শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : ফ্রেমের চশমা , কোঁকড়ানো চুল

হাওয়ায় একটা পাতলা পলিথিনের মতো দোল খেতে খেতে শহরটা যেখানে একেবারে আচমকাই শেষ হয়ে গেল , সে রকম এক জায়গাতেই আমার বেড়ে ওঠা৷ এখানকার লোক ভোরবেলা উঠে একগ্লাস ছাতু কিংবা ভেজানো ছোলা কিংবা দুটোই খেয়ে হাঁটতে বেরোয়৷ হাঁটতে যাওয়ার পোশাক বলতে লুঙ্গি -গেঞ্জি অথবা ফতুয়া আর লুঙ্গির মতো করে জড়িয়ে নেওয়া সুতির সাদা কাপড়৷ হাঁটত -ই তারা৷ দৌড়ত না৷ যারা দৌড়ত তারা সাধারণত আসত বারমুডা পরে৷ তাদের বলা হত --- মর্নিং ওয়াকার৷ আর বারমুডা পরে যারা কুকুর সঙ্গে নিয়ে দৌড়ত , তারা ছিল --- বড়লোক৷ যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তা নব্বই দশকের শুরুর দিক৷ মোবাইল আসেনি৷ কুমার শানু এসেছিল৷ ভোরবেলা মহিলাদের হাঁটতে বেরনোর রেওয়াজ তৈরি হয়নি তখনও৷
খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর গোয়ালার থেকে কয়েকপো দুধ এবং বাজার থেকে পেট টিপে টিপে কিছু জ্যান্ত মাছ কিনে গায়ের চামড়া হয়ে যাওয়া ঘামে ভেজা জামাটাকে উঠোনেই খুলে নিয়ে দড়িতে মেলে যে যার বাড়িতে এসে ‘কি গো ’ বা ‘কই গো ’ বলে ডাক দিত৷ ডাকটা একটু জোরে দেওয়াই ছিল নিয়ম৷ যারা তখনও ঘুমিয়ে আছে তারা উঠে পড়ত৷ বেশির ভাগ বাড়িতেই গ্যাস নেই৷ স্টোভ৷ বিকেলের দিকে এদেরই কেউ কেউ কাজের জায়গা থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে কেরোসিনের লাইনে দাঁড়াত৷ অল্পবয়সী মেয়েদের বিনুনি করে দিত মা কিংবা দিদিরা৷ ইলেকট্রিসিটি সবে এসেছে৷ সন্ধ্যা নেমে এলেই তা চলে যেত৷ অন্ধকার তখন মশারির মতো ঘিরে ধরত চারপাশটা ’কে৷ কিছু মানুষ আড্ডা দিত মোড়ের মাথায় থাকা ছোট বটতলার বেদীতে৷ কিছু মানুষ আড্ডা দিত ভোম্বলের ‘হেয়ার কাটিং ’ সেলুনে৷ কয়েকশো মানুষের বসতির এলাকায় একটাই সেলুন৷ একটাই টিউবওয়েল৷ একটাই ফোন৷ যে বাড়িতে ফোনটা ছিল তার মালিকের ছেলে চাকরি পেয়ে আমেরিকায়৷ সন্ধে খানিকটা ধরে এলে উত্তর দিক থেকে একটা হাওয়া সামনেটা ভাঙতে ভাঙতে এই বটতলা , সেলুন , টিউবওয়েলের সামনে থাকা মানুষগুলোর চুলের গোড়া অবধি উল্টে দিয়ে কোন দিকে একটা চলে যেত৷ এ হাওয়া কোনও লেখাপড়া শেখেনি৷ ঘুম আসত তাড়াতাড়ি৷ রাত ন ’টা-সাড়ে ন ’টার মধ্যে এলাকা শুনশান৷ একটা বিয়েবাড়ি খেলে লোকে পাঁচ দিন ধরে আলোচনা করত৷ আলুর কিলো ছিল দেড় টাকা৷

এই ছিল আমাদের পাড়া৷ ভূগোল বই এবং খবরের কাগজ যাকে ডাকত ‘মফস্সল ’ বলে৷

এই রকম একটা ছবিকেই পাশ কাটিয়ে সাইকেল চালিয়ে আমাকে আঁকা শেখাতে আসত স্যার৷ আমি বলতাম নতুন স্যার৷ সাত -আট বছর বয়স নাগাদ , যখন খুব ভোরে বিছানা থেকে মা পা দুটো টেনে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে ইস্কুলে পাঠিয়ে দিত , যখন হঠাত্ কোনও কোনও দিন স্রেফ এমনিই ইচ্ছা করতো না আর হাফ প্যান্ট পরতে কিন্ত্ত সবাই ‘পাকা ছেলে ’ বলবে এই ভয়ে ফুল প্যান্ট পরার ইচ্ছার কথা কাউকে বলা হত না , যখন ‘আর কখনও হিন্দি গান শুনব না ’--- এই শর্তে দিদি ’কে রাজি করিয়ে দু-হাতেই দুটো ঘড়ি আঁকিয়ে নেওয়া যেত , স্যার প্রথম এল সেই সময়টাতেই৷ বেঁটে মতো পাতলা চেহারা৷ কোঁকড়ানো চুল ছোট করে কাটা৷ চোখে কালো গোল ফ্রেমের চশমা৷ হারকিউলিসের সাইকেল৷ কাঁধে একটা কালো ছোটো ব্যাগ৷ গায়ে লেখা --- নেতাজি স্পোর্টিং৷

গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের কুড়ি -একুশ বছরের গভর্নমেন্ট কলেজের অত্যন্ত কম কথার সেই ছাত্রটি পড়াতে এসে আমাকে একদম প্রথমে একটাই কথা জিজ্ঞাসা করেছিল --- তুই কি ফল খেতে ভালোবাসিস ? আমি তো যা ভালোবাসি বলে দিলাম --- পেয়ারা৷ সে তখন বলল , বেশ৷ এর পর দিন থেকে যখন আসব , তোর জন্য একটা করে পেয়ারা নিয়ে আসব৷ প্রিয় মানুষ হতে এটুকুই লাগল৷

যে ঘরে আমি থাকতাম , সেখানে দুটো বড়ো বড়ো জানলা৷ পুরনো আমলের লোহার শিক দেওয়া৷ জানলা পেরোলেই একটা পাঁচিল৷ তার পর বেশ খানিকটা জংলা জায়গা৷ তার পর ছোট একটা রাস্তা৷ সেখান দিয়ে কিছু মানুষ হাঁটে৷ কিছু সাইকেল যায়৷ এ রকম৷ রাস্তার উল্টোদিকে চায়ের দোকান৷ ইস্কুল থেকে ফিরে কোনও কোনও দুপুরবেলা সেই জানলায় মুখ ঠেকিয়ে ‘কুউউউউউউ ঝিকঝিকঝিকঝিকঝিকঝিক ’ করে ট্রেন চালাতাম৷ মনে হত আমার ঘরটার তলায় একটা বড়ো চাকা লাগানো আছে৷ একটু জোরে আওয়াজ করলেই সেটা পৌঁছে যাবে ওই দোকানটার কাছে৷ ওই ভাবে চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে একটু এগিয়েও যেতাম৷ স্যার আঁকা শেখাতে আসত বিকেলবেলা৷ সন্তাহে তিন দিন৷ সম্ভবত কলেজ থেকে ফিরে৷ এক দিন ট্রেন চালাতে চালাতে দেখলাম ওই দোকানটাতে বসে মাথা নিচু করে মন দিয়ে চা খাচ্ছে সে৷ ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে ভাঁড়ে৷ আমার আর তার মাঝে দুটো খেজুর গাছ , একটা জামরুল গাছ , কয়েকটা বড়ো বড়ো ঘাস আর একটা রাস্তা৷ আমার সব থেকে প্রিয় এক মানুষকে আমি দেখতে পেয়েছি , খুঁজে পেয়েছি আর কী , অথচ সে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না (আসলে সে দেখছেই না৷ তবুও ধরে নিয়েছি সে দেখতে পাচ্ছে না৷ ) ---ওই বয়সে এটুকুর থেকে বেশি জিতে যাওয়ার আনন্দ তো আর কিছুতে -ই পাওয়া যায় না৷ এক বার মনে হল খুব জোরে চেঁচিয়ে ডাকি৷ কিন্ত্ত ডাকলাম না৷ ইচ্ছা করেই৷ তবে কুউউউ ঝিকঝিক -টা চলতে থাকল৷ ফিসফিসিয়ে৷

আঁকা শেখা চলছিল৷ আমি একদমই আঁকতে পারি না৷ নতুন স্যারের তা নিয়ে খুব একটা হেলদোল নেই৷ সে নিজের মতোই ছবি এঁকে যায়৷ এক দিন আমাকে বলল , ডালিম গাছ দেখেছিস ? আমি বললাম , না দেখার কী আছে ? রাঙা মাসির বাড়িতেই তো আছে ! ছোটোবেলা থেকে দেখছি৷ বলল , ঠিক আছে৷ আঁকবি ? আমি বললাম , না৷ তুমি আঁকো৷ আমি বরাবরই ও রকম বলতাম৷ স্যার এঁকে দিত আর একটা কথাও না বলে৷ একটা গাছ পেনসিলের কয়েকটা আঁচড়ে এঁকে ফেলল তার পর৷ তার ডালে পাতা নেই৷ কিন্ত্ত এটা দেখতে একেবারেই ডালিম গাছের মতো হল না , বললাম৷ হবে কী করে ? স্যার বলল৷ ও তো দুঃখে আছে৷ দুঃখে থাকলে কি আর ডালিম গাছ হওয়া যায় ? ডালিম কেন , কোনও গাছই কি হওয়া যায় ? তার পর ওর পাশেই একটা অনেক পাতা ভর্তি গাছ এঁকে দিল৷ সেই গাছটা ঘাড়টা খানিকটা বেঁকিয়ে ঝুঁকে পড়েছে ন্যাড়া গাছটা ’র গায়ে৷ তার পর পাতা ভর্তি গাছটা ’র পাশে পেনসিল দিয়ে সরু করে লিখে দিল --- একটা গাছের বিপদে আর একটা গাছ এ ভাবেই এগিয়ে আসে৷ তার জন্য মানুষকে লাগে না আলাদা করে৷ সেই পাতার তলাতে বড়ো করে লিখল --- আমি গাছ হতে চাই না৷ আমি তার অর্থ হতে চাই৷

আমার ড্রয়িং খাতা ভরে উঠত প্রত্যেক দিনের নতুন নতুন এই সব বাক্য এবং আঁকিবুঁকিতে৷

এ ই ভাবেই চলছিল আঁকা শেখা৷ নতুন স্যার আঁকত৷ মাঝে মাঝে তার পাশে একটু করে লিখে দিত৷ আমি তখন পেয়ারা খেতে ব্যস্ত৷ স্যার যে এই ভাবে আঁকা শেখাত আমায় , তা আমার বাড়ির লোক জানত না৷ বা , হয়তো ঠিকই জানত , আমিই তা জানি না৷ যেমন স্যার জানত না , সন্তাহে তিন দিন আমি আমার জানলা -ট্রেনটি’কে চালিয়ে নিয়ে হঠাত্ চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছে গিয়ে তাকে চমকে দেওয়ার একটা প্রাণপণ চেষ্টা দারুণ ভাবে চালিয়ে যাই৷

দুপুর শেষ হয়ে যখন বিকেলে ঢুকে যায় , সেই সময়টায় স্যার আসত৷ এই ভাবেই চলছিল দিনের পর দিন৷ অনেকগুলো সন্তাহ মাস কেটে গেল৷ এ রকমই একটা দিন স্যার এসে বলল , আজ পোর্ট্রেট আঁকব … পোর্ট্রেট মানে কী ? প্রশ্ন করলাম আমি৷ স্যার বোঝালো৷ তার পর বলল , আমি তোর মুখের একটা ছবি এঁকে দিই বরং৷ তুই চুপ করে বসে থাক৷ আমি কিছু নড়লাম৷ কিছু ঘাড় চুলকোলাম৷ তার মাঝেই পেনসিলের কয়েকটা আলগোছের টানে কাগজের উপর চেপে বসল আমার এই কান , চুল , নাক , ঠোঁট৷ কাগজটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকার পর স্যার বলল , এ বার তোকে একটা টাস্ক দিই৷ তোকে এবার আঁকতে হবে আমার মুখটা৷ বললাম , যেমন বলতাম টলতাম আর কী --- আমি তো পারব না স্যার৷ তুমিই এঁকে দাও৷ স্যার হাসল , ঠিকই পারবি৷ দেখিস …স্যারের সঙ্গে সেটাই শেষ দেখা৷ আর স্যার আসেনি কখনও৷ প্রথমে ভেবেছিলাম , শরীর খারাপ হয়েছে বোধহয়৷ শরীর খারাপ আর ক’দিনই বা থাকবে ! স্যারের বাড়ি চিনি না৷ আমি না , মা -ও না৷ তখন তো মোবাইলও ছিল না৷ প্রতি দুপুরে জানলার সামনে গিয়ে বসতাম৷ ট্রেন চালানো শুরু করার খানিক পরেই স্পিডটা কমে যেত৷ চায়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দুপুর থেকে বিকেল তার পর অন্ধকার৷ স্যার আসত না৷ জানলার পাশেই ঘুমিয়ে পড়তাম কোনও কোনও দিন৷

এ রকমই এক ঘুম থেকে উঠে এক দিন কানে আসল মা আর বাবার কিছু কথা৷ মা অল্প ফোঁপাচ্ছিল৷ বাবা বলছিল , এত অল্পবয়সী ব্রাইট একটা ছেলে৷ কেন যে এমন হয় ! তারও অনেক পরে জেনেছিলাম --- স্যারের ওই ভাঙাচোরা হারকিউলিসের উপর দিয়ে প্রচণ্ড স্পিডে কোনও এক হারকিউলিসই চলে গিয়েছে৷ সেটা বাস , লরি না ম্যাটাডোর --- তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়৷ আচ্ছা , স্যার কি তখন ওই পাতাভরা ডালিম গাছটা ’র মতোই ঝুঁকে পড়েছিল ?এই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে প্রায় সতেরো -আঠারো বছর৷ বয়স বেড়েছে৷ ফুলপ্যান্ট পরলে কেউ আর বকে না৷ ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠতে ভুলেছি সেই কবেই৷ পাড়া বলে আর কিছু নেই৷

চায়ের দোকানটা -ও উঠে গিয়েছে তা হল অনেক দিন৷ তার জায়গায় একটা ছোট কফিশপ হয়েছে৷ আমার সেই ঘরটি কেবল এখনও রয়ে গিয়েছে৷ তার তলায় আর কোনও চাকা নেই যদিও৷ কোনও কোনও রাতে সেই জানলাটা দিয়ে এখনও মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকতে হয়৷ কানে আসে বাইকের অযথা শব্দ , জাস্টিন বিবারের গান , অনেক অনেক মানুষের তোতলা বাখোয়াজি৷ এ সবের থেকে বেশ খানিকটা দূরে বসে থাকতে দেখা যায় কোনও দিনই আঁকা না শিখতে পারা সেই বাচ্চা ছেলেটাকে৷ যে দিনের পর দিন ধরে চেষ্টা করে যেত তার ড্রয়িং খাতায় নতুন স্যারের পোর্ট্রেটটা এঁকে ফেলার৷ স্যার যদি কখনও ফিরে আসে তা হলে সেটা দেখিয়ে অবাক করে দেবে৷

গোল ফ্রেমের চশমা পরা কোঁকড়ানো চুলের বেঁটে চেহারার ছবিটা আবছা হতে থাকে ধীরে ধীরে৷ রেখাগুলো ভেঙেচুরে যেতে থাকে তার … গোল ফ্রেমের চশমা , কোঁকড়ানো চুলপাতা ভর্তি গাছটা ’র পাশে পেনসিল দিয়ে সরু করে লিখে দিল --- একটা গাছের বিপদে আর একটা গাছ এ ভাবেই এগিয়ে আসে৷ তার জন্য মানুষকে লাগে না আলাদা করে৷



লেখক পরিচিতি
বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য

হ্যাঁচ্চো, মিনিবাস, মোমবাতি, মাঝরাস্তা, লেড়ো-খাস্তা... অল্প অল্প করে রয়েছেন সবেতেই। পাশ ফিরে ঘুম আর বিফ কাবাবে প্রচুর সময় দেওয়ার জন্য মাঝমাঝেই ডেডলাইন মিস করেন। প্রিয় বাক্য-- " ঠিয়াছে... কোনও অ্যাপার না...!"

গল্পকার। প্রবন্ধকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন