শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

হোর্হে লুইস বোর্হেসের তিনটি ছোটো গল্প

অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী


নরক, ১,৩২

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে একটা চিতাবাঘ ভোরের আলো ফোটার সময় থেকে বিকেলের শেষ অস্তরাগ পর্যন্ত দেখেছিল কিছু কাঠের তক্তা, কয়েকটা সোজা উঠে যাওয়া লোহার গারদ, বদলে যাওয়া পুরুষ আর নারী, একটা দেওয়াল আর সম্ভবত শুকনো পাতায় ভরা একটা পাথুরে গর্ত । সে জানতো না, জানা সম্ভবও ছিল না যে ও ঘুরে মরছে ভালোবাসার জন্য, নষ্ঠুরতার জন্য, হরিণের গন্ধমাখা বাতাসের জন্য। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা কিছু ওর দম বন্ধ করে দিচ্ছিল আর বিদ্রোহ করে উঠছিল। আর স্বপ্নে ঈশ্বর ওর সঙ্গে কথা বললেন : তুমি এই বন্দিশালাতেই বেঁচে থাকবে, আর মারা যাবে, যাতে আমি যেরকম জানি, একজন মানুষ তোমাকে নির্দিষ্ট সংখকবার দেখবে আর তোমাকে ভুলতে পারবে না । তোমার চরিত্র আর প্রতীককে স্থাপনা করবে ব্রহ্মান্ডের পরিকল্পনায় এক ছোট্ট স্থানে । এক কবিতায় । তুমি ভোগ করবে বন্দিত্ব, কিন্তু কবিতাকে দেবে একটা শব্দ।


ঈশ্বর স্বপ্নে উদ্ভাসিত করলেন পশুর পশুত্ব আর পশু বুঝতে পারলো সেইসব কারণ আর গ্রহণ করলো ওর ভবিতব্য । কিন্তু জেগে উঠে ও অনুভব করলো কেবলমাত্র এক দুর্জ্ঞেয় সমর্পণ, এক ভীষণ অজ্ঞতা, কারণ একটা পশুর সরলতার কাছে পৃথিবীর ক্রিয়াকান্ড অনেক বেশি জটিল ।

অনেক বছর পর দান্তে মারা যাচ্ছেন, রাভেনায়, যেকোন সাধারণ মানুষের মতোই অকারণ, নিঃসঙ্গ । স্বপ্নে তাঁর কাছে ঈশ্বর ঘোষণা করলেন তাঁর জীবন আর কর্মের গোপন উদ্দেশ্য । দান্তে, সবিস্ময়ে, অবশেষে জানলেন, কে আর কী ছিলেন তিনি, আর তঁর জীবনের তিক্ততাকে আশীর্বাদ করলেন । ট্রাডিশন যা যুক্ত করেছে, জেগে উঠে তা তিনি অনুভব করলেন, অনুভব করলেন অসীম একটা জিনিস তিনি পেয়েছিলেন আর হারালেন এমন একটা জিনিস যা তিনি ফিরে পেতে সক্ষম নন, এমনকি সে বিষয়ে সামান্যতম চিন্তা করতেও, কারণ মানুষের সরলতার কাছে পৃথিবীর ক্রিয়াকান্ড অনেক বেশি জটিল ।




সেরভেনতেস আর কিহোতের উপকথা


তার দেশ স্পেনের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাজার এক বুড় সেপাই শান্তি খুঁজেছিল আরিওসতোর বিশাল ভূখন্ডে, চাঁদের উপত্যকায় যেখানে নিশ্চল হয়ে থাকত স্বপ্নে কুঁড়ে খাওয়া সময় আর মোনতালবানের চুরি করা মহম্মদের মূর্তিতে ।

ওরই মতো হাসির খোরাক হিসেবে সে কল্পনা করেছিল সরল বিশ্বাসী একজন মানুষকে যে দারুণ সব লেখা পড়ে বিচলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এল তোবোসো বা মনতিয়েলের মতো সাধারণ সব জায়গায় গৌরব আর আনন্দ খুঁজবে।

স্পেন, বাস্তবতা এসব দিয়ে জয়ী হয়ে দোন কিহোতে তাঁর নিজের গ্রামে ১৬১৪ সালে মারা যান । মৃত্যুকালে অল্প কিছুকালের জন্য রেখে যান মিগুয়েল দে সেরভেনতেসকে ।

তাঁদের দু’জনের কাছেই – যার একজন স্বপ্ন দেখেছিল আর একজন যে ছিল স্বপ্নই – সমস্ত কাজের ছকটাই ছিল দুটো বিপরীত জগতের বিরুদ্ধতায় : বীরধর্মের বইয়ের এক অবাস্তব জগৎ আর সপ্তদশ শতাব্দীর এক সাধারণ প্রাত্যহিক জগৎ ।

তাঁরা ধারণা করতেই পারেনি যে সবশেষে সব অসামঞ্জস্য মুছে দেবে সময়, তাঁরা ধারণা করতে পারেনি যে উত্তরসূরীর অভাবে লা মাঞ্চা, মনতিয়েল আর কৃশকায় দুখিমুখী নাইটের শরীর সিন্ধাবাদের অভিযান বা আরিওসতোর বিশাল ভূখন্ড থেকে কম কাব্যিক ছিল না । কারণ সাহিত্যের শুরুতে ছিল মিথ, আর শেষেও ।



একটি সমস্যা

কল্পনা করা যাক যে তোলেদোতে আরবীতে লেখা একটা কাগজের টুকরো আবিস্কার করা গেল যা হস্তলেখবিদদের মতে মিদ হামেৎ বেনেনজেলির, যার কাছ থেকে সেরভেনতেস কিহোতের ব্যাপারটা নিয়েছিলেন । ঐ লেখাটায় আমরা পড়ি যে নায়ক ( যার খ্যাতি ছিল স্পেনের রাস্তায় রাস্তায় তরোয়াল, বর্শায় সুসজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়ানোয় আর কারনে অকারণে যাকে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোয় ) অনেক সংঘর্ষের পর আবিস্কার করল ও একটা লোককে খুন করেছে । এখানে এসেই লেখার টুকরোটা শেষ হয় ; সমস্যাটা হলো এটা অনুমান করা বা ঘটনার জোড় দেওয়া – এতে দোন কিহোতের কীরকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ।

আমি যতদূর জানি, এর তিনটে সাম্ভাব্য উত্তর হতে পারে । প্রথম উত্তরটা নেতিবাচক : বিশেষ কিছুই ঘটল না কারণ দোন কিহোতের বিভ্রমের জগতে মৃত্যুটা ম্যাজিকের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না আর একজন মানুষকে মেরে ফেলের ব্যাপারটা সেই মানুষকে, যে দুর্দান্ত সব দৈত্য আর যাদুকরদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বা সেকথা বিশ্বাস করে, কোনভাবেই বিচলিত করে না । দ্বিতীয় উত্তরটা ছিল করুণ ।

দোন কিহোতে কখনও ভুলতে পারত না যে সে ছিল দারুণ সব গল্পের পাঠক অলোনসো কিহানোর এক প্রতিরূপ, যে মৃত্যুকে দেখেবুঝতে পারে – একটা স্বপ্ন তাকে সেইন-এর পাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । হয়তো তার লাই পাওয়া পাগলামো থেকে তাকে জাগিয়ে তুলছে চিরকালের জন্য । তৃতিয় উত্তরটা মনে হয় সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য । যখন মানুষটা মরে গিয়েছিল তখন দন কিহোতে এটা মেনে নিতে পারেনি যে ঘটনাতা একটা প্রলাপের ফসল ; সেই কার্য-কারণের বাস্তবতা তাকে আরও একটা বাস্তবতায় বিশ্বাস করাচ্ছিল আর দন কিহোতে কখনোই তার পাগলামির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি । আরেকটা বিষয় অনুমান করা যায়, যা কিনা ইস্পানী জগতের কাছে ( এমনকি পশ্চিমী জগতের কাছেও ) ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, আর যার প্রয়োজন ছিল আরও প্রাচিন, আরও জিটিল, আর আরও ক্লান্ত এক আবহের । দোন কিহোতে নয়, হিন্দু ভারতের কালচক্রে এক রাজা, যে তার শত্রুর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করছে – হত্যা আর অপরাধের কারণ এক শাশ্বত প্রক্রিয়া অথবা এক যাদু যা লক্ষ্যণীয়ভাবে মানুষের অবস্থান্তর ঘটায়। সে জানে মৃত মানুষ একটা বিভ্রম যেমনকিনা হাতে দুলতে থাকা তলোয়ার, তার সমস্ত অতীত, প্রকান্ড দেবতারা আর এই ব্রহ্মান্ড ।


লেখক পরিচিতি
হোর্হে লুইস বোর্হেস 
(আগস্ট ২৪, ১৮৯৯ - জুন ১৪, ১৯৮৬) (স্পেনীয়: Jorge Luis Borges), পূর্ণ নাম হোর্হে ফ্রান্সইস্কো ইসইদোরো লুইস বোর্হেস আসেবেদো (Jorge Francisco Isidoro Luis Borges Acevedo) একজন প্রথিতযশা আর্জেন্টিনীয় সাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে কৃতি ও প্রভাবশালী লেখকদের মাঝে তাকে গণ্য করা হয়। যদিও তিনি তার ছোটগল্পের জন্যই বেশী বিখ্যাত, বোর্হেস্‌ একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনা লিখে গেছেন। তিনি সফল অনুবাদকও ছিলেন। জীবনের অনেকখানি সময় তিনি অন্ধ অবস্থায় অতিবাহিত করেন।



অনুবাদক পরিচিতি
বিকাশ গণ চৌধুরী

আদি নিবাস কুমিল্লা জেলার বুড়িচং গ্রাম হলেও, পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্ট শহর দেরাদুনে ১৯৬১ সালে জন্ম, ছোটবেলার অনেকটা সেখানে কাটিয়ে বড় হওয়া কলকাতায়, চাকরিসূত্রে অনেকটা সময় কেটেছে এলাহাবাদ আর মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা... লেখেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; ফরাসি, হিস্পানি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন মন্‌পসন্দ নানান লেখা, সম্প্রতি শেষ করেছেন পাবলো নেরুদার শেষ কবিতার বই ‘El libro de las preguntas’ –এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘প্রশ্ন-পুঁথি’। দীর্ঘদিন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সবুজপত্র ‘বিষয়মুখ’।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন