কই থিকা ?

শুধু ভিটা দেখতে এসেছে ? অপু বিস্মিত ।

তাই তো বললেন তেনারা। গ্রাম খুঁইজে না পাইলি এমনি এমনি ঘুরাফিরা কইরে ফেরত যাইতি হইবে শেষ পর্যন্ত। সময়ও নাকি বেশি নাই---ঐ যে স্যার তেনারা আসচেন ..।

সামনের মাইক্রো থেকে এক মহিলা আর বিশ-একুশের এক ছেলে ওদের দিকে এগিয়ে এলো। দেখে মহিলাটির বয়স অনুমান করা যায় না, হতে পারে পঁয়তিরিশ কিংবা পঁয়তাল্লিশ; মাঝারি উচ্চতার মহিলার পরনে সালোয়ার-কামিজ, হাঁটার ধরণ বলে দিচ্ছে খুবই কর্মট আর সপ্রতিভ একজন মানুষ তিনি। ছেলেটি পরে আছে ছেঁড়া জিনস, টি-শার্ট আর স্নিকার। প্যান্টটি দেখলে মনে হচ্ছে এই বুঝি কোমর ছেড়ে মাটিতে ঝাপ দেবে!

আমরা বিপদে পড়েছি, আপনারা কি আমাদের একটু সাহায্য করতে পারবেন? দ্বিধাহীন কন্ঠে মহিলাটি জানতে চায় ।

অপু তারেকের হাত থেকে কাগজের টুকরোটি নেয়, তুই তো এই এলাকার ছেলে, চিনিস নাকি গ্রামটা? কাগজের টুকরোয় চোখ বুলিয়ে অপু জানতে চায়।

তারেক হেসে বলে, আমার অবস্থা ওদের চে’ আর ভাল কোথায়! নোয়াখালির ছাগল নাইয়ার মায়ানি গ্রাম..? চিনি না। ছাগল নাইয়ায় এক সময় আমাদের কিছু রিলেটিভ ছিল, সেই ছোটোবেলা গিয়েছিলামও, এখন তো আর তাদের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ নাই । মায়ানি গ্রাম? না সরি, চিনি না ।

সরি আপনাদের কোনো হেল্প করতে পারলাম না। কাগজের টুকরোটি ফিরিয়ে দেয় অপু ।

কিছু মনে করবেন না, আপনারা গ্রামটি ঠিক ভাবে চিনেন না, অথচ সে গ্রামের খোঁজে লন্ডন থেকে এসেছেন, কারো খোঁজে? তারেক জানতে চাইলে মহিলাটি ইতস্তত করে একটু সময়, চোখের দৃষ্টিতে ওদের কতটা ভরসা করা যায় যেন পরিমাপ করে নিতে চায় ।

আমার নাম পূরবী মিত্র। জড়তাহীন স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণে মহিলা কথা শুরু করলে, ওরা সবাই, তারেক, রূপকথাকে কোলে নিয়ে অপু, সায়রা এবং ঘুমন্ত জয়তুকে কোলে নিয়ে মিরাও গাড়ি থেকে নেমে এসেছে, সবাই নবাগত মহিলা মানে পূরবী মিত্রকে ঘিরে গোল হয়ে বসে চা দোকানের সামনে একটি বড়ো কাঠাল গাছের নিচে মুখোমুখি পাতা দু’টি বেঞ্চে । সবার হাতে ধরা চায়ের কাপ। পূরবীর সঙ্গের তরুণটি কিছু দূরে আলাদা একটি টুলে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে হাতের আই পডে সম্ভবত কোনো গেম বা ইন্টারনেট সার্চ করছিল। পূরবী মিত্র দূরে বসা তরুণের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার কথা বলতে লাগলেন, ও আমার ছেলে দেব, দেবজিৎ মিত্র। ও এই প্রথম বাংলাদেশে এলো। আমি এসেছি আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটা দর্শনে। সে ভিটা, সে গ্রাম আমি যখন ছেড়ে যাই তখন আমার বয়স ছিল নয় বছর। নয় বছর বয়স ভিটা, গ্রাম দেশকে জানা বা ভালবাসার জন্য সম্ভবত খুব বেশি বয়স না, কি বলেন আপনারা ? তেমনি আমি যখন এ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম তখন দেশের জন্য তেমন কোনো মায়া অনুভব করিনি। ১৯৭১-এর সে দিনগুলোতে কত তাড়াতাড়ি এই দেশ ছেড়ে চলে যাব সে ভাবনায় আমাদের দিনের শুরু হতো আবার সে ভাবনায় আমাদের রাত গুলো শেষ হতে চাইতো না। ৭১- এর মাঝামাঝি আমার বাবা জমি-ভিটা সব একজনের সাথে বদল করে নেন, যার পরিবর্তে সে লোক আমাদের নিরাপদে এ দেশ ছাড়তে সাহায্য করেছিলেন। বাবা আমাদের নিয়ে কলকাতা চলে যান। দেশান্তরীত হয়ে কলকাতা গিয়ে আমরা প্রতিদিনের মৃত্যু আতংক থেকে বাঁচলাম, ভাবলাম, এই বুঝি মুক্তি ! এই বুঝি বেঁচে থাকবার আনন্দ! পূরবী মিত্র কথা থামিয়ে দূরের শস্যক্ষেতের দিকে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে নিজের মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিলেন । পরবাসীর আবার মুক্তি! বেঁচে থাকবার আনন্দ! কলকাতা যেয়ে আমার বাবা নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারলেন না। ভারতকে নিজের দেশ ব’লে মানতে পারলেন না। তাই এক সময় তিনি বললেন, পরবাসে যখন থাকতে হবে আমাদের তবে এখানে কেনো? আরো দূরে কোথাও চলো। কয়েক বছরের মাথায় আমরা ইংল্যান্ড চলে গেলাম। তারপর থেকে আমরা আজো ইংল্যান্ডে আছি। কি এক অভিমানে বাবা পরবর্তী জীবনে কখনো বাংলাদেশ বা ভারত কোথাও একদিনের জন্যও আসেননি। তবে তিনি আমাদের বাংলা সাংস্কৃতি থেকে কখনো দূরে সরে যেতে দেননি। সব সময় চেয়েছেন আমরা যেন বাংলা সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতে শিখি। বাবার শিক্ষার কারণে আপনাদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি। সামান্য একটু হাসলেন পূরবী মিত্র, তাতে তাঁর অহংকার প্রকাশ পেল ।

আপনি চমৎকার বাংলা বলেন। মিরা প্রশংসা করে ।

ধন্যবাদ। আমার বাবার বয়স বর্তমানে আশির ওপরে। তিনি এখন হাসপাতালে আছেন, মৃত্যুশয্যায়। ক্যান্সারে ভুগছেন বেশ কিছু দিন থেকে, খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তাররা তাঁর বেঁচে থাকার সময় কয়েক বার বেঁধে দিয়েছিলেন , তারপরও তিনি সে সময় অতিক্রম ক’রে অলৌকিক ভাবে বেঁচে আছেন। বাবার কষ্ট দেখে আমরা তার মৃত্যু কামনা করি, কিন্তু মৃত্যু তাঁর কাছে কি কারণে যেন হার মেনে আছেন। পূরবী মিত্রের চোখের কোনে অশ্রু জমে চিক্ চিক্ করে উঠে, গড়িয়ে পড়ে না। তিনি নিজেকে ধাতস্ত করে আপন মনে বলার মত করে আবার কথা শুরু করেন, হাসপাতালের বিছানায় বাবা একদিন আমার হাত ছুঁইয়ে কাছে ডাকলেন। আমি তার মুখের কাছে কান নিয়ে গেলে বললেন , আমার ভিটা মাটির গন্ধ নাকে না পেলে আমার মরণ হবে না... বাবাকে তো আর দেশে আনা সম্ভব না...,তাই...। পূরবী মিত্রের চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু এবার তার গাল বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসে।

মাটি থেকে দূরে গেলে মাটি এমন করেই বুঝি টানে !



লেখক পরিচিতি
শামীম রুনা
জন্মসাল: ১৯৭৩
জন্মস্থান: চট্টগ্রাম
বর্তমান আবাসস্থল: ঢাকা, বংলাদেশ
পেশা: ফ্রি ল্যান্স স্ক্রিপ্ট রাইটার

গল্প, শিশু সাহিত্য,নিবন্ধ  লেখেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ তালিকা: টমবয় নিশো ও তার বন্ধুরা, ঐরাবত বিষয়ক মানবিক জটিলতা, গান নামের মেয়েটি ও এক চাঁদের আলোয় সব অন্ধকার  মুছে যায় না।


1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো গল্প। সম্ভাবনাময়। গতি আছে। পর্যবেক্ষণ ভালো। তবে বিষয়ের গলি-ঘুপছি থাকে। লেখকের দৃষ্টি এসবও যেন না এড়িয়ে যায়।

    উত্তরমুছুন