শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

প্রশান্ত মৃধার গল্প : সন্ধ্যামালতী


শেষ বিকেলে কুয়োতলায় এক ঝাড় সন্ধ্যামালতীর দিকে তাকিয়ে স্নেহলতা হঠাৎ কয়েক যুগ পেছনে সরে যান।

...

মহীন্দ্র এসে পৌঁছয় শেষ বেলায়।

সন্ধ্যা তখনও হয়নি, হব-হব। দীনলক্ষ্মী বারান্দায় বসে প্রদীপের সলতে পাকাচ্ছে। মহীন্দ্রকে বারান্দার ওই মাথায় দেখেই সে স্নেহলতার উদ্দেশে বলে, ‘বড়োবউ, আইসে দেহো--’


দীনলক্ষ্মী কথা শেষ করেনি। আরও কিছু হয়ত তার বলার ছিল, হয়ত সে মহীন্দ্রের নাম ধরেই স্নেহলতাকে ডাকত, কিন্তু তার আগে বাঁধানো কুয়োর ভেতরে বালতি নামিয়ে দিয়ে টেনে তুলতে তুলতে স্নেহলতা সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ের দিকে তাকিয়েছিল। তখন পশ্চিমের নারকেল গাছের ছায়া, কাছেই একটি জবা গাছের ঝাড় আর নারকেল গাছগুলোর কোলের কাছের কাপিলার কচার ছায়া মিলেমিশে সন্ধ্যামালতীর ফুলের রঙ একটু যেন কালটে করে তুলেছে। অথচ দিনের প্রথম দিকে, এমনকি দুপুরের পরও এই গাছের ফুলগুলো কত উজ্জ্বল দেখায়-- এই পর্যন্ত ভেবেওছে স্নেহলতা। কুয়োয় নামিয়ে দেয়া বালতি জল ভরে টেনে তোলার আগে একটুক্ষণ ভাসমানই থাকে, তারপর জলে বালতি ভরে গেলে হাতে যখন দড়ির টান লাগে, ঠিক সেই সময়ে দীনলক্ষ্মী ডাক দেয়াটা মিলে গেলে, এই মিলে যাওয়াতেই দীনলক্ষ্মীর মহীন্দ্রকে দেখে ডাকের উত্তেজনার সঙ্গে সেও যেন প্রস্তুতই ছিল উত্তর নিতে, তাই বালতির জলে ডুবে যাওয়ায় টান আর দীনলক্ষ্মীর ডাক মিলেমিশে যাওয়ার এই মুহূর্তমাত্রে স্নেহলতা উত্তর নেয়, ‘কী হইচে, ও মা ঠাইরেন, ডাকেন কেন?’

দীনলক্ষ্মী সলতে পাকিয়ে একখানি ছোটো কুলায় রাখছিল। হাতে এখনও পাকায়নি এমন আরও কিছু পাতলা সাদা কাপড়ের টুকরো। তা সে কুলার ওপরে রাখল। তারপর মহীন্দ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার বলল, ‘আইসে দেহো, আইচে কেডা?’

স্নেহলতার হাত ইতিমধ্যে আরও সচল। সন্ধ্যামালতীর দিক থেকে সে চোখ সরিয়ে কুয়োর ভেতর দিয়েছে। কুয়োর একদম ভেতরে অন্ধকার। হাতের টানে ধীরে বালতি উপরে উঠলে সে দেখতে পায়। এরপর বালতি তার হাতের নাগালেই। তখন সে বলল, ‘আইচে কেডা, ও মা ঠাইরেন?’

দীনলক্ষ্মী বলল, ‘আসো। আইসে দেহো।’

দীনলক্ষ্মীকে নিয়ে সমস্যার যেন শেষ নেই। স্নেহলতা আর তার শরিকি জায়েরা কেউ কেউ তো এ কথাও বলে, এমন শাশুড়ি যেন মানুষের না হয়। সারাদিন কাজের ভেতর একটাই, পুতের বউদের পেছনে লাগা। বউদের ভুল ধরা। বউদের দোষ খোঁজা। তাই নিয়ে গালমন্দ করা। এই যে স্নেহলতা এই উঠানটুকু পার হয়ে দীনলক্ষ্মীর সামনে দিয়ে হেঁটে এসেছে, এসে কুয়োতলায় দাঁড়িয়েছে, তখনই হয়ত বুড়ি খেয়াল করেছে, বউ কুয়োয় বালতি নামিয়ে সামনের সন্ধ্যামালতী গাছ দেখছে, সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাই হয়ত পর পর দুইবার এভাবে ডাকল। আর কী কারণ থাকতে পারে? কুয়োর বালতি হাতে নিয়ে স্নেহলতা এসেছে জল নিতে। দীনলক্ষ্মী বারান্দায় বসে ঠাকুর পুজোর থাল ধোবে। হয়ত এতক্ষণে এই এক বালতি জল ভরতে ভরতে দীনলক্ষ্মী তাকে বলে বসত, ‘এহোন আসো না, সন্ধ্যা তো হইয়ে গেল। ঠাকুরের থাল ধোবো কহোন?’

কিন্তু এখন বলল অন্য কথা, কেউ একজন এসেছে সেজন্যে তাকে ডাকছে। এই মুহূর্তে বালতি টেনে তোলায় স্নেহলতা ঘাড় ফেরাতে পারছিল না। দীনলক্ষ্মীর ডাকের উত্তর নিয়ে সে ফিরে তাকাল। তখনও কাউকে দেখতে পেল না।

কারণ, মহীন্দ্র তখনও বারান্দার পুব কোনায়। কুয়োতলা থেকে বারান্দার কোনা দেখা যায় না। মাঝখানে একখানা দোচালা ঘর। কিন্তু বারান্দার প্রায় মাঝখানে বসা দীনলক্ষ্মী মহীন্দ্রকে দেখে এই ডাক দেয়ামাত্রই মহীন্দ্র তার কাছাকাছি আসছে আর স্নেহলতা কুয়োতলা থেকে হেঁটে আসছে বালতি হাতে। দীনলক্ষ্মীর ডাকেই বোঝা যায়, সে ভাবতেই পারেনি এই সময়ে মহীন্দ্র আসতে পারে। আবার দীনলক্ষ্মীর পায়ের কাছে বারান্দা থেকে নীচে নামার সিঁড়িতে এইমাত্র বসে পড়া মহীন্দ্রকে দেখেও স্নেহলতা অবাক, সেও ভাবতে পারেনি এখন মহীন্দ্র এসে হাজির হবে। এই সময়ে, এমন প্রায় দুর্যোগের ভেতরে।

স্নেহলতা বলতে যাচ্ছিল, ঠোঁটের প্রায় সামনেই ছিল, ‘ও ভাইডি, তুমি?’ কিন্তু তার আগেই দীনলক্ষ্মী বলে, ‘দেখেছো, ও বউ আইচে কেডা?’

স্নেহলতা সিঁড়ির একপাশে বালতি রাখতেই মহীন্দ্র তিনধাপ নেমে বউদিকে প্রণাম করার জন্যে নীচু হয়। স্নেহলতা সরে যায়, ‘থাক, করো কী?’

তার মানে ইতিমধ্যে মহীন্দ্র তার মা দীনলক্ষ্মীকে প্রণাম করেছে। তা দেখেনি স্নেহলতা। ছেলেকে দেখামাত্রই দীনলক্ষ্মী কেঁদেছে কি না তাও আর বোঝা গেল না। হয় দীনলক্ষ্মী তার স্বভাব গাম্বীর্য বজায় রাখতে আঁচলে চোখ মুছে ফেলেছে অথবা বেলা পড়ে আসায় এই প্রায় অন্ধকারময় দিনের শেষদিকে সে শাশুড়ির চোখ দেখে কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু স্নেহলতা সেটিই যেন দেখতে চাইছিল। জ্ঞাতি জা-দের সঙ্গে এই কথা তো কতবার তারা বলে, ‘টকি দেখতে বোম্বে আর কলিকাতা যাওয়ার দরকারডা কী, তাগে এই শাশুড়ির ধারে আইসে দেইহে গেলিই পারে।’ কয়েকদিন আগে প্রাণপ্রিয় ছোটোছেলের দেখে না বলে, কেঁদে কেঁদে চোখের জলে ভাসিয়েছে চর্তুদিক, তারপর যেই খবর আসল মহীন্দ্র ব্যবসার জন্যে যে টাকা নিয়ে গেছিল সে টাকা জাল, তখন মহীন্দ্রকে পাডার পো পাডা, গোল্লার সোগা, অকম্মার ঢেকি-- এইসমস্ত বলতে বাদ রাখেনি। শাশুড়ির এ কথা শুনে স্নেহলতা খুব অবাক হয়েছিল। এই তার শাশুড়ির মুখের ভাষা! নিজের ছেলেরে মানুষ এইভাবে গাল পাড়ে। জীবনে কতকিছুতে কতভাবে মানুষের ভুল হয়, তারপর এই সময়ে, চারদিকের যে অবস্থা, এর ভেতরে এমন ভুল তো হইতে পারে-- সেই জন্যে এভাবে মানুষের সামনে নিজের ছোটোছেলেকে গাল পাড়তে হবে? স্নেহলতা ভেবেছিল, এমন মুখের কথা সে বাপের জনমেও কোনও মেয়েমানুষের মুখে শোনেনি। গ্রামের বাড়ি গেলে, রায়বাড়ির বড়োজা আসলে তাকে শোনাবে তার মামি শাশুড়ির বোলচাল।

কিন্তু এখন দেখো ছেলেকে সামনে পেয়ে কেমন বদলে গেছে দীনলক্ষ্মীর গলার স্বর!

দীনলক্ষ্মী বলছে, ‘ও বা, মহী, খুলনোয় আইচো কহোন? কোন টেরেনে আসলি? টেরেন তো আইচে সেই কোন সোমায়। ছিলি কোতায়?’

মহীন্দ্রর চোখ-মুখ একটু উদ্ভ্রান্ত। ধুতি ও জামার ভাঁজে তা ধরা পড়ছে না। এমনকি দীনলক্ষ্মীর চোখেও হয়ত না, কিন্তু স্নেহলতা লেবু মাখানো ছোট্ট পিতলের থালা ধুতে ধুতে একবার আড়ে দেবরের চোখের দিকে তাকিয়ে মহীন্দ্রর উদ্ভ্রান্ত চোখকে পড়ে নিতে পারছে।

স্নেহলতা মহীন্দ্রকে বলল, ‘ঠাকুরপো, ও ভাই, খাইচো দুপুরে?’

‘হ।’

দীনলক্ষ্মী সলতে পাকানো শেষ করে এনেছে। মহীন্দ্রকে সে খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করেনি, স্নেহলতা তা জিজ্ঞেস করায় এবার সে যোগ করল, ‘কোয়ানে খাইলি?’

‘খুলনোয়। খাইয়ে ট্রেনে উঠিছি।’

‘নবদ্বীপদে আইজকে রওনা দেচো?’

‘না, পরশু কইলকাতা গেইলাম। সকালে রওনা দিচি।’

‘কইলকাতার অবস্থা কী?’

‘থাউক মা ঠাইরেন, ওইসব কথা পড়ে জিগেইয়েন। এহোন ও হাত ধুউক।’ স্নেহলতা মহীন্দ্রকে বলে, ‘ঠাকুরপো, জামা ছাড়ো। কুয়োদে জল আইনে দেব? মাইটে জল আছে। উড়ে মালি সামনের সাপ্লাইদে বিকালে আইনে দিচে।’

‘উড়ে মালি এহোনো আচে? দেশে যায় নাই?’

‘কী জানি, মনে হয় যাবে না। পাকিস্তানে থাইয়ে যাবে।’

মহীন্দ্র শব্দ করে শ্বাস ছাড়ে। ‘হয় যাইয়ে করবে কী? যাইয়ে যদি কাজ না পায়?’

‘তবু নিজের দেশ বুইলে কতা। এই দেশ তো এহোন বিদেশ। তোমার দাদা জিগোইল কয়দিন আগে। কয়, বাবু, এহোনও কিছু ভাবনা করি নাই।’

মহীন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে জামা খুলে পাশের টানানো দড়িতে রাখে। স্নেহলতা দেখে, মহীন্দ্রর হাফহাতা গেঞ্জিটা ময়লা, প্রায় কালটে। আধো অন্ধকারেও তা বোঝা যায়। স্নেহলতা তাই দেখছে বুঝে মহীন্দ্র বলে, ‘বউদি, দাদা কোথায়?’

‘বাইরে তো গেল বিকালে। আসপে, আইসে যাবে।’

দীনলক্ষ্মী উঠে কোনার ঘরে হারিকেন আনতে গেছে। এই ফাঁকে স্নেহলতার মহীন্দ্রর দিকে তাকিয়ে দেখাকে মহীন্দ্র একটু ইয়ার্কি করল যেন, ‘কী দেহো?’

‘দেহি তোমার গেঞ্জির রঙ।’

‘আর গেঞ্জি-- মানুষ যে কীভাবে বাইচে আছে!’

‘শুনি তো তোমার দাদা কয়।’

‘তয় আর গেঞ্জির রঙ দিয়ে হবে কী?’

‘থাক বাদ দেও। কাইল সকালে বাড়ি যাবা-- ছোটোবউ পথ চাইয়ে আছে।’

মহীন্দ্র হাসল। ‘তুমি পথ চাইয়া ছেলা না, দেওর কোথায় না কোথায়--’

‘ছেলাম তো। তাও তোমার দাদার ধারে চিঠি দেচো, দেহিছি-- বুজিচি আচো কেমন, কিন্তু সে মানুষটা তো ঠাকুরমশাইর (শ্বশুর) মুখের কথা ছাড়া তোমার আর কিছু জানে না।’

মহীন্দ্র আবার হাসল। একটু শব্দ করে। স্নেহলতার মুখের দিকে চাইল। ‘কতজন যে আর জনমের তরে বাড়িঘর স্বামীসন্তান কত তার মুখে দেখপে না, বড়োবউ! দেশটার যে কী হইল।’

‘যাও, পরে শোনব-- হাত মুখ ধোও। সন্ধ্যা দেব--’

স্নেহলতা জানে অথবা বুঝতে পেরেছে, এখন মহীন্দ্রর কাছে এইকথা শুনতে চাওয়া মানে, মহীন্দ্রর উদ্ভ্রান্ত হওয়া বাড়বে। একবারে শুনবে। মহীন্দ্রর বড়্দা আসুক। কিন্তু তখন দুই ভাইর কথা কোন দিক দিয়ে কোন দিকে যাবে-- সেই আশঙ্কায় এখনই স্নেহলতার বুক কাঁপে।





মহীন্দ্র এই অবেলায় আসবে তা যেমন এই বাড়ির কেউ জানত না, দিন পনের আগে মহীন্দ্রর একখানা চিঠি আসবে তাও তো কেউ জানত না। এই সময়ে চিঠি এসেছে তাতেই সবাই অবাক। অবাক হওয়ার কারণও ছিল। কিন্তু যত কারণই থাক, তখন বাড়ির কেউই তো মহীন্দ্রকে নবদ্বীপ যেতে দিতে চায়নি। আগে চারদিক একটু ঠান্ডা হোক, তারপর যাওয়া যাবে-- একথা বলেছিল মহীন্দ্রর বাপ অক্ষয়চন্দ্র। সেকথা শোনেনি মহীন্দ্র। বড়্দা দ্বিজেন্দ্ররও কমবেশি সায় ছিল মহীন্দ্রর যাওয়ায়। নবদ্বীপের বাড়ি ও সঙ্গে কিছু জমি কিনেছিল অক্ষয়চন্দ্র। দুই ছেলের চেয়ে জায়গা জমি বিষয় সম্পত্তির ব্যাপারে তার হিসেব অনেক টনটনে। সবকিছু আগলে রাখার কায়দা, কোর্টকাছারি-- এইসমস্ত সে দুই ছেলের চেয়ে বোঝে ভালো। তাছাড়া, অক্ষয়চন্দ্রর জানা আছে, জানা আছে স্নেহলতা কি মহীন্দ্ররও, দ্বিজেন্দ্র গায়ে বাতাস লাগিয়ে খাওয়া মানুষ। এই হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হওয়ার দিনে নবদ্বীপের জমি থাকলে কী, না থাকলেও কী-- এনিয়ে সত্যি তার যেমন কিছু যেন যায় আসে না।

মাসখানেক আগে দ্বিজেন্দ্র যেন কোত্থেকে প্রায়ই খবর নিয়ে আসত, এই বাড়ি ঘর গ্রামের বাড়ি-- এইসমস্ত কিছু হিন্দুস্থানেই থাকবে। অর্থাৎ, এই জেলা ভারতে পড়বে। তার আগে বারবার বলত, কিছুই হবে না, কোনও ভাগাভাগি হবে না। সব ঠিক থাকবে। কিন্তু দেখতে দেখতে সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল।

স্নেহলতা তখন গ্রামের বাড়ি। সেদিন উড়ে উড়ে কোত্থেকে খবর এসেছিল, কথা সত্যি, এতদিন দ্বিজেন্দ্র যা বলেছে তাই! বলেশ্বরের এই পাড়ের এইসব হিন্দুস্থানে। যদিও গ্রামের কেউ পতাকা তোলেনি। কিন্তু নদী দিয়ে উত্তরে ঢাকার দিকে যে দুই একখানা সরকারি নৌকা যাচ্ছিল তার কোনও কোনওটায় নাকি টাঙানো ছিল পাকিস্তানের পতাকা। নীচে র দিকে, দক্ষিণে কাজে গিয়েছিল কেউ কেউ। কারও কারও কাজ ছিল পিরোজপুরে। তারা দেখেছে, পিরোজপুর মঠবাড়িয়া বরগুনার ওইদিকে মানুষ পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছে, এপাশে মোড়েলগঞ্জের বন্দরে উড়েছে হিন্দুস্থানের পতাকা। এ নিয়ে জোকর দিয়েছে কত মানুষ। চিৎকার করেছে কতজন। এপাড়ে বলেছে, বন্দে মাতরম; ওপাড়ে বলেছে, আল্লাহ আকবর!

কিন্তু এই খবর যেভাবেই আসুক এই শোনায় স্নেহলতার মন সত্যি খারাপ হয়েছিল। কিচ্ছু ভালো লাগেনি। তার বাপের বাড়ি ওপারে। পুবে। মঠবাড়িয়ায়। আর তার বড়্দা থাকে ঝালকাঠি। সেসব জায়গা চলে গেল পাকিস্তানে, অন্য দেশে। দীনলক্ষ্মীরও মন খারাপ। তবে কম। দীনলক্ষ্মীর বাপের বাড়িও ওপার। ওপার মানে পিরোজপুর মহকুমায়, জেলা বরিশাল। বরিশাল মানেই পাকিস্তান। কিন্তু এই নদী পার হলেই বলতে গেলে দীনলক্ষ্মীর বাপের ভিটা। বাড়ি থেকে মাইল দেড়েক পথ হেঁটে যাও বৈরাগির হাটখোলা, তারপর নদী পার হলেই দীনলক্ষ্মীর বাপ-দাদার ভিটা। এই নিয়াও দীনলক্ষ্মীর বিড়বিড়ানির অন্ত নেই-- সারাদিন যারে পায় তারে কয়, হইয়া গেল কী?

কিন্তু এইসমস্ত নিয়ে প্রায় উত্তাপহীন দ্বিজেন্দ্র। তার এতে কিছু আসে যায় না। শ্বশুরবাড়ি থাকলেও তো তার কিছু আসতে যেত না, এখন যে অন্য দেশে গেল তাতেও তার কিছু আসে যায় না। আগেও বা কোন্কালে সে গেছে শ্বশুরবাড়ি?

মাস তিনেক আগে জন্মানো ভূপেনকে কোলে নিয়ে বলেশ্বরের দিকে তাকাতে তাকাতে স্নেহলতার চোখ ভিজে আসে।

কিন্তু চোখ ভিজে আসা, বাপের বাড়ির জন্যে মন উদাস হওয়ার ফাঁক গলে সংবাদ সব কত দ্রুত উলটে যায়। এই ছেলের নাম কী রাখবে তা জানতে চেয়েছিল দ্বিজেন্দ্রর কাছে। শ্বশুরমশায়ের কাছে জিগগাশা করার কথা বলে দ্বিজেন্দ্র খালাস। স্নেহলতা ভেবেছিল হয়ত মহীন্দ্র রাখবে নাম। কিন্তু এমন উলটাপালটা দিনে হঠাৎ ছেলেটার পর-পর তিন দিন টানা জ্বর হলে মহীন্দ্র স্নেহলতাকে নিয়ে শহরের বাড়িতে যায়। আর তখন এক সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরতে ফিরতে শোনে, সব উলটে গেছে, এইসব-- এই বাড়ি এই মহাকুমা এই জেলা সব পাকিস্তানে।

কয়েকদিন আগে বাপের বাড়ি পাকিস্তানে পড়ায় স্নেহলতা যে কষ্ট পেয়েছিল, এবার তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেল। কেননা, দ্বিজেন্দ্র ছেলেদের ব্যাপারে কিছু না ভাবলেও, অক্ষয়চন্দ্রের নাতিদের নিয়ে অন্য চিন্তা আছে। অক্ষয়চন্দ্র আগেই ঠিক করেছিল, নবদ্বীপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে দ্বিজেন্দ্রর বড়ো দুই ছেলেকে। সেখানে দীনলক্ষ্মী থাকবে নাতিদের নিয়ে। এনিয়ে দ্বিজেন্দ্র আপত্তি করেছে, কিন্তু বাপের ওপর কথা বলতে পারেনি। শুধু বলেছিল, বাগেরহাটে কত ভালো ভালো ইস্কুল কলেজ। সে কথা জানে অক্ষয়চন্দ্রও। কিন্তু তার হিসেব অন্য। নবদ্বীপের জমি ও বাড়িঘর রক্ষা হবে, নাতিদের পড়াশোনা হবে, কলকাতার কাছেও থাকা হবে। ধীরে ধীরে কলকাতার কাছে জমি কেনার পরিকল্পনা থেকে তার এই সিদ্ধান্ত। আর, তার দুই ছেলেকে এক জায়গায় রাখার পক্ষপাতীও সে না। এই দিকের জমিজমা দেখবে দ্বিজেন্দ্র, নবদ্বীপেরটা মহীন্দ্র।

কিন্তু কোলের ছেলেকে নিয়ে এই শহরে এসে স্নেহলতা যখন শুনল, এইসমস্ত পাকিস্তানে আর নবদ্বীপের বাড়ি হিন্দুস্থানে, তখনই সে জানত এখন আর সে চাইলেও বড়ো দুই ছেলে রমেন নৃপেণের নবদ্বীপ যাওয়া ঠেকাতে পারবে না। ওদিকে আগে থেকেই নাতিদের নিয়ে নবদ্বীপ যাওয়ার ব্যাপারে একপায়ে খাড়া দীনলক্ষ্মী। বউদের কাছে তার থাকতে ভালো লাগে না। অথবা, দীনলক্ষ্মী বুঝে গেছে অক্ষয়চন্দ্র কোনওকিছু নিয়ে পরামর্শ করার থাকলে বড়োবউ স্নেহলতার সঙ্গেই করে। এমনকি দ্বিজেন্দ্রর সাথেও না।

ফলে, মহীন্দ্র তার দুই ভাইপো ও মাকে নিয়ে নবদ্বীপ যাওয়ার আগে নিজে একবার নবদ্বীপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মাস পাঁচেক আগে সে আর অক্ষয়চন্দ্র কিছু জমি দেখে এসেছিল, সেগুলো যদি রেজস্ট্রি করার সিদ্ধান্ত করা যায়। নবদ্বীপে ব্যবসা শুরু করার কথাও তার মাথায় আছে। একবার ভেবেছিল গেঞ্জির কারখানা বসাবে। পরে সে-সিদ্ধান্ত বদলেছে। ভেবেছে, বিড়ির কারখানা বসাবে। কিন্তু দেশের এই ভাগাভাগির দিনে নবদ্বীপ যদি হিন্দুস্থানে পড়ে, তাহলে রংপুরের তামাক আগের মতো পাওয়া যাবে-- সেই নিশ্চয়তাই-বা কী? এই দেশ থেকে এখন যদি বানের জলের মতো মানুষ ওই দেশে যায়, তাহলে যে জমি দেখে এসেছে, কেনার কথা বলে এসেছে-- সেগুলোও ঠিকঠাক পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও মহীন্দ্রর দ্বন্দ্ব কাটে না। অক্ষয়চন্দ্রের সঙ্গে এই নিয়ে কয়েকবার পরামর্শও করেছে। দ্বিজেন্দ্রের সাথেও কথা বলেছে। দ্বিজেন্দ্রের তো কোনও কিছুতেই তেমন সায় যেমন নেই, আবার না ও নেই কোনও কাজে। এমন মানুষের সঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে পরামর্শ করাও সব সময় কাজের হয় না। যে ব্যাপারে ভালোমন্দ দুটো কথা বলে, পরামর্শ দেয় স্নেহলতা। বড়োবউর সঙ্গেই মহীন্দ্র কথা বলেছিল। সেখানে অক্ষয়চন্দ্রও ছিল। কিন্তু জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি আবার নবদ্বীপ যাওয়ার চিন্তা করেও তখন আর যাওয়া হয়নি। যেতে যেতে সেই যাওয়া প্রায় আষাঢ়ের শেষ পর্যন্ত যেয়ে ঠেকল।

আষাঢ়ের শেষ পর্যন্ত মহীন্দ্রর যেতে দেরি হওয়ার কারণ ছিল। জমি বান্দা লাগিয়ে, আর গতবারের কিছু ধান বেচে টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল মহীন্দ্রর। ধান বেচেও ছিল। শ্রীরামকাঠি বন্দর থেকে বেপারিরা এসে ধান কিনেছে, জমি বান্দা লাগানোর টাকাও কিছু দিয়ে গেছে। বাকি টাকার কিছু দেয়ার কথা ছিল খুলনায়। মহীন্দ্র নবদ্বীপ যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে খুলনায় যেয়ে শোনে, যাদের টাকা দেয়ার কথা তারা তাকে যশোরে টাকা দেবে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে, আবার বাড়ি আসবে তাতে আরও কতদিন দেরি হবে কে জানে। ফলে সে যশোরেই টাকা নেবে ঠিক করে। সেইমতো যশোরের ভৈরব নদীর কূলে দড়াটানা ঘাটে এক হোটেলে মহীন্দ্র থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। জ্ঞাতি বড়োদা যোগেশ তাকে বলেছিল, যখন বেশি টাকা পয়সার ব্যাপার হবে, লেনদেন নিয়ে কাজ করবি তখন এমন হোটেলে থাকবি যেন মানুষ বুঝতে না পারে কী জন্যে এমন হোটেলে আছিস। সে উদাহরণ হিসেবে শ্রীরামকাঠি ইন্দ্রেরহাট আর স্বরূপকাঠির ব্যবসায়ীদের উদাহরণ দিয়ে বলেছিল, তারা যদি কোনও প্রয়োজনে শ্রীরামকাঠির দিকে আসে বা আসে বাগেরহাটে বা যায় খুলনায়, তখন এইরম প্রায় ছাপড়া বোর্ডিঙেই থাকে।

মহীন্দ্রর হোটেলে থাকাও ছিল তাই। পুরনো শহর যশোর। সেখানে কত ভালো হোটেল। কিন্তু মহীন্দ্রর যোগেশের কথামতো দড়াটানার পাশে একটা প্রায় ছাপড়া হোটেলেই ছিল। যদিও পরে তার এমন একটি হোটেলে থাকা নিয়ে বাড়ির সবাই শুনে বলেছিল, শুধু এই একদিন কেন, এমনে সময়েও মহীন্দ্র এর চেয়ে ভালো হোটেলে থাকার মানুষ না।

কিন্তু এই সময় বিয়ষটা ছিল উলটো। ওই ছাপড়া হোটেলে মহীন্দ্র ছিল এই জন্যে, সেখানে তাকে শ্রীরামকাঠির লোকরা টাকা দিতে আসবে। টাকা পেয়েছিল মহীন্দ্র। তারপর কুষ্টিয়া হয়ে নবদ্বীপ গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে জমি কেনার ব্যাপারে আলাপ করে, বায়না দিতে যেয়ে দেখে, ওই টাকা জাল। যাদের জমি কিনবে তাদের একজনের কাছে টাকা দেয়ার পর সে বলে, এ টাকা কোথায় পেয়েছেন, মশাই?

তখন হিন্দুস্থান-পাকিস্তান নিয়ে চারদিকে অনিশ্চয়তা। মানুষে মানুষে প্রবল অবিশ্বাস। তার ভেতরে ধান বিক্রির টাকা নিয়ে এই অবস্থা হওয়ায় মহীন্দ্র তখন কার কাছে যায় কী করে? সে দ্বিজেন্দ্রের কাছে একখানা চিঠি লিখেছিল :

‘পূজনীয় দাদা, ধান্য বিক্রয়ের সমুদয় কাগজের নোট জাল। যদি পারেন কাউকে পাঠিয়ে ওপারে বেপারিকে ধরিবার চেষ্টা করিবেন।’

শোনা যায়, সেই বেপারিও দেশ ছেড়ে গেছে। দ্বিজেন্দ্র তাকে কোথায় খোঁজে?

তখন গ্রামের বাড়ি থেকে জ্বরে কাবু ভূপেনকে নিয়ে স্নেহলতা শহরে আসে। চারদিকে থমথমে ভাব। এমনিতে বাগেরহাট শহর সন্ধ্যার পরে অন্ধকার। ট্রেজারির ঘণ্টা রাত বাড়ায়। সন্ধ্যার পর আর আজকাল মানুষ কেউই তেমন বাইরে থাকে না। কংগ্রেস মুসলিম লিগ-- এইসব নিয়ে শহরের মানুষের দোটানা প্রায় শেষ। এখন ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা। কী হয় কী হয়। মহীন্দ্র কয়দিন আগে গেল, আসবে কবে। দ্বিজেন্দ্রের মতো মানুষ, যে আড্ডা ছাড়া প্রায় কিছুই বোঝে না, সেও প্রায় দিন সন্ধ্যার আগে পরে গোজ হয়ে বসে থাকে। কোথাও যায় না। পিসতুতো ভাই অনিল প্রায়ই সন্ধ্যায় আসে। কী করবে, কোথায় যাবে, কী সিদ্ধান্ত করা উচিত? ভারতবর্ষ স্বাধীন হচ্ছে। এইসব নিয়ে দুইজনে আলাপ করে। স্নেহলতা সময়ে সময়ে চা পাঠায়। তখন শোনে, দ্বিজেন্দ্রলাল বলছে, অনিল, মুসলিম লিগ মনে হয় খুলনারে পাকিস্তানেই ফেলাবে।

অনিল অনেক বিষয়ে চটপটে। তৎপরও। তবে, দ্বিজেন্দ্রর মতো এতটা যুক্তি দিয়ে কোনও কিছু বুঝতে চায় না বা বোঝেও না। সে বলে, ‘কী যে কয়েন-না বড়্দা, অর্ধেকের বেশি হিন্দু খুলনায়, খুলনা অবধারিত হিন্দুস্থানে।’

¯ স্নেহলতা লক্ষ করত, দ্বিজেন্দ্র কখনও হিন্দুস্থান বলে না, বলে ভারতবর্ষ।

দ্বিজেন্দ্র সায় দেয় না। হাসেও না। আবার উত্তেজিতও হয় না। অন্য সময় হলে হয়ত এই কথায় যুক্তি দিত, যুক্তি দিতে দিতে উত্তেজিত হয়ে উঠত। তারপর মুখও একটু খারাপ করত। সবাই জানে, এটিই তার কথা কওয়ার ধরন। রাগারাগির কোনও বিষয় নেই। দ্বিজেন্দ্র বলল, ‘কলকাতা শহরেও তো হিন্দু বেশি, কিন্তু খুনোখুনিতে হিন্দু মুসলমান কম গেল কেডা?’

দ্বিজেন্দ্রর অনুমান ফলল না। খুলনা ভারতবর্ষেই গেল। কংগ্রেসের মিছিল আর বন্দে মাতরম আবার শোনা গেল। বাগেরহাটের মতন ছোটো শহরেও বেশ মানুষের মিছিল হল। অনিল ব্যবসার কাজে গেছিল খুলনায়, দেখে এসেছে বড়োবাজারে কী বিশাল মিছিল।

কিন্তু দিন তিনেক বাদে সব উলটে গেল। হয়ত চারদিন। স্নেহলতা চাইলে এখন আর সব ঠিকঠাক মনেও করতে পারে না। সন্ধ্যার মুখে ‘নারায়ে তকবির, আল্লাহু আকবর’ দিয়ে মিছিল বের হল। আকাশবাণী থেকে খবর এল, খুলনা পাকিস্তানে। সঙ্গে চব্বিশ পরগনা থেকে সাতক্ষীরা খুলনার সঙ্গে। সেদিন রাতে আশপাশের বাড়িগুলোর জানালা কী জোরে জোরে লাগিয়েছিল। শহরময় মিছিল। নারায়ে তকবির, আল্লাহু আকবর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ!

এমন দিনের আগে আগে মহীন্দ্র যে বাড়িছাড়া হয়েছিল, আজ ফিরল। হা, মহীন্দ্র ফিরে এসেছে। সব ঠিক আছে তবে। শুধু মহীন্দ্রর চোখে কোথায় যেন অসহায়ত্ব। সেদিকে তাকানো যায় না। অথবা, মহীন্দ্র তাকাচ্ছে না তাদের দিকে। অথবা, হতে পারে, এই মুহূর্তে মা ও বউদির সামনে মহীন্দ্র কিছু বলতে সংকোচ করছে। সে কোনার সিঁড়িকোঠার ঘর ধরে দোতলার দিকে যেতে যেতে একবার স্নেহলতাকে বলল, ‘দাদা আসপে কহোন?’





মহীন্দ্রর চোখের এই ভাষাকে স্নেহলতা পড়ে নিতে পেরেছে। এইমাত্র দীনলক্ষ্মী দোতলায় গেছে পুজো দিতে। এই যে ঘণ্টা বাজাল। এত দ্রুত পূজা দেয় তার শাশুড়ি। মনে হয় পিতলের মূর্তিগুলো ঠিকঠাক প্রসাদ দেখে বুঝেও উঠতে পারে না কী প্রসাদ তাদের দেয়া হয়েছে! বাতাসা না নকুলদানা না চিনি, নাকি আজ বৃহস্পতিবার তাই সকালে রসগোল্লা, সন্ধ্যায় সন্দেশ।

স্নেহলতা মহীন্দ্রর পেছন পেছন গেল। মহীন্দ্র সিঁড়িতে কয়েক ধাপ উঠেছে। ঘরের মাঝখানে একটা হারিকেন রেখে স্নেহলতা মহীন্দ্রর কাছে জানতে চাইল, ‘ও ভাই, কোনও সমস্যা?’

মহীন্দ্র হয়ত ভাবেনি, এই সময়ে পেছনে স্নেহলতা থাকতে পারে। নিজে বিড়বিড় করে কী বলছিল। ফিরল। সিঁড়িকোঠার এই ঘরটি খুব অন্ধকার। বরং, সিঁড়িতে কিছু আলো। দেয়ালের উপরের দিকে একটা জায়গা ফাঁকা করে দেয়া, আলো আসে। বাইরের সন্ধ্যার আলো আঁধারির এক ঝলক মহীন্দ্রর মুখে পড়েছে। মহীন্দ্র মুখ ঘোরানোয়, মুখখানি প্রায় বিকৃতই লাগল, ‘না, পরে ক’বানে। যাই হাত মুখ ধুই।’

‘যাও। উপরে বিকেলে আনা জল আছে--’

তাহলে কি অন্য কোনও সমস্যা, যে সমস্যার কথা তাকেও বলতে চাইছে না মহীন্দ্র। মুখটা কেমন করে তার দিকে তাকাল। এইভাবে তাকায় না।

স্নেহলতার মন ভালো না। ভূপেন প্রায় মাস খানেক ধরে ভুগছে। বড়ো দুজন গ্রামের বাড়িতে। পড়াশোনা কী করে না করে কে জানে। শ্বশুর সেখানে আছে, আছে মহীন্দ্রর বউ প্রিয়বালা। দুইভাই শয়তানি বদমাইসি করে না হয়ত, কিন্তু শ্বশুরমশারই পক্ষে তাদের পড়াশোনার ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বলা হয়ত সম্ভব হচ্ছে না। আর, এইখানে পড়বে না নবদ্বীপে যাবে এই নিয়ে তাদের দোটানারও শেষ নেই। ওদের কাকা নবদ্বীপে ধানিজমি কিনতে পারেনি, এই হুড়াহুড়িতে হাজার কুড়ি টাকা খুইয়ে এসেছে।

কিন্তু এই খবরের চেয়ে বড়ো খবর, স্নেহলতার বাপের বাড়ির দিকে থানায় আশ্রয় নিয়েছিল কিছু মানুষ। যাদের হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হওয়ার পর-পরই বাড়িঘর থেকে নাকি তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। থানার ওসি নাকি জল্লাদ ডেকে তাদের সবাইকে কোতল করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। সেদিন থানায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল, তারা কেউই আর জীবন নিয়ে বেঁচে আসতে পারেনি। এই কথা শোনার পরে স্নেহলতার গলার ভাত নামেনি কয়েকদিন। তার বাপের বাড়ি কাছেই, রাজাপুর। প্রিয়বালার বাপের বাড়ি কাঁঠালিয়া, রাজাপুরের প্রায় গায়ে। সেখান থেকে চিঠি আসে, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে এই সময়ে মহীন্দ্র নেই। প্রিয়বালার মনের অবস্থা বুঝতে পারে স্নেহলতা।

দিন কয়েকের ভেতরই সবকিছু প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসে। দ্বিজেন্দ্রের মুখভার কাটে। আবার বাড়েও। কোনও কোনওদিন খবর আনে কে কে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চলে যাবার। বড়ো রাজবাড়ির মানুষজন আগে অনেকেই কলকাতা থাকত, এখন তারা সবাই চলে যাবে। বড়ো রাজবাড়ি অর্থাৎ জমিদারদের বড়ো ছেলের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রর খাতির ছিল ভালোই, তার যাওয়ার ঘটনা শুনে দ্বিজেন্দ্র বলেছিল, তারা এখন এই দেশ থেকে যাক বা না যাক, ছেলেদের রাখবে না। যদিও তাদের গ্রামে, স্নেহলতা তার বাপের বাড়ির দিকের মতন কিছু শোনেনি। কিছু হবেও না। মানুষের জমি জায়গার শক্তি না থাকলে, নেতাদের শক্তি না থাকলে, থানার শক্তি না থাকলে কোনওভাবেই এতদিনের প্রতিবেশীর মাথায় লাঠি তুলতে পারে না। তখনই পারে, যখন আশপাশের মানুষ উসকে দেয়, তখন।

তাই, দ্বিজেন্দ্রে কয়েকদিনের ভেতরই আবার নির্লিপ্ত হয়ে যায়। তার ভাবখানা এই বাপের গোলায় ধান আছে, মাঠে জমি আছে, ওই ধান বেচবে আর খাবে। দেশ পাকিস্তান হইল আর আগে কোনওদিন হিন্দুস্থান ছিল কি ব্রিটিশের দেশ ছিল তাতে কী আসে যায়? যেভাবে চলছে চলুক। তার ফুটানি মারার সুযোগ, গুলতানি মারার ইয়ারদোস্ত আর মাঝে মধ্যে এ জায়গায় ও জায়গায় যদি মেয়েমানুষের কাছে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে, তা হলেই হয়।

কিন্তু স্নেহলতা কোনওদিনও এভাবে ভাবেনি। তার বাপও এই ভাবনার মানুষ ছিল না। চাকরি-বাকরি না করে, লেখাপড়া না শিখে গায়ে বাতাস লাগিয়ে খাওয়ার মতন পদ তাদের বাপের বাড়ির দিকের গুষ্টির কেউই না। এইখানে এসে সে দেখেছে, এরা বাপের সম্পত্তিতে তা দিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারলে খুব খুশি। যেন, বাপের যে সম্পত্তি আছে তা অক্ষয়। জীবনে এর কোনও কিছু ফুরাবে না। এই হিসেবের রাজা তার স্বামী দ্বিজেন্দ্র। গায়ে বাতাস লাগানো ভাবের চূড়ামনি। স্নেহলতা হিসেব করেছে, নিজেতে নিজেতে মিলিয়ে দেখেছে, এই করলে তার ছেলেরা মানুষ হবে না। বাপ-ঠাকুর্দার সম্পত্তির দিকে চোখ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দিন পার করে দেয়া-- এই সম্পত্তির দিকে তাকিয়ে ইস্কুল-কলেজে ঠিকঠাক না যাওয়া, এই কোনও কাজের কথা না। কিন্তু স্নেহলতা যেন তার দিব্য চোখে দেখতে পারছে তার রমেন-নৃপেণ সেদিকে যাচ্ছে। এখনি ছেলে দুটোকে নবদ্বীপ পাঠানো দরকার। কিন্তু এর ভেতরে আসল এই এক ছাতার দেশ ভাগ। সবাই বলে, দেশ স্বাধীন। দেশই যদি স্বাধীন হবে, তাইলে এতদিনের দেশ এইভাবে ভাগ হয়? দেশ স্বাধীন মানে তা’লি (তাহলে) দেশ ভাগ। স্নেহলতা ভাগভাগির স্বাধীনতাকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে, নিজের সুযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল, এই যদি হবে, যদি নবদ্বীপ হিন্দুস্থানে যাবে, যদি এই খুলনা বাগেরহাট পাকিস্তানে যাবে, যদি বরিশাল পিরোজপুর ভা-ারিয়া এইসব পাকিস্তানে যাবে-- যদি হিসেবটা এই রকম হয়, তাইলে এই স্বাধীনতার কোনও দরকার ছিল না। মানুষের ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশ অনেক সময় এদিক ওদিক দিয়ে ঘুরে যায়, নিজের সঙ্গে মিলিয়ে সে এর ভালোমন্দের হিসেব করে। স্নেহলতা সেইভাবে নিজের জন্যে প্রয়োজনীয় হিসেব মিলিয়ে নিতে থাকে।





এদিন দ্বিজেন্দ্র এসে গোঁজ হয়ে বসে থাকল। কারও সঙ্গে কথা বলল না। প্রথম কতক্ষণ নীচে র বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল। সামনেই ডান কোনায় টিনের রান্নাঘর। বারান্দার মাঝখান থেকে পথ গেছে কুয়োতলায়। রান্নাঘরের পাশের বারান্দায় যেখানে দ্বিজেন্দ্র দাঁড়িয়ে ছিল, প্রায় অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে স্নেহলতাকে দেখছিল, সেখানে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও স্নেহলতা তাকে দেখত না। স্নেহলতা তাকে দেখল এই জন্যে, সে কুয়োতলার দিকে যাচ্ছিল ফ্যানের ভাঁড় নিয়ে। বামের হাতায় পাশাপাশি দুটো নারকেল গাছ, সেই দুটোর মাঝখানে কুকুরের খাদা। স্নেহলতা রান্নাঘরের উলটো দিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে দেখে, দ্বিজেন্দ্র দাঁড়িয়ে। স্নেহলতা বাম হাতে ঘোমটা টানে। তারপর বলে, ‘মহীন্দ্র আইচে--’

দ্বিজেন্দ্র একবার শুধু বলে, ‘হুঁ।’

স্নেহলতার মনে হল, লোকটার মন ভার। অথবা, মেজাজে তেমন খোশ ভাব নেই। না হয় মানুষটা এমন মন মরা হয়ে থাকে না কোনও সময়। কী এমন হল যে একবার শুধু হুঁ বলল। নাকি শিবের জল পেটে পড়েছে। তা হওয়ার কথা না, শাশুড়ি আছে। এই সময় তার কামারপট্টির দিকে যাওয়ার কথা না।

কুয়োতলা থেকে ফিরতে ফিরতে স্নেহলতা দেখল, দ্বিজেন্দ্র একবার পেছনে ফিরে ধীরে পায়ে সিঁড়িকোঠার ঘরে ঢুকে গেল। চুলোয় জ্বাল দিতে দিতে সে দ্বিজেন্দ্রের যাওয়া দেখল। একবার জানতে চাইলে, ‘হেরিকেন ধরব নাকি?’ কিন্তু সিঁড়িকোঠায় রাখা আলো সিঁড়িতে পড়ছে। আর উঠতে উঠতে ঘুরে যাওয়া সিঁড়িতে রাখা আলোর আভাসে দ্বিজেন্দ্র দোতলায় উঠে গেল।

তখন স্নেহলতা কান খাড়া করেছিল দোতলায় উঠে দ্বিজেন্দ্র মহীন্দ্রর সঙ্গে কোনও কথা বলে কি না। মহীন্দ্র এমনিতেই প্রায় বিপর্যস্ত। যেন আধমরা মানুষ। এতগুলো টাকা খুইয়ে এসেছে। স্নেহলতা ভেবেছে, হয়ত মহীন্দ্র দ্বিজেন্দ্রের সঙ্গে কথা বললে, এই নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে তর্ক হতে পারে। বরং, স্নেহলতা রান্নাঘরের দরজা দিয়ে সিঁড়িকোঠার দিকে তাকিয়ে দেখল, মহীন্দ্র নীচে এসেছে। কিছু একটা খুঁজছে। স্নেহলতা জানতে চাইল, ‘ও ভাই, খোঁজো কী?’

মহীন্দ্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে স্নেহলতার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘গামছা খুঁজি।’

‘তুমি এহোন হাত মুখ ধোও নাই?’

‘না।’

‘কী করছো?’

‘ওই ওপাশের ঝুলবারান্দায় দাঁড়াইয়াছেলাম। এহোন যাব।’

‘তোমার গামছা দেখো উপরের এই কোনার বারান্দায় আছে। আমি ধুইয়ে ভাঁজ কইরে থুইচি।’

মহীন্দ্র দাঁড়িয়ে থাকে। হয়ত এই গামছা খুঁজতে আসার ছলে সে স্নেহলতাকে আরও কোনও কথা বলতে চায়। স্নেহলতা তা বুঝতেও পারে। কিন্তু তার আগে সে জানতে চাইল, ‘তোমার দাদার সাতে কোনও কথা হ’ল?’

‘না। কী কথা?’

‘এমনি-- তোমাদের এতদিন বাদে দেখা।’

‘না, দাদা আমারে কিছু ক’ল না।’

‘ওই উত্তরের ঘরে কিছুক্ষণ বসল, তারপর ঝুল বারান্দায় আইসে দাঁড়ালি আমি প্রণাম করলাম, তারপর চুপ করে থাকল। বড়োবউ, দাদা আমার উপর রাগ নাকি?’

‘না। সেরম তো কিছু মনে হ’ল না।’

মহীন্দ্র নিজেতে বলল, ‘হ--।’ দাদা, এমনি। এটা তার অভ্যাস।

স্নেহলতা বলল, ‘যাও হাত মুখ ধোও-- গেঞ্জিডার অবস্থা হইচে কী। প্রিয়বালা বুন্ডি দেকলে যে কী কবে!’

মহীন্দ্র আবার দোতলায় গেল। তারপর খুব দ্রুত নীচে নামল। স্নেহলতা টের পেল, মহীন্দ্র ¯œান করছে। গায়ে ঘটির পর ঘটি জল ঢেলে যাচ্ছে। জ্বর বাধাবে নাকি। কোন দূর থেকে আইচে-- এই জলে এত ভেজে কেন?

ভাত চড়িয়ে স্নেহলতা দোতলায় আসে। একখানা খাঞ্জা থালায় মুড়িভাজা আর চা হাতে। দোতলার খোলা ফাঁকা জায়গায় একখানা হাতঅলা চেয়ারে দ্বিজেন্দ্র পশ্চিম দিকে ফিরে বসা। রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো মহীন্দ্র। কত দূর থেকে এসেছে, বসলে পারে। স্নেহলতা মহীন্দ্রর হাতে চায়ের কাপ আর রেলিঙে ছোটো বাটিতে মুড়িভাজ রাখতে রাখতে বলে, ‘বসো তুমি--’ তারপর দ্বিজেন্দ্রর সামনে ছোটো একটা টুলের পর চায়ের কাপ ও মুড়ির বাটি রাখে। দীনলক্ষ্মী এখানে নেই। সে এখন কিছু খাবে না। স্নেহলতা দেখল, কোনার ঘরে খাটের ওপর বসে সামনে হেরিকেন রেখে দীনলক্ষ্মী ভাগবৎ পড়ছে সুর তুলে। স্নেহলতা ওই ঘরের দরজার সামনে রাখা চেয়ার উঁচু করে মহীন্দ্রর দিকে আনতে লাগলে সে বলে, ‘করো কী? আমি আনি, তুমি থোও--’

কিন্তু দ্বিজেন্দ্র বলল, ‘না, দিক দিক তোরে চেয়ার দিক। আফটার অল, তুই বড়োবউর দিগি¦জয়ী দেওর--’

স্নেহলতা চেয়ারটা রেলিঙের কাছে রাখতে রাখতে দ্বিজেন্দ্রের মুখের দিকে তাকায়। হেরিকেনের আলো কম। দ্বিজেন্দ্রের উপহাস করা মুখ ভালো করে দেখা গেল না। কথার অর্থটাও ভালো বুঝল না। ইংরেজি বলেছে, তা বুঝেছে। স্নেহলতা বলল, ‘বাদ দেও দিন-- কীভাবে না কীভাবে আসল-- চারদিকে এই দুর্যোগ-- তুমি খোঁচা দিয়ে কথা কও।’

স্নেহলতা টের পেল, তার এই কথার ভেতরে দীনলক্ষ্মীর ভাগবৎ পড়া থেমে গেছে। স্নেহলতা জানে, দীনলক্ষ্মী স্বামী-দেওরের সামনে বউদের এইভাবে কথা বলা পছন্দ করে না। কিন্তু এখন স্নেহলতা সত্যি নিরুপায়। যত যাই ঘটুক, এই সময় ভাইটা ফিরে এসেছে, কেমন আছে, ভালোমন্দ তাই জানতে চাবে, নাকি এর ভেতর এমন খোঁচা দিয়ে কথা বলা লাগে?

দীনলক্ষ্মীর যা স্বভাব। পড়া থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হইচে, ও বউ?’

স্নেহলতা দ্বিজেন্দ্রর দিকে চাইল। যেন জানত দ্বিজেন্দ্রকে এই কথা বলার পরই দীনলক্ষ্মী কিছু একটা বলতে পারে। স্নেহলতা বলল, ‘কিছু না, মা ঠাইরেন।’ এরপর মহীন্দ্র এখনও চেয়ারে বসেনি দেখে বলল, ‘বসো। এই হারিকেনডা পালটাইয়া দেব। আলো কম। সিঁড়িকোঠার ডা আইনে দি--’

দ্বিজেন্দ্র স্নেহলতার তৎপরতা দেখে। স্নেহলতা ওই কথা বলায় সে শব্দ করে হেসেছে। দ্বিজেন্দ্রের মনের অবস্থাও ভালো না, স্নেহলতা জানে। মহীন্দ্রকে এই কথা বলেছে, এই যেন কয়েকদিনে তার বেশি কথা বলা।

মহীন্দ্র বলল, ‘লাগবে না।’ হয়ত মহীন্দ্র চায় না বড়্দার সঙ্গে খুব মুখ-চোখের কাছাকাছি সংযোগ হোক।

স্নেহলতা দ্বিজেন্দ্রকে বলল, ‘তুমি দয়া কইরে ওরে কিছু কইয়ে না।’

‘কইয়ে আর হবে কী, বড়োবউ! যা দেইহে আইচি তাতে আমার আমাগো আর গেইচে কী? হইচে কী-- সবই আচে-- এট্টু পরে পাত ভইরে ভাত খাব-- মানুষ--’

দ্বিজেন্দ্র বলল, ‘যা শুনি চাইর দিক-- সত্যি-- তুই তো কিছু কইস নেই--’

‘কী কব-- আপনি তো জিগোননি--’

‘তুই কইলকাতা গেইলি? না-রানাঘাট যশোর এই পথে আইচিস?’

স্নেহলতা দ্বিজেন্দ্রর দিকে তাকাল। লোকটার ধরন বোঝা ভার। এতক্ষণে ভাইটার কাছ থেকে জানতেও চায়নি কোন পথে এসেছে। পথঘাটের কী সমাচার।

মহীন্দ্র বলল, ‘কলকাতা হইয়ে।’

‘কী দেকলি?’

‘শিয়ালদায় মানুষ আর মানুষ। পথের সব স্টেশনেই মানুষের ভীড়। হাড়িকুড়ি বোচকা বেডিং নিয়ে সব গেছে। বেশির ভাগ পিরোজপুর বরিশালের-- খুলনার এদিকেরও আছে। তয় পরিচিত কেউ বাদি নেই--

‘মানুষ এইভাবে যাইতেচে--’ দ্বিজেন্দ্রের গলার স্বর নেমে এসেছে। কিন্তু মহীন্দ্রর গলার অসহায়ত্ব তার গলায় নেই।

স্নেহলতা নীচে চলে যাচ্ছিল। মহীন্দ্রর মুখে বরিশাল শুনে দাঁড়িয়েছে। তখন দেখে, ঝুল বারান্দায় মহীন্দ্রর মেলে দেয়া গামছাটা বাতাসে একখানে দলা দিয়ে আছে অথবা মহীন্দ্র গামছাটা ঠিকঠাক মেলে দেয়নি। মহীন্দ্রর গামছা টানটান মেলে দেয়া থাকে। এখন যখন তখন বৃষ্টি আসে। গামছা শুকায় না। বোটকা গন্ধ আসে। সে ঝুলবারান্দায় যেয়ে গামছায় হাত দিতে শালতলার দিকে মিছিলের শব্দ শোনে। বহু মানুষের স্বর। ওইদিকে থেকে আসছে।

এই সময় মহীন্দ্র বলে, ‘ও দেশ দিয়াও আসতিচে মানুষ। নবদ্বীপে দেখলাম, মুসলমানরা এদিক আসপে মনে হয়।’

‘হয়, এই তো এট্টা খেলা পাতাইয়ে থুইয়ে ইংরেজ যায়-- কী খেলা যে হবে!’

শালতলায় শোনা গেল : আলাহু আকবর।

মহীন্দ্র বলল, ‘আজকাল খুব জাকইর দেয় মেয়া সাহেবরা?’

‘হ,’ স্নেহলতা বলল, ‘এই কয়দিন খুব শুনি--’

দীনলক্ষ্মীর ভাগবৎ পড়া আবার থেমে গেছে। স্নেহলতা ভাবল, জানতে চাবে কী হয়েছে?

মহীন্দ্র বলল, ‘ওপারে, নবদ্বীপে খালি বন্দে মাতরম-- আর মিছিল-- নবদ্বীপেরও কিছু নাকি পাকিস্তানে পড়ছে।’

দ্বিজেন্দ্রের চোখ বড়ো হল। হয়ত এটা তার জন্যে দুঃসংবাদ। হয়ত নবদ্বীপে যে জমি কিনতে চেয়েছে তাদের বাবা তার কী ভবিষ্যৎ-- সেই আশঙ্কায়।

দ্বিজেন্দ্র বলল, ‘এপারে আল্লাহু ওপারে বন্দেমাতা-- মাঝখানে মানুষ যাতাকলে-- চ্যাডের স্বাধীনতা--’

স্নেহলতা জানত, জানত মহীন্দ্রও, দ্বিজেন্দ্র এমন কথা বলে। মুখ খারাপ করবে। মুখ খারাপ করে কথা বলা তার স্বভাব। এখন দীনলক্ষ্মী কাছে আছে, ভাগবৎ পড়ছে তাই হয়ত এতক্ষণে এনিয়ে কিছু বলেনি।

স্নেহলতা দুই ভাইর প্রায় মাঝখানে দাঁড়ানো। নীচে যাবে। চুলায় ভাত চড়িয়ে এসেছে। যদিও কাঠ টেনে চুলার মুখে রাখা আছে। একটু পরে গেলেও সমস্যা নেই।

স্নেহলতা আবার ধমকের সুরে কথা বলল, কিন্তু নীচু গলায়, ‘কী সমস্ত কও-- মা ঠাইরেন ভাববৎ পড়ে--’

‘বাদ দেও তোমার ভাগবৎ। মানুষ বাঁচে না, ভাগবৎ দিয়ে হবে বা--’ পরের টুকু আর বলল না।

‘হয়। মানুষ যে কীসের মদ্যি পড়িচে, তা না দেকলি বিশ্বাস হয় না। সে বরাদ্দে--’ মহীন্দ্র বলে চলেছে।

এই সময় দোতলার এই ফাঁকা জায়গা থেকে স্নেহলতা দেখল, ওই বাড়ির গরু নিয়ে পাশের বাড়ির পেছন থেকে আসছে একটা ছেলে। কুয়োতলা পরে সন্ধ্যামালতী গাছগুলো প্রায় মাড়িয়ে যাচ্ছে গরুগুলো। স্নেহলতা বলল, ‘দেইখে যা, ফুল গাছগুলো--’

তখন, দ্বিজেন্দ্রকে আবারও, ‘চ্যাটের স্বাধীনতা’ বলতে শোনে স্নেহলতা। আর মহীন্দ্র বিড়বিড় করে বড়্দার সামনে, ‘আমাগো ওই কয়ডা টাকা গেইচে-- বড়োবউ, মা ক’ল তোমাগো ওদিক নাকি মানুষ মারিচে--’

স্নেহলতা নীচে নেমে গেছে। সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ের কাছে দুটো গরু।





এই ঘটনার বহুদিন বাদে, বহু বহু দিন বাদে, এই বাড়ির পুবের ঘরে স্নেহলতার নাতিরা টিভিতে ‘বন্দে মাতরম’ গান দেখে, দেখতে দেখতে গলা মেলায় তাদের (হিন্দু ও মুসলমান) বন্ধুদের সঙ্গে। নাতিদের দেখা অনুষ্ঠানে একবার গান্ধি, একবার নেহরু, একবার নেতাজি সুভাষের ছবি দেখায়। এক নাতির কাছে, কারে কারে দেখায় তা জানতে চান স্নেহলতা। দিল্লি কলকাতায় বড়ো দুই ছেলের কাছে গেলে ওই শহরে তাদের মূর্তিও দেখেছেন। ছবি দেখেছেন। সমাধি দেখেছেন। এইসব তিনি এ দেশের নাতিদের জানিয়েছেন। স্নেহলতা বোঝেন, শ্রাবণের এই প্রায় শেষে-- হিন্দুস্থান পাকিস্তান এই সময়ে হয়েছিল। কত বছর আগে? নাতিদের বাপ ভূপেনের বয়স হিসেব করেন : পঞ্চান্ন বছর? সেদিন ওর মাস তিনেক। আর, ফাঁকে শালতলার রাস্তায় একটা মিছিল থেকে ‘নারায়ে তাকবির, আলাহু আকবর’ শোনেন তিনি।

এর কিছুক্ষণ বাদে, ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে বহুদিনের অভ্যস্ত চোখে সন্ধ্যার ম্লান আলোয় তার মনে হয় সেদিনের কথা। ডানে ঘুরলে দেখবেন বসে আছেন দ্বিজেন্দ্র, রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো মহীন্দ্র।

এ সময় কোর্ট মসজিদের আজান শুনে ঝুলবারান্দায় তার সাদা কাপড় তুলতে শুরু করলে নীচে বাড়ির সীমানায় তাকিয়ে দেখেন, পরিত্যক্ত কুয়োতলায় প্রচুর সন্ধ্যামালতী ফুটে আছে। এক পশলা বৃষ্টির পরে ফুলগুলো ঝাড়সহ চকচক করছে।

এমন সন্ধ্যায় দেশহীন বহু মানুষের খবর নিয়ে ফিরেছিল মহীন্দ্র।
কুয়োতলায় বৃষ্টির পরের সন্ধ্যামালতীর ঝাড় দেখে স্নেহলতা প্রায় পাঁচ যুগ আগে ফিরে গেলেন!...

...
লেখক পরিচিতি

প্রশান্ত মৃধা

গল্পকার। প্রবন্ধকার। 

জন্ম : কচুয়া, বাগেরহাট, ১৯৭১।

পেশা : শিক্ষকতা। 

প্রকশিত বই : কুহক বিভ্রম, ১৩ ও অবশিষ্ট ৬, বইঠার টান, শারদোৎসব, করুণার 

পরিজন, মিঠে আশার অন্ধকার। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন